কার্নিশে আলতা মাখানো পর্ব ১৬
তন্ময়ী তিতিক্ষা
অশ্রুসিক্ত নেত্রপল্লব মেলে সামনে তাকাতেই আর্শির বুকটা যেন ধক করে উঠল। শ্বাসটা মুহূর্তের জন্য থমকে গেল। চোখদুটো বিস্ময়ে বড় হয়ে গেল নিমিষেই। তার ঠিক সামনেই দাঁড়িয়ে আছে তার বাবা শাহাদাত হায়দার। আর্শি বেশ অবাক হলো। কিছু সেকেন্ড সময় স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। নিজের চোখকেই যেন বিশ্বাস করতে পারছে না। আকস্মিক শ্রবণশক্তিতে বাবার কথা প্রবেশ করতেই ভাবনাচূর্ণ হলো আর্শির।
“কি হলো অবাক হলি?”
“তুমি এখানে কি করে বাবা?”
শাহাদাত হায়দারের চোখদুটো স্থির হয়ে আছে মেয়ের মুখে। মেয়ের চোখের অশ্রুটুকু চোখের আড়াল হলো না। ক্লান্ত মুখশ্রীতে একবার চক্ষুদ্বয় বুলিয়ে নিলেন তিনি। পরক্ষণেই শান্ত স্বরে বলে উঠল,
“চল কোথাও বসে কথা বলি।”
আর্শির এতক্ষণে খেয়াল হলো তার বাবা তাকে তুই করে বলছে। সে যেন অবাক হতেও ভুলে গেল। যে বাবা কিনা ছোটবেলা থেকে তার সাথে দু’টো বাক্যও ব্যয় করতো না সে বাবা আজ এই কথা বলছে? ফ্যাল ফ্যাল দৃষ্টিতে আর্শি কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল বাবার পানে। নিজের চক্ষুদ্বয়ও যেন বিশ্বাস করতে পারছে না। পুনরায় বাবার কন্ঠ কর্ণপাত হতেই তড়িঘড়ি করে মাথা নাড়ল আর্শি। এই সুযোগ সে হাত ছাড়া করতে চায় না। নিমিষেই অভ্যন্তরে খুশিরা যেন ডানা ঝাপটাতে শুরু করল আর্শির। খুশি মনে এগিয়ে যেতে থাকলো বাবার পিছু পিছু।
নিরিবিলি একটা রেস্টুরেন্ট। তেমন জনসমাগম নেই বললেই চলে। সকলে ব্যস্ত যে যার কাজে। দু’টো টেবিল পরেই একটা স্কুল শিক্ষার্থীর দল বসেছে। হই-হুল্লুড়ে ব্যস্ত তারা। তাদের মাঝেই ছোটখাটো একটা ছেলে টুং টাং শব্দে গিটার বাজাচ্ছে। আর অন্য বন্ধুরা ছেলেটাকে উৎসাহ দিচ্ছে। দৃশ্যটা দেখে আর্শির ঠোঁটের কোণে হাসি ছড়িয়ে পড়ল। মনে পরে গেল নিজের বন্ধুদের কথা। তারাও তো ঠিক এভাবেই আড্ডা দেয় ভার্সিটিতে। আর গিটার বাজানো ছেলেটার মধ্যে যেন তার বন্ধু প্রহরেরই প্রতিচ্ছবি। নিজের ভাবনার মাঝেই আকস্মিক শুনতে পেল বাবার কন্ঠস্বর,
“আযরান আমাকে সবটা বলেছে।”
কথাটা শুনেই আর্শির বুকটা হঠাৎ কেঁপে উঠল। চোখদুটো বিস্ময়ে আরও বড় হয়ে গেল। আযরান সব বলেছে মানে? তাদের বিয়ের কথাও বলে দিয়েছে নাকি? ঠোঁট কাঁপতে লাগল সামান্য।
“কি… কি বলেছে?”
