Tell me who I am 2 part 6
আয়সা ইসলাম মনি
চিন্তার অতল গহ্বরে নিমজ্জিত কাব্যের ভাবনার প্রবাহ হঠাৎই ছিন্ন হলো মোবাইলের একটিমাত্র টুং শব্দে। কাব্য ধাতস্থ হতে খানিক সময় নিল। মনোযোগ ভেঙে চোখ রাখল ফোনের স্ক্রিনে। তাতে ভেসে উঠল একটি বার্তা। প্রেরক: ইলিজা।
“এত রাত হয়ে গেছে, আপনি কি ঘুমাননি, নাকি মাত্রই উঠলেন?”
অপ্রত্যাশিত এই বার্তায় কাব্যের বুক ধক করে উঠল। চোখ বড় হয়ে গেল বিস্ময়ে। বারবার স্ক্রিনে চোখ বুলিয়ে নিশ্চিত হতে চাইল—এ কি সত্যিই ইলিজা? এই রাতে, এই মুহূর্তে ইলিজা মেসেজ করেছে! সে সটান উঠে বসে দ্রুত উত্তর দিল, “আপনি জেগে আছেন?”
অন্যদিকে বিছানায় আধশোয়া অবস্থায় থাকা ইলিজার ঠোঁটে একপ্রস্থ হাসির রেখা ফুটে উঠল। সে উত্তর দিল, “না তো, এটা আমার প্রেতাত্মা কথা বলছে।”
কাব্য বুঝতে পারল খুনসুটির ছোঁয়া আছে ওর কথায়, তবুও তার মনটা হাসল না। তার মুখ গম্ভীর, ভ্রূ কুঁচকে আছে। ভেতরটায় তখন এক সাগর অস্থিরতা কাজ করছে। সে আবার টাইপ করল, “কোনোভাবে কি ফোনে কথা বলতে পারবেন? জানি, এটা প্রায় অসম্ভব, কিন্তু খুব জরুরি। আপনার কণ্ঠস্বর আমার শুনতেই হবে, নাহলে এই ছটফটানি আমাকে গ্রাস করে ফেলবে।”
এদিকে ইলিজা কাব্যের মধ্যে থাকা দগ্ধ আকুতি অনুভব করল। ঠোঁটে লেগে থাকা হাসির রেখা ম্লান হয়ে এলো। সে হালকা ঠোঁট কামড়ে চিন্তা করল, কী করবে। তার ঘরের দরজাটা খোলা, পাশের কক্ষে ঘুমিয়ে আছেন মমতাজ ও আব্দুর রহমান। অল্প শব্দেও যদি মমতাজ জেগে ওঠেন, তবে রক্ষা নেই। তারপর কিছু না লিখেই ধীরে ধীরে উঠে পা টিপে দরজার দিকে এগোল। দরজাটা সাবধানে বন্ধ করল। আলো জ্বালালে মমতাজ টের পেতে পারেন—এ আশঙ্কাতে ঘরের আলো আগেই নিভিয়ে রেখেছিল। তবে বিছানার পাশের টেবিলে রাখা ল্যাম্পটি অল্প আলোতে জ্বলছে।
ইলিজা এবার বিছানার পাশে রাখা ফোনটা হাতে তুলে বেলকনির দিকে এগিয়ে গেল। চারদিকে শীতল রাত। চাঁদ আজ মেঘের আলখেল্লায় ঢাকা। বাহিরে হালকা বাতাস বইছে, আর সেই বাতাসে ইলিজার চুল এলোমেলো হয়ে কপাল ছুঁয়ে যাচ্ছে। সে হাত দিয়ে চুলগুলো সরিয়ে নিল।
ওদিকে এখনো ইলিজার কোনো বার্তা না আসায় কাব্যের বুকের ভেতর এক অজানা সংশয়ের কাঁটা বিঁধে বসল। হৃদয়ের গতি বিক্ষিপ্ত হয়ে উঠল, চিন্তায় কপালের রেখা কুঁচকে উঠল গভীরভাবে। ইলিজা কি তবে ভুল বুঝল তাকে? এত রাতে ফোনে কথা বলার অনুরোধ কি নির্লজ্জ সাহসিকতার নিদর্শন মনে হলো ওর কাছে?
কাব্য জানে, তার উদ্দেশ্যে কোনো অপবিত্রতার রেখাও নেই। তবু একজন মেয়ের নীরবতা—বিশেষত ইলিজার মতো আত্মসম্মানী, সুগভীর মেয়ের মানেই হাজারটা ব্যাখ্যার অসহায় ভিড়। সে তড়িঘড়ি টাইপ করতে শুরু করল, “আপনি হয়ত আমাকে ভুল ভাবছেন। বিশ্বাস করুন, আমার চিন্তা আপনার কল্পনার বহু বাইরে। আমি এতটাই দুশ্চিন্তাগ্রস্ত যে, মেসেজে কোনো শব্দে বোঝানো সম্ভব না। ফোন না-ই করুন, তবু বিশ্বাস রাখুন, আমি কোনো অসম্মানজনক কিছু ভাবিনি। আপনি এই গভীর রাতে জেগে আছেন, এটা ভেবেই…”
কথা শেষ করার আগেই ফোনের স্ক্রিনে ভেসে উঠল নতুন মেসেজ। প্রেরক: ইলিজা।
“আচ্ছা, কল করুন।”
এই সংক্ষিপ্ত বার্তাটিতে কাব্যের মুখে এক বিস্তৃত নরম হাসির রেখা ফুটে উঠল। টাইপ করে রাখা মেসেজ মুছে, কল বাটনে আঙুল রাখল।
ফোন বেজে উঠল। ইলিজা ফোনটা কানে তুলল। আর ঠিক তখনই একটা দীর্ঘ, প্রশমিত নিশ্বাসের শব্দ শুনল। কাব্যের ফুসফুসভরা সেই নিশ্বাস যেন ইলিজার কানে ধাক্কা দিয়ে ঢুকে পড়ল শরীরের রন্ধ্রে রন্ধ্রে। মুহূর্তেই কাঁপুনি উঠল তার শরীরজুড়ে। পুরুষের নিশ্বাস যে এতটা সংবেদনশীল, প্রবলভাবে স্পর্শকাতর হতে পারে; সে তো জানত না।
তার গলা শুকিয়ে গেল, ঠোঁট কেঁপে উঠল, কিন্তু শব্দ হলো না। ইলিজা এখন নিজেই নিজের কাছে অপরিচিত। এই রাতে, এই নির্জনতার মাঝে, এক পুরুষের কণ্ঠশব্দ শুনতে এমনভাবে অধীর হওয়া—এ যেন কোনো গোপন অসুখ, যার কোনো নাম নেই।
অপরদিকে কাব্য যেন সব কথা ভুলে গেছে। সে শুধু বসে আছে কানে ফোন লাগিয়ে। তার চোখ বন্ধ, হৃদয়ের গহিন অতল থেকে কোনো শব্দ উঠে আসার অপেক্ষা করছে।
কাব্য ভেবেছিল ইলিজা প্রথমে কিছু বলবে। মেয়েটা চঞ্চল, স্বভাবতই তীক্ষ্ণ জবাবদিহিতে ওস্তাদ। কিন্তু আজকের ইলিজার মধ্যে এক বছর আগের সেই দুরন্ত কিশোরীর সঙ্গে বিস্তর ফারাক। বয়ঃসন্ধিকালের মনোজাগতিক রূপান্তর, কিংবা হৃদয়ে অজান্তে বুনে ওঠা অনুরাগের প্রথম অঙ্কুর—সব মিলিয়ে সে এক নবপরিচিত সত্তা হয়ে উঠেছে।
ইলিজা দাঁড়িয়ে আছে বেলকনির রেলিং ধরে, মুখটা আকাশের দিকে তোলা। চোখে-মুখে অস্থিরতা কাজ করছে। কখন জানি ওপাশ থেকে প্রতীক্ষিত কোনো শব্দ ভেসে আসবে! আজ অবধি সে বান্ধবীদের সঙ্গেও এত রাতে এমন কথোপকথনে জড়ায়নি। ফোনে কারও কণ্ঠে এত গভীরভাবে ধ্বনিত হতে পারেনি তার ভেতরের অনুভূতি।
এই প্রথম, এই গভীর রাতে কেবল একজনের জন্য সে সমস্ত ভয় অতিক্রম করে সাহসী হয়েছে। এই চিন্তা তার মস্তিষ্কে ঝড় তুলল। নিজের মনেই ফিসফিস করে বলে ফেলল, “তবে কি আমি প্রেমে-টেমে পড়লাম নাকি?”
নিজেকে প্রশ্ন করে নিজেরই মুখে একরকম ধিক্কার ছুঁড়ে ইলিজা চুপিচুপি বলল, “আস্তাগফিরুল্লাহ, তওবা তওবা। কি সব বলিস? ছি ছি!”
তারপর দীর্ঘ নিস্তব্ধতা। বেলকনির রেলিংয়ে ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা ইলিজার বুকের ভেতর ধুকপুকানি বেড়েই চলেছে।
সময় কেটে যাচ্ছে, তবু কেউ কোনো শব্দ উচ্চারণ করছে না। মূলত সংযম আর দ্বিধার দ্বন্দ্ব দুজনের মধ্যেই বিরাজ করছিল। কাব্যও পূর্বে কখনো কোনো নারীর সঙ্গে এমন কথোপকথনে জড়ায়নি।
কাব্য শেষমেশ একটা গভীর নিশ্বাস ফেলে ভারী গলায় বলল, “এত রাতে জেগে আছেন কেন?”
