শিউলি ফুল পর্ব ১১
তাজরীন ফাতিহা
রাতে গা কাঁপিয়ে হামিদার জ্বর এলো। কাঁথায় মুড়িয়ে রাখা দুই মাসের নাজুক পলকা শরীরটি অনবরত কেঁদে যাচ্ছে। জন্মের পরেই এমন নিষ্ঠুর, নিদারুণ এক পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়েছে তাকে। ছোট্ট নমনীয়, নাজুক শরীরটা তা নিতে পারেনি। কষ্টে চিৎকার দিয়ে থেমে থেমে কাঁদছে। কাঁদতে কাঁদতে গলা চিরে গেছে বাচ্চাটার। এখন যেন কাঁদতেও পারছে না। শিউলি মেয়েকে বুকের ভেতর আঁকড়ে ধরে কাঁদছে। তার মেয়েটা আল্লাহর এতো প্রিয় যে জন্মাবার পর থেকেই পরীক্ষা দিয়ে আসছে। আল্লাহ তার মেয়েকে অনেক ভালোবাসেন বোধহয়। নাহলে আল্লাহ তার হামিদাকে এত সমস্যা কেন দেবেন? হামিদ সেই যে ঝগড়ার পরে হনহনিয়ে বাড়ি থেকে বেরিয়েছে এখনো ফেরেনি।
সেই থেকে হেলেনা পারভীন যা নয় তাই শুনিয়েছেন শিউলিকে। মেয়ে মানুষের এত তেজ ভালো না, কার সাথে তর্ক করেছে হুঁশ কি খুইয়ে ফেলেছে? শিউলি আসলেই হুঁশ খুইয়ে ফেলেছিল। তখন ওর কি যে হয়েছিল নিজেও জানে না। শুধু বিষাক্ত লাগছিল সবকিছু। নিজেকে নিজেই যেন আজ চিনতে পারছিল সে। এখন মেয়ের কান্নায় বুকে কাঁপন ধরছে। কেন সে ঝোঁকের বশে এই পাগলামি করতে গিয়েছিল? দুনিয়ায় তার মতো এমন নিষ্ঠুর মা বুঝি আর একটাও নেই। মেয়ের কান্নারত মুখের দিকে চাইলেই বুক কেঁপে ওঠে, কষ্টে কলিজা এফোঁড় ওফোঁড় হয়ে যায়। কী করবে সে? কী করলে তার বুকের মানিকের কষ্ট কম হবে? মেয়ের কান্না যত বাড়ছে শিউলি তত ছটফটিয়ে উঠছে। শিউলি হামিদাকে বুকের দুধ খাওয়াতে চেষ্টা করল। বাচ্চাটা একটু মুখে নিয়ে আবার মুখ সরিয়ে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে। অল্প খেয়ে আর খাচ্ছে না। জ্বরে শরীর পুড়ে যাচ্ছে। তাপ বের হচ্ছে।
“আমার হামিদা, একটু খা আমার মানিক। কষ্ট হইতাছে আমার মানিকের? মায় খুব খারাপ?”
হামিদা বিরতিহীন কেঁদে যাচ্ছে,
“ওয়া…ওয়া..”
“কি করলে আপনের কষ্ট কম হইব, আম্মারে কন। আম্মা আপনেরে হেইডাই দিমু।” মেয়েকে বুকে আগলে।
প্রত্যুত্তরে হামিদা কিছু বলতে পারল না। সে তার স্বরে ‘ওয়া ওয়া’ করে কেঁদে যাচ্ছে। শিউলির সহ্য হলো না তার এত সাধনার নাড়িছেঁড়া ধনের এই বিরতিহীন কান্না। অস্বাভাবিক লাগছে এই কান্না। দিশেহারা হয়ে পড়ল শিউলি। কি করবে বুঝতে পারছে না। কার কাছে যাবে? তার মেয়েটা এমন করে কাঁদছে কেন? বুকটা যে তার ঝাঁঝরা হয়ে যাচ্ছে। উদ্ভ্রান্তের মতো মেয়েকে বুকে নিয়েই খালি পায়ে ছুটল হেলেনা পারভীনের ঘরের দিকে। তিনি এশার নামাজ শেষে তসবিহ জপছেন। শিউলি দোরের সামনে দাঁড়াতেই তিনি তাকালেন সেদিকে।
“আম্মা, ওয় কেমুন কইরা জানি কানতাছে। একটু দেহেন না। ঝুমুরের বাচ্ছাডা যেমনে কাইন্দা মইরা গেল ঠিক হেমন কইরা কান্দে। আমার মাইয়াডাও কি মইরা যাইব?” পাগলের মতো লাগছে শিউলিকে।
হেলেনা পারভীন উঠে এলেন। বাচ্চার গালে, কপালে হাত দিয়ে পরীক্ষা করলেন। জ্বরে শরীর কাঁপছে। চিন্তিত গলায় শুধালেন,
“কহনতে জ্বর?”
