Home এক দেখায় এক দেখায় পর্ব ৩২

এক দেখায় পর্ব ৩২

এক দেখায় পর্ব ৩২
সুরভী আক্তার

রাবেয়া চৌধুরী কে নিচে নিয়ে এসেছে মিহি । একসাথে খেয়ে নিলো পাঁচ জনে । রাশেদ রায়হান চৌধুরী আর হেনা বেগম আজই ফিরবেন । তাদের ফিরতে ফিরতে বিকেল গড়াবে । দুপুরের দিকে মিহি আর রুহি কে নিয়ে একেবারে বেরিয়েছে রাফি ‌। বেরোনোর আগে রাবেয়া চৌধুরী কে ঘুমের ঔষধ দিয়ে ঘুম পাড়িয়ে বেরিয়েছিলো । টিউশন শেষে ঐ পথে একেবারে বাড়ি ফিরেছে মিহি । রিকশা নিয়ে ফিরেছে । কারোর প্রয়োজন হয় নি আজ । এসেছে থেকে ঘর বন্দি । মনটা খারাপ অজানা কারনে । দরজা চাপিয়ে পড়তে বসেছে সন্ধ্যার দিকে । আজমাল হোসেন বাইরে থেকে গলা খাঁকারি দিয়ে মেয়ের ঘরে ঢুকলেন । আগামী সপ্তাহের প্রথম দিনে হাতিরঝিল এর উদ্দেশ্যে রওনা হবেন তারা । মিহি কে এখনো জানানো হয় নি । জানানো টা প্রয়োজন । মেয়েকে একা রেখে যেতে মন সায় দিচ্ছে না তার । তবুও তিনি মিহি কে সাথে নিয়ে যেতে পারবেন না ।
আব্বুর উপস্থিতি টের পেয়ে নড়েচড়ে বসল মিহি । বই থেকে চোখ সরিয়ে আব্বুর দিকে তাকালো । মুচকি হাসলো ‌একটু । আজমাল হোসেন ভেতরে বসলেন । মিহি চেয়ার ছেড়ে উঠে আব্বুর কাছে বসলো । আদুরে কন্ঠে বলল….

” ভালো লাগছে না আব্বু , অনেক দিন কোথাও যাওয়া হয় না । চলো কোথাও থেকে ঘুরে আসি । তুমিও তো সারাদিন বাড়িতে বসে বসে বোর হও । কোথাও নিয়ে চলো আমাদের….
” কোথায় যাবে আম্মু ?
” তুমি যেখানে নিয়ে যাবে সেখানে ! তুমি যেখানে যাবে সেখানেই যাবো আমরা ! কোথায় নিয়ে যাবে বলো…
আজমাল হোসেন নিরস হাসলেন । মোলায়েম কন্ঠে বললেন…
” আমি তো অনেক দূরে যাবো । সেখানে এতো তাড়াতাড়ি নিয়ে যাবো না তোমাদের । তোমাদের যাওয়ার সময় হয় নি এখনো । তুমি আর তোমার আম্মু থাকবে আমি কিন্তু চলে যাবো ।
মিহি অবুঝের মতো শুধায়…
” কোথায় যাবে আব্বু ?
আজমাল হোসেন কথা পাল্টালেন….

” কদিন পর এক জায়গায় যাবো । তোমার আম্মু ও যাবে আমার সাথে । তুমি যাবে না ! কোথায় যাবো আমরা এটাও জিজ্ঞেস করবে না । আব্বু যা বলছে তাই শোনো , রুহিকে নিয়ে বাড়িতে থাকবে তুমি । আমরা শুধু দুদিনের জন্য যাবো । আবার ফিরে আসবো তো ।
মিহি আঁতকে উঠলো । আব্বু আম্মু কোথাও যাবে , আর ওকে নিয়ে যাবে না এটা হতেই পারে না । আর কোথায় বা যাবে আব্বু আম্মু ? কোথাও যাওয়ার জায়গা নেই তো কারোর । কোথায় যাবে , তাও আবার দুদিনের জন্য । মিহি উদ্বিগ্ন স্বরে শুধালো….
” কোথায় যাবে তোমরা ? আমাকে নিয়ে যাবে না কেনো ? আমিও যাবো !
” বললাম তো মা , কোথায় যাবো এটা জিজ্ঞেস করবে না । ফিরে এসে তোমাকে নিয়ে ঘুরতে যাবো । তখন যেও আমাদের সাথে । এবার না । আমি রুহিকে বলবো , ও থাকবে তোমার সাথে । কোনো সমস্যা হবে না । সাফি তো আছেই তোমার খেয়াল রাখার জন্য ।
মিহি অবুঝের মতো চেয়ে আছে । আব্বুর বলা কথা গুলো মাথার উপর দিয়ে যাচ্ছে । কোথায় বা যাবে আব্বু আম্মু ? আর কোথায় যাবে এটা বললেই বা কি হবে ? আর মিহি কেই বা সাথে নিয়ে যাচ্ছে না কেনো ? প্রশ্ন ঘুরছে মাথায় । মিহির ভাবনার মাঝে আজমাল হোসেন বললেন….

