ইশকে দে ফানিয়ার পর্ব ৪৯
মেহজাবিন নাদিয়া
ডাক্তার এসে কিছুক্ষণ আগেই সারিমকে দেখে গেছেন। পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে চেকআপ করার পর জানিয়ে গেছেন-সাময়িক কোনো মানসিক চাপ সহ্য করতে না পেরে সে সেন্সলেস হয়ে পড়েছিল। তাছাড়া বড় কোনো বিপদ হয়নি, কিছুক্ষণের মধ্যেই জ্ঞান ফিরে আসবে। সারিম সুস্থ আছে জেনে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে অরি। সে তো ভয়ে কত কী ভেবে বসেছিল!
আরিশান মৃধা পাশে গম্ভীর মুখে দাঁড়িয়ে ছেলের মুখের দিকে তাকিয়ে আছেন। খুব ভালোভাবেই বুঝতে পারছেন, ছেলে তাঁর ঠিক কোন কথায় এভাবে বেহুঁশ হয়েছে। আড়চোখে একবার জেবাকেও পরখ করে নিলেন। মেয়েটা অরির পাশে দাঁড়িয়ে আছে, চোখে-মুখে দুশ্চিন্তার স্পষ্ট ছাপ। হয়তো সারিমের এই অবস্থার জন্য মনে মনে নিজেকেই দায়ী ভাবছে।
এখনো আরিশান মৃধার কানে জেবার বলা সেই বাক্যটি প্রতিধ্বনিত হচ্ছে-উনার অনাগত সন্তান!সবচেয়ে বেশি অবাক লাগছে এটা ভেবে যে,জেবা এসব বিষয়ে জানা সত্ত্বেও সেদিন তাঁকে ডিভোর্স দিতে চেয়েছিল! তিনি যদি সেদিন তাকে না আটকাতেন,তবে না জানি কী হতো! মেয়েটার এমন কাণ্ডজ্ঞানের মাশুল আরিশান মৃধা ঠিকই কড়ায়-গণ্ডায় আদায় করে ছাড়বেন।
এমন সময় পিটপিট করে চোখ খুলল সারিম। নিজেকে বিছানায় আবিষ্কার করে এবং চারপাশে সবার উপস্থিতি দেখে ভীষণ অবাক হলো। সবাই এখানে কেন? তখনই তার মস্তিষ্কে খেলে গেল সেই ঘটনাটা। অরিকে নিয়ে সামান্য বাগানে হাঁটতে বেরিয়েছিল সে, তখনই কানে এসেছিল জেবার মুখে সেই বাচ্চার কথা। সব মনে পড়তেই সারিম বাবার দিকে তাকাল। আরিশান মৃধা ছেলের জ্ঞান ফিরতে দেখে মুখ ঘুরিয়ে নিলেন। বাবার এভাবে মুখ ঘুরিয়ে নেওয়া মোটেই পছন্দ হলো না সারিমের। সে জেবার দিকে ঘুরে তাকিয়ে বলল,
“অরিকে নিয়ে একটু বাইরে যাও, জেবা।”
জেবা আর কথা বাড়াল না, সারিম যা বলল সেটাই করল। অরি আর জেবা রুম ছেড়ে বেরিয়ে সোজা আরিশান মৃধার রুমে চলে গেল। অরি ও জেবা যেতেই সারিম আবার বাবার দিকে তাকাল। সারিমের এমন চাহনিতে কিছুটা অস্বস্তিতে পড়লেন আরিশান মৃধা। বুঝলেন, এবার এই অসভ্য ছেলের সামনে তাকে জবাবদিহি করতেই হবে। সারিম বাবাকে আপাদমস্তক একবার খুঁটিয়ে দেখে নিল। এরপর ইশারায় তাকে পাশের চেয়ারটাতে বসতে বলল। আরিশান মৃধা চুপচাপ বসতেই সারিম বলে উঠল,
_”কাজটা কি তুমি মোটেও ঠিক করলে, ড্যাডি? একবারও আমার অনুমতি নেওয়ার প্রয়োজন মনে করলে না?”
