শিউলি ফুল পর্ব ১০
তাজরীন ফাতিহা
হামিদকে চিন্তামুক্ত করে পরদিন সকালেই সেকান্দার আর হালিমা বাড়ির পথে রওনা হলো। রাতে সেকান্দার কি করেছে কে জানে হালিমার চেহারা দেখে অনুমেয় যে, হালিমা পটে গেছে। গোসল টোছল সেরে গাট্টি বোঁচকা গুছিয়ে ভোরেই তৈরি সে, সেকান্দার আর তাদের একমাত্র ছেলে। শিউলির কাছ থেকে বিদায় নিয়ে উঠোন পেরিয়ে বাড়ির সামনের মেঠোপথে এসে থামল হালিমা। সামনে ভ্যানগাড়ি দাড় করানো। হামিদ এগিয়ে দেবে ঘাট পর্যন্ত। বাকি পথ নদীপথেই ভ্রমণ তাদের। হেলেনা পারভীন মেয়ে চলে যাচ্ছে দেখে বিমর্ষ চিত্তে দাঁড়িয়ে আছেন। কয়েক পোটলা এরই মধ্যে গুছিয়ে হালিমার সঙ্গে দিয়ে দিয়েছেন। এই পোটলার রহস্য নিশ্চয়ই বলে দিতে হবেনা। বাঙালি মায়েদের চিরায়ত স্বভাব বাপের বাড়ি এলে সঙ্গে ফিরতি কিছু না কিছু দিতেই হবে। এ যেন বাঙালি ঐতিহ্য, আভিজাত্য। সোবহানকে কোলে নিয়ে হেলেনা পারভীন কিছুক্ষণ কাঁদলেন। নাতিকে বেশিদিন কাছে পেলেন না। মেয়েটা চারদিনও থাকলো না। হালিমার বাচ্চাটা আদর আদর কথা বলে তাকে মায়ায় ফেলে দিয়েছে।
হালিমা ভ্যান গাড়িতে বসার আগে মাকে ঝাপটে ধরে অনেকক্ষণ কাঁদল। তার বহু মায়ার জায়গা ছেড়ে সে আজ বিদায় নিচ্ছে। শৈশবের সমস্ত স্মৃতি ফেলে তাকে আবারও যেতে হবে তিনবছরের সেই স্বল্পপরিচিত জায়গায়। অবশ্য সেটাকে কয়েদখানা বললেই ভালো হয়। সেখানে নেই কোনো উচ্ছলতা, খুশি, নিভৃত যাপন। আছে একঝাঁক ঝগড়া, নাখুশি, আনন্দের দাফন। উঠোনের সেই পুরোনো আমগাছ, কাঁঠাল গাছ, চালতা গাছ এখনো আগের মতোই সগর্বে দাঁড়িয়ে আছে কিন্তু সেই কেবল স্থানান্তরিত হচ্ছে। ঐ বাড়িতে মা ঠিকই আছে তবে তার গর্ভধারিণী নেই। বেছে বেছে ভালোটা খাওয়ানোর কেউ নেই। মায়ের মতো আগলে রাখার কেউ নেই। সেখানে তার স্বামী সেকান্দারের মা আছে। হালিমা সেখানে দূরছাই করা ঘরের বউ মাত্র। মায়েরা কেবল নিজের সন্তানের বেলাতেই এমন মমতাময়ী হয় কেন? পরের সন্তানের জন্য যদি অল্প একটু মমতাময়ী হতো তাতে কী ক্ষতি হতো?
“আম্মা, ভাবির লগে কাইজ্জা কইরো না। তোমারে ছাইড়া যাইতে আমার যেমন কইলজা পুড়তাছে ভাবিরও অমন পুড়ে। হের তো মাই নাই। তুমি নাহয় এট্টু মা হইলা ক্ষতি তো নাই কুনো। তোমার মাইয়ারা কাছে নাই, ভাবিরে নিজের মাইয়া ভাইবা এট্টু আদর, সোহাগ কইরো। সোবহানরে যেমন আদর করতা হামিদারেও কইরো। বেশি করতে না পারলে এট্টুই নাহয় কইরো। মনে রাইখো হাউরি আমারও আছে। ভাবির লগে যা করবা হেডি ফিরতি তোমার মাইয়ার উপ্রেও আইবো।”
হেলেনা পারভীন কান্নারত মেয়েকে ঝাপটে ধরে কেঁদেই চলেছেন। হামিদ এসে যাওয়ার জন্য তাগাদা দিল। পরে নৌকা পাওয়া যাবেনা। হালিমা মাকে ছেড়ে বড় ভাইকে আঁকড়ে ধরল।
“ভাইজান..”
