Home এক দেখায় এক দেখায় পর্ব ২৬

এক দেখায় পর্ব ২৬

এক দেখায় পর্ব ২৬
সুরভী আক্তার

ফুচকা হতে হলে অবশ্যই ঝাল হতে হবে । ফুচকা মানেই ঝাল । আর ঝাল ফুচকা মানেই মুখরোচক ইমোশন । ঝাল ব্যতীত ফুচকা খেয়ে কোন ফিল নেই ।
ফুচকা খেতে খেতে রাফি আর শান্ত কে এতগুলো নীতি বাণী শুনিয়ে দিয়েছে রুহি । রাফি প্রথমে দুটো নরমাল ফুচকা এনেছিল দুজনের জন্য । সেটা ফেরত পাঠিয়ে আবারো ঝাল ঝাল করে নতুন করে ফুচকা বানিয়ে নিয়ে এসেছে । রাফি এতো ঝাল খেতে বারণ করেছে হাজার বার । কে শোনে কার কথা ?
রুহি মিহি একে অপরের সাথে পাল্লা দিয়ে গিলে গেছে সময়গুলো ফুসকা । একটু দয়া দেখিয়ে রাফি আর শান্ত কে একটা করে দিয়েছে খেতে । অনিচ্ছা সত্ত্বেও একটা খেয়েই বেচারা দের অবস্থা নাজেহাল । ঝালে চোখ মুখ লাল হয়ে গেছে ওদের । পানি খেতে খেতে পেট ফুলে গেছে । তবুও ঝাল কমছে না ।
এদিকে রুহি মিহির কোন হেলদোল নেই । এতগুলো ঝাল ফুচকা খাওয়ার পরও তেমন রিয়াকশন নেই ওদের । অথচ চোখ,নাক,ঠোঁট, মুখ সব লাল হয়ে গেছে ঝালের তোপে ।

আজ আর মিহিকে একা ছাড়েনি রাফি । মেয়েটা ঠিকমতো হাঁটতে পারছে না । তার উপর আজ নতুন রাস্তা দিয়ে বাড়ি ফিরতে হবে, একা ছাড়তে মন সায় দেয় নি রাফির ।
শান্তর সাথে রুহিকে পাঠিয়ে দিয়েছে বাড়িতে । নিজে দায়িত্ব নিয়েছে মিহির । গাড়িতে বসে আছে দুজনে । এখনো ঝাল কমেনি রাফির । এমনিতেই রাফি ঝাল খেতে পারে না । ঝালের চোটে ফর্সা মুখশ্রী লাল বর্ন ধারন করেছে ওর । গাড়িতে এসি চলছে তবুও বিন্দু বিন্দু ঘাম জমেছে কপালে, চিবুক বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে এক ফোঁটা । বারবার ঢোক গিলে টানটান হয়ে গাড়ি চালাচ্ছে সে ।
এতক্ষণ রুহির সামনে ঝাঁলের কথা প্রকাশ করে নি মিহি । এবার আর সহ্য হচ্ছে না । আজকের ফুচকায় ঝালের মাত্রা একটু বেশি ছিল ।
ঝালে চোখ নাক দিয়ে পানি বের হওয়ার মতো অবস্থা । বারবার নাক টানছে সে ।
হঠাৎ কিছু মনে পড়তেই ব্যাগে হাত চালায় মিহি । ব্যাগ ঘেঁটে একটা ক্যাটবেরি বের করে । চকলেট বরাবরই পছন্দ মিহির । ব্যাগে সবসময় থাকে । মিহি তড়িঘড়ি করে প্যাকেট ছিঁড়ে এক কামড় বসায় চকলেটে । খেতে খেতে চোখ বন্ধ করে মাথা এলিয়ে দেয় দেয় সিটে । চকলেটের মিষ্টতায় একটু হলেও ঝাল নিবারণ হয়েছে । মিহি চোখ খুলে এবার তাকায় রাফির দিকে । চোখ মুখ লাল হয়ে আছে রাফির । মিহির বেশ মায়া লাগলো ওকে দেখে । রাফি তো খেতে চায় নি, জোর করে খাইয়েছে রুহি । মিহি নরম স্বরে বলল….

” বেশি ঝাল ছিল তাই না ? খুব বেশি ঝাল লেগেছে ?
” হুম….
ছোট্ট জবাব দিলো রাফি । মিহির অনুশোচনা বোধ হলো একটু । নিজের হাতের চকলেট টার দিকে তাকিয়ে মিনমিন স্বরে বলল….
” চকলেট খাবেন..?
ঝাল কমে যাবে….
রাফি এবার সরাসরি তাকালো । প্রথমেই তাকালো হাতে থাকা চকলেটের দিকে । সবে একটা কামড় বসিয়েছে মিহি । পরক্ষনেই রাফি চোখ সরিয়ে নিয়ে স্বাভাবিক কন্ঠে বলল….
” চকলেট খাই না আমি…
” একটু খান…
চোখ লাল হয়ে গেছে আপনার । একটু খেলে দেখবেন ঝাল কমে যাবে । আমার হাতের টা খেতে হবে না, আমার ব্যাগে আরো আছে…বের করে দেই ?
রাফি খানিক সময় চুপ থাকলো । জিভ দিয়ে ঠোঁট ভিজিয়ে আলতো হাসার চেষ্টা করে বললো…
” ড্রাইভ করছি তো , কিভাবে খাবো..?

