Home শিউলি ফুল শিউলি ফুল পর্ব ৯

শিউলি ফুল পর্ব ৯

শিউলি ফুল পর্ব ৯
তাজরীন ফাতিহা

“পোটলা-পাটলি গোছা, কাইল বাড়িত যাইতে হইব।”
সেকান্দার পায়ের উপর পা তুলে শুয়ে শুয়ে হালিমাকে নির্দেশ দিল। হালিমা লিপস্টিক দিচ্ছিল ঠোঁটে। স্বামী এলেই সে সাজুগুজু করতে বসে যায়। এ নিয়ে তার শাশুড়ি তাকে কম কথা শোনায় না। তার কথা হলো ঘরে এত সেজে থাকতে হবে কেন? আর হালিমার কথা হলো, স্বামীর জন্য সাজবে না তো কার জন্য সাজবে? ছোটবেলা থেকে তার সাজার বেশ শখ ছিল। মা কিংবা ভাইজান কখনোই তাকে বোরকা ছাড়া সেজেগুজে কোথাও বের হতে দেয়নি। সবসময় ভাইজান শিক্ষা দিয়েছেন, মেয়েদের একমাত্র সাজ কেবল এবং কেবলমাত্র স্বামীর জন্য। তার ব্যক্তিগত পুরুষের জন্য। আর কারো জন্য এই সাজ নয়। স্বামী ব্যতীত অন্য কারো জন্য সাজা হারাম। হালিমাও সেজন্য সবসময় প্রতীক্ষায় থেকেছে তার সাজগোজ শুধুমাত্র তার ব্যক্তিগত পুরুষের জন্য হবে। তার জন্য প্রতিদিন নতুন নতুন উপায়ে সাজবে। তাই বিয়ের পর থেকেই সে সেকান্দারের সামনে খুব পরিপাটি এবং সেজেগুজে থাকে। অথচ এই লোক জীবনেও তার সাজাগোজের প্রশংসা করেনা উল্টো মা, বোনের কেচ্ছা নয়তো পেত্নি, হ্যান ত্যান বলেনা রাগ উঠিয়ে দেয়।

হালিমা চোখে কাজল দিয়ে হাতের আয়নাটা রাখল ট্রাংকে ভরে। এটার ভেতর তার সাজগোজের জিনিসে ঠাসা। লিপস্টিক, কাজল, চুলের রেশমি ফিতা, কাচের চুড়ি, নুপুর, নাকের নথ, টিকলি, কানের দুল, গলার হার, ঝুমকো বিছা, আয়না, পাউডার সব আছে এতে। বিয়ের আগে ঘরে সেজে বসে থাকত সে। মা, ভাইজান আর আপাদের দেখাতো ঘুরে ঘুরে। বারকয়েক নিজেকে দেখেটেখে আবার সাজ উঠিয়ে ফেলত। এখনো বাবার বাড়িতে এলেই এটা নিয়ে বসে। শ্বশুরবাড়িতেও এমন একটা আছে। সেকান্দারের সঙ্গে ঝগড়া করে গঞ্জের মেলা থেকে সাজগোজের সব সরঞ্জাম কিনেছিল সে। লোকটা তার বেলায় হাড়কিপ্টে হয়ে যায়। একটা টাকা বের করতে সেকান্দারকে সেবার কত তোষামোদ করতে হয়েছিল হালিমার!

