Home কাজলরেখা কাজলরেখা পর্ব ৫৬

কাজলরেখা পর্ব ৫৬

কাজলরেখা পর্ব ৫৬
তানজিনা ইসলাম

মাঝখানে কেটে গেছে কিছুদিন। এই কদিনে চাঁদনী একবারও কলেজে যায়নি। বন্ধুদের সাথেও দেখা হয় না অনেকদিন। তবে আঁধারের সাথে সময়টা মোটামুটি ভালোই কাটছে। হাজার চেষ্টা করেও নিজের সাথে ঘটে যাওয়া অপ্রীতিকর ঘটনাগুলো ও ভুলতে পারছে না; মাঝেমধ্যেই স্মৃতিগুলো মনে পড়ে যায়। মন খারাপ হয়, গ্রাস করে চরম হতাশা। অনেকবার আঁধারকে কথাগুলো বলতে গিয়েও শেষ মুহূর্তে আর বলা হয়ে ওঠে না।
​আঁধারের সাথে ওর বন্ধুদের এক অদৃশ্য দূরত্ব তৈরি হয়ে গেছে। আগে যারা সারাদিন কল করে পাগল বানিয়ে দিত, সেই বন্ধুরাই এখন তিন-চার দিনেও যোগাযোগ করে না। চাঁদনী ভাবে, সব পরিবর্তনই কি এত হুট করে আসে! সবকিছু কেমন অচেনা হয়ে গেছে।

​শাবিহার ব্যাপারটা চাঁদনীকে বড্ড ভাবায়। আঁধারের সব বন্ধু ওকে দেখতে এলেও শাবিহা একবারও এল না। কয়েকবার ওর মাথায় এসেছিল—‘শাবিহাও হয়তো জড়িত ছিল।’ পরক্ষণেই সেই ভাবনা ঝেড়ে ফেলে সে। এমনটা হতে পারে না! মেয়েটা গম্ভীর, হাসে না ঠিকই, কিন্তু ওর সাথে এমনটা করতে পারে না। শাবিহা অতটাও খারাপ না। কয়েকবার ভেবেছিল আঁধারকে জিজ্ঞেস করবে, কিন্তু পরে আর করা হয়নি। কীভাবে করবে? আঁধার সেদিনের পর থেকে ওই বিষয়ে কোনো কথাই বলেনি। চাঁদনীরও খুব সংকোচ হয় নিজ থেকে প্রসঙ্গটা তুলতে। ওর কোনো দোষ নেই, তবুও নিজের সাথে ঘটে যাওয়া ঘটনার কথা ভাবলে একধরণের লজ্জা কাজ করে। শাবিহা যদি জড়িত থাকত, তবে কি আঁধার ওকে ছেড়ে কথা বলত? নিশ্চয়ই না। আঁধারের ওপর এই বিশ্বাসটুকু চাঁদনীর আছে। শুধুমাত্র সত্য কথাটা বলে দেওয়ার অপরাধে অর্পিতার সাথে আঁধার কী করেছিল, তা চাঁদনী নিজের চোখে দেখেছে।