মিহি ফের ব্যাগে হাত চালাতে চালাতে সহজ সরল ভাবে নির্দ্বিধায় বললো…
” আমি খাইয়ে দিচ্ছি….
রাফি সহসা তাকালো ওর দিকে । হাসলো একটু । মোলায়েম কন্ঠে বলল…
” আর বের করতে হবে না । আপনার হাতের টাই দিন ।
” কিন্তু এটা তো আমি…
” সমস্যা নেই…। একটু দিন , তাতেই হবে….
মিহি চকলেটের নিচের এক টুকরো অংশ ভেঙে ধরলো রাফির সম্মুখে । রাফি ঢোক গিলে সামনের দিকে তাকিয়েই মুখ এগিয়ে মুখে নিলো টুকরোটা । রাফির আলতো ঠোঁটের স্পর্শ হাতে লাগতেই শিহরিত হয়ে উঠল মিহি । বিদ্যুৎ খেলে গেল পুরো শরীর জুড়ে । আকস্মিক হাত সরিয়ে নিলো ও । ঢোক গিলে জিভ দিয়ে অধর ভেজালো । কেমন যেনো কম্পন সৃষ্টি হলো মিহির পুরো শরীরে । চোখ বন্ধ করে নিলো সে । চোখে খুলে আড়চোখে চাইলো রাফির দিকে । রাফির ধ্যান নেই এদিকে । ও এক ধ্যানে ড্রাইভ করে যাচ্ছে । গাড়ির গতি বাড়িয়েছে সে । মিহি কিছু মুহূর্ত পর মৃদু স্বরে শুধালো…

” ঝাল কমলো…?
রাফি ব্যাস্ত কন্ঠে সহসা উত্তর করলো…
” হুম…
আর কথা হলো না দুজনের মাঝে ।
মিহি দের বাড়ির সামনে মিহিকে নামিয়ে দিলো । মিহি নামতেই তড়িৎ বেগে গাড়ি স্টার্ট দিলো রাফি । নিজেও আর কিছু বললো না, আর না মিহি কে কিছু বলার সুযোগ দিলো ।
মিহি কপাল কুঁচকে তাকালো রাফির গাড়ির পানে, যেটা এখন এগিয়ে গেছে অনেকটা দুরে । খানিক বাদ চোখের আড়াল হয়ে গেল । আশ্চর্য হলো মিহি । বরাবরই মিহি বাড়ির ভেতরে ঢোকার পর রাফি চলে আসে সেখান থেকে । মিহি চোখের আড়াল না হওয়া অবধি গাড়িতেই বসে এক ধ্যানে তাকিয়ে থাকে ও । তবে আজ তার ব্যতিক্রম । মিহিকে গাড়ি থেকে নামিয়েই ছুটে পালালো সে । প্রথমবার হলো এমনটা ।
এতে একটু খারাপ লাগা সৃষ্টি হলো মিহির মনে । মনে হলো রাফি ওকে এড়িয়ে চলে গেলো ।
মিহি গাড়ির দিক থেকে চোখ ফিরিয়ে বাড়ির দিকে পা বাড়ালো ।

এদিকে কিছু দুর এসে গাড়ি থামালো রাফি । পুরো শরীর দড়দড় করে ঘামছে ওর । কপালের শিরা উপশিরা অত্যাধিক ফুলে উঠেছে । টকটকে লাল হয়ে গেছে পুরো শরীর । চোখ রক্তিম বর্ন ধারন করেছে । গাড়ি থামিয়েই সিটবেল্ট খুলে ফেললো রাফি । ব্লেজার খুলে ফেললো শরীর থেকে ‌। ছুড়ে মারলো সেটা । গলার টাই একটানে ছাড়িয়ে নিলো গলা থেকে । ব্যাস্ত হাতে শার্টের উপরের দুটো বোতাম খুলে দিল ‌। চিবুক বেয়ে ঘাম গড়িয়ে পড়লো অনায়াসে । চোখ মুখ স্থির হয়ে গেছে রাফির । খিচে আছে পুরো শরীর । কন্ঠনালিতে শ্বাস আটকে গেছে ‌। পুরো শরীর ক্রমান্বয়ে কাঁপছে ।
রাফি কোন রকমে ফোন হাতে নেয় । কল লাগালো কারোর নাম্বারে । কাঁপা কাঁপা হাতে কানে তুললো ফোনটা । রিসিভ হয় না প্রথম বার । চোখ খিচে জোরে একটা শ্বাস টানে রাফি । আবারো কল লাগায় একই নাম্বারে । এবার রিসিভ হতেই রাফি জড়িয়ে আসা কন্ঠে ক্ষীন স্বরে আওয়াজ তুললো..
” লো… লোকেশন পাঠিয়ে দিয়েছি । তাড়াতাড়ি আয়.. । আমার আবারো অ্যানাফাই……
বলতে বলতে থেমে গেল রাফি । কানের ফোনটা গড়িয়ে পড়লো হাত থেকে । চোখ বুজে এলো রাফির । সামনে এলিয়ে পড়লো ও । কপাল ঠেকলো গাড়ির স্টিয়ারিংয়ে । হাত দুটো নেতিয়ে পড়ল । পুরো শরীর ভার হীন হয়ে অবচেতন হয়ে পড়লো নিমিষেই..!

