এক মুঠো চাঁদের আলো পর্ব ২
নুসরাত ফারিয়া
-“আমার সাথে এমনটা কেন করলে দাদাজান? তুমি জানতে, আমি বিয়ে নামক বন্ধন থেকে নিজেকে কতটা দূরে সরিয়ে রেখেছিলাম। তবুও তোমার জন্য, শুধুমাত্র তোমার জন্য এই বিয়েটা করলাম। কারণ আমি চাইনি, আমার জন্য আমার দাদাজান কষ্ট পাক! তার শেষ ইচ্ছেটা অপূর্ণ থাক! কিন্তু তুমি কি করলে? আমার ডিপার্টমেন্টের ছাত্রীর সাথেই আমাকে বেঁধে দিলে? যাকে আমি একটুও পছন্দ করি না, অথচ আজ সে আমার ওয়াইফ! আমার ভাগ্যের উপর রীতিমতো হাসি পাচ্ছে। ট্রাস্ট মি দাদাজান! তোমার থেকে এমনটা কখনো আশা করেনি। দিনশেষে তুমি মানুষটাও আমাকে চিনলা না। এই অসহনীয় ব্যথা-টা কোথায় রাখি, বলো তো….দাদাজান?”
ভোররাতে সোবহান খান নামাজ আদায় করে বাগানে এসেছিলেন, হাঁটাহাঁটি করার জন্য। এটা উনার নিত্যদিনের অভ্যেস। সকালের শীতল বাতাসটা উনি গায়ে মাখাতে বেশ পছন্দ করেন। একই সঙ্গে বাগানে থাকা হরেকরকমের ফুল-ফল, ঔষধ গাছের ঘ্রাণ নিতেও খুব ভালোবাসেন। পাখিদের মিষ্টি সুরে গাওয়া গান, কিচিরমিচির শব্দও বেশ উপভোগ করেন। বলতে গেলে, মানুষটা একদম প্রকৃতি প্রেমি! পূর্বপুরুষদের ভিটা-জমি সব গ্রামে। উনার জন্ম গ্রামে হলেও পড়ালেখা ও চাকরির সুবাদে শহরে আসা। তারপরই এখানে চিরস্থায়ী হয়ে নতুন সংসার পাতা! মানুষটা আজও নিজের গ্রামে কাটানো কিশোরকাল বড্ড মিস করেন। বারবার ছুটে যেতে ইচ্ছে করে ওই দূরে সবুজ, প্রাণখোলা গ্রামের বাড়িতে। কিন্তু চাইলেই তো আর সব সম্ভব নয়! নিজের প্রিয়তমা হারিয়ে এই বৃদ্ধ বয়সে বউমা, নাতি-পুতিকে আঁকড়ে ধরেই উনার বেঁচে থাকা।
বহুদিন পর আজ একমাত্র ছেলের কথা খুব মনে পড়ছিল সোবহান খানের। শিশিরে ভেজা, তাজা সবুজ ঘাসের ওপর দাঁড়িয়ে আনমনে চেয়ে ছিলেন ওই দূর আকাশের দিকে। আজ যদি উনার ছেলে ও বড় বউমা বেঁচে থাকত, তাহলে নিশ্চয়ই খুব খুশি হত। নিজের চোখে ছেলের বিয়ে, ছেলের বউ, নাতিপুতি, সংসার দেখতে পাওয়াটাও ভাগ্যের বিষয়। যেটা সব মানুষের থাকে না! ঠিক তেমনই উনার ছেলে ও বড় বউমার নেই। এসব ভেবে দীর্ঘশ্বাস ফেলে সোবহান খান পিছনে ফিরতেই দেখতে পেলেন, তার বড় নাতি আধার খান গম্ভীর মুখে দাঁড়িয়ে আছে। তিনি কিছু বলার আগেই আধার একের পর এক অভিযোগ তুলে ধরল তার দাদাজানের কাছে। সবটা শুনে মোটেও চিন্তিত হলেন না সোবহান খান। হয়তো তিনি আগে থেকেই জানতেন, তার নাতি সাত সকাল এসে এমন কিছুই বলবে। কারণ তিনি কামই করেছে এমন! নাতির আহতভরা চোখের দিকে তাকিয়ে শান্ত গলায় জানতে চাইলেন,
-“তুমি আমার নাতবউকে কেন পছন্দ করো না?”
