Home কার্নিশে আলতা মাখানো কার্নিশে আলতা মাখানো পর্ব ১৭

কার্নিশে আলতা মাখানো পর্ব ১৭

কার্নিশে আলতা মাখানো পর্ব ১৭
তন্ময়ী তিতিক্ষা

ছোট্ট রান্নাঘরটায় টুকটাক শব্দ উঠছে।আর্শি দাঁড়িয়ে ঠিক রান্নাঘরের মাঝে। জায়গাটা ছোট, হাত বাড়ালেই দেয়ালে ছোঁয়া যায়। তবুও আর্শির চলাফেরায় বিন্দুমাত্র অসুবিধা হচ্ছে না। বরং যেন অদ্ভুত এক আপন অনুভূতি ঘিরে ধরেছে তাকে।হালকা একটা নিঃশ্বাস ফেলল আর্শি।
“কি রান্না করা যায়?”

নিজের সাথেই বিড়বিড় করে উঠল আর্শি। সবকিছু ঘেটে ঘুটে দেখে নিল। আযরান বাজার করেছে ঠিকই তবে বেশি কিছু হয়তো নিয়ে আসতে পারেনি। কোনোমতে যা পেরেছে এনেছে।কিছু না পেয়ে শেষমেশ আর্শি ঝুড়ির ভেতর থেকে দুটো আলু আর তিনটা ডিম বের করল। ঠোঁটের কোণে এক চিলতে হাসি ফুটে উঠল নিমিষেই। পুনরায় বিরবির করে বলে উঠল,
“চল আর্শি, আজ তোর প্রথম সংসার শুরু হোক আলুভাজি আর ডিম দিয়ে..”
নিজেই নিজের কথায় হালকা হেসে ফেলল। আর দেরি না করে ঝটপট রান্না করতে শুরু করল। রান্না প্রায় শেষের পথে। আলুভাজির ঘ্রাণ চারদিকে ছড়িয়ে পড়তেই আর্শির নিজেরই খিদে পেয়ে গেল। পেটে যেন ইঁদুর ছুটোছুটি করছে। পেটে একবার হাত বুলাতেই রান্নাঘরের দরজার পাশে ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা আযরানের কণ্ঠ ভেসে এলো,
“হাত বুলাচ্ছিস যে বরং? বাবা টাবা হবো নাকি?”
আর্শি চমকে উঠল। আযরানের কথায় ঝটপট হাত নামিয়ে ফেলল পেট থেকে। পরক্ষণেই কটমট করে চাইল আযরানের পানে। কন্ঠে তেজ মিশিয়ে হলে উঠল,
“উল্টো পাল্টা কথা বলবি তো এই খুন্তি দিয়ে পিটিয়ে সোজা করে দিবো।”
“আয় সোজা কর।”

কথাটা বলেই জোড়ালো কদমে এগিয়ে এলো আযরান। আর্শি অতি নিকটে গাঁয়ের সাথে গাঁ লাগিয়ে আর্শির উঁচিয়ে রাখা হাতটা বন্দি করে ফেলল। আকস্মিকতায় আর্শি ভরকাল। আযরানের কান্ডে অবাকের চরম পর্যায়ে পৌছে গেল। পিছনে একবার মাথা ঘুরিয়ে দেখে নিলো। না! যাওয়ার কোনো জায়গা নেই। পুনরায় মাথা ঘুরিয়ে ভ্রুঁ কুঁচকে চাইল আযরানের পানে। আযরানের হাতের মুঠোয় বন্দি হাতটা ছাড়াতে চাইলেই সেটা ছেঁড়ে দিল আযরান। মাথা বাঁকিয়ে আর্শির কাঁধের ওপর দিয়েই উঁকি দিয়ে দেখলো একবার। তারপর পুনরায় আর্শির দিকে তাকিয়ে ভ্রুঁ নাঁচিয়ে বলল,
“খুব তো গন্ধ ছড়াচ্ছে কিন্তু খাওয়ার উপযোগী হবে তো মুটি?”
আর্শি ঘাড় ঘুরিয়ে কটমট করে তাকালো,
“খেতে না চাইলে বাইরে যা। কেউ তোকে জোর করে খাওয়াচ্ছে না।”
আঁড়চোখে চাইল আযরান। সিদ্ধান্ত নিলো সামনের রমনীকে আর না ক্ষেপানোর। এমনিই ক্ষুধায় পেট ফেঁটে যাওয়ার জোগান। বিষ দিলে হয়তো বিষও খেয়ে ফেলবে। এখন যদি রাগানোর কারনে খাবার না জোটে? কথাটা ভেবেই মুখ গম্ভীর করে পিছু হটলো আযরান। রান্নাঘর থেকে যেতে যেতে বলে উঠল,
“বউ থাকতে বাইরে কেন যাবো? বউয়ের হাতের রান্নাই খাবো। যদি অখাদ্যও হয় তাহলে বুকে পাথর চেপেই খেয়ে নিব।”
আর্শি কিছুক্ষণ স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। আযরানের কথাটা কানে লাগল বড্ড। কেমন যেন অদ্ভুত অনুভূতি হলো বউ শব্দটায়। হুট করে মাথা নেড়ে ভাবনা গুলোকে বিদেয় করল।কিসব ভাবছে সে ছিহ! ঠোঁট শক্ত করে ফেলল আর্শি।
“অসভ্য একটা…”

