Home এমপি তামিম সরকার এমপি তামিম সরকার পর্ব ১০৫

এমপি তামিম সরকার পর্ব ১০৫

এমপি তামিম সরকার পর্ব ১০৫
কায়নাত খান কবিতা

দু’বছর পর নিজেদের ঘরের দোরগোড়ায় পা রাখতেই যেন সময় থমকে দাঁড়ায় সুবহার।
সুবহা নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে থাকে দরজার মাঝ বরাবর। বাকরুদ্ধ, স্তব্ধ, নিঃশ্বাস পর্যন্ত যেন আটকে গেছে কোথাও।ধীর পায়ে ঘরের ভিতরে প্রবেশ করে সে। ইস! কী বিশ্রী গন্ধ। গা গুলিয়ে আসার মতো।
ঘরটা আর শুধু একটা ঘর নেই,এটা যেন একটা অপেক্ষার ইতিহাস।সারা দেয়াল জুড়ে তার নাম—“সুবহা… সুবহা… সুবহা…”

কখনো বড় অক্ষরে, কখনো কাঁপা হাতে লেখা, কোথাও আবার দাগ কেটে মুছে ফেলা—তবুও মুছতে না পারা এক গভীর উপস্থিতি।
খাটের পায়ার সাথে বাঁধা শেকলটা নিঃশব্দে ঝুলে রয়েছে—যেন কোনো উন্মাদ ভালোবাসার নিঃশব্দ স্বীকারোক্তি।
মেঝে জুড়ে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা কাগজগুলো—প্রতিটা পাতায় একই নাম, একই আর্তি, একই অপেক্ষা।
এই ঘরের প্রতিটা দেয়াল, প্রতিটা কোণ যেন সাক্ষী,এই দু’বছর তামিম কীভাবে বেঁচে ছিল না।
সে তো চাইলে পারতো, নতুন করে শুরু করতে, নতুন কাউকে নিজের জীবনে আনতে, সুখের সংসার গড়তে।
কিন্তু কিছু ভালোবাসা থাকে—যেগুলো মানুষকে এগোতে দেয় না, পেছনেও ফিরতে দেয় না।
শুধু মাঝখানে আটকে রাখে… এক অনন্ত যন্ত্রণার ভেতর।
সুবহার ঠোঁট নিস্তব্ধ, কিন্তু চোখ দুটো বিশ্বাসঘাতক হয়ে গেছে।নিঃশব্দেই ঝরতে থাকে অশ্রু।তার বুকের ভেতর এক অদ্ভুত প্রশ্ন জেগে ওঠে।এ কেমন ভালোবাসা?
যেখানে একজন মানুষ নিজের স্বাভাবিকতা হারিয়ে ফেলে, শুধু আরেকজনকে হারানোর শোকে।
নিজেকে ঘৃণা করতে থাকে সে,বারবার, নির্মমভাবে।কেন গিয়েছিল সে সেদিন রেললাইনে?কেন একটা ভুল সিদ্ধান্ত পুরো জীবনটাকে এভাবে ভেঙে দিলো?
যদি না যেতো?
তাহলে হয়তো এই ঘরটা আজ এমন নিঃশ্বাসহীন হয়ে থাকতো না।

—“পরী…?”
তামিমের কণ্ঠ ভেসে আসে পেছন থেকে,ক্লান্ত, তবুও আশ্রয় খোঁজা।সুবহা ধীরে ধীরে ফিরে তাকায়।এই মুহূর্তে তার আর কিছু চাওয়ার নেই,
শুধু এই মানুষটার বুকে একটু আশ্রয়।
একটাও শব্দ না বলে, সে এগিয়ে গিয়ে জড়িয়ে ধরে তামিমকে।যেন সমস্ত অপরাধবোধ, সমস্ত ভাঙা অনুভূতি এক আলিঙ্গনে মিশে যায়।
—“এমন ভেঙে-চুড়ে কে কাকে ভালোবাসে, তামিম…?”
তামিম হালকা হাসে, কিন্তু সেই হাসির ভেতরেও ক্লান্তি লুকানো। আজ কতদিন পর সে সুবহাকে পলো এতো কাছে। এতো আপন করে।