“বিকেল থেইকা শরীর গরম গরম লাগতাছিল।” কোনরকম উত্তর দিল শিউলি।
“হামিদ বাড়ি আহে নাই অহনো?”
শিউলি মাথা নাড়িয়ে না জানাল। বেশ বিধ্বস্ত দেখাচ্ছে তাকে। হেলেনা পারভীন চটে গেলেন। সব রাগ গিয়ে পড়ল শিউলির উপর। মুখে যা এল তাই বললেন,
“অলক্ষ্মী কোনহানের। পোলাডারে একটু শান্তি দিল না। হারাদিন না খাইয়া আছিল পোলাডা আমার। নাইতে যাওয়ার আগে চিল্লায় কইছিল আম্মা ভাত বাইড়া থুইয়ো, হারাদিনে পেডে দানাপানি পড়ে নাই। আর এই অলক্ষ্মী সব শেষ কইরা দিছে। বাচ্ছাডার জ্বর আইছে, অবস্থা ভালা মনে হইতাছে না। হামিদ থাকলে কবিরাজের কাছে লইয়া যাইতো।”
“আম্মা, চলেন আপনে আর আমি কবিরাজের বাড়ি যাই।” বেশ তাড়াহুড়ো করে বলল শিউলি।
“এই রাইতের বেলায়? কবিরাজের বাড়ি কত দূর হুঁশ আছে কুনো? তার উপ্রে দুইজনই বেডি মানুষ। বিপদ আপদের কুনো রাখ ঢাক আছে?”
“তয় ওর আব্বারে এহন কই পামু?” উন্মাদের মতো আহাজারি করে।
“আরেকটু দেক আয় কিনা। আর জামা পাল্ডাইয়া দে। ঘাম দিলে আরও জ্বর উঠব।”
শিউলি নিজের শরীরের ভারসাম্য রাখতে পারছে না। তার বুকের মধ্যে যেন এক খণ্ড তাপের সংস্পর্শ। মেয়েটার শরীর এত গরম হয়ে যাচ্ছে, শিউলি দিশা হারিয়ে ফেলছে। ঘরে এসে জামা পাল্টে মেয়েকে বুকে চেপে কাঁদতে কাঁদতে আল্লাহর কাছে সাহায্য চাইল।
“আল্লাহ গো, সাহায্য করেন। আমার বুকের মানিকরে কাইড়া নিয়েন না। ওয় আমার বহুত কষ্টের ফল। আমারে নিঃসন্তান বানায়েন না মালিক আমার।”
হামিদ এল ঘণ্টা খানেক পরে। ঘরে না আসতে পারলেই তার যেন শান্তি। সারাদিন দোকানে বসে ছিল। চেয়েছিল বাড়ি না যেতে। কিন্তু সারাদিন পেটে কিছু না পড়ায় ক্ষুধার তাড়নায় বাড়ি আসতে বাধ্য হলো। দোকানে বসে চায়ে ভিজিয়ে একটা পাউরুটি খেয়েছিল। এইটুকুই তার খাওয়া। সংসারের এত চাপ, অভাব, আহাজারি, ঝগড়া আর ভালো লাগেনা। সবকিছু ফেলে টেলে কোথাও চলে যাওয়া যেতো। রাগ পড়ে যাওয়ার পরে মেয়েটার জন্য বুকটা পুড়ছিল। একটু কোলে নিলে ক্ষতি তো হতো না কিন্তু তার শরীরটা আসলেই ভালো লাগছিল না। নয়তো মেয়েকে সারাদিন রাখার সাধ্য তার আছে। কত মাইল উত্তপ্ত রোদে হেঁটে হাফেজুল্লাহর কাছে গেছে এরপর বাড়ি ফিরে মেয়েকে কোলে নিয়ে থাকার শক্তি কি তার ছিল? সেসময় বাড়ি থেকে না বেরোলে শিউলিকে আজ খুনই করে ফেলত। মাথা গরম হয়ে গিয়েছিল, এতটা অশান্তিতে। ঘরে ঢুকতে না ঢুকতেই মেয়ের কান্নার শব্দ পেল। হামিদকে দেখতে পেতেই শিউলি উদভ্রান্তের মতো ছুটে এল।
