Home এমপি রুশভিয়ান মির্জা এমপি রুশভিয়ান মির্জা পর্ব ৭

এমপি রুশভিয়ান মির্জা পর্ব ৭

এমপি রুশভিয়ান মির্জা পর্ব ৭
ফাতেমা তুজ জোহরা

এই শা*লি এত ঢং ক্যান করছিস আমার জীবনডারে না খাইয়া তুই ম*র*বি না!
ইনান একনিমেষেই বাস্তবে ফিরে আসে, রুশভিয়ানের কর্কশ গলার স্বর শুনে। সে একরাশ আ*তং*ক নিয়ে রুশভিয়ানের দিকে তাকায়। সে তো চোখ বন্ধ রেখে তার সামনের সোফায় ভাবলেশহীন ভাবে সি*গা*রে*ট টানতে ব্যাস্ত।
সি*গা*রে*টে*র বিদঘুটে গন্ধে ইনান দুই হাত দিয়ে নাক মুখ শক্ত করে আশেপাশে অবলোকন নিজের অবস্থান বোঝার জন্য। সে যে ঘরে অবস্থান করছে ঘরটা আহামরি খুব একটা সৌন্দর্য পূর্ন না। একটা ছোট চৌকি রাখা আছে যেটাতে সে বসে আছে তার থেকে কিছুদূরে রাখা আছে পুরনো সোফা। যেটাতে রুশভিয়ান বসে সি*গা*রে*ট খাচ্ছে। ঘরটা দেয়ালে অনেক পুরনো লাল লাল দা*গ স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে। যা শুকিয়ে দেয়ালের সাথে মিশে আছে। ঘরের কোনায় ছোট একটা ব্যাগ, ব্যাগের মধ্যে কি রাখা আছে ইনান তা বুঝতে পারলো না। সে আবার ঘাড় ঘুরিয়ে রুশভিয়ানের দিকে তাকায়। মনে মনে ভাবতে লাগলো এই ন*র*ক থেকে কিভাবে মুক্তি পাওয়া যায়।
রুশভিয়ান সি*গা*রে*টে শেষ টান দিয়ে কিয়তক্ষন ঝিম ধরে বসে থেকে চোখ খুলে ইনানের দিকে চেয়ে বলল,” আমার লগে বাইরে আয়, তোরে আমি নিয়া যামু আমাদের গ্রামে?

ইনানের বুকটা ধক করে উঠলো রুশভিয়ানের কথা শুনে। চোখ দুটোতে পানিতে টইটম্বুর হয়ে উঠলো আসন্ন ভ*য়ে। সে ব্যাতিব্যস্ত কন্ঠে বলল, ” আমাকে ছে**ড়ে দিন স্যার, আমি কাউকে কিছু বলব না। আমাকে বাঁ*চ*তে দিন?
রুশভিয়ান জিভ দিয়ে গাল ঠেলে অনতিবিলম্বে বলল,” তোর লেইগা আমার পিছনে ইয়া বড় বাঁশ ঢুইকা গেছে। আর তুই বলতাছিস ছা*ইরা দে। শুইনা রাখ তোরে আমি ছা*ড়মু না। যতদিন এই বি*প*দে আমি ডুইবা থাকবো ততদিন তুই আমার লগে থাকবি?
রুশভিয়ানের কথা গুলো শুনে ইনানের ছোট হৃদয় ভ*য় ঢুকে যায়। সে কাঁদতে কাঁদতে অনুনয়ের স্বরে বলল,” প্লিজ আমাকে ছে*ড়ে দিন ? আমাকে আবার ন*র*কে ঠেলে দিবেন না ” কথাটুকু বলেই ইনান কান্নায় ভেঙে পড়লো
ইনানের অনুরোধ গুলো পাথরের দেয়ালে আছরে পরার মতো তার কাছে ফিরে আসছিলো । সে হয়তো জানে না রুশভিয়ানের কাছে আবেগ,ভালোবাসা, মোহ,মায়া, মমতা, সব তুচ্ছ। সে জন্য ইনানের কথার মর্মাথ টুকু বোঝার চেষ্টা করলো না।যে কতটা ক*ষ্ট পেলে একটা পেয়ে এইভাবে বলতে পারে । আর করবে বা কি করে। কথাগুলো বোঝার জন্য একটা সুন্দর মন থাকা দরকার যেটা রুশভিয়ানের কাছে নেই। তার হৃদয় অহং*কার আর টাকার নিচে নিপতিত হয়ে আছে।