ওপাশে ইলিজা একটু হেসে বলল, “এ প্রশ্ন কিন্তু আমি অনেক আগেই আপনাকে করেছিলাম।”
“আমার… ইউনিভার্সিটির প্র্যাকটিক্যাল করছিলাম।”
“আচ্ছা।”
“এবার আপনারটা বলুন।”
“আসলে হঠাৎ একটা দুঃস্বপ্ন দেখে ঘুম ভেঙে গেছে। তারপর অনেক চেষ্টা করেও আর ঘুম এলো না, তাই অনলাইনে গেইম খেলছিলাম।”
কাব্য একটা প্রশান্তির নিশ্বাস ফেলে ভেতরে ভেতরে বলল, “যাক, তাহলে ও অন্য কারো সঙ্গে কথা বলছিল না।”
ঠোঁটের কোণে মৃদু হাসি নিয়ে কাব্য জিজ্ঞেস করল, “আমার মেসেজটা পড়ছিলেন?”
ইলিজা ভ্রূ উঁচু করল, একটু ভান করা বিস্ময়ের সুরে বলল, “কোনটা?”
কাব্য ঢোক গিলে থেমে থেমে বলল, “ওই যে… যেটা… শুরুতেই দিয়েছিলাম…”
“আমার এখানে তো কোনো মেসেজ আসেনি।”
কাব্য একটু হেসে বলল, “মজা করবেন না। মেসেজ না গেলে আপনি কীভাবে বুঝলেন আমি অ্যাকটিভ?”
ইলিজা ধরা পড়ে গিয়ে মৃদু হেসে ফেলল। তবে তখন কাব্যের পাঠানো হঠাৎ সেই বার্তাটি তার হৃদয়ে যে উত্তাল ঢেউ তুলেছিল, তা ভাষায় ব্যাখ্যা করা দুরূহ। বিশেষ করে কাব্যকে তো কিছুই বলা যাবে না। কাব্যের প্রতিটি শব্দই অনুপম, অপূর্ব; মনকে নির্মল প্রশান্তিতে আচ্ছন্ন করে দেয়। ইলিজারও তেমনই হয়েছিল। মেসেজটা পড়ে সে দীর্ঘ সময় নিঃশব্দে ভাবছিল—কি উত্তর দেওয়া উচিত? শেষে বহু অনুশীলন ও আত্মসংবরণে সে মূল প্রসঙ্গ এড়িয়ে নিজস্ব এক মোড়কে উত্তর পাঠিয়েছিল। কিন্তু এখন ঠিকই সেই মেসেজটারই মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিল।
সে এক মুহূর্ত নীরব থেকে খুব শান্ত কণ্ঠে বলল, “মানুষকে না ছুঁয়েও সারাজীবন ভালোবাসা যায়, এ কথা আমি বিশ্বাস করি না।”
কাব্য স্নিগ্ধ হেসে বলল, “যদি আপনাকে না দেখেও ভালোবাসতে পারি, বছরের পর বছর সেই প্রেমের সুপ্ত শিখাটি আগলে রাখতে পারি, তাহলে স্পর্শহীন ভালোবাসার ধারণাটাও তো অবাস্তব নয়, তাই না?”
ইলিজার ঠোঁটের কোণে হাসির সূক্ষ্ম রেখা ফুটে উঠল। সে কণ্ঠে রসিকতার আবরণে প্রশ্ন ছুঁড়ে দিল, “আপনি কি কবি? কবিতা লেখেন?”
কাব্য কিঞ্চিৎ ভ্রূ কুঁচকে সামান্য বিস্ময়ে বলল, “না তো।”
“তাহলে এত সুন্দর ভাষা শিখলেন কীভাবে? আপনি তো সিএসই’র স্টুডেন্ট।”
কাব্য হেসে গলা নরম করে শুধালো, “কিছু শব্দ শিখতে হয় না, ম্যাডাম। ওরা হৃদয়ের ঘন সংবেদ থেকে নিজেই আত্মপ্রকাশ করে। আর আমি বিশ্বাস করি, আমি একজন খাঁটি বাঙালি।”
“আপনার কঠিন উচ্চারণ আর ব্যতিক্রম শব্দ মাঝেমধ্যে আমাকে থমকে দেয়। আমি তো সব শব্দের মানেও বুঝতে পারি না।”
কাব্য হঠাৎই গলা নামিয়ে গভীর আবেগে বলে উঠল, “আপনি অনেক বড় হয়ে গেছেন, মিস ইলি। যেটা আমি একদমই চাইনি। আমি তো খুঁজে ফিরি সেই দুরন্ত, অগোছালো, চটাং চটাং কথা বলা ইলিজাকে; যার প্রতিটা বাক্য ছিল বিদ্যুৎচমকের মতো তীক্ষ্ণ, হঠাৎ নেমে আসা বৃষ্টির মতো অকস্মাৎ, আর এক আশ্চর্য কোমল উন্মাদনায় ভরপুর। কিন্তু আপনি বদলে যাচ্ছেন। যতটুকু গুছিয়ে বলার, ততটুকুই বলেন। এভাবে বদলে যাবেন না, প্লিজ।”
ইলিজা এক মুহূর্ত নিশ্চুপ রইল। তারপর ফিসফিস করে বলল, “সবাই তো চায় ম্যাচিউর মেয়ে। আর আপনি কিনা…”
কাব্য যেন এতক্ষণ এই সুযোগের জন্যই অপেক্ষা করছিল। সে অনর্গল বলে উঠল, “ম্যাচিউর মেয়েদের সাথে প্রেম করা যায় না, ইলিজা। তাদেরকে ঘরে আনতে হয়। কারণ তারা জীবনের প্রতি এতটাই সংবরণশীল যে প্রতিটি অনুভবকেই কোনো না কোনো হিসেবের খাতায় লিখে রাখে। তাদের হাসিও পরিকল্পনার ছকে বাঁধা, আবেগও সময়সীমার মধ্যে সীমাবদ্ধ। তারা ভালোবাসে, কিন্তু ভালোবাসার খরচ-জমার খতিয়ান রাখে। আর আমি চাই না প্রেম এমন কোনো ব্যাংক অ্যাকাউন্ট হোক, যেখানে আবেগের সুদ মেলে না। তাছাড়া ম্যাচিউর মেয়েরা নদী নয়, তারা বাঁধ। প্রেমে তারা সাঁতার কাটে না, তারা খোঁজে নিরাপদ তীর। প্রেমকে তারা শোকেসে রাখা ফুল মনে করে; যার গন্ধ আছে, রং আছে, কিন্তু তা ছড়িয়ে দেওয়ার স্বাধীনতা নেই।
আর আমি? আমি তো সেই উন্মাদ প্রেমিক, যে ফুল দেখে ছিঁড়ে ফেলে, গন্ধে মাতাল হয়, পাপড়ি নষ্ট হওয়ার ভয় না করেই তাকে হৃদয়ের বুক পকেটে নিয়ে ঘুরে বেড়াতে চায়। আমি নদীর টানে ভেসে যেতে চাই, নিরাপত্তাহীনতায় ডুবে গিয়ে খুঁজে নিতে চাই ভালোবাসার গভীরতা; যেখানে মানুষ ভুল করে, ভুল বোঝে, তবুও ভালোবাসে। আর আপনি তো আমার উন্মনা ইলিজা, যার একেকটা কথা বসন্তের মাতাল হাওয়া—আগে থেকে জানান না দিয়ে এসে মন উলটে দেয়। আমি চাই না আপনি পালটে যান। তাছাড়া আপনাকে তো এখন আমার ঘর ছাড়া জীবনে আনতে পারব না। তাই আপনি বরং কিছুটা ইমম্যাচিউরই থাকুন। যেন আপনাকে একটা কথা আমাকে হাজারবার বুঝাতে হয়। আর আমি তাতে বিরক্ত না হয়ে বরং খুশি হয়ে আপনার সাথে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কথা বলার অজুহাত খুঁজে পাবো। একটু দুষ্টুমি করুন তো, ভুলভাল করে আমাকে নাকাল করুন তো। আমাকে হিংসা করান, চোখ গোল গোল করে ঝাড়ুন। যেমনটা করতেন এক সময়। আমি চাই না আপনি বড় হয়ে যান এতটাই, যে আমার হাত ছেড়ে চলে যাবেন।”
তার কণ্ঠ স্তব্ধ হলো। কিন্তু এই নীরবতা ইলিজার হৃদয়ের প্রতিটি স্নায়ুতে নিঃশব্দ বজ্রপাতের মতো বয়ে গেল। ইলিজা ঠোঁট খুলে কিছু বলতে চাইল, কিন্তু জিভ যেন লেপ্টে রইল তালুতে।
কাব্য হাসল। নরম কণ্ঠে বলল, “আমার এখনো মনে আছে, আপনি যখন গাল ফুলিয়ে চলে যেতেন, আপনাকে তখন ‘সজনেডাঁটা’ বা ‘করলানী’ বা ‘পিশাচিনী’ ডাকতাম! আমি জানতাম, আপনি ঠিকই এক মিনিট পর ফিরে এসে বলবেন, ‘এই, কি বললেন আপনি?’ ইশ, কি রাগটাই না করতেন!”
এ কথা বলেই কাব্য শব্দ করে হেসে উঠল। তার চোখজোড়া ঝলমল করছে৷ ইলিজা নীরব মুগ্ধতায় একরাশ মুচকি হাসি ছড়িয়ে দিল। কিছুক্ষণ পর কাব্য অস্থির গলায় বলে উঠল, “এই করলানী, এই ছন্নছাড়া কাব্যটাকে একটু গুছিয়ে দিতে পারবেন?”