সবকিছু গুছিয়ে ধীর পায়ে পালঙ্কের ধারে এগিয়ে এল হালিমা। সোবহান ঘুমে কাদা। সেকান্দার তাকে একবার দেখে সাংসারিক আলাপ জুড়ে দিয়েছে। মা, বোন এমন করবেই। মানিয়ে, গুছিয়ে চলতে হবে আরও নানা কথা। সাথে আরও বলে চলল এভাবে ঝগড়া করে বাড়ি থেকে চলে আসা হালিমার একদমই অনুচিত হয়েছে। ফের যেন এই ভুল না হয়, নয়তো হালিমাকে একদম রেখে যাবে বাপের বাড়ি। হালিমার এপর্যায়ে ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে গেল।
“কিচ্ছু গুছাইতাম না।” ত্যাড়া গলা।
“ক্যান?”
“ক্যান আবার, যামু না আপনের বাড়িত হেইলিগা।”
“হালিমা তুই আমারে রাগাইতে চাইতাছস? এত কাম ফালাইয়া তোর তামশা দেহার লাইগা আইছি?” সেকান্দারের গম্ভীর কণ্ঠ।
“না আইলে আবার যানগা। মানা করছে কেডা?”

“তোর চোপা বহুত চলতাছে, একদম টিপ দিয়া ধইরা চোপা বন্ধ করমু কইলাম।” আগ্রাসী গলায়।
হালিমা টলমলে আঁখিতে সেকান্দারের দিকে চাইল। লোকটা তাকে মারার হুমকি দিল? অবশ্য এ আর নতুন কী? তাকে তো একবার ঘাড় ধরে শাসন করেছিল, পিঠে কিল দিয়েছিল। সোবহানকে মেরেছিল বলে। চোখের অশ্রু গড়াতে দিল না। চুপচাপ শুয়ে পড়ল। সেকান্দার অবাক হলো। হালিমার চোখ দুটো ভাসা ভাসা। দেখতে ভালো লাগে। সোবহানের চোখ দুটোও ওর মায়ের মতো। সেকান্দার স্বীকার করেনা তবে হালিমার চোখদুটো তার দুর্বলতা। আবার কাজলও পড়েছে। বউকে পেছন থেকে আঁকড়ে ধরল। হালিমা নির্জীবের মতো শক্ত হয়ে রইল। সেকান্দার কোমল গলায় বলল,
“তোর বেরানি এহনও হয়নাই? বাপের বাড়ি কয়দিন থাকবি?”
“যে কয়দিন মন চায়।”
“ভাইজানের হাতে টান এহন। পরে আবার আহিস।”

“আপনেরে অত ভাবতে কয় নাই কেউ। ভাইজান একটা পেডের খাওন যোগাইতে পারব।”
“আমারে নাইলে না রাখলি, সোবহানরেও রাখবি না?” বিস্মিত কণ্ঠ।
“না, পেডে শত্রু লইছি। বাপরে এহনই মায়ের নামে নালিশ করা শিখছে।”
“তুই আমার পোলারে এমন অমানুষের মতো মারলে ওয় নালিশ করব না? ওইটুক বাচ্ছারে তুই ক্যামনে মারোস? কত নরম ওরা জানোস? ভুল করলে শুধরায় দিবি তা না খালি চটাং চটাং হাত চলে তোর। পাইয়া দাম দেস না, না? পোলাহান কী জিনিস তোর ভাবিরে জিগাইস। হেয় জানে বাচ্ছা আল্লাহর কত বড় নেয়ামত।” গুরুগম্ভীর কণ্ঠ।
“হ, আমারে আল্লাহর বাচ্ছা দেয়াই উচিত হয় নাই।” অভিমানী কণ্ঠ।
“বাড়িত ল, মাইনষের বাড়ি বেশিদিন থাকন ঠিক না। আমার ঘর খালি কইরা তুই পরের ঘরে বাতি জ্বালাস?”
“যামু না। আপনেরা বেডারা খুব খারাপ। খালি বউয়ের দোষ দেহেন। ক্যান যে ছ্যাত ছ্যাত করি, হেইডা দেহেন না। হারাদিন কত অশান্তি যায় একটা সংসারে বোঝেন আপনেরা? আপনের পোলা তো আমি পালতে পারিনা এহন দেইখা শুইনা পোলার লাইগা ভালা মা লইয়া আহেন।”
সেকান্দার বউকে কৌতুক কণ্ঠে শুধাল,