বাড়িতে এসেই একটু ঘুমিয়েছে মিহি । রাফির আচরণে মন খারাপ হয়েছে একটু । কারোর সাথে কথা বলে নি এসেছে থেকে । এসেই ভারাক্রান্ত মন নিয়ে গাঁ এলিয়ে দিয়েছে বিছানায় । অমনি কখন ঘুমিয়ে পড়েছে নিজেও টের পায় নি ।
ঠিক রাত এগারোটার পর পর ঘুম ভেঙেছে ওর । আজমাল হোসেন মেয়ের দুর্বলতা বুঝে মেয়েকে ডাকেন নি আর । ঘুম থেকে উঠেই চোখ কচলাতে কচলাতে পা দুটো টেনে টুনে নিচে নামছে মিহি । ক্ষিদের চোটে ইঁদুর দৌড়াচ্ছে পেটে । একটুও ক্ষিদে সহ্য করতে পারে না মিহি । মিহি চোখ দুটো সম্পূর্ণ খোলার চেষ্টা করে,,নিচে কেউ নেই । আব্বু আম্মু ঘরে আছে হয়তো । মিহির অভিমানের পাল্লা ভারী হলো এবার । আব্বু আম্মু একবারও ডাকলো না ওকে । ও কতক্ষন ঘুমিয়েছিল, তবুও ডাকলো না । নিজেরা খেয়ে দেয়ে শুয়ে পড়লো ?
অভিমানী মিহি বেসিন থেকে চোখ মুখে পানি ছিটিয়ে নিলো । খাবার বেড়ে নিলো একটা প্লেটে । চেয়ারে পায়ের উপর পা তুলে খেতে বসলো । এক লোকমা খাবার তুলে মুখে দিলো । কিন্তু খেতে ইচ্ছে করছে না মিহির । গলায় আটকাচ্ছে খাবার । এদিকে ক্ষিদের জ্বালায় চো চো করছে পেট । মিহি বিরক্ত হলো এবার । খেলো না একটুও । হাত ধুয়ে পা বাড়ালো সিঁড়ির দিকে । সাবিনা বেগম নামছিলেন সিঁড়ি বেয়ে,, মেয়েকে দেখে উৎসুক কন্ঠে জিজ্ঞেস করলেন….

” উঠে পড়েছিস মা ? ঘুম হলো ঠিকমতো ? কখন উঠলি ? ডাকবি না আমায়..?
মিহি খানিক খিটখিটে স্বরে উত্তর করলো….
” এক্ষুনি উঠেছি । এখন আবার ঘুমাবো । ঘুম হয়নি আমার ।
” খেয়েছিস কিছু ? ক্ষিদে পায় নি ..?
” আমাকে নিয়ে ভাবতে হবে না তোমাদের ? তোমরা তো খেয়ে নিয়েছো একা একা, একবারও ডাকো নি আমাকে ! আমি খেলাম কি না খেলাম তাতে কি আসে যায় তোমাদের ?
মিহির অভিমানী কথায় সাবিনা বেগম সরু চোখে তাকালেন । মিহি এখনো নিভু নিভু চোখে দাঁড়িয়ে আছে । ঘুমে টলছে ও । দেখেই বোঝা যাচ্ছে অর্ধঘুম ছুটে গেছে । তাই হয়তো মেজাজ বিগড়ে আছে মেয়ের । মেয়ের অভিমান দেখে মুচকি হাসলেন সাবিনা বেগম ।
” তোমার খাওয়া না খাওয়া তে আমাদের যায় আসবে না তো কার যায় আসবে শুনি ? তুমি জানো, আমরা এখনো খাই নি । তোমার অপেক্ষাতেই ছিলাম , ঘুমিয়ে ছিলে তুমি, তাই ডাকি নি । ভেবেছিলাম ঘুম থেকে উঠলে একসাথে খাবো ।
মিহি নাক টেনে দ্বিগুন অভিমানী স্বরে বলল….
” হয়েছে ! খেয়ে নাও তোমরা । আমার ক্ষিদে নেই । ঘুমাবো আমি,, গেলাম…..
বলেই ঘুমে টলতে টলতে উপরে উঠে গেল মিহি । সাবিনা বেগম বাঁধা দিলেন না আর । বাঁধা দিলেও কাজ হবে না । এখন ঘুমে আচ্ছন্ন হয়ে আছে মিহি ।
ঘরে গিয়ে আবারো শুয়ে পড়লো ও । আজ ঘুম পাচ্ছে ভীষণ । চোখ লেগে আসছে আপনা আপনি । শুতেই আবারো ঘুমে তলিয়ে যায় মিহি ।

