Home এমপি শেহরান মির্জা এমপি শেহরান মির্জা পর্ব ৯

এমপি শেহরান মির্জা পর্ব ৯

এমপি শেহরান মির্জা পর্ব ৯
সেঁজুতি আক্তার

সূর্যের আলো ক্ষীণ হয়ে এসেছে। আকাশটা মেঘলা হয়ে আছে। হালকা বাতাস বইছে। মনে হচ্ছে যেকোনো সময় বৃষ্টি নামবে। মাইরা ছাদের রেলিং এর সাথে হেলান দিয়ে চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে।
সামনে সায়রা মাটিতে বসে আছে। হাতে তিনটা টব। একটাতে দুইটা গোলাপ গাছ আরেকটাতে একটা বেলি ফুল গাছ। গাছগুলো সায়রা আজকে ওর বান্ধবীর বাসা থেকে নিয়ে এসেছে। পাশের ছাদে কয়েকটা ছেলে ক্রিকেট খেলছে। বলের আওয়াজ এখান পর্যন্ত আসছে। মাইরা কিছুক্ষণ সেদিকে তাকিয়ে থাকলো। সায়রার দিকে ঘুরে আস্তে করে বলল, আচ্ছা আপু, আমরা যদি ছাদে ক্রিকেট খেলি তাহলে কেমন হয় বলো তো?

সায়রা কাজ করতে থেমে গেল। ভ্রু কুঁচকে মাইরার দিকে তাকালো। “ভাবি, তুমি এখন ক্রিকেট খেলবা?
মাইরাও সায়রার দিকে তাকিয়ে ছোট করে মুচকি হাসলো। কেন আপু, তুমি কি খেলতে পারো না?
সায়রা মাথা নাড়ল। “না, আমি পারি না।
মাইরা বলল, “তাতে কি হয়েছে। আমি আছি তো। আমি তোমাকে শিখিয়ে দিবো। তুমি যাও, ঘর থেকে দুইটা ব্যাট আর একটা বল নিয়ে আসো।
সায়রা উঠে দাঁড়ালো। বিরক্ত হয়ে বলল, “আরে ভাবি, তুমি কি পাগল হইলা নাকি। এই ছাদে ক্রিকেট খেলা যাবে না। এখানে খেলা যাবেনা । খেলতে হলে নিচে চলো।
মাইরা ভ্রু কুঁচকে ফেলল। “কেন এই ছাদে খেলা যাবে না কেন? ওই যে দেখো, পাশের ছাদের ছেলেগুলোও তো ছাদেই খেলতেছে। ওরা পারলে আমরা পারবো না কেন?
সায়রা হাতের মাটি ঝাড়তে ঝাড়তে বলল, “আরে ভাবি, ওদের ছাদে গিয়ে দেখো তো একটা গাছও আছে কিনা। আর আমাদের ছাদটা দেখো। চারপাশে শুধু গাছ আর গাছ। এখানে যদি বল লাগে তাহলে একটাও গাছ আস্ত থাকবে না। সব ভেঙে যাবে।”

মাইরা চারপাশে তাকিয়ে দেখলো। সায়রা ঠিকই বলেছে। এতগুলো টব, এতগুলো গাছ। এখানে সত্যিই খেলা যাবে না। নাহলে সব নষ্ট হয়ে যাবে। মাইরা বলল, “আচ্ছা ঠিক আছে। বুঝছি। তাহলে চলো আমরা নিচে গিয়েই খেলি।”
মাইরা সায়রার দিকে দুই পা এগিয়ে আসতেই সায়রা আবার বলল, “না ভাবি, এখন একদম না। এখন তো সন্ধ্যা হয়ে গেছে। এখন খেললে আম্মু বকা দিবে। তার চেয়ে বরং কালকে সকালে খেলি, কেমন?