“মা নাহয় আনলাম, বউও কী আনুম?”
হালিমা ঘাড় ঘুরিয়ে সেকান্দারের দিকে অত্যাধিক ঠাণ্ডা দৃষ্টি দিল। সেকান্দার তা দেখে ঢোক গিলল। হালিমার চাহনি দেখে মনে হচ্ছে এখনই তাকে গিলে ফেলবে।
“আমারে ছাড়েন।” হালিমার শীতল গলা।
“বউ ছাড়া থাকন যায়? আমার মেলা কষ্ট হয় হালিমা। এমন জিদ দেহাইস না, বাড়ি ল।” ঝাপটে ধরে হাতের বাঁধন আরও শক্ত করল।
“আপনের কিয়ের কষ্ট হয়? আমি না থাকলেই তো আপনেগো ভালা। ঘরে আর ঝগড়া হয়না। সোজা রাস্তা মাপতে কইছেন, মাপছি। অহন এসব রঙ ডঙ্গের কতা কইবেন না।”
“তয় কিয়ের কতা কমু? সোহাগের?”
“জানি না, কোনো কতাই আপনে কইবেন না। ফুলস্টপ মাইরা থাহেন।”
“চুপ কইরা থাকন যায়?”
হালিমা জবাব দিল না। স্বামীর দিকে ফিরলও না। তার দুঃখ কেউ বোঝেনা। স্বামীর জন্য সাজলেও স্বামী ফিরে দেখেনা, সংসারে ঝামেলা লেগেই থাকে। এসব হালিমার ভালো লাগেনা। সবকিছু ছেড়ে ছুঁড়ে যেদিকে দুচোখ যায় চলে যাওয়া যেতো! পেছন থেকে চাপ বাড়ল। হালিমা সেই শক্তপোক্ত হাতের বাঁধনে পিষ্ট হলো।

“ধুরু, এমুন শক্ত কইরা ধরছেন কিল্লিগা? বেদনা পাই।” মোচড়ামুচড়ি করে।
“আস্তেই তো ধরলাম। শক্ত কই?”
“গণ্ডারের লাহান হাত দুইডা, এইডা বলে আস্তে?”
“ভাত ঠিক কইরা খাবি না, আমি ধরলেই এহন গণ্ডার? গতর হইব এক্কেরে শক্তপোক্ত। আর ওরে ধরলে লদাইয়া যায়। ছ্যানছ্যানানী একটা। ছ্যান ছ্যান ছাড়া আর পারস কী? যা ধরলাম না তোরে। কথা কইলেও দোষ, সোহাগ করলেও দোষ।” হালিমাকে ঝাড়া মেরে সরিয়ে পুত্রের দিকে মুখ করে শুলো।
হালিমা আঁতকে উঠে স্বামীকে পেছন থেকে ঝাপটে ধরে পিঠে মুখ ঘষতে লাগল। পিঠে আঁকিবুকি করতে লাগল। সেকান্দারের সাড়াশব্দ না পেয়ে আরও শক্ত করে ধরল।
“রাগ কইরেন না। এদিকে ফিরেন। দেহেন সাজছি আপনের লাইগা।”
“যা সর।” আবারও হালিমাকে সরিয়ে দিয়ে।
“একটু ফিরেন। এমুন করে ক্যা এই বেডাডা?” অধৈর্য কণ্ঠ।
“দেহার মুড নাই, ঘুমায় পড়ছি।” সেকান্দার চোখ বুজে নাক টানার শব্দ করল।
“দেখবেন না?”
“উহু।”