ছেলের এমন কথায় চরম বিরক্ত হলেন আরিশান মৃধা। এ কেমন কথা! তাকে এখন বাবা হতে হলেও ছেলের পারমিশন নিতে হবে? তাছাড়া এ বিষয়ে কি তাঁর আগে থেকে কোনো কল্পনা ছিল? তিনি নিজেও তো মাত্রই জানতে পারলেন যে আবার বাবা হতে চলেছেন!
_”তুমি এসব ফালতু কথা বলার জন্য আমাকে বসিয়েছ?”
_”এখন আমি ফালতু হয়ে গেলাম, তাই না? হবই তো! নতুন জন যে আসছে আমার সম্পত্তিতে ভাগ বসাতে!”
_”ব্যস, এটাই কারণ? সম্পত্তির জন্য নিজের আর কোনো ভাই-বোন চাচ্ছ না? ওকে ফাইন! তুমি তোমার সব সম্পত্তি নিয়ে নাও, আমার সন্তানের ওসবের কোনো প্রয়োজন নেই।”
সারিম বাবার কথায় হতাশ হয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
_”হাহ্! এই দিনটাই দেখার বাকি ছিল! এখন আমি পর হয়ে গেলাম আর ওটা নিজের সন্তান হয়ে গেল? বাহ্ বাবা, বাহ্! তাহলে আমি কে তোমার?”
_”তুমিও আমার সন্তান, সেও আমার সন্তান। আমি দুজনের মধ্যে কখনো ভেদাভেদ করব না-যদি না তুমি নিজে চাও। আমার চোখে তোমরা দুজনেই সমান।”
_”তাহলে তুমি বলতে চাচ্ছ, আমি তাকে মেনে না নিলে তুমি আমাদের মধ্যে ভেদাভেদ করবে?”
_”বাবা হিসেবে সন্তানের প্রতি এটা আমার কর্তব্য।”
সারিম চুপ করে রইল। আরিশান মৃধা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে সারিমের দিকে তাকালেন। তাকে গভীর কোনো ভাবনায় মগ্ন থাকতে দেখে আরিশান মৃধা বলে উঠলেন,
_”কী ভাবছ?”
সারিম আনমনেই জবাব দিল,
_”ভাবছি না, উপলব্ধি করছি।”
_”কী উপলব্ধি করছ?”
সারিম হতাশ মাখা কণ্ঠে বলল,
_”দেখছি, বাবা হওয়ার পাশাপাশি ভাই হওয়ার অনুভূতিটা ঠিক কেমন!”
আরিশান মৃধা এবার যেন দ্বিতীয় দফায় ধাক্কা খেলেন। অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলেন,
_”বাবা হবে মানে কী?”
_”বাহ্ রে! তুমি একাই বাবা হতে পারো নাকি? আমিও বাবা হচ্ছি, তাও একাধিক বাচ্চার বাবা! ক্যান ইউ ইমাজিন? আমার ছানাপোনা আর তোমার ছানাটা মিলে কতগুলো নতুন সদস্যের আগমন ঘটবে!”
ছেলের কথা শুনে চোখ কপালে উঠল আরিশান মৃধার। জীবন তাকে কোথায় এনে দাঁড় করাল! একই সাথে বাবা আর দাদা হওয়ার সংবাদ শুনতে হচ্ছে তাঁকে! তবে তাঁর ছোট অদ্রিজাটা এখন মা হতে চলেছে শুনে একদিক থেকে যেমন মনে আনন্দের জোয়ার ভাসল, অন্যদিকে মেয়েটার গর্ভে একাধিক বাচ্চা শুনে চিন্তার ভাঁজ পড়ল কপালে। না জানি কী অবস্থা এখন মেয়েটার! অদ্রিজাকে ইদানীং একদম সময় দিতে পারছেন না তিনি। অথচ মেয়েটা সবসময় তাঁর পরিস্থিতি বোঝে, তাই কখনো কোনো কিছু বলেও না।
_”ওকে ডাক্তার দেখিয়েছ নিশ্চয়ই? কী বলেছে ডাক্তার?”