” কি হলো মা ? আর কিছু জিজ্ঞেস করবে ?
মিহি আব্বুর দ্বিমত বুঝে কথা বাড়ালো না , দুদিকে মাথা ঝাঁকালো । আজমাল হোসেন এক চিলতে হাসলেন । ইদানিং মিহির লক্ষ্য মতো তার শরীরের অবস্থা ভালো । আগের তুলনায় শ্বাস কষ্ট কমেছে । কাঁশিও হয় না তেমন । তবে আজকাল চুপচাপ হয়ে গেছেন আজমাল হোসেন । কথা বলেন কম । কেমন যেন গুটিয়ে থাকেন ঝিঁম মেরে । শরীর সুস্থ হলেও আগের তুলনায় শুকিয়েছে অনেক । সবসময় ঘরে বসে থাকতে থাকতে চেহারায় ফ্যাকাসে ভাব দেখা দিচ্ছে । মিহি অনেক দিন পর এক ধ্যানে লক্ষ্য করলো , আব্বুর চুল গুলো অনেকটাই পেকেছে । পাক ধরেছে দাঁড়ি’তেও । আগে কাঁচা পাকা মিশেলে চুল ছিলো । বেশ লাগতো আব্বু কে এতে । মিহি অনেক সময় নীরবে তাকিয়ে থাকতো আব্বুর দিকে । আব্বু যখন বই পড়ে,মিহি তখন এক ধ্যানে তাকিয়ে থাকে । আব্বু কে দেখার মাঝেও অদ্ভুত তৃপ্তি জাগে । হাজারো মুহূর্ত পেরিয়ে গেলেও আব্বু কে দেখার তৃপ্তি মেটে না । তাকিয়েই থাকতে ইচ্ছে করে শুধু । আব্বু যখন হাসে তখন অদ্ভুত প্রশান্তি জাগে । আর সেই হাসির কারন টা যদি মিহি হয়, তাহলে তো কোনো কথাই নেই । প্রশান্তিতে ছেয়ে যায় মন ।
মিহি আব্বুর দিকে অনেকটা সময় গভীর দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকলো । আসলেই বয়স বাড়ছে আব্বুর । মিহি আঁতকে ওঠে । বুকটা কেঁপে ওঠে কেমন যেন । এতটা ভয় লাগে কেনো ? মিহি আচমকা আব্বুর এক বাহু শক্ত করে জড়িয়ে ধরে । মাথা রাখে আব্বুর কাঁধে । আবদার করে শীতল কন্ঠে…..

” কোথায় যাবে জিজ্ঞেস করবো না । কিন্তু কথা দাও ফিরে এসে ঘুরতে নিয়ে যাবে আমায় । ঠিক ছোট বেলার মতো । শুনলাম মেলা বসেছে কোথাও, মেলায় যাবো কিন্তু ! তুমি, আমি আর আম্মু । ঠিক আগের মতো । নিয়ে যাবে বলো ?
আজমাল হোসেন প্রফুল্ল হাসলেন । মেয়ের মাথায় চুমু খেলেন । শীতল কন্ঠে বললেন…
” আচ্ছা মা , নিয়ে যাবো । আগে ফিরে আসি তারপর । তুমি আপাতত লিস্ট করে রাখো, কি কি কিনবে মেলায় ! সব কিনে দেবো তোমায় । কোনো কিছুর অভাব রাখবো না ।
মিহি মুচকি হাসলো । চোখ বুজলো আব্বুর কাঁধে মাথা রেখে । আজমাল হোসেন চেয়ে আছেন কোনো এক দিকে । তার চাহনি কেমন নিস্তেজ । কথার ধরনটাও ক্ষীণ, শান্ত ।
সময় বহমান । নিজ ধারায় বয়ে চলে তা । কারোর জন্যই অপেক্ষা করে থাকে না । মিহি পরদিন টিউশনে যায় নি । আজও যেতে চায় নি । ইচ্ছে ছিলো না যাওয়ার । আজ আবার রাফির ফ্লাইট আছে । দীর্ঘ এক মাসের জন্য দেশ ছাড়বে সে । ফ্লাইট সাড়ে বারোটায় । মিহি জানে না । আজ টিউশন ছিলো আট’টায় ।

সকালের দিকে রুহি গাড়ি নিয়ে ওকে ড্রপ করে নিয়ে এসেছে । অনিচ্ছা সত্ত্বেও এসেছে মিহি । আটটা থেকে দশটা পর্যন্ত দুই ঘণ্টা পড়িয়েছেন ইমরান । দশটার দিকে ক্লাস শেষে বেরিয়েছে । মিহি বেশি কথা বলে নি আজ । কেমন নেতিয়ে আছে সে । চোখে মুখে উচ্ছাস নেই বরাবরের মতো । রুহি এটা ওটা বলছে , মিহি শুনেই যাচ্ছে শুধু । ক্লাস থেকে বেরিয়ে আনমনে হেঁটে দুজনে এসে থামলো অফিসের নিচে । রুহি বললো, ড্রাইভার এখন পৌঁছে দেবে ওদের । দু’জনেই বসলো একটু । এমনিতেও মিহির দাঁড়িয়ে থাকতে ইচ্ছে করছে না । পা দুটো কেমন টনটন করছে । মাথা নুইয়ে বসে আছে সে । অজানা কারণে মনটা ভার হয়ে আছে সেই সকাল থেকে । দুই থেকে তিন মিনিটের মাথায় দুজন দাঁড়ালো সামনে । উপস্থিতি টের পেয়ে মাথা তুললো মিহি । রাফি আর শান্ত দু’জনেই দাঁড়িয়ে । পড়নে ফর্মাল পোশাক । সাদা শার্ট ইন করে পড়া , কালো ব্লেজার উপরে । ব্লেজারের রঙা প্যান্ট । চুল গুলো সুন্দর করে গুছিয়ে সেঁটে রাখা । মিহি তাকিয়ে রইল কয়েক পলক । হৃৎপিণ্ড থমকে গেছে মুহূর্তেই । রাফি আর মিহি দু’জনের চোখ একে অপরের দিকে স্থির । ওদের স্থির দৃষ্টিতে ব্যাঘাত ঘটালো শান্ত । গলা খাঁকারি দিয়ে উঠলো সে । তৎক্ষণাৎ দৃষ্টি সরালো দু’জনে । মিহি মাথা নুইয়ে ফেললো আবারো ‌। শান্ত ফিচেল হেসে চোখ মারল রুহিকে । ইশারায় বোঝালো কিছু । অতঃপর পুনরায় গলা খাঁকারি দিয়ে বললো….