“হামিদার মেলা জ্বর, ওরে কবিরাজের কাছে লইয়া চলেন।”
হামিদ নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে পরণের শার্ট খুলতে খুলতে বলল,
“চক্ষের সামনে দিয়া যা কইলাম। তোরে দেখতে মন চায়না।”
“দেইখেন না। আমি মুখ লুকাইয়া রাখমুনি। খালি মাইয়ারে একটু কবিরাজের কাছে লইয়া যান। মেলা জ্বর, ছুইয়া দেহেন।”
হামিদ ছুলো না। শিউলির কথা তেমন গ্রাহ্য করল না। ভাবল সদ্য মা হয়েছে সামান্য কিছুতেই পাগলামি করে। গামছা নিয়ে বের হতে গেলে শিউলি আবার পথ আগলে দাঁড়াল,
“হামিদার আব্বা, আমার কথা হুনেন। মাইয়ার কান্নার আওয়াজ পাননা আপনে?”
‘হামিদার আব্বা’ ডাকটায় কি ছিল হামিদের জানা নেই মেরুদণ্ড বেয়ে অজানা এক শীতল স্রোত বয়ে গেল। মেয়ের এমন অস্বাভাবিক কান্নায় সারাদিন মেজাজ খারাপ করা হামিদ একটু টললো বোধহয়। কাঁপা কাঁপা হাতে মেয়েকে ছুঁতে নিলে মনে হলো তার হাতে ময়লা লেগে আছে। হামিদকে আবার হাত সরিয়ে নিতে দেখে শিউলি প্রশ্নাত্মক দৃষ্টিতে চাইল। হামিদ বুঝল সেই দৃষ্টি।
“হাতে ময়লা, গোসল দিয়া ধরমু। গরুর খাবার দিছিলি?”
“দিছি। আপনে এহন নাইতে গেলে ওয় মইরা যাইব। এমুন করেন ক্যান?” শিউলি মুখে যা এল গড়গড়িয়ে বলে গেল।
হামিদ ধমক দিল,
“মুহে লাগাম দিয়া কতা ক, মইরা যাইব আবার কেমুন কতা বান্দির বাচ্ছা?” শিউলিকে দোরের সামনে থেকে একপ্রকার ঠেলেই সরিয়ে দিল।
হামিদ হন্তদন্ত হয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে হাত ধুয়ে আসল। ভেজা হাত লুঙ্গিতে মুছে মেয়েকে কোলে নিল। বাবার কোলে যেতেই যেন এতক্ষণের মিইয়ে রাখা কণ্ঠ তাজা হয়ে উঠল। চিৎকার দিয়ে জানান দিল তার ভীষণ কষ্ট হচ্ছে। হামিদ মেয়েকে কোলে নিয়ে হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। এত জ্বর, শরীর যেন উত্তপ্ত লেলিহান শিখা। কী করবে ভেবে পেল না। হাতে এক আনা কানাকড়ি পয়সাও নেই তার। মেয়েকে নিয়ে কোথায় যাবে এই খালি হাতে? সে অসহায়ের মতো আসমানের দিকে চেয়ে শুধাল,
“এত বিপদ ক্যান খোদা? এই গরীবের পেডে আর কত লাথি মারবেন?”
