এমপি শেহরান মির্জা পর্ব ৮
সেঁজুতি আক্তার
-শেহরান তোয়ালেটা মাইরার দিকে ছুড়ে মারল।
-মাইরা রাগী চোখে শেহরানের দিকে তেড়ে যেতে নিলেই পানির উপরে পা রাখতেই স্লিপ খেয়ে ধপ করে পড়ে গেল। আহ বলে চেঁচিয়ে উঠল।
-শেহরান ঠোঁটের কোণে দুষ্টু হাসি নিয়ে বলল, সাধে কি বলি ইডিয়েট। দেখো এই জন্যই বলেছি তুমি আসলেই একটা বোকা মেয়ে। কিছু পারো না। নিজেই চুলের পানি সমেত এনে রুমে ফেললে। আবার সেই পানিতে নিজেই পা দিয়ে পড়ে গেলে। তাহলে বলো তোমার মতো বোকা আর কয়টা আছে।
-দেখুন একদম বোকা বলবেন না। আর আমি বোকা নই। মাইরা দাঁতে দাঁত চেপে বলল।
-শেহরান চোখ ছোট ছোট করে বলল, সত্যি?
-হুম! মাইরা মাথা নিচু করে কোমরে হাত দিল। আজ খুব বেশি ব্যথা করেছে।
-মাইরাকে শান্ত দেখে শেহরান বুঝল হয়তো খুব বেশি ব্যথা পেয়েছে। কয়েক সেকেন্ড চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল। দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল উঠতে পারবে?
-মাইরা ব্যথায় মুখ কুঁচকে মাথা নাড়তেই আর কিছু না বলে শেহরান হঠাৎ কোলে তুলে নিল।
-মাইরা চমকে শেহরানের দিকে চাইল। বুকের মধ্যে ধুকপুক করছে। গাল দুটো যেন লজ্জায় লাল হয়ে গেছে।
-শেহরান মাইরার দিকে তাঁকিয়ে গলার স্বর নরম করে বলল, তুমি ঠিক আছো? খুব বেশি ব্যথা করছে?
-মাইরা দুই দিকে মাথা নাড়িয়ে না বলল।
-শেহরান মাইরাকে নিয়ে বিছানায় বসিয়ে দিল। তারপর ফার্স্ট এইড বক্স থেকে ব্যথার ওষুধ আর মলম এনে মাইরার হাতে ধরিয়ে দিল।
-মাইরা মলমটির দিকে অবাক চোখে তাকাল। শেহরানের প্রতি কেমন একটা ভালো লাগা কাজ করলো। মুগ্ধ দৃষ্টিতে ও শেহরানের দিকে তাকিয়ে রইল। এই খাটাশ লোকটার মধ্যেও যে এত মায়া আছে, মাইরা ভাবতেই পারেনি।
-শেহরান ফ্লোরে পড়ে থাকা পানিগুলো মুছে ফেলল। তারপর আরেকটা টাওয়েল নিয়ে ওয়াশরুমে চলে গেল।
-এদিকে মাইরা আনন্দে আত্মহারা হয়ে গেছে। খাটাশ লোকটা তার যত্ন নিয়েছে। তার চুল মুছে দিয়েছে। না লোকটা ভালোই আছে। ওপরে ওপরে যা অমন করে। ভিতরে ভিতরে একটু হলেও দয়ালু আছে। মাইরার ঠোঁটের কোণে লাজুক হাসি খেলে গেল। অবশেষে একটু একটু করে ওই মানুষটার সাথে সম্পর্কের উন্নতি হচ্ছে।
-এক গ্লাস পানি নিয়ে ওষুধটা খেয়ে মলমটা লাগিয়ে নিল। এখন একটু ভালো লাগছে। হঠাৎ মাইরার মনে হল, আচ্ছা বিয়ের দুই দিন পরেই তো মানুষ বরকে নিয়ে বাবার বাড়িতে যায়। কই আমরা তো গেলাম না। ভাবতেই মুখটা মলিন হয়ে গেল।
-হঠাৎ খট করে দরজা খোলার শব্দে মাইরার ধ্যান ভাঙল।
-শেহরান বেরিয়ে এসেছে। গায়ে একটি কালো কালারের স্যুট।
মাইরার দিকে একবার তাকিয়ে সাথে সাথে চোখ ফিরিয়ে নিল। মিররের দিকে তাকিয়ে হাতে ঘড়ি পড়তে পড়তে বলল, ওষুধ খেয়েছো?
-মাইরা হাঁ করার মতো শেহরানের দিকে তাকিয়ে আছে। এই খাটাশ লোকটাকে কি সুন্দর লাগছে। মনে মনে ভাবতেই ঠোঁটের কোণে মুচকি হাসি খেলে গেল।
– ভ্রু নাচিয়ে বলল, কি ব্যাপার? হাসছো কেন?
