ইশকে দে ফানিয়ার পর্ব ৪৮
মেহজাবিন নাদিয়া
জেবা কিছু একটা বলতে যাবে, ঠিক তখনই ওপর থেকে জিনিসপত্র ভাঙার বিকট শব্দ ভেসে এলো। হঠাৎ এমন আওয়াজে অরি আর জেবা দুজনই চমকে গেলো। সারিম বুঝতে পারলো আনতারা মৃধা এবার ক্ষেপেছে! তাই এখানে আর এক মুহূর্ত থাকাটা বুদ্ধিমানের কাজ হবে না ভেবে, সে অরিকে আচমকা কোলে তুলে নিয়ে সোজা ওপরের রুমে চলে গেলো।
সারিম যাওয়ার পরপরই জেবাও ওপরে চলে এলো। সে করিডোর দিয়ে যাওয়ার সময় গেস্টরুম থেকে আনতারা মৃধার তাণ্ডব আর ভাঙচুরের শব্দ শুনতে পেলো। তবে সেদিকে কোনো পাত্তা না দিয়ে রুমে চলে এলো।রুমে এসে দেখলো আরিশান মৃধা বেশ আরামে বিছানায় হেলান দিয়ে ফোন স্ক্রোল করছেন। জেবার তা দেখে মেজাজ একদম সপ্তমে চড়ে গেলো। সে সোজা গিয়ে আরিশান মৃধার হাত থেকে ফোনটা টান মেরে কেড়ে নিয়ে বালিশের ওপর ছুড়ে মারলো।
আরিশান মৃধা জেবার এই উগ্র রূপ দেখে বেশ অবাক হলেন। গুরুত্বপূর্ণ কাজের মাঝে এভাবে ফোন কেড়ে নেওয়ায় বিরক্ত হয়ে জিজ্ঞেস করলেন,
_”সমস্যা কী তোমার বেয়াদব মেয়ে?”
_”আমার সমস্যা কী তা আপনি সত্যি বুঝতে পারছেন না, নাকি না বোঝার ভান করছেন? আপনার এসব ভাবসাব আমার একদম পছন্দ হচ্ছে না!” জেবা রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে বললো।
আরিশান মৃধা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন,
_”আমার কোনো কিছু তোমার কোনোদিন পছন্দ হয়েছে বলে তো মনে হয় না! তোমার জ্বালায় আমি একদণ্ড শান্তিতে থাকতে পারছি না। নেহাত বউ বলে ছাড় পাচ্ছো।”
_”ওহ! আমি যখন এতই জ্বালাই, তাহলে আমাকে মুক্তি দিয়ে দিচ্ছেন না কেন? আপনার জন্য… শুধু আপনার জন্য ফুফু আজ আমাকে ত্যাজ্য করলো! আপনি ইচ্ছে করে আপনার অ্যাসিস্ট্যান্টকে দিয়ে ফুফুর কাছে মিথ্যা খবর পাঠিয়েছিলেন না, যে আমি নিজে থেকে আপনার সাথে ফিরে এসেছি? আপনার একটুও লজ্জা করলো না। আমার মৃত বাবাকে নিয়ে ব্ল্যাকমেল করে এই বাড়িতে ফিরিয়ে আনতে? খালি একবার বাবার খুনি ধরা পড়ুক, তারপর দেখুন আমি কীভাবে এই বাড়ি ছেড়ে চলে যাই! আপনার নিরাপত্তারও আমার দরকার নেই, আর না আছে আপনার ‘সো-কল্ড’ বউ সেজে থাকার কোনো শখ!”
জেবা একশ্বাসে কথাগুলো বলে থামলো। আরিশান মৃধা মন দিয়ে জেবার কথাগুলো শুনলেও মুখে কোনো টু শব্দ করলেন না, পুরো চুপ মেরে রইলেন।ওনাকে এভাবে চুপ থাকতে দেখে জেবা আরও ক্ষেপে গিয়ে বললো,
_”কী হলো, বোবা হয়ে গেছেন নাকি? কথা বলতে পারেন না?”
আরিশান মৃধা বিরক্ত হয়ে বললেন,
_”না, আমি তোমার মতো গায়ে পড়ে ঝগড়া করতে পারি না। চুপচাপ কান খুলে শুনে রাখো-তোমার সাথে সংসার করার জন্য আমি তোমার কোনো অনুমতি চাচ্ছি না। তাই আমার সাথে লাগতে এসো না,ভবিষ্যতের দিকে মন দাও।”
_”কিসের ভবিষ্যত? কোন ভবিষ্যতের কথা বলছেন আপনি?”
আরিশান মৃধা ঠোঁটের কোণে বাঁকা হাসি ফুটিয়ে বললেন,
_”কাছে এসো, বুঝিয়ে দিচ্ছি।”
জেবা চোখ ছানাবড়া করে আরিশান মৃধার দিকে তাকালো। ছিঃ! লোকটা তাকে কীসব বাজে ইঙ্গিত দিচ্ছে!
_”লজ্জা করে না আপনার? আমাকে এসব কথা বলতে! নিজের বয়সটা দেখেছেন আগে?”