শাবিহাকে কি আঁধার ছেড়ে দেবে? উহু! কখনোই না। যতই কাছের বন্ধু হোক, চাঁদনীর সাথে যে জঘন্য ঘটনা ঘটেছে, তাতে শাবিহা জড়িয়ে থাকলে আঁধার তাকে এত সহজে ছাড়ত না। এটুকু তো অন্তত সে মানুষটাকে চেনে। চাঁদনী সেদিনের পর থেকে আর আগের মতো ত্যাড়ামি করে না। আঁধার কিছু বললে সেটার ভুল ব্যাখ্যা দাঁড় করিয়ে তর্কাতর্কিও করে না এখন আর।বরং আঁধার যা বোঝাতে চায়, চাঁদনী তা বোঝার চেষ্টা করে। ছেলেটা সারাক্ষণ ওর ছায়ার মতো পাশে থাকে। খুব বেশি জরুরি কাজ না পড়লে ইদানীং বাইরেও যায় না সে।
​তবে আজ আঁধার, একদম সাতসকালে ঘুম থেকে উঠেই কোথায় যেন গেছে! যাওয়ার সময় চাঁদনীকে কিছু বলে যায়নি। পরে ফোনে জানিয়েছে, আজ নাকি ওর জন্য একটা সারপ্রাইজ আছে। চাঁদনী সেই সারপ্রাইজের অপেক্ষাতেই প্রহর গুনছে। যদিও সে জানে, আঁধারের সারপ্রাইজগুলো চমকপ্রদ হওয়ার চেয়ে অদ্ভুত হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। এমন সময় আপন সুরে বেজে উঠল কলিংবেল। শব্দটা কানে যেতেই চাঁদনী দ্রুত গিয়ে সদর দরজা খুলে দিল।
দরজা খুলতেই চোখজোড়া স্থির হয়ে যায় ওর, জ্বলজ্বল করে ওঠে মণিদ্বয়। দরজায় আকিব শিকদার দাঁড়িয়ে আছেন। স্নিগ্ধ মুখটায় লেগে আছে স্নেহভরা চাহনি আর মৃদু মিষ্টি হাসি। আঁধারও ওনার পিছু পিছু এসে দাঁড়াল, বেশ উত্তেজিত ভঙ্গিতে বললো

—“চাঁদ, কেমন লেগেছে সারপ্রাইজ?”
​চাঁদনী অবাক হয়ে কথা বলতে পারছে না। মনে হচ্ছে খুব অবিশ্বাস্য কিছু দেখে ফেলেছে সে। আকিব শিকদার মেয়ের অবস্থা বুঝতে পেরে হাসি চওড়া করে বললেন,
—“চলে এসেছি আম্মা।”
​চাঁদনী এখনো ঘোরে আটকে আছে। এখানে সে আকিব শিকদারকে দেখবে, সেটা আশাই করতে পারেনি। তাহলে এটাই ছিল আঁধারের সারপ্রাইজ! চাঁদনী আবেগে আপ্লুত হয়ে ডাকলো,
—“বাবা!”
​কতদিন ধরে দেখে না ও ওর বাবাটাকে! আসার সময় শেষ কথা পর্যন্ত বলে আসেনি। আকিব শিকদার হাত বাড়িয়ে কাছে ডাকলেন চাঁদনীকে। ও ছুটে গিয়ে জড়িয়ে ধরল বাবাকে। তিনি ওকে শক্ত করে ধরে মাথায় চুমু খেলেন। কোমল স্বরে বললেন,
-“তুমি বলেছিলে না,যেদিন আমি পরিবার ছেড়ে আগে তোমার কথা ভাবতে পারব। ওদের ছেড়ে চলে আসতে পারব। সেদিন যেন তোমার সামনে আসি? আমি এসেছি আম্মা। আমি ওদের ছেড়ে চলে এসেছি।”
​চাঁদনীর কানে কথাগুলো অবাস্তব ঠেকায়।ওর বাবা তার প্রিয়র চেয়েও প্রিয় পরিবারকে ছেগে চলে আসবে। এটাও বিশ্বাস করার মতো ঘটনা! অবিশ্বাসের স্বরে উৎকণ্ঠা নিয়ে বললো

—“সত্যি? আমার বিশ্বাস হচ্ছে না বাবা!”
আকিব শিকদার ওর মাথায় হাত বুলিয়ে নরম স্বরে বললেন,
—“একদম সত্যি। আমি ঢাকায় চলে এসেছি। ঢাকায় আমাদের অফিসের যে ব্রাঞ্চটা আছে, সেটা তো এতদিন আঁধার দেখতো। এবার আমিও চলে এলাম ওকে সাহায্য করতে।”
​চাঁদনী মাথা তুললো, ঘাড় বাঁকিয়ে আঁধারের দিকে তাকিয়ে অবাক হয়ে বলল,
—“তুমি তো কখনো বললে না, ঢাকায় শিকদার্স-এর যে ব্রাঞ্চ আছে, সেটা তোমার তত্ত্বাবধানে চলে!”
আঁধার এমন ভাব করলো, যেন এসব নিয়ে আলোচনা করা তার মানহানির সমান। উদাসীন গলায় বললো ও, —“প্রয়োজন মনে হয়নি। এসব বলে কী হবে? আমি চেয়েছিলাম তুই এই ধারণা নিয়েই থাক যে আমি বাবার টাকায় ফুটানি দেখাই।যেটা সবসময় বলে আসতি। আমি চাইনি তোর বক্তব্য বদলে যাক।”
​চাঁদনী রাগ দেখিয়ে বললো,