ইলিজা এবার একটু কপাল কুঁচকালো। তার গলার স্বরও একটু চড়া হলো, “এই, আপনি আবার করলানী বললেন? আপনি তো আমাকে চেনেন না এখনো… একবার যদি রাগ উঠে যায়, একদম কেলিয়ে দাঁত ভেঙে দেওয়ার শক্তি আমার আছে।”
কাব্য এবার খিলখিলিয়ে হেসে উঠল। হাসির শব্দটা ইলিজার গায়ে এসে লাগল। হাসির আড়ালে কি কাব্য তার রাগটাকে গুরুত্বহীন বানিয়ে দিল?
ইলিজা ঠোঁট কামড়ে বলল, “আবার হাসছেন? আমি কিন্তু সিরিয়াসলি রেগে আছি।”
“এই তো ফিরে পেলাম আমার সেই চটাং চটাং কথা বলা ইলিজাকে। আর ওটুকু শরীরে এত জোশ আপনার, যে আপনি মারলে আমার দাঁত ভেঙে যাবে!”
ইলিজা মুখ টিপে হেসে বলল, “দাঁত না ভাঙলেও ঘুসি মেরে চোখ তো কানা করতেই পারব।”
এক মুহূর্ত পর তার কণ্ঠটা কোমল হয়ে এলো, “আর আপনি তো গুছানোই আছেন, কাব্য। আপনাকে আর কী গুছাবো?”
এই কথাটা শুনে কাব্যের হাসির রেখাগুলো মুহূর্তে স্তব্ধ হয়ে নিষ্প্রভ হয়ে গেল। তার গলা থেকে এক নিশ্বাস বেরোল, “আমি একদমই অগোছালো, ইলিজা। আমাকে কেউ কখনো গুছিয়ে দেয়নি। কেউ রান্না করে আমার সামনে প্লেট রাখেনি। আমার পাশে কেউ গল্প বলে রাত পার করেনি। কেউ আমাকে আদর করে কয়েকটা কথা বলেনি।”
কাব্যের কণ্ঠের ভার শুনে ইলিজার বুকটা কেমন করে উঠল। ভেতরে কোথাও যেন হালকা ব্যথা চেপে বসল। সে নরম গলায় প্রশ্ন করল, “আর?”
কাব্য কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল। নিশ্বাস নিচ্ছিল ধীরে ধীরে। ভেতরের শব্দগুলো মুখে আনার সাহস সংগ্রহ করছিল। তারপর হঠাৎ গলাটা কেঁপে উঠল, “ইলিজা… আমার জীবনটা আপনার বা বাকিদের মতো নয়। সবার মতো সাজানো-গোছানো, কিংবা আদর-পাওয়া কোনো শৈশব আমার ছিল না। জানেন, কেউ কখনো আমার মাথায় হাত রাখেনি, কেউ বলেনি, ‘ভেঙে পড়ো না, আমি তো আছি তোমার পাশে।’ স্কুলের গেটে কেউ দাঁড়িয়ে থাকেনি আমার জন্য। ভয়ের রাতে কখনো কারো বুকে মুখ গুঁজে ঘুমাইনি। জ্বর হলে আমার পাশে কেউ বসে থাকেনি রাতভর। কেউ ক্লান্ত মুখ দেখে এক গ্লাস পানি এগিয়ে দেয়নি। কেউ আমার জন্য দরজা খুলে অপেক্ষা করেনি। কেউ বাড়ি ফিরলে জিজ্ঞেস করেনি, ‘কিছু খেয়েছো?’ কেউ ঘুমাতে যাওয়ার আগে চাদরটা গায়ে তুলে দেয়নি। আমি বরাবরই নিজেই নিজের অভিভাবক, নিজেই নিজের সান্ত্বনা হয়ে বেঁচে আছি। পৃথিবীটা কত সুন্দর দেখুন! কিন্তু আমার জন্য নয়। কারণ… কারণ আমি কারো কাছে কখনো গুরুত্বপূর্ণ ছিলাম না। আমি ছিলাম ব্যবহারযোগ্য, কিন্তু অপরিহার্য না। যখন দরকার, তখন ডাক পড়েছে। কিন্তু ভালোবাসার জায়গায় কখনোই বসানো হয়নি আমাকে। আর এই ব্যবহারের নকশায় আমি নিজেকে প্রতিদিন একটু একটু করে নিঃশেষ করেছি। আমি কাউকে হারানোর ভয়ও পাই না ইলিজা, কারণ আমি কিছুই পাইনি যা হারানোর মতো!”
কাব্যের কথাগুলো শুনে ইলিজার গলা বুজে এলো। থুতনি কেঁপে উঠল। শরীরটাও কেমন অবশ হয়ে গেল। অজান্তেই চোখের নিচে জল জমে উঠল। ইচ্ছে হলো কাব্যের কাছে গিয়ে তার হাতটা ধরুক, আর বলুক, ‘আমি তো আছিই এসব দায়িত্ব নেবার জন্য।’
কিন্তু সে উপায়ও নেই এখন। সে আস্তে করে জিজ্ঞেস করল, “আপনার মা-বাবাও না?”
‘মা’ শব্দটা উচ্চারিত হতেই কাব্য থেমে গেল। শরীরটা নিস্তেজ হয়ে এলো, হাতের আঙুল কাঁপতে শুরু করল। মুখটা মুহূর্তেই ভার হয়ে গেল। তার গলার আওয়াজ আরও নীচু হয়ে গেল, “আমার… আমার মা নেই…”
এই একটা বাক্য যেন ভেতর থেকে ঠেলে আনা রক্তমাংস কাঁপিয়ে দেওয়া এক অদৃশ্য ক্ষতচিহ্নের মতো। কাব্য কয়েকবার ঢোক গিলে বলল, “তিনি আমাকে এই পৃথিবীর আলো দেখিয়ে বিদায় নিয়েছেন চিরদিনের জন্য। তিনি তো এখন শান্তিতে আছেন, কারণ তিনি চলে গেছেন শহিদি মৃত্যু নিয়ে। কিন্তু আমাকে… আমাকে এই নির্মম পৃথিবীতে একা রেখে গেলেন। আমি ছিলাম একা, রইলামও একাই। তিনি আছেন জানি, আমার ভেতরে কোথাও একটা গেঁথে আছেন। আমি তাকে দেখি না, শুধু অনুভব করি। জানেন ইলিজা, আমি বড় হয়েছি ঠিকই, কিন্তু… কিন্তু কারো ভালোবাসার ছায়ায় না। আমি বেড়ে উঠেছি শূন্যতার নিঃশব্দ আলিঙ্গনে। সেটা চোখে দেখা যায় না, কিন্তু এই শূন্যতা ভিতরটা প্রতিদিন কুঁড়ে কুঁড়ে খায়। এই দুনিয়ায় আমি নিজের ছায়া ছাড়া কাউকে পাশে পাইনি কখনো।”
কেন জানি কাব্যের করুণ, ভারাক্রান্ত কণ্ঠস্বর ইলিজার ভেতরটা চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দিল। ভাষা হারিয়ে ফেলল সে। চোখের কোণ ততক্ষণে স্নিগ্ধ জলে ভিজে উঠেছে। হয়ত আরেকটু পরেই টুপটাপ করে গড়িয়ে পড়বে। কি বললে উপশম হয় এই অনন্বয় বেদনার—তা তার জানা নেই। খুব করে বলতে ইচ্ছে হল তার, ‘আপনি শুধু প্রয়োজন নন, আপনি কারো প্রার্থনা। আমি তো আপনার মতোই কাউকে চেয়ে এসেছি এতদিন। আর আমি হব সেই প্রথম মানুষ, যে আপনাকে গুরুত্ব দিয়ে খুব খুব ভালোবাসবে।’
কিন্তু গলা থেকে কোনো শব্দ বের হলো না। কারণ এমন কিছু আবেগ থাকে, যা এক মুহূর্তে বললে অপবিত্র হয়ে যায়; তাতে সময় দিতে হয়, সয়ে নিতে হয়, ভালোবাসার জলে গলিয়ে চুমুক দিতে হয়।
গলায় সামান্য কাঁপন নিয়ে ইলিজা বলল, “আর… আর আংকেল?”
কাব্যের কণ্ঠ হঠাৎ করেই কাঁপল। তার গলা থেকে কঠিন শব্দ ঝরে পড়ল, “প্লিজ ইলিজা, এই মানুষটা আমার আপন কেউ নন। তাকে নিয়ে কিছু বলার রুচিও হারিয়ে ফেলেছি অনেক আগেই। এই মানুষটা আমার রক্তের কেউ হয়েও, আমার জীবনের কোনো অংশ হয়ে উঠতে পারেননি। তাই তাকে নিয়ে বলা মানেই সেই ব্যথাগুলোকে আবার উসকে দেওয়া।”
ইলিজা মাথা নীচু করে নিশ্চুপ রইল। নিজের পিতাকে ঘিরে এমন প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে, মানে নিশ্চয়ই এর অন্তরালে কোনো মর্মান্তিক ও গূঢ় বেদনার ইতিহাস রয়েছে। ইলিজা একটা সময় আস্তে বলল, “আমি যদি বলি, একদিন আপনার জীবনের পুরো গল্প শুনতে চাই… শুনাবেন?”