_”বলেছে তুমি একসাথে চার বাচ্চার দাদা হবে।”
আরিশান মৃধার মাথা ঘুরে ওঠার জোগাড় প্রায়! সারিমের মুখে একাধিক বাচ্চার কথা শুনে তিনি ভেবেছিলেন হয়তো যমজ হবে। কিন্তু এখন শুনছেন কোয়াড্রপল! চমকে উঠে অরির চিন্তায় কেঁপে উঠলেন তিনি। এতটুকু মেয়ে, চার-চারটে বাচ্চা কীভাবে গর্ভে ধারণ করবে ভেবেই পেলেন না। তাঁকে এভাবে চুপ থাকতে দেখে সারিম আড়চোখে তাকিয়ে বলল,
_”কী হলো, অবাক হলে বুঝি? ভাবছ নিশ্চয়ই আমার ডিএনএ-র কত পাওয়ার! ভাবতে থাকো, ভাবতে তো হবেই। আমি কি আর তোমার মতো দুর্বল চিত্তের পুরুষ নাকি? মৃধা আবরার সারিমের মধ্যে আলাদাই একটা ভাইব আছে, যা দুনিয়ার আর কারো নেই!”
ছেলের মুখে নিজের পুরুষত্ব নিয়ে এমন খোঁচা শুনে রাগে রি রি করে উঠল আরিশান মৃধার সর্বাঙ্গ। এমন একটা সিরিয়াস মুহূর্তেও ছেলেটার তাঁর পিছে না লাগলে যেন চলেই না!
_”তোমার আসল সমস্যাটা কোথায় একটু বলবে শুনি? না মানে, তোমার বাবা হই আমি। দুর্বল হলে নিশ্চয়ই তোমার মতো অসভ্যকে জন্ম দিতাম না! তুমি তো একাই পাঁচটা বাচ্চার সমান।”
বাবার কথায় সারিম মুখ ঘুরিয়ে তুচ্ছ তাচ্ছিল্যের ভঙ্গিতে বলল,
_”তবুও বিশ্বাস হচ্ছে না!”
আরিশান মৃধা রেগে উঠে বললেন,
_”তোমাকে বিশ্বাস করতে ও হবে না। আমারই ভুল যে তোমার মতো বেয়াদব ছেলের সঙ্গে কথা বলতে এসেছি!”
বলেই তিনি চেয়ার ছেড়ে উঠে যাওয়ার উপক্রম করতেই পেছন থেকে সারিম ডেকে উঠল,
_”যাও, ঠিক আছে, ভালো কথা! তবে একটা কথা কান খুলে শুনে নাও-এই বেয়াদব ছেলেটার জন্যই কিন্তু আজ তুমি আবার বাবা হতে পেরেছ! নয়তো বয়সের সাথে সাথে তোমার মেশিনের যা অবস্থা,তাতে জেবা কেন, তারা বেগমও তোমাকে ছেড়ে চলে যেত। ভাগ্যিস নিজের মান-সম্মান বাঁচাতে সেদিন হাসপাতালে তোমাকে ওই ড্রাগস ইনজেক্ট করেছিলাম! নয়তো আজ জেবা নিশ্চিত অন্য কারও বউ হতো।”
আরিশান মৃধা দরজার কাছেই থমকে দাঁড়িয়ে পড়লেন। পেছনে ফিরে ছেলের দিকে তাকানোর শক্তিটুকুও যেন হারিয়ে ফেলেছেন। তাও বহু কষ্টে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকালেন। বিশ্বাস করতেই কষ্ট হচ্ছে যে এটা তাঁর নিজের রক্ত, তাঁর সন্তান! কতটা অবলীলায় বলে দিল যে ড্রাগসের মাধ্যমে তাঁর আর জেবার মিলন ঘটিয়েছে সে! আর ভাবতে পারলেন না তিনি। এমন একটা অসভ্য, জাউরা ছেলেকে জন্ম দিয়ে জীবনে সবচেয়ে বড় ভুলটা করেছেন। নয়তো শেষ বয়সে এসে নিজের ছেলের মুখ থেকে এসব নির্লজ্জ কথা শুনতে হতো। তা যেন ওনার কল্পনারও অতীত ছিল!
সারিম বাবাকে এভাবে নিস্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে বলল,
_”কী হলো, দাঁড়িয়ে গেলে যে? যাও নিজের রুমে, আর যাওয়ার সময় আমার বউকে একটু পাঠিয়ে দিও। রাত অনেক হয়েছে, আমার আবার নানা রকম ক্রেভিংস জাগছে, বুঝলে? তোমার মতো অত অচল তো আর নই, আস্ত একটা কচি যৌবন নিয়ে জন্মেছি!”