হামিদ কেঁপে উঠল। চোখে পানি এলেও তা আড়াল করল। তার আদরের হালিমা। একদম ছোট থাকতে তিন বোনকে কোলেপিঠে করে মানুষ করেছে হামিদ। বোনদের দুঃখ তার সহ্য হয়না। ভাইজান ডাকের মধ্যে কি যে আছে হামিদ জানে না, সারাদিন শুনতে মন চায়। তিন বোনের আবদারের জায়গাই তো ছিল এই ভাইজান। বড় দুটোর থেকে এই হালিমা হামিদের কাছে একটু বেশিই আদরের। ছোট্ট হালিমা তার পিছে পিছে ঘুরতো আর আবদার করতো। ভাইজান এটা আনবেন, ওটা আনবেন। হামিদের এখনো কানে বাজে ছোট্ট হালিমার সেই আবদার,
“ভাইদান আমাল দন্য লিস্তিক আইনু। চুলি (চুড়ি) আইনু।”
হালিমা লিপস্টিক উচ্চারণ করতে পারত না। সাজগোজ ছিল তার অন্যতম শখ। তাই হাতের কাছে যাই পেতো সেসব দিয়ে সাজতে বসে যেতো। মায়ের ওড়না দিয়ে শাড়ি পরে পুরো মুখে লিপস্টিক ভরিয়ে এনে তার সামনে দাঁড়িয়ে বলতো,
“ভাইদান, সালি পিনছি। লিস্তিক দিছি। কেমুন?”
হামিদের তখন বোনকে কোলে তুলে প্রশংসায় ভাসিয়ে ফেলতে হতো নয়তো ভুলক্রমেও যদি কেউ সুন্দর না বলতো মাটিতে আছড়ে পাঁচড়ে কাঁদতে বসে যেতো। সেই কান্না সারাদিনেও কমতো না। সেই ছোট্ট হালিমা এখন কত বড় হয়ে গেছে। ছোট্ট হালিমার মতো তার নিজেরও একটা ছানা হয়েছে। সেই ছানার জননী এখন সে। হালিমা ভাইয়ের বুকে মুখ লুকিয়ে ফোঁপাতে ফোঁপাতে বলল,
“ভাইজান আমারে দেখতে যাইবা। বিয়া দিয়া পর কইরা দিছো? তুমি খোঁজ না নিলে আমার খোঁজ নেয়ার আর আছে কে?”
হামিদ বোনের মাথায় হাত বুলিয়ে দিল,
“আইচ্ছা, যামু। আর কান্দিস না। কাইন্দা তো বুক ভাসায় ফালাইতাছস।”
“আমার ভাইজানের বুক, আমি ভাসামু। তুমি মানা করনের কে?”
“আইচ্ছা, হইছে তো। আবার আহিস। সেকান্দার ওরে লইয়া ঘুরতে আইয়ো। ওর আমগো ছাড়া মুন টিকে না। তুমিও ঘুইরা যাইয়ো।” শেষ কথা সেকান্দারকে উদ্দেশ্য করে বলল।
“জি ভাইজান, আমু। আর কাইন্দো না। এবার লও। দেরি হইলে সম্পান পামু না।”
হালিমা সেকান্দারের কথা শুনে সকলের অগোচরে মুখ মুচড়াল। তুমি? মাগোমা বেডা মানুষ যে নাটক জানে! তার মা, ভাইয়ের সামনে কত সোহাগ করে কথা বলে এই লোক? এমনিতে তুই তুকারি ছাড়া মুখ দিয়ে কথাই বের হয়না। এখন সাধু পুরুষের উৎকৃষ্ট উদাহরণ বলা চলে। প্রত্যেক মেয়ের বাবা, মায়ের স্বপ্নের জামাই। ঘোড়ার ডিম। মনে মনে বলে আবারও মুখ মুচড়াল। সোবহান বাবার কোলে বসে বসে কান্না করছে। মা কাঁদলে সেও কাঁদে। তাছাড়া মামা, মামী, নানির কাছ থেকে চলে যাচ্ছে ভেবে ছোট্ট মনে বিরাট আফসোসের দেখা দিয়েছে। এখন তার মা তাকে লাল বানালে কে বাঁচাবে তাকে? সেই দুঃখে ছোট্ট সোবহান কাঁদতে কাঁদতে আরও মুষড়ে পড়েছে।