” ভালো থেকো পাখি , এই একটা মাস যত্ন নিও নিজের । তুমি নিজের ঠিকঠাক যত্ন নিলে অন্যজন কিন্তু তার আশাতেই বাঁচবে । সাথে সাথে আমার জান টাকে ও একটু দেখো । আজ থেকে এই একটা মাস নিজেরা একে অপরের খেয়াল রাখবে কিন্তু ।
মিহি চোখ তুলে তাকালো । মুচকি হাসার চেষ্টা করলো । ও ভেবেছিল হয়তো চলে গেছে এনারা । কিন্তু এখনো যায় নি জানা ছিল না ।
মিহি আলতো স্বরে বলল…
” জ্বি ভাইয়া । আপনারাও খেয়াল রাখবেন নিজেদের ।
” চিন্তা করো না, আমি নিজের সাথে সাথে রাফির ও খেয়াল রাখবো ।
বলেই রাফির দিকে তাকিয়ে ঠোঁট বাঁকিয়ে হাসলো । রুহি গদগদ হয়ে ভাইয়া কে জড়িয়ে বললো….
” আই মিস ইউ ভাইয়া , অনেক বেশি মিস করবো তোমায় । প্লিজ তাড়াতাড়ি ফিরে এসো ।
কথার মাঝে টিটকারী মারলো শান্ত….
” এহহ,, কেউ কি শুধু ভাইয়া কেই মিস করবে ? আর আমি ? আমি কি বানের জলে ভেসে আসলাম নাকি ? কেউ তো পাত্তাই দিচ্ছে না আমায় ।
রুহি মিষ্টি হাসলো । ভনিতা হীন বললো….

” বানের জলে ভেসে আসলেও আপনাকেও অনেক বেশি মিস করবো ।
বলেই লাজুক হাসলো । শান্ত ও ঠোঁট চেপে হাসলো । রাফির কানের কাছে মুখ এনে ফিসফিস করে বলল…
” তোর বোনকে জড়িয়ে ধরতাম একটু , তোর সামনেই ধরবো , নাকি আড়ালে যাবো ? বল ?
রাফি কপাল কুঁচকে শক্ত চোয়ালে তাকালো । এতক্ষণ ধরে একটা কথাও বলে নি ও । এখনো বললো না কিছু । শান্ত ওর দৃষ্টি দেখে নিজেই আবার ফিসফিস করে সাফাই গাইলো….
” না মানে দেখ , তোর বোনকে তো আর আমি বোন হিসেবে জড়িয়ে ধরবো না ‌। জড়িয়ে ধরবো বউ হিসেবে । তুই তো আবার আমার সম্পর্কে বড় সম্বন্ধি হোস । এই টুকু তো লজ্জা আছে আমার । আমি আবার লাজুক ছেলে , তোর সামনে তোর বোনকে জড়িয়ে ধরলে লজ্জা লাগবে না আমার ? তোর বোন ও তো লজ্জা পাবে , এই ভেবে জিজ্ঞেস করলাম আরকি !
রাফির চাহনি আরো সরু হলো । ভ্রু যুগলের মাঝখানে ভাঁজ পড়েছে । শান্ত হেসে ফেললো এ পর্যায়ে । রাফির কাঁধে হাত রেখে আবারো ফিসফিস করলো….

” এভাবে তাকাস না । আরো বেশি লজ্জা পাচ্ছি তো । আচ্ছা আমি না হয় তোর বোনকে নিয়ে ওদিক টায় যাচ্ছি । তুইও বরং তোর কাজ সেরে নে । হাতে কিন্তু বেশি সময় নেই ।
এবার রুহির দিকে ফিরে গলা ছাড়লো…
” জান , একটু এসো তো আমার সাথে । ইম্পর্ট্যান্ট একটা কাজ আছে । তাড়াতাড়ি এসো…
বলেই রাফি আর মিহি কে দেখিয়ে চোখে ইশারা করলো । রুহি বুঝতে পেরে দুজন কে একবার পরখ করে নিয়ে বললো…