নিজের সাথেই বিড়বিড় করলেও, কপোলদ্বয় রক্তিম বর্ণ ধারন করেছে বেশ টের পেল। চট করে মাথা ঝাঁকিয়ে আবার কাজে মন দিল। কড়াইয়ের আলুগুলো নামিয়ে ছোট্ট প্লেটে রাখল। তারপর ডিমটা ভেজে সুন্দর করে সাজিয়ে নিল পাশে। এতটুকু রান্না তবুও যত্নের কমতি রাখল না আর্শি। টেবিলে সব গুছিয়ে রেখে ধীর পায়ে বেরিয়ে এলো রান্নাঘর থেকে। মেঝেতে পাতানো গদিতে চোখ বুঁজে শুয়ে আছে আযরান। আর্শি ঘড়িতে একবার চক্ষুদ্বয় বুলিয়ে নিল। রাত আটটা বাজে সবে। ছেলেটা ঘুমিয়ে পড়ল নাকি? ধীর কদমে এগিয়ে গেল সে। অল্প একটু ঝাঁকিয়ে মৃদুস্বরে ডেকে উঠল,
“আযরান? ঘুমিয়ে পড়েছিস?”
সাথে সাথে নেত্রপল্লব মেলে চাইল আযরান। কেমন লালচে হয়ে আছে চোখ দু’টো। আযরান যে ক্লান্ত বুঝতে সময় লাগলো না আর্শির। কেমন যেন খারাপ লাগল৷ শান্ত স্বরে বলে উঠল,
“খেতে আয়। খেয়ে ঘুমিয়ে পড়িস।”

আযরান চুপচাপ বসে। টেবিলে সাজানো আর্শির রান্না করা খাবার গুলো। সামনের খাবারগুলোর দিকে তাকিয়ে হুট করেই বাসার কথা মনে পড়ল তার। মনে পড়ল মায়ের হাতে রান্না কতরকমের পদ। বাড়িতে হলে হয়তো এইগুলো দিয়ে সে খেতেই পারতো না। তবুও আজ থেকে খাবে সে। আর্শি কষ্ট করে রান্না করেছে। শুধুমাত্র তারই জন্য। কথাটা ভেবে ঠোঁটের কোণে স্মিত হাসি ফুঁটে উঠল আযরানের।একটু ভাত তুলে আলুভাজির সাথে মিশিয়ে মুখে পুরে দিল। বরাবরের মতো আর্শির রান্না চমৎকার হয়েছে। খাওয়ার মাঝেই হুট করে ক্ষুধার্ত আযরানের মনে পড়ল আর্শির কথা। মাথা ঘুরিয়ে তাকাতেই দেখতে পেল চুপচাপ তারদিকেই তাকিয়ে আছে আর্শি। পুনরায় খাওয়ার মন দিলো আযরান। বলে উঠল,
“চোখ দিয়ে আমাকে না গিলে ভাত খা। আমার হাত থেকে খাওয়ার মতলব আঁটছিস নাকি আবার? এইসব বাবা আমি পারবো না।”
তাৎক্ষণিক ভাবনার তার ছিঁড়ে গেল আর্শির। সে এতক্ষণ মনোযোগ দিয়ে দেখছিল আযরানের খাওয়া। কেননা সে জানে আযরান এইসব খায় না৷ কিন্তু এই দেখার যে আযরান এই মানে বের করবে সে ভাবতেই পারেনি। কিছু না বলে কেবল চোখ পাঁকালো আর্শি। কথা না বাঁড়িয়ে নিজেও খাওয়ায় মনোযোগী হলো। এই ঘাড়ত্যাড়া ছেলের সাথে সে আর কথাই বলবে না।

