Home এক দেখায় এক দেখায় পর্ব ২৮

এক দেখায় পর্ব ২৮

এক দেখায় পর্ব ২৮
সুরভী আক্তার

সকাল সকাল ফেসবুক নোটিফিকেশনে হতবাক হয় মিহি ।
আজ ২২ আগস্ট । ভোর ভোর ঘুম ছুটে গেছে মিহির । ঘুম জড়ানো চোখ দুটো পিটপিট করে খুলে আড়মোড়া ভেঙে উঠে বসে সে । মাথার চুল গুলো এলোমেলো হয়ে আছে । কাল চুল খুলেই ঘুমিয়ে পড়েছিল । বাঁধার ফুরসৎ টুকুও পায় নি । সেগুলো এখন জট পাকিয়ে এলোমেলো হয়ে গেছে । মিহি দুহাতে হাত খোঁপা করে নেয় এলোমেলো চুল গুলো । বালিশের নিচ থেকে হাতড়ে ফোন বের করে সে । সময় দেখার জন্য ফোন অন করতেই স্ক্রিনে ভেসে থাকা নোটিফিকেশন দেখে চোখ বড় বড় হয়ে যায় ওর । অমনি ঘুমের ঘোর কেটে যায়,,লাফিয়ে উঠে বসে সে । ফেসবুক ওপেন করতেই মুচকি হাসি ফোটে ঠোঁটের কোণে । খুশির অনুভূতিতে শিরশির করে ওঠে পুরো শরীর । ঢেউ খেলে যায় মনে ।

আজ রাফির বার্থডে !!
অদ্ভুত রহস্যময় আনন্দ জাগে মনে । রাফির প্রোফাইল ঘাটতেই নজরে আসে ওর টাইমলাইনে অনেকেই পোস্ট করেছে । প্রত্যেক টা পোস্টের কমেন্ট জুড়েই শুভেচ্ছা জানানো হয়েছে রাফি কে ।
বুকটা কেমন ঢিপঢিপ করছে, স্পষ্ট টের পাচ্ছে মিহি । তবে পরক্ষনেই মিহির অনুভূতি পূর্ণ উৎফুল্ল মুখটা চুপসে যায় । চৌধুরী বাড়িতে জন্মদিন পালন করে না কেউ । রাফি তো আরো বেশি কড়া এই বিষয়ে । রুহির দিক থেকে যে নিয়মটা কার্যকর, রাফির দিক থেকে সেটা নিশ্চয়ই আরো বেশি সক্রিয় হবে ।
মিহি হাতের ফোনটা ধরেই যুবু-থুবু হয়ে বসে রইলো কিছুক্ষণ ।
তবে ভাবলো কিছু একটা । ভাবনার মাঝেই আবারো এক চিলতে হাসি ফুটলো ঠোঁটের কোণে ।
টিউশন ছিলো দুপুর দুটোর সময় । মিহি বারো’টার দিকে বেরিয়েছে বাড়ি থেকে । দুই ঘণ্টা ধরে কিছু একটা করে ঠিক সময় মতো টিউশনে হাজির হয়েছে । মুখে হাসি লেগেই আছে আজ । রুহি পড়ার ফাঁকে লক্ষ্য করেছে মিহি কে । ও কেমন একা একাই মিটমিট করে হাসছে !

ক্লাস শেষে বাইরে বেরিয়েও মিহি কে কিছু জিজ্ঞেস করে নি রুহি । বরং কালকের ঘটনাটা সম্পুর্ন খুলে বলেছে । মিহির কোনো ভাবান্তর দেখা যায় নি ওর কথায় । সে আগ বাড়িয়ে আর কিছু বলেও নি । চুপ চাপ শুনেছে সবটা । চৌধুরী গ্রুপ অফ ইন্ডাস্ট্রির পার্কিং লটে দাঁড়িয়ে আছে দু’জনে । কিছু সময় পর শান্ত উপস্থিত হয় ওদের মাঝে । মিহি চোরা চোখে খুঁজছে রাফি কে । আজ রাফি নেই । শান্ত ওদের কাছে এসে তাড়া দিয়ে বলল…
” চলো চলো…
দেরি হয়ে যাচ্ছে ।‌
বলেই হাঁটা লাগায় শান্ত । রুহি পা বাড়াতে গেলে পিছন থেকে ওর হাত টেনে ধরে মিহি । নরম দৃষ্টিতে তাকিয়ে কৌতুহলি কন্ঠে শুধায়….

” এখন কোথায় যাচ্ছি আমরা ?
” কেনো,, বাড়িতে !! বাড়িতে যাবি না ?
সাবলীল ভাবে উত্তর করে রুহি । মিহির ভঙ্গিমা বদলে যায় কিছুটা । সে মিনমিন করে বললো…
” না.. মানে,, তোর ভাইয়া আসবে না ? উনিই তো রোজ রোজ পৌঁছে দেন আমাদের,, তাই আর কি !!
রুহি ঠোঁট টিপে হাসলো । গলা খাঁকারি দিয়ে বললো…
” আহারে ভাবি জান… ভাইয়া কে মিস করছো বুঝি ?
” না না… তেমন কিছু না । আ…আসলে ফেসবুকে নোটিফিকেশন পেয়েছিলাম,, আজ ওনার বার্থডে । তাই আর কি,, উইশ করতাম । মানে ঐ , উনি তো আমাকে গিফট দিয়েছিলেন তাই ওনার জন্য একটা ছোট্ট গিফট নিয়ে এসেছিলাম । সেটা দেওয়ার ছিলো…
রুহির ঠোঁট প্রসারিত হলো আরো বেশি । সে মেকি স্বরে বলল…