দাদাজানের প্রশ্নের প্রতিত্তোরে জবাব দিল আধার,
-“কারণ ওই মেয়েটা একটা দস্যি! একদম বাঁচাল টাইপের। সবসময় এমন কিছু অঘটন ঘটিয়ে বসে থাকবে, যেটা বিপরীত মানুষকে বিপদে ফেলে দেয়। কোথায় কি বলতে হয় সেটাও জানে না। মেয়ে মানুষের মুখের ভাষা এত বাজে হতে পারে সেটা ওই মেয়েটাকে না দেখলে জানতামই না। সাধারণ কনমসেন্স বলতেও কিছু নেই! এই তো, কয়েক মাস আগেই আমার সাবজেক্টে ডবল জিরো পেয়ে ফেল করেছে। অথচ খুশির ঠেলায় পুরো ডিপার্টমেন্ট মিষ্টি বিতাড়ন করেছে। ভার্সিটিতে গেলে সারাক্ষণ ধেইধেই করে ঘুরে বেড়ায়। সাথে নিজের মতো কয়েকটা পাগলকে জুটিয়ে গিটার নিয়ে কিচিরমিচির করতে থাকে। পুরো ভার্সিটিকে অতিষ্ঠ বানিয়ে রাখে। আর তুমি এমন মেয়েকেই আমার গলায় বেঁধে দিলে? ওই মেয়েটাকে তো পাবনায় রাখা উচিত ছিল। ডিজগাস্টিং একটা মেয়ে!”
একনাগাড়ে কথাগুলো বলে থামল আধার! ওই বেয়াদব মেয়েটার ঘটানো ইতিহাসের শেষ নেই। সবটা যদি বলতে শুরু করে তাহলে সকাল গড়িয়ে রাত হয়ে যাবে, তবুও মেয়েটার কুকীর্তিগুলো বলা শেষ হবে না।
সোবহান খান নাতির বলা অভিযোগ শুনে ঠোঁট চেপে হাসলেন। সেটা লক্ষ্য করে আধার গম্ভীর মুখে বলল,
-“আমি কোনো কৌতুক বলি নাই দাদাজান! আর না এখানে হাসার কোনো বিষয় রয়েছে। আ’ম সিরিয়াস!”
-“দেখো নানুভাই! তুমি একটু বেশিই ভাবছো। মেয়েটা বাঁচাল না! ও খুব সহজসরল একজন মাইয়া। যেটা মনে আসে ওটাই বলে দেয়। এতে খারাপের কিছু দেখছি না তো! আমার নাতবউ চঞ্চল প্রকৃতির মেয়ে, আর তুমি তার উল্টোটা। তাই এমন রিয়াক্ট করছো। কিছুদিন একসাথে থাকো, সংসার করো, তারপর বুঝবা তোমার দাদাজান ক্যান এমনটা করছে।”
সোবহান খানের কথা শুনে আধারের কপাল কুঁচকে গেল। যেখানে সে ওই মেয়েটার সাথে এক মূহুর্তের জন্য থাকতে চাচ্ছে না, সেখানে কি-না সংসার করবে? তাও আবার ওই আধপাগল মেয়ের সাথে? অসম্ভব! সে এটা কিছুতেই করতে পারবে না।
-“দুঃখীত দাদাজান। তোমার এই কথাটা রাখতে পারব না। কারণ আমার ডিভোর্স চাই!”
নাতির মুখে ডিভোর্সের কথা শুনে সোবহান খান চমকে উঠলেন। তড়িঘড়ি করে কাছে এগিয়ে এসে বললেন,
-“এমন অলক্ষ্যে কথা বলতে নেই নানুভাই। আমাদের সঙ্গে এখন একটি নতুন পরিবারও যোগ হয়েছে। তারা খুব আশা করে আমাদের ঘরে নিজেদের আদরের মেয়েকে দিয়েছে। নাতবউয়ের বাবা তো তাকে এত তাড়াতাড়ি বিয়েই দিতে চাননি। অথচ আমার এক কথায় রাজি হয়ে নিজের কলিজার টুকরোকে দিয়েছে। আর সেখানে তুমি ডিভোর্সের কথা বলছো?”