সকাল সকাল ঘুম ভেঙ্গেছে মিহির । কাল অনেকটা সময় ঘুমিয়েছে । এতোটা ঘুমায় না মিহি । কাল বেশি হয়ে গেছে একটু । সকাল সবে ৭ টা । পাখির কিচিরমিচির শব্দে আড়মোড়া ভেঙে গাঁ মুড়িয়ে উঠে বসে মিহি । অনেকটা ঘুমানোর ফলে ফ্রেশ লাগছে নিজেকে । তবে মাথাটা ঝিমঝিম করছে একটু ।
ওয়াশ রুম থেকে ফ্রেশ হয়ে নেয় তাড়াতাড়ি ।
কাল থেকে নিজের ফোনটা ব্যাগেই আছে । বের করেনি এখনো । এদিকে তড়তড় করে ক্ষিদে বাড়ছে । মিহি তড়িঘড়ি করে নিচে নেমে হালকা ব্রেকফাস্ট করে নেয় । কালকে রাতের ঘটনা বেমালুম ভুলে গেছে । কি ঘটেছিল কিছুই মনে নেই । সাবিনা বেগম মেয়ের শিশু সুলভ ভুলো মন দেখে মুচকি হাসেন ।
ব্রেকফাস্ট সেরে উপরে উঠে ব্যাগ থেকে ফোন বের করে মিহি । ফোন অন করতেই চক্ষু দ্বয় কপালে উঠে যায় ওর ।
অর্ধ শতাধিক মিসড কল উঠে আছে । সব রুহির নাম্বার থেকে । মিহি শুকনো ঢোক গেলে তা দেখে । আজ কপালে দুঃখ আছে ওর ।
মিহি নিজেই এবার কল লাগায় রুহির নাম্বারে । ফোন রিসিভ হতেই ওপাশ থেকে শীতল কন্ঠ ভেসে আসে….

” হ্যালো…
মিহি আমতা আমতা করতে করতে বলল….
” হ্যা….হ্যালো পাখি..!
কি করছিস ? আসলে আমি সরি,, কাল ওখান থেকে ফিরেই ঘুমিয়ে পড়েছিলাম , সারারাত ঘুমিয়েছি বিশ্বাস কর ! ফোন ব্যাগেই ছিল । আমি না একদম লক্ষ্য করি নি জান,, সরি….
” ওওও….
রুহির ছোট্ট উদাসীন বাক্যে মিহি গদগদ হয়ে আবারো বললো….
” কি করছিস পাখি…?
” কিছু না..!
” কোথায় আছিস তুই ? আজ টিউশনে আসবি না..?
” না…
বরাবরের মতো ছোট্ট উত্তর রুহির । প্রশ্নের উত্তরে পাল্টা কোন প্রশ্ন করছে না । এবার কপাল কুঁচকে আসে মিহির । মিহি ধীর কন্ঠে বলে….

” কি হয়েছে পাখি ..?
এভাবে কথা বলেছিস কেনো ? তোর কি মন খারাপ ?
রুহির ফোঁপানোর শব্দ কানে ভেসে আসলো এবার । আচমকা বুকটা ছ্যাঁত করে উঠলো মিহির । মিহি ব্যতিব্যস্ত হয়ে শুধালো….
” কি হয়েছে পাখি..?
কাঁদছিস কেনো তুই ? কি হয়েছে তোর ? বল‌ না…
রুহি ক্রন্দনরত অস্পষ্ট স্বরে আওড়ালো…..
” পাখি… আমার ভাইয়া…..
পুনরায় বুকটা ধক্ করে উঠলো মিহির । মস্তিষ্ক জেঁকে উঠলো । মিহি কাঁপা কন্ঠে বলল….
” ভা.. ভাইয়া ? কি , কি হয়েছে তোর ভাইয়ার ?
” ভাইয়া হসপিটালে…
রুহির কথা কর্ণকুহরে পৌঁছা মাত্রই কেঁপে উঠলো মিহি । সহসা নিস্তেজ হয়ে গেল পুরো শরীর । দু’পা পিছিয়ে ধপ করে বসে পড়লো খাটে । গলা দিয়ে আর একটা আওয়াজ বের করার মতো শক্তি নেই । আর না প্রচেষ্টা চালালো মিহি । রুহি আরো কিছু একটা বললো ফোনের ওপাশ থেকে । শোনা মাত্রই কান থেকে ফোন নামালো মিহি । স্তব্ধ হয়ে থমকে বসে রইল কিছুক্ষণ । চোখের কোনে পানি জমে টইটুম্বুর হয়ে আছে । পলক পড়া মাত্রই গড়িয়ে পড়লো সেই পানি ।
আচমকা উঠে দাঁড়ালো মিহি । টেবিলের উপর থেকে নিজের পার্সটা তুলে নিলো হাতে । ছুট লাগালো বাইরের দিকে । হুড়মুড়িয়ে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামলো । খানিক সামলে নিলো নিজেকে । আম্মু রান্না ঘরে । মিহি বাইরে থেকে কাঁপা গলায় চেঁচিয়ে বললো…..