—“আমি বাসি। তোমাকে বাসি। খুব… খুব বেশি ভালোবাসি।”
সুবহার গলা কেঁপে ওঠে,বার বার একটি কথায় মনে হতে থাকে।
—“আমি যদি সত্যি সত্যি ম—”
—“কানের নিচে লাগাবো।”
তামিম হঠাৎ গম্ভীর হয়ে ওঠে, চোখে এক ঝলক ভয় আর রাগ, সে যেন কিছুতেই তাকে হারাতে চায় না। কল্পনাতে ও নয়।
—“এসব কথা মুখে আনবে না।”
সুবহা চুপ করে তাকিয়ে থাকে তার দিকে।
তারপর আলতো করে হাত তুলে তামিমের গালে ছুঁয়ে দেয়।একটা স্পর্শ, যেখানে ক্ষমা আছে, কৃতজ্ঞতা আছে, আর একটু ভালোবাসার লাজুক স্বীকারোক্তি।
—“You are the best husband ever, তামিম…”
—“ইতিহাস স্বাক্ষী থাকবে।”
—“কী নিয়ে?”
—“এই যে, কোনো বউ তার স্বামীকে বেস্ট বলছে!”
হালকা দুষ্টুমি মেশানো কণ্ঠে বলে,—“বেডি মানুষ আর যাই করুক, জামাইয়ের এত তারিফ করে না।”
এই কথায় হালকা একটা নিঃশ্বাসের হাসি বেরিয়ে আসে সুবহার ঠোঁট থেকে।দীর্ঘদিন পর, খুব ছোট্ট, তবুও সত্যি।তারপর হঠাৎই সে চারপাশে তাকাতে থাকে।দেয়াল, খাট, কাগজ, শেকল কিছু একটা খুঁজছে সে।

__কী খুঁজো বেডি মানুষ?”
__লাঠি!”
__কেন?’’
__স্বামী পেটাবো।”
__এতোদিন পর কাছে পাইছি। কই একটু ১৯/২০ করবো তা না। বেডি মানুষের জাতই খারাপ।”
সুবহা রেগে তামিমের চুল খামচে ধরে। এতোটাই জোড়ে ধরে তামিম বাঁকিয়ে যায়।
__শয়তান ছেমড়ি ছাড়। ব্যাথা পায়।”
__আপনি এই দু-বছর আমাকে না খুঁজে পাগল কীভাবে হলেন তামিম?”
সুবহার কথা শুনে তামিম ‘থ’ মেরে যায়। একে তো সে পাগল হয়ে গেছিলো। নিজের ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেছিলো। কিন্তু সুবহার সেদিকে খেয়াল নেই। তার খেয়াল রয়েছে তামিম কেন তাকে দু-বছর খুঁজতে গেলো না? কেন সে পাগল হলো তাকে না খুঁজে।
__বাহ রে বেডি মানুষ বাহ। তেরা কই জাবাব নেহি হে। জামাই পাগল হওয়া জীবন কাটায়,হেতি আইসা রাগ করে।কেন খুঁজতে গেলো না। বাহহ।”
__একে তো আপনি দু-বছর ধরে পাগল ছিলেন। আমাকে খুঁজে বের করলেন।তার উপরে এসব ভুলভাল লজিক দিচ্ছেন?”