” তাই…?
” হুম…
মাথা নুইয়ে ছোট্ট করে উত্তর করলো মিহি । রুহি ওর অবস্থা বুঝে মিটিমিটি হাসছে । পরক্ষনেই নিজেকে গম্ভীর করে কথা না বাড়িয়ে মিহির হাত ধরে টেনে বাইরে বের হলো সে । মিহিও দ্বিমুখীতায় আর কিছু বলতে পারলো না । বাইরে এসে উশখুশ করছে মিহি । শান্ত গাড়ি বের করতে গেছে । দুমিনিটের মাথায় গাড়ি নিয়ে আসলো সে । মিহি আহত চোখে চেয়ে আছে রুহির পানে । রুহি দেখেও না দেখার ভান করছে যেনো । গাড়ি আসতেই রুহি মিহিকে উদ্দেশ্য করে স্বাভাবিক কন্ঠে বলল…

” ওঠ…
বলেই সে উঠে পড়লো । মিহিও মাথা নিচু করে উঠে পড়লো ব্যাক সিটে রুহির পাশে । অস্থির লাগছে নিজেকে । কত সখ করে নিজের সমস্ত জমানো টাকা দিয়ে রাফির জন্য একটা ঘড়ি কিনলো সে, হতে পারে দামে কম, তবুও অনেক অভিরুচি থেকে ঘড়িটা কিনেছে ও । রাফির সবসময় হাতে ঘড়ি পড়ে, হাতের ঘড়িতে ছেলেদের রুচিশীলতা প্রকাশ পায় । তাই মিহিও যত্ন করে একটা ঘড়ি কিনেছে ওর জন্য ।
মিহির উৎফুল্ল খুশি খুশি মনটা নিরস হয়ে গেল মূহুর্তেই । চুপসে আছে মুখটা । মাথা নামিয়ে নিরস থমথমে মুখে বসে আছে ।
গাড়ি স্টার্ট হতেই শান্তর হেঁয়ালি কন্ঠ ভেসে আসলো…

” আচ্ছা মিহি পাখি,, একটা মেয়ে দেখো তো । বিয়ে করাবো রাফি কে…
মিহি হতচকিতে তাকালো সামনে । ড্রাইভিং সিটে আবিষ্কার করলো অন্য কাউকে । পিছন থেকে দেখেই চিনতে অসুবিধা হলো না মিহির । সে তৎক্ষণাৎ ফ্রন্ট মিররে চাইলো । দর্পণে ভেসে উঠেছে রাফির অর্ধেক মুখশ্রী । কপালে কয়েক স্তর ভাঁজ । শান্ত কথায় বিরক্ত হয়েছে হয়তো । চোখে কালো সানগ্লাস । মিহি হতবাক হয়ে চেয়ে আছে । চোখে অবিশ্বাসের দিপ্তী । এতক্ষণ খেয়াল করে নি সামনে কে আছে আর কে নেই । ভেবেছিল শান্ত ড্রাইভ করছে হয়তো । মিহি পর মূহুর্তে তাকালো রাফির পাশের সিটে । শান্ত পিছন ফিরে ওর দিকেই প্রশ্ন সূচক নয়নে চেয়ে আছে । মিহির তাকানো তে পরপর দুবার ভ্রু নাচালো সে । পুনরায় বলে উঠলো……
” কি হলো ? কি দেখছো ? একটা মেয়ের খোঁজ দাও দেখি ,, রাফি বুড়ো হয়ে যাচ্ছে । বিয়ে দিতে হবে ওকে । শালা ২৮ বছরে পা দিলো,, তবুও বিয়ে করার কোনো উদ্বেগই নেই ।
মিহি আবারো চোখ বড় বড় করে তাকালো রাফির দিকে । রাফি আগের তুলনায় বেশি করে কপাল কুঁচকে রেখেছে । মিহি অবাক স্বরে আহাম্মকের ন্যায় বুলি ফুটালো.…

” ২৮ বছর !!
রাফি ও সহসা তাকালো মিররের দিকে । শান্ত গাঁ ছেড়ে বললো…
” হুম… ২৮ বছর !!
” বাপরে,, এতো বড়…!
মিহির অবুঝের মতো অবিশ্বাস্য চাহনি দেখে মুখে হাত চেপে ফিক করে হাসলো রুহি । রাফি মিররে দৃষ্টি রেখেই একটা ভ্রু উঁচু করে গম্ভীর স্বরে মিহির উদ্দেশ্যে শুধালো…
” সো হোয়াট…?
বোকার মতো হাসার চেষ্টা করলো মিহি । আমতা আমতা করতে লাগলো…
” না মানে…আমি তো ভেবেছিলাম ২৫/২৬ হবে হয়তো ! আপনাকে দেখে মনে হয় না আপনি বুড়ো হয়ে গেছেন ।
অকস্মাৎ ব্রেক কষলো রাফি । সহসা পিছন ফিরলো মিহির পানে ।
উচ্চ শব্দ করে হেসে উঠলো শান্ত । মিহি পিটপিট করে তাকিয়ে আছে রাফির তীক্ষ্ণ দৃষ্টির দিকে । রাফি দ্বিগুণ ভারী গলায় বলে উঠলো…