” হুম… যাচ্ছি । চলুন…
পাখি তুই এখানে থাক, আমি আসছি এক্ষুনি ।
বলেই এক মুহুর্ত অপেক্ষা না করে শান্তর পিছু পিছু হাঁটা লাগালো । মিহি কিছু বোঝার আগেই দু’জনে চোখের আড়াল হলো । ওদের থেকে চোখ সরালো মিহি । সামনে তাকাতেই রাফির সাথে চোখাচোখি হতেই মূহূর্তেই চোখ নামিয়ে দৃষ্টি সরিয়ে নিলো । থতমত খেয়ে অপ্রস্তুত একটা অবস্থায় পড়ে গেল সে । ঘন পলক ফেললো এদিক ওদিক চেয়ে । রাফি শ্বাস ফেললো ওর অবস্থা দেখে । পাশে বসলো । মিহি কে ইশারা করে বললো…
” বসো !
তৎক্ষণাৎ আবারো চাইলো মিহি । বুকটা কেঁপে উঠলো বোধহয় ।
সময় নিয়ে দ্বিধা কাটিয়ে দুরত্ব রেখে বসলো । হাত পা শিরশির করছে । কম্পন অনুভূত হচ্ছে স্পষ্ট । হাত কচলাচ্ছে মিহি ।
রাফি আর শান্ত বাসা থেকে বেরিয়েছে আটটার দিকে । এখন দশটা পেরিয়েছে । ফ্লাইট সাড়ে বারোটায় । এয়ার পোর্ট পৌঁছাতে এখান থেকে কুড়ি মিনিটের মতো লাগবে । তাই আর চিন্তা নেই । হাতে সময় আছে অনেক । রাফি মিহিকে গভীর দৃষ্টিতে চেয়ে বোঝার চেষ্টা করলো । শান্ত কন্ঠে অদ্ভুত ভাবে বললো…

” একবার হাত ধরি তোমার ?
কথাটা কর্ণপাত হতেই সর্বাঙ্গে শিহরণ খেলে গেল মিহির । অস্বস্তি বাড়লো । নিজের কানকে বিশ্বাস হলো না । ভুল কিছু শুনলো বোধহয় । মিহি নির্বোধের ন্যায় সন্দিহান কাঁপা গলায় বুলি ফুটালো…
” হ্যাঁ ?
রাফি চেয়ে থেকেই ফের ভনিতা হীন সোজাসাপ্টা বললো…
” তোমাকে ছুঁতে পারি ? হাতটা ধরি একবার ? অনুমতি দেবে ?
মিহির চক্ষু চড়কগাছ । বড় বড় করে চাইলো অক্ষি যুগল‌‌‌ । পাথরের ন্যায় স্থির হয়ে তাকিয়ে আছে । নড়ছে না একটুও । থম মেরে বসে আছে । ওকে আরো বেশি অবাক করে অনুমতির তোয়াক্কা না করে একটু ঝুঁকে অবিলম্বে ওর হাত টা নিজের হাতের মুঠোয় আবদ্ধ করল রাফি । আকস্মিক স্পর্শে মিহি পাথরের ন্যায় জমে গেছে মুহূর্তেই । গলায় আটকে জোড়ালো হচ্ছে নিঃশ্বাস । দম বন্ধ হয়ে আসতেই মিহি কোনো রকমে শ্বাস টানলো ‌।
গলা শুকিয়ে কাঠ । শুল্ক ঢোক গিলে ভেজানোর চেষ্টা করলো গলা । রাফির হাতের মুঠোয় আবদ্ধ হাত দুটো কাঁপছে ক্রমান্বয়ে । মিহি হাত ছাড়ানোর চেষ্টা করলো । পারলো না । রাফি চোখে চোখ রেখে স্বাভাবিক কন্ঠে বলল…

” আমার স্পর্শে খারাপ লাগছে ?
মিহি শিরশিরে অনুভূতি সমেত কোনো কিছু না বুঝেই দুদিকে মাথা নাড়ালো । রাফি আলতো হাসলো । মিহির হাতের আঙ্গুল দ্বয়ে আলতো স্লাইড করলো । শিহরণে দম খিচে চোখ বন্ধ করলো মিহি । রাফি হাতের দিক থেকে চোখ সরিয়ে মিহির বন্ধ চোখের কম্পিত পাপড়ির দিকে তাকালো । পরখ করে নিলো সম্পুর্ন মুখশ্রী । তির তির করে কম্পিত গোলাপি অধরের দিকে চোখ যেতেই তৎক্ষণাৎ চোখ সরালো । নিজের চোখকে সংযত করে ঠান্ডা কন্ঠে বলল…

” স্ব-ইচ্ছায় আমার ছোঁয়া পাওয়া একমাত্র মেয়ে তুমি । যাকে আমি নিজে থেকে স্পর্শ করেছি । এই জীবনে আর তুমি ব্যতীত অন্য কোন মেয়েকে স্পর্শ করতে চাই না । সারাজীবনের জন্য শুধু তোমাকেই ছোঁয়ার বৈধতা চাই । মনে রেখো, তোমাকে ছোঁয়ার বৈধতা যেন শুধু আমারই হয় । এই এক মাস পর নতুন কিছু হতে চলেছে তোমার সাথে । নিজেকে প্রস্তুত করাও । মাত্র ত্রিশ দিন আছে, ত্রিশ দিন মানে ২৫,৯২,০০০ সেকেন্ড । তার পর অনেক কিছুই পাল্টে যাবে । বুঝেছো কি বললাম ?
মিহি ওষ্ঠ যুগল কিঞ্চিত ফাঁক হয়েছে । চোখ খুলে পলক বিহিন তাকিয়ে আছে সে । রাফি একটা ভ্রু উঁচু করতেই আবারো নির্বোধের ন্যায় দুদিকে মাথা ঝাঁকালো মিহি । রাফি ঠোঁটের কোণা কামড়ে হাসি আটকে বললো…
” বুঝতে হবে না । সাবধানে থাকবে ! বাসা থেকে একা বের হবে না । রুহি প্রতিদিন টিউশনের জন্য ড্রপ করে নেবে তোমাকে । আবার সময় মতো বাড়িতেও পৌঁছে দেবে । এবার বুঝেছো !
মিহির রুদ্ধ গলায় ক্ষীন আওয়াজ আসলো…