আরিশান মৃধা এবার আর চুপ থাকতে পারলেন না। ছেলের দিকে ফিরে চরম বিরক্তি ও ক্ষোভ নিয়ে চড়া গলায় বললেন,
“সারিম, তোমার কি মনে হয় না যে দিন দিন তুমি লজ্জা-শরমের মাথা খেয়ে বসছ? নয়তো নিজের বাবার সামনে এসব কুরুচিকর কথা মুখ দিয়ে কীভাবে আনো?”
সারিম বাবার রেগে যাওয়াকে বিন্দুমাত্র পাত্তা না দিয়ে বাঁকা হেসে বলল,
“অত লজ্জা পেয়ে কী হবে শুনি? তার চেয়ে ভালো চল আমরা দুজন বন্ধু হয়ে যাই। একজন আরেকজনের সাথে সব এক্সপেরিয়েন্স শেয়ার করব!”
_”আমার মোটেই ঠ্যাকা পড়েনি তোমার মতো ছেলের সাথে বন্ধুত্ব করার! কথা শেয়ার করা তো বহ দূরের ব্যাপার!”
সারিম বাবার রাগ দেখে একগাল দুষ্টু বলল,
_”কেন, রাগ করেছ বুঝি? সেই জন্য বন্ধুত্ব করতে চাচ্ছ না? আচ্ছা সমস্যা নেই, চলো তোমাকে আমি কলিকাতা হারবাল গিফট করে সকল ঝগড়া মিটিয়ে নেই!তারপর বন্ধুত্বটা ঘটিয়েই ফেলি, কী বলো?”
আরিশান মৃধা ভারী গলায় শ্বাস নিয়ে নিজেকে কিছুটা সামলানোর চেষ্টা করলেন। রক্তবর্ণ চোখে ছেলের দিকে শেষবারের মতো তাকালেন। এই ছেলের কথাতে আর কান দেওয়া যাবেনা।
_”তোমার এই অসভ্য মুখ আর এক মুহূর্তও আমি সহ্য করব না। অদ্রিজাকে পাঠাচ্ছি, ওর ঠিকঠাক খেয়াল রাখবে!”
কথাটা বলেই আরিশান মৃধা আর এক সেকেন্ডও দাঁড়ালেন না। ধুপধাপ পা ফেলে রুম থেকে বেরিয়ে সশব্দে দরজাটা ভিড়িয়ে দিলেন। পেছনে ফেলে গেলেন সারিমকে, যে কিনা ঠোটের কোনে মুচকি হাসি নিয়ে ওনার গমন পথে চেয়ে আছে।
আরিশান মৃধা নিজের রুমে ফিরে এলেন। এসে দেখলেন অরি ও জেবা একে অপরকে জড়িয়ে ধরে ঘুমিয়ে আছে। ওদের শান্ত ঘুমাতে দেখে আর ডাকলেন না তিনি। ফিরে যেতে নিয়েও হুট করে ওনার নজর আটকে গেল জেবার দিকে। নড়াচড়া করে ঘুমানোর ফলে মেয়েটার জামা কিছুটা সরে পেটের অংশ উন্মুক্ত হয়ে আছে।
মুহূর্তের মধ্যে চোখ সরিয়ে নিলেন আরিশান মৃধা। নজর অন্যদিকে রেখেও এক হাত বাড়িয়ে সাবধানে জেবার জামাটা ঠিক করে দিলেন তিনি। করতে গিয়ে সামান্য আঙুলের স্পর্শ লেগে গেল জেবার গায়ে-তাতেই যেন ওনার সর্বাঙ্গ কেঁপে উঠল। এক মুহূর্তও আর দাঁড়ালেন না, দ্রুত রুম ছেড়ে বেরিয়ে এসেন। বুকের ভেতর হৃদপিণ্ডটা অনবরত দড়ফড় করছে, গলা শুকিয়ে কাঠ। এই মুহূর্তে তীব্র পানির তৃষ্ণা অনুভব করায় তিনি তড়িঘড়ি নিচে নেমে এলেন গলা ভেজাতে।
ঠিক তখনই নজর গেল সদর দরজার দিকে। দেখেন আনতারা মৃধা ভেতরে প্রবেশ করছেন। ওনাকে দেখে খানিকটা অবাক হলেন আরিশান মৃধা।আনতারা মৃধা চলে গিয়ে আবার ফিরে এল কেন?