টর্চ লাইটকে সঙ্গী করে মেয়েকে নিয়ে কবিরাজ শামসু মিয়ার বাড়ি উপস্থিত হয়েছে হামিদ। টাকা ছিল না বিধায় এতটা পথ হেঁটে এসেছে। পায়ে তার অসম্ভব ব্যথা। মেয়ের কান্নার জন্য তা পাত্তা দিল না। ভয়ে ছিল এই ভেবে ঘন বন জঙ্গল পেরিয়ে এত রাতে মেয়েকে নিয়ে আবার কোনো বিপদের সম্মুখীন হতে হয় কিনা। দোয়া দুরূদ পড়ে বের হয়েছে। শিউলিকে আনেনি সাথে। এমনিতেই পেটের সেলাই এখনো পুরোপুরি শুকায়নি। তার উপর কবিরাজ হামিদা জন্মের পরে বলেছিল শিউলির উপরে নাকি বদ জ্বিনের নজর আছে। তাই হামিদ ওকে সাথে আনেনি। মহিলা মানুষ নিয়ে এত রাতে বের হওয়াটা ঝুঁকিপূর্ণ। চোর, ডাকাত আক্রমণ করতে পারে। বেশ রাত এখন। গ্রামের মানুষ সবাই ঘুমে কুপোকাত। শামসু মিয়াও ঘুমিয়ে পড়েছিলেন। হামিদের ডাকাডাকিতে উঠে এলেন। শামসু মিয়ার বয়স সত্তরের কাছাকাছি। চামড়ায় ভাঁজ পড়েছে। কুঁচকানো চামড়া ও সাদা পাকা চুলগুলো তার অভিজ্ঞতা এবং প্রৌঢ়ত্বের প্রমাণ।
বাচ্চাটাকে দেখে কী কী যেন ওষুধ পথ্য এক ফোঁটা, এক ফোঁটা খাওয়ালেন শামসু মিয়া। শিশুটিকে ধরে বারবার সাংঘাতিক সাংঘাতিক করছেন তিনি। বাচ্চার গায়ে এত জ্বর নিশ্চয়ই অবাক হয়েছেন। শামসু মিয়া তার টোটকা দেয়া শেষে দোয়া পড়ে ফুঁক দিয়ে দিলেন সারা শরীরে। বাচ্চাটা মিনিট দশেক পড়ে কান্না কমিয়ে বাবার কোলে ফোঁপাতে লাগল। হামিদ মেয়ের ধীরে ধীরে ফোঁপানা টের পাচ্ছে। শামসু মিয়া বললেন,
“এই বড়িডা খাওয়াবি। এট্টুক মাইয়ার শরীরে অমন সাংঘাতিক জ্বর আইলো ক্যামনে? বাচ্ছা পালতে হয় খুব সাবধানে। যেমনে হেমনে বাচ্ছা পালন যায়না। আর এত রাইতে মাইয়া লইয়া বাইর হওয়া ঠিক হয় নাই। তেনারা বিরক্ত হইয়া যা খুশি করব।”
অন্য ইঙ্গিত দিলেন শামসু মিয়া। হামিদ সেসবের ধার ধারল না। অভাব আর টাকার চিন্তায় থাকলে জ্বীন ভূতের চিন্তা আসেনা। আসলে হামিদ এতটা পথ পাড়ি দিতে পারতো না। ওসব চিন্তা তারাই করে যারা তিনবেলা আমোদ ফুর্তির ভেতর থাকে। হামিদের চিন্তা শুধু টাকা কেন্দ্রিক। লম্বা এক দীর্ঘশ্বাস ফেলে জিজ্ঞেস করল,
“কবিরাজ কাকা, ওর আবার জ্বর উডবো না তো?”
“না, জ্বরের ওষুধ দিয়া দিছি। একটু পরে ঘাম ছাইড়া দিব। ওরে একটু পর পর খাওয়াবি। খাওনে যেন কুনো হেরফের না হয়। এইটুক বাচ্ছার অসুক বান্দায় ফেলছস। তোর বউয়ের খবর কী? তেনারা জ্বালায়? আমার মনে হয় তোর মাইয়ার উপ্রেও হেরা নজর দিছে। তাবিজ দিয়া দিতাছি, হাতে আর গলায় বাইন্ধা রাখবি।”
হামিদ না পারতে মাথা নাড়াল। হামিদের শতভাগ ধারণা শামসু মিয়া ভঙ চঙ বুঝাচ্ছেন তাকে। সব টাকা খাওয়ার ধান্ধা এই বুড়ো লোকের। জ্বীন ভূত তাদের বাড়িতে আসবে কোথা থেকে? বাড়ির জায়গায় জায়গায় গরুর দাঁতের চোয়াল ঝোলানো আছে। শিউলির ঐ ঘটনার পরে হেলেনা পারভীন সেগুলো জায়গায় জায়গায় ঝুলিয়ে রেখেছেন। জ্বীন ভূত ওসবের ভয়েই তো এখন আর তাদের বাড়ির ত্রিসীমানায় আসবে না। অথচ অশিক্ষিত হামিদের ধারণাতেই নেই জ্বীনের প্রধান খাদ্য হাড্ডি। কিসের সেটা বলা মুশকিল।
