Home এক দেখায় এক দেখায় পর্ব ৪৪

এক দেখায় পর্ব ৪৪

এক দেখায় পর্ব ৪৪
সুরভী আক্তার

” সত্যিই ভালোবাসেন তো ?
এখনো অভিমানি স্বর মিহির । খানিক সন্দিহান ও বটে । রাফি ওর দিকে এগোলো আর একটু ‌। চোখে চোখ রেখে বিমোহিত দৃষ্টিতে চেয়ে আবেশিত ফিসফিস কন্ঠে বলল…
” আমার চোখের দিকে তাকাও….
মিহি তো তাকিয়েই ওর চোখের দিকে । আরো গাঢ় হলো দৃষ্টির মিলন । একে অপরের চোখে ডুবে কিছুকাল নীরবতায় পেরোলো । রাফি বললো এবার…
” কি দেখতে পেলে ?
মিহির ঠোঁটের কোণা কামড়ে খানিক ভাবুক ভঙ্গিতে বলল…
” আপনার চোখের মনি একটু লালচে ? এতো দিন তো দেখিনি , আজ লক্ষ্য করে দেখলাম ।
আকস্মিক তাজ্জব হলেও পরমুহূর্তে হেসে ফেললো রাফি । একই সাথে মিহিও । লাজুকতায় মুখ নামায় মিহি । চোখের পাপড়ি ভেজা এখনো । রাফি হাসি আটকে আবার পূর্ণ দৃষ্টি পাত করলো । দীর্ঘ শ্বাস টেনে হাত বাড়িয়ে চোখের পাপড়ি দ্বয় মুছিয়ে দিলো । আবেশে চোখ বুজলো মিহি । কাঁপল পুরো চিত্ত । শ্বাস আটকালো গলায় । রাফি ওর এমন অবস্থা দেখে ঠোঁট চেপে হাসলো । ডাকলো হাস্কি স্বরে…

” ম্যাডাম ?
ঝট করে চোখ খুললো মিহি । রাফি ওর কোলে আড়াআড়ি ভাবে নিজের হাত রাখলো । সেখানে থুতনি ঠেকিয়ে মিহির পানে প্রগাঢ় বিমূর্ত দৃষ্টিতে চেয়ে বললো একই স্বরে…
” আমার চোখের মণি কিন্তু আপনি ,, এভাবে সারাজীবন আমার চোখের মণি হয়ে আমার চোখের সামনে থাকবেন , লাজুকতায় নিজেকে মুড়িয়ে ধরা দেবেন আমার খানিক লালচে চোখের মনিতে । তাতেই হবে আমার । আর কিচ্ছু চাই না… আমার চোখের মণি হয়ে আমার চোখের মণি কোঠায় ঠাই নিয়েন শুধু । যেন আপনাকে ছাড়া আমি অন্ধ হয়ে যাই…অন্ধ হওয়ার পর শুধু ভিক্ষা করতে না পাঠালেই হবে ।
ঠোঁট কামড়ে রসিক স্বরে শেষ কথাটা বললো রাফি । মিহি হেসে ফেললো আবারো । কি স্নিগ্ধ হাসি তার ব্লোসোমের । যে হাসিতে কোনো অভিমান নেই আজ । নেই কোনো রাগ । শুধু স্নিগ্ধতা । রাফি বিমূর্ত এই লাগাম হীন সৌন্দর্যময় হাসির ক্ষিন ঝংকারে । ঢোক গিললো ও । নিজের মাঝেই বিড়বিড় করলো….
” অবশেষে তুমি আমার …।
কথাটা পৌঁছেছে মিহির কানেও । রাফি এতোটা কাছে থাকা সত্ত্বেও অস্বস্তি হচ্ছে না আজ । অথচ মাঝে মাঝে ও চোখ তুলেও তাকাতে পারে না এই লোকটার দিকে । তখন কি যে হয় কে জানে । রাফি তো ওর বান্ধবীর ভাই….
ইশ , এই কথা মনে আসতেই জিভে কামড় বসালো মিহি । বান্ধবীর ভাই এতোটা কাছে ? মিহি তড়িঘড়ি করে বললো…

” সরুন আমার কাছ থেকে ! দূরে যান…
” কেনো ?
” কারণ আপনি আমার বান্ধবীর বড় ভাই , আমার এতোটা কাছে আসা আপনার মানায় না । দূরে যান….
” ও আচ্ছা, আমি আপনার বান্ধবীর বড় ভাই ?
তা আপনার বান্ধবীর এই বড় ভাই কিন্তু কাল আপনার ড্রেস চেঞ্জ করে দিয়েছে…
দূরে সরে ঠোঁট কামড়ে বললো রাফি । ঠোঁট উল্টালো মিহি । ঝট করে প্যাক প্যাক করে উঠলো….
” ছিঃ…..অসভ্য মিথ্যা বাদি লোক… আপনি খুব খারাপ । আমি এক্ষুনি চলে যাবো এখান থেকে .. থাকবো না আপনার সাথে …
কথা বলেই আর থামলো না । এক দৌড়ে উঠলো সিঁড়ি বেয়ে । রাফি ওর যাওয়ার পানে তাকিয়ে ঠোঁট পিষে হাসলো ।