রুশভিয়ান কপাল কুচকে ফেলল বিরক্তিতে। এক হাত দিয়ে লুঙ্গির আগামাথা ধরে গা ঝাড়া দিয়ে উঠে ইনানের দিকে তাকিয়ে গম্ভীর কন্ঠে বলল,” যতই কান্না কর? আমার জীবন থেইক্কা শনি না কাটা পর্যন্ত তোরে আমি মু*ক্তি দেব না। আর আমার লগে বেশি পায়তারামি করলে জিন্দা ক*ব*র দিয়া দিমু” বলেই দরজার দিকে এগিয়ে গিয়ে আবার সটান হয়ে দাঁড়িয়ে পড়লো রুশভিয়ান। পিছনে ফিরেই বলল,” আমার লগে আয়, এক কথা আমি বার বার বলি না ” বলেই চলে গেল।
ইনান চোখ থেকে টপটপ করে পানি গড়িয়ে পড়ছিলো। বুকের ভেতরটা যেন বরফ জমে গেছে ভ*য়ে। তবু ও আস্তে আস্তে চৌকি থেকে উঠে দরজার দিকে এগিয়ে যায়। প্রতিটি পদক্ষেপ তার মনে হচ্ছিলো সে নিজের অস্তিত্ব থেকে দূরে সরে আসছে। গলা শুকিয়ে কাট তবু এক এক পা আবার সেই ড্রয়িং রুমে এসে তার পায়ের গতি স্থির হলো।ঝাপসা চোখে সামনে তাকিয়ে দেখলো রুশভিয়ান কারো সাথে কথা বলতে ব্যাস্ত। ইনান নিজের জায়গায় ঠাঁই দাঁড়িয়ে রইলো।

এভাবে কিয়তক্ষন ইনান দাঁড়িয়ে থাকার পর তার ছোট্র শরীর টা নড়েচড়ে উঠলো। সে হকচকিয়ে সামনে তাকাতেই দেখল গুন্ডাটা তার হাতের ডানা ধরে হিরহির করে বাইরে টেনে নিয়ে যেতে লাগলো। ইনান বিমূঢ় হয়ে রুশভিয়ানের দিকে তাকিয়ে ছোট ছোট পায়ে বড়বড় পদক্ষেপ তুলতে লাগলো। তবুও রুশভিয়ানের পায়ের গতির সাথে তাল সামলাতে পারলো না। ইনান আকুল গলায় বলল, ” প্লিজ আসতে হাঁটুন, আমার খুব ক*ষ্ট হচ্ছে আপনার সাথে পা মিলিয়ে হাঁটতে। রুশভিয়ান পায়ের গতি স্থির হলো লিফটের সামনে । একহাত বাড়িয়ে এক নাম্বার বোতামে চাপ দিতেই লিফটের দরজা ধীরে ধীরে খুলে যেতে লাগলো।
ইনান বুক এক হাত দিয়ে কোনরকমভাবে নিঃশ্বাস টুকু নিচ্ছিলো বেচারী। বেচারীর সুখটুকু সামনের মানুষটার স*হ্য হলো না। এক ধা*ক্কা*য় লিফটের ভেতরে ইনান পাঠিয়ে দেয়। রুশভিয়ান গৌরবের সাথে প্রবেশ করলো লিফটের ভেতরে।

ইনান পড়তে নিচ্ছিলো সামনের দিকে,কোনভাবে নিজের শরীরের ব্যালেন্স ঠিক রেখে আস্তে আস্তে উঠে দাঁড়িয়ে এককোনায় চলে গেল। রুশভিয়ান একভাবে দাঁড়িয়ে আছে তার ইনানের দিকে কোন প্রকার ভ্রক্ষেপ নেই।
লিফট যত নিচে নেমে যেত লাগলো ইনানের হৃৎস্পন্দন আরো দ্রুত হতে লাগলো। ভ*য়,অনিশ্চয়তা ভবিষ্যৎ , আর অসহায়ত্ব তাকে পুরোপুরি গ্রাস করে ফেলেছে। ঠোঁট কাঁপছে , চোখ ভিজে আসছে বার বার। হাতের উল্টো পিঠে মুছতে লাগলো। তার কান্নার শব্দ গুলো তার গলায় আটকে গেছে।
এরইমধ্যে লিফট এসে থামলো একতলায় খুলে গেল লিফটের ভারী পাল্লা দুটো।কয়েক সেকেন্ডের নিস্তব্ধতা । তারপর রুশভিয়ান এবার ইনানের ডান হাত ধরে বেরিয়ে গিয়ে কড়িডরে হাঁটতে লাগলো।দেয়ালে সারি সারি লাইট লাইটের আলোয় প্রতিটি পদক্ষেপ যেন আরো স্পষ্ট হয়ে কানে বাজছে।
রুশভিয়ান একবার ও পিছনে তাকাল না। সোজা ধীর পায়ে সামনে হাঁটতে লাগলো। তার কাধ সমান। মুখের কোন অভিব্যাক্তি নেই।এক হাতে ধরে আছে লুঙ্গি। কালো আর সাদা লুঙ্গির পোশাকের সঙ্গে গম্ভীর উপস্থিতিটা ও তাকে আর কঠিন করে তুলছে।
আর ইনান পায় ধীরে ধীরে ভারি হয়ে আসছে। অচেনা করিডরে, প্রতিটি দরজা, প্রতিটি ছায়া তার মনে নতুন নতুন আশঙ্কা জাগিয়ে তুলছে। শুকনো ঠোঁট বার বার জিভ দিয়ে ভিজিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করলে ও গলা শুকিয়ে আসছে তার।
করিডর পেরিয়ে তারা ভবনের প্রধান প্রবেশদ্বারে পৌঁছালো। বাইরে কালো রঙের গাড়ি অপেক্ষা করছে। মূদু আলোয়, নিস্তব্ধ পরিবেশে দূরে দাঁড়িয়ে আছে দশজন লোক। লোকগুলো দেখে ইনান ভ*য়ে গুটিয়ে গেল আরো। তার মনে হচ্ছে লোক গুলো হয়তো তার জন্য অপেক্ষা করছে। গলা শুকিয়ে কাট হয়ে এলো নিজের অযাচিত চিন্তায়।

