কাজলরেখা পর্ব ৫৭
তানজিনা ইসলাম
আজ ফার্স্ট ইয়ারের শেষ ক্লাস। দেখতে দেখতে একটা বছর চোখের পলকে চলে গেলো।চাঁদনী অনেকদিন কলেজে আসেনি। লম্বা একটা গ্যাপ পরে গেছে ওর৷ তবে বাড়িতে বসে, ফাইনালের জন্য ভালোই প্রিপারেশন নিয়েছে ও। তটিনী ওঁকে পড়াশোনার পাশাপাশি সব রকমের হেল্প করেছে। নিজের বড় বোনের মতো। চাঁদনীর আজও কলেজে আসার কথা ছিলো না। ভেবেছিলো, একেবারে এক্সাম দিতে আসবে। গ্যাপ পরার কারণে প্রিন্সিপালকে অ্যাপ্লিকেশন তো দিতেই হবে। আর একদিন এসে কী করবে ও! এমনিতেও আঁধার কলেজে এসে সব সামলে নেয়। ওঁকে এসব নিয়ে ভাবতে হয় না। কিন্তু হাসনার কল পেয়ে চলে এসেছে ও। ফার্স্ট শেষ ক্লাস। সেকেন্ড ইয়ারে উঠলে, ক্লাস চেঞ্জ হয়ে যাবে। ওঁদের এতো এতো স্মৃতি। শেষদিন এসে সেলিব্রেট না করলে, কেমন করে হয়।
চাঁদনী চলে এসেছে কল পেয়েই। এই তো সেদিন মনে হয়, চাঁদনী ওঁদের সাথে পরিচিত হয়েছিলো। একটা বছর কাটিয়েও ফেললো। এই চারজনই আছে ওর। বাকিদের সাথে ভদ্রতার খাতিরেও কখনো কথা হতো না ওর। যেহেতু এটা শেষ ক্লাস, বেশিরভাগ স্টুডেন্টই উপস্থিত হয়েছে। ক্লাসের সব বেঞ্চ ভর্তি স্টুডেন্ট, গিজগিজ করছে। সচারাচর এতো এটেন্ডেন্স দেখা যায় না। রেহান চাঁদনীর সাথে তেমন একটা কথা বলছে না। কেমন যেনো এড়িয়ে চলছে ওঁকে। চাঁদনী মন খারাপ করে অনেকবার জিজ্ঞেসও করতে চেয়েছিলো, ছেলেটা এমন কেনো করছে ওর সাথে! অথচ ওদের বন্ধুমহলের সবচেয়ে উৎফুল্ল ছেলেটা রেহান। চাঁদনীর সাথে কথা বলতে দৌড়ে দৌড়ে আসে। চাঁদনী আসলে, যেমন ভাবছিলো ব্যাপারটা তেমন না। রেহানের লজ্জা লাগছিলো, ওর সাথে কথা বলতে। চাঁদনী জানেনা, কিন্তু রেহান তো জানে শাবিহা কি করেছে! প্রমাণ নেই, কিন্তু ওই যে কাজটা করেছে সেটা রেহান জানে। যার বড় বোনের জন্য চাঁদনী এতোবড় একটা ক্ষতির হাত থেকে বেঁচেছে, তার সাথে কী করে কথা বলবে চাঁদনী! স্বাভাবিক ব্যবহারটা কেনো যেন ভেতর থেকে আসছে না।
চাঁদনী অন্যমনস্ক হয়ে দাঁড়িয়ে ছিলো, শহিদ মিনারের সামনে। ওঁদের ছুটি হয়ে গেছে একটু আগেই৷ রেহান আর সিয়াম ওঁদের রেখে চলে গেছে। বৃষ্টি আর হাসনা ক্লাসে গেছে, কোনো একটা কাজে। চাঁদনী যায় নি। ওর আর সিড়ি বইতে ইচ্ছা করছে না। আজকের দিনটায় অনেক দৌড়াদৌড়ি হয়ে গেছে। শক্তি নেই আর।
-“হেই।” চমকে তাকালো চাঁদনী। তটিনী এসেছে। হাসছে ওর দিকে তাকিয়ে। তটিনী কে দেখেই ঠোঁটের হাসি বিস্তৃত হলো ওর। উৎফুল্ল হয়ে ডাকলো
-“আপু। তুমি এখানে?”