মিহি ঘরে গিয়ে ফ্রেশ হয়ে নিজের কাপড় গুলো পড়ে নিয়েছে । নয়টা পেরোলো । মিহি তড়িঘড়ি করে ঘর বেরোতে গেলে আচমকা মুখোমুখি হলো এক মধ্য বয়সী মহিলার । উনি ঘরে ঢুকেছিলেন । ওনাকে দেখে দাঁড়ালো মিহি । অপ্রস্তুত অবস্থায় পড়ে থতমত খেলো খানিক । মহিলা টা মুচকি হাসলো মিহি কে দেখে । এগোতে এগোতে বললো…
” এখন কেমন আছেন ম্যাডাম ? জ্বর কমেছে ?
মিহি বুঝলো না । কপাল কুঁচকে বিড়বিড় করলো..
” জ্বর ?
” কাল তো সারারাত গা গরম ছিল আপনার । ভেজা শরীরে ছিলেন তো তাই । আমিই তো কাপড় পাল্টে দিলাম । আপনার কাপড় নেই এখানে ! কাবাডে খুঁজে পেলাম না, পরে স্যার নিজের কাপড় বের করে দিলেন আপনাকে পড়ানোর জন্য ।
সে কি গা গরম কাল আপনার । স্যার তো সারারাত জেগে ছিলেন আপনার পাশে । ভেজা কাপড় চিপে চিপে আপনার কপালে জ্বর পট্টি দিয়েছেন সারারাত … আমি স্যার কে কতবার বললাম যে আমি থাকি আপনার দেখা শুনার জন্য, কিন্তু উনি তো শুনলেন না । আমাকে পাঠিয়ে দিয়ে নিজ দায়িত্বে টেক কেয়ার করেছে আপনার ।
মিহি ক্ষিয় কাল থমকালো । রাফি মিথ্যে বলে নি । আবার পুরোপুরি সত্যিও বলে নি । সারা রাত জেগে ছিল সে ? মিহির জন্য ?
মিহি কে নীরব থাকতে দেখে সামনের জন আবার বললো…

” স্যারের তো হাত কেটেছে ম্যাডাম । ঔষধ লাগানো হয় নি , আমি স্যার কে কাল বলেছিলাম ঔষধ লাগিয়ে ব্যান্ডেজ করে নিতে । উনি বোধহয় করেন নি কাল । নিচে দেখলাম একা একা মেডিসিন লাগাচ্ছেন , হাতটা জখম হয়ে আছে , আপনি গিয়ে দেখুন…
আমি রুম ক্লিন করে দিচ্ছি…..
মিহি আঁতকে উঠলো ‌। ও তো এতোক্ষণ ছিলো । লক্ষ্য করে নি রাফির হাত ।
তড়িঘড়ি করে নিচে নামলো মিহি । নামতে নামতে দেখতে পেলো রাফি সোফায় বসে নিজের হাতে মলম লাগাচ্ছে নিজে নিজেই । চোখ মুখ ব্যাথায় কুঁচকানো । মিহি ওর পাশে বসলো । হাতখানার দিকে তাকিয়ে চোখ সরালো ‌। কেমন জখম হয়ে আছে । মিহি আতঙ্কিত হয়ে শুধালো…
” হাতে কি হয়েছে আপনার ? এভাবে জখম হলো কি করে । কাঁটলো কি করে এভাবে ? বলেন নি কেনো আমায় ? আর আমিও কেমন , একটুও লক্ষ্য করি নি ।
রাফির শান্ত কন্ঠ…

” কিচ্ছু হয়নি ।
” কিচ্ছু হয়নি বললেই হলো ? কতটা জখম হয়েছে ? কিভাবে হয় এমন ? আমাকে দিন ,আমি ঔষধ লাগিয়ে দিচ্ছি ।
মিহির তীব্র জেদ দেখানো কন্ঠস্বর । রাফি মুচকি হাসলো । হাত খানা বাড়িয়ে দিয়ে বললো…
” নিন ,, একটু যত্ন করে ঔষধ লাগিয়ে দিন । এতেই সেরে যাবে ।
মিহি চোখ তুলে তাকালো । কপাল কুঁচকালো নাকের ডগা অবধি । খানিক অভিমানী স্বরে বলল….
” আবার আপনি আমায় আপনি করে বলছেন ? আপনি করে সম্বোধন কেনো করেন আমায় ?
” ভালো লাগে তাই ! আপনাকে আপনি বলতে খুব ভালো লাগে জানেন , যতটা আপনাকে ভালো লাগে ঠিক ততটাই ।
আমার আপনিটা তো আপনি হয়েই আমার জীবনে এসেছিলেন । আপনিও তুমিতে আসুন , আমিও যাবো ।
মিহি চোখ সরু করলো ।
এই মুহূর্তে এসব মনে ধরছে না । মাথায় ঘুরছে আম্মুর কথা । কাল থেকে মিহি বাইরে । সাবিনা বেগমের কি অবস্থা কে জানে ? মিহির সাথে তো কথাও হয় নি । সাফি কি থেকে কি বলেছে জানা নেই ।
মিহি আলতো হাতে রাফির জখমে মলম লাগালো । ততক্ষন নির্বিশেষে রাফি চেয়ে দেখলো তার ব্লোসোম কে । মোহময় দৃষ্টি তার । কাল সারারাত এমনি ছিলো । পুরো রাত কাবার হয়েছে মিহির পানে এক দৃষ্টে চেয়ে থাকার মাঝে । তবুও তৃষ্ণা মেটে নি রাফির । এ ভীষণ তৃষ্ণার্ত নয়ন, এতো সহজে তৃপ্তি মিটবে না ।
মিহি মলম লাগানো শেষ করে ব্যান্ডেজ করে দিলো । রাফির দিকে তাকিয়ে চিন্তিত মুখে বললো….