” আমি বুড়ো হয়ে গেছি ?
তব্দা খেয়ে ভড়কালো মিহি । শুকনো ঢোক‌ গিলে রুহির হাত চেপে ধরলো, মিনমিন স্বরে বললো…
” না… বুড়ো কখন বললাম ? ঐ বয়স বেড়েছে এটাই বললাম শুধু । ভাবা যায়, আমার থেকে দশ বছরের বড় আপনি !
” তাতে কি ?
” কি…কি আবার ,, কিছুই না ।
” এনি প্রবলেম ?
” নাহ , আমার প্রবলেম থাকতে যাবে কেনো !!
” প্রবলেম থাকলেও সলিউশন নেই । বয়স কমাতে পারবো না আমি !
মিহি ফ্যাল ফ্যাল করে চেয়ে আছে । রুহি ফিচেল হেসে মিহির বাহু জড়িয়ে বললো…
” আরে ভা… না মানে পাখি,,
কোথায় আমার ভাইয়ার বয়স বেড়েছে ? আমার ভাইয়া কি হ্যান্ডসাম দেখেছিস ! বয়স ২৮ হলেও দেখতে কিন্তু ২৫ বছরের হ্যান্ডসাম বয় লাগে ?
অতঃপর মিহির কানের কাছে এসে ফিসফিস করে বললো…
” এটাই কিন্তু বিয়ের উপযুক্ত সময় ভাবি জান । দোষ তো তোরই , তুই কেন আগে আসলি না ? আগে আসলে হয়তো আমার ভাইয়ার বউ হয়ে যেতি এতদিন । দু-একটা বাচ্চাও……
বাকি কথা শেষ করার আগে আকস্মিক ওর মুখ চেপে ধরলো মিহি । দাঁত চেপে নিরেট দৃষ্টিতে তাকালো । রুহির মতোই ফিসফিস করে বললো…

” চুপ করবি !
মিহি হাত সরাতেই ঠোঁট কামড়ে হাসলো রুহি । রাফি আবারো ড্রাইভিং এ মনযোগ দিয়েছে । শান্ত বকবক বাদ দিয়ে কানে ইয়ারফোন লাগিয়েছে । গানের তালে চোখ বন্ধ করে হাত আর মুখ নাড়াচ্ছে ও । মিহি ঢোক গিলছে বারবার । অভদ্র চোরা চোখ দুটো বারবার যাচ্ছে মিররের দিকে । মিহি কোন রকমে টেনে হিচড়ে চোখ সরিয়ে চোখ বন্ধ করে নিলো । লম্বা শ্বাস টানলো । মিহি চোখ সরাতেই রাফি দৃষ্টি পাত করলো মিররের দিকে । চশমার আড়ালে মিহির কার্যকলাপ ওর দৃষ্টিগোচর হয় নি । মুচকি হাসলো রাফি ।
রুহিও মাথা এলিয়ে চোখ বন্ধ করে আছে । চোখ খুললো মিহি । একবার করে রুহি আর শান্ত কে দেখে নিলো । অতঃপর নরম কন্ঠে রাফির উদ্দেশ্য বললো…
” হ্যাপি বার্থডে…
ভাবাবেগ না দেখিয়ে গুরুগম্ভীর উত্তর করলো রাফি…
” থ্যাঙ্ক ইউ…

মিহি তবুও মুচকি হাসলো । ব্যাগ থেকে ছোট্ট একটা গিফট বক্স বের করে হাতে রাখলো । ওদের বাড়ির সামনে গাড়ি থামতেই রুহির থেকে বিদায় নিয়ে গাড়ি থেকে নামলো মিহি । একটু থেমে জানালা দিয়ে রাফির দিকে হাতের বক্স টা এগিয়ে দিয়ে তাড়াহুড়ো করে বলতে আড়ম্ভ করলো…
” আ… আপনার বার্থডে গিফট । জানি খুব বেশি দামী নয় । আপনি এতো কমদামি জিনিস ইউজ করেন না এটাও জানি । তবুও পছন্দ হলে পড়বেন…! আমি আসি…
বলেই এক মুহুর্ত অপেক্ষা না করে দম খিচে পা চালালো মিহি । থামলো বাড়ির ভেতরে গিয়ে । হাঁফ ছাড়ল সে ।
এদিকে মিহি যেতেই রুহি মেকি স্বরে বলে উঠলো…
” কান থেকে হাত সরাবো ভাইয়া ? আর চোখ খুলবো কি ? দেখো আমি কিন্তু কিছু শুনিও নি আর দেখিও নি । তুমি বললে চোখ খুলি……
রাফি তপ্ত শ্বাস ফেললো । বোনকে দেখে রাশভারী কন্ঠে বললো…