-“তোমার সাথে দেখা করতে এসেছি। তোমার তো আজকে শেষ ক্লাস।”
-“হ্যাঁ।”
-“দেখো, শাবিহাও এসেছে দেখা করতে তোমার সাথে।”
শাবিহা পিছু পিছু হেঁটে এলো। চাঁদনীর ঠোঁটের হাসি মিইয়ে গেলো। শাবিহাকে ওর ভয় লাগে। কেমন যেনো মেয়েটা! ওর মনে হয়, চুপচাপ মানুষরা নিজেদের মধ্যে অনেককিছু লুকিয়ে রাখে। শাবিহা হেঁসে বললো
-“অবাক হলে, মনে হচ্ছে।কেমন আছো? তোমাকে সেদিন দেখতে যেতে পারিনি। আজ দেখতে এসেছি।”
-“ভালো আপু।” নরম স্বরে উত্তর করলো চাঁদনী।
-“একটু অবাক হয়েছি। আপনি রেহানকে নিতে এসেছেন? ও তো সিয়ামের সাথে চলে গেছে।”
-“নাহ। রেহানকে নিতে আসিনি। আমার কাজ তোমার সাথে। ওর সাথে কিছু নাই।কিছু টিপস নিবো তোমার থেকে, তারপর চলে যাবো।”
চাঁদনী কপালে ভাজ ফেললো।বললো
-“কীসের টিপস!”
-“আগে বলো, এতোটা শুকিয়ে গেছো কেনো? আঁধার যত্ন নেয় না?”
চাঁদনী অবাক হলো ভীষণ। শাবিহার থেকে এ প্রশ্নটা আশা করেনি ও। ও কয়েকদিন ধরে অনেক কম খাচ্ছে। এমনিতেও কম খায়। কিন্তু পরীক্ষার চিন্তায় খাওয়াদাওয়া, ঘুম, বিশ্রাম এসব ঠিকঠাক হচ্ছিলো না। আঁধার বাচ্চার মতো যত্ন নেয় ওর। ও বলতে গেলাে সেটা। আবার কথা ঘুরিয়ে বললো
-“এক্সামের জন্য একটু চিন্তা হচ্ছে। আর রুটিন দেওয়ার পর থেকে খাওয়া, ঘুম ঠিকমতো হচ্ছে না। এজন্য হয়তো।”
-“আরো কতো কিছুর চিন্তা করতে হয় তোমাকে। কীভাবে একটা মানুষের খুব প্রিয় মানুষকে কেড়ে নিবা। স্মুথলি ভিক্টিম কার্ড প্লে করবা। নিজেকে সতীসাবিত্রী প্রমাণ করার জন্যও তো অনেক কসরত হয়। কী করে করো বলোতো। টিপস দাও না।”
শাবিহার পাংশুটে মুখ। কিন্তু গলার স্বর একদম স্বাভাবিক। চাঁদনী হতভম্ব হয়ে চায়লো। তটিনীও অবাক হলো ওর মুখ থেকে এসব কথা শুনে। শাবিহা তো বলেছিলো, ওর চাঁদনী কে দেখতে ইচ্ছে করছে। মেয়েটা কেমন আছে, ভালোমন্দ জিজ্ঞেস করবে সরাসরি। এসব কী বলছে ও?
তটিনী শাবিহার হাত ধরে বললো
-“কী বলছিস! পাগল হলি?”
চাঁদনী অস্থির স্বরে বললো
-“বুঝিনি।”
-“বুঝোনা? না, নাটক মারাও, কোনটা? তোমাদের মতো মেয়েগুলারে ভালোই চেনা আছে আমার। ছেলেদের কীভাবে ফাঁদে ফেলে, নিজের পক্ষের করতে হয়, সেসব ভালোই জানো। এই বয়স থেকেই এসব! আরেকটু বড় হলে কী করবা?”
-“কী বলছেন, জানেন আপনি?”