রুশভিয়ান গাড়ির পেছনের দরজার কাছে এগিয়ে গিয়ে খুলে ইনানের দিকে তাকিয়ে বলল,” এই উঠে যা!
একপল রুশভিয়ানের মুখের দিকে তাকিয়ে পরিস্থিতির চাপে ধীরে ধীরে গাড়িতে গিয়ে বসে পড়লো।
ইনানের বসার পর রুশভিয়ান শব্দ করে দরজা লাগিয়ে দেয়।
রুশভিয়ান সামনে বসে ড্রাইভার কে বলল, গাড়ি রুপনগরের দিকে লইয়া চলো। ড্রাইভার মালিকের হুকুম পেয়ে গাড়ি স্ট্যাট করলো।গাড়ির ভেতরে ইঞ্জিনের মূদু গর্জন ছাড়া আর কোন আওয়াজ নেই। সিটে বসে ইনান হাতের সাথে হাত কচলে যাচ্ছে। জানলার কালো কাঁচের ওপারে শহরের আলো দ্রুত পেছন সরে যাচ্ছে। কিন্তু সে বুঝতে পারছে না গাড়িটা কোথায় যাচ্ছে।
রুশভিয়ান পাশের সিটে নিশ্চুপ হয়ে বসে আছে। সোজা বসার ভঙ্গি, স্থির দৃষ্টি আর গম্ভীর মুখভঙ্গি দেখে বোঝার জো নেই তার মাথায় কি চলছে রুশভিয়ানের । মাঝে মাঝে জানলার দিকে তাকাচ্ছে। আবার সামনের রাস্তার দিকে অস্থির দৃষ্টিতে ফেরাচ্ছে।
এভাবে কিয়তক্ষন কেটে যাবার পর রুশভিয়ান একবার পিছনে ফিরে তাকাতেই দেখলো ইনান গুটিসুটি হয়ে সিটে বসে জানলার দিকে তাকিয়ে আছে। রুশভিয়ান কিছু বলল না আবার ও সামনের দিকে তাকায়।

রাত্রি তিনটা,, চারপাশ এমন নিস্তব্ধতা যে চারপাশের ঝিঁঝিপোকার ডাক ও স্পষ্ট হয়ে শোনা যাচ্ছে। আকাশে আধখানা চাঁদ মেঘের আড়াল থেকে মাঝে মাঝে উঁকি দিচ্ছে।
গাড়িটা ধীরে ধীরে রুপনগরের কাঁচা রাস্তায় ঢুকে পড়ে। চাকার নিচে শুকনো মাটির ধূলো বাতাসে উড়ে আবার ও মিলিয়ে যায়। কোথাও কোথাও বৃষ্টি হওয়ায়,রাস্তায় তৈরি হয়েছে ছোট ছোট গর্ত। তাই গাড়িটি সাবধানে সামনে এগিয়ে যেতে থাকে। রাস্তার দুপাশে সারি সারি বাঁশঝাড়,আর বিশাল গাছের অন্ধকারে রহস্যময় ছায়া হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। দূরে দু এক টিনের ঘরে টিমটিমে আলো জ্বলছে। তবে বেশির ভাগ বাড়ী অন্ধকারে গভীর ঘুমে ডুবে আছে।
গাড়ির ভেতর নিস্তব্ধ পরিবেশ। ইনান ক্লান্তিতে গভীর ঘুমে তলিয়ে আছে। মাথাটা একপাশে হেলে পড়ে আছে। এলোমেলো চুলের কয়েকটি গোছা মুখের উপর পড়ে রয়েছে।
রুশভিয়ান এক ভাবই বসে রয়েছে এমন সময় তার ফোনটা কেঁপে কেঁপে উঠতে লাগলো। রুশভিয়ান ফোনটার দিকে তাকিয়ে দেখলো স্কিনে আমির। রুশভিয়ান ফোনটা রিসিভ করে বলল,” আর মাত্র দশমিনিট লাগবো, তোরা কাজি রেডি রাখ। আর যা যা লাগবো সব কিছু।
ওপাশ থেকে আমির বলল,” এগুলো লইয়া কোথায় থাকবো ভাই?
রুশভিয়ান বলল,” রত্নকুঞ্জে সব হইবো, মির্জা মহল আমি যামু না। ওইটা আমার লেইগা নিষিদ্ধ …. বলেই ফোন রেখে আবার সিটে গা এলিয়ে বসে রইলো।রুশভিয়ান শেষের কথাগুলো আক্ষেপ স্বরে বলল।