” বাড়ি যেতে হবে । আম্মু একা আছে ।
রাফি আলতো স্বরে বলল….
” ব্রেকফাস্ট করে তারপর…
” না,, আমি কিছু খাবো না । আপনি আমায় নিয়ে চলুন প্লিজ ।
” আমি খাবো…
” তো খেয়ে নিন তাড়াতাড়ি…!
” একটা চুমু খাই তোমায় ?
মিহি তড়িতে লাফিয়ে উঠলো । থতমত খেয়ে কেশে উঠলো । এতক্ষণে ধ্যানে ফিরলো রাফি । ভুল করে বেফাঁস হয়ে ঠিক কথা বেরিয়ে গেছে মুখ দিয়ে ।
উঠে দাঁড়ালো রাফি । গলা খাঁকারি দিয়ে বললো….
” না মানে ,, আমিও কিছু খাবো না । আপনি চলুন…
মিহি আর দাঁড়ালো না । ছুটে বেরোলো বাড়ি থেকে । রাফি ঠোঁট পিষে হেসে বেরোলো পিছু পিছু । পুরো রাস্তায় একটা বারের জন্যেও রাফির দিকে তাকায়নি মিহি । চোখ চুরিয়ে তাকিয়েছে এদিক ওদিক । এই লোকটার দিকে তাকানো বিশাল দায় ।
রাফি মিটিমিটি হাসছে ওকে দেখে । বাড়ির সামনে গাড়ি থামতেই মিহি তাকালো এবার । মুহুর্তেই সেই দৃষ্টির সাথে দৃষ্টির মিলন । চোখ নামালো মেয়েটা । বললো নত স্বরে…

” আসি..?
” আন্টিকে দেখে রেডি হয়ে আসুন । আমার সাথে ক্যাফেতে যাবেন ! রুহি আছে ওখানে…
” আপনি যান , আমি চলে যাবো ।
” উঁহুম … আমার সাথেই যাবেন ।
” দেরি করে যাই একটু ,, মাইনে থেকে টাকা কাটলে কেটে নেবেন !
রাফি আলতো হাসলো । ঠোঁট চেপে বললো…
” পুরো মাইনেটাই কেটে নেবো । আপনি যখন আমার দায়িত্ব তখন বেকার বেকার মাইনে দেবো কেনো আপনাকে ? আমি তো আছি আপনার জন্য…
মিহি স্মিথ হাসলো ।
” আচ্ছা , আপনি যান । আমি চলে যাবো…
” উহুম… রেডি হয়ে নিচে আসুন আমি অপেক্ষা করছি আপনার জন্য…
মিহি তপ্ত শ্বাস ফেললো । এই লোকটাকে মানাতে পারবে না ও । নিজেই হার মেনে নামলো গাড়ি থেকে । তড়িঘড়ি করে বাড়িতে ঢুকলো চাবি দিয়ে । উদ্বিগ্নতা চেপে রাখতে পারলো না আর । সঙ্কিত হয়ে আসলো মুখ খানা । ড্রইং রুমে আম্মু নেই । মিহি ঢোক গিলে ডাকলো উঁচু স্বরে…

” আম্মু …?
কিচেন থেকে বেরোলেন সাবিনা বেগম । মুখো ভঙ্গিমা স্বাভাবিক তার । মিহি কে স্বস্তির হাসি হাসলেন । হাত মুছে মেয়ের কাছে এসে শুধালেন স্বাভাবিক কন্ঠে…
” এসেছিস ? রেহার বিয়ে শেষ ?
কপাল কুঁচকালো মিহি । হয়তো বুঝলো না । প্রশ্ন সূচক কন্ঠে উচ্চারণ করলো..
” হ্যাঁ ?
” রেহার বিয়ে হলো ? এতো সকালে ফিরবি ভাবি নি । রেহা তো বললো তোর ফিরতে ফিরতে দুপুর হবে ।
মিহির মাথার উপর দিয়ে গেল কথা গুলো । বুঝলো না কিছুই । এখানে রেহা আসলো কোথা থেকে ? আর রেহার বিয়ে মানে ? সাবিনা বেগমের সাথে কথা হয়েছে ওর ?
মিহি সন্দিহান হয়ে শুধালো…
” রেহা বলেছে মানে ?
” কাল তো রেহা ফোন করে বলল তুই ওর বাড়িতে আছিস । আর থাকবি ওখানে । ওর তো বিয়ে,তাই না ? কি ভেবেছিলি তোকে থাকতে বারন করবো আমি ? কথা বলিস নি কেন কাল আমার সাথে ?
মিহি এখনো বুঝলো না কিছুই । থম মেরে বোঝার চেষ্টায় রইলো কিছুক্ষণ । পরমুহূর্তে জোর পূর্বক হেসে সাবিনা বেগমের কথার সাথে তাল মেলালো ।
যা বুঝলো , তাতে সাফি কিছুই বলে নি তাকে । সাফির কানাডা থেকে ফেরার খবর ও হয়তো জানেন না সাবিনা বেগম । জানলে নিশ্চয়ই শুধাতেন এই বিষয়ে ।
মিহি হাঁফ ছাড়ল । বাঁচলো বোধহয় । এক রাশ চিন্তায় ছিল এতক্ষন । সাবিনা বেগম কিছুই জানেন না এতেই রক্ষে ।
মিহি ওনার সাথে টুকটাক কথা বলে কাপড় চেঞ্জ করে ফের বেরোলো বাড়ি থেকে । বাড়ির বাইরে রাফির গাড়ি । মিহি তড়িতে উঠলো । তাড়া দিলো…