আরিশান বয়সের পার্থক্যে কান না দিয়ে উল্টো জেবাকেই খোঁচা মেরে বললেন,
_”কে যেন বলছিল ভালোবাসা নাকি বয়স মানে না? সত্যি বলতে, সেদিন হাসপাতালে আমার সব লজ্জা কোনো এক রমনী চুরি করে নিয়ে গেছে। তাই লজ্জা জিনিসটা এখন আমার মধ্যে একদম মিসিং! এখন আর কী করার? এভাবেই মানিয়ে নাও আমার সাথে।”
জেবা লোকটার কথা শুনে যেমন ভিষণ লজ্জা পেলো, তেমনি তার এই হঠাৎ বদলে যাওয়া দেখে অবাকও হলো। বুঝতে পারছিল না এখন কী উত্তর দেবে। তবে হাসপাতালের ওই মুহূর্তটার কথা মনে পড়তেই তার আবার রাগ আর লজ্জা দুটো একসাথেই উঠে গেলো। কত ইচ্ছে ছিল জীবনের ওই সুন্দর মুহূর্তটাকে বিশেষ করে স্মৃতিতে ধরে রাখবে, অথচ সারিম তার সব চিন্তাভাবনায় এক বালতি জল ঢেলে দিলো! সবদিক থেকেই ভেস্তে দিলো সবকিছু।হঠাৎ জেবার মনে হলো, তাদের তো এখনো ডিভোর্স হয়নি। আরিশান মৃধাকে কি এখনই তার প্রেগন্যান্সির কথাটা বলে দেওয়া উচিত, নাকি পরে বলবে? সে দ্বিধায় পড়ে গেলো।
জেবাকে এভাবে হঠাৎ চুপ হয়ে যেতে দেখে আরিশান অন্য কিছু ভেবে নিয়ে বললেন,
_”কী হলো,একদম চুপ হয়ে গেলে যে? রেডিওর ব্যাটারি শেষ নাকি?”
রেডিও বলাতে জেবা আবার ফোঁস করে উঠলো,
_”এই! আপনি কাকে রেডিও বললেন শুনি? কোন দিক থেকে আমাকে আপনার রেডিও মনে হয়?”
_”মনে হওয়ার কী আছে? তোমার আচরণই বলে দেয় তুমি একটা ভাঙা টেপ রেকর্ডার! অসভ্য মেয়ে একটা, বোঝে কম চিল্লায় বেশি। এমনকি বয়সে বড়দের গায়ে হাত তুলতেও যার বাধে না!”
জেবা বুঝতে পারলো লোকটা তাকে ওইদিনের থাপ্পড়টা নিয়ে খোঁচা দিচ্ছে। এতদিন জেবা মনে মনে এই বিষয়টার জন্য বেশ অনুশোচনা করছিল, কিন্তু আজ লোকটার মুখের ওপর তর্ক শুনে মনে হচ্ছে-একটা কেন, আরও দু-চারটে কষিয়ে দেওয়া উচিত ছিল! তবে মুখে বললো,
_”সো হোয়াট! তাতে কী হয়েছে? বউ হই আপনার। অন্যায়কে সাপোর্ট করলে বউয়ের হাতে দু-একটা মার খেতেই হবে, তা সে আপনি যত বড় মহাপুরুষই হন না কেন!”
_”তার মানে তুমি মেনে নিলে যে তুমি আমার বউ?”
_”মন থেকে মানিনি, কাগজ-কলমের হিসাবটা থেকে বললাম আরকি! আমার ঠেকা পড়েছে আপনার মতো দুর্নীতিবাজ লোককে স্বামী মানতে!”
আরিশান মৃধা এবার আর নিতে পারলেন না। এই মেয়েটা কিছুক্ষণ পরপর ওনাকে নিত্যনতুন উপাধি দিয়েই চলেছে, আর উনি তা চুপচাপ শুনে যাচ্ছেন! এখন আবার ‘দুর্নীতিবাজ’ তকমা ঝুলিয়ে দিলো! সারাজীবন মানুষ ওনাকে একজন সৎ ও দায়িত্ববান মন্ত্রী হিসেবে চিনে এসেছে, অথচ এই দুদিনের বউটা এসে ওনার মান-সম্মান ফুটে নিয়ে যাচ্ছে। চাইলেও এই মেয়ের সামনে গাম্ভীর্য ধরে রাখা যায় না। এখন আর আগের মতো ধমক দিলেও এই মেয়ে দমে না। উল্টো ওনাকে দশকথা শুনিয়ে দেয়। আর ওনি সেসব নিলজ্জের মতো শুনেও আসে। নিজের আচরণের এই পরিবর্তন দেখে উনি বেশ বিরক্ত হলেন। দিন দিন কেমন যেন বলদে যাচ্ছেন।
জেবা আরিশান মৃধার থমথমে মুখের দিকে একবার তাকিয়ে আর কিছু বললো না। শরীরটা বড্ড ক্লান্ত লাগছে তার, এই মুহূর্তে ঘুম ছাড়া আর কিছুই মাথায় আসছে না। পাশ কাটিয়ে সোজা বেডে গিয়ে শুয়ে পড়লো। এসিটা বাড়িয়ে দিয়ে ব্ল্যাঙ্কেটটা ভালো করে গায়ে জড়িয়ে নিলো।
তখনি জড়িয়ে ধরে ঘুমানোর জন্য কিছুর অভাব অনুভব করতেই সে ব্ল্যাঙ্কেটের নিচ থেকে হাতটা বাড়িয়ে আরিশান মৃধার উদ্দেশ্যে বললো,
_”আমার টেডিটা দিন, ওটাকে জড়িয়ে ধরে ঘুমাবো।”
আরিশান মৃধা পাশে থাকা পিঙ্ক কালারের টেডিটা জেবার দিকে বাড়িয়ে দিলেন। না চাইতেও সামান্য একটা টেডির ওপর ওনার ভীষণ হিংসে হলো-তার জায়গায় কিনা রাজত্ব করছে একটা টেডি! মনে মনে প্রতিজ্ঞা করলেন, একবার সবকিছু ঠিক হয়ে যাক, এই টেডি আর এই ঘরে রাখবেনই না!