আম্মা আপনি জানেন ভাইয়া নতুন বউ নিয়া রত্নকুঞ্জ আসছে। বউ নাকি মেলা সুন্দর ওই যে বলে না টিভির নায়িকাদের মতো…. কথাগুলো তারা বেগমের উদ্দেশ্য বলে একগাল হাসলো বলল আরিয়ান মির্জা। বয়স চৌত্রিশ হলে ও মা*ন*সি*ক অবনতির কারনে এখনো সাত আট বছরের বাচ্চা মতো ব্যবহার করে।
তারা বেগম প্রতিদিন এইসময় ফজরের সালাত আদায় করতে উঠে। আজকে তার ব্যাতিক্রম হয়নি। তারা বেগম বিচ্ছুরিত দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো আরিয়ানের দিকে। তারা কথাগুলো বিশ্বাস হলো না। রুশভিয়ান কালকে একটা বউ কে মে**রে ফেলেছে আজকে আবার বিয়ে করতে এনেছে। আরিয়ান এখনো হাততালি দিচ্ছে আর হেঁসেই হেঁসেই বলছে, ” আজকে খুব মজা হবে রুশ ভাইয়া বউ নিয়ে রত্নকুঞ্জে আসবে। আমাকে অনেক সুন্দর সুন্দর খাবার খেতে দিবে ….আরিয়ান কথাগুলো বলতে বলতে যেতে নিলেই তারা বেগম তার হাত আকড়ে ধরে আকুল কন্ঠে বলল, ” সত্যিই রুশার ছেলে নতুন বউ নিয়া রত্ন কুঞ্জে আইতাছে!
আরিয়ান ঠোঁট উল্টে বলল,” রুশা কে আম্মা?

তারা বেগম মুখ চোখ শক্ত হয়ে গেল এক লহমায়। হাত দুটো মুষ্টিবদ্ধ করে দাঁতে দাঁত চেপে বলল, ” আমার জীবনডারে যে শে*ষ কইরা ছে সে হইলো রুশা মির্জা। আমার সাধের সাংসার টাকে ভেঙে চুরমার কইরা ছিলো ওই রুশা ” অত্যধিক ক্রো*ধা*ন্বিত হয়ে তারা বেগম কথা গুলো বলল।
আরিয়ান বোকা বোকা দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো, সে কিছুই বুঝতে পারলো না।
তারা বেগম আবার অস্থির কন্ঠে বলল,” কি হইলো বল রুশার ছেলে বিয়া কইরাছে?

এমপি রুশভিয়ান মির্জা পর্ব ৬

আরিয়ান শব্দ করে হেঁসে বলল, ” রুশার ছেলে বিয়ে করে নি, আমার ভাইয়া রুশভিয়ান বিয়ে করে বউ নিয়ে আসছে …. কথাটুকু বলে আরিয়ান আলো আঁধারির মধ্যে চলে গেল।
তারা বেগম পাশে থাকা ফুলদানিটা নিচে ফেলে বলল,” এটা কিছুতেই হইতে পারে না, আমি রুশার ছেলেদের শান্তি থাকতে দেবো না।তার ধ্বং*সে*র কারণ আমি হইবে, এই তারা বেগম হইবো …. কথাগুলো বলে তারা বেগম পাগলের মতো হাসতে লাগলো। তার পৈ*শা*চি*ক হাসির শব্দ পুরো মির্জা মহল কেঁপে উঠলো আচানাক…..

এমপি রুশভিয়ান মির্জা পর্ব ৮