” চলুন…
ক্যাফের সামনে এসে গাড়ি থামলো একেবারে । রাফি নামার আগে আর কেউ দেখার আগেই চট করে গাড়ি থেকে নামলো মিহি । দূরত্ব বাড়ালো গাড়ি থেকে । ভেতরে ঢুকলো দ্রুত পায়ে । ভেতরটায় কেউ নেই ।
কিচেনের সামনে রেহা । মিহি ভ্রু গুটালো ওকে দেখে । দ্রুত এগিয়ে দাঁড়ালো রেহার সামনে । রেহা মিহি কে দেখে মুচকি হাসলো । কিছু বলার আগেই মিহি ফটাফট শুধালো….
” আম্মু কে কি বলেছিস তুই ?
” বলি নি ,, অযুহাত দিয়েছি ।
” ম..মানে ?
” তুই তো কাল বাড়িতে ছিলি না , আন্টি টেনশন করতো , তাই একটা ছল দিয়েছি,যে তুই আমার বিয়েতে আমার বাড়িতে আছিস ।
মিহি ছলকে উঠলো আতঙ্কে । ঠোঁট ভিজিয়ে মিনমিন করলো…
” তুই কি করে জানলি আমি বাড়িতে ছিলাম না ।
” স্যার বলেছে , স্যারের সাথে ছিলি তো ?
মিহি আঁতকে উঠলো পুনরায় । ভীত হয়ে আসলো চাহনি । মিহির অবস্থা বুঝে রেহা মুচকি হাসলো । মিহির কুকড়ানো হাতের উপর নিজের হাত রাখলো । বললো মোলায়েম শান্তনার স্বরে…
” কি হলো মিহি ? এভাবে কি দেখছিস ? আমি কিন্তু সব জানি । স্যার তোকে মিহি বলে কেনো ডাকে সেটাও জানি । তুইতো মিহি , তাহলে মাহি বলবে কেনো ? আমরা জানতাম না , তাই মাহি বলতাম । এখন কিন্তু আমি সব জানি ।
মিহির দূর্বোধ্য চাহনি । রেহা খানিক থেমে কন্ঠ আরো নরম করে বললো…
” স্যার সব বলেছে আমায় ! আন্টি যাতে টেনশন না করে,তাই আন্টিকে কিছু বলে ম্যানেজ করতে বলেছিল !
স্যার তোকে ভালোবাসে , তাই না মিহি ?
মিহি চোখ নামালো । পিছন থেকে রুহির চিৎকার…

” পাখিইইইই ??
ঝট করে ফিরলো মিহি । নিজেকে ঠিক ভাবে সামলে ওঠার আগেই রুহি হুড়মুড়িয়ে জড়িয়ে ধরলো ওকে । টাল সামলাতে না পেরে পেছনে পিছিয়ে গেল মেয়েটা । খানিক ক্ষণ হতভম্ব রইলো । পরিস্থিতি বুঝে সামলালো নিজেকে । হাসলো স্বাভাবিকের ন্যায় । রুহি ওকে ছেড়ে উদ্বিগ্ন হয়ে বললো…
” জান ,, ঠিক আছিস তুই ? কি হয়েছে তোর ? কাল ওভাবে চলে গেলি কেনো ?
মিহির সজল হয়ে আসলো অক্ষি যুগল‌‌‌ । ঠোঁট উল্টালো মেয়েটা । কেঁদে ফেলবে এক্ষুনি ।
নাক টেনে টেনে বললো কোনো রকমে….
” আর কক্ষনো যাবো না !
” যাবি কি করে , আমি যেতে দিলে তো ? এবার আমি তোকে ছাড়লে তো কোথাও যাবি ?
সজল চোখে হাসলো দুই বান্ধবী । রেহা মুচকি হাসলো পিছনে ।
শান্ত আর পিছনে দাঁড়িয়ে । শান্ত গলা খাঁকারি দিয়ে বললো টিপ্পনি মেরে…
” মিহি পাখি,, কাল কোথায় ছিলে সারা রাত ? না মানে, কাল সারারাত তো রাফির কোনো খোঁজ পাই নি । তুমি জানতে রাফি কোথায় ছিলো ?
মেয়েটা শান্তর দিকে একপলক তাকিয়ে মাথা নোয়ালো । শান্ত কথা শেষ করে রাফির দিকে চেয়ে চোখ মারলো ঠোঁট কামড়ে । বিরক্তি প্রকাশ করে কপাল কুঁচকালো রাফি ।
এমন সময় কোথা থেকে ধড়ফড়িয়ে ছুটে আসলো জেরিন… পিছু পিছু জারিফ ওকে ডাকতে ডাকতে । জেরিন ওর ডাক শুনলে তো । ও ছুটে এসে থামলো । ঠোঁট উল্টে রাফির দিকে ঘুরে নেকি স্বরে বলল….

” স্যার ,, হাত কেটে গেছে আমার । একটু ব্যান্ডেজ করে দিন না । ব্যাথা হচ্ছে ভীষণ…
মাহির তো পা ধরেছিলেন , কোলেও নিয়েছিলেন , আমার হাত ধরুন , তাতেই হবে ।
সবাই কপাল কুঁচকে তাকালো ওর হাতের দিকে । এক আঙ্গুল বাড়িয়ে আছে ও । আঙ্গুলের ডগা দিয়ে এক ফোঁটা রক্ত সবে টিপে টিপে বেরোচ্ছে বোধহয় । জেরিনের মুখো ভঙ্গিমা দেখে মনে হচ্ছে বিশাল কিছু ।
রাফি ঠোঁট চেপে বাঁকা চোখে তাকালো মিহির দিকে । মেয়েটা নির্বিকার ভঙ্গিতে তাকিয়ে আছে । রেহা কড়া কন্ঠে বলে উঠলো…
” জেরিন এদিকে আয় ,সব কিছুতে বাড়াবাড়ি তোর । কোথায় কেটেছে দেখি, এদিকে আয়…
” বাড়াবাড়ি কোথায় করলাম ? আমি কখনো বাড়াবাড়ি করেছি । এই দেখ, টলটলে এক ফোঁটা রক্ত বেরিয়েছে, এটাকে ভাঙ্গলে আরো কতো ফোঁটা হবে জানিস ? এক ফোঁটা রক্ত তৈরিতে কত দিন সময় লাগে কোনো আইডিয়া আছে তোর…
রেহা বিরক্ত হলো । জারিফ ধমকালো এবার…