-মাইরা সাথে সাথে দৃষ্টি সরিয়ে ফেলল। আমতা আমতা করে বলল, ক-কই হাসছি না তো।
-আমি দেখলাম তুমি হাসছো, তুমি বলছো তুমি হাসছো না? এই ব্যাপার কি বলো তো?
-কোন ব্যাপার না। আপনি থাকুন আমি যাই। মাইরা তাড়াহুড়ো করে বিছানা থেকে নেমে রুম থেকে বেরিয়ে গেল।
-শেহরান মাইরা যাওয়ার দিকে তাকিয়ে ফিক করে হেসে ফেলল।
পরক্ষণেই গলা ঝেড়ে গম্ভীর হয়ে আয়নার দিকে তাকিয়ে চুল সেট করতে লাগল। বুকের ভেতর অদ্ভুত একটা শান্তি লাগছে।
-ড্রয়িং রুমের সোফায় সায়রা বসে ফোন স্ক্রল করছে। পাশেই লিনাও আছে। লিনা মূলত ফুপির বাসায়ই বেশি থাকে। এখান থেকেই ও ভার্সিটি করে। সায়রা আর লিনা একই বয়সের।
-মাইরা রুম থেকে বেরিয়ে ধীরে সুস্থে সিঁড়ি দিয়ে নামলো। কোমরের মধ্যে চিনচিনে ব্যথা করছে। ড্রয়িং রুমের সোফায় দেখল সায়রা লিনা বসে। লীনাকে দেখে মুখ ভেংচিয়ে রান্না ঘরের দিকে চলে গেল।
-লীনা হতভম্ব চোখে মাইরার রিঅ্যাকশন দেখল। এই মেয়েটা ওকে মুখ ভেংচালো? রাগে লিনার শরীর জ্বলে যাচ্ছে। এতোটুকু মেয়ে হয়ে কিনা ওর সাথে এমন ব্যবহার। মনে মনে ফন্দি এঁটে ফেলল। কিভাবে এই মেয়েকে টাইট করা যায়। ভেবেই শয়তানি হাসলো।
-মাইরা রান্নাঘরে এসে দেখল শাহানা বেগম সব খাবার বাটিতে রাখছেন। আর কাজের খালা একে একে সব বাটি টেবিলে নিয়ে যাচ্ছে। মাইরা মিষ্টি হেসে এগিয়ে গেল। শাহানা বেগমের পাশে গিয়ে বলল, দিন আম্মু। আমাকে দিন। আমি টেবিলে নিয়ে গিয়ে রাখছি।
-শাহানা বেগম হেসে মাইরার দিকে তাকিয়ে বললেন,থাক তোমাকে কিছু নিয়ে যেতে হবে না। তুমি গিয়ে বসে পড়ো।
-না আম্মু। আমাকে দিন। শাহানা বেগমের হাত থেকে তরকারির বাটিটা নিয়ে নিল। মুচকি হেসে বাটিটা টেবিলের উপরে রাখল।
-রায়হান মির্জা এসে চেয়ার টেনে বসলেন। সায়রা লীনাও বসল।
-শাহানা বেগম এসে প্লেটে হাত দিতেই মাইরা মুচকি হেসে বলল,
-আম্মু আপনি বসুন। আজ আমি খাবার দিবো সবাইকে।
-শাহানা বেগম মাইরার দিকে শান্ত চোখে তাকালেন। তারপর বললেন, আচ্ছা ঠিক আছে দাও।
-মাইরা মুচকি হেসে প্রথমে শ্বশুরের প্লেটে খাবার বেড়ে দিল। তারপর একে একে সবাইকে দিল।
-সায়রা মাইরার দিকে তাকিয়ে বলল,এই ভাবি, ওই চিংড়ী মাছের বাটিটা দাও তো।
-মাইরা মুচকি হেসে বাটিটা সায়রার দিকে এগিয়ে দিল।
-মাইরা এবার তুমিও বসে পড়ো।
-বাবা, আমি পরে বসছি। আপনারা খেয়ে নিন। তারপর না হয় আমি বসছি।
-মাইরা, শেহরান কোথায়? খাবে না?
