অপরাহ্নে উপসংহার পর্ব ৪৫
তোনিমা খান
অন্তঃস্থলের সুপ্ত অনুভূতি গুলো যেদিন নিজের ভাইয়ের স্ত্রী রূপে প্রকাশ পায়, সেদিন-ই এরোজ মাটি চাপা দিয়ে দিয়েছিল সেই অনুভূতি গুলোকে। ওই দিকে দ্বিতীয় বার ফিরে তাকানোর সাহস আর ইচ্ছে কখনো হয়নি। কিন্তু মন যে সবকিছুর উর্ধ্বে! যত দিন যায়, সেই অনুভূতির তীব্রতায় এরোজ বদ্ধ উন্মাদে পরিণত হয়! পেরে ওঠে না মনের সাথে। ভোলার প্রয়াসে কতশত মাদকদ্রব্যের সান্নিধ্যে গেল। সেগুলোও ফিকে পড়ে তার অনুভূতির তীব্রতার কাছে! সেই তীব্রতা থেকে পালাতে পালাতে একটা সময় দেশ ছাড়ে কিন্তু তবুও কি ভুলতে পেরেছে? একাকী জীবনে গড়ে ওঠে একটা নিজস্ব পৃথিবী। যেই পৃথিবীতে কারোর দেয়া ঠুনকো কিছু অনুভূতি হয় তার বেঁচে থাকার কারণ।
অথচ যেই সুখকে হারিয়ে ফেলার আফসোসে একটা মানুষ মৃতপ্রায়, সেই সুখটুকুকেই কেউ তিলে তিলে দুমড়েমুচড়ে মেরে ফেলতে চেয়েছে।
চেয়ারে বসা তিন ভাই বোনের সামনে থেকে যখন একটা পরিবার চিৎকার করে কাঁদতে কাঁদতে আই সি ইউর দিকে গেল, তখন মাথা নুইয়ে কাঁদতে থাকা এরোজ আরো দ্বিগুণ বেগে হাউমাউ করে কাঁদতে লাগল। সব শেষ হয়ে যায়নি!
তপোবন দু’হাতে চোখমুখ আঁকড়ে ধরে নুইয়ে পড়ে। চোখের কার্নিশ বেয়ে আরেক ফোঁটা অশ্রু গড়িয়ে পড়ল। ভেঙে পড়া অন্তঃস্থল উজ্জ্বীবিত হতে লাগল একটু একটু করে!
এরোজ উঠে দাঁড়ায়। টলমলে পায়ে চোখ মুছতে মুছতে বেরিয়ে যায় হাসপাতাল থেকে। তার গতিশ্লথ হয় ঠিক সেই জায়গাটায় এসে, যেখানে ভাগ্য পরিবর্তন করার অলৌকিক ক্ষমতা রয়েছে।
এরোজ ধপ করে বসে পড়ে মসজিদের মেঝেতে। চুল বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে ওযুর পানি,পড়নের ঢিলেঢালা সাদা শার্টটা ঘেমে জবুথবু হয়ে লেপ্টে আছে দেহের সাথে, চোখেমুখে অজস্র প্রত্যাশা।
আছরের নামায পড়ে নত শির দুই হাত তুলতেই টুপটাপ করে নোনাজল গুলো গড়িয়ে পড়তে লাগল।
এরোজ লালচে ঝাঁপসা নেত্রে চেয়ে বলল,
–“বিগত ছয় বছরে আমি কখনো আপনার কাছে আসিনি। আমি পাপী, আমি আপনার সবচেয়ে নিকৃষ্ট বান্দা। কিন্তু ঐ মানুষটা যে বিনা অপরাধে মৃত্যুর সাথে লড়ছে, সে তো নিষ্পাপ। আমার নায়েল নিষ্পাপ। তাদের জন্য হলেও আমার প্রার্থনাটুকু একটু শুনুন। আমি জানি একটা মানুষ অপরাধ করতে করতে জিতে যাবে, আরেকটা মানুষ কষ্ট সহ্য করতে করতে মরে যাবে—এই অন্যায় বিচার আপনার নয়। আপনি তো ন্যায়বিচারকারী! এবারের মতো তাকে সুস্থ করে দিন। নয়তো পিশাচেরা জিতে যাবে। তাকে আর একবার লড়ার সুযোগ দিন।”
সৃষ্টিকর্তা কখনোই তার বান্দার প্রত্যাবর্তনকে ফিরিয়ে দেননা। এরোজকেও খালি হাতে ফেরায় না।
মৌনতাকে আই সি ইউ তে নেয়ার কিছুক্ষণ আগে আরেকজন রোগী অতিরিক্ত ব্লিডিং এর কারণে আই সি ইউতে নেয়া হয়। এবং সেই মৃত্যু বরণ করে। এ যাত্রায় জিতে যায় ন্যায়! কিন্তু কতবার? বড় যুদ্ধ যে সামনে!