” মারবো একটা চটকানা । বেশি বেশি ঢং শিখেছিস না ? আসবি এদিকে , আয় আমি বেঁধে দিচ্ছি আঙ্গুল ।
জেরিন চুপসালো । রাফির প্রতিক্রিয়া না দেখে আরো নুইয়ে গেলো ফাটা বেলুনের ন্যায় ।
কতদিন পর এক হলো দুই বান্ধবী । রাফির কেবিনের সোফায় বসে মিহির কাঁধে মাথা রেখে রুহি সব কথা উগড়ে দিয়েছে আজ । অভিমানী স্বরে সব জমানো কথা বলছে একে একে ।
রুহি ঢাকা ভার্সিটিতে ভর্তি হয় নি , এমনকি ভর্তি পরীক্ষাও দেয় নি । ওরা তো দু’জনে একসাথে ঢাবি পড়ার স্বপ্ন দেখেছিলো , মিহি কে ছাড়া একা একা সেই স্বপ্ন পূরণ করবে কি করে রুহি ? রুহি ঢাবির আশেপাশেও যায় নি । এতো দিনের সব পরিশ্রম, পড়াশোনা সব বৃথা । বিশ্ববিদ্যালয়ে এডমিশন ন্যায় নি দেখে হেনা বেগম কতো বকেছেন ওকে । সেই সব বকা থেকে ওকে বাঁচিয়েছে রাফি । রাশেদ রায়হান চৌধুরী এই নিয়ে মেয়েকে একটা কথাও বলেন নি । তিনি সায় দিয়েছেন মেয়েকে । মেয়ে যেখানে পড়তে চায় সেখানেই পড়াবেন মেয়েকে । শেষের দিকে রুহিকে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি করানো হয়েছে কদিন আগে। ক্লাস শুরু হয়েছেও কদিন হলো ।
রাফি ক্লাসের সিডিউল অনুযায়ী নিজ দায়িত্বে রুহিকে ভার্সিটি নিয়ে যাওয়া আসা করেছে ‌। ভার্সিটিতে কারোর সাথে টু শব্দেও কথা বলে নি রুহি । বলতেও চায় নি । বন্ধুত্ব তো দূর , কারোর সাথে নিজের পরিচয় টুকুও শেয়ার করে নি ।

সোহেল আর নাদিয়া তো নেই । মিরা আর রৌনকের সাথে কথা হয় মাঝে মাঝে । তাও ওরা আগ বাড়িয়ে খোঁজ নেয়।
মিহি চুপচাপ শুনে গেলো ওর কথা গুলো । বিকেলে বেরিয়েছে চারজনে ‌। রুহি আর মিহি ব্যাক সিটে । এখনো গল্পে মত্ত ওরা, হাতে আইসক্রিম । শান্ত চুপচাপ বসে রাফির পাশে । রাফির মুখে সারফারাজের কথা শুনলো এই মুহূর্তে । ফিরে এসেছে সারফারাজ । ওদের প্রান প্রিয় বন্ধু থেকে শত্রু হয়ে যাওয়া সারফারাজ ।
শত্রু তো সারফারাজের দিক থেকে । রাফি তো এখনো নরম ওর প্রতি । যদিও কাল হাত উঠেছিল রাগের ক্ষোভে ।
শান্ত চুপ হয়ে বসে আছে । রুহি মিহির মনযোগ নেই এদিকে । রাফি কোথায় নিয়ে যাচ্ছে ওদের জানা নেই । বললো তো শহরের দিকে যাবে একটু ঘুরতে ।
শান্ত নিচু স্বরে মুখ খুললো এবার…
” তাহলে এতো দিন সারফারাজের সাথে ছিলো মিহি ?
” বলতে পারিস…ওর আয়ত্তে ছিলো এক প্রকার ।
” সারফারাজই সাফি ? তাহলে আমরা যাকে দেখেছিলাম , সে কে ?
” সাজানো কেউ, ওকে সাফি সাজিয়ে আমাদের সামনে তুলে ধরা হয়েছিল ।
” এসব সারফারাজ করেছে ?
” ও নয়তো কে ? এসব করার জন্যই হয়তো ফিরে এসেছে….
” মিহি সেইভ নয় !
” তাইতো কাল থেকে এক মুহুর্তের জন্যও ছাড়িনি ওকে । আর ছাড়বোও না…
” ও কোথায় এখন ?
” যেখানেই থাক , খুব তাড়াতাড়ি সামনে আসবে ও নিজেই ।

কথা শেষ হয়েছে কি হয় নি , আচমকা ওদের চলন্ত গাড়িকে ওভারটেক করে একটা ট্রাক দাঁড়ালো সামনে । তড়িঘড়ি করে গতি কমিয়ে অকস্মাৎ ব্রেক কষলো রাফি । ওরা চারজনই জড়তায় হেলে পড়লো সামনের দিকে । ঝট করে মাথা তুললো রাফি । পিছনে তাকিয়ে মিহি আর রুহিকে দেখে আতঙ্কিত হয়ে শুধালো…
” ঠিক আছিস তোরা ?
হ্যাঁ সূচক মাথা নাড়লো দু’জনেই । রাফি ঘাড় ঘুরিয়ে সামনে তাকালো । ট্রাকটা থমকে । চোখের পলকেই আরো একটা কালো কিচকিচে কালো গাড়ি পাশ কাটিয়ে সামনে দাঁড়ালো ওদের । গাড়ির দরজা খুলে নামলো সাফি । আঁতকে উঠলো মিহি । নাকের ডগায় ওয়ান টাইম টেপ । চোখ মুখো ভঙ্গিমা বিভৎস ।
রুদ্ধ গলায় ঢোক গিললো মিহি । রুহি চোখ সরু করে তাকিয়ে রইল কিছুক্ষণ ‌। হয়তো মনে করার চেষ্টা করলো । চেহারা খানা স্পষ্ট নয় ।
রাফির চাহনি দেখে মনে হচ্ছে স্বাভাবিক । শান্ত পাশ ফিরলো ওর দিকে । রাফি সোজাসুজি নিরেট কন্ঠে আদেশ ছুঁড়ল রুহি, মিহির উদ্দেশ্যে…