আনতারা মৃধা সামনে আরিশান মৃধিকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে থমকে দাঁড়ালেন। আরিশান মৃধা প্রশ্নবিদ্ধ দৃষ্টিতে জিজ্ঞেস করলেন,
_”তুমি তো চলে গিয়েছিলে। আবার ফিরে আসলে যে?”
আনতারা মৃধা নিজেকে সামলে নিয়ে বললেন,
_”আমার ছেলের বাড়ি, আমি যখন খুশি আসতে পারি।”
আরিশান মৃধা সংক্ষেপে “ওহ” বলে সন্দিহান কণ্ঠে যোগ করলেন,
_”তাহলে এত নাটক করে চলে যাওয়ার অভিনয়টা কেন করেছিলে? আবার নতুন কোনো মতলব নেই তো তোমার?”
আনতারা মৃধা কিছুটা ঘাবড়ে গেলেন। তোতলাতে তোতলাতে বললেন,
_”ম-মতলব মানে কি বোঝাতে চাইছ তুমি? ভুলে যেও না এটা আমার ছেলের বাড়ি, তাই আমি যখন খুশি আসতে পারি। তাছাড়া তোমার সন্তানের মা হিসেবেও আমার একটা অধিকার আছে। আর আমি এখানে স্থায়ীভাবে থাকতে আসিনি, চলেই যাব।”
_”তা কতদিনের জন্য আসা হলো শুনি?” আরিশান মৃধার প্রশ্ন।
আনতারা মৃধা জবাব দিলেন, _”হাসপাতালে জবের জন্য অ্যাপ্লাই করেছি। জবটা হয়ে গেলেই তোমার বাড়ি ছাড়ছি আমি। তখন এই আনতারা মৃধা তোমার ছায়াও মাড়াবে না কখনো।”
আরিশান মৃধা শান্ত ভঙ্গিতে বললেন,
_”বেশ ভালো তো। তবে যাওয়ার আগে আমার সার নেমটা ফিরিয়ে দিয়ে যেও। তোমার সাথে ‘মৃধা’ নামটা ঠিক যায় না, এটা সম্মানীয় মানুষদের পাশেই মানায়।”
_”আমার দরকারও নেই তোমার এই সার নেমের, তোমারটা তুমি রেখে দাও!”
বলেই আনতারা মৃধা হনহন করে গেস্টরুমের দিকে ওপরে উঠে গেলেন। ওনার যাওয়ার পথের দিকে তাকিয়ে বাঁকা হাসলেন আরিশান মৃধা।এরপর রান্নাঘরে গিয়ে ফ্রিজ থেকে ঠান্ডা পানি বের করে খেয়ে তৃষ্ণা মেটালেন। সেখান থেকে বের হয়ে ওপরে যাওয়ার সময় নজর পড়ল ছেলের দিকে। দেখলেন সারিম অরিকে কোল তুলে নিয়ে নিজের রুমের দিকে ঢুকে যাচ্ছে। দৃশ্যটা দেখে আরিশান মৃধা মুচকি হাসলেন। তিনি খুব ভালো করেই বোঝেন, ছেলেটা একদম বউ-পাগলা; বউকে ছাড়া এক রাতও ও কাটাতে পারে না।
নিজের রুমে ফিরে এসে দেখলেন জেবা একইভাবে ঘুমিয়ে আছে, আর জামাকাপড়ের অবস্থা আগের চেয়েও বেহাল। আরিশান মৃধা এবার আর কোনো কিছু ঠিক করতে গেলেন না। চুপচাপ ঘরের লাইট অফ করে জেবার পাশে শুয়ে পড়লেন। ব্ল্যাংকেট টেনে নিয়ে দুজনে গায়ে জড়িয়ে নিতেই ঘুমের ঘোরে জেবা হঠাৎ ওনার এক হাতের ওপর মাথা রেখে হাতটা শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। আরিশান মৃধা তাকে সেভাবেই থাকতে দিলেন, তারপর মৃদু হেসে পাশ ফিরে জেবার মুখপানে তাকিয়ে ঘুমিয়ে পড়লেন।
ঘুমের ঘোরেই অরি তীব্র এক গা-গোলানো অস্বস্তি অনুভব করল। আচমকা দেহে কোনো ভারী কিছুর স্পর্শ পেতেই সে পিটপিট করে চোখ মেলে তাকাল। খানিকটা মাথা ঘুরিয়ে দেখতে পেল-সারিম তাকে নিবিড়ভাবে জড়িয়ে ধরে আচ্ছন্ন হয়ে ঘুমিয়ে আছে। অরি সারিমের গায়ে মৃদু ধাক্কা দিয়ে অবরুদ্ধ গলায় বলে উঠল
_”সারিম, উঠুন… আমার ভিষণ বমি পাচ্ছে।”
নিদ্রার গাঢ় আবেশে সারিম কেবল একটু নড়েচড়ে বসল, অতঃপর অরিকে আরও আঁকড়ে ধরে পুনরায় ঘুমে তলিয়ে গেল। অরির বমি ভাব ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছিল। সহ্যসীমা অতিক্রম করায় এবার সে সারিমকে কিছুটা জোরে ধাক্কা দিয়ে বলল,
_”সারিম, উঠুন না প্লিজ!”