-মাইরা চোখ ছোট ছোট করে সায়রার দিকে তাকালো। “সত্যি বলতেছো? কালকে খেলবা তো?
-সায়রা হেসে মাথা নাড়ল। “হুম, সত্যি সত্যি। প্রমিস।
সায়রা আবার টবের কাছে বসে মাটি দিতে লাগলো। হঠাৎ ওর ফোনটা বেজে উঠলো। ফোনটা বের করে স্ক্রিনের দিকে তাকাতেই সায়রার ঠোঁটের কোণে একটা হাসি ফুটে উঠলো। ফোনটা কানে নিয়ে উঠে দাঁড়ালো। যাওয়ার আগে মাইরার দিকে তাকিয়ে বলল, “ভাবি, তুমি এই টবগুলোতে মাটি দিয়ে দাও। আমি একটু আসছি।” কথাটা বলেই সায়রা সিঁড়ির দিকে চলে গেল।
মাইরা টুলটা টেনে এনে বসলো। তারপর আস্তে আস্তে হাত দিয়ে শুকনো মাটিগুলো তুলে টবের মধ্যে দিতে লাগলো। কাজ করতে করতেই আকাশের দিকে তাকালো। মেঘ আরও ঘন হয়ে এসেছে। হঠাৎ টপ করে দুই এক ফোঁটা বৃষ্টি পড়লো। তারপর এক সেকেন্ডও লাগলো না। ঝমঝম করে মুষলধারে বৃষ্টি নেমে গেল। বৃষ্টির পানিতে এক সেকেন্ডেই মাইরা ভিজে গেল। কিন্তু মাইরা একটুও নড়লো না। ও শুধু দুই হাত মেলে দিয়ে বৃষ্টিতে ভিজতে লাগলো। কারণ ওর বৃষ্টি খুব পছন্দ।

শেহরান পার্টি অফিস থেকে বাসায় ফিরেছে। বাসায় কিছু জরুরি কাগজপত্র ছিল। ওগুলো নেওয়ার জন্যই আসা। রুমে ঢুকে দেখলো মাইরা নেই। শেহরান কাগজগুলো ব্যাগে ভরলো। তারপর রুম থেকে বের হয়ে সোজা নিচে নেমে গেল।
-ড্রয়িং রুমে শাহানা বেগম সোফায় বসে আছেন। হাতে একটা বই। শেহরান কাছে গিয়ে বলল, “আম্মু, মাইরা কই?
-শাহানা বেগম বই থেকে চোখ না সরিয়েই বললেন, “ছাদে গেছে। সায়রার সাথে গাছ লাগাচ্ছে।
শেহরান আর কিছু বললো না। হাতের ব্যাগটা সেন্টার টেবিলের ওপর রেখে সিঁড়ি দিয়ে উপরে উঠতে লাগলো। ছাদের দরজাটা হালকা ভেজানো ছিল। শেহরান দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকতেই থমকে গেল।

-বৃষ্টির মাঝখানে মাইরা। দুই হাত মেলে দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। চুল ভিজে পিঠের সাথে লেপ্টে আছে। সাদা জামাটাও ভিজে গায়ের সাথে লেগে গেছে। মাইরা চোখ বন্ধ করে বৃষ্টির পানি হা করে খাচ্ছে আর মিটিমিটি হাসছে।
-শেহরান কিছুক্ষণ চুপচাপ দাঁড়িয়ে দেখলো। তারপরে দৃষ্টি সরিয়ে গলা খাঁকারি দিল। এই যে ম্যাডাম।
-মাইরা চমকে চোখ খুললো। সামনে শেহরান। শেহরানের গায়ে সকালের সেই স্যুট সেট। সেটাও বৃষ্টিতে হালকা ভিজে গেছে। মাইরা তাড়াতাড়ি হাত নামিয়ে ফেলল। “আ… আপনি?”
-শেহরান ভ্রু উঁচালো। “এই ভর সন্ধ্যায় ছাদে ভিজছো কেন? জ্বর আসলে কে দেখবে শুনি?”
-মাইরা মুখ ঘুরিয়ে নিল। “আমার জ্বর আসবে না। আমার বৃষ্টি ভালো লাগে।”
শেহরান এক পা এক পা করে এগিয়ে আসলো। “ভালো লাগে তাই না?”
-মাইরা অবাক হয়ে বলল, “হুম।”
-শেহরান মাইরার খুব কাছে এসে দাঁড়ালো। পানি চুইয়ে চুইয়ে পড়ছে দুইজনের গা থেকে। মাইরা একটু পিছিয়ে গেল।