” গাড়ি থেকে কেউ নামবে না । বাইরে যাই হয়ে যাক না কেন , তোমাদের পা যেন গাড়ির বাইরে না পড়ে ।
অতঃপর ঘাড় ঘুরিয়ে পিছন ফিরলো । কন্ঠ নরম করে মিহির ভীত নয়নের দিকে তাকিয়ে বললো…
” মিহি ,, আমার কথা শোনো , গাড়ি থেকে নামবে না । ওকে ?
মিহি মাথা দোলালো জোর পূর্বক । দুই ডোর লক করে চোয়াল শক্ত করলো রাফি । শান্ত সহ নামলো গাড়ি থেকে ।
গাড়ির সামনে দাঁড়াতেই ক্যাট ক্যাট করে গা দুলিয়ে হাসলো সারফারাজ..
” ইশশ্ ,,, শান্ত যে । কেমন আছিস ব্রো ? নাইস টু মিট ইউ..! কতদিন পর দেখলাম বল ?
এই দেখ না , রাফি টা কি শক্ত মার মেরেছে
আমায় ! একদম ব্যাথায় থেঁতলে গেছে নাকটা । কদিন পর বিয়ে করবো আমি , এভাবে কি আর বিয়ে করা যায় বল ?
বন্ধু হয়ে বন্ধুর প্রতি মায়া করলো না একটুও ‌। আমার বউটা কেও কাল থেকে নিজের দখলে রেখেছে । সুযোগ হীনা আমি এখনো কিছুই করতে পারলাম না ওর সাথে । না জানি রাফি কাল কি কি করলো ওর সাথে…
ক্ষিপ্ত তায় গর্জে উঠলো রাফি….

” সারফারাজ ,,, মাইন্ড ইউর ল্যাঙ্গুয়েজ..? ওকে টানবি না এখানে ।
” টানবো না কেনো ভাই ? ওকেই তো টানাটানি করবো । আফটার অল , ওকে তুই কি যেন বলে , লাভ করিস ! তাই না ? রুজান রাফি চৌধুরী তো ভালোবাসে ওকে । ওকে টানবো না তো কাকে টানবো ?
ওকেই তো টানতে হবে । অবশেষে রুজান রাফি চৌধুরীও ভালোবেসেছে কাউকে ! ইন্টারেস্টিং । ইন্টারেস্ট বাড়িয়ে দেই আরো একটু , কি বলিস ?
রাফি শক্ত চোয়ালে নিজেকে সংযত করতে ব্যস্ত । সাফি হাসলো । হাসতে হাসতে হেলে দুলে এগোলো । গাড়ির গ্লাস ভেদ করে সোজাসুজি মিহি কে দেখে ফিচেল হেসে ডাকলো…
” হেয়,বেইবি ডল .. কাম হেয়ার !
এইদিকে এসো বেইব । আই’ম ওয়েটিং পর ইউ । হাবির বেস্টুর সাথে রাত কাটানোর ফিলিংস শেয়ার করবে না আমার সাথে ?
মিহি চোখ মুখ কুঁচকে সিটিয়ে গেলো । রুহি কিংকর্তব্য বিমূঢ় হয়ে একে একে একেক জনের দিকে তাকাচ্ছে । পুনরায় গর্জে উঠলো রাফি…

” সারফারাজ ,, আমি বলেছি মুখের ভাষা ঠিক কর তোর ।
” ঠিক করবো না , কি করবি ? তুই খারাপ করলে দোষ নেই , আর আমি খারাপ বললেই দোষ ?
চল ,এসব বাদ দেই । লুকোচুরি থেকে বেরিয়ে আসি এবার । অনেক কথা জানার জন্য তোর মনটা যে ব্যাকুল হয়ে আছে আমি জানি । সব বলবো আজ তোকে । আগে তুই বল , তুই যে মানুষ খুন করেছিস এটা বলেছিস তোর বোন আর বোনের বান্ধবী – আমার বেইবি ডল কে ?
শেষের কথা গুলো দাঁত পিষে বললো । চোখ মুখ শক্ত করে হাত মুঠো করলো রাফি । রুহি মিহি তৎক্ষণাৎ চাওয়া চাওয়ি করলো একে অপরের দিকে । রুহি বললো বিড়বিড় করে…
” পাখি ,, ও সাফি ? কি বলছে ও এসব ? ভাইয়া কে কি বলছে এসব…
মিহি ঢোক গিললো । সাফি রাফির চারপাশে গোল গোল করে চক্কর কাটতে কাটতে আবারো বললো…
” বলিস নি হয়তো , তাই না ? নিজের কু- কির্তির কথা এভাবে বলাও যায় না । কিন্তু আমি তোর মতো নোই । আজ বলি আমার কিছু কু- কির্তির কথা ? চল , রেডি ?
মিহি পাখি… মাহিতা ইসলাম মিহি । মেয়েটা ভালো । পাঁচটা বছর পর দেশে আসলাম তোর জন্য , তোর কাছ থেকে হিসেব তোলার জন্য ।