“আমিও যামু না আপনের লগে। আমারে কয় ছ্যানছ্যানানী, আপনে কী? ছ্যানছ্যানা বেডা। আমার আশেপাশে আপনে যদি আর কুনুদিন আইছেন, আইজাকার কতা মনে থাহে যেন।” জিদ্দি গলা।
হালিমা উঠে ফোঁস ফোঁস করতে করতে হাতের চুড়ি, দুল সব খুলতে লাগল। সেকান্দারের কোনো সাড়াশব্দ পাওয়া গেল না। লিপস্টিক, পাউডার সব মুছে যেই কাজল মুছতে গেল অমনি বাধা পেল। কর্ণকুহরে কিছু শব্দরা এসে আন্দোলিত হলো।
“সব মুছছস ভালা কতা, কাজলে হাত দিবি না। লিবিস্টিক একটা ফাউল জিনিস, খালি মুহে লাগে। অহন কাছে আয়।”

রাতে ঝিঁঝিঁ পোকা ডাকছে। আশপাশ নিস্তব্ধ, কোলাহলমুক্ত। শিউলি, হামিদা ঘুমাচ্ছে। হামিদ ঘুমাতে পারছে না। ছটফট করছে কিস্তির চিন্তায়। পরশু কিস্তির লোক আসবে। হামিদের কাছে এক টাকাও নেই। লোকগুলোকে সময়মতো টাকা না দিলে ভীষণ খারাপ ব্যবহার করে। ঘরে বোন, বোন জামাই আছে। ওদের সামনে বেইজ্জত হতে বেশ খারাপ লাগবে। আবার সে বাড়িতে না থাকলে কিস্তির লোকদের মা, বউয়ের সঙ্গে খারাপ ব্যবহার মানতে পারেনা হামিদ। শিউলি সেদিন বলছিল, হামিদকে অপমান অপদস্ত করে কথা বলা নাকি তার ভালো লাগেনা। যা তা বলে। আশপাশের মানুষ উঁকি দিয়ে দেখে, পিছে পিছে মজা নেয়, নানা কথা বলে। কিন্তু কী করার, সময় মতো টাকা না দিলে তো এসব শুনতে হবেই।

এদিকে ঘরে বাজার নেই। হামিদের এখন মাথা কাজ করেনা। কোথায় গেলে সব চিন্তা মুক্ত হওয়া যায়? কারো কথা এখন ভালো লাগেনা। মেয়েটাকে ডাক্তার দেখানো লাগবে। পা’টা যদি ঠিক করা যায়। কিন্তু টাকা? টাকা কোথায় পাবে সে? ছটফট করতে করতে উঠে বসল বিছানায়। মেয়ে, মেয়ের মা দুজনই কি নিশ্চিন্তে ঘুমাচ্ছে! সে কেন ঘুমাতে পারেনা? পুরুষদের নাকি খালি সুখ আর সুখ। তাহলে হামিদের নেই কেন? শিউলি যেন কি বলছিল? হামিদ তাকে পছন্দ করেনা, ভালো পায়না? আচ্ছা, মাথায় এক গাদা চিন্তা, টাকার ভাবনা নিয়ে কারো মুখ দিয়ে এসব কথা বের হয় হওয়া সম্ভব? এত এত চিন্তা নিয়ে হামিদের বউ, বাচ্চার প্রতি ঠিকমতো খেয়াল করার সময়ই হয়ে ওঠেনা। মুখে দুটো মিষ্টি কথা কী বলবে সে? কোথায় যেন শুনেছিল,
“অভাব যখন আসে, ভালোবাসা তখন জানালা দিয়ে পালায়।”