চাঁদনীর গলার স্বর উচ্চ হলো। শাবিহা চোখ পাকিয়ে, দাঁতে দাঁত চেপে বললো
-“জানি আমি। ভালো করেই জানি। তোর মতো মেয়েরা যে কতো বড় বেহায়া, নির্লজ্জ হয়- সেটা ভালো করেই জানা আছে আমার। আরেকজনের ভালোবাসার মানুষকে কেঁড়ে নিয়ে তোরা কী পাস! আবার ভিক্টিম কার্ডও প্লে করিস।”
শাবিহা তুই তোকারি শুরু করলো৷ চাঁদনী স্তব্ধ হয়ে দেখলো শাবিহার ব্যবহার। ও এই শাবিহাকে চিনতে পারলো না। সবসময় নরম, গম্ভীর স্বরে কথা বলা মেয়েটা আর এ মেয়েটার মাঝে বিস্তর ফারাক আছে। শাবিহা চেঁচিয়ে বললো
-“আঁধার কে কেড়ে নিয়েছিস তুই আমার থেকে৷ আমার ভালোবাসাকে আলাদা করে দিয়েছিস আমার থেকে। এতো কিছু হয়ে যাওয়ার পরও, ওর এতো অপমানের পরও তুই ওঁকে ছাড়লি না। এখানেই বোঝা যায় তুই কতো বড় বেহায়া! তোর কোনো আত্মসম্মান নাই। মেয়ে জাতির কলঙ্ক তুই।”
আত্মসম্মান নিয়ে কথা বলায় চাঁদনীর গায়ে লাগলো খুব। রেগে বললো
-“মুখ সামলে কথা বলেন আপু। আমি কী করেছি? আমি কাওকে কাড়িনি। সে আপনাকে এতো ভালোবাসলে, আমি কে হই আপনাদের মাঝে আসার!”
-“তুই অনেক ছল ছাতুরি জানিস বুঝেছিস। আমি দেখি নাই, প্রথম থেকে আঁধার কতোটা বিরক্ত ছিলো তোকে নিয়ে! না পারতে থাকছে ও তোর সাথে। এতোকিছু হওয়ার পরও তুই ওর জীবন ছেড়ে গেলি না। ও কখনোই তোকে ভালোবাসে নাই।”
-“ও তাই? সে কাকে ভালোবাসছে? আপনাকে? তাহলে সে, আপনাকে রেখে গ্রামে চলে গেলো কেনো? কেনো আপনার কথা একবারও ভাবলো না? এতো ভালোবাসে আপনাকে, এতো ভালোবাসা অথচ ঠিকই আরেকজনকে বিয়ে করতে চলে গেলো। এমন ভালোবাসার জন্য লড়তে আসছেন আপনি আমার সাথে!কথা শোনাচ্ছেন! ভুল করছেন শাবিহা আপু। সে আপনাকে কখনোই ভালোবাসে নাই। হ্যাঁ, অতীতে অনেক কিছু হয়েছে। এর জন্য সে অনেকবার অনুতপ্ত হয়েছে আমার কাছে। ক্ষমা চেয়েছে৷ আপনাকে এতো ভালো বাসলো আমাকে তো বলতোই তার জীবন থেকে চলে যেতে। আমি নিজে চলে যেতাম। সে আমাকে বোঝা ভাবলে, তার জীবনে আমাকে আটকে রাখতো না। আমাকে বেহায়া বলছেন, অথচ বিবাহিত একটা ছেলের জন্য কান্নাকাটি করছেন। এটা আপনার কেমন আত্মসম্মান? আসলে আমাকে যেসব কথা বলছেন, সেসব আপনিই। আপনার আত্মসম্মান নেই তাই আমাকে বেহায়া বলছেন আপনি।”
শাবিহা চাঁদনীর গালে চড় বসাতে গেলো। তটিনী হাত ধরে ফেললো ওর। শাবিহা ছাড়িয়ে নিলো ওর হাত।
ধাক্কা বসালো চাঁদনীর গায়ে। চাঁদনী দুপা পিছিয়ে গেলো। পরতে পরতে সামলালো নিজেকে। শাবিহা রাগে কাপছে। বারবার তেড়ে আসছে চাঁদনীর দিকে।
হাসনা আর বৃষ্টি এসে দেখলো জটলা বেঁধেছে। দু’টো মেয়ে দাঁড়িয়ে আছে, চাঁদনীর সামনে। সেখানে একজন রেহানের বোন। হাসনা দৌড়ে এলো৷ চাঁদনীকে ধরে চেঁচিয়ে বললো
-“এমন করছেন কেনো আপনি?