এদিকে জেবা টেডিটা হাতে পেতেই সেটাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে ঘুমের রাজ্যে পাড়ি জমালো।
Ishq de fanniyar lad gaye
Meri jaan ke peechhe pad gaye
Seedhi laake dekho mere
Dil ki chhat pe chadh gaye
Sau sau awaazein maare akhiyan
Maare akhiyan, maare akhiyan
Usey neeche chhat se utaare akhiyan
Utaare akhiyan, utaare akhiyan
Sau sau awaazein maare akhiyan
Ikk uska naam pukaare
Sohne rang de Mahiya
Tere hi jaise lagte hain saare
Darr lagta na ho jaaye yaari
Sohne rang de mahiya…
Poochh le tu chaand se
Ginta hoon taare
Darr lagta na ho jaye yaari
Sohne rang de Mahiya… ho…”
_”জ্বি মানে স্যার প্রেমে পড়েছেন নাকি কারো?”
আচমকা কারো গলার কন্ঠস্বর শুনে গিটার টা রেখে দেয় আয়ুশ। দেখা গেলো তার সামনে দাঁড়িয়ে আছে আলভী। আলভীকে দেখে অপ্রস্তুত হলো কিছুটা। এই সময় নিজের ফ্ল্যাটে সে মোটেও আলভীকে আশা করেনি। আলভী আয়ুশের সামনে এসে দাঁড়ালো। হাতে থাকা তদন্তের ফাইলটা এগিয়ে দিয়ে গম্ভীর গলায় বলল-
_”কেসের গুরুত্বপূর্ণ এভিডেন্স পাওয়া গেছে।”
_”কি কি জানতে পারলে?”
_”আপনার সন্দেহই ঠিক ছিলো স্যার। এসব কিছুর পিছনে আনতারা মৃধারই হাত আছে। এই দেখুন, এখানে ক্রাইম সীনের কাছাকাছি ওনার ফোনের টাওয়ার লোকেশন অ্যাকটিভ দেখাচ্ছে। এছাড়া সেলুলার কোম্পানি থেকে প্রাপ্ত কল ডিটেইলস রেকর্ড পর্যালোচনা করে জানা গেছে, ঐখানে ওনি আর অনুপমা ছাড়াও আরো এক ৩য় পক্ষ ব্যক্তি উপস্থিত ছিলেন। ট্র্যাকিং ডেটা অনুযায়ী একই সময়ে তিনজনের গতিপথ একই রেখায় মিলে যাচ্ছে।”
আয়ুশ ফাইলটা হাতে নিয়ে গভীর মনোযোগে ফরেনসিক ও নেটওয়ার্ক ট্র্যাকিং রিপোর্টগুলোর ওপর চোখ বুলালো। এরপর আলভীর উদ্দেশ্যে বলল-
_”এ ব্যাপারে আরিশান আঙ্কেল ও সারিমকে এখনই ইনফর্ম করার দরকার নেই। তদন্তের স্বার্থে আমাদের আরো স্ট্রং প্রমাণ দরকার।”
_”তবে এর চেয়ে আর বড়ো স্ট্রং প্রমাণ কিই বা হতে পারে, স্যার?”
আয়ুশ দুচোখ উঁচিয়ে কিছু একটা ভাবলো। এরপর সূক্ষ্ম হাসির রেখা ফুটিয়ে বলল-
_”তোমার মনে হচ্ছে না আলভী, এই কেসের পিছনে অবশ্যই কোনো গভীর উদ্দেশ্য বা মোটিভ আছে? যেটা আরিশান আঙ্কেল আর সারিম খুব করে লুকাতে চাচ্ছে।”
আলভী অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলো-
_”কি উদ্দেশ্য থাকতে পারে? আর তারা কেনই বা সেটা লুকাবে?”
আয়ুশ বলল-
_”উদ্দেশ্য যাই থাকুক না কেন, প্রফেশনাল ইনভেস্টিগেশনের মাধ্যমে তা বের হয়ে আসবে। এখন তোমার প্রধান কাজ হচ্ছে এই ৩য় ব্যক্তিটার পরিচয় ক্র্যাক করা এবং তাকে খুঁজে বের করা। ঐ সন্দেহভাজনকে আমার যেকোনো মূল্যে চাই। খুব শীঘ্রই এই কেসের জট খুলতে চলেছে।”
আলভী মাথা নাড়ালো, বলল-
_”আই উইল ট্রাই মাই বেস্ট স্যার। তবে অবিরাম থাকলে খুবই হেল্পফুল হতো, আফটার অল সিআইডি ফিল্ডে সে এসব ইন্টেলিজেন্স ও এভিডেন্স কালেকশনে এক্সপার্ট।”
অবিরামের কথা শুনতেই আয়ুশ প্রশ্ন করলো-
_”অবিরামের কোনো খোঁজ পেয়েছো?”