কাব্য একটু হাসল। না, সেটি হাসি ছিল না, ছিল কষ্টের নিচে চাপা পড়ে থাকা একটা গলা ধরা পরিহাস। তারপর সে তীক্ষ্ণ কণ্ঠে বলল, “কীভাবে বলি বলুন তো? পুরুষ জাতটাই এমন। আপনারা মেয়েরা তো কাউকে বলতে পারেন, কিন্তু আমরা পারি না। আর গল্প? আমাদের গল্প হয় না, ইলিজা। আমরা যদি বলি, ‘আমার কষ্ট হচ্ছে’, মানুষ বলে দুর্বল। যদি বলি, ‘আমি ভেঙে পড়েছি’, বলে কাপুরুষ। আমরা কান্না পেলে দাঁত চেপে সহ্য করি, কারণ আমাদের কান্নার শব্দকে কেউ বেদনা ভাবে না, তাকে বলা হয় নাটক। আমাদের চোখে জল মানেই, অযোগ্যতার স্বাক্ষর। তাই আমরা চুপ থাকি। গভীর রাতে বালিশে মুখ লুকিয়ে শুধু নিঃশব্দে নিঃশেষ হই। এটা যে কতটা নির্মম, তা কেউ বোঝে না। আমরা শুধু শিখি, ‘পুরুষ হয়ে এতটা নরম হলে চলে?’ তাই গল্প বলতে চাইলে… শুরুতেই গলার ভেতর গিঁট লেগে যায়। তাছাড়া কারো সামনে নিজের ভেতরের ক্ষত খোলা মানেই কাউকে অস্ত্র ধরিয়ে দেওয়া— যেটা সে যখন খুশি, তখন চালিয়ে দিতে পারে।”
ইলিজা নির্বাক রইল, কেবল শ্রবণে নিমগ্ন থাকল। কান্না যেন বুকের এক কোণে চেপে বসেছে। কী বলে সান্ত্বনা দেবে, তাও জানে না। শুধু গভীরভাবে ভাঙা ভাঙা শ্বাস ফেলল।
কাব্য আবার মৃদুস্বরে উচ্চারণ করল, “একটা আবদার ছিল। রাখবেন?”
ইলিজা আস্তে করে বলল, “হুম।”
কাব্য ঢোক গিলে বলল, “আমাকে একটু… শুধু একটু ভালোবাসবেন?”
এই বাক্যটা সোজা গিয়ে আঘাত করল ইলিজার হৃদয়ের গভীরে। কতটা সরল আর অসহায়ভাবে বলা হয়েছে! যেন ভালোবাসাটা নয়, বরং সে একটু আশ্রয়, একটু ঘর, একটু নিজের কাউকে চাইছে।
ইলিজা তখন একটা চাপা হাসির সাথে নরম কণ্ঠে বলল, “আপনি এমন একজন মানুষ, যাকে না ভালোবেসে থাকা যায় না। যে আপনাকে ভালোবাসবে না, সে নিজেই ভালোবাসার যোগ্য না।”
কাব্য ধীর গলায় বলল, “আপনি কি আমাকে ভালোবাসবেন? আমার ছোট ছোট অপূর্ণ ইচ্ছেগুলো পূরণ করবেন?”
ইলিজা এবার সরাসরি জবাব না দিয়ে চুপ করে রইল। তারপর একটু পরে গলা একটু ভারী করে বলল, “উত্তরটা তোলা থাকুক। কালকে ফ্রি আছেন?”
“কখন?”
“যদি বলি সারাটা দিন?”
কাব্য আপন মনে ভাবতে লাগল, “সকালে ক্লাস, তারপর ল্যাব রিপোর্ট সাবমিশন। দুপুরে আবার দুইটা টিউশন। উমম… কালকের টিউশনিটা যদি শুক্রবারে সরাইয়া দিই, তাইলে তো আবার পুরো শুক্রবারটাই দৌড়ের উপর চলবে। ধুর, ব্যাপার না।”
কিছুক্ষণের নীরব পর্যালোচনার পর সে বলল, “সকাল দশটার পর থেকে ফ্রি থাকব। কেন বলুন তো?”
ইলিজার ঠোঁটে মৃদু হাসি ফুটল, “যদি বলি মিস ইলি আর মিস্টার আরভিন কাব্য কাল সারাটা দিন শহরের এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্তে ঘুরে বেড়াবে, কাব্যের কি সেই সময় হবে?”
এই কথাটা শুনে কাব্যের চোখে প্রশান্তির দীপ্তি ছড়িয়ে পড়ল। মনটা এমন উচ্ছ্বসিত আনন্দে ভরে উঠল যে মুহূর্তখানেক আগের আবেগঘন ভারটুকুও মিলিয়ে গেল। সে মুখে প্রশস্ত হেসে লজ্জাবনত কোমল দৃষ্টিতে বলল, “মিস ইলির জন্য কাব্য তার সারাজীবনকেই উৎসর্গ করতে পারে।”
ইলিজাও লাজুক হাসি দিয়ে উত্তর দিল, “এখন ভালো করে ঘুমিয়ে পড়ুন। সারারাত না ঘুমিয়ে চেহারার কী অবস্থা করেছেন, কে জানে।”
ইলিজার মমতাময়ী উদ্বেগ বাক্য শুনে কাব্য নীরবে হাসল। জীবনে প্রথমবারের মতো কেউ তার জন্য ভাবছে—এই অনুভবই নির্মল শান্তি হয়ে তার হৃদয়ের কোন ছুঁয়ে গেল। সে বলল, “আচ্ছা, এখন কাজটা শেষ করে নেব। তারপর আজান শোনার সঙ্গে সঙ্গে নামাজ আদায় করে ঘুমোতে যাব।”
নিজের মনে বলল, “ইচ্ছে করছিল শুভ্রের প্রজেক্টটা শেষ করে ফেলি, কিন্তু আপনার সামনে এই ক্লান্ত, ধূলিধূসর চেহারা নিয়ে তো আর হাজির হওয়া চলে না। ঘুমটুকুই এখন মুখের জন্য সবচেয়ে বড় প্রসাধন।”
ইলিজা কৌতূহলী হয়ে জিজ্ঞেস করল, “আপনি কি নিয়মিত নামাজ পড়েন?”
“হ্যাঁ, পাঁচ ওয়াক্ত।”
“চেহারা দেখেই বোঝা যায়। নূরের মতো ঝলমল করে।”
“আপনি পাঁচ ওয়াক্ত পড়েন না, তাই তো?”
ইলিজা একটু ইতস্তত বোধ করল। গলা নামিয়ে বলল, “কি করে বুঝলেন?”
“চেহারা দেখে।”
ইলিজা লজ্জা মিশ্রিত স্বরে বলল, “না মানে… ফজরের সময় প্রায় মরার মতো ঘুমিয়ে থাকি। মিরু আপু থাকলে হয়ত পিটিয়ে হলেও নামাজ পড়িয়ে ছাড়ত, এখন আর হয় না।”
“এবার থেকে আমি ফজরের সময় আপনাকে ফোন করে জাগাব, উঠবেন তো?”
ইলিজা উৎসাহে প্রফুল্ল স্বরে বলল, “সত্যিই?”
“হ্যাঁ। আর আজকের নামাজটা পড়ে নিন। এখন আর ঘুমাতে হবে না। ফজরের পর ঘুমানো উচিতও না। কিছুক্ষণ পর সূর্যোদয়ের অপূর্ব দৃশ্য উপভোগ করবেন, শীতল বায়ুর পরশ অনুভব করবেন, তারপর মনোযোগ দিয়ে পড়াশোনা শুরু করবেন, কেমন?”
ইলিজা হেসে বলল, “আপনি একদম গার্ডিয়ানের মতো কথাগুলো বললেন।”
কাব্য হেসে বলল, “পরামর্শ দিলাম মাত্র। তবে আন্টি আংকেল অনুমতি দিলে আপনার পারসোনাল অভিভাবক হওয়ার জন্য আমি এক পায়ে রাজি।”
ইলিজা কিছু না বলে লাজুক হাসল। লজ্জায় তার নরম গাল দুটো টমেটোর মতো রক্তিম হয়ে উঠলো৷ কাব্য আবার বলল, “শুভরাত্রি অরূপে শুভ সকাল, আমার সজনেডাঁটা প্রিয় ইলিজা।”
ইলিজাও কণ্ঠস্বর নরম করে ফিসফিস করে বলল, “গুড নাইট।”
শেষে ফোনের লাইন বিচ্ছিন্ন হলো।
আর.এ-এর কথা শুনে ব্লাডশেড আর অবস্কিউর তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে একে অপরের দিকে তাকাল। উভয়েই কথার অন্তর্নিহিত তাৎপর্য অনুধাবনের চেষ্টা করল। ব্লাডশেড ভ্রূ কুঁচকে, শীতল গলায় বলল, “কে সে?”
আর.এ এক ব্যক্তির নাম উচ্চারণ করতেই ব্লাডশেডের চোখের রং তীব্র রক্তাভ হয়ে উঠল। ঘাড়ের রগগুলো কষে ফুলে উঠল। হাতের শিরা দপদপ করতে লাগল, ক্রোধে তার সমস্ত শরীর উত্তপ্ত হয়ে উঠল। হাতে ধরা ওয়াইন গ্লাসটি মুহূর্তেই তার তালুতে চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে গেল। কোনো পূর্বাভাস ছাড়াই সে চেয়ার ঠেলে উঠে, সেই ভাঙা কাচের ধারালো অংশ দিয়ে আর.এ-র কব্জির উপর সজোরে আঘাত করল। কাচের ধারালো টুকরো মাংস ছেদ করে ভিতরের র’ক্তনালীতে পৌঁছে গেল। আর.এ’র হাত র’ক্তে ভিজে গেছে।
ব্লাডশেড ভাঙা কাচের তীক্ষ্ণ প্রান্তটা আর.এ-র গলায় ঠেকিয়ে, দাঁত কিঞ্চিৎ কিড়মিড় করে বলল, “ইউ বা’স্টা’র্ড! তোমার সাহস কীভাবে হয় ওর নাম নেওয়ার? আমার কাছের মানুষ বা আমার পরিবারের থেকে হাজার কিলোমিটার দূরে থাকো। ওর যদি কোনো ক্ষ’তি হয়, তোমাকে আমি কীভাবে কীভাবে মার’ব, সেটা নিশ্চয়ই বলে দিতে হবে না।”
আর.এ কেবল তাকিয়ে দেখল, তার হাত ফে’টে গেছে। র’ক্ত টপটপ করে ফ্লোরে পড়ছে। কাচ ঢুকে গেছে মাংসের নিচে। কষ্ট হচ্ছে, কিন্তু মুখ একদম শান্ত তার। আর.এ হালকা হেসে শান্ত কণ্ঠে বলল, “এতটা অশান্ত হচ্ছ কেন?”