—“কোনো মানে আছে এসবের? আমাকে বললে কী হতো?আমার এতোদিন, আসলেই মনে হতো, তুমি শুধু শুধু বড়বাবার টাকা উড়াও। কোনো কাজের না।হুহ!”
—“জানি না কী হতো! আমার বলতে ইচ্ছে হয়নি। বোঝাতে গিয়ে এত শব্দ খরচ করার মানে হয় না। যে আমার ব্যাপারে যা ধারণা রাখে, রাখুক। আই ডোন্ট কেয়ার।”
—“হাহ! যখন চিল্লাপাল্লা করো তখন শব্দ খরচ হয় না?”
মেয়েটা ওঁকে কথায় জিততে দেয়নাতর্তাতর্কি করে সবসময়। আঁধার চোখ রাঙিয়ে হালকা ধমকে বললো
—“চুপ!”
​আকিব শিকদার দেখলেন ঝগড়া বেঁধে যাচ্ছে। এই ছেলেমেয়ে দুটো কথায় কথায় ঝগড়া বাধিয়ে দেওয়ার অসীম গুণ নিয়ে জন্মেছে। ওরা সাধারণ কথা বলতে বলতেও বিশ্বযুদ্ধের প্রস্তুতি নিতে শুরু করে। তিনি হাত উঁচিয়ে ওদের ঝগড়ায় বাধা দিয়ে বললেন,
—“হয়েছে, থামো। একটা সাধারণ ব্যাপার নিয়ে ঝগড়া বাধিয়ে দিচ্ছো। এখনো এমন করলে কেমন হবে বল তো? তোমরা কি এখনো ছোট আছো?”
​চাঁদনী মুখ বাঁকিয়ে বলল,

—“আমি তো ছোটই। তোমার ভাইয়ের দামড়া ছেলেটা আমার মতো ছোট বাচ্চার সাথে পাঙ্গা নেয় কেন!”
আঁধার ব্যঙ্গ করে বলল,
—“হ্যাঁ, তুমি আমার লেদা বাচ্চা!”
​চাঁদনী ফের মুখ বাঁকালো, জিভ বের করে ভেঙচিও কাটলো। পরক্ষণে বাবার দিকে তাকিয়ে বললো,
—“তুমি এখন থেকে আমাদের সাথেই থাকবে? এখন থেকে কি প্রতিদিন তোমাকে দেখতে পাব?”
আকিব শিকদার আশ্বস্ত নয়নে তাকিয়ে বললেন,
—“হ্যাঁ, প্রতিদিন দেখতে পাবে। কিন্তু আমি তোমাদের সাথে থাকব না।”
—“কেন? কেন? তাহলে কোথায় থাকবে তুমি?”
আকিব শিকদার বলার আগে, ​পাশ থেকে আঁধার বললো,
—“চাচু ফ্ল্যাট কিনেছে। আমাদের অ্যাপার্টমেন্টের সামনের বিল্ডিংয়ে। আমাদের এখানে ফ্ল্যাট খালি ছিলো না। আমি অনেকদিন ধরে খুঁজছিলাম। চাচু আরও আগেই আসতেন, ফ্ল্যাট পাচ্ছিলেন না বলে আসতে পারেননি। পরে আমিই সামনের বিল্ডিংয়ে ব্যবস্থা করে দিলাম।”
​চাঁদনীর আজ আর কয়টা সারপ্রাইজ পাওয়া বাকি কে জানে! মেয়েটার পিঠপিছে কত কিছু ঘটে যায়, ও টেরও পায় না। এবার ও স্বাভাবিক গলায় বললো,