“ও ভাইজান, আম্মা আর ভাবির খেয়াল রাইখো। নিজের যত্ন নিও। এমন শুকাই গেছ ক্যান? আমার ভাইজান তো এমন শুকনা আছিল না। নিজের খেয়াল রাহো না কয়দিন হইছে? ভাবিরে কইছি, তোমার খেয়াল রাহার লাইগা। তোমার বলে রাইত হইলে শরীর বিষ করে? ভাবিরে সইরষার তেল গরম কইরা মালিশ কইরা দিতে কইছি। হারাদিন এমন খাটো তাও ঠিক কইরা খাওন খাওনা। তুমি অসুস্থ হইয়া পড়লে আম্মা, ভাবি, হামিদার কী হইব ভাবছ একবার? হেগো লাইগা তোমার সুস্থ থাকন লাগব। মনে রাইখো তুমি বটবৃক্ষ, হেগো ছায়া। তুমি নাই মানে হেগো ছায়াও নাই। মা, বউয়ের লগে মিলমিশ কইরা থাইকো। একজনের লগে ন্যায় করতে যাইয়া আরেকজনের লগে অন্যায় কইরো না। তুমি আমার ভাইজান। আমার চাইয়া মেলা ভালা বুঝো।”
বলেই ফোঁপাতে ফোঁপাতে থামল। ভাইজানের রোদে পোড়া মুখটা হাতিয়ে দিল বড় মায়া করে। হামিদের চোখের পানি আটকে রাখতে বড্ড কষ্ট হলো। তার সেই ছোট্ট হালিমা কত বুঝদার হয়ে গেছে। ভাইজানকে জ্ঞান দিতে জানে। কোথায় যেন শুনেছি, মেয়েরা পরের ঘরে গেলে রাতারাতি বড় হয়ে যায়। কথাটা আসলেই সত্য। শিউলি কিংবা হালিমা সবার বেলাতেই সে এটা দেখেছে।
হামিদ বোনকে নৌকায় উঠিয়ে দিয়ে অনেকক্ষণ পাড়ে দাঁড়িয়ে রইল। হালিমা যতক্ষণ হামিদকে দেখা যায় কাঁদতে কাঁদতে ভাইজানকে দেখে গেল। ভাইজানের ছায়া চোখের আড়াল হতেই আবারও ফুঁপিয়ে উঠল হালিমা। সেকান্দার ছেলেকে নিয়ে চিড়া মুড়ি আর গুড় খাচ্ছে। হেলেনা পারভীন দিয়ে দিয়েছেন পথিমধ্যে খাওয়ার জন্য। মায়ের কান্না দেখে সোবহান বাপের কানে ফিসফিস করে বলল,
“আব্বা? আম্মা কান্দে কেনু? আম্মাকে তুমি নাল বানাই দিচ?”
সেকান্দার খুঁক খুঁক করে কেশে উঠল। এসময় কে মনে করেছে কে জানে? গলায় চিড়া মুড়ি আটকে গেল তার। পানি পান করে শ্বাস নিল।
“আমি তোর আম্মারে কখন লাল বানালাম? একটা কথাও তো বলিনি সকাল থেকে। তোর আম্মা তোর নানির বাড়ি থেকে চলে এসেছে দেখে কাঁদছে।”
“আমিও কানছি।” মন খারাপ করে।
সোবহান নিজের দিকে ইশারা করল। নৌকা দুলে উঠতেই হালিমা চিৎকার দিয়ে উঠল। সে বাপ, ছেলের থেকে দূরে বসে দুঃখবিলাস করছিল। নৌকার দুলুনি ভীষণ ভয় পায় সে। কোনরকম হামাগুড়ি দিয়ে আসতে নিলে নৌকা আবারও অন্যপাশে হেলে গেল পানির ঢেউয়ের তালে। মাঝিও ওপাশে। এজন্য আরও বেশি আতঙ্কিত হয়ে গেছে সে। নদী ভ্রমণ ভালো লাগলেও এই ভয়ংকর দুলুনি হালিমা প্রচণ্ড ভয় পায়।