আলভী বলল-
_”চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি।”
আয়ুশ একটু হতাশ হলো। কোথায় গেলো অবিরাম তা এখনো জানা যাচ্ছে না। সেদিন অবিরাম তাকে এতোগুলো জরুরি ফোনকল করে হঠাৎ উধাও। সে সেদিন অন্য একটা কেসে ব্যাস্ত থাকায়,অবিরামের কলটাও রিসিভ করতে পারেনি। আয়ুশ বুঝলো এর পিছনে বড় কোনো ঘাপলা বা ষড়যন্ত্র আছে। অবিরাম খুবই পাওয়ারফুল এভিডেন্স কালেক্টর। সে যেখানেই যেতো না কেন এমন সব ক্রুশিয়াল এভিডেন্স আনতো যা কেসের সলভিং প্রসেস অর্ধেক সহজ করে দিতো। মনে মনে অবিরাম যেখানেই থাকুক সুস্থতার প্রার্থনা করলো আয়ুশ।
_”অবিরামের কোনো খোঁজ পেলে অবশ্যই জানাবে আমায়। এখন যেতে পারো।”
আলভী এরপর চলে যাওয়ার জন্য হাঁটা ধরলো। যেতে গিয়েও কি একটা ভেবে পিছু ফিরে বলল-
_”বাই দ্য ওয়ে, নতুন প্রেমে পড়লে একটু শিল্পী হতে সবারই মন চায়। বেস্ট অফ লাক স্যার!”
আয়ুশ কৃত্রিম রাগ দেখিয়ে বলল-
_”তেমন কিছুই না।”
তবে এতক্ষণে আলভী দরজা পেরিয়ে বেরিয়ে গেছে। আলভী চলে যেতেই আয়ুশ আপনমনে হেসে ফেলে। প্রেমে আর সে? আসলেই তো, তাকে যে প্রেম রোগে ধরে ফেলেছে। তাও আবার সেই বাদামী চুলের অধিকারী। কি নেশা লাগিয়ে গেলো তার মনে! এতো চেষ্টা করেও এই একমাসে সে মেয়েটাকে একটুও ভুলতে পারছে না। উল্টো মেয়েটা তার ধ্যান-জ্ঞান সবকিছু কব্জা করে বসে আছে। আয়ুশ বুঝে গেছে, এই মেয়েকে তার লাগবেই। এই মেয়ে ছাড়া সে থাকতে পারবে না।
আনতারা মৃধা কাউকে কিছু না বলেই এক কাপড়ে বাড়ি ছেড়ে চলে গেছেন।দুপুরের দিকে অরিকে বাড়িতে রেখে সারিম একটা ইভেন্টে গিয়েছিল। অনুষ্ঠান শেষ হতেই সে ফোন হাতে নিয়ে দেখতে পায়, অরি তাকে পর পর অনেকগুলো মিসড কল দিয়ে রেখেছে। সেই সাথে একটা মেসেজও পাঠিয়েছে ‘জলদি বাড়ি ফিরার জন্য!
মেসেজ দেখে দ্রুত বাড়ি ফিরে আসে সারিম।ভাবলো অরির কিছু হলো কিনা।কিন্তু এসে জানতে পারে আসল ঘটনা। তবে আনতারা মৃধার এমন হুট করে বাড়ি ছেড়ে চলে যাওয়ার কথা শুনে সারিম মোটেও বিচলিত হলো না।যেন সে আগে থেকেই জানতো,এমন কিছুই একটা ঘটবে।
বারান্দায় দাঁড়িয়ে সারিম নিশ্চিন্ত মনে সিগারেট ফুঁকছিল। সারিমকে এতটা শান্ত আর নিশ্চিত থাকতে দেখে অরি এগিয়ে এলো তার দিকে। পিছন থেকে এসে সারিমকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে উদ্বেগ ভরা কণ্ঠে বলল,
_”সারিম, আপনার মা একা একা এত রাতে বাড়ি ছেড়ে চলে গেছে, উনি থাকবেন কোথায়? আপনার একটুও চিন্তা হচ্ছে না?”
পিঠে অরির স্পর্শ পেতেই সারিম হাতের জ্বলন্ত সিগারেটটা নিচে ফেলে দিল। মুখের সিগারেটের গন্ধ দূর করতে পকেট থেকে একটা চুইমগাম বের করে মুখে পুরে চিবিয়ে ফেলে দিল। এরপর অরিকে দুহাতে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে এক ঝটকায় কোলে তুলে নিল।
অরি হঠাৎ এমন করায় সারিমের বুকে হালকা ধাক্কা দিয়ে বলল,
_”কী করছেন কী বলুন তো? যখন তখন আপনার এভাবে আমাকে কোলে নেওয়ার অভ্যাস কিন্তু আমার নেই!”