বলেই চরম অস্বস্তিতে ডুকরে কেঁদে উঠল সে।
সহসা অরির এই কান্নার ধ্বনি কানে পৌঁছাতেই চমকে উঠে বসে সারিম। অরির আকুল কান্নায় তার সমস্ত তন্দ্রা নিমেষেই উবে গেল। অতিশয় উদ্বিগ্ন হয়ে সে অরির অশ্রুসিক্ত মুখখানি দুহাতের অঞ্জলিতে তুলে নিয়ে শুধাল,
_”কী হয়েছে তোমার,জান? তাকাও,আমার দিকে,চন্দ্রিমা!”
অরি সারিমের পানে চাইল। বমি এসে কণ্ঠনালীতে আটকে আছে; অসহ্য যন্ত্রণায় মেয়েটা ছটফট করছে। সে কেবল কোনোমতে উচ্চারণ করতে পারল-
_”ব… বমি…”
কথাটি শেষ হওয়ার পূর্বেই সারিমকে স্তম্ভিত করে দিয়ে সে সারিমের গায়ের ওপর বমি করে দিল। অরির এমন শোচনীয় অবস্থা দেখে প্রচণ্ড শঙ্কিত হয়ে পড়ল সারিম। সে দুহাতে অরিকে নিজের বুকের আরও কাছে টেনে নিল, যাতে সে নির্বিঘ্নে সবটা উগরে দিতে পারে। একপর্যায়ে বমি করতে করতে ক্লান্ত অরি সারিমের বাহুতেই নেতিয়ে পড়ল।
সারিম তাকে ওই অবস্থাতেই সাবধানে ধরে একহাতে বালিশে হেলান দিয়ে বসিয়ে দিল। তার পোশাক অরির বমিতে সিক্ত হয়ে গিয়েছে।তাই ওয়াশরুমে গিয়ে মাত্র দু-এক মিনিটের মধ্যে নিজেকে পরিষ্কার করে পোশাক বদলে দ্রুত কক্ষে ফিরে এল সে। এসে দেখল, চরম দুর্বলতায় অরি প্রায় ঢলে পড়ছে।
সারিম দ্রুত পদে এগিয়ে গিয়ে অরিকে কোলে তুলে নিল এবং শীতল বাতাসের স্পর্শ পেতে তাকে নিয়ে ব্যালকনিতে সুসজ্জিত সোফায় গিয়ে বসল। অরি নিশ্চুপ হয়ে সারিমের তপ্ত বক্ষে মাথা গুঁজে রইল। সারিম তার অবিন্যস্ত চুলে সস্নেহে আঙুল চালিয়ে সান্ত্বনা দিতে লাগল।
হঠাৎ অরি তলপেট চেপে ধরে এক তীব্র ও বুকফাটা আর্তনাদ করে উঠল। অরির সেই আকস্মিক চিৎকারে সারিমের বুকটা কেঁপে উঠল।
_”কী হয়েছে, বউ? তুমি এভাবে কাঁদছ কেন? বলো আমাকে, কোথায় যন্ত্রণা হচ্ছে?”