—“কতদিন ধরে এসব করছো তোমরা?”
—“আমার ঢাকায় আসার পরপরই চাচ্চু জানিয়েছিলেন তিনি এখানে চলে আসবেন, চট্টগ্রামে আর থাকবেন না। তোকে জানানো হয়নি শুধু।”
চাঁদনী অভিমানী স্বরে বলল,
—“অথচ তোমরা একবারও বললে না আমাকে!”
—“আমরা দুজন তোকে সারপ্রাইজ দিতে চেয়েছিলাম। তুই অনেকদিন ধরে মন খারাপ করেছিলি, চাচ্চুর জন্য। ভাবলাম, হুট করে তাকে দেখলে, খুশির পরিমাণ টা বেশি হবে। যদি আগেভাগে জানাতাম, প্রতিদিন প্যানপ্যান করতি তুই, চাচ্চু কখন আসবে! চাচ্চু কখন আসবে! এজন্য ভাবলাম, একেবারে নিয়ে এসে সারপ্রাইজ দিই। তো, বল। সারপ্রাইজ কেমন লাগলো চাঁদ।”
-“বেস্ট।”

​দুপুরে আকিব শিকদার আঁধার আর চাঁদনীর সাথেই খাবার খেলেন। নতুন ফ্ল্যাটে সব গোছানো বাকি। রান্নাবান্নাই বা কে করবে! এখনো তো সার্ভেন্টও ঠিক করা হয়নি। নতুন বাসায় উঠার হাজারটা কাজ। সব তো দুপুরের মধ্যে করা সম্ভব না। আঁধার আর চাঁদনী তাই তাঁকে যেতে দেয়নি। তবে এখনো তার ফ্ল্যাটে, ফার্নিচার সেটআপ করা হচ্ছে। সব ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। সেখানে খাওয়ার মতো অবস্থায় নেই। তবে চাঁদনী, আঁধার আর ওর বাবার সাথে গিয়ে দেখে এসেছে ওর বাবার ফ্ল্যাট। ওর খুব এক্সাইটমেন্ট কাজ করছে মনে মনে। এখনো পর্যন্ত বিশ্বাস হচ্ছে না, ওর বাবা একেবারের জন্য চট্টগ্রাম থেকে ঢাকা চলে এসেছে। আর ফিরবে না। ফিরলেও হয়তো, ওঁদের পড়াশোনা শেষ হওয়ার পর। তবে চাঁদনী জানতে পারেনি, এতো হটকারিতায় ডিসিশন নেওয়ার কারণ কী! ওরা চট্টগ্রাম থেকে ফিরেছে, তেমন বেশি একটা দেরি তো হচ্ছে না।

ওর বাবা আসতে চায়লে তো, ওঁদের সাথেই আসতে পারতো। ওরা আসার একমাস পেরোতেই কেনো তাকে ইমার্জেন্সি আসতে হয়েছে! চট্টগ্রামে সব ঠিক আছে তো! চাঁদনী জিজ্ঞেস করেনি এসব। নিজের মনেই সমীকরণ মেলানোর চেষ্টা করছে। যে কারণেই আসুক। ওর বাবা এসেছে এটাই যথেষ্ট।
চাঁদনী চিন্তায় পরে যায়, ওর বাবা একা ফ্ল্যাটে কী করে থাকবেন? রান্না কে করবে? একটা মানুষ কি একা থাকতে পারে? সবাই তো আর আঁধার না! আঁধার নিজেও তো একা থাকতে পারেনি, বিগড়ে গিয়েছিল। যদিও সৃষ্টিকর্তা ওকে সুবুদ্ধি দিয়েছেন, তবুও ও যে কত কীসে জড়িয়েছিল তা তো বলার অপেক্ষা রাখে না। চাঁদনী আকিব শিকদার থেকে জানতে চেয়েছিলো, সে তো চায়লেই চাদনী আর আঁধারের সাথে ওঁদের ফ্ল্যাটে থাকতে পারে। সেখানে ওনাকে আবার আলাদা ফ্ল্যাট কিনতে হবে কেনো। উনি জানিয়েছেন, এটাও একপ্রকার চাঁদনীর শ্বশুরবাড়ি। কথাটা ঠিক শ্বশুর বাড়ি নয়। স্বামীর বাড়ি। মেয়ে আর মেয়ের জামাইয়ের সাথে এক ফ্ল্যাটে কী করে থাকবেন তিনি! এ ভারী লজ্জার বিষয়। চাদনী বলার আগেই আঁধার একমাস আগে বলে রেখেছিলো ওঁদের সাথে, ওঁদের ফ্ল্যাটে থাকতে। আকিব শিকদার মানেনি।
আকিব শিকদার টেবিলে নানাপদ দেখে অবাক হয়ে বললেন,