“আপনের টেকা কয়েকদিন পরে দিলে হইব কাকা?” হামিদ এবার মুখ খুলল।
“হইব। তুই বাড়িত যা, সময় মতো দিয়া যাইস।”
হামিদার বাহুতে তাবিজ বেঁধে দিল। গলায়ও একটা বাঁধল। বাচ্চাটা বাবার কোলে সারাদিন পরে একটু ঘুমাচ্ছে। তাকে যে তাবিজ বেঁধে দেয়া হলো সেটা তার ধারণাতীত রইল। হামিদ নিশ্চিন্ত হয়ে দোয়া কালাম পড়ে নিজের ও মেয়ের শরীর বন্ধ করে আল্লাহর নাম নিয়ে বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা দিল। চাদরের আড়ালে মেয়েকে ভালোভাবে লুকিয়ে নিল। এবার সহিসালামতে বাড়ি পৌঁছতে পারলেই শান্তি।
অনেকখানি পথ পাড়ি দিয়ে বাড়ি ফিরে গোসল দিয়ে ভাত খেতে বসল হামিদ। শিউলি মেয়েকে দেখে হামলে পড়েছে। বাচ্চাটা ঘুমাচ্ছে। মেয়েকে ঘুমের ভেতরেই খাইয়ে দিয়েছে শিউলি। ঘুমন্ত হামিদাকে বুকে নিয়ে পাকঘরের দাওয়ায় বসে ভাত বেড়ে দিল শিউলি। হামিদ সারাদিন পরে ভাত পেয়ে গোগ্রাসে গিললো। ভাতের নলা এমন বড় করে নিয়ে মুখে দিচ্ছে দেখে শিউলির বেশ মায়া লাগল। লোকটা আজ সারাদিন তার কারণেই না খাওয়া। হাতে পয়সা থাকলে অন্তত ভারী কিছু খেতে পারত। নিশ্চয়ই পাউরুটি খেয়ে দিনাতিপাত করেছে। শিউলি পাতে আরেকটু ভাত আর শাক তুলে দিল। আজ শাক ছাড়া আর কিছুই রান্না হয়নি। লোকটা তা দিয়ে এত মজা করে খাচ্ছে। পেটের ক্ষুধা মানুষকে কোথায় নিয়ে যায়? খালি পেটে শুধু ভাত দিলেও গেলা যায়, অথচ খাবারের ভেতরে ডুবে থাকলে পোলাও কোরমাতেও খিদে পায়না।
“হামিদার আব্বা, দুফুরে আপনের লগে খারাপ আচরণ করছি। আমার লাইগা আইজকা হারাদিন খালি পেডে আছিলেন। গোসসা কইরা আবার অভিশাপ দিয়েন না। মাফ কইরা দিয়েন। মাথা ঠিক আছিল না, পাগলামি করছি।”
হামিদ রসকষহীন গলায় জবাব দিল,
“হুদা পাগলামি করলে তো মাফ করতাম, করলি তো করলি দুধের মাইয়াডারে লইয়া করলি। হেই দৌড়াতে তো আমারেই হইল। পাও ফুইলা গেছে আইজকা এত হাঁটার ফলে। এহন জমিনে পাও ফালাইতে পারিনা। তোর পাগলামির কারণে মাইয়াডা মরতে বইছিল। এমুন পাগলামি আর করবি না, খবরদার! বাচ্ছা এমনে এমনে হয়নাই। আল্লাহ বহুত কষ্টের পরে ওরে আমগো ঘরে পাডাইছে।”
রাত এখন তিনটা বাজে। হামিদ নামাজ পড়ে চৌকিতে বসল। হামিদা আবার উঠে গেছে। জ্বরের কষ্টে কাঁদতে কাঁদতে চোখ বুজে দুধ খাচ্ছে সে। হামিদ সেদিকে খেয়াল দিল না। ক্লান্তিতে দুচোখের পাতা মুদে এল তার। সারা শরীর বিষের মতো ব্যথা করছে। মা, মেয়ের থেকে উল্টোদিকে মুখ করে শুয়ে পড়ল। শিউলি কিছুক্ষণ পরেই তার নাক ডাকার শব্দ পেল। আজকে লোকটা বেশ দ্রুতই ঘুমিয়ে পড়েছে। তার এই গভীর নিদ্রাই জানিয়ে দিচ্ছে প্রচুর ক্লান্ত সে।