সেখানে হামিদের জীবনে তো অভাব কখনো আসেনা। অভাব তার নিত্যদিনের সঙ্গী হয়ে ছায়ার মতো অনুসরণ করে। মেয়েটাকে দেখলে বুকটা পুড়ে যায়। কাকে বলবে নিজের দুঃখের কথা? মেয়েটা তো তার নিজেরও। শিউলির একার চিন্তা হয়না, তারও হয়। বাবা সে, জন্মদাতা। মা নয়-দশমাস গর্ভে রাখে আর বাবা ছায়ার মতো আগলে রাখে সকল প্রতিকূলতা থেকে। রক্ত পানি করে স্ত্রী, সন্তান ও পরিবারের মানুষদের মুখে অন্ন তুলে দেয়। বস্ত্রের যোগান দেয়। তবুও এই পৃথিবীতে পুরুষদের দোষের পাল্লাটা কেন বেশি হয়? সবাই নারীর কষ্ট বোঝে, তাদের নিয়ে শয়ে শয়ে উপন্যাস কবিতার বই লেখে। পুরুষের কষ্ট নিয়ে কাউকে লিখতে দেখা যায়না কেন? পুরুষ বলেই কি এত বৈষম্য? নাকি নারীরা এই পৃথিবীতে খারাপ হয়না? তবে যে তার চর্মচক্ষু ভিন্ন কথা বলছে! যুগে যুগে শাশুড়ি, বউয়ের এই ক্যাচালে তো পুরুষরা দায়ী নয় তবুও কেন সব দোষের ভাগীদার পুরুষ হয়? পুরুষরা খারাপ বলে চারদিক সয়লাব হয়ে যায়?
মাস্টার কাকা সেদিন বলছিলেন, এই দুনিয়া নারী, পুরুষ কাউকে ছাড়া চলা অসম্ভব। স্রষ্টা উভয়কে তার নিজস্বতা দিয়েই সৃষ্টি করেছেন। স্রষ্টার সৃষ্টি হিসেবে প্রত্যেকটা মানুষকে সম্মান করা তাদের কর্তব্য।

হামিদ উঠে ওযু করল। নামাজ পড়া হয়না বহুদিন। আজ আবারও রবের দরবারে হাজির হয়েছে তার এক নাফরমান গোলাম। আল্লাহ নিশ্চয়ই হাসছেন? নিশ্চয়ই বলছেন,
“বিপদের সময় ঠিকই মনে পড়ে রবের কথা? অথচ বিপদ হটিয়ে দিলে আমি আল্লাহকে তোমরা এমনভাবে ভুলে যাও যেন কোনোদিন ডাকোইনি।”
নামাজ শেষে আল্লাহর কাছে তার কষ্টের কথা ব্যক্ত করল হামিদ। পুত্র হিসেবে মায়ের সুস্থতা কামনা করল, পিতা হিসেবে মেয়ের সুস্থ জীবন। কিন্তু স্বামী হিসেবে কী চাইবে হামিদ নিজেও জানে না। শুধু শিউলি ভালো থাকুক আর তার মা এবং স্ত্রীর দ্বন্দ্ব কেটে যাক এইটুকুই চাইল। জায়নামাজ গুছিয়ে টুপি খুলে বেড়ার আংটায় ঝুলিয়ে রাখল। ঘুমন্ত মেয়ের পুরো শরীরে ফুঁ দিয়ে মাসেহ করে দিল। বাবার পরশে হামিদা নড়ে উঠল। সবকিছু নড়লেও বাম পা’টা নড়ল না। সেই পায়ের দিকে চাইতেই হামিদের চোখ দুটো ভিজে উঠল। গ্রামের অনেকেই টিটকারী করে বলে, হামিদের ল্যাংড়া মেয়ে হয়েছে। নিজের জন্য কষ্ট হয়না। হয় মেয়েটার জন্য। বড় হতে হতে এই সমাজের এসব বিষাক্ত কথার বাণে তার মেয়েটা বিদ্ধ হবে, দগ্ধ হবে, বারবার ভেঙে যাবে। হামিদ সেসব কীভাবে সইবে? তার মেয়েকে নিয়ে একটা বাজে কথাও তো সে সহ্য করতে পারবে না। আল্লাহ তাকে কোমল পরিস্ফুটিত একটি ফুল উপহার দিয়েছেন ঠিকই কিন্তু সেই ফুল কোনোদিন দুই পায়ে ভর দিয়ে স্বাভাবিকভাবে হাঁটতে পারবে না এটা সে জন্মদাতা হয়ে মেনে নেবে কী করে?

