এমপি শেহরান মির্জা পর্ব ২৩
সেঁজুতি আক্তার
মাইরা ছাদের কার্নিশ ঘেঁষে বসে আছে। আকাশটা আজ ভীষণ মেঘলা। ঠিক তার মনের মতো। মাইরা একদৃষ্টিতে আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে। বাতাসে তার খোলা চুলগুলো এলোমেলো হয়ে উড়ছে।
রাত প্রায় বারোটা। সারাদিনের ক্লান্তি শরীরে জমে আছে। ডান হাতটাও ব্যথা করছে। সকালে রিকশা থেকে পড়ে গিয়ে হাতে বেশ ভালোই আঘাত পেয়েছিল। তখন খুব একটা ব্যথা লাগেনি। এখন ব্যথাটা ধীরে ধীরে জানান দিচ্ছে। অথচ সে বিশ্রাম নেয়নি।
কলেজ করেছে। তারপর বাড়ি ফিরেছে। বাড়ি ফিরে প্রতিদিনের মতো কাজ করেছে। রাতের রান্নাটাও শেষ করেছে।
–কেউ জানতে চায়নি, হাতটা কেন এমন করে ধরে রেখেছে।
মাইরা অবশ্য কাউকে বলেনি।
–হঠাৎ টুপ করে দু-ফোঁটা পানি এসে পড়ল তার মুখে। মাইরা হাত বাড়িয়ে দিল। আরেক ফোঁটা পানি এসে পড়ল তার হাতের তালুতে। মাইরা আকাশের দিকে তাকাল। তারপর কোনো পূর্বসংকেত ছাড়াই বৃষ্টি নামল। কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই মাইরার কাপড় ভিজে শরীরের সঙ্গে লেপ্টে গেল। চুলগুলো ভিজে কপালে লেপ্টে গেল।
–মাইরা উঠে দাঁড়াল। দুই হাত মেলে দিল বৃষ্টির দিকে।
মনে হলো, আকাশ আজ তার হয়ে কাঁদছে। চোখের কোণ বেয়ে দু-ফোঁটা নোনা জল গড়িয়ে পড়ল। বৃষ্টির পানির সঙ্গে মিশে গেল সেই জল। মাইরা খুব আস্তে করে গুনগুন করে উঠল —
“জানি তুমি, আসবে না ফিরে
বাসবে না ভালো আমাকে…”
“জানি তুমি, ভেঙেছ
হৃদয় সেই আশাতে, দুঃখ চেপে রয়…”
গানটা শেষ করতে পারল না। গলার মধ্যে কেমন দলা পাকিয়ে আসছে। খুব কষ্ট হচ্ছে। তারপর ফিসফিস করে আবার বলল খুব নিচু স্বরে “মনে কি পড়ে?”
কাকে প্রশ্ন করল মাইরা, সেটা সে নিজেও জানে না।
হয়তো নিজেকেই।
রাত কত হয়েছে বোঝা যায় না। একটি অন্ধকার ঘরে বড় মনিটরের সামনে বসে আছে একজন মানুষ। মনিটরের পর্দায় একের পর এক সিসিটিভি ফুটেজ চলছে। মানুষটির হাতে জ্বলন্ত সিগারেট। ধোঁয়া ধীরে ধীরে ঘরের অন্ধকারে মিশে যাচ্ছে। সেন্টার টেবিলের ওপর পড়ে আছে অ্যালকোহলের বোতল। লোকটি সেদিকে তাকাচ্ছে না। তার চোখ শুধু মনিটরে স্থির । পর্দায় বৃষ্টিতে ভিজতে থাকা মাইরাকে দেখা যাচ্ছে। লোকটির ঠোঁটের কোণে খুব সামান্য একটা হাসি ফুটে উঠল। সেই হাসিতে আনন্দ নেই। আছে অদ্ভুত এক বিষাদ।
রাত প্রায় দুইটা। বৃষ্টি অনেকটাই কমে এসেছে। মাইরা এখনো ছাদে বসে আছে। কতক্ষণ ধরে এভাবে বসে আছে, তার হিসাব নেই। শরীর ঠান্ডায় কাঁপছে। তবুও উঠতে ইচ্ছে করছে না। শরীরটা ভালো লাগছে না।
হঠাৎ মনে হলো, অনেক রাত হয়ে গেছে। নিচে যেতে হবে।
মাইরা ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল। সিঁড়ি দিয়ে নামতে নামতে একবার নিজের ডান হাতটার দিকে তাকাল। ব্যথাটা এখন বেশ তীব্র। তবুও মুখে কোনো বিরক্তি নেই। রুমের সামনে এসে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল।