—”এতোসব কে রান্না করেছে? কুক আছে কোনো?”
—”আছে। বাট এসব আমি রান্না করেছি।” আঁধার উত্তর দিলো।
—“আঁধার, তুমি রান্না করেছ সব?”
আঁধার গাছাড়া ভাব নিয়ে, মৃদু কণ্ঠে বলল,
—“হ্যাঁ, কয়েকটা ডিশ মাত্র। খুব বেশি তো না।”
—“তারপরও! অনেক বেশি। চাঁদ রান্না করেনি?ও তো রান্না পারে, যতোটুকু আমি জানি। শিকদার বাড়িতে থাকতে, টুকটাক অনেক রান্না করতো ও।”
​চাঁদনী তরতরিয়ে বলে,
—“পারি তো বাবা। আঁধার ভাই তো কিচেনে যেতে দেয় না।”
আকিব শিকদার চাঁদনীর থেকে চোখ সরিয়ে আঁধারের দিকে তাকালেন,
—“কেন আঁধার? আম্মাকে কিচেনে যেতে দাও না কেন? শিকদার বাড়িতে থাকতে ও রান্না করতে খুব ভালোবাসতো। বড় ভাবি ওঁকে সবকিছু শিখিয়েছিলো!”

—“কিচেনে কাজ করার দরকার কী? দুজন সার্ভেন্ট আছে, সব কাজ ওরাই করে ফেলে। আমার রান্না করতে ইচ্ছে হলে করি, কিন্তু চাঁদনীকে এসব করতে দেওয়া যাবে না। এতে ওর পড়াশোনার ক্ষতি হবে। মনোযোগ রান্নাবান্না আর ঘরদোরে চলে গেলে পড়াশোনায় বসবে না। আমি শুধু চাই ও পড়াশোনাটা ভালো করে করুক। তোমার মেয়ে তো সেটাও করে না!”
​আকিব শিকদারের বেশ ভালো লাগলো কথাগুলো। মিষ্টি হেঁসে বললেন,
—“তাই? ও কী করে?”
আঁধার চেয়ার টেনে বসলো এবং অভিযোগের সুরে বলল,
—“সারাদিন মোবাইল নিয়ে বসে থাকে। রাখতে বললেও রাখে না। আমার একটা কথাও শোনে না।”
আকিব শিকদার মেয়ের দিকে তাকালেন। ও পাশে বসে কটমট করে আঁধারের দিকে তাকিয়ে আছে। সে দৃশ্য দেখে মনে মনে হাসলেন তিনি। মুখে মেকি রাগ চেপে বললেন,
—“এমন করা কি ঠিক চাঁদ? আঁধার তোমার বড় না?
ফের আঁধারের দিকে তাকিয়ে বললেন