-“হ্যাঁ বলছি! কারণ তুমি আর কোনো পথ খোলা রাখোনি দাদাজান।”
-“তাহলে আমার কথাও শুনে রাখো নানুভাই! তুমি যদি আমার নাতবউরে ডিভোর্স দাও, তাহলে আমি এই বাড়ি ছাইড়া চইলা যামু।”
দাদাজানের কথা শুনে আধার দাঁত কিড়মিড় করল। এই বুড়োটা সবসময় তাকে ইমোশনাল ব্ল্যাকমেইল করে। তার ভালোবাসার মানুষ বলতে এই একজনই রয়েছে। তাই তো সবসময় বাধ্য হয়েই সবকিছু মেনে নেয়। চাইলেও সে তার দাদাজানকে হার্ট করতে পারে না। অথচ এই মানুষটাকে-ই আজ খুব অপরিচিত লাগছে তার কাছে।
-“চ-চা!”
পেছন থেকে চিকন মেয়েলি কণ্ঠস্বর শুনে দাদা-নাতি দুজনেই ঘাড় ঘুরিয়ে তাকায়। আলো মাথায় এক হাত লম্বা ঘোমটা তুলে, মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে। লাল টুকটুকে মেহেদী রঙা দু’হাতে চায়ের ট্রে ধরে রেখেছে। পরণে সুতির সেলোয়ার-কামিজ! সোবহান খান আলোকে দেখে মুখে লম্বা একটা হাসি টেনে এগিয়ে গিয়ে মাথায় হাত বুলিয়ে আদুরে কণ্ঠে বললেন,
-“এত সকালে উঠেছো কেন? আর রান্নাঘরেই বা কেন গিয়েছো?”
আলো মুখ তুলে ধীর কণ্ঠে বলল, -“ঘুম ভেঙ্গে যাওয়ার পর আর ঘুম আসছিল না দাদুভাই। তাই নামাজ পরে বাহিরে এলাম। আর আমি রান্নাঘরে যাইনি। এটা তো শেফালি চাচি নিয়ে আসছিল তোমার জন্য। উনার কাছ থেকেই আমি নিয়ে এলাম। তুমি তো জানো দাদুভাই, আমি আবার রান্নাবান্না খুব একটা পারি না।”
শেষের কথাটা ফিসফিসিয়ে বলে আলো। সেটা শুনে সোবহান খান খুকখুক করে কেশে আড়চোখে নাতির দিকে তাকায়। আধার নিজের ফোনে ব্যস্ত! তার এইদিকে কোনো খেয়াল নেই। সোবহান খান কিছু না বলে নাতিবউয়ের হাত থেকে চায়ের কাপ নিয়ে ধীর কণ্ঠে শুধালেন,
-“তোমার জামাইকে বলেছো নাকি, আমরা আগে থেকেই পরিচিত?”
আলো দুইদিকে মাথা নাড়িয়ে বলল, -“না দাদুভাই। এখনো বলিনি। তবে আমি তোমার উপর খুব অভিমান করেছি।”
-“কেন? আমি আবার কি করলাম?”
-“তুমি এত বড় একটা অঘটন ঘটিয়ে এখন বলছো, আমি আবার কি করলাম? মানে সিরিয়াসলি দাদুভাই?”
সোবহান খান চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে বললেন,
-“আমি যা করেছি, তোমাদের ভালোর জন্যই।”
-“ভালো না ছাই। তুমি মিষ্টি মিষ্টি কথা বলে আমাকে ভুলিয়ে ভালিয়ে এই হিটলার স্যারের সাথে বিয়ে দিয়েছো। আমি এখন বুঝতে পারছি, তুমি আগে কেন বলো-নি এই উজবুক ব্যাটা তোমার নাতি! যদি বলতে তাহলে আমি বিয়ের রাতে দেয়াল টপকে হলেও পালিয়ে যেতাম। তবুও তোমার বদমাইশ নাতির বউ হতাম না। তুমি এমনটা না করলেও পারতে দাদুভাই।”