” এমন বিচ্ছু বিটকেল হলি কবে থেকে ?
রুহি চোখ খুলে দাঁত কেলিয়ে বললো…
” বিচ্ছু বিটকেল কোই হলাম ? তোমাদের আলাদা ব্যপার-স্যাপার থাকতে পারে না, এই ভেবে আর কি…
” শান্ত শেখাচ্ছে তোকে এসব ?
শান্ত কান থেকে ইয়ারফোন খুলে তড়িৎ বেগে চেঁচিয়ে উঠলো…
” খবরদার সব কিছুতে আমাকে জড়াবি না ! আমি কেনো তোর বোনকে শেখাবো এসব ? সে কি কিছু বোঝে না নাকি ? কচি খুকি তোর বোন !
রাফি বললো না কিছু ।
চৌধুরী বাড়িতে জন্মদিন পালন করে না কেউ । সেই মতে রাফির জন্মদিনেও কারোর কোনো ভাবান্তর নেই । তবে হেনা বেগম সন্ধ্যার দিকে পায়েস রান্না করেছেন ছেলের জন্য । রাফি বাড়িতে এসেই ল্যাপটপ নিয়ে বসেছে । কাজ করছে কিছু একটা , কিছুদিন পর সুদানে একটা প্রজেক্ট নিয়ে কাজ আছে । রাফি কে যেতে হতে পারে সেখানে । রাফি চেষ্টায় আছে দেশে থেকেই প্রজেক্ট কমপ্লিট করার । নতুবা প্রজেক্টের কাজে কমপক্ষে একমাসের জন্য দেশের বাইরে সুদানে যেতে হবে তাকে । যেটা সে চাইছে না । রাশেদ রায়হান চৌধুরীর সাথে এই নিয়ে কথা বলে নি সে । যদি প্রজেক্ট কমপ্লিট না হয় তাহলে ওকে সুদানে যেতেই হবে ।
হেনা বেগম পায়েসের বাটি হাতে নিয়ে ছেলের ঘরের বাইরে দাঁড়িয়ে আছেন । বাইরে থেকে কড়া নাড়েন তিনি । দরজা খোলাই ছিল, রাফি বাইরে আম্মু কে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে গলা বাড়িয়ে স্বাভাবিক কন্ঠে বলল…

” আম্মু, তুমি বাইরে দাঁড়িয়ে আছো কেনো । এসো…
ঘরে ঢুকলেন হেনা বেগম । রাফি পুনরায় বলল…
” আমার ঘরে আসার জন্য তোমাকে নক করতে হবে না আম্মু । তুমি এমনিতেই আসতে পারো..
হেনা বেগম মুচকি হেসে ছেলের পাশে বসলেন । এক পলক ল্যাপটপের দিকে তাকিয়ে রাফির দিকে চাইলেন । শান্ত স্বরে বললেন…
” তোর জন্য পায়েস বানিয়েছিলাম । খেয়ে নে দেখি ,‌ খেয়ে বলতো কেমন হয়েছে ?
রাফি ল্যাপটপ থেকে চোখ সরিয়ে আম্মুর দিকে তাকালো । হেনা বেগম এক চামচ পায়েস ছেলের মুখে তুলে দিলেন । রাফি খেয়ে দায় সারা ভাবে বললো…
” ভালো হয়েছে আম্মু…
হেনা বেগম খানিক ইতস্তত হয়ে বললেন…

” একটা কথা বলি রাফি ?
” হুম , বলো…
” তিথি মেয়ে টাকে বিয়ে করতে কি সমস্যা তোর ?
তৎক্ষণাৎ রাফির চঞ্চল কর্মরত হাত দুটো থেমে গেল । হেনা বেগম ছেলের নিস্তব্ধতা দেখে আবারও বললেন…
” জানিস, মেয়েটা আজ এসেছিল ওর আব্বুর সাথে । আমার তো ওকে আর ওর ব্যাবহার ভারী পছন্দ হয়েছে । আমাকে পায়েস বানাতেও সাহায্য করেছে ও । তোর জন্মদিনের কথা শুনে নিজে থেকেই এসেছিল আজ । অনেকটা সময় ছিল আমাদের সাথে । ভারী মিশুক মেয়ে । তোর সাথে খুব মানাবে দেখিস ।

” এসব বলতেই আসলে ?
” না , মানে, পায়েস নিয়ে এসেছিলাম তোর জন্য ।
” এতো মিষ্টি জিনিস খাই না আমি ।
” এক্ষুনি তো বললি ভালো হয়েছে ।
রাফি উত্তর করলো না । আবারো মনযোগ ফেরালো নিজ কাজে । হেনা বেগম নীরবে বসে থাকলেন কিছুটা সময় । আহত ভেজা স্বরে বললেন…
” তুই কি আমার পছন্দের এই টুকু মুল্য ও দিবি না ? আমার কথা শুনবি না তুই ? আমরা কি তোর খারাপ চাই ? দেখ মেয়েটা অনেক ভালো……
” আম্মু, কথা শেষ হয়েছে তোমার । এসব শুনতে ভালো লাগছে না আমার ।

” তুই কি কাউকে পছন্দ করিস ?
রাফি এবার আম্মুর দিকে তাকিয়ে দীর্ঘ শ্বাস ফেললো । দোটানা হীন সোজাসুজি উত্তর করলো…
” হ্যাঁ, পছন্দ করি । আর আমি যাকে পছন্দ করি , বিয়ে করলে তাকেই করবো । তবে এখন নয় , সময়‌ প্রয়োজন আমার ।
বলেই এক সেকেন্ড সময় ব্যয় না করে গটগট পায়ে ঘর ছেড়ে ব্যালকনিতে এসে দাঁড়ালো । হেনা বেগম হতবাক হয়ে থমকে বসে থাকলেন কিছুটা মুহূর্ত । রাফির কথা গুলো বিশ্বাস হলো না তার । তিনি লম্বা শ্বাস ফেললেন । অনেক আশা নিয়ে এসেছিলেন ছেলে কে বোঝাতে । আশাহত হয়ে ঘর ত্যাগ করলেন তিনি ।
এদিকে রাফি অনেকক্ষণ যাবত ব্যালকনিতে গম্ভীর হয়ে বুকে হাত গুজে দাঁড়িয়ে থেকে ঘরে আসলো । হেনা বেগমের ঘর ত্যাগের আভাস পেয়েছিল অনেক আগে । কিন্তু নিজের ঘরে আসে নি । বড় বড় শ্বাস টেনে মন মস্তিষ্ক ফ্রেশ করে ঘরে আসে সে ।