কাঁপা গলায় প্রশ্ন করল আর্শি। শাহাদাত হায়দার গভীর দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন মেয়ের দিকে। সেই দৃষ্টিতে আজ কোনো রাগ নেই আর না আছে কঠোরতা। শান্ত স্বরেই বলে উঠল,
“তোদের বিয়ের ব্যাপারটা।”
মুহুর্তে মাথা নিচু করে ফেলল আর্শি। মাথা উঁচু করার আর সাহসটুকুও আর পেল না। শাহাদাত হায়দায় পুনরায় বলে উঠল,
“আমি খুশি হয়েছি শুনে। আযরান ভালো ছেলে। তোকে ভালো রাখবে মা।”
‘মা’ শব্দটা শুনে চমকে উঠল আর্শি। অবাকের চরম পর্যায়ে পৌছে গেল যেন। কিছুক্ষণ স্থির দৃষ্টিতে রইল বাবার দিকে। বুকটা কেঁপে উঠল সামান্য। বাবার মুখ থেকে মা ডাকটা বুঝি এত সুন্দর? ধীরে ধীরে চক্ষুদ্বয় ভিজতে আরম্ভ করল আর্শির। ঠোঁটের কোণে আনমনে মুচকি হাসি ফুঁটল তার। শাহাদাত হায়দার হয়তো বুঝলেন মেয়ের মনের অবস্থা। এগিয়ে এসে বসলেন মেয়ের পাশে। নিজের ডান হাতটা তুলে আর্শির মাথায় রাখতেই হুঁ হুঁ করে কেঁদে উঠল আর্শি। ছোটবেলা থেকে বাবার ভালোবাসা না পাওয়া মেয়েটা যেন অল্প একটু স্নেহেই গলে গেল। প্রশান্তিতে ভরে উঠল সমস্ত মন। শাহাদাত সাহেব এবার মায়াময় কন্ঠে বলে উঠল,
“ক্ষমা করে দিস মা.. আমি তোর বাবা হয়েও তোর জন্য কিছুই করতে পারলাম না। আমি একজন ব্যর্থ বাবা।”
ব্যাস! এই একটা বাক্যেই যেন সব বাঁধ ভেঙে গেল। আর্শি আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। হুট করে বাবার বুকে মুখ গুঁজে কেঁদে উঠল। বাচ্চাদের মতো ফুঁপিয়ে অভিযোগের ঝুলি খুলে বসল,
“আমাকে কেন ছোট থেকে অবহেলা করলে বাবা। জানো কেউ আমাকে ভালোবাসতো না। ছোট মাও না। ছোট মা আমাকে সবসময় মারতো। একটুও আদর করতো না। আম্মু চলে গেছে সবাই আমাকে অপয়া বলতো বাবা। কেউ আমাকে ভালোবাসে না এমনি কি তুমিও না। জানো বাবা তুমি যখন আয়রাকে আদর করতে আমার খুব কষ্ট হতো। আমারও আদর পেতে ইচ্ছা করতো। স্কুলে সবার বাবা আসতো কিন্তু তুমি কেন আসতে না বাবা। বলো কেন আসতে না?”
বাবার বুকে মাথা রেখে কতশত অভিযোগ করল। তার কান্নার শব্দে চারপাশটা নিস্তব্ধ হয়ে গেল। শাহাদাত হায়দার শুধু মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে যেতে লাগলেন। কান্নায় একদম ভেঙে পড়েছে আর্শি। কেন পারলো না সে বাবার রাজকন্যা হতে? কেন পেলো না বাবার একটু ভালোবাসা?
দূর থেকে একজোড়া চোখ আর্শির ওপরই স্থির। আর্শির কান্নায় যেন হৃদয়ের যন্ত্রণা বাঁড়িয়ে দিচ্ছে মানুষটার। তীরের মতো বিঁধছে আর্শির প্রত্যেকটা কথা। আযরান আর্শির দিকে লক্ষ্য করে বিরবির করে বলে উঠল,
“এটাই তোর শেষ কান্না মুটি এরপর আর কান্নারা তোকে ছুঁতেও পারবে না।”
পুরান ঢাকার এক সরু গলির ভেতরে দাঁড়িয়ে আছে ছোট্ট একটা দু’তলা বাড়ি। বাইরে থেকে দেখলে খুব সাধারণ বাড়িটা। দেয়ালের রং কিছুটা খসে গেছে, কোথাও কোথাও স্যাঁতস্যাঁতে দাগ।বাড়িটার নিচতলায় একটা ছোট্ট গ্রিল গেট। আযরান গেটটা ঠেললেই কিঁচ কিঁচ শব্দ করে খুলে গেল সেটা। আযরানের পিছনেই কৌতূহলী দৃষ্টিতে আশেপাশটা পর্যবেক্ষণ করছে আর্শি। কিছুক্ষণ আগেই রেস্টুরেন্টে হাজির হয়েছিল আযরান। তারপর বাবার থেকে বিদায় নিতেই একপ্রকার টানতে টানতে তাকে এখানে নিয়ে এসেছে। পুরো গলিটাতে একবার চক্ষুদ্বয় বুলাল আর্শি। গলির এমাথা থেকে ওমাথা পর্যন্ত অসংখ্য তারের ছড়াছড়ি। আযরানের পিছু পিছু ভিতরে ঢুকতেই একটা সরু সিঁড়ি নজরে এলো। যার সিমেন্টের ধাপগুলো বহুদিনের ব্যবহারে খানিকটা ক্ষয়ে গেছে। এবার আর কৌতূহল ধমাতে পারল না সে। অবশেষে প্রশ্ন করেই ফেলল,
“এখানে কেন নিয়ে এসেছিস আযরান?”