” হুম !
রাফি হাতের বাঁধন আলগা করে শীতল কন্ঠে বলল…
” ফোনটা দেখি তোমার !
মিহি হাত আলগা পেতেই তৎক্ষণাৎ হাত সরিয়ে নিলো । পিছিয়ে গিয়ে চোখ বন্ধ করে শ্বাস টানলো । জিভ দিয়ে অধর ভিজিয়ে পুনরায় তাকালো । রাফির কথা মনে আসতেই বললো…
” ফ.. ফোন কি করবেন ?
” দাও !
মিহি কথা বাড়ালো না । কাঁপা হাতে বাধ্যের ন্যায় ব্যাগ থেকে ফোনটা বের করে রাফির দিকে এগিয়ে দিলো । রাফি ফোন হাতে পেতেই কললিস্টে ঢুকলো । মিহি গলা বাড়িয়ে উঁকি দিচ্ছে দেখার জন্য ।
রাফি কিপ্যাডে নিজের নাম্বারের কয়েকটা সংখ্যা চাপতেই ওর নাম্বার টা ভেসে উঠলো সামনে । স্ক্রিনে নিজের নাম্বার টা যে নামে সেভ করা সেই নামটা নজরে আসতেই তৎক্ষণাৎ মিহির দিকে তাকালো রাফি । মুহূর্তেই চোখ সরিয়ে মুখে হাত দিয়ে শুকনো কেশে উঠলো । মিহি কিছু না বুঝে ড্যাপ ড্যাপ করে তাকিয়ে আছে । রাফি কাশি থামিয়ে ঠোঁট ভেজালো জিভে । ফোন লাগালো ওর নাম্বারে । মিহি কপাল কুঁচকে জিজ্ঞেস করল…

” কাকে ফোন করছেন ?
রাফির ভাবেলাশহীন জবাব…
” আপনার ‘জামাই জান’ কে !
মিহির কপালে আরো কয়েক স্তর ভাঁজ পড়লো
। বোঝার চেষ্টা করলো কথাটার অর্থ । ওর মস্তিষ্ক সবটা বোঝার আগেই রাফির পকেটে থাকা ফোনটা বেজে উঠলো বিকট শব্দে । রাফি পকেট থেকে ফোনটা বের করে হাতে নিলো । এক পলক তাকিয়ে বাঁকা হাসলো । অতঃপর মিহির সামনে ধরলো ওর ফোন খানা । মিহি কপাল কুঁচকে অবিলম্বে তাকালো নিজের ফোনের দিকে ।
তৎক্ষণাৎ ভিমড়ি খেয়ে নিজেও কেশে উঠলো দুবার । মুখ দিয়ে উঁচু স্বরে বেরিয়ে আসলো আপনা আপনি …
” আসতাগফিরুল্লাহ…

বলেই রাফির দিকে তাকালো । মিহির অবস্থা দেখে ঠোঁটের কোণে ফিক করে হাসি ফুটলো রাফির । তবে তা মিহির চোখে পড়লো না । দুজনের চোখে চোখ মিলতেই চক্ষু লজ্জায় লুটিয়ে পড়লো মিহি । এটা নিশ্চয়ই রুহির কাজ । সেই দিনই তো রুহিই রাফির নাম্বার টা এই নামে সেভ করেছিল । সেদিন আব্বুর অসুস্থতায় ফোন করার সময় শূন্য মস্তিষ্কে উত্তেজিত হওয়ায় সেভাবে লক্ষ্য করে নি মিহি । পরক্ষনেও আর লক্ষ্য করে দেখার প্রয়োজন হয় নি । রাফির নাম্বার টা মিহির ফোনে ‘জামাই জান’ দিয়ে সুন্দর করে সেভ করে দিয়েছে রুহি । সাথে আবার একটা রেড হার্ট ইমুজি ও আছে । মিহি চোখ নামিয়ে জিভে কামড় বসালো । চোখ তুলে তাকানো দায় হয়ে পড়েছে । তবুও চোখ তুলে দাঁত কেলিয়ে বোকার মতো হাসার চেষ্টা করলো । সাফাই গেয়ে তৎক্ষণাৎ বললো…
” বিশ্বাস করুন , আমি সেভ করি নি । এটা রুহির কাজ । আমি তো জানতাম ও না আপনার নাম্বার আমার ফোনে সেভ করা আছে ! সত্যি বলছি , আমি সেভ করি নি ।
রাফি খানিক গলা ভারী করে বললো…

” সমস্যা নেই । সেভ আছে ভালোই হয়েছে । দেশে কাজে আসবে এটা । এখন তো বাইরে যাচ্ছি । একটা কথা বলে দিচ্ছি , এই একটা মাস নিয়ম করে প্রতিদিন ঠিক সন্ধ্যা ছয়টায় একটা করে কল আসবে আপনার ফোনে । কলটা যেন মিস না হয় । ওকে ? গট ইট ?
মিহি চমকাচ্ছে একের পর এক । ডাগর চোখ দুটো অত্যাধিক বড় করে তাকিয়ে আছে সেই তখন থেকে । এসব কি হচ্ছে আজ ? রাফি এমন করছে কেন ? আর এভাবেই বা কথা বলছে কেনো ? বুঝেও অবুঝের মতো ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে আছে মিহি । বক্ষ স্পন্দন জোরালো সেই শুরু থেকে , যা এখন স্থির শান্ত হয়েছে । মিহি কে এভাবে তাকিয়ে থাকতে দেখে রাফি শুধালো…