” আ.. আম্মু,, আমার ক্লাস আছে এখন । স্যার ফোন করেছিল, এক্ষুনি যেতে হবে । আমি গেলাম…..
বলেই আবারো এলোমেলো পায়ে ছুট লাগালো বাইরের দিকে । সাবিনা বেগম রান্না ঘর থেকে বের হতে হতেই বাড়ির সীমানা পেরিয়েছে মিহি ।
হসপিটালের করিডোর দিয়ে এলো মেলো পায়ে এলোপাথাড়ি ছুটে যাচ্ছে মিহি ‌ । আশেপাশে কোনো দিকে খেয়াল নেই ওর । বুকটা ধড়ফড় করছে । চোখ ভিজে ঘোলাটে হয়ে আসছে বারবার । হাতের উল্টো পিঠে মুছে নিচ্ছে পানি । চুলগুলো এলোমেলো হয়ে আছে । মাথার ওরনাটা পড়ে গেছে । হসপিটালে সিঁড়ি বেয়ে চার তলায় উঠতে গিয়ে হাঁপিয়ে গেছে । তবুও ক্ষান্ত হয়নি ও , হাঁপাতে হাঁপাতে ঘন শ্বাস ফেলে ছুটেই যাচ্ছে ।‌ পায়ের ব্যথা ভুলে গেছে বেমালুম ‌ । ৪০৪ নং কেবিনের সামনে এসে পা থেমে যায় ওর । দাঁড়িয়ে যায় ও । কেবিনের দরজা চাপানো । মিহি কাঁপা কাঁপা হাতে দরজায় মৃদু ধাক্কা দেয় । খুলে যায় দরজাটা । এক পা কেবিনের ভিতরে রাখে ।
রুহি আর শান্ত বসে আছে । দরজা খোলার শব্দে ঘাড় ঘুরিয়ে পিছন ফিরে তাকায় দুজনে । দরজায় মিহিকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে আঁতকে ওঠে রুহি । এইতো একটু আগে কথা হলো, এতো তাড়াতাড়ি মিহি এখানে পৌঁছালো কিভাবে ?
সম্পুর্ন কথা শেষ হওয়ার আগেই ফোন কেটেছিল মিহি ।
রুহি তড়িঘড়ি করে এগিয়ে যায় মিহির কাছে । বাহু ধরে হালকা ঝাঁকায়….

” পাখি…
তুই এখানে ? এতো তাড়াতাড়ি আসলি কি করে ?
মিহির ভেজা দৃষ্টি স্থির সামনের বেডের দিকে । বেডের উপর সোজা হয়ে টান টান হয়ে শুয়ে আছে রাফি । চোখ দুটো বুজে রাখা । কোমর অবধি চাদর টেনে রাখা । বাম হাতের পিঠে ক্যানুলা লাগানো আছে এখনো ।
মিহির সাঁড়া না পেয়ে রুহি আবারো ডাকে …
” পাখি…
নড়ে ওঠে মিহি । ধ্যান ভাঙ্গে ওর । দূর্বল চোখ ফেরায় রুহির দিকে । চোখের কোনে পানি চিকচিক করছে । মিহি কাঁপা গলায় বলে….
” কি..কি হয়েছে ওনার..?
হসপিটালে কেনো ?
রুহি একবার রাফির দিকে তাকালো । রাফির পাশেই চিন্তিত মুখে বসে আছে শান্ত । রুহির মুখটাও শুকনো দেখাচ্ছে ।
মিহি আবারো বলল…
” বল‌ না , কি হয়েছে ওনার ?
রুহি কিছু না বলে মিহিকে নিয়ে ঢুকলো কেবিনের ভিতরে । ওর হাত দুটো ধরে বললো….
” কাল তোকে রেখে আসার পথে একটু অসুস্থ হয়ে পড়েছিল ভাইয়া । একটু নয় অনেকটাই !
” কি…কি হয়েছে ?
” ভাইয়ার অ্যানাফাইলাক্সিস আছে…

মানে, ওটা এক ধরনের এলার্জি । ভীষণ মারাত্মক । বাদাম বা চকলেট জাতীয় কিছু খাবার খেলে এই এলার্জির অ্যাটাক শুরু হয় ।
ছোট বেলা থেকে এসব খাবার থেকে বিরত থেকেছে ভাইয়া,, এমনকি আমারাও কখনো ভাইয়ার সামনে এসব খাবার খাইনি ।
জানি না কাল হঠাৎ কি হয়েছিল ? ভাইয়া তো কখনো এসব ছুঁয়েও দেখে না । খাওয়া তো দূরের কথা । কিন্তু অ্যাটাক আসলো কি করে সেটাই তো বুঝতে পারছি না ? ভাইয়া তো শেষ বার আমাদের সাথে ফুচকা খেয়েছিল…
মিহি থমকালো । আশ্চর্য বনে চাইলো রাফির পানে । যে এখন নিস্তব্ধ হয়ে শুয়ে আছে অচেতন অবস্থায় । মিহি চোখ পুনরায় ভরাট হয়ে উঠলো ।
মিহির চোখে পানি দেখে রুহি মোলায়েম কন্ঠে বলল….