এই প্রশ্ন শুনে অবস্কিউর বিস্ফোরিত হল। থরথর করে কাঁপছে রাগে সে। চেয়ার ধাক্কা মেরে সরিয়ে দিয়ে সামনের দিকে এগিয়ে এলো, তার চোখ দুটি রক্তাক্ত হয়ে গেছে। সে থুতু ফেলল মেঝেতে। দাঁতে দাঁত চেপে বলল, “ফা*কিং স্লা*ট! তুই আবার জিজ্ঞেস করছিস কেন ব্লাডশেড অশান্ত হচ্ছে? তুই কী জানিস আমরা কোন স্তরের নৃশংসতা ধারণ করি? ব্লাডশেডের মধ্যে যতটুকু রাগ আছে, আমার মধ্যে তার দ্বিগুণ বিষ। তোর শরীরের কোথায় হাত ঢুকিয়ে কীভাবে ছিঁ’ড়ে খা’বো, আমি নিজেও জানি না। আমি নিজেকে থামাতে পারছি না, ব্লাডশেড। চল, ওর টি’ট’স থেকে কলিজা সব কে*টে খে*য়ে ফেলি।”
ব্লাডশেড হাত নীচে রেখেই ক্ষীণ এক ইঙ্গিত করল—তার সেই গুপ্ত সংকেতের মর্মার্থ কেবল অবস্কিউরেরই বোধগম্য। বুঝাল, আর.এ কোনো সাধারণ নারী নয়; তার আগমন ঘিরে রয়েছে এক রহস্যাবৃত উদ্দেশ্য, যার নিহিত তাৎপর্য এখনও অস্পষ্ট। অবস্কিউর নিজের অন্তর্জাগতিক তাড়নাকে দমন করল। কারণ যে নারী স্পষ্টতই বিপদের সমস্ত পূর্বাভাস জেনেও এমন এক বিপজ্জনক বাঁশবাগানে নিজে এসেছে, তার কাছে হয়ত আরো চমকে দেওয়ার মতো প্রমাণও সঞ্চিত রয়েছে; এমন সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না। অতএব একে বিনাশের সিদ্ধান্ত এখনি গ্রহণযোগ্য নয়।
আর.এ একবার অবস্কিউরের ক্রোধাচ্ছন্ন মুখাবয়বের দিকে তাকাল। তার চোখের দৃষ্টি এতটাই তীব্র ছিল যে মুহূর্তকাল মনে হল, অবস্কিউর যেন এখনই তাকে খে’য়ে ফেলবে।
আর.এ অবস্কিউরকে কোনো প্রতিউত্তর দিল না। ধীর দৃকপাতে ব্লাডশেডের দিকে তাকিয়ে উচ্চারণ করল, “তোমার পরিবার তো আমারও পরিবার…”
মিরা আলিঙ্গন থেকে বেরিয়ে এসে বিস্ময়ের দৃষ্টিতে কারানের চোখে চেয়ে রইল। চাপা ধমক নিয়ে বলল, “আবার কীসের কাজ, কারান? শোনো, এখন কোনো কাজ নয়। আজ রাতটা শুধু বিশ্রামের। সারারাত এক বিন্দু চোখ লাগাতে পারোনি, তার উপর হাতের এই যন্ত্রণাদায়ক অবস্থা। কাল হসপিটালে যেতে হবে। এই মুহূর্তে তুমি আমার সঙ্গে বিছানায় যাবে।”
“তুমি ঘুমাও। আমাকে এখন একশ পদ রাঁধতে হবে।”
মিরা ধপ করে উঠে দাঁড়াল। ভ্রূ দুটো একত্রে কুঁচকে কঠোর কণ্ঠে বলল, “তোমার কি মাথার সমস্ত তার ছিঁড়ে গেছে? এই মুহূর্তে তুমি শুধুই ঘুমাবে। কোনো রকম যুক্তি-তর্ক শুনতে চাই না। বুঝেছো?”
কারানও উঠে দাঁড়াল। মিরার গালে এক হাত রাখল আলতো করে। বলল, “এটা আমার প্রাপ্য, মিরা। এই শাস্তি আমি নিজ হাতে বেছে নিয়েছি। তুমি থামাতে পারবে না।”
মিরা সঙ্গে সঙ্গে তার হাত গাল থেকে সরিয়ে দিল। মুখে কঠোরতা নিয়ে বলল, “একদম আজেবাজে কথা বলবে না। তোমার হাতের অবস্থাটা একবার ভালো করে দেখেছো? এই ব্যথা নিয়ে একশোটা পদ রান্না করবে? কে খাবে এতকিছু? তোমার কি আমাকে রাক্ষসী মনে হয়? আর আমি এতটা নিষ্ঠুর নই যে স্বামীকে এক হাজারবার ক্ষমা চাওয়ানোর পর আবার একশ পদ রান্নার শাস্তি দিব! আমি তোমায় ক্ষমা করে দিয়েছি, কারান। এবার তুমি আমার কথা শুনে শান্তভাবে বিছানায় যাবে। বিশ্রাম নিবে।”
কারানের মুখে কোমল হাসি ফুটে উঠল। আনমনে বলল, “ক্ষমা যতই আসুক, তাতে যে ক্ষতের দাহ কমে না। আমাকে জ্বলতেই হবে, বেগম।”
এরপর আওয়াজ করে বলল, “আমি চাইলে তোমার জন্য হাজার পদও রাঁধতে পারি। কিন্তু যন্ত্রণা আমাকে ব্যর্থ করে দিচ্ছে। হাতে ব্যথা নিয়ে রাঁধতে গিয়ে যদি হাত খুলে পড়ে যায়! তাও রাজি ছিলাম, কিন্তু আমার অনবদ্য স্ত্রীটির পাশে, হাত-শূন্য হাসব্যান্ড একদমই মানাবে না।”
মিরা যদিও রাগ ধরে রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করছিল, কিন্তু এই কথাটা শুনে সে অবশেষে হেসে ফেলল। তার হাসি দেখে কারানও আলতো হাসলো। সে এগিয়ে এসে কারানকে আলতোভাবে জড়িয়ে ধরল। মাথা রেখে দিল তার কাঁধে। স্নিগ্ধ কণ্ঠে মিরা বলল, “কিন্তু কারান, তুমি বুঝতে পারছো না; তোমার হাতের এই ব্যথাটা আমার কাছে এক অসহনীয় যন্ত্রণা হয়ে উঠেছে। আমি চাই না, এই ব্যথাটা আরও বাড়ুক। তোমার কাটা হাতের জায়গাটা যখনই দেখি, আমার শ্বাস বন্ধ হয়ে আসে। আগে তুমি সুস্থ হয়ে ওঠো। তারপর যা ইচ্ছা করো, আমি কিছুতেই বাধা দেব না। তখন একশ পদ নয়, এক হাজার পদই রাঁধবে, আমি চুপ থাকব। কিন্তু এখন না। প্লিজ…”
কারানের চোখে অনড় দৃঢ়তা ফুটে উঠল। নিশ্বাস ফেলে বলল, “তোমার বলা শেষ হলে আমাকে যেতে দাও। এই ভোজনপ্রস্তুতির জন্য অন্তত আট-নয় ঘণ্টা সময় লাগবে। তবে আমি কম কম বানাব, যেন আমরা দুজনেই শেষ করতে পারি।”
মিরার রাগ যেন হঠাৎ আগ্নেয়গিরির উত্তপ্ত লাভার মতো ফেটে বেরোতে চাইল। কপালের ভাঁজগুলো কঠিন হয়ে উঠল, চোখদুটো রক্তাভ হলো। কাঁধ থেকে মাথা উঠিয়ে সমস্ত শাসনভঙ্গি নিয়ে বলল, “তুমি কি আদৌ মানুষ হবে না? একটাবারের জন্যও আমার কথা শোনো না কেন?”
কারান তার রোষানলে পুড়তে থাকা মুখটার দিকে তাকিয়ে রইল; কোনো উত্তর দিল না, প্রতিরোধও করল না। সেই দৃষ্টিতে ছিল এক নিবিষ্ট চাহনি, যেন সে মিরার প্রতিটি ভ্রুকুটি, প্রতিটি কণ্ঠস্বরের কম্পন, ঠোঁটের ক্ষীণ নড়াচড়াও গভীরভাবে গিলে নিচ্ছে। কি দেখছে সে—তা ভাষায় প্রকাশ করা দুরূহ; কারণ এই মুখ তার কাছে কোনো সামান্য নারী-মুখ নয়, বরং এক অদৃশ্য সৌন্দর্যের আকর।
মিরা বিরক্ত হয়ে ঠোঁট বাঁকিয়ে বলল, “তোমার থেকে বরং এক পাগলের সাথে বকবক করলে কিছুটা ফল পাওয়া যেত! কীভাবে তাকিয়ে আছে দেখো! এই যে, কী দেখছেন, মিস্টার?”