” কি হয়েছে ? কি দেখছেন ?
” কিছু না । কি হয়েছে আপনার ? আপনি এভাবে কথা বলেছেন কেনো ?
” কি হয়েছে এখন জানতে হবে না । ফিরে আসি তারপর জানাবো । লেট হয়ে যাচ্ছি , সাবধানে থাকবেন কিন্তু । আসি…
মিহির বক্ষ স্থল ধক্ করে উঠলো । কিছু বলার আগেই শান্ত আর রুহি দাঁড়ালো সামনে এসে । শান্ত পরপর দুবার ভ্রু নাচিয়ে ঠোঁট চেপে বললো…
” কি হলো বড় শালা বাবু ? আমার কাজ তো শেষ । তোর হলো ? দেরি হয়ে যাচ্ছে আমাদের , যেতে পারি এখন ?
রাফির কোনো দিকে তাকালো না আর । উঠে দাঁড়িয়ে গম্ভীর স্বরে জবাব দিলো…
” চল..
অতঃপর বোনকে জড়িয়ে বললো…

” সাবধানে থাকবি । টিউশন ব্যতীত বাড়ি থেকে বের হওয়ার কোনো খবর যেন না পাই । মনে থাকবে ?
” খুব মনে থাকবে ভাইয়া ! তাড়াতাড়ি ফিরে এসো…
রুহিকে ছেড়ে পা বাড়ালো রাফি । পিছন ফিরে মিহির পানে তাকালো না আর । দু’কদম এগোতেই হাতে আলতো টান পড়ায় আপনা আপনি থেমে গেল । মিহির কাছাকাছি বসার ফলে ওর সিল্কি ওরনার সুতোর এক অংশে বেঁধে আটকে গেছে রাফির রোলেক্স ঘড়ির সাথে । রাফি বাধা পেয়ে কয়েক পলক তাকিয়ে থাকলো স্থির দৃষ্টিতে । মিহি সুতোর বাঁধন আলগা করে ছিঁড়ে দিলো । জুবায়ের চৌধুরীর কন্ঠে নড়েচড়ে উঠলো চারজনে । কালই নারায়ণগঞ্জ থেকে ফিরেছেন তিনি । রাফি আর শান্ত কে এয়ার পোর্টে পৌঁছে দেওয়ার কথা ছিল তার । বাড়ি থেকে বের হতে হতে সময় লেগে গেছে তার । তিনি গেট থেকে হাঁপানো স্বরে উত্তেজিত কন্ঠে বললেন…
” উফ, দেরি হয়ে গেছে তো । আমার আসতে দেরি হয়ে গেল । চল চল তোদের তাড়াতাড়ি এয়ার পোর্টে ছেড়ে আসি । দেরি হয়ে যাবে
নয়তো ।
রুহি আর মিহি কে দেখে তিনি আবারও বললেন…

” মামনি, তোমরা এখানে ? ড্রাইভার নেই ? গাড়িতে গিয়ে বসো , ড্রাইভার পৌঁছে দেবে তোমাদের । কেমন ? আমরা আসি , দেরি হয়ে যাচ্ছে ।
বলেই তাড়া লাগালেন তিনি ।
কয়েক মুহূর্তের মাথায় অপেক্ষা না করে বেরিয়ে পড়লেন তারা । মিহি রুহি দাঁড়িয়ে দেখলো তাদের অদূরে চলে যাওয়া গাড়িটার দিকে । এদিকে গাড়ির দিকে মনযোগ নেই মিহির । কেমন ছটফট অনুভূত হচ্ছে ওর । বুকের ভেতর টা ছটফট করছে অজ্ঞাত কারণে । স্থির থাকতে পারছে না মিহি । হাত পা ঠান্ডা হয়ে আসছে মনে হচ্ছে । দড়দড় করে ঘাম জমছে শরীরে । মিহি লম্বা শ্বাস টানলো । রুহি তাকিয়ে ওর অবস্থা বেগতিক দেখে ব্যাস্ত স্বরে বলল…
” কি হয়েছে পাখি , ঘামছিস কেনো এভাবে ? শরীর খারাপ লাগছে ? ঠিক আছিস তুই ?
মিহি ঘন ঘন শ্বাস টানছে । শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে । হাঁফ ফুরিয়ে আসছে কেমন । মিহি স্বাভাবিক হওয়ার চেষ্টা করে বললো…

” আমি বাড়ি যাবো !
ভালো লাগছে না আমার !
রুহি মজার ছলে কিছু বলতে গিয়েও বললো না । কথা আটকালো পেটেই ।
গাড়িতে উঠে এসির মধ্যেও ঘাম কমছে না মিহির । এদিকে শ্বাস প্রশ্বাস বেগতিক । মিহির স্পষ্ট অনুভব হচ্ছে, শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে ওর । এমনটা আগে হয় নি কখনো । মিহি লম্বা লম্বা শ্বাস টানলো বুক ভরে । রুহির কাঁধে মাথা এলিয়ে চোখ বুজলো ।
বাড়ির সামনে গাড়ি থামতেই নেমে পড়লো । রুহি ও নামলো ওর সাথে । মিহির অবস্থা দেখে ওর হাত ধরে প্রধান গেট পেরিয়ে এগোলো সদর দরজা পর্যন্ত । দরজার বাইরে গুটি কয়েক মানুষের ভিড় । মিহি কপাল কুঁচকে তাকালো । ওদের বাড়ির বাইরে এমন মানুষ কেনো ? অন্যসময় তো কেউ আসে না । একেই মিহির শ্বাস জোরালো তার উপর বাড়ির বাইরে মানুষ দেখে অজানা ভয়ে আরো বেশি অস্থির হয়ে পড়লো সে ।