—“মেয়েদের, সংসারে এসব করতে হয়। চাঁদনী, না পারলে একটা কথা ছিলো। কিন্তু আমার মেয়ে ছোটবেলা থেকে সবকিছু শিখেছে। তুমি নিজেও জানো। রান্না করাটা বড় কোনো ব্যাপার না। তুমি ওঁকে কিচেনে যেতে না দিলে, ওটা আমার জন্য আরো খুশি। আমি আমার মেয়েকে পুতুলের মতো বড় করেছি। ও পুতুল হয়েই আছে। তবুও সংসার করা শিখতে হয়। এখানো ওর শ্বাশুরি বা ওর মা নেই। যে ওঁকে শেখাবে। ওর সব নিজে নিজেই শিখতে হবে।”
​আঁধার কপালে ভাজ ফেলে তাকালো। উদগ্রীব হয়ে বললো
—“ওর সংসার করার বয়স হয়নি। তোমরা বিয়ে দিয়েছ বলেই যে ও বড় হয়ে গেছে, এমন তো না।”
ওঁদের এসব কথার ধার ধারল না চাঁদনী। ওর মনে অনেকটা সময় ধরে একটা প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে।ও নিজের প্রশ্ন নিয়ে বললো

—“রাখো তোমরা এসব। আমার কথা শোনো। বাবা একা ফ্ল্যাটে কী করে থাকবে?”
আঁধার শয়তানি হাসি দিয়ে বললো,
—“ভাবছি চাচ্চুর জন্য একটা বউ নিয়ে আসব। সরি চাচ্চু না, শ্বশুরবাবার জন্য একটা শাশুড়ি মা নিয়ে আসব। কেমন হয় বিষয়টা?”
​আঁধার ভেবেছিল বাবা আর মেয়ে দুজনেই খেপে যাবে। আকিব শিকদার চোখ ছোট করে তাকালেও চাঁদনী সম্মতি দিয়ে বললো
—“ভালোই হয়।”
—“তুই বলছিস এই কথা?”
—“হুম। বাবা একা একা কী করে থাকবে? বাবাকে দেখে রাখার জন্য একজন মানুষ দরকার।”
​ওদের দুজনের এই উদ্ভাসিত নয়নে তাকিয়ে থাকা দেখে আকিব শিকদারের রাগ লজ্জার সংমিশ্রনে গাল আর চোখ লাল হয়ে উঠল। ধমকে বললেন

—”লজ্জার মাথা খেয়েছো তোমরা? বাবা হই আমি তোমাদের। আমার বিয়ে নিয়ে গসিপ করার কথা তোমাদের?”
আঁধার সেটা খেয়াল করে বলল,
—“আরে, তুমি রেগে যাচ্ছ কেনো? ট্রাস্ট মি চাচ্চু, একা থাকা খুব কষ্টের। আমি চারটা বছর একা ছিলাম, আমি জানি। তোমরা আমার কথা ভাবোনি, কিন্তু দেখো আমি তোমার কথা ভাবছি।তোমার একজন সঙ্গী খুব দরকার। আমি ভালো পাত্রীই জোগাড় করব, বিশ্বাস রাখো আমার ওপর।”
—“মার খাবি আমার হাতে! এতগুলো বছর একা থেকেছি, শেষ সময়ে এসে কাউকে লাগবে কেন?”
আঁধার রসিকতা করে বলে উঠল,
—“তুমিই না বলো, মনে মনে তুমি এখনো ইয়াং!”
আঁধারের মুখ থেকে হাসি সরে না। আকিব শিকদার বললেন
—ফালতু কথা রাখো। বিয়ে করতে হলে, অনেক বছর আগেই করে নিতাম। এতোগুলো বছর একা থাকতে পেরেছি, চাঁদনীকে একা বড় করতে পেরেছি। এখন একা ফ্ল্যাটে থাকতে পারবো না! এটা কে বললো তোমাদের? সমস্যা হবে না আমার। বেশিরভাগ সময় এখানেই খেয়ে যাবো।”
আঁধার পাংশুটে বললো

—” আমার তো সমস্যা হবে চাচ্চু। তোমার না হলেও। তোমার বলদ মেয়েটা সারাদিন তোমার কাছে গিয়ে বসে থাকবে।এদিকে আমি একা হয়ে যাবো। পারলে আমিও গিয়ে বসে থাকবো তোমার কাছে। ব্যালেন্স থাকছে না তো। সবদিকে মেইনটেইন করতে হবে আমাদের। তোমার জন্য বউ নিয়ে এলে, সে তোমার খেয়াল রাখবে। চাঁদ সারাক্ষণ চিন্তায় থাকবে না। ওখানে গিয়ে বসেও থাকবে না।মূলত তোমার চেয়েও বেশি আমি নিজের কথা ভাবছি। একটা মেয়ে দেখি। সরি, মহিলা। মহিলা দেখি একটা!”
আকিব শিকদার ভয়ঙ্কর দৃষ্টিতে তাকালেন। আঁধার চুপ করে গেলো।