“এই হুনছেন।”
সেকান্দার ছেলেকে নিয়ে খুনসুটিতে মত্ত ছিল। মাঝ নদীতে বাতাসের ফোসফসানি, পানির তরঙ্গিত ঢেউ আর বৈঠা বাওয়ার শব্দে কিছুই তার কান পর্যন্ত এসে পৌঁছাল না। তার উপর ছেলেকে নিয়ে সে ছাউনিতে বসা। হালিমা ছাউনির বাইরে বসে ছিল তার ভাইজানকে দেখার আশায়। সেই যে বসেছে এখনো আসেনি। সেকান্দারের সাড়াশব্দ না পেয়ে হালিমা চিৎকার করে ডাকল,
“এই সোবহানের আব্বা…”
এবারের ডাক সেকান্দারের কানে পৌঁছেছে। ছেলেকে উরু থেকে নামিয়ে তাড়াহুড়ো করে ছাউনি থেকে বেরোলো। বেরোতেই দেখল হালিমা হামাগুড়ি দিয়ে দূরে বসে আছে। ছলছল অসহায় চাহনি। সেকান্দার এগিয়ে এসে বউকে আগলে নিল। হালিমা এতক্ষণ পরে ভরসার জায়গা পেয়ে সেকান্দারকে ঝাপটে ধরল। পানির স্রোত উল্টোদিকে বইতেই নৌকা আবারও দুলতে লাগল। হালিমা সেকান্দারকে বলল,
“শক্ত কইরা ধইরেন, পইড়া যামু।”
“শক্ত কইরাই তো ধরছি।” রসকষহীন গলা।
“কই, আপনে ঢিলা কইরা ধরছেন। পইড়া যামু কইলাম সোবহানের বাপ।” হালিমা দুলে উঠে স্বামীর বুকের সঙ্গে একদম মিশে গেল।
“যা পইড়া। না পড়লে আমিই হালাই দিমু। দিলাম..” বলতে বলতে হালিমাকে ফেলে দেয়ার ভান করল।
“এমন করেন ক্যান? ডরাই না?” স্বামীর বুকের শার্ট আঁকড়ে ধরে।
“এহন ডরাস ক্যান? ছ্যানছ্যানানী কোনহানের। তোর চাইয়া আমার সোবহান বেশি সাহুসী। দেখ কেমুন বীরের লাহান খাড়ায় রইছে আমার ছাওয়ালডা।”
অদূরে দাঁড়ানো ছাউনির নিচে হাততালি দিতে থাকা ছেলেকে উদ্দেশ্য করে দেখাল সেকান্দার। বাচ্চাটা দুলতে থাকা নৌকায় বেশ মজা পাচ্ছে। হালিমা একবার দেখে আবারও স্বামীর বুকে মুখ লুকিয়েছে।
“হ, আপনের পোলা বীরপুরুষ হইব।”
“হইবোই তো, বাপের লাহান বীরপুরুষ। কইলজা হইছে এট্টুক হেতি একলা বইয়া রং ডং মারাইতে বইছে। নায়িকা হইতে গেছিল। ভীতুর ডিম কোনহানের।”
কথা বলতে বলতেই নৌকার দুলুনি পেরিয়ে ছাউনিতে এসে থামল। ছাউনিতে ঢুকেই লম্বা একটা নিশ্বাস নিল হালিমা। এতক্ষণ দম আটকে চোখ বুজে স্বামীর বুকে পড়ে ছিল। ওখান থেকে সেকান্দার কীভাবে এনেছে জানে না সে। এসেই ছেলেকে চাপড় মারল। হাততালি দিয়ে তার মজা নিচ্ছিল দেখে। সোবহান বাবার দিকে ছলছল চোখে চাইল। তার ভাসা ভাসা চোখদুটো যেন অভিযোগ জানাল,
“আম্মা আবাল নাল বানাইছে আব্বা।”