সারিম অরির চোখের দিকে তাকিয়ে বলল,
_”অভ্যাসটা এবার করে নাও চন্দ্রিমা, কারণ এখন থেকে রোজ তোমাকে এভাবেই কোলে তুলে ঘুরে বেড়াবো।”
অরি আর তর্ক বাড়ালো না। কারণ সে ভালো করেই জানে, এই লোক একবার যা বলবে, তা করেই ছাড়বে। বাইরের মেঘলা আকাশ থেকে নামা ঠান্ডা বাতাস গায়ে লাগতেই সারিম আর দেরি না করে অরিকে কোলে নিয়েই রুমের ভেতরে চলে এলো।
আজকের আবহাওয়াটা চমৎকার, পুরো আকাশ জুড়ে মেঘের ঘনঘটা। রুমে এসে সারিম অরিকে বিছানায় আরাম করে বালিশে হেলান দিয়ে শুইয়ে দিল। তারপর নিজেও অরির পাশটিতে গা ঘেঁষে বসে পড়লো। অরি একটু এগিয়ে এসে সারিমকে দুহাতে জড়িয়ে ধরলো। সারিম পুরো নীরব, কেমন যেন একটা গভীর চিন্তায় মগ্ন।
অরি আস্তে করে বলল,
_”সারিম, আপনার কি মায়ের জন্য সত্যি একটুও কষ্ট হচ্ছে না? উনি যতই খারাপ হোন না কেন, শেষ পর্যন্ত তো উনি আপনার মা!”
সারিম নিজের মাথাটা অরির কাঁধে নামিয়ে দিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল,
_”তাকে নিয়ে আমার ভেতরে এখন আর কোনো অনুভূতি আবেগ কাজ করে না। জীবনের প্রতিটা পদে সে শুধু নিজেকে নিয়ে ভেবেছে, কখনো আমার কথা ভাবেনি। সে চরম স্বার্থপর ছিল।এখন নাহয় আমিও ঠিক তার মতোই হয়ে গেলাম।”
অরি খুব মায়া হলো। সে সারিমের চুলে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বলল,
_”আপনি কথাগুলো একদম মন থেকে বলছেন না সারিম। ভেতরের জমে থাকা কষ্ট থেকে বলছেন। একবার নিজের মনটাকে সত্যি করে জিজ্ঞেস করে দেখুন তো, উনার জন্য আপনার ভেতরে আসলে ঠিক কেমন ফিল হয়?”
সারিম অরির প্রশ্নের কোনো সোজা উত্তর দিল না। উল্টো অরির তুলতুলে গালে মিষ্টি একটা চুমু এঁকে দিয়ে বলল,
_”থাক, বড়দের মতো অনেক লেকচার দিয়েছো! বউ, এখন একদম কাছে আছো, শান্ত হয়ে থাকো তো।”
অরি সারিমকে আলতো করে ঠেলে সরিয়ে দিয়ে কৃত্রিম রাগ দেখিয়ে বলল,
_ “অসভ্য লোক একটা! ছাড়ুন বলছি। বাবা হতে চলেছেন এবার অন্তত নিজের মুখে একটু লাগাম টানুন!”
সারিম দুষ্টুমি করে অরির কানের লতিতে হালকা এক কামড় বসিয়ে ফিসফিস করে বলল,
_”কী করবো বলো বউ? তোমার সাথে ঠিকঠাক মতো বাসরটাই করা হলো না!এর আগেই যেন সবকটা আঁটঘাট বেঁধে হামলা চালালো।জাউরা শুক্রাণুগুলো একদম আস্ত চার-চারটে মিসাইল মেরে আমার সব যৌবন এক নিমেষে ধসিয়ে দিল!”
সারিম কথা বলার ধরন দেখে অরি শক্ত করে চোখ-মুখ কুঁচকে ফেলল,
_”ইশ! আপনার মুখে এত ঢং আসে কোত্থেকে বলুন তো? ঠিকঠাক বাসর না হলেই যদি একসাথে এতগুলো ‘ডাউনলোড’ হয়ে যায়, তবে বাসর হলে কী হতো! আর আপনি কীভাবে এত সিওর যে চারটাই আসবে? ডাক্তার তো বলেছিল তিনটা ও হতে পারে!”
সারিম সোজা নাকচ করে দিয়ে বলল,
_”আরে ধুর! এগুলো তো আমার রক্ত, আমারই তো বংশ! এদের ওপর আমার কোনো বিশ্বাস নেই। দেখবে ঠিক চারটাই দুনিয়াতে আসবে এই বাপটাকে জ্বালানোর জন্য!”
অরি সারিমের এমন যুক্তিতে খোঁচা মেরে বলল,
_”ইশ রে! আপনার আর ঠিকমতো বাসর করা হলো না, শুনে আমার ভারী কষ্ট হলো!”
সারিম একগাল হেসে বলল,
_”হাহা! এতে কষ্টের কী আছে? এরা একবার পেট থেকে বাইরে বের হোক, তারপর আমি আবার আমার ডিউটি শুরু করে দেবো! এসব ফরজ কাজে পিছিয়ে থাকতে নেই বউ। তা সে জোয়ান কাল হোক আর বুড়ো কাল! আমার বাপের মতো আমিও বুড়ো বয়সে তোমাকে নিয়ে ধুমধাম রঙ্গলীলা করবো!”