রুহি কপাল কুঁচকে হাত চেপে ধরে আছে ওর । মিহি মানুষের ভিড় ঠেলে বাড়িতে ঢুকলো । ড্রইং রুমেও বেশ কয়েকজন উপস্থিত । মিহি চঞ্চল চোখ ঘুরিয়ে এদিক ওদিক তাকালো । রুহি একবার প্রশ্ন করলো ” কি হয়েছে পাখি ? তোদের বাড়িতে এতো গুলো মানুষ কেন ? চিনিস এদের ? ‘ মিহি আলতো ঘাড় নাড়ালো শুধু । দরজা বরাবর সামনের সোফা টায় উল্টো ফিরে বসে আছেন সাবিনা বেগম । মিহি রুহির হাত ছাড়িয়ে এক প্রকার ছুটে গেলো আম্মুর কাছে । সামনে দাঁড়াতেই আঁতকে উঠলো । সাবিনা বেগম স্থির পাথরের মূর্তির ন্যায় বসে আছেন । চুলের খোঁপা টা খানিক এলোমেলো । চোখের নিচে পানি বোধহয় একটু । পাশেই ওনাকে ধরে বসে আছেন সুফিয়া আন্টি । বাড়ি ওয়ালার স্ত্রী তিনি । তার মুখটাও শুকনো । মিহি কে দেখে মলিন হলো আরো । মিহি আম্মু কে দেখে মতি গতি হারিয়ে হুড়মুড়িয়ে বসলো পায়ের কাছে । আম্মু কে আলতো ঝাঁকিয়ে জড়ানো গলায় ডাকলো…

” আম্মু ! কি হয়েছে ? বাড়িতে এতো মানুষ কেনো আম্মু ?
সাবিনা বেগমের দৃষ্টি মেঝেতে । ঝাঁকানোর পর ও একটু ও নড়লেন না তিনি । চোখের দৃষ্টি ও কাপলো না । স্থির পাথরের ন্যায় বসে রইলেন । মিহির বক্ষ স্থল আঁতকে উঠলো পুনরায় । এবার সুফিয়া আন্টির দিকে চাইলো মিহি । হাসার চেষ্টা করে বললো…
” আন্টি , কি হয়েছে আম্মুর ? কথা বলছে না কেনো ? আর বাড়িতে এতো মানুষ কেনো ? কারা ওনারা ? কি করছে আমাদের বাড়িতে ?
সুফিয়া আন্টি ও উত্তর করলো না । ঠোঁট চেপে টলমল চোখে তাকালেন মিহির দিকে । মিহি শুল্ক ঢোক গিললো । আবারো আম্মু কে ঝাঁকালো…এবার গলা বাড়িয়ে বললো…
” এই আম্মু , কি হয়েছে বলবে তো । কেউ কিছু বলছো না কেনো ? কি হয়েছে তোমার ? বাড়িতে এতো মানুষ কেনো ?
আব্বু , আব্বু কোথায় আমার ? আব্বু,, আব্বু…
উঠে দাঁড়িয়ে পরপর কয়েক বার গলা উঁচিয়ে ডাকলো আব্বুকে । আশেপাশের সবাই চেয়ে আছে মিহির পানে । রুহি থামালো মিহি কে । দুই বাহু ধরে বললো…

” ঘরে আছেন হয়তো আঙ্কেল । ঘরে গিয়ে দেখ…
মিহির মস্তিষ্ক ফাঁকা লাগছে । শূন্য মস্তিষ্কটাই স্পষ্ট জানান দিচ্ছে , কিছু তো হয়েছে ! কেউ কিছু বলছে না কেনো মিহি কে ? একেই শরীর টা অবস লাগছে । মিহি কে আব্বু ছাড়া কেউ কিছু বলবে না । মিহি আব্বু কে ডাকতে ডাকতে ধড়ফড় করে উঠলো সিঁড়ি বেয়ে । কাঁধের ব্যাগটা পড়লো সিঁড়ির উপর । সেদিকে খেয়াল নেই । মিহি হুড়মুড়িয়ে ঘরে ঢুকলো । ঘরে, ওয়াশ রুমে , ব্যালকনিতে, সবখানে খুঁজলো । আব্বু নেই । মিহি আবারো নামলো ধড়ফড়িয়ে । সিঁড়ি বেয়ে নামতে নামতে সাবিনা বেগম কে চেঁচিয়ে বললো…
” আব্বু কোথায় আম্মু ? আব্বু ছাড়া তোমরা কেউ কিছু বলবে না আমায় , তাই তো ? বলো আব্বু কোথায় ?
সাবিনা বেগম এখনো নিস্তব্ধ । এতক্ষণে চোখের পলক পড়েছে কি না জানা নেই । মিহি অস্থির হয়ে পড়ছে । আম্মু কে আরো কয়েক বার ঝাঁকালো । একই প্রশ্ন ঘুরে ফিরে বারবার করলো । উত্তর পেলো না কোনো । না আম্মু উত্তর করলো আর না অন্য কেউ । মিহি এবার তপ্ত শ্বাস ফেললো । দাঁড়িয়ে গিয়ে রাগান্বিত স্বরে চেঁচিয়ে উঠলো…
” তোমরা কেউ কিছু বলবে আমায় ? কি হয়েছে সবার ? কারা তোমরা ? কি করছো আমাদের বাড়িতে ? আমার আব্বু কোথায় কেউ বলবে ? কেউ কোনো কথা বলছো না কেনো ? কোথায় আমার আব্বু ?