অরি তলপেট সজোরে চেপে ধরে অনবরত অশ্রুবিসর্জন করে যেতে লাগল। যন্ত্রণার প্রচণ্ডতায় তার মুখ দিয়ে কোনো স্পষ্ট বাক্য নিঃসৃত হচ্ছে না; কেবল অস্ফুট স্বরে কেঁদে কেঁদে বলল,
_”সারিম… বাঁচান আমাকে! ভীষণ ব্যথা…”
সারিম যেন দিশেহারা হয়ে পড়ল; তার মস্তিষ্ক সাময়িকভাবে কার্যক্ষমতা হারিয়ে ফেলল। সে অরির হাত দুটি তলপেট থেকে সরিয়ে, আলতো করে পরনের বস্ত্র সামান্য তুলে সেখানে একে একে বহু প্রলেপসম চুম্বন একে দিল। বিড়বিড় করে বলতে লাগল,
_”সব ঠিক হয়ে যাবে, সোনা… সব ঠিক হয়ে যাবে।”
কিন্তু যন্ত্রণার তীব্রতা উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাচ্ছিল। অরির এই করুণ পরিণতি সইতে না পেরে সারিম তাকে দ্রুত ঘরে এনে বেডে শুইয়ে দিল। পাশে বসে তার মাথাটা পরম মমতায় নিজের বুকের মাঝে চেপে ধরে বলল-
_”কিচ্ছু হবে না তোমার,চন্দ্রিমা। কিচ্ছু হতে দেব না।”
একহাতে অরিকে ধরে রেখে অন্যহাতে বালিশের পাশ থেকে ফোনটা তুলে নিয়ে দ্রুত একটি নম্বরে ডায়াল করল। অপরপ্রান্ত থেকে সংযোগ স্থাপিত হওয়া মাত্রই সারিম রুদ্ধশ্বাসে বলে উঠল,
_”আলভি, এখনই একজন লেডি গাইনোলজিস্ট পাঠাও বাড়িতে।দশ মিনিটের মধ্যে যেন সে এখানে পৌঁছায়!”
আলভি কিছু বলতে যাওয়ার আগেই সারিম কলটি বিচ্ছিন্ন করে দিল। অরি পেটের অসহ্য যন্ত্রণায় ক্রমাগত কাতরাচ্ছিল। সারিম তাকে শান্ত করার আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে গেল; তার সমগ্র মুখমণ্ডলে বারবার চুমু একে দিল, কিন্তু মেয়েটির কান্না থামল না। সে তীব্র যন্ত্রণায় সারিমের টি-শার্ট খামচে ধরে কোঁকাতে লাগল।
সারিম আর সহ্য করতে না পেরে অরির ওপর খানিকটা ঝুঁকে তাকে দুহাতে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। আচমকা অরি নিজের ঘাড়ে তপ্ত অশ্রুর স্পর্শ পেল; পরক্ষণেই তার কানে এল সারিমের রুদ্ধকণ্ঠের রোদনধ্বনি। প্রিয়তমাকে কোনোভাবেই শান্ত করতে না পেরে অবশেষে নিজের সমস্ত মানসিক শক্তি হারিয়ে কেঁদে ফেলেছে ছেলেটি।
অরি সেই যন্ত্রণার সাগরে নিমজ্জিত থেকেও শুনতে পেল, সারিম কান্নার তোড়ে বিড়বিড় করে বলছে-
“আই হ্যাভ নো নীড অফ এনি চাইল্ড… এরা আমার চন্দ্রিমাকে কষ্ট দিচ্ছে! এদের এই দুনিয়াতে আসার কোনো অধিকার নেই…”
ইশকে দে ফানিয়ার পর্ব ৪৮
অরি অস্পষ্টভাবে সারিমের প্রতিটি শব্দ শুনছিল, কিন্তু পেটের তীব্র ব্যথায় তার বাকশক্তি রুদ্ধ হয়ে এসেছিল; কেবল এক যন্ত্রণাদায়ক গুঞ্জনধ্বনি নির্গত হচ্ছিল তার কণ্ঠ থেকে। সারিম তখনো অরিকে বুকের মাঝে জড়িয়ে ধরে ব্যাকুল হয়ে কেঁদে যাচ্ছিল, আর ঘরের স্তব্ধতা ভেদ করে ছড়িয়ে পড়ছিল অরির করুণ ও কাতর আর্তনাদ।