আযরান পিছু ঘুরে চাইল। তবে জবাব দেওয়ার প্রয়োজনবোধ করল না। কিন্তু আর্শির বার বার প্রশ্ন করাতে শেষমেষ বিরক্ত হয়ে বলল,
“তোকে বেচতে এনেছি। এবার চুপচাপ চল। নাহলে সিঁড়ি থেকে ফেলে মাথা ফাঁটিয়ে দিবো।”
নিমিষেই আর্শির কপাল কুঁচকে গেল। মনক্ষুণ্ণও হলো ভীষণ। এই ছেলে কি ভালোভাবে কথা বলতে পারে না? সবসময় এমন ত্যাড়া উত্তর দিতেই হবে? আর কোনো প্রশ্ন করল না আর্শি। চুপচাপ আযরানকে অনুসরণ করতে থাকল।
দু’কামরার ছোট্ট একটা বাসা। দরজা খুললেই প্রথমে একটা ছোট্ট ড্রইং স্পেস। খুব বেশি কিছু নেই শুধু একপাশে ছোট্ট একটা টেবিল আর দু’টো চেয়ার রাখা। দেয়ালে একটা ঘড়ি ঝুলছে। আর্শি এবার ভিতরে এগিয়ে গেল। ড্রয়িংরুমের ডানপাশেই ছোট্ট একটা রান্নাঘর। জায়গাটা এতটাই ছোট যে একসাথে দু’জন দাঁড়ালেই গা ঘেঁষাঘেঁষি হয়ে যাবে হয়তো। দেয়ালে টাঙানো কয়েকটা হাঁড়ি-পাতিল, আর পাশেই ছোট ছোট চুলা। এবার আর্শি আযরানের দিকে ঘুরে তাকাল। হয়তো সে কিছুটা আন্দাজ করতে পারছে। আযরান তার দিকেই তাকিয়ে আছে। হয়তো আগে থেকেই তার দৃষ্টি আর্শির ওপর ছিল। এবার কন্ঠ নরম রেখে বলে উঠল,
“ভিতরে গিয়ে দেখ সংসার পছন্দ হয় কিনা।”
“সংসার!”
বিস্ময়ে হতবার আর্শি। সংসার শব্দটা শুনে সূক্ষ্ম কম্পন অনুভব হলো হৃদপিন্ডে। ঠিক তখনই কর্ণে প্রবেশ করল আযরানের কন্ঠস্বর,
“হুম সংসার।”
“কার সংসার? আমার?”
“উঁহু, আমাদের।”
অপলক চেয়ে রইল আর্শি। চেয়ে রইল নিনির্মেষ দৃষ্টি ফেলে। প্রশান্তিরা কি মনের এককোণে বাসা বাঁধল? কি জানি। জানতে চায় না আর্শি। তবে কথাটায় তার ভালো লাগায় ছেঁয়ে গেছে। এবার কথা না বাঁড়িয়ে এগিয়ে গেলো ভিতরের দিকে। একটা মাঝারি সাইজের বেডরুম। প্রথমটা থেকে সামান্য বড় হবে বোধহয়। মেঝের উপরে গদি পাতা। খুব বেশি আরামদায়ক না হলেও পরিষ্কার করে বিছানো। তারপাশেই ছোট্ট একটা আলমারি। আর দেয়ালের একপাশে ছোট একটা আয়না। আর্শি খুশি হলো বড্ড। বাসাটা ছোট হলেও তার বেশ পছন্দ হয়েছে। রুমের পাশেই একটা বারান্দা দেখে সেদিকে ছুটে গেল আর্শি। সেখানে দাঁড়াতেই বিকেলের মৃদু হাওয়া সর্বাঙ্গ ছুঁয়ে গেল। বিকেলের হাওয়াটা তার এলোমেলো চুলগুলোকে বারবার উড়িয়ে দিচ্ছে। চোখদুটো আধবোজা। কিছু একটা অনুভব করার চেষ্টা করছে সে। শান্তি, স্বস্তি.. নাকি নতুন এক অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ?