এসেই ওকে যেদিন দেখলাম , কেনো যেনো ভালো লেগেছিল । তবে পাত্তা দেই নি । দেশি জিনিসে ইন্টারেস্ট নেই এখন আর । তবে ওর প্রতি কোনো যেনো ইন্টারেস্ট জন্মালো । কবে জন্মালো জানিস ? ঐ যে তোর একটা বোন আছে না , মেহজাবিন না কি নাম ? ওর বিয়ের আগে হলুদের রাতে ওকে ছোঁয়ার পর ইন্টারেস্ট জন্মালো ওর প্রতি !
রাফি ঝট করে চাইলো । সাথে সাথে শান্ত ও । মিহি থমকালো এক মুহুর্ত । কি বলছে ইনি ?
রাফির দৃষ্টি দেখে হাসলো সাফি ,গা দুলিয়ে অদ্ভুত ভঙ্গিতে । হাসি থামিয়ে মুখখানা বিকৃত করলো । বললো পর মুহুর্তে…
” কি বলতো ,, আমার কলিজার টুকরা বোনকে মেরেছিলি না ? মনে নেই ! মেরেছিলি তো আমার বোনকে । বোনের প্রতিশোধ বোন দিয়েই নিতে চেয়েছিলাম ।
মনে আছে , সেই রাতে মিহির সাথে কি ঘটেছিল ? দেখেছিস তো সিসি ক্যামেরায় ! খুঁজেছিস আমায় , পাস নি ! পাবি কি করে ? আমি তো ধরাই দেই নি তোর কাছে ? তুই যে গাছে উঠেছিস , সেই গাছে উঠিই নি আমি । কি বলতো ,যদি ধাক্কা দিস, তাহলে পড়ে মরবো তো । অকাল মরন চাই না আমার । তোকে না মেরে তো আরো ও না ।
আমার বোনের মতো তোরও একটা সুন্দর বোন আছে , তাই না ? দেখতে কিন্তু এখন বেশ কড়া হয়েছে ।
কথা শেষ হতেই রাফি কিছু করার আগেই হিংস্রের ন্যায় গর্জে উঠলো শান্ত । চুপ চাপ থাকতে পারলো না আর । হিংস্র থাবা বসালো সাফির কলারে । কলার চেপে ধরলো বজ্রের ন্যায় । দাঁত পিষে গুমড়ে উঠলো….

” খবরদার ,, জিভ টেনে ছিঁড়ে ফেলবো । নল টুটি জ্বালিয়ে দেবো একদম । চোখ উপড়ে ফেলবো যদি ওর দিকে কু দৃষ্টিতে তাকাস…
চমকে উঠলো মিহি রুহি । একে অপরের হাত শক্ত করে ধরে সিটিয়ে গেলো দু’জনে । সাফি শান্ত রইলো । শান্তর শক্ত হাত ধীরে ধীরে সরাতে সরাতে বললো…
” কাম ডাউন ব্রো । এতো উত্তেজিত হওয়ার মতো কিছুই হয় নি এখনো । বাকি কথা গুলো শোন আগে ।
ওর দিকে তো শুধু তাকাই নি । আরো কিছু করতে চেয়েছিলাম । ছুঁতে চেয়েছিলাম ওকে । ভীষণ ভাবে ছুঁতে চেয়েছিলাম । গাঢ় দাগ ফেলতে চেয়েছিলাম ওর শরীরে ।
এবার একটা শক্ত ঘুষি পড়লো সাফির চোয়ালে । ছিটকে দূরে পড়লো ও । মুহুর্তেই পিছনের ট্রাক থেকে দনদন করে নামলো কতগুলো বখাটে । ওরা তেড়ে আসতে গেলে হাত উঁচিয়ে থামিয়ে দিল সাফি । নিজেকে স্বাভাবিক করে হাসলো অস্বাভাবিক । ঘুষিটা পড়েছে শান্তর শক্ত হাত হতে । শান্ত আবার ছুটে যেতে গেলে আটকে দিলো রাফি,, ফুঁসে উঠলো সে….

” জানোয়ার , ভুলে যাস না ও আমার বোন । কোনো এক সময় বোনের স্নেহ দিয়ে বোনের জায়গায় বসিয়েছিলি ওকে ।
” সেসব তো অনেক আগের কথা… বোন তো তুইও ভেবেছিলি আমার বোনকে , আর এটাই কাল হলো আমার বোনের জন্য । তোর বোন বোন আর আমার বোন বোন না ?
বললাম না , বোনের বদলে বোন ! তোর বোন তোর কাছে যতটা প্রিয় , যতটা প্রাণ ভোমরা তোর , আমার বোন ও ঠিক ততটাই প্রাণ ভোমরা ছিলো আমার । জান ছিলো ও আমার । কলিজার অংশ ছিলো । জানিস তো তোরা !
আরে তুই তো এটাও জানতিস আমার বোন তোকে ভালোবাসে , কিন্তু কি করলি তুই ? আমার বোনের আবেগ , অনুভূতি , মনটা ভেঙে দিলি ? মেরে দিলি ওকে ? জানটা নিয়ে নিলি ওর ? আরে ওকে এই দুহাতে কবরে শুইয়েছিলাম আমি , জানিস , ওর খাটিয়ার ভার বইতে হয়েছে আমায় । পাগল হয়ে গেছিলো আমার বাপ মা । খবর রেখেছিস কিছুর ? বোনটাকে মেরে দিলি আমার ?
বলতে বলতে চোখ ছাপিয়ে পানি গড়িয়ে পড়লো সাফির । পিছনে পেছালো দুই কদম । কাঁদতে কাঁদতে পাগলের মতো হেসে উঠলো খ্যাক খ্যাক করে । পিচ ঢালা রাস্তায় বসলো দপ করে । দুই হাঁটু জড়িয়ে বিলাপ করতে লাগলো…

