Home এক দেখায় এক দেখায় পর্ব ৩

এক দেখায় পর্ব ৩

এক দেখায় পর্ব ৩
সুরভী আক্তার

নতুন একটি সকাল…
সেপ্টেম্বর মাসের প্রচণ্ড গরমের কারনে যখন সবাই নাজেহাল তখন এক ফালি বৃষ্টির আগমন ঘটেছে আজ ঢাকা শহরে ,, বৃষ্টির এই শিতল হাওয়া যেনো মুছে দিয়েছে অতীতের সব ক্লান্তি ।
সবে সকাল ৭ টা বাজে,, সেই ভোর রাত থেকেই অঝোর ধারায় বৃষ্টি হলেও এখন বৃষ্টির মাত্রা একটু কমেছে,, হালকা বাতাস বইছে আর গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি পড়ছে ধরনীতে , সেই বৃষ্টিকে উপভোগ করার জন্য গুটি গুটি পায়ে ছাঁদ বিহীন বারান্দায় এসে দাঁড়ায় মিহি,, দুহাত মেলে দীর্ঘশ্বাস ফেলে আলিঙ্গন করে বৃষ্টিকে,, মেঘের অগোচরে ঠিক বৃষ্টি নামার পরের শিতল হাওয়া যেনো মন ভেজানো এক নতুন অনুভুতির
সঞ্চার করে মিহির মনে..!

এর মাঝেই কেটে গেছিলো কয়েকটা দিন,, প্রতিদিন কলেজ থেকে বাড়ি আসা যাওয়া,, বন্ধুদের সাথে আড্ডা দেওয়া,,তার সাথে যুক্ত হয়েছে নতুন কোচিং ক্লাস,, কলেজের পর কোচিং থেকে বাড়ি ফিরতে ফিরতে প্রায় ৫ টা বেজে যায় ,, তার পর আবার পরিবারের সাথে সময় কাটানো তো আছেই ।
তবে আজ সকাল সকাল বৃষ্টি হওয়ায় কলেজে যেতে পারে নি মিহি। শুধু মিহি নয় ওদের ফ্রেন্ড গ্রুপের কেউ আজকে কলেজ যায়নি ।
তবে গ্রুপ কলে – ওরা সবাই মিলে plan করেছিলো আজকে কোচিং এর পর সবাই মিলে একটু সন্ধ্যার শহর উপভোগ করবে ।
যেই ভাবা সেই কাজ,, কোচিং শেষ হতে না হতেই মিহি, রুহি, সোহেল, মিরা‌,রৌনক, নাদিয়া – সবাই একসাথে বেরিয়ে পড়ে । প্রথমে ওরা সবাই মিলে রাস্তার একটা টং দোকানে চায়ের আড্ডা বসায় ,, বৃষ্টির পরের ঠান্ডা weather সাথে গরম গরম মালাই চায়ের combination এ আড্ডা জমে ক্ষীর।
এতো কিছুর মাঝেও নাদিয়ার মন খারাপ লক্ষ্য করে রুহি নাদিয়াকে বলে…

” কি রে,, সেই তখন থেকে দেখছি তুই কেমন চুপচাপ হয়ে আছিস,,কি হয়েছে বলতো তোর??
” ওর আবার কি হবে,, দেখ হয়তো বয়ফ্রেন্ডের সাথে ব্রেকআপ হইছে।
সোহেলের কথায় একসাথে সবাই শব্দ করে হেসে উঠে..।
নাদিয়া একটু রেগে গাল ফুলিয়ে বলে..
” দেখ সোহেল..
” শুধু সোহেল কেনো‌ ,, আমাদেরকে ও দেখা কি দেখাবি ।
নাদিয়া কে কথার মাঝে থামিয়ে কথাটা বলে রৌনক । রৌনকের কথায় নাদিয়া আরো বেশি তেঁতে ওঠে নাদিয়া । চোখ রাঙিয়ে তাকায় ওদের দিকে । সোহেল আর রৌনক মিটিমিটি হাসছে ওকে দেখে ‌। মিহি ওদের থামিয়ে বলে…
” উফ্,,থামবি তোরা ,, এই নাদিয়া বলত কি হয়েছে তোর?
নাদিয়া গাঁ ঝেড়ে শ্বাস ছেড়ে বলল…