কারান গভীর কণ্ঠে উত্তর দিল, “আমার সহধর্মিণীকে।”
এই সরল বাক্যটি মিরার সমস্ত ক্ষোভ নিস্তব্ধ করে দিল। মিরার গালজোড়া এক নিমিষেই গোধূলির মতো লাল হয়ে উঠল। লাজুক হেসে এগিয়ে এসে কারানের গলায় দুই হাত জড়িয়ে বলল, “বাংলা শব্দচয়ন বেশ সাবলীলভাবে আয়ত্ত করেছেন, একে চৌধুরি।”
কারান মৃদু হেসে তার একপাশে উড়ে যাওয়া চুলগুলো পরম যত্নে কানের কাছে গুঁজে দিয়ে বলল, “এবার কিচেনে যাওয়া দরকার, মিরা।”
মিরা তার বুকে মাথা হেলিয়ে স্নিগ্ধ স্বরে বলল, “হুম, তবে তার আগে দুজন নামাজটা আদায় করে নিই। দেখবে, মনটা পরিশুদ্ধ লাগবে, শরীরও হালকা হয়ে যাবে। এমনকি তোমার হাতের ব্যথাও দূরে সরে যাবে।”
কারান মাথা নাড়িয়ে বলল, “চলো।”
ওজু শেষে কারান আয়নার সামনে দাঁড়াল। সে মুহূর্তে আয়নায় যে প্রতিচ্ছবিটি ফুটে উঠল, তা এক স্থিতধী পুরুষের—যার শরীরে ক্লান্তি থাকলেও চেহারায় শুদ্ধি মিশে আছে। তার গায়ের উজ্জ্বল ত্বক ফজরের আলোয় আরও উজ্জ্বল লাগছে। খোঁচা খোঁচা দাড়িতে মুখের রেখাগুলো আরও স্পষ্ট দেখাচ্ছে। তার গভীর চোখ দুটো এতটাই স্থির যে, কেউ একবার তাকালে চোখ ফিরিয়ে নিতে পারবে না।
সে পরেছে একখানা বিশুদ্ধ কালো পাঞ্জাবি। বুকের মাঝখানে সূক্ষ্ম সোনালি জরির কাজ করা। হাতার কফে সূক্ষ্ম বেনারসি নকশা করা। পাঞ্জাবিটার কাট এতটাই নিখুঁত যেন তার সুঠাম শরীরের রেখাগুলো মেপে বিশেষভাবে বানানো হয়েছে। তার মাথায় বাধা আছে একটি সাদা-কালো দাগ কাটা মসলিন রুমাল।
মিরাও ওজু সেরে ধীর পায়ে ঘরে ফিরে এলো। তার ত্বকটা যেন সদ্য ফোঁটা শেফালির মতো দুধে ধোয়া নির্মল আর নিখুঁত। সে পরল একটা আকাশি নীল রঙের সিল্ক-সাটিনের তৈরি বোরকা। হিজাবটাও ঠিক একই রঙের। সে সেটি গলায় এক পাক দিয়ে পেঁচিয়ে নিল। হিজাবের এক কোনা আলতো করে পেছনে ফেলতেই, ঘাড়ের স্নিগ্ধ রেখা এক ঝলক দেখা দিয়ে হারিয়ে গেল কাপড়ের ভাঁজে।
কারান আয়নায় মিরার প্রতিবিম্বে চোখ রাখতেই তার ভেতরে এক অনির্বচনীয় আলোড়ন উঠল। সে পিছনে ঘুরে দাঁড়িয়ে নিজের মাথায় বাঁধা রুমালের অনুরূপ একটি রুমাল নিয়ে মিরার কাছে এলো। পূর্ণ যত্নে সেটি মিরার মাথায় পরিয়ে দিল।
মিরা স্নিগ্ধ দৃষ্টিতে সেই প্রতিটি মুহূর্ত গ্রহণ করল। তারপর মুচকি হেসে বলল, “নীল চোখ, লম্বা, সুঠাম দেহের এই অপার সুদর্শন পুরুষটা আমাকে প্রতিনিয়ত মুগ্ধ করে ফেলছে। মা শা আল্লাহ! কী অদ্ভুত সুন্দর লাগছে আমার স্বামীকে!”
কারান আলতো হেসে এক ধাপ পেছনে সরে দাঁড়াল। স্ব থুতনিতে হাত রেখে মাথাটা সামান্য কাত করে গভীর দৃষ্টিতে তাকাল তার দিকে। তারপর এক পা এগিয়ে এসে মিরার চিবুক তুলল। কপালের ঠিক মাঝখানে এক মৌন চুম্বন রেখে দিল। গভীর কণ্ঠে বলল, “এই চোখের গভীরতা, এই দুধে ধোয়া মুখের মুগ্ধতা আর নির্মল হাসির শুদ্ধতা… সুবহানাল্লাহ তাবারাকাল্লাহ! কী অপরূপ লাগছে আমার স্ত্রীকে!”
মিরা হেসে কারানের পায়ের ওপর দাঁড়িয়ে পড়ল, পা উঁচিয়ে তার কপালের মাঝখানে এক আলতো চুমু দিল। তারপর নিচে নেমে কোমল কণ্ঠে বলল, “এবার চলুন, স্বামীজি।”
দুজন একসাথে জায়নামাজ বিছিয়ে নামাজে দাঁড়াল। নামাজ শেষে মোনাজাতে কারান দুই হাত তুলে রেখেছিল। মিরা তার পাশেই করজোড়ে নিবিষ্ট। হঠাৎ সে কারানের হাতের মাঝখান থেকে যেন তার দোয়াগুলো চুরি করে নিল। কারান চমকে তার দিকে তাকাল।
দোয়া শেষে মিরা মুখমণ্ডলে ধীরে হাত বুলিয়ে, কারানের গালেও স্পর্শ করল সেই একইভাবে। কারান স্নিগ্ধ কণ্ঠে বলল, “এটা কী করলেন, বেগম?”
মিরা হেসে কারানের কোলের মধ্যে গা এলিয়ে দিল। কণ্ঠে শিশুর মতো সরলতা নিয়ে বলল, “তোমার দোয়াগুলো চুরি করে নিলাম।”
কারান কিছু বলল না, শুধু অপলক তাকিয়ে রইল সেই মুখের দিকে, যে মুখে স্রষ্টা নিজে সৌন্দর্যের সীমা মেপে দিয়েছেন। কী নিখুঁত, কী কোমল, কী ভয়ানক সুন্দর এই নারী! সময় যেন থেমে যেতে চাইছে এই মুখের প্রশান্তিতে।
মিরা তার চাহনি বুঝে নিয়ে বলল, “জীবনটা কত সুন্দর, হানি! আমি এভাবেই সারাজীবন তোমার সাথে কাটাতে চাই।”
কারান হাসল না। কারণ সে জানে, তার জীবন সমুদ্রের শান্ত তরঙ্গ নয়, বরং তার নিচে গভীর খাদ আছে। যেখানে প্রতিটি সুখ-ক্ষণ গিলে নেওয়ার মতো উন্মুখ করে দাঁড়িয়ে আছে ভবিষ্যৎ।
সে মিরার গালে আলতো হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বলল, “মিরা, তোমাকে একটা কথা বললে তুমি কি আমাকে বিশ্বাস করবে?”
মিরা চোখ সরু করে বলল, “কী কথা?”
কারান এক দীর্ঘ, গুমোট নিশ্বাস ছাড়লো।
“তোমার গায়ে হাত তোলা বলো বা আর যে-সব করেছি, ওগুলো আমি ইচ্ছা করে করিনি।”
মিরা চোখে হতচকিত বিস্ময় নিয়ে কারানের কোল থেকে উঠে বসল। কারানের অনুতপ্ত, ক্লান্ত চাহনির দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। এতক্ষণ যে স্নিগ্ধতা কারানের মুখে লেগে ছিল, এখন তাতে বিষাদের ছায়া ঘনিয়ে এসেছে।
কারান আবার নীচু গলায় বলল, “বোঝোনি, তাই তো?”
মিরা কোনো উত্তর দিল না। শুধু স্তব্ধ চোখে তাকিয়ে রইল তার দিকে।
“যাকে তুমি দেখেছিলে, সে আমি নই। আবার যাকে এখন দেখছ, সেও আমি নই। আমি দুটো সত্তার মাঝখানে ঝুলে থাকা এক বিভক্ত সত্তা।”
মিরার কপাল কুঁচকে বলে উঠল, “তুমি কি আমার সঙ্গে মনস্তাত্ত্বিক গেইম খেলছ?”