_”হ্যাঁ, বুঝে গেছি আপনাকে আমি ভালো করেই! এখন দয়া করে মুখটা বন্ধ রাখুন প্লিজ!”
সারিম লক্ষ্মী ছেলের মতো অরি কথা শুনে চুপ হয়ে গেল। তারপর আস্তে আস্তে নিজের মাথাটা নামিয়ে এনে অরির পেটের ওপর রাখলো। একদম কান পেতে ভেতরের ছোট্ট নতুন প্রাণগুলোর অস্তিত্ব শোনার চেষ্টা করলো। যদিও এত কম বয়সে তাদের কোনো সাড়াশব্দ পাওয়া অসম্ভব, তাও সারিমের মনে হলো সে যেন ওদের প্রতিটা স্পন্দন পরিষ্কার অনুভব করতে পারছে।
সারিম আলতো হাতে অরিকে ধরে ওর পেটে ছোট ছোট অনেকগুলো চুমু খেল। তারপর অরির চোখের দিকে তাকিয়ে নরম গলায় জিজ্ঞেস করলো,
_”চন্দ্রিমা, এরা আমাকে ‘বাবা’ বলে ডাকবে কবে?”
অরি মিষ্টি একটা হাসি ফুটিয়ে বলল,
_”আগে তো দুনিয়াতে আসতে দিন! তারপর দেখবেন-আপনাকে বাবা, ড্যাডি, পিতা, ফাদার সব বলে একসাথে ডাকবে। ঠিক যেমনটা আপনি আপনার বাবাকে ডাকেন, আপনার সন্তানরাও আপনাকে ঠিক তেমনটাই ডাকবে।”
সারিম অধৈর্য হয়ে বলল,
_”কিন্তু এরা আসবে কবে বলো তো? আর তো একদম সহ্য হচ্ছে না! দেখো না, একদিনের মধ্যেই তোমার পেটটাকে কীভাবে ফুলিয়ে দিচ্ছে!”
অরি তো পুরো অবাক! চোখ বড় বড় করে বলল,
_”কী বলছেন যা তা! কোথায় আমার পেট ফুলেছে?”
সারিম হাতের ইশারায় অরিকে একটু নিচু হতে বলল। অরি কী দেখার জন্য যেই না পেটের দিকে একটু ঝুঁকেছে, সারিম অমনি সুযোগ বুঝে অরির ঠোঁটে টুপ করে একটা চুমু খেয়ে নিল!
অরি হঠাৎ এই কাণ্ডে থতমত খেয়ে গেল। পরক্ষণেই নিজেকে সামলে নিয়ে রাগের ভান করে বলল,
_”অসভ্য লোক! এসব করার ফন্দি ছিল, তাই না?”
সারিম দুষ্টু হেসে আবারও অরির পেটে মুখ গুঁজলো। অরি সাথে সাথে শিউরে উঠে কেঁপে উঠলো।
_”সারিম! বেবি আসার পরও আপনি এসব শুরু করে দিলেন? ছাড়ুন বলছি আমাকে!”
সারিম কিছুক্ষণ অরিকে ওইভাবে শক্ত করে ধরে রেখে তারপর ছেড়ে দিল। সারিম ছাড়তেই অরি বুক ভরে লম্বা লম্বা শ্বাস নিতে শুরু করলো। সারিম এত কাছে আসায় অরির বুকের খাঁচাটা দ্রুত ওঠানামা করছে। নিজেকে শান্ত করতে একটু সময় লাগলো তার।সারিম অরির দিকে একটা বাঁকা ইঙ্গিতপূর্ণ চাহনি নিক্ষেপ করে হঠাৎ বেশ গম্ভীর মুখে বলে উঠলো,
_”আমি একটা জিনিস ভাবছি বউ… বেবিরা দুনিয়াতে আসার পর, ওদেরকে আমরা প্যাকেটজাত দুধ খাইয়ে বড় করবো।”
অরি অবাক হয়ে বলল,
_”কেন? আমি থাকতে আবার প্যাকেটের দুধ খাওয়ানোর কি দরকার?”
সারিম চোখ ছোট ছোট করে তক্ষণি বলে উঠলো,
_”তুমি আছো মানে কী? ওইসব বেয়াদপ চিন্তাভাবনা মাথা থেকে একদম ঝেড়ে ফেলো বউ! আমি আমার জিনিসে ব্যাড টাচ একদম সহ্য করবো না, তা সে আমার নিজের সন্তানই হোক না কেন!”
অরির এবার সত্যি সত্যি মুখ হাঁ হয়ে গেল! সে তাজ্জব বনে গিয়ে বলল,
_”এই! আপনার এসব কথা বলতে লজ্জা করে না? নিজের পেটের সন্তানদের নিয়েও আপনার হিংসা হয়? আপনি আসলে কী ধাতুর তৈরি বলুন তো সারিম?”