আলো গোমড়া মুখ করে তাকায়। সে এই মানুষটাকে বিশ্বাস করেছিল। সাথে খুব ভালোও বাসে, একদম নিজের দাদার মতোই। কখনো সে দাদা-দাদির, নানা-নানির ভালোবাসা পায়নি। এই মানুষটার সাথে অনাকাঙ্ক্ষিত ভাবে পরিচিত হওয়ার পর থেকেই দাদার ভালোবাসা কেমন, সেটা উপলব্ধি করতে পেরেছে। তাই তো খুব কম সময়ের মধ্যে মানুষটার সাথে মিশে গেছে। যখন জানতে পারল, এই মানুষটার নাতবউ হতে চলেছে, তখন সে খুশিতে প্রায় কেঁদে দিয়েছিল। কারণ সে কখনোই চায়নি এই মানুষটার এত ভালোবাসা থেকে বঞ্চিত হোক। তারওপর নিজেরও বিয়ে করার খুব শখ ছিল। আর এত ভালো একটা মানুষের নাতবউ হতে পারাটাও ভাগ্যের ব্যাপার ছিল। তাই তো নাচতে নাচতে রাজি হয়ে গিয়েছিল বিয়ের জন্য। সাথে মানুষটার মিষ্টি মিষ্টি কথা তো ছিলই! কিন্তু এখন ইচ্ছে করছে, কঁচু গাছের সাথে ফাঁ’সি দিতে। নাচতে নাচতে বিয়ে করার মজা এখন হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছে।
সোবহান খান আর কথা বাড়ালেন না। বরং নাতবউকে ইশারা করে বললেন, -“যাও, যাও! তোমার স্বামীজানকে গিয়ে চা দাও। নয়তো ঠান্ডা হয়ে যাবে।”
আলো হাতে থাকা চায়ের দিকে তাকায়। এটা সে নিজের জন্য এনেছিল। একটুও ইচ্ছে করছে না ওই লোকটাকে দিতে। রাতে কি নিষ্ঠুরভাবে তাকে ভিজিয়ে দিয়েছিল। এখন তো মন বলছে, এই গরম চা স্যারের মাথার ওপর ঢেলে দিতে। তাহলে একটু ভালো লাগত। তবে আপাতত গুরুজনের কথাই শুনলো। আলো মাথা নাড়িয়ে ধীর পায়ে এগিয়ে গেল তার স্বামীর দিকে।
আধার ফোনে এতটাই ব্যস্ত ছিল যে, সে খেয়ালই করেনি পিছনে আলো এসে সবে দাঁড়িয়েছে। মেয়েটি মাথা নিচু রেখেই দু’হাতে ট্রে বাড়িয়ে দিয়ে কিছু বলার জন্য মুখ খুলতে যাবে, তখনই আধার হুট করে পিছনে ঘুরে সামনে পা বাড়ায়! সঙ্গে সঙ্গে আলোর সাথে ধাক্কা লেগে যায়। ফলস্বরূপ গরম চায়ের কাপ এসে সোজা আধারের জায়গা মতো পড়ে গেল।
-“শীট!”
আধার চেঁচিয়ে ওঠে। হঠাৎ করে এমন হওয়ায় আলো হতভম্ব হয়ে যায়। একই সাথে ভয়ও পেল খুব। এই না আবার তাকে থাপ্পড় মে’রে দেয়। তাই চটজলদি হাঁটু গেড়ে বসে, নিজের ওড়নার অংশ টেনে আধারের ভিজে যাওয়া জায়গা মুছে দিতে দিতে অস্থির গলায় বলে উঠলো,
-“স-সরি, সরি স্যার! আমি খুব সরি। আসলে বুঝতে পারিনি এমনটা হয়ে যাবে। প্লিজ রাগ করবেন না। স-সরি!”
আধার দাঁতে দাঁত পিষে দাদাজানের দিকে তাকায়। যে কি-না এই ভয়ংকর দৃশ্য দেখা মাত্রই উল্টো পথ ধরে, বড় বড় পা ফেলে বাড়ির ভেতর যেতে শুরু করেছে। আধার চোখ বুজে লম্বা লম্বা শ্বাস নিয়ে নিজেকে শান্ত করার চেষ্টা করল। এবং খপ করে একহাতে মেয়েটার হাত চেপে ধরে হিসহিসালো,
এক মুঠো চাঁদের আলো পর্ব ১
-“মিস কালো? আপনি আমার কোথায় হাত রেখেছেন, সেটা একবার খেয়াল করুন।”
স্যারের কথা শুনে আলোর হুঁশ ফিরে এল। সে বড়বড় চোখে সামনে তাকিয়ে চট করে নিজের দু’হাত সরিয়ে নিলো। তারপর আর কোনোদিকে না তাকিয়ে, সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে পিছনে ফিরেই দৌড়ে চলে গেল। ছিঃ! ছিঃ! সে সাত সকাল কামটা করল কি? সোজা স্যারের…..! আস্তাগফিরুল্লাহ! তওবা, তওবা৷ আলো তুই আর জীবনেও ভালো হলি না। ছিহহহহ্!