সেকান্দার কড়া চোখে হালিমার দিকে চাইল। সেদিকে হালিমার খেয়াল নেই। সে চোখ বুজে বোরকা সামলে ছাউনিতে হেলান দিয়ে বসেছে। নদীর ওই ভয়ংকর ঢেউ গুলোর কথা ভাবলেই তার বুক কাঁপে। ছোটবেলায় একবার উথাল পাথাল ঢেউয়ের কবলে পড়েছিল সে। সেবার কিভাবে যেন নৌকা থেকে পড়ে গেল। সাঁতার জানত না তখন, ভাইজান তাকে বাঁচিয়েছিল। সেই থেকেই এই নদী ও ঢেউ দুটোই তার কাছে ভয়ংকর। সাঁতার পাড়লেও এই আগ্রাসী ঢেউ হালিমার ভয়ের কারণ।
হালিমারা চলে যেতেই শিউলির কেমন একলা একলা লাগতে শুরু করেছে। হামিদ এখনো বাড়িতে এসে পৌঁছায়নি। ওদিকে হেলেনা পারভীনও অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। মেয়েরা চলে গেলে সবসময় তিনি এমন অসুস্থ হয়ে পড়েন। তখন শিউলির তার জন্মদাত্রীকে দেখতে বড্ড ইচ্ছে হয়। তার মাও বুঝি মেয়ের চিন্তায় এমন অস্থির হতেন? মাকে হারিয়েছে আজ কতগুলো বছর। আব্বাকেও দেখেনা কতদিন হয়েছে। কেমন আছে তার আব্বা? হামিদকে ভয়েও বলতে পারেনা ওবাড়ি যাওয়ার কথা। লোকটার হাতে নেই টাকা। সারাক্ষণ মেজাজ চড়া হয়ে থাকে। কিছু বললেই খিটমিট করে ওঠে। ঘরে একটুও বাজার নেই। হালিমাদের আপ্যায়ন করতে গিয়ে যা মজুদ ছিল সবই শেষ। মেয়েটা বুকের দুধ খায় বলে রক্ষে নয়তো এইটুকু শিশুকেও তাদের মতো উপোস থাকতে হতো। হেলেনা পারভীনের দ্বারে গিয়ে ঘুরে এসেছে সে। রান্নার বিষয়ে উনি কিছুই জানাননি।
হালিমা ঘুমন্ত মেয়েকে শুইয়ে রেখে শাক তুলতে গেল বাড়ির পেছনের ক্ষেতে। ঝটপট ঝাঁপিতে করে কতগুলো শাক তুলে এনে ঘরের অভিমুখে আসতেই শুনল মেয়ের উথাল পাথাল কান্নার শব্দ। শিউলি রোয়াকে ঝাঁপি রেখে দৌড়ে ঘরে আসতেই দেখল হেলেনা পারভীন বাচ্চাটার শিয়রের পাশে বসে আছেন। শিউলির কাছে তা অতীব আশ্চর্যের একটি দৃশ্য! হেলেনা পারভীন থানের আঁচল দিয়ে কান্নারত বাচ্চাটার কপাল ডলে দিচ্ছেন আর শিউলিকে গালিগালাজ করছেন। শিউলিকে আঁতকে উঠে এগিয়ে এসে জিজ্ঞেস করল,
“কী হইছে আম্মা?”
শিউলিকে দেখতে পেতেই হেলেনা পারভীন খেঁকিয়ে উঠলেন,
“ঐ বান্দি, মাইয়া থুইয়া কই গেছিলি, হ্যাঁ? পইড়া কপাল ফাইট্টা গেছে। এমুন চিক্কুর দিয়া কানতেছিল আইয়া দেহি এই দশা। মাইয়া মারবি? তোর দোষে হইছে ল্যাংড়া এহন আবার কপাল ফুলাইছস। ঠ্যাংয়ে বেদনা পাইছে কিনা কেডা জানে?”
শিউলি মেয়েকে হুড়মুড়িয়ে কোলে নিল। মেয়েকে বুকে আগলে ঝরঝর করে কেঁদে দিল। তার মেয়ের উপরেই আল্লাহ এতো বালা মুসিবত দেন কেন? আল্লাহ তাকে আর কত পরীক্ষায় ফেলবেন?