কারান মিরার দুই কাঁধ শক্ত করে ধরে রাখল। মিরার দিকে এক পা এগিয়ে এসে মাথার রুমালটা খুলে পাশে রাখল। তার চোখ দুটো এতটাই ক্লান্ত আর দগ্ধ যে, দেখলেই বোঝা যায়—কারান নিজের সাথে নিজেই লড়ছে। কেমন যেন অস্থির হয়ে উঠল সে। নীচু গলায় বলল, “বিলিভ মি মিরা, আমার সত্যিই কিছু একটা হয়েছিল। কে.ছি হাউজে যাওয়ার পর থেকেই আমি আর আমি ছিলাম না। হ্যাঁ, আমি মানছি তোমাকে দিয়ে বারবার কফি বানানোটা ইচ্ছাকৃত ছিল, কারণ তখন তোমার প্রতি আমার কোনো টান ছিল না; বরং আমি বিরক্ত ছিলাম। আমি শুধু পরীক্ষা নিচ্ছিলাম, তুমি কতদূর সহ্য করতে পারো; আমার মতো জটিল, বিষাক্ত একজন মানুষের পাশে তুমি দাঁড়িয়ে থাকতে পারবে কিনা যাচাই করছিলাম।”
একটা দীর্ঘ নিশ্বাসে গলা কেঁপে উঠল তার।
“কিন্তু… কিন্তু গায়ে কফি ফেলাটা আমার ইচ্ছাকৃত ছিল না, মিরা। আই সুয়্যার! আমি যখন তোমার হাত থেকে কাপটা নিতে গিয়েছিলাম, তখনই নড়েচড়ে কফিটা তোমার গায়ে ছিটে উঠলো। তোমার হাতে পড়ল, হাতটা পুড়ল। মুহূর্তে আমার ভিতরটা কেঁপে উঠেছিল। ইচ্ছে করছিল তোমার হাতটা ধরতে, জিজ্ঞেস করতে, ‘ডিড ইট হার্ট? হাউ মাচ ডাজ ইট বার্ন?’ ইচ্ছে করছিল তখনই মলম এনে লাগিয়ে দেই। বাট আই ডিডেন্ট ডু দ্যাট। ইন্স্টেড, আই স্টুড দেয়ার ওয়েরিং আ ক্রুয়েল, শেইমলেস মাস্ক। যেন তোমাকে দেখাতে পারি, আমি কতটা নির্মম। তোমার চোখে আমি হয়ে উঠলাম এ মোরালি করাপ্ট ভিলেন। ভালো ব্যবহার করলে হয়ত তুমি টান পেতে পারো, তাই আমি নিজেকে খারাপ করে তুলেছিলাম। বিকজ…”
ঢোক গিলে থেমে বলল, “বিকজ আই ওয়ান্টেড ইউ টু হেইট মি। আই ওয়ান্টেড ইউ টু ডিভোর্স মি। আমি জানতাম, আমি যদি ভালো ব্যবহার করি, তুমি হয়ত আমায় ভালোবেসে ফেলবে। আর আমি চাইনি তুমি এক নিষ্ঠুর, বিকৃত একটা মানুষকে ভালোবাসো।”
কারান আপনমনে বলল, “তোমাকে কষ্ট দেওয়ার পিছনে আরো বড় একটা কারণ হলো, তোমাকে বাঁচানো।”
এরপর আবার নিশ্বাস টেনে বলল, “আর… আর মিরা, বাকি কাজগুলো আমি করিনি। বিশ্বাস করো, আমি তোমাকে ইচ্ছে করে আঘাত করিনি। প্রমিস, ইচ্ছেকৃত করিনি। আমি তোমার গায়ে হাত তুলেছি, তোমাকে ছোট করেছি, অপমান করেছি… কিন্তু কখনও সজ্ঞানে করিনি। আই ডোন্ট নো হাউ টু মেক ইউ ট্রাস্ট মি, অর ইভেন ইফ আই অ্যাম ট্রাস্টওয়ার্থি। বাট সুইটহার্ট, সাডেনলি মাই বডি ওয়াজ গোয়িং থ্রু হরমোনাল চেঞ্জেস। আমি জানি না কীভাবে, কেন—কিন্তু তোমাকে যখন আঘাত করতাম, তখন একটুও অনুশোচনা হতো না। আমি অবাক হতাম নিজের উপর; অপরাধ করেও নিজেকে দোষী মনে হতো না! স্ট্রেঞ্জ, রাইট?”
তার শ্বাস ভারী হয়ে উঠল। কণ্ঠে রাগ আর হতাশা নিয়ে বলল, “অথচ এখন ভাবলে গা শিউরে ওঠে। আমি তোমাকে মেরেছি এটা ভাবলেই আমার হাত কে’টে ফেলতে ইচ্ছে করে। তুমি এখন ভাবতে পারো, তোমাকে বোঝানোর জন্যই আমি নাটক করছি। কিন্তু ট্রাস্ট মি, আমি ইচ্ছে করে করিনি। আমি নিজেও জানি না কীভাবে বোঝাব তোমায়। আমি নিজের কাছেই অপরিচিত হয়ে গিয়েছিলাম। হ্যাঁ, আমি খারাপ। খারাপের থেকেও খারাপ। পৃথিবীর সবচেয়ে বিকৃত পুরুষদের মধ্যে আমিও একজন। আমি নারীদের প্রতি ঘৃণা পোষণ করতাম, সেটা ঠিক। কিন্তু তাদের ডিসরেসপেক্ট করাটা ছিল না আমার নীতিতে।
তুমি যখন এগারো মাসের সব কিছু সামনে তুলে ধরলে, তখন প্রথমবার মনে হলো—আমি কি পাগল ছিলাম? আমি তখন রিসার্চ করলাম, খুঁজতে থাকলাম কী হয়েছিল আমার সঙ্গে, কেন আমি এমন হয়েছিলাম। কিন্তু কিছুই পেলাম না। হয়ত আল্লাহ নিজেই আমাকে কোনো পরীক্ষায় ফেলেছিলেন। অথবা হয়ত… অন্য কেউ আমাকে নিয়ন্ত্রণ করছিল। কিন্তু ওই টাইমটায় আমার এসব নিয়ে সময় নষ্ট করতে ইচ্ছে করছিল না। আমি শুধু চাইছিলাম তুমি একবার… একবার শুধু আমার দিকে তাকিয়ে বলো, ‘আমি তোমাকে ভালোবাসি।’ কবে তুমি বলবে, ‘কারান, আমি তোমার!’ আমি তো মরিয়া ছিলাম তোমার হৃদয়ে একটু জায়গা পেতে। তুমি যখন ধীরে ধীরে কাছে আসতে শুরু করলে, তখন আমি ভেতরে কাঁদছিলাম প্রতিটি মুহূর্তে। অপরাধবোধে বিদ্ধ হচ্ছিলাম। কিন্তু আমি চুপ করে ছিলাম।”
মিরা এতক্ষণ নীরব শ্রোতা হয়ে থেকেছিল। কিন্তু এবার নীচু গলায় বলল, “পুরোনো কথা বাদ দাও, কারান। আমি সত্যিই ওসব আর মনে করতে চাই না। সেই সময়টাকে মনে করলেই বুকটা কেমন করে ওঠে। অস্থির লাগে খুব।”
“বাট মিরা, ইউ শুড নো, যদি কখনো আমার ওপর রাগ জমে, তখন ওই এগারো মাসের কথা যেন মনে না আসে। দ্যাট ওয়াজ নট মি। ওকে?”
মিরা কপাল কুঁচকে জিজ্ঞেস করল, “তুমি কি সবকিছুকেই সন্দেহের চোখে দেখো?”
“নট এভরিথিং, বাট যেগুলো অস্বাভাবিক মনে হয়, সেগুলোর পেছনে আমি একটা কারণ খুঁজি। ইট কুড বি সাইকোলজিক্যাল, অর সায়েন্টিফিক। মেবি ইভেন সুপারন্যাচারাল, বাট আই ডোন্ট বিলিভ ইন দ্যাট।”
“তাহলে বলছ তোমাকে কেউ কন্ট্রোল করেছিল?”
“গেস সো।”
মিরা একটু হাসল, “কারান চৌধুরীকে? তুমি কি বিশ্বাস করো সামওয়ান ক্যান কন্ট্রোল ইভেন ইউ?”
কারান হেসে ফেলল।
“বাঘকেও নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব, মিরা। আর আমি তো রক্তমাংসের সাধারণ মানুষ মাত্র।”
মিরা তার দিকে স্থিরভাবে তাকিয়ে বলল, “তুমি বাঘের থেকেও চার ধাপ উপরে। কখনো কখনো তো তোমাকে আমারই ভয় হয়।”
হঠাৎই কারান চোখ বন্ধ করে ফেলল। মুখের রেখাগুলো থেমে গেল, নিশ্বাসের গতিও পালটে গেল। তার মস্তিষ্ক তখন ঢুকে পড়েছে পুরোনো স্মৃতির এক গহীনে। মনস্তত্ত্বে একে বলে ‘মেন্টাল টাইম ট্রাভেল’। এই প্রক্রিয়ায় মানুষ শরীরের নাড়িনক্ষত্র না নাড়িয়ে মস্তিষ্কের ক্যানভাসে ফিরে যায় সেই দৃশ্যপটে, যেখানে কোনো এক বিচ্যুত মুহূর্ত তাকে চিরতরে বদলে দিয়েছিল।
মিরা অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল তার দিকে।
সে একপাশে গিয়ে তার কাঁধে হাত রেখে হালকা ধাক্কা দিয়ে বলল, “কি ভাবছো?”
কারান চোখ খুলে ফেলল। আচমকা শরীরে কিছু অনুভব হলো। বলল, “আমার কি ওই ব্যাপারটা নিয়ে রিসার্চ করা উচিত, মিরা? যদি সত্যিই আমার মস্তিষ্ক কোনো সময়ে অন্য কারো ইচ্ছায় নিয়ন্ত্রিত হয়ে থাকে…?”
মিরা এক মুহূর্ত চুপ করে রইল। তারপর দৃষ্টি সরিয়ে জানালার দিকে তাকাল। বাইরের আলো তখন ম্লান হয়ে গেছে। সে ঘাড় ফিরিয়ে বলল, “তুমি কি সত্যিই সেই পথে হাঁটতে চাও, যেখানে উত্তর পাওয়া যাবে কিনা তার নিশ্চয়তা নেই?”
কারান কিছু বলল না। মিরার গভীর চোখের দিকে তাকিয়ে রইল শুধু।
“সময় নষ্ট করার কি খুব দরকার, কারান? আমাদের জীবন তো কেবল প্রশ্ন খোঁজার জন্য নয়। কিছু কিছু জিনিস উত্তর না পেয়েই ছেড়ে দিতে হয়।”
সে এগিয়ে এলো। কারানের গালে হাত রাখল।
“তুমি তো নিজেই বলেছিলে, আমাকে তখন সহ্য করতে পারতে না। তাই হয়ত নিজের অজান্তেই আমাকে আঘাত করেছো। তবে সেটা তোমার দায় নয়, বরং সময়ের এক নির্মম পরীক্ষা। আমাদের এখন আরো অনেক গুরুত্বপূর্ণ কাজ আছে। আত্মবিশ্লেষণে ডুবে থাকলে বর্তমানটা হাতছাড়া হয়ে যাবে। আসলে আমার আর এসব ভালো লাগছে না, বিরক্ত হয়ে গেছি আমাদের জীবনের ওঠানামা নিয়ে। তাই আমি চাই তুমি শুধু আমাকে নিয়ে সামনে এগিয়ে চলো।”
কারান নীচু স্বরে বলল, “রাইট!”