শেহরান ঠোঁটের কোণে বাঁকা হাসলো। ডান হাতটা মাইরার দিকে বাড়িয়ে দিল। শেহরানের আচরণ দেখে মাইরা চোখ বন্ধ করে ফেলল। শেহরান মাইরার চুলে লেগে থাকা একটা পোকা হাত দিয়ে ছাড়িয়ে ফেলে দিল। তারপরে মাইরার দিকে তাকিয়ে বলল, “এবার চোখ খোলো। আর এভাবে না ভিজে। নিচে যাও। না হলে ঠান্ডা লেগে যাবে।”
-মাইরা সাথে সাথে চোখ খুলে ফেলল। পাশের ছাদে একটি ছেলে এদিকেই তাকিয়ে আছে। শেহেরান ছেলেটির দিকে তাকিয়ে। তারপরে মাইরার দিকে তাকালো। একটু গম্ভীর হয়ে বলল, “নিচে চলো। ফার্স্ট।”
মাইরা ভ্রু কুঁচকালো। “আমি তো থাকবোই। আমার ভালো লাগতেছে। আপনি যান।”
শেহরান এক পা সামনে বাড়ালো। “ভালো লাগতেছে? জ্বর আসলে তখন ভালো লাগবে?”
-মাইরা মুখ বাঁকালো। “আসবে না।”
শেহরান আর সহ্য করতে পারলো না। রাগী চোখে মাইরার দিকে তাকিয়ে বলল, “তোমার জামা ভিজে গেছে। এই অবস্থায় দাঁড়িয়ে থাকবা না। নিচে যাও, কাপড় চেঞ্জ করো।”

-মাইরা প্রথমে বুঝলো না। তারপর নিজের দিকে তাকিয়ে লজ্জা পেয়ে গেল। তাড়াতাড়ি দুই হাত দিয়ে বুকের কাছে জামা চেপে ধরলো। কিন্তু মুখে বলল, “তো? কি হইছে? আপনার কি?”
শেহরান চোয়াল শক্ত করলো। “আমি দেখি নাই। আর দেখতেও চাই না। নিচে চলো বলছি।”
-মাইরা জেদ করে বলল, “যাবো না। আমি এখানেই থাকবো। আপনি চলে যান।”
-শেহরান রেগে গেল। জেদ করতেছো? আমি যা বলি তাই করবা। এটা আমার হুকুম।”
মাইরা পাল্টা জবাব দিল, “আপনার হুকুম আমি শুনবো কেন? আপনি কে আমার?”
শেহরান থমকে গেল। এক সেকেন্ডের জন্য চুপ করে রইলো। তারপর আস্তে করে বলল, “কে আমি? সেটা তুমি ভালো করেই জানো।”
মাইরা কথাটা শুনে অন্যদিকে মুখ ঘুরিয়ে নিল। বুকের ভেতর ধক করে উঠলো। কিন্তু মুখে বলল, “জানি না।”

শেহরান আর কথা বাড়ালো না। সামনে গিয়ে মাইরার হাতটা শক্ত করে ধরলো। “উঠো।”
মাইরা হাত ছাড়ানোর চেষ্টা করলো। “লাগতেছে। ছাড়েন। আমি নিজেই যাইতে পারবো।”
শেহরান ছাড়লো না। ভেজা হাতটাই ধরে রাখলো। “পারবা না। পড়ে যাবা।”
-মাইরা বিড়বিড় করে বলল, “ঢং।”
শেহরান শুনেও কিছু বললো না। শুধু মাইরাকে নিয়ে ছাদের দরজার দিকে হাঁটতে লাগলো।
সিঁড়িতে নামতে নামতে মাইরা বলল, “আপনি সবসময় এমন কেন? একটু নরম হয়ে বলতে পারেন না?”

শেহরান নিচের দিকে তাকিয়ে বলল, “পারি না।”
মাইরা ফোঁস করে নিঃশ্বাস ফেলল। “জানি। আপনি পারবেনও না। পাথর একটা।
শেহরান মাইরার দিকে একবার তাকালো তারপরে চোখ নামিয়ে নিল। কিছু বললো না।
নিচে নেমে শেহরান মাইরার হাতটা ছেড়ে দিল। “যাও, রুমে গিয়ে কাপড় চেঞ্জ করো। আর মাথা ভালো করে মুছবা।

এমপি শেহরান মির্জা পর্ব ৮

মাইরা কিছু না বলে দৌড়ে রুমের দিকে চলে গেল। যাওয়ার সময় একবার পেছনে তাকালো। শেহরান তখনও দাঁড়িয়ে আছে। ভিজা কোর্টটা গা থেকে খুলছে।
মাইরা বিরবির করে বলল, খাটাশ লোক একটা।

এমপি শেহরান মির্জা পর্ব ১০