” তেমন কিছু না রে,, এমনিতেই ভালো লাগছে না,,এই আর কি।
” ধুর তোর মন খারাপ কে গুল্লি মার তো ,,, চল আমরা এখন enjoy করি,,
বলেই নাদিয়ার হাত টানতে টানতে নির্জন রাস্তায় নেমে দাঁড়ায় মিহি , পিছন ফিরে সোহেলের উদ্দেশ্যে বলে..
” সোহেল তাড়াতাড়ি চায়ের বিল মিটিয়ে চলে আয় ,, আমরা গেলাম।
মিহি, মিরা, নাদিয়া রাস্তায় নামলেও রুহি এখনো সেই আগের যায়গায় মুখ ফুলিয়ে বসে আছে,,এটা দেখে মিহি ওর কাছে দৌড়ে গিয়ে জড়িয়ে ধরে মিষ্টি কন্ঠে বলে ..
” sorry pakhi ,, আর এমন হবে না ,,,চল এখন ।
মিহি রুহির হাত ধরে দৌড়ে রাস্তায় নামে,, মৃদু হাওয়ায় চার বান্ধবী যেনো মুক্ত পাখির মতো উড়তে থাকে,, ব্যস্ত ঢাকা শহরের এই‌ রাস্তাটি সচরাচর কোলাহল পূর্ণ থাকলেও আজ নির্জন,, শুধু বাতাসে ভেসে আসছে কিছু মেয়েলি কন্ঠের হাসির ঝংকার।

সোহেল আর রৌনক চায়ের বিল দিয়ে আসতে আসতে মিহিরা ওদের থেকে কিছুটা এগিয়ে গেছে,,
এই নিরব আনন্দের মাঝেই মিহি ওর ফোনে একটি গান বাজিয়ে দেয়,, সেই গানের তালে তালে চার বান্ধবী একই সাথে নাচতে আরম্ভ করে..
গান বাজছে..♪♪♪♪
Aare machri ke jaise
Tarpe jawani
Rauwa se piya hum
Sach KaHa tani..
Sach Kaha tani .!!

নাচের মাঝেই হঠাৎ রুহির ফোন বেজে ওঠে,, নাচতে নাচতে রুহি ওর ফোনের স্ক্রিনে তাকাতেই ওর নাচ থেমে যায়। চোখ গোল গোল করে তাকিয়েই মৃদু স্বরে চিৎকার দিয়ে উঠে ও ।
ওর চিৎকারে সবার নাচ থেমে যায়,, মিহি রুহির কাছে গিয়ে ওর বাহু হালকা ঝাঁকিয়ে জিজ্ঞেস করে..
” কি রে pakhi !! কে ফোন করেছে ?
” ভা..ভা.. ভাইয়া
বলেই রুহি যেইনা ফোন রিসিভ করতে যাবে ,, ঠিক তখনই ওর ফোনটা সুইচ অফ হয়ে যায় । চার্জ নেই ফোনে । রুহি অসহায় ভয়ার্ত কন্ঠে বলে….
” যাহ্,,এই ফোনটার এক্ষুনি চার্জ শেষ হতে হলো,, ? আজতো আমি শেষ ।
রুহির ভয় পাওয়ার কারন বুঝতে না পেরে মিহি অবুঝের মতো শুধায়..
” তুই এতো ভয় পাচ্ছিস কেনো ? তোর ফোন সুইচ অফ হয়েছে তো কি হয়েছে,, এই নে আমার ফোন থেকে তোর ভাইয়াকে কল করে জানিয়ে দে , যে তুই এখন আমাদের সাথে আছিস।
” ওরে মিহি তুই বুঝতে পারছিস না,, আজ পাঁচ মাস পর ভাইয়া দেশে ফিরছে আর এই কথাটা আমি ভুলে গেলাম কি করে ? ও নিশ্চয়ই বাসায় এসে আমাকে দেখতে পায়নি তাই এখন ফোন করছে ।”
” কিহ !! তোর ভাইয়া আজ দেশে ফিরেছে??
রৌনকের কথায় পিছন ফিরে তাকিয়ে রুহি ছোট করে জবাব দিলো.. ”

” হুম !
মিহি বলে…
” তুই তো বাসা থেকে permission নিয়েই এসেছিস ,,,আর তোর ভাইয়া কোনো বাঘ – ভাল্লুক নাকি কোনো villain যে তুই এতো ভয় পাচ্ছিস ?
” ওর ভাইয়া কোনো বাঘ – ভাল্লুক বা villain নয় ,, তবে সুপারস্টার বটে ‌ । তবে villain এর থেকেও কম কিছু নয়,,
শেষের কথাটা বিড়বিড় করে বলল নাদিয়া.. নাদিয়ার কথার মানে বুঝতে না পেরে মিহি আবারো অবুঝের মতো প্রশ্ন করে…
” মানে ??
” তুই জানিস না,, রুহির বড় ভাই মি. রুজান রাফি চৌধুরী দেশ ও বিদেশের একজন জনপ্রিয় নামকরা Singer আর তার সাথে উনি চৌধুরী গ্রুপ অফ ইন্ডাস্ট্রির একমাত্র কর্নধার।
মিরার কথা শেষ হতেই রুহি চোরা চোখে মিহির দিকে তাকিয়ে মিনমিন করে বলে…
” আসলে পাঁচ মাস আগে ভাইয়া অফিসের কাজে জাপান গেছিলো, আর আজকেই ওর দেশে ফেরার কথা,, আমি না একদম ভুলে গেছিলাম।
কথা শেষ করেই মিহির বাহু জড়িয়ে আবারো বলে..
” sorry pakhi ,, আসলে তোকে না ভাইয়ার বিষয়ে কিছু বলা হয়নি,, ভাইয়ার বিষয়ে তো কোন কথাই আলোচনা হয়নি তাই আর কি…
” থাক । আমাকে আর কৈফিয়ত দিতে হবে না.. তুই আগে তোর ভাইয়ার সাথে কথা বলে নে । নয়তো টেনশন করবেন উনি…