কথাটা শেষ করেই দুহাতে মাথা চেপে ধরে ধপ করে মেঝেতে বসলো মিহি । হিজাবটা এলোমেলো । মাথা চেপে কুঁকড়ে উঠলো মিহি । ফেটে যাচ্ছে বোধহয় মাথাটা । রুহিও দিকবিদিক হারিয়ে দুহাতে জাপটে ধরলো মিহি কে । সাবিনা বেগম এবার তাকালেন মিহির দিকে । চোখে স্থিরতা । আলো ,অনুভূতি কিছুই নেই । নিস্তেজ চাহনি তার । সুফিয়া বেগম পাশ থেকে এবার কিছু বলার জন্য উদ্যত হলেন । মুখ ফুটানোর আগে বাইরে থেকে গাড়ির শব্দ ভেসে আসলো । সবাই একসাথে তাকালো খোলা দরজা বরাবর বাইরের দিকে । মিহি ও মাথা তুললো । আম্মুর দিকে চোখ যেতেই দেখতে পেলো , মিহির চোখে চোখ রেখে মুচকি হাসলো সাবিনা বেগম । চোখে পানি টলটল করছে । তবুও হেসে জড়ানো গলায় বললেন তিনি…

” এসেছে তোর আব্বু । দেখিস , এবার ওনার সাথে একদম কথা বলবো না আমি । সাহস কি করে হয় ওনার আমাকে এভাবে একা ফেলে কোথাও চলে যাওয়ার ?
আব্বু এসেছে শুনে মিহির মুখে ও হাসি ফুটলো । উঠে দাঁড়ালো ও । হাসি মুখে দাঁড়িয়ে থাকলো কিছুক্ষণ । অতঃপর দূর্বল কাঁপা পায়ে ছুট লাগালো । দরজার সামনে গিয়ে থমকে দাঁড়ালো । গেটের ভেতরে একটা এম্বুলেন্স । মিহির হাসি হাসি মুখটা চুপসে গেল । আশেপাশের পরিস্থিতি থমথমে । মিহি তাকিয়েই রইলো নিরল চোখে । চার জন সাদা পোশাক পরিহিত লোক একটা লম্বাটে স্ট্রেচারে করে কাউকে নিয়ে আসছে এদিকে । দেখতে দেখতে মিহিকে পাশ কাটিয়ে তারা দরজা পেরিয়ে বাড়ির ভেতরে ঢুকলো । মিহি লক্ষ্য করলো স্ট্রেচারে বোধহয় শুয়ে আছে কেউ । তাকে দেখা যাচ্ছে না । একটা সাদা পাতলা চাদর মতো কিছু দিয়ে ঢেকে রাখা তার পা থেকে মাথা পর্যন্ত । মিহি চেয়ে থেকেই এক কদম পিছিয়ে দরজা ধরে সামলে নিলো নিজেকে । দু-একবার পলক ফেলে আবারো দেখলো । চার জন লোক স্ট্রেচার টা মাঝ বরাবর মেঝেতে রাখলো । অতঃপর বেরিয়ে গেল তারা । তারা বেরোতেই বাইরে থেকে সাফি ঢুকলো বাড়িতে । মিহি সাফি কে দেখে অদ্ভুত হাসলো ঠোঁট ফাঁক করে । গলা ,ঠোঁট,মুখ শুকিয়ে যাচ্ছে কেমন যেন । মিহি ঢোক গিললো , গলা ভিজলো না । আবারো ঢোক গিললো । গলায় রস পৌঁছালো একটু । মিহি এবার সাফি কে বললো…

” কি হয়েছে ? আব্বু, আব্বু কোথায় আমার ? জানেন কেউ কিচ্ছু বলছে না আমায় ! আপনি বলুন ,, আব্বু কোথায় ?
বলতে বলতে নিরিহ চোখ দুটো দিয়ে পানি গড়ালো আপনা আপনি । একই সাথে টুপটাপ কয়েক ফোঁটা পানি গড়িয়ে চিবুক বেয়ে নেমে গেলো । মিহির এমন কথায় সবার চোখ মিহির দিকে । সাফি করুন চোখে চেয়ে আছে । আহত দৃষ্টি তারও । আহত করুন চাহনি দিয়ে ইশারা করে তাকালো খাটিয়া মতো স্ট্রেচার টার দিকে । ইশারা অনুযায়ী মিহিও তাকালো পূর্ণ দৃষ্টিতে ‌। সাথে সাথে ঢোক গিললো একটা ।

এক দেখায় পর্ব ৩১

কয়েক মুহূর্ত দাঁড়িয়ে থেকে নিস্তেজ হয়ে পা বাড়ালো । গুটি গুটি পায়ে এগোলো । মাঝে গিয়ে দাঁড়িয়ে থাকলো আরো কিছুক্ষণ । মেঝেতে বসলো ধপ করে । ভ্রু দ্বয় কুঁচকে চোখ সরু করে তাকালো । লম্বাটে সাদা চাদরে ঢাকা দেহ খানা দেখলো পা থেকে মাথা অবধি । হাত পা শিরশির করে উঠলো মিহির । মিহি কাঁপা হাত বাড়ালো । সাদা চাদরের এক অংশ সরালো । টুপ করে পানি গড়ালো আবার । চোখে পানি নিয়েই মিহি মুচকি হাসলো । শীতল কন্ঠে ডাকলো…
” আব্বু……

এক দেখায় পর্ব ৩৩