মিহির দেওয়া গিফট বক্স ওপেন করেছিল বাড়িতে এসেই । ঘড়িটা দেখে অনেক টা সময় তাকিয়ে ছিল ঘড়ির পানে । ঘড়ির কাঁটায় টিকটিক করে অনেকটা সময় বয়ে গেছে ওর তাকিয়ে থাকার মাঝে ।
বারংবার মুগ্ধ হয়ে মুচকি হেসেছে রাফি । রাফি আবারো ছুঁয়ে দেখলো তার প্রেয়সীর দেওয়া উপহার খানা । রাফির কাছে তার সখের নারীর দেওয়া তৃতীয় উপহার এটা । প্রথমটা ছিল সে নিজেই । দ্বিতীয় টা একগুচ্ছ লাল গোলাপ । আর তৃতীয় টা এই সময়ের যন্ত্র । তার প্রেয়সীর ভালোবাসা মিশ্রিত ছোঁয়া লেগে আছে এতে । রাফি ঠোঁট ছোঁয়ালো ঠান্ডা ঘড়িটাতে । চোখ বন্ধ করে দীর্ঘ একটা শ্বাস টেনে নিল ভেতরে । মুঠো ফোন হাতে নিয়ে সোফায় গাঁ এলিয়ে ফোনের স্ক্রিনে চেয়ে থাকলো আরো অনেকটা সময় । মিহির অগোচরে তোলা একাধিক ছবি আছে রাফির এলবামে । যা বন্দি হয়ে আছে হাজারো স্বপ্নকে ঘিরে । হাজারো কল্পনার সাক্ষী হয়ে ।
চেয়ে থেকেই ঘোরের মাঝে ফিসফিস করলো রাফি……

” কবে এতটা আপন হলেন আমার ? নিজেকে কবে এতখানি মিশিয়ে দিলেন আমার মাঝে ? আমার অজান্তেই আমার মাঝে অনেকটা জায়গা করে নিয়েছেন আপনি । যেটার পরিমাপ করতে আমি অক্ষম । আমার প্রতিটা নিঃশ্বাসে, প্রতিটা‌ রন্ধ্রে রন্ধ্রে ছড়িয়ে পড়েছে আপনার আসক্তি । আমার পৃথিবী থমকে গেছে ঠিক সেই দিন , যেদিন আপনার ঐ ডাগর দৃষ্টিতে আমার দৃষ্টি মিলেছিল । কি সাংঘাতিক আপনি, এই আমি টাকে পুরো পাল্টে দিয়েছেন । যে আমি কখনো কারোর সাথে জড়ায় নি, সেই আমি পুরোপুরি জড়িয়ে গেছি আপনার সাথে । আপনার ঐ চোখের দৃষ্টিতে ।
আপনার চোখের চাহনি আমার হৃদয়ের গভীরে হানা দিয়েছে ম্যাডাম, বারংবার হারিয়ে গেছি আমি আপনার দৃষ্টিতে । আপনি আমার হৃদয়ের ক্যানভাসে আঁকা প্রথম স্বপ্ন, যেটাকে বাস্তবে চাই আমি । দেবেন না বাস্তবে ধরা ?
মিহির ছবি পানে চেয়ে কথা গুলো আওড়ালো সে । চোখ বুজলো আবেশে ।
এদিকে ঘরে বসে পড়ায় মত্ত মিহি । বাড়িতে এসে অনেক টা সময় ধ্যান মগ্ন ছিল অন্য কিছু নিয়ে । কালকের বিষয়ে রুহির বলা কথা গুলোতে তখন তেমন মাথা না ঘামালেও এখন বারবার মাথায় ঘুরছে কথা গুলো । রাফিও কেমন গম্ভীর ছিল আজ ।

তবে এখন সমস্ত চিন্তা বাদ দিয়ে পড়তে বসেছে সে । ঘরে আলো জ্বলছে, তবুও টেবিল ল্যাম্প জ্বালিয়ে তার আলোতে পড়ছে সে । পড়ার সময় দুই কান চেপে না ধরলে পড়ায় মনোযোগ বসে না তার । সে আনমনে দুহাতে দুকান চেপে ধরে জোরে জোরে পড়ছে । হঠাৎ কি একটা ভেবে আচমকা কান থেকে হাত সরালো । পড়া থেমে গেল আপনা আপনি । মুখ বন্ধ হয়ে গেল মিহির । এতক্ষণে যেন শান্ত হলো পুরো ঘর ।
মিহি কিছু একটা ভেবে ফোন হাতে নিলো সময় দেখার জন্য । দশটা পেরিয়েছে । সময়ে নজর যাওয়ার আগে নজর আটকালো উপরে ভেসে থাকা মেসেজের নোটিফিকেশনে । হাঁ বনে গেলো মিহি । রাফি আজও নিজে থেকে মেসেজ করেছে ! তব্দা খেলো মিহি । ভাবলো চোখের ভুল । চোখ কচলে আবারো তাকালো । না ,, ঠিকি তো দেখছে ।
মিহি তড়িঘড়ি করে মেসেঞ্জার ওপেন করতেই রাফির মেসেজ সামনে আসলো । ছোট্ট একটা মেসেজ……