শাবিহা নিজের মতো বললো
-“আরেকজনের জিনিস কেঁড়ে কি শান্তি পাস? তোদের মতো মেয়েদের ভালোমতো চেনা আছে আমার। ছেলে দেখলেই তোদের শুরু হয়ে যায়, ভিক্টিম কার্ড প্লে করা।
চাঁদনী ভঙ্গুর গলায় বললো
-“ভালো করছেন না এসব। সে আপনাকে কখনোই ভালোবাসেনি। মেনে নিন। কেনো মিথ্যে অহং ধরে বসে আছেন! মরিচীকার পেছনে ছুটবেন না আপু।”
-“তোরে ভালোবাসে? সে হিসেবে তো তোকেও ভালোবাসে না। তোকে ভালোবাসলে তো আমাকে কিছু হলেও বলতো। তোর এতোবড় ক্ষতি করতে চাইলাম আমি। তোকে তিন তিনটা ছেলের হাতে ছেড়ে দিলাম। তোর সম্মান শেষ করে দিতো ওরা। এতোসব জানার পরও আঁধার আমাকে কিছু বলেনি।”
চাঁদনী যথাসম্ভব নিজেকে শান্ত রাখার চেষ্টা করে বললো
-“মিথ্যে বলবেন না আপু। আমি চিনি তাকে। আপনার চেয়েও বেশি। যদি আমার ক্ষতি করার পেছনে আপনার হাত থাকতো। সে সেদিনই আপনার সাথে সব সম্পর্ক শেষ করে দিতো। কিছু না অনেক কিছুই বলতো আপনাকে।”
শাবিহা দমলো না। রাগে কিড়মিড়িয়ে বললো
-“তোর জামাই আমারে কিচ্ছু বলে নাই। আমাদের বন্ধুত্ব আগের মতোই আছে। রিক শাস্তি পেলেও আমার কিছুই হয়নি। আমাকে একটা উচ্চ বাক্য পর্যন্ত বলেনি ও। দেখেছিস, তোর অবস্থান টা কোথায়! তারপরও বলবি, তুই গুরুত্বপূর্ণ। তোরে ভালোবাসে। তুই জিজ্ঞেস করিস আঁধার থেকে। আমারে কিছু বলছে কি-না। একটা ফুলের টোকাও দেয় নাই। অথচ পুরো ঘটনা ও জানতে পেরেছিলো। রিকের সব কারসাজির পেছনে আমার ইন্ধন ছিলো।”
চাঁদনীর অবিশ্বাস্য দৃষ্টি। ঠোঁট তিরতির করে কাঁপছে কিছু বলার জন্য। শাবিহা ওর আওয়াজ বন্ধ করে দিয়েছে।
-“তুই ওর কাছে কোনো মাইনে রাখিস না বুঝেছিস। আরে তোর এতো বড় ক্ষতি করতে চেয়েছি আমি। তোর ইজ্জত, সম্মান সেখানেই শেষ হয়ে যেতো। সমাজের চোখে কলঙ্কিত হয়ে বাচতি সারাজীবন।এতো কিছুর পরও আঁধার আমার সাথে বন্ধুত্ব ভাঙলো না। এতো বড় বড় যে কথা বলছিস। তোদের এই নাম মাত্র বিয়ে থেকে, আঁধারের কাছে আমাদের বন্ধুত্ব বেশি গুরুত্বপূর্ণ। চলে যা ওর জীবন থেকে। আর কতো বেহায়ার মতো পরে থাকবি!”
আশেপাশে কিছু স্টুডেন্ট, ওঁদের গার্ডিয়ানরা দাঁড়িয়ে আছে। সবাই দেখছে ওঁদের। মজা নিচ্ছে চাঁদনীর অপমানের। বাঙালি এসব জটলা, ঝামেলা ভালোই পছন্দ করে। চাঁদনী বলতে পারলো না কিছু শাবিহাকে। ও পাথর হয়ে দাড়িয়ে থাকলো।
কাজলরেখা পর্ব ৫৬
তটিনী থামাতে পারলো না শাবিহাকে। ওর মুখে যাই আসলো তাই বলে গেলো ও চাঁদনী কে। তটিনী টেনে নিয়ে গেলো শাবিহাকে। শাবিহা চিল্লাতে থাকলো, ছাড় আমাকে। আমার কথা শেষ হয়নি। যেতে যেতেও অনেক কিছু বলে গেলো চাঁদনীকে।হাসনা ধরে আছে চাঁদনীকে।
চাঁদনীর ঝাপসা দৃষ্টিতে শুধু দেখলো, শাবিহাকে তটিনী টেনে নিয়ে যাচ্ছে।

আরে আপু প্লিজ আপু একটা একটা পর্ব কতবার দিবেন কয়েকটা বড় একসাথে দেন আপু প্লিজ আপু একটু বোঝেন না আপু প্লিজ আপু পরে পাট গুলা তাড়াতাড়ি দিয়ে দেন আপু আমাদের ধৈর্যটা ভেঙে যাচ্ছে আপু
আরে আপন নেক্সট পার্ট দেন না প্লিজ🙏🥺
আপু পরের পাট টা দেন