বাইরে মৃদু বাতাস বইঁছে। ঘরের জানালা খুলে দিল আর্শি। সাথে সাথে একরাশ শীতল হাওয়া তাকে ছুঁয়ে গেল। এই রাতের হাওয়াটুকু তার ভীষণ পছন্দের। জানালাটা আর বন্ধ করল না। ঘরে ফ্যান লাগানো হয়নি। আজ কোনোরকম রাতটা পার করতে পারলেও হলো। টিউশনির টাকাটা সে পেয়েছিল আজকেই। সেটা দিয়েই নাহয় ফ্যান কেনা যাবে। কথাটুকু ভেবেই বিছানার দিকে এগোলো আর্শি। কক্ষ অন্ধকারাচ্ছন্ন। শুধু বাইরে থেকে আসা ল্যাম্পপোস্টের হালকা আলোয় আলোকিত হয়ে আছে অল্পস্বল্প। পাতানো বিছানার একসাইডে তন্দ্রাচ্ছন্ন হয়ে আছে আযরান। আর্শি দাঁড়িয়ে সেদিকেই তাকিয়ে রইল কিছুক্ষণ। মনে শতখানেক দ্বিধা। আযরানের পাশে তাকে ঘুমাতে হবে? গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠল নিমিষেই। অস্বস্তিতে বুঁদ হলো মন। আর তো কোনো উপায়ও নেই।
“কি মুশকিলে পরলি রে আর্শি। এই ফাজিলের সাথে কিনা তোকে থাকতে হবে?”
মিনমিন স্বরে বাক্য গুলো উচ্চারণ করল সে। গুঁটি গুঁটি পায়ে এগিয়ে গিয়ে একদম কোণায় এসে শুয়ে পড়ল। যেন কাছাকাছি শুলেই মহাভারত অশুদ্ধ হয়ে যাবে। কিছুক্ষণের মাঝেই ঘুমেরা এসে ভীর করল আর্শির চক্ষে। গভীর ঘুমে তলিয়ে গেল মেয়েটা।

মধ্যরাত। চারপাশ একদম নিস্তব্ধতায় মোড়ানো। কেমন একটা অদ্ভুত শব্দে কেঁপে উঠল নিস্তব্ধতা। আর্শির ঘুম ভেঙে গেল আচমকাই। চক্ষুদ্বয় বুঁজে থাকলে কান সজাগ হয়ে গেল। কেটে গেল বেশ খানিকটা সময়। পুনরায় হুট করে অদ্ভুত শব্দ হলো। এবার আর্শি ধীরে ধীরে নেত্রপল্লব মেলে চাইল। বুকটা ধরফর করে উঠল অকারণেই। মৃদু মৃদু ঘাম জমলো কপালে। হাত দিয়ে তা মুছে ফেলল আর্শি। অনেকটা সময় পেরিয়ে গেলেও এবার আর কোনো শব্দ শুনল না। মনের ভুল ভেবে পুনরায় পাশ ফিরে শুঁয়ে পড়ল। ঠিক তখনই ঝুনঝুন এক ধরনের শব্দ শ্রবণশক্তিতে প্রবেশ করল। হকচকিয়ে চক্ষুদ্বয় খুলে ফেলল আর্শি। ভয়ে বুকটা ধ্বক করে উঠল। সে স্পষ্ট শুনেছে নুপুরের শব্দ। এক লহমায় বরফ হয়ে গেল। নিশ্বাস আঁটকে গেল নিমিষেই। পুনরায় কানে এসে বাঁজল সেই একি শব্দ। পুরো শরীর শিউরে উঠল এবার। হাত ঠান্ডা হয়ে গেছে মুহুর্তে। থরথর করে কাঁপতে লাগলো পুরো কাঁয়া। ভয়ের চোটে এবার চিল্লিয়ে উঠল,