” থ্যাঙ্ক ইউ……
আপনা আপনি হাসি ফুটলো অষ্টাদশীর ওষ্ঠদ্বয়ে । দুলে উঠলো কোমল নারী হৃদয় । বেড়ে গেল নিঃশ্বাসের গতি । কাঁপা হাতে একটু অজানা ভাব নিয়ে রিপ্লাই করলো সে……
” কেনো ?
খানিক বাদ ওপাশ থেকে রিপ্লাই আসলো……
” যা দিয়েছেন আমায়, তার জন্য ।
” কি দিলাম !!
” জানেন না কি দিয়েছেন ?
” জানি তো !
” কি দিলেন ?
” যা আপনার কাছে আছে !
ছোট ছোট খানিক জটিল বার্তা প্রেরিত হচ্ছে একে অপরের মাঝে । সময় যেন আঁটকে গেছে দুজনের কাছেই । দুজনের দৃষ্টি একই দিকে । আবেশে হাসছে দুজনে । রাফি এক চিলতে হেসে উত্তর পাঠালো……

” কি আছে আমার কাছে ?
” সময় !! আর সময়ের একটা যন্ত্র ।
” এটা দিয়ে কি বোঝালেন ?
” আমি তো কিছু বোঝাই নি , আমি তো শুধু উপহার দিলাম । কিন্তু, আপনি কি কিছু বুঝলেন নাকি ?
” বুঝলাম !
” কি বুঝলেন শুনি ?
রাফি ছোট করে মুখে উচ্চারণ করলো..
‘ অপেক্ষা ‘ । মেসেজে টাইপ করলো….
” যা বোঝার বুঝেছি , বাচ্চাদের এতো কিছু বুঝতে নেই ?
মেসেজ দেখে কপাল কুঁচকালো মিহি । প্রশ্ন করলো…

” বাচ্চা কে ?
” কেনো তুমি…
মানে আপনি !
” বাচ্চা হলাম কবে ? আই এম 18 ইয়ার্স ওল্ড……
” আমি বুড়ো হলাম কবে ,, আই এম অনলি 28 ইয়ার্স ওল্ড……
মিহি মুচকি হাসলো , সাথে রাফিও । উত্তর করলো মিহি……
” আমাকে তুমি বলে সম্বোধন করতে পারেন আপনি ! বাচ্চা তো , করাই যায় !
” গত এক বছরে করলাম না এখন কেনো করবো ?
” এক বছরে এটা জানতাম না যে আপনি বুড়ো ! এখন জানলাম, তো বুড়ো হয়ে বাচ্চাদের তুমি বলাই যায়…
মেসেজ সেন্ট করে ঠোঁট কামড়ে মুচকি হাসলো মিহি । ওদিকে মেসেজ সিন হয়েছে অনেকক্ষণ হলো । রিপ্লাই আসে নি এখনো । হাসি হাসি মুখটা থমথমে পরিনত হলো মিহির । রাফি কি রাগ করলো ? কথার পরিপ্রেক্ষিতে হয়তো একটু বেশি বলে ফেললো মিহি । আরো অনেক টা সময় অপেক্ষা করলো বার্তা আসার । কিন্তু এলো না । চুপসে গেল মিহি ।

ফোন হাতে নিয়ে সেভাবেই চেয়ারে হেলান দিয়ে কখন ঘুমিয়ে পড়েছে খেয়ালই নেই । বারোটার পর আজমাল হোসেন মেয়ের ঘরে এসে দেখেন মিহির অবস্থা । টেবিলের সামনে চেয়ারে হেলান দিয়ে ঘুমিয়ে আছে মিহি । একহাতের মুঠোয় ফোন আবদ্ধ এখনো । অন্য হাত ঝুলে আছে চেয়ারের পাশে । মাথাটা হেলে পড়েছে অনেকটা । আজমাল হোসেন দুদিকে মাথা নাড়লেন । রোজ রোজ কয়েক দফা ঘুম বিরতি দিয়ে মেয়েকে এক পলক দেখে যান তিনি । আজ ও এসেছিলেন । মিহি গোছানো হলেও গোছানোর মাঝেই বড্ড এলোমেলো । এই এলোমেলো ভাবটা গুছিয়ে দেয় আজমাল হোসেন । তিনি মিহির মাথায় আলতো হাত রেখে মৃদু স্বরে ডাকলেন……
” মিহি,, আম্মু এখানে ঘুমিয়ে আছো কেনো ?
মৃদু ডাকেই ঘুম কেটে গেছে মিহির । এখনো ঘুমায় নি ঠিকমতো । তাই সহজেই ভেঙ্গেছে ঘুম । মিহি আধো চোখে আব্বুর দিকে তাকিয়ে এক গাল হাসলো । আদুরে কন্ঠে বলল…
” কখন ঘুমিয়ে পড়েছি খেয়ালই নেই আব্বু ।
” পড়াশোনার খুব চাপ , তাই না আম্মু ? ক’দিন পর তো রেসাল্ট……
” আমি ঢাকায় পড়বো আব্বু । চাপ তো নিতেই হবে ।
” এখন ঘুমাও মা…