তারপর দীর্ঘ একটা নিঃশ্বাস ফেলে দরজা খুলে ভেতরে ঢুকল। আলমারি থেকে কাপড় বের করে ওয়াশরুমে চলে গেল। কিছুক্ষণ পর গোসল সেরে বেরিয়ে আসলো মাইরা। মাথায় তোয়ালে জড়ানো।
ভেজা শরীরে রুমে আসার দরুন ফ্লোরটা ভিজে গেছে। মাইরা নিচু হয়ে পানি মুছে ফেলল। তারপরে আস্তে করে গিয়ে দরজা লাগিয়ে দিয়ে মাথার তোয়ালেটা খুলে বারান্দায় মেলে দিল। ফোনটা হাতে নিল। সঙ্গে একটা ডায়েরি আর কলম নিয়ে বিছানায় বসল।
কিছুদিন আগে বান্ধবীর সাহায্যে ফেসবুকে একটা অ্যাকাউন্ট খুলেছিল মাইরা। ওর কিছু বান্ধবীকে বলেছিল কিছু ছাত্রী ম্যানেজ করে দিতে। মাইরা ভেবেছে এখন থেকে টিউশনি করাবে।
–ও যেহেতু পড়াশোনায় ভালো, ক্লাস ওয়ান থেকে সেভেন পর্যন্ত পড়াতে পারবে। আজ দুইটা ছাত্রীর মা মেসেজ দিয়েছিল। তারা নাকি তাদের মেয়েদেরকে পড়াতে চায়। এটা শুনে মাইরা বেশ খুশি হয়েছে। কারণ আর কতদিন ভরসায় থাকবে?
— এই বাড়ির ভাত আজ আছে, কাল নাও থাকতে পারে। এখন থেকেই নিজের ব্যবস্থা করতে হবে। হয়তো প্রথমে কষ্ট হবে, আস্তে আস্তে সব কিছু সয়ে যাবে। ভেবেই মাইরা মুচকি হাসলো। ডাইরিতে ছাত্রীর নাম আর ফোন নাম্বার লিখে রাখলো। তারপরে ডায়েরিটা আগের জায়গায় রেখে ফোনটা নিয়ে বিছানায় শুয়ে পড়ল।
–ফোন বালিশের পাশে রেখে চোখ বুজলো। কিন্তু আজ চোখে ঘুম ধরা দিচ্ছে না কিছুতেই। একটুও ভালো লাগছে না কিছু। তাই ফোনটা আবার হাতে তুলে নিল। ফোনের লক খুলে ফেসবুকে ঢুকলো। ফেসবুক স্ক্রল করতে করতে হঠাৎ একটি আইডি চোখে পড়ল। প্রোফাইলটা দেখেই বুকের মধ্যে ধুক করে উঠলো। শেহরানের আইডি। আইডিতে ক্লিক করল। ৯ ঘণ্টা আগে একটি পোস্ট করা হয়েছে। একটি কালো গাড়ির সামনে শেহরান দাঁড়িয়ে আছে। ক্যাপশনে লেখা মনে রাখবো”।
ক্যাপশনটা চোখে পড়তেই মাইরার হাত-পা শিরশির করতে লাগলো। আর ফোন দেখা যাবে না। সাথে সাথে ফোন অফ করে বালিশের নিচে ঢুকিয়ে রাখলো। তারপরে ওড়না মুখের উপর দিয়ে চোখ বুজলো।
সকাল আটটা। প্রত্যেকদিনের মতো মাইরা সকাল সকালেই উঠেছে। সকালে উঠেই রান্না করে। সমস্ত কাজ সেরে রুমে গিয়ে ফ্রেশ হয়ে আসলো। ডাইনিং টেবিলে সবাই খাবার খাচ্ছে। মাইরাও খাচ্ছে।
শাহানা বেগম আড়চোখে একবার মাইরার দিকে তাকালেন। মেয়েটা কেমন শুকিয়ে গেছে। ভাবতেই মনটা খারাপ হয়ে গেল। আবার কিছুক্ষণ পরেই মনটা বিষিয়ে উঠলো। যখনই মনে হলো তার ছেলে বাড়ি ছেড়ে চলে গেছে।
–সায়রা খেতে খেতে উঠে দাঁড়ালো। আমার হয়ে গেছে, আমি গেলাম। বলেই চলে গেল। রায়হান মির্জা একবার মেয়ের দিকে চাইলেন। কিন্তু কিছু বললেন না।
-;মাইরার হাতের মধ্যে চিনচিন ব্যথা করছে। তাও কোনোরকম কষ্ট করে অল্প একটু খেয়ে উঠে দাঁড়ালো। চলে যেতে নিলেই রায়হান মির্জা পিছু ডাকলেন খাওয়া শেষ তোমার?