​রাত চট্টগ্রামে ফিরে গেছে। তবে যাওয়ার আগে বাড়ির সবাইকে জানিয়ে গেছে যে সে শাবিহার বিয়ে ঠিক করেছে তার পছন্দের এক পাত্রের সাথে। সাদিক এহসান দ্বিমত করেননি। কবিতা এহসান সরাসরি কিছু না বললেও ওনার বিশ্বাস, রাত শাবিহার জন্য ভালো কাউকেই খুঁজবে। তবুও হ্যাঁ, না বললেন না কারণ রাত বলেছে। রাতের সাথে ওনার কীসের যেনো এক দ্বন্দ্ব।রাতকে উনি কিছু বলেন না। রাতও ওনাকে, কখনো অসম্মান করে না। তবুও কীসের যেনো এক চোখে চোখে শত্রুতা থেকেই যায়। কিন্তু শাবিহার অবস্থা ভালো না। সে সারাক্ষণ ঘরে বসে থাকে।উনি যখন জিজ্ঞেস করেছেন শাবিহা রাজি কি না, সে বলেছে—“ভাইয়া যা ভালো বোঝে।”

শাবিহা সচরাচর এমন নয়। সে অন্যের সিদ্ধান্তে নিজের জীবন চালায় না। রাজি থাকলে সরাসরি ‘হ্যাঁ’ বলত, না থাকলে রাতকেই ‘না’ করে দিত। ওনাদের কানে কথাটা আসতেই দিতো না। শাবিহা নিজের সিদ্ধান্তে জীবন চালায়। নিজে যা ভালো বোঝে। উনি কথার মিল পাচ্ছেন না। শাবিহার অবস্থা ভালো ঠেকছে না৷ ওনার কাছে।
​শাবিহা পাংশুটে মুখে বসে আছে। বিরক্তিতে ওর সর্বাঙ্গ জ্বলে যাচ্ছে। ওর কোনো অনুশোচনা নেই, আছে শুধু রাগ। সব রাগ গিয়ে পরছে চাঁদনীর ওপর। প্রথমে ও ভালোবাসার মানুষকে কেড়ে নিল, নিজের ভাইকে পর্যন্ত ওর বিরুদ্ধে করে দিল, বন্ধুদের সাথে দূরত্ব তৈরি করল। হাঁটুর বয়সী একটা মেয়ের এত ক্ষমতা! ওর বিয়ে পর্যন্ত ঠিক হয়ে গেছে। শাবিহা জ্বলে পুড়ে অঙ্গার হয়ে যাচ্ছে। সেখানে চাঁদনী এতো নিশ্চিন্তে কী করে! শাবিহা এত সহজে ছাড় দেবে না। শোধবোধ করা যখন শুরু করেছে সে, তখন এর শেষটাও সে-ই করবে। সেদিন ওর সীমাবদ্ধতা ছিল যাতে কেউ ওকে খারাপ না ভাবে, আঁধারের চোখে যেন ও নিচে না নামে। এখন তো আর সেই দায়বদ্ধতা নেই। আঁধার নিজেই তো বন্ধুত্ব ভেঙে দিয়েছে! ও নেমে গেছে আঁধারের চোখে। আগের সে সম্মান ফিরে পাওয়া সম্ভবও না। তাই ওর কোনো বাঁধা নেই। এবার যা করবে ও সামনাসামনি করবে। পরোক্ষভাবে না। আঁধার প্রমাণ ছাড়া দোষারোপ করেছে তো ওঁকে। এবার আঁধারের কাছে প্রমাণ থাকবে, তবুও ও শাবিহার কিছু করতে পারবে না।