চোখে কালি পড়বে নয়তো ।
এই বলে তিনি বের হলেন মেয়ের ঘর থেকে । একটু হাঁটাহাঁটি করলেন করিডোরে । বুক ব্যথা করছে তার । শরীর ঘামছে । ঘরে সাবিনা বেগম আছেন বিধায় ঘর থেকে বেরিয়েছিলেন তিনি । মিহির ঘরে আলো দেখে নিজেকে সামলে মেয়ের কাছে যান তিনি ।
তবে এখন আর সহ্য করা যাচ্ছে না । ব্যাথা বাড়ছে ভীষণ । শ্বাস রুদ্ধ হয়ে আসছে গলায় । খিচে আসছে পুরো শরীর । রক্ত জমাট বাঁধছে চোখে মুখে । শিরা উপশিরা ফুলে উঠেছে শরীরের । করিডোর থেকে সিঁড়ির কাছে এসে থমকে যান তিনি । শরীরের ভার ছেড়ে লুটিয়ে পড়েন সিঁড়ির উপর । শব্দ হয় ধপ করে । সিঁড়ি গড়িয়ে নিচে এসে পড়েন তিনি ।
মিহি সবে খাটে গাঁ এলিয়ে দিয়েছিল । শব্দ পেয়ে তড়িঘড়ি করে উঠে আসে সে । করিডোরে কেউ নেই । মিহি এদিক ওদিক তাকিয়ে করিডোর থেকেই নিচে তাকায় । অমনি আঁতকে ওঠে সে…! সিঁড়ির নিচে আব্বু কে পড়ে থাকতে দেখে গগন কাঁপিয়ে চিৎকার করে ওঠে…
” আব্বু….
হুড়মুড়িয়ে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামে সে । ওর চিৎকারে মুহুর্তেই ঘর থেকে বেরিয়ে আসেন সাবিনা বেগম । মিহিকে সিঁড়ির নিচে আজমাল হোসেনের নিথর দেহের সাথে বসে থাকতে দেখে ধড়ফড়িয়ে ওঠেন তিনি ।
সিঁড়ি বেয়ে পড়ার ফলে কপাল কেটেছে আজমাল হোসেনের । মিহি একহাতে আব্বুর কপাল চেপে ধরে অন্য হাতে কান্নারত অস্থির কন্ঠে ঝাঁকিয়ে ঝাঁকিয়ে ডাকছে আব্বু কে…
দিশা হারিয়ে ফেলেছে ও । সাঁড়া নেই আজমাল হোসেনের । নিঃশ্বাস চলছে থেমে থেমে ধীর গতিতে । সাবিনা বেগমও হিতাহিত জ্ঞান শূন্য হয়ে পড়েছেন । চোখ ভিজেছে দুজনেরই ।

সকাল সাড়ে সাতটা । হসপিটালে আব্বুর বেডের পাশে তার পায়ের কাছে নিশ্চল চোখে চেয়ে বসে আছে মিহি । পাশেই একটু চোখ বুঝেছেন সাবিনা বেগম । সারা রাত পেরোনোর পর সবে চোখ বুজেছেন তিনি । আপনা আপনি লেগে এসেছে চক্ষু দ্বয় ।
মিহির চোখ মুখ ফুলে একাকার । সারারাত এক মুহুর্তের জন্যও চোখের পাতা এক হয় নি তার । সে এখনো চেয়ে আছে আব্বুর পানে । আজমাল হোসেনের মুখে অক্সিজেন মাস্ক । এখনো অর্ধজ্ঞান হীন তিনি । পুরোপুরি হুস ফেরেনি এখনো । মিহির চক্ষু দ্বয় ভেজা । ফুলে আছে । এক ধ্যানে চেয়ে আছে সে । ওর ধ্যান ভাঙ্গে কারোর ডাকে……
” মিহি……
সহসা চোখ ফেরায় মিহি । রাফির দিকে দৃষ্টি পাত করতেই রাফি এগিয়ে এসে বলে…
” আবার কাঁদছো ?
হাতের উল্টো পিঠে চোখের পানি টুকু মুছে আহত ভেজা কন্ঠে মিহি বললো…

” না,, আর কাঁদবো না ।
” মাথা ব্যাথা কমলো ?
উপর নিচ মাথা নাড়ালো মিহি । তবে মাথা যন্ত্রণা কমে নি মোটেও, যন্ত্রণায় ফেটে যাচ্ছে মাথাটা । রাফি সরু চোখে পরখ করে অবস্থা দেখেই বুঝলো । পিছন ফিরে সাবিনা বেগম কে এক পলক দেখে চেয়ার টেনে বসলো মিহির সামনে । সে কিছু বলার আগেই মিহি চোখ তুলে নিচু স্বরে বলল……
” থ্যাঙ্ক ইউ…কাল যদি আপনি না আসতেন তাহলে হয়তো…
কি যে করতাম আমি ?
রাফি চেয়ে আছে । বললো না কিছু । মিহি ওর চাহনি দেখে অপ্রস্তুত হয়ে আবারো বললো……
” সরি…
” সরি কেনো ?
” কালকের জন্য ! আমি শুধু মজা করেই আপনাকে বলেছিলাম । রাগ করেছিলেন,, তাই না ?
” উঁহুম…
একটুও রাগ করি নি ! তোমার উপর রাগ আসে না আমার ।