তারপর সে গভীর চিন্তায় ডুবে গেল। সামনে অসংখ্য দায়িত্ব জমে আছে। তবে পুরোনো অতীতের ধুলোমলিন পাতাগুলো উল্টে দেখার প্রয়োজন অস্বীকার করা যায় না। হয়ত কিছুই মিলবে না, আবার মিরার কথাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
সেই সময় নারীদের প্রতি তার দৃষ্টিভঙ্গি ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন, তাই তৎকালীন আচরণে বিভ্রান্তি থাকাটাও অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু একটি প্রশ্ন বুকের গহীনে কাঁটার মতো বিঁধে রইল।
আপনমনে বলল, “আমি তো তোমাকে দেখার আগেই ভালোবেসে ফেলেছিলাম, তাহলে কি সত্যিই ওইসব আমারই করা?”
কারানের অন্যমনস্ক ভাব দেখে মিরা বলল, “আবার কি ভাবছ?”
কারান তার চোখে চোখ রেখে বলল, “Do you believe in manipulation?”
মিরা হাসিমাখা কণ্ঠে বলল, “না করার তো কিছু নেই।”
“আমার কেন জানি মনে হচ্ছে, মাত্র তুমি আমাকে ম্যানিপুলেট করেছ।”
“অদ্ভুত! কি সব আজেবাজে কথা বলছ? আমি যদি তোমাকে ম্যানিপুলেট করতাম, তুমি কি সেটা বুঝতে পারতে?”
“তাও ঠিক,” বলেই কারান মাথা কাত করে বিড়বিড় করল, “মাথায় অতিরিক্ত চাপ পড়ছে, কি থেকে কি বলছি বুঝে উঠতে পারছি না। হচ্ছেটা কি?”
মিরা তার মনোস্থিতি বুঝতে পেরে তৎক্ষণাৎ এগিয়ে এলো। কারানের চিন্তাজড়িত মুখের দিকে নজর দিয়ে তার গালে স্নিগ্ধ হাত রাখল, “আজ হঠাৎ কেন এসব বলছো, কারান?”
কারানের ঘোর ভাঙতে শুরু করল। নিজেকে সামলে একটু গভীর নিশ্বাস নিল। ঠান্ডা গলায় বলল, “ওই যে, তুমি মনে করালে। আমার আসল উদ্দেশ্য তোমার সামনে ভালো হওয়া নয়, কিন্তু তুমি আমার উপর বিশ্বাসটা হারাবে না। নো ম্যাটার হোয়াট হ্যাপেনস, বুঝবে আমি তোমার সব। আমি ছাড়া তোমার কেউ আপন নয়, মিরা। তোমার পরিবারও নয়। গট ইট?”
মিরার কপালে গভীর ভাঁজ পড়ে গেল। গলার স্বর স্থির রেখে বলল, “মাথা ঠিক আছে তোমার? পরিবারও নয় মানে কি?”
কারান শান্ত চেহারায়ই বলল, “তাদের মেয়েকে তার হাসব্যান্ড এগারোটা মাস টর্চার করেছে। হ্যাঁ, মেয়ে কিছু একটা বুঝিয়ে দিয়েছে ঠিক আছে। কিন্তু তাদের কেন একবারও মনে হয়নি ‘মিরা কি আদৌও ভালো আছে?’ কেন মনে হয়নি?”
মিরা এদিক-ওদিক মাথা ঝাঁকিয়ে বলল, “এটা কোনো যুক্তি হতে পারে না। তোমার সঙ্গে তাদের সম্পর্ক আন্তরিক ছিল, আমিও কখনো বুঝতে দেইনি। তাহলে?”
“মিরা, তুমি যদি এক মিনিটের জন্যও আমার চোখের আড়ালে চলে যাও, আমি উন্মাদ হয়ে যাই। কোথায় গেলে, ঠিক আছো কিনা—এই চিন্তায় আমার নিশ্বাস বন্ধ হয়ে আসে। তোমার নিরাপত্তা নিয়ে চিন্তার এক অদৃশ্য অ্যানক্সিয়েটি সবসময় পেছনে লেগেই থাকে। অথচ এগারোটা মাসেও, একবারও এমন অনুভব হলো না তাদের?”
মিরা কঠিন স্বরে বলল, “তুমি এসব বুঝবে না। আমি ভিডিও কলে তাদের সাথে কথা বলেছি, হাসিমুখে দেখিয়েছি আমি কতটা সুখী। সেখানে তাদের বোঝার মতো কোনো ক্লু ছিল না। আর তুমি তো জানোই, আমার বাবা-মা কেমন মানুষ। তারা নিজেদের কষ্ট, দুঃখ সব গোপন রাখেন। তাই তাদের কোনো ফ্লট নেই। তারা আমাকে নিঃসন্দেহে সীমাহীন ভালোবাসেন।”
একটা দীর্ঘ নিশ্বাস ফেলে কারান ভরা গলায় বলল, “আমি তো কখনো বলিনি তারা তোমাকে ভালোবাসেন না। তাদের ভালোবাসা নিঃস্বার্থ ঠিক। কিন্তু আমি শুধু তোমাকে ডিফারেন্সটা বুঝাতে চাই। তাদের কাছে তুমি ‘হীরা’, আর আমার কাছে তুমি ‘কোহিনুর হীরা’। তাদের কাছে তুমি ‘ফুল’, আর আমার কাছে তুমি ‘জুলিয়েট রোজ’। তাদের কাছে তুমি ‘তারা’, আর আমার কাছে তুমি ‘নীলতারা’। তাদের কাছে তুমি ‘দোয়া’, আর আমার কাছে তুমি ‘তাকদির’। তাদের কাছে তুমি ‘জান্নাত’, আর আমার কাছে তুমি ‘জান্নাতুল ফেরদৌস’। তারা তোমাকে ভালোবাসে গভীরভাবে, বিশেষ করে তোমার বাবা। কিন্তু… কিন্তু পৃথিবীর কেউ, কেউই, আমার মতো করে তোমাকে ভালোবাসতে পারবে না।”
মিরা অপলক চোখে কারানের কথাগুলো শুনছিল। এক মুহূর্তেই তার হৃদয় বশীভূত হয়ে গিয়েছিল; কারানের দেওয়া উদাহরণগুলোই ছিল তেমন নিখুঁত। হীরা তো অনেক, কিন্তু কোহিনুর হীরা একটাই। ফুল তো প্রচুর, কিন্তু জুলিয়েট রোজের মতো বিরল গাছ পাওয়া যায় না—যার জন্য পনেরো বছর, পাঁচ মিলিয়ন ডলার খরচ হয়েছিল। তারা তো অসংখ্য, কিন্তু নীলতারার দেখা মেলে যুগে যুগে একবার। জান্নাত প্রত্যেক বাবা-মায়ের সন্তানের জন্যই শান্তির ঠিকানা, কিন্তু জান্নাতুল ফেরদৌস হলো সেই জান্নাতের মধ্যে সর্বোচ্চ মর্যাদার স্থান, আল্লাহর প্রিয় স্থান। আবার দোয়া অনেকেই করে, কিন্তু ভাগ্য নির্ধারিত হয় আল্লাহর ইচ্ছায়। মিরার হৃদয়ে কারানের কথাগুলো গভীর ছাপ ফেলেছিল।
কারান যে খেলাটা খেলছে, তা প্রতিহিংসার নয়, ধ্বংসেরও নয়। সে চায় না মিরা তার মা-বাবাকে ঘৃণা করুক; কিন্তু চায় মিরা বুঝুক, এই বিশাল দুনিয়ায় সে শুধু কারানের কাছেই নিরাপদ।
মিরা চোখ নামিয়ে গভীর দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
“বাবা-মা তো স্বার্থ দেখে না, কারান।”
কারান ঠোঁটে রহস্যময় হাসি ফুটিয়ে শান্ত গলায় বলল, “তবে কি জানো, সামটাইমস নিঃস্বার্থতার আড়ালেও লুকিয়ে থাকে দায়িত্বপরায়ণ এক আত্মরক্ষা। দে ফুলফিল্ড দেয়ার রেসপন্সিবিলিটিজ, দ্যাটস ইট। কিন্তু মায়া? অনুভব? দ্যাটস মিসিং।”
Tell me who I am 2 part 5 (4)
মিরা কেঁপে উঠল যেন। ঢোক গিলে বলল, “না, তুমি যা বলছ তা ঠিক না। আমি যেমন তোমাকে বিশ্বাস করি, তাদেরও ততটাই করি। দে রেইজ্ড মি উইথ লাভ, কেয়ার, অ্যান্ড স্যাক্রিফাইস। তারা… তারা আমার অস্তিত্বের শুরু। দে আর মাই ব্লাড, মাই রুটস। আমি জানি তারা আমাকে কতটা ভালোবাসে।”
“আজ তা-ই মনে হচ্ছে, জানি। বাট সামডে, ওয়ানডে তুমি নিজেই বুঝবে, তোমার মা-ই তোমার সরলতা নিয়ে খেলেছে। যাকে তুমি শিকড় ভেবেছ, সে-ই একদিন ভূমিকম্পের কারণ হবে। তোমার মা-ও তোমাকে ঠকিয়েছে, মিরা।”