— মাইরা পেছনে ফিরে শ্বশুরের দিকে তাকিয়ে বলল, “জি!
— কলেজে যাবে না?
— জি আব্বু, যাব। কিছু বলবেন?
— না।
রায়হান মির্জা আর কোনো প্রশ্ন করলেন না। তাই মাইরা চলে গেল।
রায়হান মির্জা মাইরার যাওয়ার দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। তারপরে স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে বললেন, তোমার একটা জিনিস আমায় খুব হতাশ করেছে শাহানা!
–শাহানা বেগম চমকে স্বামীর দিকে চাইলেন। আমি আবার কী করলাম?
— কী করোনি তুমি?
— শাহানা বেগম গলায় একটু ঝাঁঝ নিয়ে বললেন, যা বলবা সোজাসুজি বলো, না হলে বলার দরকার নাই।
— রায়হান মির্জা রাগি চোখে স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে বললেন, মেয়েটাকে ছেলের বউ করে তুমি নিয়ে এসেছো। তুমি জানতে মেয়ের বয়স কম। যার জন্য তোমার ছেলেকে পদত্যাগ করতে হয়েছে। আর তোমার ছেলে বাড়ি ছাড়লো। কিন্তু তুমি কী করছো? তুমি ওই অসহায় মেয়েটার দিকে রাগ দেখাচ্ছো যার কোনো দোষই নাই কেনো?
— তীক্ষ্ণ চোখে শাহানা বেগম বললেন, কী করেছি আমি? আমি তো কিছু করিনি! তুমি একদম আমাকে দোষ দেবে না।
–রায়হান মির্জা ক্ষিপ্ত কণ্ঠে বললেন, তুমি কিছু করোনি? একবারও ভেবে দেখেছো! মেয়েটা এতোটুকু বয়সে কী কী সহ্য করছে? মাইরা এতোটুকু বয়সে জিনিসগুলো সাফার করছে!
–এবার শাহানা বেগম মাথাটা নিচু করে ফেললেন। সত্যিই তো, উনি তো এটা কখনো ভেবে দেখেননি। তারপরে মিনমিনে কণ্ঠে বললেন, আমি না হয় এরকম করেছি। তো তুমি কী করো? তুমিও তো সেই একিই!
এমপি শেহরান মির্জা পর্ব ২২
–শাহানা, তুমি বোধহয় ভুলে যাচ্ছ। শেহরানের যাওয়ার পরে আমার কত ক্ষতি হয়েছে। আমি বাইরে বাইরে না ছুটলে পথে বসতে হতো। মনে রাখবে একটা কথা। রাগে গজরাতে গজরাতে রায়হান মির্জা টেবিল ছেড়ে উঠে চলে গেলেন।
–শাহানা বেগম একা খাবার টেবিলে বসে রইলেন। গভীর ভাবনায় পড়ে গেলেন। সত্যিই কি তিনি বেশি করে ফেলেছেন? মেয়েটার সাথে কি উনি অন্যায় করেছেন?