সন্ধ্যা নয়টা। এভারকেয়ার হাসপাতালের আই.সি ইউ এর শুন্য কড়িডরটিতে হঠাৎ করেই আন্দোলিত হলো নার্সের ব্যস্ত কণ্ঠ।
–“পেশেন্ট নাম্বার ৪০২ মৌনতা সিকদার এর পরিবারের লোক কে আছেন? তাড়াতাড়ি আসুন।”
আইসিইউ-র সামনে বেশি মানুষ থাকার অনুমতি না থাকায় কেবল তপোবন আর এরোজ সেখানে অপেক্ষা করছিল। তারা ছুটে যায় নার্সের কাছে। নার্স একটি স্লিপ এগিয়ে দিয়ে উদ্বিগ্ন গলায় বললেন,
— “রোগীর প্লাটিলেট কাউন্ট এগারো হাজারে নেমে এসেছে। যেকোনো সময় ব্রেইন হেমারেজ হওয়ার ঝুঁকি আছে। আগামী ২ ঘণ্টার মধ্যে অন্তত তিনজন রক্তদাতার ব্যবস্থা করুন। ব্লাড ব্যাংকে আমাদের স্টকে যতটুকু ছিল, সব ব্যবহার করা হয়ে গেছে। এখন আপনাদেরই জরুরি ভিত্তিতে জোগাড় করতে হবে।”
এরোজ স্লিপটি খুঁটিয়ে দেখে বলল,
— “এবি পজিটিভ ব্লাড গ্রুপ তো “ইউনিভার্সাল রেসিপিয়েন্ট”। সব গ্রুপের রক্তই গ্রহণ করতে পারে, তাই না? আমরা কি অন্য গ্রুপের রক্ত দিতে পারি?”
নার্স বললেন,
— “জরুরি অবস্থায় অন্য গ্রুপ ভাবা যায়, কিন্তু প্লাটিলেটের ক্ষেত্রে সেম গ্রুপ হওয়াই সবচেয়ে নিরাপদ। আর দাতার রক্তে কোনো সংক্রমণ বা অ্যালার্জি থাকলে সেটা গ্রহণ করা সম্ভব হবে না।”
নার্সের কথায় এরোজ এবার ভাইয়ের দিকে তাকায়,
— “ভাইজান, তোমার ব্লাড গ্রুপ তো এবি পজিটিভ।”
তপোবন দ্রুত মাথা নেড়ে সায় দিয়ে বলল,
— “হ্যাঁ, আমার গ্রুপ মিলে যাচ্ছে। আমি এখনই রক্ত দিচ্ছি।”
নার্স সম্মতি দিয়ে বললেন,
— “ঠিক আছে, আসুন। আপনার রক্তে কোনো অ্যালার্জি বা অন্য সমস্যা আছে কি না, সেটা আগে পরীক্ষা করে নিতে হবে। কিন্তু এরপরেও আরও প্লাটিলেট লাগবে রোগীর অবস্থা আশঙ্কাজনক!”
–“জি, আমি ব্যবস্থা করছি।”
নার্স চলে যেতে নিলেও এরোজ পিছুডাকে তাকে। মিহি স্বরে শুধায়,
–“সে ঠিক হয়ে যাবে তো?”
নার্স দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
–“অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ হয়েছে, উপরন্তু লিউকোমিয়ার পেশেন্ট। ডাক্তাররা সর্বোচ্চ চেষ্টা করছেন।”
এক ঘন্টার মাঝে দু’জন ডোনার জোগাড় করে এরোজ বলহীন দেহে এগিয়ে যায় আই সি ইউর কাছে। ছোট্ট কিউবাকৃতির গ্লাসটি ভেদ করে রুগ্ন মুখটির একটু অংশ দেখা যাচ্ছে। চারিপাশ ঘিরে আছে ডাক্তাররা। তখনো তারা পর্যবেক্ষণে ব্যস্ত। যার সুখ দেখা সর্বদা কাম্য ছিল আজ সে কেন এত অসুখী?