” আপনাকে কাল মাঝরাতে ডিস্টার্ব করেছি, তাই না ? ‌আব্বুর ঐ অবস্থা দেখে মাথায় কিছু ছিল না , ওনাকেও (সাফি) অনেক বার ফোন করেছিলাম , পাই নি । তাই বাধ্য হয়ে আপনাকে ফোন করেছিলাম ।
” কে বললো আমি ডিস্টার্বড হয়েছি ?
বরং তুমি আমাকে জানিয়েছো, ভরসা করেছো আমার উপর, এটা ভালো লেগেছে আমার ।
” দুনিয়াতে নিজের আপন মানুষ থাকাটা খুব গুরুত্বপূর্ণ, জানেন । যাদের কেউ নেই, তারা বোঝে এর মর্মটা ।
নিরস ভেজা কন্ঠে কথাটা বলল মিহি । বলার সময় কাঁপল গলাটা । চোখ দুটো ভরে এসেছে আবারো । রাফি স্থির হয়ে চেয়ে আছে । চোখের পানি গড়ানোর আগে মিহি মুছে নিলো সেটা । আব্বুর পানে চাইলো একবার । তার মুখ পানে চেয়ে পুনরায় হাহাকার করে উঠলো বুকটা । কাল যদি কিছু একটা হয়ে যেতো । কি হতো তাহলে ? কি করতো মিহি ? আব্বুর অবস্থা দেখে হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছিল কাল । নিজেকে যথাসম্ভব সংযত করে সাফি কে কল করেছে অনেক বার । পায় নি । মাথা কাজ করছিল না সেই মূহূর্তে । মস্তিষ্ক অচল হয়ে পড়েছিল । সেই অচল মস্তিষ্ক শেষ মুহূর্তে জানান দেয় রাফির কথা । কোন কিছু না ভেবে সেই সময়েই রাফির নাম্বারে ফোন লাগায় মিহি । কান্নার ফলে বলতে পারছিল না কিছু । গলা দিয়ে কথা বের হচ্ছিল না । শুধু কাঁপা অস্পষ্ট স্বরে একটা কথাই বলেছিল……
‘ তাড়াতাড়ি আসুন প্লিজ,, আমার আব্বু……’ । আর কিছু বলতে পারে নি । গলার স্বর রুদ্ধ হয়ে এসেছিল । রাফিও অস্থির হয়ে ছুটে এসেছিল কিছু সময়ের ব্যবধানে । অজানা আশঙ্কায় হৃৎপিণ্ড খাঁচা ছাড়া হওয়ার অবস্থা হয়েছিল তার । বেগতিক ভাবে ছুটে এসেছিল সে । আজমাল হোসেনের অবস্থা দেখে পরমুহূর্তে একটুও অপেক্ষা না করে হসপিটালে এডমিট করা হয় তাকে ।

রাফি একবার তাকালো আজমাল হোসেনের দিকে । তার বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে সে জ্ঞাত । তবে মিহি আর সাবিনা বেগম কে কিছু জানায় নি সে । আজমাল হোসেনের থেকে চোখ ফিরিয়ে সে চাইলো মিহির মলিন মুখের পানে । চোখ ফুলে গেছে কাঁদতে কাঁদতে । রাফি শান্তনা দিয়ে স্বাভাবিক কন্ঠে বলল……
” আঙ্কেল এখন একদম ঠিক আছেন । আন্টি ও ঘুমিয়েছেন । তুমি নিচে চলো, খেয়ে আসবে কিছু ।
মিহি নাক টেনে ছোট করে উত্তর করলো…
” ক্ষিদে নেই আমার, খাবো না ।
” মিহি,, জেদ করো না । চলো, একটু কিছু খেয়ে আসবে ।
বলতে বলতে উঠে দাঁড়ালো রাফি । মিহিও নামার জন্য উদ্যত হতেই পাশ থেকে বেজে উঠল ফোনটা । মিহির পাশে বেডের উপরই ছিল সেটা ফোনের শব্দে রাফি, মিহি একই সাথে তাকালো সেদিকে । তৎক্ষণাৎ কপাল কুঁচকে আসলো রাফির । চোয়াল শক্ত হলো মুহূর্তেই । মিহিও সহসা তাকালো রাফির দিকে । রাফি ফোনের দিকেই তাকিয়ে আছে । সাফি ফোন করছে, স্ক্রিনে জ্বল জ্বল করছে তার নামে সেভ করা নাম্বারটা । রাফির ক্ষিপ্ত চোখ সরিয়ে পা বাড়ালো । সহসা ডাকলো মিহি…

এক দেখায় পর্ব ২৭ (২)

” কোথায় যাচ্ছেন ?
” বাইরে , আপনি কথা শেষ করে আসুন ।
” ওনার সাথে আমার কোনো সম্পর্ক নেই ।
হঠাৎ মিহির এমন কথার মানে বুঝার চেষ্টা করলো না রাফি । মিহি নিজেও বুঝলো না হঠাৎ সে কেনো এই কথাটা বলতে গেলো । রাফি থমকে এক পলক পিছন ফিরে তাকালো, চেহারার কোনো পরিবর্তন আসে নি । সে আবারো বড় বড় পা ফেলে দ্রুত কেবিন ছেড়ে বাইরে বের হলো…

এক দেখায় পর্ব ২৯