“আযরান! এই আযরান উঠ।”
আর্শির কণ্ঠ কাঁপছে। আতঙ্কে গলা শুকিয়ে গেছে। পাশেই তন্দ্রাচ্ছন্ন হয়ে থাকা আযরান আর্শির ডাকে তৎক্ষনাৎ উঠে বসল। ঘমন্ত চক্ষুদ্বয় আর্শির পানে নিক্ষেপ করতেই যেন থমকে গেল আযরান। আর্শিকে এমন অবস্থায় সে আগে কখনো দেখেনি। পুরো শরীর থরথর করে কাঁপছে। চোখদুটো ভয়ের চোটে বড় হয়ে গেছে মেয়েটার। ঘেমে নেয়ে একাকার অবস্থা। আযরান ভয় পেয়ে গেল আর্শির অবস্থা দেখে। ঘাবড়ে গিয়ে বলে উঠল,
“কি হয়েছে?”
আর্শি কোনো উত্তর দিল না। হঠাৎ করেই ঝাঁপিয়ে পড়ল আযরানের বুকে। দুহাতে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল তাকে।
আযরান কিছুক্ষণ স্থির হয়ে গেল। এমন আচরণে সে সত্যিই অবাক। আযরানের বুকে মাথা রেখেও কাঁপছে মেয়েটা। আযরান দুহাতে চেপে ধরল আর্শিকে। কিছুক্ষণ সময় দিলো শান্ত হওয়ার। সময় নিয়ে মাথায় আলতো এক চুমু দিয়ে জিজ্ঞাস করল,

“কি হয়েছে মুটি? দুঃস্বপ্ন দেখেছিস? কিচ্ছু হয়নি তো। শান্ত হো। দেখ আমি আছি এখানে। কি হয়েছে বল আমাকে।”
আর্শি কিছুক্ষণ কোনো কথা বলতে পারল না। শুধু শক্ত করে জড়িয়ে ধরে রইল আযরানকে। বুকের ভেতরটা উঠানামা করছে দ্রুত।কিছুটা সময় পেরোতেই কাঁপা কাঁপা কণ্ঠে ফিসফিস করে বলল,
“আমি.. আমি শব্দ শুনেছি…”
আযরান ভ্রুঁ কুঁচকে তাকাল,
“কিসের শব্দ?”
আর্শি চোখ তুলে তাকাল তার দিকে। চোখদুটো এখনো ভয়ে টলমল করছে। ভয়ার্ত কন্ঠে বলে উঠল,
“নুপুরের…। বাই..বাইরে থেকে আসছিল।”
শেষ কথাগুলো বলতে গিয়েই গলা আঁটকে গেল তার। আবার মুখ গুঁজে দিল আযরানের বুকে। আযরান কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর হালকা একটা নিঃশ্বাস ফেলে বলল,
“এইসব কিছু না। স্বপ্ন দেখেছিস আর্শি।”
“না!”

আর্শি মাথা নাড়ল জোরে। পুনরায় অস্পষ্ট স্বরে বলে উঠল,
“আমি জেগে ছিলাম। স্পষ্ট শুনেছি”
আযরান এবার আর্শির মাথা হাত বুলিয়ে দিল। একটু নরম গলায় বলল,
“শোন, নতুন জায়গা। তার ওপর চারপাশ চুপচাপ। মাথায় ভয় ঢুকে গেলে এমন অনেক কিছুই মনে হয়। তুই ক্লান্ত ছিলি, ঘুমের ঘোরে শুনেছিস। এর বেশি কিছু না। আর ভয় পাস না।”
আর্শি কিছু বলল না। শুধু আরও একটু সেঁধিয়ে গেল আযরানের বুকে। আযরান এবার আর কিছু না বলে তাকে নিয়ে শুয়ে পড়ল। এক হাত দিয়ে আর্শিকে জড়িয়ে রাখল, যেন ভয়টা একটু কমে। আর্শির কপালের চুলগুলো গুছিয়ে দিয়ে বলে উঠল,
“চোখ বন্ধ কর। আমি আছি।”

কার্নিশে আলতা মাখানো পর্ব ১৬

আর্শি অনিচ্ছা সত্ত্বেও চোখ বন্ধ করল। তার কাঁপুনি ধীরে ধীরে কমে আসছে। আযরানের বুকের মাথা রেখেই একটু একটু করে একসময় ঘুমে তলিয়ে গেল আর্শি। আযরানের চোখদুটো বন্ধ হলো না। সে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল অন্ধকারের দিকে।
মনে হলো যেন সে কিছু একটা শুনেছিল। তবে আর্শি ভয় পাবে বিধায় বলেনি। কিন্তু এই মাঝরাতে নুপুরের শব্দ আসবে কই থেকে?

কার্নিশে আলতা মাখানো পর্ব ১৮