-শাশুড়ির কথা শুনে মাইরা সিঁড়ির দিকে তাকিয়ে দেখলো শেহরান নিচে নামছে। ওই তো আম্মু। আপনার ছেলে আসছে।
-সবাই সিঁড়ির দিকে তাকালো।
-শেহরান এসে একটা চেয়ার টেনে বসে পড়ল। শেহরানের পাশের চেয়ারটা খালি। তারপরের চেয়ারে লিনা বসেছে।
-মাইরা শেহরানের প্লেটে খাবার বেড়ে দিল।
-শেহরান একবার মাইরার দিকে তাকিয়ে খাওয়ায় মনোযোগ দিল। তারপর বলল, তুমি খাবে না? বসে পড়ো।
-শেহরানের কথা শুনে সবাই মুচকি হাসতে লাগলো।
-লীনার হাতে ধরা চামচটা থেমে গেল। চোখের পানিটা মাথা নিচু করে লুকিয়ে ফেলল। বুকের ভেতরটা হিংসায় জ্বলে যাচ্ছে।
-মাইরা, তুমি বসে পড়ো।
-শাশুড়ির কথা শুনে মাইরা শেহরানের পাশের চেয়ারটায় বসে পড়লো। একটা প্লেট নিতেই শেহরান খেতে খেতেই মাইরার প্লেটটা হাত থেকে নিয়ে নিজেই খাবার বেড়ে দিলো।
-মাইরা শেহরানের আচরণ দেখে লাজুক হাসলো।
-টেবিলে বাসার সবাই শেহরানের আচরণ দেখে ঠোঁট টিপে হাসলো।
-সবাই যে যার মতো নীরবে খাচ্ছে।
-শাহানা বেগম হালকা কেশে পরিষ্কার করে নিলেন। তারপর মাইরার দিকে তাকিয়ে বললেন, মাইরা, পড়াশোনা তো করতে হবে নাকি?
-মাইরার হাতটা থেমে গেল। অবাক চোখে শাশুড়ির দিকে তাকালো।
-শাহানা মাইরার দৃষ্টিকে উপেক্ষা করে বললেন, কোন কলেজে ভর্তি হতে চাও?
-মাইরা মাথা নিচু করে বলল, আসলে আম্মু, আমি এখনো ঠিক করিনি আমি কোন কলেজে হবো।
-শাহানা বেগম তীক্ষ্ণ চোখে মাইরার দিকে তাকালেন। তারপর বললেন, পড়াশোনা করার ইচ্ছা নেই নাকি?
-মাইরা একটু হাসার চেষ্টা করে বলল, আসলে আম্মু, হয়েছে কি…
-থাক আর কিছু বলা লাগবে না তোমাকে। তোমার মামার থেকে আমি সব শুনেছি। শাহানা বেগম গম্ভীর গলায় বললেন। আমি চাই আমার ছেলের বউ শিক্ষিত হোক। নিজের পায়ে দাঁড়াক।
-মাইরার গলায় ভাত আটকে গেল। শাশুড়ির কথা শুনে কাশতে কাশতে চোখ দিয়ে পানি বেরিয়ে গেল।
-শেহরান পানির গ্লাসটা এগিয়ে দিল।
-আর আমি সবকিছু রেডি করে রেখেছি। তুমি কাল শেহরানের সাথে গিয়ে ভর্তি হয়ে আসবে।
-মাইরা চোখ বড় বড় করে শেহরানের দিকে তাকালো।
-শেহরান মায়ের দিকে তাকিয়ে বলল, আমার সময় নেই। তুমি গিয়ে তোমার বউমাকে ভর্তি করিয়ে এসো।
-শাহানা বেগম গম্ভীর চোখে শেহরানের দিকে তাকিয়ে বললেন,
আমি পারবো না। তোমার বউ, তুমি গিয়ে ভর্তি করিয়ে আসবে।
-আম্মু, তুমি কি বুঝতে পারছ না? আমি ব্যস্ত। কিভাবে কলেজে গিয়ে ওকে ভর্তি করে আসবো? তার থেকে বরং তুমি নিজেই যাও। নয়তো বাবাকে পাঠাও। নয়তো সায়রা গিয়ে ভর্তি করে আসুক।
-সায়রা ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে বলল, আমি পারবো না। তুমি গিয়ে তোমার বউকে ভর্তি করে আসবে।
-শেহরান রাগী চোখে সায়রার দিকে তাকালো।
-সায়রা মাথা নিচু করে খাওয়ায় মনোযোগ দিল। যেন এদিকে সাইক্লোন আইলা বয়ে গেলেও আর মাথা উঠিয়ে দেখবে না।
এমপি শেহরান মির্জা পর্ব ৭
-লীনা মাথা তুলে মাইরার দিকে তাকালো। ঠোঁটের কোণে শয়তানি হাসি নিয়ে বলল, ফুপি, আমি গেলে কি কোন সমস্যা? আমি না হয় মাইরাকে ভর্তি করিয়ে দিয়ে আসবো।
-শাহানা বেগম লীনার দিকে তাকিয়ে গম্ভীর কন্ঠে বললেন, দরকার নেই। তোকে কিছু করতে হবে না। শেহরানই যাবে কালকে।
-শেহরান আর কোন কথা বলল না। জানে এখন কথা বললে কথা বাড়বে। আর যেটা ও চায় না।
-মাইরা মাথা নিচু করে বিড়বিড় করে বলল, আবার পড়াশোনা