শাবিহা দ্রুত তটিনীকে কল করলো। তটিনী রিসিভ করতেই কোনো হাই, হ্যালো ছাড়া গড়গড়িয়ে বললো
-“তুই কী চাঁদনীকে এখনো পড়াস? ওঁর টিচার ছিলি না তুই?”
কলের অপরপ্রান্তে থাকা তটিনী অবাক হলো ভীষণ। বিয়ে ঠিক হওয়ার পর থেকে শাবিহা বড্ড পাগলামো করছে। এই মেয়ে আবার চাঁদনীর কথা জিজ্ঞেস করছে কেনো! আবার কী করবে ও। তটিনী বললো
-“হুম। পড়াই তো। হঠাৎ, ওর কথা জিজ্ঞেস করছিস যে?”
-“ওর কলেজে যাবো।তুই যাবি আমার সাথে?”
-“কেনো? ওর কলেজে কেনো যাবি?”
-“এমনিই। ওঁকে দেখবো। ওর এতো অসুস্থতায়ও ওঁকে দেখতে যাইনি। আঁধার যতোই আমাকে ব্লেইম করুক। আমি তো মনুষ্যত্ব ভুলতে পারি না। আমি তো জানি আমি কিছু করিনি। চাঁদনীর সাথে কথা বলবো।”

-“আঁধারের ফ্ল্যাটে চল। কলেজে কেনো?”
-“আত্মসম্মান নেই আমার? বন্ধুত্ব ভেঙে দিয়েছে ও৷বেহায়ার মতো আবার যাইতাম?”
শাবিহা কিছুটা চিল্লিয়ে বললো। তটিনী কিছু বলতে পারলো না। শাবিহা নিজেকে সামলে বললো
-“কালকে ওঁদের কলেজে যাবো কেমন!”
-“চাঁদনী তো মনে হয়, এখন কলেজে যাচ্ছে না। ওর সামরে ফার্স্ট ইয়ার ফাইনাল এক্সাম।”
-“আমাকে একটু খোজ নিয়ে দিবি, ও কোনদিন কলেজে যাবে! ছুটির পর দেখা করবো ওর সাথে। কথা আছে।”
-“ঠিক আছে। আমি জেনে, তারপর জানাবো। আমি যাবো তোর সাথে।”
-“আচ্ছা।”

কাজলরেখা পর্ব ৫৫

শাবিহা কল কেটে দিয়ে কিছুক্ষণ পাথরের মতো বসে থাকলো। ও যখন অশান্তিতে আছে, ও চাঁদনী কেও শান্তিতে থাকতে দেবে না। চাঁদনীর সব শান্তি ও নিজেই শেষ করবে। আঁধার বন্ধুত্ব ভেঙে ঠিক করলো না। এ বিষয়টা খুব সেন্সিটিভ ছিলো৷ বন্ধুত্বে আঘাত আনা উচিত হয়নি। এ সম্পর্কটা কে শাবিহা খুব ভালোবাসতো। বন্ধু হিসেবে আঁধার, ওর প্রেমিক আঁধারের চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ ছিলো। প্রেমিক হারিয়ে যাওয়ার পর শাবিহা এতোটাও পাগলামি করেনি।কিন্তু বন্ধুত্ব ভেঙে যাওয়ার পর সবকিছুতেই সেন্সিটিভ আচরণ করছে ও।আধার, এতোদিন ওর বন্ধু শাবিহা কে দেখেছে। এবার যখন ও, খারাপ হয়েই গেলো একবার। এখন শাবিহা জঘন্য হয়ে দেখাবে। আঁধার, শাবিহার খারাপ সাইড নিতে পারবে না।

কাজলরেখা পর্ব ৫৭

2 COMMENTS

  1. আলহামদুলিল্লাহ 😮‍💨 যা কাকু অবশেষে একটা পর্ব দিলেন প্লিজ আপু বাকি পর্বগুলো তাড়াতাড়ি দিয়ে দেন না 🙏🥺

  2. ইশ এতদিন কি ওয়েট করা যায় । একটু তাড়াতাড়ি দেওয়ার চেষ্টা করবেন প্লিজ ।

Comments are closed.