” কি রে…
কাঁদছিস কেনো ? ভাইয়া এখন ঠিক আছে । ঘুমিয়েছে একটু ।
রিলিজ দেওয়া হবে একটু পর । ভাগ্যিস কাল সঠিক সময়ে ভাইয়া ফোন করে জানিয়েছিলো সবটা, নয়তো…
মিহি ভেজা কন্ঠে বলল…
” কাল থেকে এখানে আছিস তুই ?
” হুম,,
শুধু আমি না, সবাই ছিলো । আম্মু আব্বু একটু আগে চলে গেল । কাল থেকে কাঁদতে কাঁদতে আম্মুর অবস্থা শেষ । তাই আর এখানে থাকতে দেই নি,, একটু পর রিলিজ দেওয়া হবে, স্যালাইন চলেছে কাল থেকে ।ইনজেকশন পুশ করা হয়েছে তো তাই ভাইয়া একটু ঘুমোচ্ছে । ঘুম ভাঙ্গলেই চলে যাবো..!
কিন্তু তুই, তুই এতো তাড়াতাড়ি আসলি কি করে ?
” সি এন জি তে এসেছি ।
মাথা নামিয়ে ছোট্ট করে জবাব দিলো মিহি । শান্ত এতক্ষন শুনছিলো ওদের কথা ।
কাল থেকে রুহির খাওয়া হয় নি । মুখটা মলিন হয়ে আছে । শান্ত উঠতে উঠতে বলল…

” পাখি, তুমি একটু এখানে থাকবে ? আসলে রুহি কাল থেকে কিছু খায় নি । এখন দেখো ১০ টা বেজে গেছে । না খেয়ে থাকলে শরীর খারাপ করবে.. আমি ওকে একটু কিছু খাইয়ে নিয়ে আসি ।
মিহি আলতো ঘাড় কাত করে সম্মতি দিলো । রুহিও কিছু বললো না , মিহির অবস্থা বুঝে একটু সময় করে দিল রাফির কাছে থাকার জন্য ‌। ওর নিজেরও ক্ষিদে পেয়েছে । খাওয়া প্রয়োজন এখন । মাথা ঘোরাচ্ছে একটু ।
মিহিকে কেবিনে রেখে ওরা দুজনে কেবিন ত্যাগ করলো । যাওয়ার আগে দরজাটা ভিজিয়ে দিল বাইরে থেকে ।
মিহি সেই তখন থেকে এক দৃষ্টিতে দেখে যাচ্ছে রাফি কে । ও গুটি গুটি পায়ে এসে দাঁড়ালো বেডের পাশে । চেয়ে থাকলো আরো কিছুক্ষণ । রাফির গায়ে ছোপ ছোপ লাল লাল আভা ফুটে উঠেছে । মিহি একটা চেয়ার টেনে বসলো ওর কাছে । ঘুমন্ত রাফির মলিন মুখ পানে চেয়ে ওর ডান হাতটা নিজের ছোট ছোট দুহাতের মুঠোয় নিলো । গাঁ একটু গরম হয়ে আছে রাফির । চেহারা কেমন ফ্যাকাশে দেখাচ্ছে ।
আচমকা ঠোঁট উল্টে কেঁদে উঠলো মিহি । নিজের কর্মকান্ডে নিজেই হতভম্ব হয়ে গেছে ও । কি করলো ও এটা । ওর জন্যেই তো এসব হয়েছে । না জেনে শুনে এতবড় একটা ক্ষতি করে ফেললো ও ।
মিহি ফুঁপিয়ে উঠে রাফির হাতটা শক্ত করে চেপে ধরলো । বেডে রাখা ওর হাতের মুঠোয় মাথা নামিয়ে কপাল ঠেকালো । ক্রন্দনরত আধো ভেজা কন্ঠে অপরাধি স্বরে বলতে লাগলো…

” আই এম সরি…
অনেক অনেক সরি । আমার জন্যই এমনটা হয়েছে । আমি দায়ী আপনার অসুস্থতার জন্য । সব আমার দোষ,, আমি খুব বাজে । খুব বাজে… আমি কারোর বিষয়ে ভাবি না । সবসময় ভুলভাল কাজ করি..
কিন্তু বিশ্বাস করুন, আমি জানতাম না আপনার চকলেটে এলার্জি আছে ! জানলে কখনোই এমনটা করতাম না । কখনোই না…
আই এম রিয়েলি সরি.. প্লিজ ক্ষমা করে দিন আমায়..।
এবারের মতো তাড়াতাড়ি সুস্থ হয়ে যান প্লিজ…
আর আপনিও খুব বাজে, আপনি কেনো বললেন না আমায় ? আমি কখনো আপনার ক্ষতি চাই না বিশ্বাস করুন । আপনি আমায় ক্ষমা করে দিন প্লিজ ।
মিহির চোখের পানিতে ভিজে গেছে রাফির হাত । হাতের মুঠো নোনতা পানিতে জবজবে হয়ে গেছে । এদিকে অস্পষ্ট স্বরে কথা গুলো বারবার আওড়িয়ে যাচ্ছে মিহি । রাফির হাতটা নড়ে ওঠে একটু । ঘুম ছুটে গেছে অনেক আগে । এতক্ষণ নীরবে শুনছিলো তার প্রেয়সীর আহাজারি । ঠোঁট প্রসারিত হলো রাফির ।
” কাঁদছো কেনো..?