” তোর জন্য আমার বোন মরেছে । আমিও তোর বোনকে মরার রাস্তায় পৌঁছাতে চেয়েছিলাম । সম্মান নষ্ট করে মরার পথ দেখাতে চেয়েছিলাম ওকে ।
কিন্তু মাঝ পথে আসলো এই মিহি । সেদিন রুহির জায়গায় মিহি এসে পড়েছিল । কে জানত ও আসবে ? তবে এসে ভালোই করেছিলো, তখন তো জানতে পারলাম কে এই মিহি ! একটা মেয়ের প্রতি রুজান রাফি চৌধুরীর এমন আচরণ প্রথম বার দেখলাম সেদিন । রাফি তো এমন নয় , আমি তো ওকে হাড়ে হাড়ে চিনি । কোনো মেয়ের দিকে তাকানো তো দূর ছিল রাফির কাছে, কিন্তু সেই রাফি কি করলো , কতো সুন্দর করে মিহি কে জড়িয়ে সামলালো ওকে । সেদিন নিজের চোখ কে বিশ্বাস হয় নি । পড়ে খোঁজ চালালাম , বুঝলাম – রুজান রাফি চৌধুরী ভালোবেসে ফেলেছে মাহিতা ইসলাম মিহি কে । উফ্ কি প্রেম ? প্রথম প্রেম ! বান্ধবীর বোনকে এক পলক দেখেই প্রেমে পড়লো রুজান রাফি চৌধুরী ! বিরাট একটা হ্যাশট্যাগ !
তখন মাথায় অন্য কিছু আসলো । প্লান আসলো নতুন । তোর বোন তো তোর প্রাণ । আর মিহি,তোর নিঃশ্বাস । এই নিঃশ্বাস টাকে না হয় আটকে দিলাম । যে কষ্ট আমার বোন পেয়েছে , সেই একই কষ্ট তোকে দিলে মন্দ হয় না । ভালোবাসায় না হয় তুইও মরলি , যেভাবে আমার বোন মরেছে ।
রাফির এবার শান্ত কন্ঠ…

” তোর বোন সাইকো ছিল । মাথায় সমস্যা ছিলো ওর ।
” তাই বলে কি ওকে ভালোবাসা যেত না ? পাগল হয়েও তো ও তোকে ভালোবাসলো । তাহলে তুই কেনো বাসলি না….
” তোর বোনের জাস্ট একটা প্যাশন ছিলাম আমি । ও জেদ দেখিয়ে আমার কাছে আসতে চেয়েছিল । আমার প্রতি কোনো ভালোবাসা ছিল না ওর মাঝে ।
” কি ছিল কি ছিল না আমি জানি না । শুধু জানি তোর জন্য আমার বোন মরেছে ! তুই মেরেছিস ওকে । এখন আমি তোকেও বাঁচতে দেবো না । আমার বোন তোকে পায়নি । তোকে আর কেউ পাবে না । মিহি কেও পাবি না তুই । সেই জন্যই তো দূরে সরিয়েছিলাম ওকে । আগেই সরাতাম , যেদিন জানতে পেরেছিলাম তারপর থেকেই সম্পর্ক গভীর করতে শুরু করেছিলাম ওর পরিবারের সাথে । একটু মিশেছি কি মিশি নি , ওর বাপ মা তো জামাই ভাবতে শুরু করলো আমায় । মেঘ না চাইতেই একেবারে বৃষ্টি ।

মিহি কে তোর কাছে অতদিন এমনি এমনি রেখেছিলাম নাকি , চাইলে আগেই সরাতে পারতাম । কিন্তু সরাই নি ,, ওর প্রতি তোর অনুভূতির মাত্রা বাড়িয়ে সরালে চুলকানি বাড়বে তোর । তখন নিজে থেকেই তড়পে তড়পে মরবি । তাই তো ধরা দেই নি তোর সামনে । আর একটা বিষয় ভালোই হয়েছে , আমার সাফি পরিচয় টা । ভাঙ্গিস ওদের সামনে সাফি পরিচয়ে ছিলাম আমি । তুই খুজেছিলি সাফি কে , দেখেছিসও তো । হুমকি দিয়েছিলি তো সেই সাফি কে তাই না ? যেন মিহির ত্রিসীমানায় ও না যায় ও ! আহারে , এতো জ্বেলাসি ? কিন্তু রং টার্গেট ব্রো ,, ও তো সাফিই ছিলোই না । আমার লোক ছিল ও । যে সাফি সেজে তোর চোখে ধরা দিয়েছিল । কিন্তু ওর ব্যাড লাক… মেরেছিস তো ওকে তাই না ? সিলেটের মাটিতেই তো পুঁতে দিয়েছিস ? মিহি কে তোর থেকে দূরে সরানোর অপরাধে !
দ্বিতীয় খুনটাও করলি জীবনে ? এতোটা প্রেম ? প্রেমের জন্য খুন ? ব্রাভো ব্রো , ব্রাভো !! তুই এতোটা প্রেমিক পুরুষ জানা ছিল না আমার ! আর এতটা স্টুপিড, এটাও জানা ছিলো না । তোর নাকের ডগায় থেকে মিহি কে দূরে সরালাম , আর তুই টেরও পেলি না । ওর বাপটা মরে ভালোই হয়েছে । বুড়ো মরে সুযোগ করে দিয়েছে আমায় ।

এক দেখায় পর্ব ৪৩

মিহি কেঁপে উঠলো আব্বুর প্রসঙ্গে । এতক্ষণ মূক বনে তাকিয়ে শুনছিলো ? কি সব শুনলো ও ? মাথা কাজ করছে না ? সাফি এতো কিছু করেছে ? আর রাফি ? রাফি খুন করেছে । কেঁপে উঠলো মিহির চিত্ত । রুহি বিমূর্ত । নড়ছে না একটুও । এতো কিছু ঘটে গেছে আড়ালে । সাফি কে ও যেদিন প্রথম দেখেছিল , চেনা লেগেছিল একটু । আগে কতো দেখেছে সাফি কে ? এই কারনেই চেনা লেগেছিল তাহলে ? কিন্তু কিসব বলছেন উনি ? কে কাকে ভালোবাসতো ? আর রাফি খুন করেছে মানে ? রুদ্ধ গলায় ঢোক গিললো রুহি । মিহির মাথা চক্কর দিয়ে উঠছে । কন্ঠ নালি শুকিয়ে যাচ্ছে । গরম ধোঁয়া বেরোচ্ছে কান দিয়ে । চোখ গরম হয়ে আসছে । এই যেন শ্বাস আটকাবে গলায় !

এক দেখায় পর্ব ৪৫