“ঘুমান নাই?” শিউলির ঘুম ঘুম কণ্ঠ।
হামিদ মাথা নুইয়ে চুপচাপ বসে ছিল। শিউলির কণ্ঠে মুখ উঠিয়ে চাইল। শিউলি উঠে বসল। মেয়েকে দেখে স্বামীর পানে জিজ্ঞাসু দৃষ্টি দিল। হামিদ কেমন করে যেন বলল,
“শিউলি, চল ওরে ডাক্তার দেহাই।” মেয়ের দিকে ইশারা করে।
শিউলি বুঝল না। ঘুমের ঘোর কাটেনি এখনো তার।
“ক্যান?”
“ডাক্তাররা ওর পাওডা যদি ঠিক কইরা দিতে পারে!”
কণ্ঠে লুকায়িত কষ্ট ও আফসোস। শিউলি অবাক হলো। হামিদকে মেয়েকে নিয়ে ভাবতে দেখে ভালো লাগছে তার। লোকটা উপরে উপরে শক্ত আদতে দিলটা প্রচণ্ড নরম। শিউলি বোঝে। স্বামীকে ভরসা দিয়ে বলে,

“তা নাহয় যাইবেন। আপনের হাতে টেকা আছে?”
টাকার কথা শুনে হামিদ স্ত্রীর পানে করুণ চোখে চাইল। হাঁটুতে এক হাত রেখে মাটির দেয়ালে ভর দিয়ে রাখল শরীরটা। শিউলি স্বামীর পাশে এসে বসল। মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে শুধাল,
“মাইয়ার লাইগা এত রাইতে এই চিন্তা করতাছেন? ওরে তো একটু কোলেও নেননা।”
লম্বা শ্বাস ফেলে হামিদ ঊর্ধ্বমুখে চাইল।
“ওরে এমন দেখতে ভাল্লাগে না।”
শিউলির বুকে কামড় দিল। মেয়েকে এমন দেখতে তারও যে ভাল্লাগে না। কোনরকম থেমে থেমে বলল,
“ওয় আপনের মতন হইব মনে হয়।”
হামিদ তৎক্ষণাৎ ঘাড় ঘুরিয়ে শুধাল,
“কেমনে বুঝলি?”

“চোখ, কান, ঠোঁট সব আপনের পাইছে। হাসেও আপনের মতো কইরা।”
“এত কিছু খেয়াল করছস? আমি তো করলাম না।”
“আপনে তো মাইয়ার দিকে তাকানই না, খেয়াল করবেন ক্যামনে?”
হামিদ মেয়ের দিকে না তাকালে কে তাকায়? সে মেয়ের দিকে কতবার তাকায় তা শিউলিকে কোনোদিন বুঝতে দেবে না। এদিকে শিউলির বেশ ভালো লাগছে হামিদকে এত কথা বলতে দেখে। হামিদা জন্মের পরে এই প্রথম হামিদ এত কথা বলছে তার সাথে। প্রায় দুই-তিন মাস পর। কি যে শান্তি লাগছে তার!

শিউলি ফুল পর্ব ৮

“তাইলে তো মাইয়া বেশি সুন্দর হইব না। তোর মতোন হইলে সুন্দর হইতো।”
“আমি বুঝি সুন্দর? আমি তো কালা।” লাজুক কণ্ঠ।
“তুই কালা হইলে আমি কয়লা।”
“ইশ, মিত্যা কতা। আপনে তো সুন্দর মানুষ।” শিউলি ঘাড় ঘুরিয়ে বলল।
“হাছা কইছি। কালার জামাই কয়লা। মিলছে ভালা।”

শিউলি ফুল পর্ব ১০