শীতল কন্ঠ কানে বাজতেই সহসা মাথা তুলে তাকায় মিহি । চোখের পানিতে ভিজে গেছে পুরো মুখ । রাফির নরম চাহনি দেখে অপ্রস্তুত হয়ে পড়ে মিহি । সহসা ওর হাতটা ছেড়ে দেয় । রাফি নিজের হাতের দিকে একবার দৃষ্টি পাত করে আবারো দৃষ্টি ফেরায় মিহির দিকে । মিহি নাক টানছে । কান্নার দরুন নাকের ডগা লাল বর্ন ধারন করেছে । দুহাতে চোখ মুছে নিলো মিহি । ভেজা দৃষ্টি স্থির করলো রাফির দিকে । রাফি এখনো আধো চোখে তাকিয়ে আছে । ঘুম ভেঙ্গেছে কেবল, ঘুমের রেশ কাটেনি পুরো পুরি । চোখ মুখ এলার্জির কারণে ফুলে গেছে । রাফির এরূপ অবস্থা দেখে বুক ভার হয়ে আসছে মিহির । গলায় কান্না আটকে রেখেছে কোন রকমে । রাফি শোয়া থেকে উঠে বসার চেষ্টা করলো । রক্ত চাপ নিয়ন্ত্রণে ছিল না । দূর্বল হয়ে আছে শরীর । মিহি তড়িঘড়ি করে রাফির কাঁধ জড়িয়ে ওকে সাহায্য করল উঠে বসতে । পিঠের কাছে বালিশ রেখে আধশোয়া হয়ে বসলো রাফি । মাথা পিছনের দিকে একটু এলিয়ে চোখ ফেরালো মিহির দিকে,,মৃদু হেসে শান্ত গলায় প্রশ্ন করলো…

” কখন এসেছো..?
মিহি ভেজা চোখ মুছে নিলো আবারো । ফুঁপিয়ে উঠে কন্ঠ খাদে নামিয়ে পাল্টা প্রশ্ন ছুড়লো…
” আপনি আমায় বললেন না কেনো, যে আপনার চকলেটে এলার্জি আছে ?
” এমনি বলি নি..!
” এমনি এমনি কেনো বলবেন না আপনি ?দেখেছেন কি অবস্থা হয়েছে আপনার ? যদি আপনার কিছু হয়ে যেতো..?
খানিক উত্তেজিত কন্ঠে কথাগুলো বলল মিহি । রাফি মুচকি হেসে শীতল কন্ঠে বলল…
” কি হতো আমার কিছু হলে ?
” অনেক কিছুই হতো…
আপনার কিছু হলে আমি ,, আমি নিজেকে ক্ষমা করতে পারতাম না কখনো !
” আর ,, আর কি হতো..?
মিহির গলা দিয়ে আর একটা শব্দও বের হলো না । চিবুক গলায় নামিয়ে বসে আছে । রাফি স্থির দৃষ্টিতে চেয়ে থাকলো মুহূর্তের পর মুহুর্ত । চুলগুলো এলোমেলো হয়ে আছে, কান্না ভেজা মুখের সাথে কয়েকটা ছোট ছোট চুল লেপ্টে আছে । রাফি প্রশ্ন করলো….
” নিজের এই রকম অবস্থা কেনো ?
হিজাব কোথায়..?
মিহি সেই একই কাতর কন্ঠে উত্তর করলো…

” পড়িনি..
” কেনো ?
” তাড়াহুড়ো করে বেরিয়েছি, তাই সময় পাই নি ?
” কিসের এতো তাড়া ?
মিহি এবার চোখ তুললো । চোখাচোখি হলো দুজনের । কেউ দৃষ্টি সরালো না । মিহি নিরেট দৃষ্টি বজায় রেখেই জড়ানো গলায় বলল…
” আপনি আর কখনো এমনটা করবেন না প্লিজ..! আপনি তো জানতেন আপনার চকলেটে এই এলার্জি ছিল.. তো খাওয়ার প্রয়োজন কি ছিল ? শুধু শুধু জেনে শুনে নিজের ক্ষতি কেনো করতে গেলেন আপনি ?
” খাওয়ার প্রয়োজন ছিল ! আর ক্ষতি কোথায় করলাম..?
” ক্ষতি করেন নি ? নিজের অবস্থা দেখেছেন ?
রাফি নিজের দিকে তাকালো । কপাল কুঁচকে বললো…
” দেখলাম তো ! কেনো, আপনি কি দেখছেন আমার মাঝে ? ভালো লাগছে না আমায় ?
মিহি কোন উত্তর করার আগেই শান্ত আর রুহি দরজা ঠেলে কেবিনে ঢুকলো । দু’জনে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকালো দরজার দিকে । মিহি চটপট করে নিজের চোখের পানি মুছে নিলো । এলোমেলো চুল গুলো হাত খোঁপা করে ওরনা টেনে নিলো মাথায় ।
রাফি কে সজাগ দেখে রুহি দ্রুত এগিয়ে এসে অস্থির হয়ে শুধালো…