সারিম বেশ গর্বের সহিত বলল।
_”বউকে খেয়ে দেওয়া নামক ধাতু।”
_”জ্বি আমি বুঝে গেছি। আপনি আসলে কোনো ধাতু না বরং অধাতু দিয়ে তৈরী।”
পরপর দুটো কড়া থাপ্পড় খেয়ে গালে হাত দিয়ে স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে জেবা। তার সামনেই দাঁড়িয়ে আছেন আরিশান মৃধা, যার চোখের দৃষ্টিতে আগুন জ্বলছে!ঝড় ওঠার আগে যেমন চারপাশ থমথমে হয়ে যায়, ঠিক তেমন এক প্রলয়ংকরী ঝড় যেন জেবার বুকের ভেতর আছড়ে পড়ছে। আরিশান মৃধা রাগে জেবার দিকে তাকিয়ে আছেন। দুপুরে তিনি বাড়িতে ছিলেন না, ভেবেছিলেন জেবা হয়তো রুমে ঘুমাচ্ছে। তাই ভাবাভাবি না করে কিছু জরুরি কাজে বাইরে যান। ঠিক তখনই ওনার ফোনে ওনার অ্যাসিস্ট্যান্ট কিছু ছবি পাঠায়- যেখানে পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে, জেবা লুকিয়ে একটা অজানা ছেলের সাথে দেখা করতে গেছে, এমনকি সেই ছেলেটা জেবাকে জড়িয়ে ধরে আছে!
এমন দৃশ্য চোখের সামনে দেখা আরিশান মৃধার পক্ষে প্রায় অসম্ভব ছিল। তিনি জীবনেও কল্পনা করতে পারেননি, সারিমের বলা কথাগুলো এভাবে পদে পদে সত্যি হয়ে যাচ্ছে। জেবার মনে এখন অন্য কারো বসবাস।মেয়েটা এজন্য তাকে এভাবে এড়িয়ে চলছে। বাড়িতে ফিরেই তিনি যখন এ ব্যাপারে জেবাকে জবাবদিহি করতে বলেন, জেবা সোজা উত্তর দিতে অস্বীকার করে। আর সেই রাগের মাথায় বাধ্য হয়েই আরিশান মৃধা ওর গায়ে হাত তুলে ফেলেন।
জেবা মাথা নিচু করে চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইলো। ওকে এভাবে নিশ্চুপ থাকতে দেখে আরিশান মৃধা আরও চটে গেলেন। রাগের মাথায় পাশে থাকা সোফায় কয়েকটা সজোরে ঘুসি মারলেন তিনি। তাও জেবা মুখ খুললো না।
আরিশান মৃধা এবার জেবার দুই বাহু খামচে ধরে ঝাঁকুনি দিয়ে চিৎকার করে উঠলেন,
_”আনসার মি, ড্যাম ইট! ওই ছেলের সাথে তোর কী সম্পর্ক?”
জেবা তবুও একদম নিশ্চুপ।
আরিশান মৃধার রাগের পারদ চরমে উঠলো,
_”মরার ভয় নেই তোর? ডানা গজিয়েছে না? টেনে ডানা ছিঁড়ে ফেলবো একদম! আমার খাঁচায় থেকে অন্য খাঁচায় যাওয়ার ফন্দি আঁটছিস? বল! ওই ছেলের সাথে কতদিনের সম্পর্ক তোর?”
জেবা এবার মুখ খুললো। একদম শক্ত কণ্ঠে বলল,
_”বলবো না আমি! আমার জীবন, আমি যাকে ইচ্ছে তাকে নিয়ে থাকবো, তাতে আপনার কী?”
কথাটা বলতে দেরি, তার গালে আবারও পর পর দুটো চটাস করে থাপ্পড় পড়তে দেরি হলো না!আরিশান মৃধা কপালে দুহাত ঠেকিয়ে নিজের রাগ নিয়ন্ত্রণ করার আপ্রাণ চেষ্টা করলেন। জেবা এবারও শক্ত হয়ে নিশ্চুপ রইলো, চোখ দিয়ে এক ফোঁটা জলও ফেললো না।
আরিশান মৃধা এবার কণ্ঠের জোর নামিয়ে আনলেন। জেবার দুটো হাত নিজের হাতের মুঠোয় চেপে ধরে নরম গলায় আকুতি জানিয়ে বললেন,
_”লুক এড মি,, লিসেন। তুমি এখনও অনেক ছোট, কোনটা ভালো আর কোনটা মন্দ তা বুঝতে শেখোনি। আই উইল ট্রাস্ট ইউ! আমি জানি তুমি আমাকে ঠকাচ্ছো না। তুমি যেটাকে ভবিষ্যৎ ভাবছো, সেটা কেবল একটা কাল্পনিক গল্প! বাস্তবতা শেখো জেবা। আই উইল রিয়ালি মেক ইউ হ্যাপি… প্লিজ ডোন্ট লিভ! তোমার যা চায় আমি তোমাকে সব দেবো, শুধু তুমি আমার সাথে থেকে যাও এই জীবনটায়! তোমার সব কথা মেনে চলবো, কখনো কমপ্লেন করার সুযোগ দেবো না… প্লিজ, জাস্ট ওয়ান মোর চান্স!”