হেলেনা পারভীন চলে গেছেন কিছুক্ষণ আগে। কী কী পাতার রস চিপে হামিদার কপালে লাগিয়ে দিয়ে গেছেন। সঙ্গে সরিষার তেল। রক্ত পড়া কমে গেছে। শিউলি পাথরের মতো নিশ্চুপ বসে আছে। কাঁদতে কাঁদতে গলা বসে গেছে তার। মেয়ের ঘুমন্ত মুখশ্রীর দিকে চাইতে আবারও কান্নায় বুক উতলে উঠতে চাইল। কপাল ফুলে লাল হয়ে আছে। শিউলি জানে মেয়ের আজ জ্বর আসবে। বাচ্চারা এমনিতেই নাজুক হয়, তারউপর এইটুকু বাচ্চা যে ব্যথা পেয়েছে জ্বর আসা স্বাভাবিক। হামিদা ঘুমের ভেতরেই ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে উঠছে। মায়ের ওড়নার কোণা ধরে রেখেছে। মা যদি আবার তাকে রেখে চলে যায় এই ভয়ে বোধহয়! শিউলি মেয়েকে কোলে নিয়েই রান্না চড়াল। কান্না বোধহয় তার নিত্যসঙ্গী। কোনোদিন কমার নয়।
মাটির চুলোর ধোঁয়ায় বাচ্চাটা কেশে উঠছে বারবার। শিউলি লাকড়ি ঠেলে মেয়ের নাকের কাছে কাপড় দিল। যেন ধোঁয়া নাকে না লাগে। বাচ্চাটা কেঁদে উঠতেই শিউলি খাওয়াতে লাগল। এভাবেই বহু কষ্ট মেয়েকে নিয়ে রান্না শেষ করল শিউলি। কী রেঁধেছে নিজেও জানে না। লবণ, মরিচের হিসেব করেনি আজ। পুরোটা সময় মেয়ের চিন্তাতেই কেটেছে তার।
মেয়েকে একা রেখে গোসল করতেও আজ ঢুকল না। মন সায় দিল না মায়ের। হামিদ এলে মেয়েকে তার কাছে রেখে গোসলে যাবে ভাবল। মেয়ে গায়ে প্রস্রাব করে দিতেই বাচ্চার জামা পাল্টে নিজে সেই ভেজা পোশাকেই বসে রইল। হেলেনা পারভীন ঘুমিয়ে আছেন। ওনাকে আর বিরক্ত করতে মন সায় দিল না শিউলির। এমনিতেও উনি না থাকলে তার মেয়ে আজ কাঁদতে কাঁদতেই মরে যেত। সে হিসেবে শিউলির আজ হেলেনা পারভীনের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানানো উচিত।
হামিদ এল ভরদুপুরে। মাথায় টাকার চিন্তায় এখন হন্যে হয়ে ঘুরছে চারদিকে। কোনো কাজের জোগাড় করা যায় যদি। দোকানে আজকাল আয় রোজগার নেই। দুটো আয় যেন বেশি হয় এজন্য কাজের খোঁজ করছে সে। গরমে পুরো শরীর পুড়ে গেছে তার। রোদে হাঁটতে হাঁটতে পায়ের জুতোয় ক্ষয় দেখা দিয়েছে। অবশ্য জুতোটা এমনিতেও পুরোনো। হামিদ জোড়াতালি দিয়ে পরে। এসেই কলপাড়ে রাখা বালতি ভর্তি পানি গায়ে ঢেলে দেহটা ঠাণ্ডা করে নিল। আকাশের পানে চেয়ে লম্বা লম্বা শ্বাস ফেলছে সে। আজ একটু বেশিই হাঁটা হয়েছে। পাশের গ্রামে গিয়েছিল। হাফেজুল্লাহর বাড়িতে। কোনো কাজের সন্ধান যদি দিতে পারেন তিনি এই ভেবে। উনার কাছে আবার কাজের খোঁজ থাকে। উনি বলেছেন একটা ব্যবস্থা করবেন। হামিদ সেই একটা ভরসা নিয়ে এসেছে, দেখা যাক আল্লাহ কবে তার ভাগ্য খোলে।
শরীরে কয়েক বালতি পানি দিয়ে ঘুরতেই দেখল শিউলি মেয়েকে কোলে নিয়ে আজ আগে থেকেই গামছা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। চেহারা অত্যন্ত বিমর্ষ। অন্যান্যদিনের তুলনায় আজ শিউলিকে একটু বেশিই ভঙ্গুর মনে হলো হামিদের। লুঙ্গি পাল্টে ভেজা লুঙ্গি ধুতে বসতে নিলেই শিউলি বাধ সাধে,
“লুঙ্গি রাইখা যান, আমি ধুইয়া দিমু। একটু ওরে কোলে রাহেন।”
“এহন লইতে পারুম না, ঘুমামু। মেলা খাটুনি গেছে, শরীর ভালা না।” কলপাড় থেকে উঠতে উঠতে।
“আমি এহনও গোসল দেই নাই। একটুখানি রাখতে কইছি, আপনেগো এত তামশা ক্যান? ওয় এত বোঝা হইয়া গেলে কইয়া দেন হালাইয়া দিয়া আহি।” গলার স্বর খানিক জোরেই শোনালো আজ শিউলির।
হামিদ অবাক হয়ে শিউলির পানে চাইল। এই প্রথম শিউলিকে এত উঁচু কণ্ঠে কথা বলতে শুনল। হামিদের সঙ্গে সঙ্গে রাগে সারা শরীর জ্বলে উঠল। শিউলির স্পর্ধা দেখে অবাক হচ্ছে সে? সারাদিন পরে বাসায় এসেছে অথচ শিউলি তার উপর গলা চড়াচ্ছে?