__যেখানো গল্পটাই লজিকলেস। সেখানে তুই লজিকের কথা কস কেমনে বোনই?”
__বউকে বোন ডাকা হারাম ভাই টু।”
তামিম কিছু না বলে টি-টেবিল থেকে পানির জগ নিয়ে পুরোটা মাথায় ঢালে নিজের। তার বউ যত বড় হচ্ছে ততই লজিকের মা-কে সালাম দিচ্ছে।
তামিমের এমন অদ্ভুত কান্ড দেখে পাশ কাটিয়ে সুবহা বাইরে চলে যায়। কারণ তার ভাই মা-রা যাওয়ার সময় সে ছিলো না। ভাইকে শেষ বার সে দেখতে পারেনি। কিন্তু তার কবর তো দেখতে পারবে। ঘর থেকে বের হওয়ার আগে সুবহা তামিমের দিকে তাকায়।
__আমি আসার আগে রুমটা যেন পরিষ্কার হয়ে যায়। না-হলে রাতে সরকার বাড়ির বাইরে ঘুমাতে হবে।”
__যেমন আপনার ইচ্ছা ম্যাডাম।”
সুবহা গটগটিয়ে বেরিয়ে পরে ঘর থেকে। তামিম তখনও ফ্লোরেই বসা। সুবহা যেতেই পঞ্চ পাণ্ডব এসে হাজির হয়।
__ভাই!”

পাঁচ জন একসাথে ভাই বলাতে তামিম একটু চমকে উঠে।
__শালার ভাইরা। কলিজা কাঁপাইয়া দেস কেন?”
পঞ্চ পাণ্ডব কোনো কথা না বলে, সোজা এসে তামিমকে জড়িয়ে ধরে। দু-বছর পর এটা প্রথম বার ছিলো যখন তারা তামিমকে স্বাভাবিক রুপে দেখছে।
__এতো জোড়ে ধরিস না জাওড়া পোলাপান। দম আটকাইবো।”
তামিম বলার পর ও কোনো কাজ হয় না। পঞ্চ পাণ্ডব নিজেদের মতো করে কাঁদতে ব্যস্ত তাকে ধরে।
__ভাই। জীবনে বাপের ছায়া পাই নাইক্কা। আপনারে পাইছি। আপনার কিছু হইলে নগদে মইরা যামু।”
কালা মানিক বেশ আবেগপ্রবণ হয়ে কথা গুলো বলে। কিন্তু তার কথা বলতে দেরি সাকিবের তার কথার মাঝে বা হাত ঢোকাতে দেরি নেই।
__দেখছিসনি হালা কত বড় মিথ্যুক।”
__কী মিথ্যা কথা কইছি আমি?”
__ভাই ওই জরিনার লগে প্রেম করতে গেছিলো। আপনে এতো অসুস্থ তারপর ও। হেতির না-কি কিছু ভালা লাগে না অথচ হেতি গেলিছো প্রেরেম করবার।”
সাকিবের কথা শুনে কালা মানিক জিহবায় কামড় কাটে। এভাবে তাকে বিশাল বড় বাঁশ দেবে সাকিব এটা সে কল্পনা ও করতে পারেনি। মাঝ থেকে পেট মোটা রফিক বলে ওঠে।

__ ভাই ওই ফর্সা হওয়ার ক্রিম ও মাখছিলো। ডেইলি রূপ চর্চা করতো।”
__ভাই মিছা কথা। ওরা নিজেগো দোষ ঢাকতে এডি কইতাছে।”
কালা মানিকের কথা শুনে বাকিরা শুকনো ঢোক গিলে।কারণ তারা সকলে যে মেয়ে বাজ এটা তামিম ভালো মতোই জানে।কিন্তু তার অসুস্থ থাকার সময় ও তাদের চরিত্রের উন্নতি না দেখে বেশ বিরক্ত হয় তামিম।
মানিক আবার ও বা শুরু করে,__ ভাই! সাকিব বটগাছে ছেড়িগো ঢিল মারতো। কিন্তু হেরে কেউ পাত্তা দিতো না। মাহির জিমে গিয়ে বডি বানাইয়া রাস্তায় শার্ট ছাড়া ঘুরতো। পেটলু, না খাইয়া ওর পেট কমাইতা গেছিলো।কারণ রিয়া বলছে ওর পেট আছে যতদিন ব্রেকআপ ততদিন। পরে ওই কানছে কিন্তু আপনার জন্য। আর এই টাকলা কী করছে জানেন, বিভিন্ন জরি বটি দিয়া তেল বানাইছে। কারণ ওর টাকের জন্য মেয়ে পটে না। ভাই আমি একাই দোষি না”
তামিম খুব ধৈর্য সহকারে পঞ্চ পাণ্ডবের কথা শুনতে থাকে। কিন্তু তার মুখের আকৃতি বলে অন্য কথা। তামিম কালা মানিকের দিকে তাকিয়ে বলে,