জেবা আরিশান মৃধার হাত থেকে নিজের হাত দুটো ছাড়িয়ে নেওয়ার জন্য তীব্র টানাটানি শুরু করলো। জেবাকে নিজের কাছ থেকে এভাবে দূরে সরে যেতে দেখে আঁতকে উঠলেন আরিশান। ওর হাত দুটো আরও শক্ত করে চেপে ধরে বলে উঠলেন,
_”ডোন্ট লিভ লুনা! ইউ আর ওনলি মাইন! প্লিজ আমাকে ছেড়ে যেও না… তুমি যেমন চাও আমি নিজেকে ঠিক সেভাবে তৈরি করবো, প্রমিস! প্লিজ… প্লিজ ডোন্ট লিভ!”
জেবা ওনার আকুতি কানেই তুললো না, উল্টো হাত দুটো আরও শক্ত করে ছাড়িয়ে নেওয়ার প্রাণপণ চেষ্টা চালিয়ে গেল।এত বোঝানোর পরেও মেয়েটার এভাবে দূরে সরে যাওয়াকে কিছুতেই মেনে নিতে পারলেন না আরিশান মৃধা। জেবাকে থামাতে এবার গায়ের সব জোর দিয়ে পরপর চার-চারটে থাপ্পড় বসিয়ে দিলেন!
এবারের থাপ্পড়গুলো আগের চেয়েও এতটাই জোরালো ছিল যে জেবার মাথাটা মুহূর্তের জন্য ভনভন করে উঠলো। কানে যেন সে কিছুই শুনতে পাচ্ছিল না, চারপাশটা এক লহমায় অবশ হয়ে এলো। তবে সব কষ্ট চেপে নিজের শেষ শক্তিটুকু দিয়ে আরিশান মৃধাকে ধাক্কা দিয়ে ছাড়াতে ছাড়াতে জেবা ফুঁসে উঠলো।
জেবা গালের যন্ত্রণা সহ্য করে শক্ত গলায় বলল,
_”হাতটা আজকাল বড্ড বেশি চলে, তাই না?”
আরিশান মৃধা হাঁপাতে হাঁপাতে বললেন,
_”তুমি বারবার আমাকে বাধ্য করছো জেবা!”
জেবা চোয়াল শক্ত করে বলল,
_”মুক্তি কেন দিচ্ছেন না আমায়? আমাকে এভাবে কষ্ট দিয়ে আটকে রেখে আপনার কী লাভ?”
আরিশান মৃধার চোখে এক গভীর অন্ধকার নেমে এলো,
_”প্রথমবারের ভুলটা আমি দ্বিতীয়বার করার ভুল করতে চাই না!”
জেবা তিক্ত হেসে খোঁচা মেরে বলল,
_”প্রথমজন চলে গেছে বলে দ্বিতীয়জনকে কেন তার মাশুল গুনতে হবে?”
আরিশান মৃধার মুখটা এক লহমায় কঠিন হয়ে উঠলো,
_”প্রথমবার থেকে শিক্ষা নেওয়া, আর দ্বিতীয়বার শিক্ষা দেওয়া! আমাকে ছেড়ে যাওয়ার চেষ্টা করো না মেয়ে… আমি তোমার ক্ষেত্রে বড্ড বেশি নিষ্ঠুর হয়ে গেছি!”
জেবা ঘৃণাভরে আরিশান মৃধার চোখের দিকে তাকিয়ে শেষ আঘাতটা হানলো,
_”ঘৃণা করি আমি আপনাকে! প্রচণ্ড ঘৃণা করি! আমার চোখে দেখা ভালো মানুষের আড়ালে থাকা সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ কাপুরুষ আপনি!”
এরপর জেবা এক অভাবনীয় কাজ করে বসলো। আরিশান মৃধার হাতটা নিয়ে নিজের পেটের উপর রাখলো। আরিশান মৃধা কিছু বুঝবেন কি তার আগে জেবা চিৎকার করে বলে উঠলো।
_”জানতে চাইছিলেন না ঐ ছেলেটার সঙ্গে আমার কি সম্পর্ক। তাহলে শুনুন।ঐ ছেলেটার জন্যই আজ আপনার অনাগত বাচ্চা আর বউ দুজনেই বেঁচে আছে।”
আরিশান মৃধা পুরোপুরি স্তদ্ধ হয়ে গেলো। কানে এখনো তার বাচ্চা শব্দটা আঘাত হানছে।মনে হলো সে কোনো ভুল শুনছে। মস্তিকে রন্ধে রন্ধে শব্দটা বার বার প্রতিধ্বনি হচ্ছে।ওনার অনাগ বাচ্চা।এমন সময় পিছন থেকে একটা আওয়াজ আসলো। অরির কন্ঠস্বর শুনা গেলো।
ইশকে দে ফানিয়ার পর্ব ৪৭
_”সারিম আপনার কি হয়েছে।চোখ খুলুন প্লিজ।”
আরিশান মৃধা আর জেবা দুজনে একসঙ্গে ঘুরে তাকালো দেখলো।সারিম সোফার উপর ঢলে পরে আছে। চোখ দুটো বন্ধ মাথাটা হেলানো। অরি সারিমকে বার বার ডেকে যাচ্ছে। তবে সে কোনো সাড়া শব্দ দিচ্ছে না।