আকস্মিক পাশে এসে দাঁড়াল আযরান। দু’জনের মাঝখানে নীরবতা। আর্শি পাশ ফিরে চাইল। হুট করে কি হলো কে জানে? আনমনে বলে উঠল,
“যদি বলতাম আমাকে ছেড়ে দে। তুই আমাকে ছেড়ে দিতি আযরান?”
“ধরলাম কখন যে ছাড়বো?”
নাক ফুলালো আর্শি। রাগে চোখের কোণে জল এলো। চিকচিক করতে থাকা চক্ষুদ্বয় মেলে বলে উঠল,
“তুই একটা অসহ্য!”
“জানি।”
“অসভ্য!”
“ওটাও জানি।”
“খাটাস!”
আযরান এবার কপাল কুঁচকে চাইল আর্শির পানে। কিছুটা রসিকতা করে বলে উঠল,
“আমার এতগুলো গুণ একসাথে। কি সৌভাগ্য তোর।”
“উত্তর দিলি না? বললেই ছেড়ে দিতি?”
আযরান এবার ঝুঁকল। দুইপা এগিয়ে আসতেই তিন পা পিছিয়ে গেল আর্শি। আযরান দৃষ্টি স্থির করল আর্শির গালের লাল তিলটার দিকে। এক ভ্রুঁ উঁচিয়ে বলে উঠল,
“অবশ্যই ছেড়ে দিতাম….কিন্তু পরবর্তীতে আরও শক্ত বাঁধনে বাঁধতাম। যেন বাঁধন ছিঁড়ে পালাতে না পারিস।”
আর্শি চোখ নামিয়ে ফেলল। ঠোঁট কাঁপছে হালকা। পরক্ষণেই নিজেকে সামলে নিয়ে আবার রাগী গলায় বলল,
“যাই বল না কেন তবুও.. আমি তোর সাথে সংসার করবো না।”
“করিস না আমিও কোনো প্যাচপ্যাচানির সাথে সংসার করবো না। কাঁদুনি মুটি একটা!”
আর্শি নাক ফুলালো। কথাটা গায়ে লাগলো বেশ। রেগে চলে যেতে চাইলেই হাত টেনে পুনরায় দাঁড় করিয়ে দিল আযরান। দু’হাতের মাঝে আঁটকে ফেলল তাকে। তড়িৎ বেগে চমকে উঠল আর্শি। দুরুদুরু বুকে তাকিয়ে রইল আযরানের পানে। সামনে থাকা মানুষটার দৃষ্টি কেমন অদ্ভুত। আযরান হাত এগিয়ে আনলো। আর্শির কপালে থাকা চুল গুলো কানে গুঁজে দিতে দিতে বলে উঠল,
কার্নিশে আলতা মাখানো পর্ব ১৫
“এর থেকে আর ভালো ব্যবস্থা করতে পারিনি । রাগ করিস না বউ। এই ছোট্ট পুরোনো ঘরেই না হয় তোকে রাজরানী করে রাখবো। পারবি না এই ছোট্ট ঘরে আমার সাথে সংসার করতে?”
মন্ত্রমুগ্ধের ন্যায় চেয়ে রইল আর্শি। হুট করে আর্শির মনে হলো সামনের থাকা ছেলেটা হয়তো বয়সেই ছোট মাত্র। কিন্তু দায়িত্বের দিক দিয়ে একদমই নয়। অল্পস্বল্প ভালো লাগায় ছেয়ে গেল অভ্যন্তর। পারল না বেশিক্ষণ আযরানের চোখে চোখ রাখতে। এই দৃষ্টিযুগল এক হলেই আর্শির বক্ষে কম্পন ধরে। অদ্ভুত অনুভূতি হয়। যা সে চায় না। একদমই চায় না। এর মাঝেই পুনরায় শ্রবণশক্তিতে প্রবেশ করল আযরানের কন্ঠস্বর। আযরান কিছুটা আবদারের স্বরে বলে উঠল,
“কিছু রান্না করে দিবি মুটি? কাল রাত থেকে কিছু খাইনি। খুব ক্ষিধে পেয়েছে।”