” ভাইয়া, উঠে গেছো ? কেমন লাগছে এখন ? শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে কি ? ডাক্তার ডাকবো ?
রাফি আলতো হেসে বললো….
” আমি এখন একদম ফিট আছি । এতো excited হতে হবে না তোকে ।
শান্ত ঠোঁট কামড়ে মেকি স্বরে বলল…
” আর ডাক্তার ডাকতে হবে না জান ,, এসব নরমাল শরীরের ডাক্তারের প্রয়োজন নেই আর । মনের ডাক্তার তো উপস্থিত আছে, সে হলেই চলবে..! কি বলিস ব্রো..?
রাফি এবার চোখ পাকিয়ে তাকালো । কথা ঘুরিয়ে রুহিকে বলল….
” খেয়েছিস কিছু ?
” হুম…
এখনি খেয়ে আসলাম ।
এবার মিহির দিকে ফিরে স্বাভাবিক কন্ঠে শুধালো…
” আপনি খেয়েছেন ?

মিহি ভ্রু যুগল কিঞ্চিত জড়ো করলো । রাফির হঠাৎ হঠাৎ এমন তুমি-আপনি মিলমিশ সম্বোধন গড়মিল লাগে ওর কাছে ।
মিহি তো ছোট তাহলে ওনার এভাবে আপনি বলে সম্বোধন করার মানে কি ? আর যখন আপনি বলে, তাহলে মাঝে মাঝে তুমি বলে কেন ?
মিহি স্বাভাবিক কন্ঠে উত্তর দেয়….
” হুম, খেয়েছি..!
বারোটার দিকে রাফি কে রিলিজ দেওয়া হয় হসপিটাল থেকে । হসপিটাল থেকে সোজা বাড়িতে গেছে ও । শান্ত কে দায়িত্ব দিয়ে মিহিকে ওর বাড়িতে পৌঁছে দিয়েছে ।
বাড়িতে এসেছে থেকে মিহি বিবস হয়ে শুয়ে আছে । ঘরে আবছা আলো । সমস্ত লাইট অফ । ব্যালকনি দিয়ে মৃদু আলো আসছে ।‌ নিস্তব্ধ ঘরে একমনে কিছু ভেবে চলেছে মিহি । চোখ মুখের কোনো প্রতিক্রিয়া নেই । স্থির চোখ দুটোতে পলক পড়ছে খানিক বাদ বাদ ।
মাঝে মাঝে শ্বাস দীর্ঘ হয়ে আসছে ।
পড়াশোনা আছে অনেক । আজ আর টিউশন হলো না । বাড়িতে এসে বলেছে টিউশন ক্লাস ছিলো, তাই তাড়াহুড়ো করে বেরিয়েছিলো তখন । আজকাল বাড়িতে টুকটাক অনেক মিথ্যা কথাই বলে মিহি । অনেক কিছুই চেপে যায় । এই তো সেদিনের কোচিংয়ের বাইরের ঘটনা টাও বাড়িতে বলে নি । মিথ্যে অজুহাতে কাটিয়ে দিয়েছে । বললেই বা কি হবে, মিহি কে নিয়ে আরো বেশি টেনশনে থাকবে ওর আব্বু আম্মু । বাড়ি থেকে বেরোনো দায় হয়ে পড়বে নয়তো ।

তবে মিহির মিথ্যে বলার অভ্যাস ছিল না কখনো । আব্বু আম্মুর কাছে তো মিথ্যে বলার প্রশ্নই আসতো না । সব ঘটনা সহজ ভাবে স্বীকার করতো তাদের কাছে । নিজের মনের সমস্ত কথা খুলে বলতো ।
ইদানিং মিহির অনেক অভ্যাসেই পরিবর্তন এসেছে । অনুভূতিতে ও পরিবর্তন এসেছে ।
উথাল পাতাল চিন্তা ভাবনা করতে করতে মিহি শোয়া ছেড়ে এক ঝটকায় উঠে দাঁড়ায় ।
দৃপ্ত পায়ে উঠে যায় নিজের পড়ার টেবিলে সামনে । ব্যাগ ঘেঁটে সমস্ত চকলেট বের করে বাইরে, টেবিলের ড্রয়ার, বইয়ের ভাঁজ সব জায়গা থেকে চকলেট গুলো বের করে সব এক জায়গায় জড়ো করে । সর্বদা মিহির চকলেট পছন্দ । আজমাল হোসেন অফিস থেকে ফেরার সময় এখনো মেয়ের জন্য চকলেট নিয়ে আসেন রোজ । পড়ার সময় পড়তে পড়তে চকলেট খাওয়া অভ্যাস হয়ে গেছে মিহির ।

এক দেখায় পর্ব ২৫

এটা নতুন কিছু নয় ।
মিহি সমস্ত চকলেট একজায়গায় করে গটগট পায়ে ব্যালকনিতে গিয়ে দাঁড়ায় । উপর থেকে এক ঝটকায় সব গুলো ফেলে দেয় নিচে ।
নিরেট কন্ঠে আওড়ায়….
” আজ থেকে তোদের কোনো স্থান নেই আমার জীবনে । আমার পছন্দের তালিকা থেকে মুক্তি দিয়ে দিলাম তোদের !

এক দেখায় পর্ব ২৭