” রাগ করেছিস pakhi ?
” আরে ,, আমি কেনো রাগ করতে যাবো ? তোর ভাইয়া সুপারস্টার হোক বা ব্যাঙের ছাতাই হোক , তাতে আমার কি ?
” Thanks janu ,, তবে ভাইয়াকে ব্যাঙের ছাতা না বললেও পারতি।
আচ্ছা এখন তোর ফোনটা আগে দে ভাইয়াকে কল করি..
বলেই মিহির হাত থেকে ফোনটা নিয়ে ভাইয়াকে কল করে রুহি,, দুই-একবার রিং হতেই অপর পাশ থেকে কল রিসিভ হয় ,, অপর পাশের ব্যক্তিকে কোন কথা বলার সুযোগ না দিয়ে রুহি গড়গড় করে বলতে আড়ম্ভ করে…
” sorry ভাইয়া,,, সত্যি বলছি…..
রুহির কথা শেষ হওয়ার আগেই একটা গম্ভীর কন্ঠ ভেসে আসে ফোনের ওপাশ থেকে —-
” কোথায় আছিস ? আমাকে এক্ষুনি location পাঠিয়ে দে ।
বলেই টুং টুং করে ফোনটা কেটে দেয় । রুহি কান থেকে ফোনটা নামাতেই মিহি বলে…
” কি হলো pakhi ?
রুহি ঠোঁট উল্টে বলে..

” ভাইয়া মনে হয় নিতে আসছে আমাকে,, location পাঠাতে বলল,,,
রুহির কথা শুনে রৌনক আমতা আমতা করতে করতে বলে…
” তাহলে আমরা যাই হ্যাঁ,, ? কালকে কলেজে দেখা হবে।
রৌনকের কথায় তাল মিলিয়ে নাদিয়া আর মিরাও বলল …
” আমরাও যাই তাহলে। আসি রে মিহি ।
বলেই উল্টো দিকে হাঁটা লাগালো সবাই,, যেনো পালাতে পারলেই বাঁচে… ওরা চলে যেতেই মিহি ভ্রু কুঁচকে বলে…
” বুঝলাম না,, ওদের আবার হঠাৎ কি হলো ?
” সেটা না হয় পরে বলব,, এখন চল ভাইয়া এখনি এসে যাবে ।
” নাহ,,, আমার বাসা তো এখান থেকে অনেকটা কাছেই , তোদের আর কষ্ট করে আমাকে Drop করে দিতে হবে না ,,,,আমি একাই যেতে পারবো,, তুই বরং টং দোকানে গিয়ে অপেক্ষা কর । আমিও যাই ,, নয়তো অনেকটা late হয়ে যাবে।

” কিন্তু…
” কোনো কিন্তু না পাখি,,, আমি তো বললাম আমি যেতে পারবো,,আসি ?
” আচ্ছা সাবধানে যেও pakhi ।
মিহিকে জড়িয়ে ধরে বলে রুহি । মিহিও গদগদ হয়ে বলে…
” love you pakhi 💝
” love you too baby….

এক দেখায় পর্ব ২

রুহির থেকে বিদায় নিয়ে মিহি গলির মোড়ের দিকে হাঁটা লাগায় উদ্দেশ্যে রিকশা নিয়ে বাসায় ফেরা । এখান থেকে মিহিদের বাড়ি অনেকটাই কাছে,, রিকশায় করে যেতে হলে ৫ মিনিটের মধ্যেই পৌঁছানো যায়,,,যার কারণে রুহিও মিহিকে একা ছাড়তে রাজি হয়ে যায়,, নয়তো মেয়েটা মিহিকে একা ছাড়তো কিনা কে জানে-!
ব্যাগের মধ্যে কিছু একটা খুঁজতে খুঁজতে অন্যমনস্ক হয়ে হাটছিলো মিহি ,, হঠাৎ শক্ত খাম্বা মতো কোনো কিছুর সাথে ধাক্কা খেয়ে মাটিতে পড়ে যেতে নেয় মেয়েটা । মুখ দিয়ে অচিরেই ‘ আহ্ ‘ সূচক একটা মৃদু শব্দ বেরিয়ে আসে ,, ভয়ে চোখ মুখ খিচে বন্ধ নেয় মিহি ,,তবে মাটিতে পড়ার আগেই একটা শক্ত পোক্ত বলিষ্ঠ হাত আগলে নেয় মিহিকে…

এক দেখায় পর্ব ৪