“কানাপট্টি একদম গরম কইরা দিমু বান্দির বাচ্ছা। কার লগে গরম দেহাস তুই? ঘরে বইয়া থাকতে থাকতে গতরে চর্বি জইমা গেছে না? রক্তপানি কইরা ঘরে আহি তোর মেজাজ দেহার লাইগা?” হামিদের উঁচু কণ্ঠ।
শিউলির কান্না পেয়ে গেল। খুন করে ফেলতে ইচ্ছা করল পৃথিবীর সকল মানুষকে। সে আর তার মেয়ে কী এতই বোঝা আল্লাহর দুনিয়ায়? একটু কারো সহমর্মিতা পায় না কেন?
হেলেনা পারভীন চিল্লাচিল্লি শুনে ঘর থেকে বেরিয়ে এলেন। হামিদকে রাগারাগি করতে দেখে বুঝলেন শিউলি কিছু বলেছে বোধহয়। তিনি এগিয়ে এসে বললেন,
“কী হইছে কি? তোগো জ্বালায় কী একটু শান্তি মতো ঘুমাইতেও পারমু না?”
“ওয় আমার লগে মেজাজ দেহায়, ছাড় দিতে দিতে মাথাত উইড্ডা নাচতাছে।” কিড়মিড় করে বলল হামিদ।
হেলেনা পারভীন কিছু বলার আগেই শিউলি মেয়েকে নিয়েই ঝপাঝপ কয়েক মগ পানি গায়ে ঢেলে দিল। ঘুমন্ত বাচ্চাটা পানি লাগায় চিৎকার দিয়ে কেঁদে উঠল। তার ব্যথার জায়গাতেও পানি লেগেছে। জ্বলে পুড়ে যাচ্ছে। বাচ্চাটার কান্নার বেগ মুহূর্তেই বাড়ল। হাত, পা নাড়িয়ে কেঁদে যাচ্ছে। শিউলি আজ মেয়েকে থামালো না। উল্টো আরও গায়ে পানি ঢালতে লাগল। মা এত সংগ্রাম করছে, মেয়েকেও এইটুকু থেকেই সংগ্রাম শিখতে হবে। হামিদ, হেলেনা পারভীন উভয়ই হতভম্ভ হয়ে গেল। হেলেনা পারভীন হায় হায় করে উঠলেন,
“কী করতাছে এই ছেমড়ি? আইজকা মাইয়াডা এমনিতেই বেদনা পাইছে, ওয় বোধহয় বাচ্ছাডারে মাইরাই শান্ত হইব।”
শিউলি চিৎকার করে বলল,
“হ হ, ওরে মাইরা আমি মরমু। আমার মাইয়ার লাইগা কারো দরদের দরকার নাই। না মরলে দরকার হইলে গলা টিইপ্পা মারমু। এই অকেজো মাইয়ার বাঁচনের কোনো দরকার নাই।”
শিউলি ফুল পর্ব ৯
হামিদ এখনো হতভম্ব হয়েই দাঁড়িয়ে আছে। কী হচ্ছে, কেন হচ্ছে কিছুই তার বোধগম্য হচ্ছেনা। কেন এই রাগারাগি, চিল্লাচিল্লি হচ্ছে কিছুই মস্তিষ্ক ধরতে পারছে না। শুধু কানে বাজছে বাচ্চাটার তার স্বরে কেঁদে চলা, ব্যথার কথা, মায়ের গালিগালাজ আর শিউলির পাগলামি। রাগ তার রন্ধ্রে রন্ধ্রে খেলা করছে। হাত মুঠ করে শিউলির ঔদ্ধত্যপনা দেখছে। হুট করে সবকিছু বিষাক্ত লাগছে কেন? আচ্ছা, এই জগৎ সংসার বিষাক্ত নাকি এই সংসার জীবন? এখন কি একটা খুন করলে তার মহাপাপ হবে?