__ তোর জরিনা কই?”
কালা মানিক কিছুটা মন খারাপ বলে,
__আমি চোখ দিয়ে যেই মেয়ের দিকে তাকায় তারই বিয়ে হয়ে যায়।”
__আর আমি হাত দিয়ে যারে ধরি তারই ইন্না-লিল্লাহ হয়ে যায়।”
হুট করে মাহির চেচিয়ে বলে,
__ভাই ক্ষেপছে রে। পালা শালার ভাইরা।
তামিমের জুতো খোলা দেখে পঞ্চ পাণ্ডব পাঁচ দিকে দৌড় শুরু করে।এতো বছর তারস এসেছিলো নিজেদের সুখদুঃখ প্রকাশ করতে।কিন্তু সাকিবের জন্য পুরো বিষয়ে পানি পড়ে যায়।সাকিবের জন্মই হয়েছে তাদের সুখের জীবনে বাগড়া দেওয়ার জন্য।
__হাই খোদা! কোন পাপ করছিলাম। এমন জাওড়া পোলাপান আমার কপালে দিলেন।”
দরজার বাইরে থেকে লুকিয়ে লুকিয়ে তামিমের আফসোস করা দেখতে থাকে পঞ্চ পাণ্ডব। সকলে চুপ থাকলে বরাবরের মতোই সাকিব আজ ও নিজের বাচাল মুখ বন্ধ রাখতে পারে না।মুখ ফসকে বলে ওঠে,

__ভাই আমরা জাওড়া হলে ও ভালো আছি। দিলটা পরিষ্কার।”
__খাঁড়া আজকে।”
তামিম জুতো হাতে নিয়েই বেরিয়ে পরে। তাকে তেড়ে আসতে দেখে পঞ্চ পাণ্ডব পাঁচ দিকে দৌড়ে লাগায়। তামিম সোজা নিচে চলে যায়। গিয়ে দেখে সোফাতে সুবহা তার মায়ের কোলে মাথা রেখে শুয়ে রয়েছে। চোখ অসম্ভব লাল।হয়তো খুব কেঁদেছে।
তামিম এসে সোজা সুবহার সামনে দাড়ায়। হাঁটু পেরে বসে তার সামনে।
__চোখ লাল কেন পরী?”
সুবহা উঠে বসে।নিজেকে গুছিয়ে হাতের আঙ্গুল দিয়ে বাইরে ইশারা করে।ঝুম ধারে বৃষ্টি হচ্ছে। যার ফলে সে তার ভাইয়ের কবর দেখতে যেতে পারেনি।
__চলো উঠো।”
_কিন্তু বৃষ্টি?”
__আল্লাহর পানি। বরকত ময়।চলো।”

এমপি তামিম সরকার শেষ পর্ব

তামিম সুবহা নিয়ে মাথায় একটা বিশাল বড় কালো ছাতা দিয়ে বেরিয়ে পরে বাড়ির উত্তর দিকে। যেখানে রয়েছে সরকার বাড়ির কবরস্থান। তামিমের দাদা, দাদি, সকলে রয়েছে এখানে।এখন সুবহার ভাই ও।
কবরের সামনে গিয়ে হাঁটু পেরে বসে পরে সুবহা।নিজেকে সামলানো খুব কষ্টকর হয়ে পরে তার জন্য। বাবা-মা সব কিছু হারিয়ে তার শেষ রক্তের সম্পর্ক ছিলো শুধু মাত্র সৌরভ। কিন্তু আজ সে ও নেই তার কাছে।
__ও অনেক কষ্ট পেয়ে মরেছে না? ছোটো মানুষ বয়সই কত ছিলো। কত কষ্ট পেলো আমার ভাইটা।”
_আজ আমি তোমাকে আটকাবো না পরী। মন খুলে কাঁদো।”

এমপি তামিম সরকার পর্ব ১০৬

1 COMMENT

Comments are closed.