হামিদ ঘুমের ঘোরে টের পাচ্ছে তার পায়ে কে যেন মোলায়েম হাতে মালিশ করে দিচ্ছে। তার এত আরাম লাগল। কিছুক্ষণ পরে অনুভব করল মোলায়েম হাতজোড়া তার মাজায় এসে থামল। সেখানেও চলল কিছুক্ষণ যত্ন নিয়ে মালিশ। হামিদ ঘুমের কারণে চোখ মেলতেও পারছে না তবে সব অনুভব করতে পারছে। একটু পরে কারো তার বুকের ভেতরে ঢোকার তোড়জোড় টের পেল। হামিদ নড়েচড়ে সোজা হয়ে শুলো। অনুভব করল একটি ভারী শরীর তাকে ঝাপটে ধরে বুকের উপরে মাথা ফেলে রেখেছে। যেন খুব করে চাচ্ছে হামিদের শরীরের ভেতর ঢুকে যেতে। হামিদ অবচেতনেই আগলে নিল শরীরটি।
সকাল সকালই কিস্তির লোকেরা এসে হাজির। হামিদকে যা নয় তা শুনিয়ে দিচ্ছে তারা। হামিদ গরুকে গোসল করিয়ে, খাইয়ে দাইয়ে ঘরে এসেই দেখল উঠোনে তাদের পদচারণা। তাকে দেখতে পেতেই তারা টাকা চেয়ে বসল। হামিদ দিতে অপারগ জানানোতেই শুরু হলো কথা কাটাকাটি। প্রতিবার তার অপারগতা কিস্তির লোকেরা শুনবেই বা কেন?
“নাটক করেন আমগো লগে? কিস্তির টাকা দিতে না পারলে টাকা লইছেন ক্যান? শ্লা ভন্ড কোনহানের। প্রত্যেকবার ফাত্রামি করে। আমগো যেন সময়ের কুনো দাম নাই।”
হামিদ চুপচাপ অপমান হজম করতে পারল না। এধরনের কথা সে জীবনেও শোনেনি। অথচ কয়েক বাড়ির সামনে লোকটা চিৎকার করে তাকে অপমান করছে। এ ওবাড়ির মেয়ে, বউরা উঁকিঝুঁকি মেরে দেখছে এ বাড়ির কাণ্ড। হামিদ পাল্টা জবাব দিলে হাতাহাতির মতো অবস্থা হয়ে গেল। শিউলি মেয়েকে কোলে নিয়ে পর্দার আড়াল থেকে সবকিছু দেখছে। হামিদের গেঞ্জি মুঠ করে যখন কিস্তির এক লোক গায়ে হাত ওঠাতে গেল তখন হামিদা চিৎকার দিয়ে কেঁদে উঠল। বাচ্চাটার কান্নার আওয়াজ পেয়ে কিস্তির আরেক লোক এগিয়ে এসে মারমুখী লোকটাকে থামালো। লোকটা মারতে না পেরে হামিদের গেঞ্জি টেনে ছিঁড়ে ফেলল। শিউলি কেঁদেই ফেলল হামিদের গেঞ্জি টেনে ছিঁড়ে ফেলার সময়। স্বামীর অপমান কোনো স্ত্রী সহ্য করতে পারে? মা, মেয়ে পাল্লা দিয়ে কাঁদছে। শিউলি কাঁদছে স্বামীর অপমানে আর শিশুটি? শিশুটি কি বাবার অপমানে এমন করুণ স্বরে কাঁদতে লেগেছে? সে কি বুঝতে পারছে তার বাবাকে কত বাড়ি লোকের সামনে অপমান করা হচ্ছে?
শিউলি ফুল পর্ব ১০
কিস্তির লোকেরা পরবর্তী তারিখ দিয়ে গেল। এরমধ্যে টাকা ম্যানেজ করতে না পারলে গরু নিয়ে যাওয়া হবে বলে হুমকি দিয়ে গেল। হামিদ উঠোনে ছেঁড়া গেঞ্জি পরে এক আকাশ কষ্ট, অপমান, আত্মগ্লানি নিয়ে দাঁড়িয়ে রইল। পুরুষ মানুষদের কাঁদতে নেই নীতিতে নিজেকে সামলে নিল। ছেঁড়া গেঞ্জি পাল্টে আরেকটা শার্ট পরে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।