গ্লাসে হাত রেখে এরোজ ফিসফিসিয়ে বলে,
–“যেই পথে শুধু আপনার আনাগোনা ছিল সেই পথ ছেঁড়ে দিয়েছিলাম বহু আগে—যেন পিছু ফিরে আপনাকে সুখী দেখতে পারি। কিন্তু এগুলো কি? এভাবে দেখার জন্য তো আপনার পথ ছাড়িনি। মৌন! শুনছেন? জীবন নামক রণক্ষেত্র হয় লড়ার জন্য! আপনাকে লড়তে হবে আপনার হারাতে বসা মাতৃত্বের বিরুদ্ধে, লড়তে হবে নিজের দৈহিক যন্ত্রণার বিরুদ্ধে, লড়তে হবে ঐ পিশাচের বিরুদ্ধে!”
–“এই দুষ্টু ছেলে! তোমলা আমায় লেখে বেলু কলতে চলে এসেছো কেন?”
এরোজ তখন পুরোপুরি নিমগ্ন ঐ এক টুকরো ভঙ্গুর মুখ দেখতে। কর্নকুহরে চিকন আহ্লাদি একটা কণ্ঠ প্রতিধ্বনিত হতেই সে ফিরে তাকায়।
সাদা ফ্রক পরিহিত বাচ্চা মেয়েটির পিঠে ছড়িয়ে আছে রাশি রাশি চুল। নায়েল কোমড়ে হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। চোখেমুখে তার রাগ! অদূরে তকদির সিকদার দাঁড়ানো।
এরোজ নিটল দৃষ্টিতে তাকায় বাচ্চা মেয়েটির দিকে। ধীরপায়ে তার কাছে হেঁটে গিয়ে হাঁটু গেড়ে বসে তার সামনে।
নায়েল কোমড়ে হাত রেখে পুনরায় শুধায়,
– “দাদুভাই বলেছে, তোমলা না-কি মাম্মাকে নিয়ে হেলিপেলি তে করে উলে উলে এসেছো এখানে? আমাকে আনোনি কেন? তোমলা কত মজা কলেছো, তাই না?”
পরপরই দ্বিগুণ উৎসাহে শুধায়,
– “পাখি দেখেছো? মেঘ দেখেছো? আকাশ কেমন? ছোঁয়া যায়? আকাশের কোথায় পানি জমে থাকে জানো? সেখানে কি পুকুল আছে? নয়তো বৃষ্টিল পানি কোত্থেকে পড়ে?”
রাজ্যের কৌতুহলী কণ্ঠে করা অবুঝ প্রশ্নে—এরোজ মরুর বুকে মূর্ছা যাওয়া এক রুক্ষ খরখরে প্রাণহীন তৃষ্ণার্ত জীবের মতো তাকিয়ে রয়। এই কণ্ঠেও এত মায়া! এই মায়াভরা মুখটির দিকে তাকালেই তো পুরো পৃথিবী রঙিন লাগে! বেঁচে থাকার অন্যতম এক কারণ খুঁজে পাওয়া যায়। তার কাছে যদি এমন একটা পুতুল থাকত—তবে পুরো পৃথিবীতে নিজেকে সবচেয়ে ধনী, অমূল্যবান ব্যক্তি মনে হতো! সেখানে কি করে ইমরোজ এই মুখটির হাসি কেড়ে নেয়ার চিন্তা করতে পারে?
– “কি হলো, বলছো না কেন? বৃষ্টি কোত্থেকে পলে? আকাশে কোনো পুকুল, সুমিং পুল দেখেছিলে?”
পুনরায় নায়েলের শিশুসুলভ কণ্ঠে এরোজের নিস্তরঙ্গতা ভঙ্গ হয়। নায়েল মুখ ফুলিয়ে বলল,
– “আবাল যখনি হেলিপেলিতে উঠবে তখন আমায় নিয়ে উঠবে। আমি আকাশ দেখব। নেবে তো? না নিলে কিন্তু আমি অনেক কষ্ট পাবো। খুব কান্না কলব! তোমার সাথেও খুব লাগ কলব!”
এরোজ নিষ্পলক দেখতে দেখতেই হঠাৎ করে জাপ্টে ধরে নায়েলকে। ফ্যাসফ্যাসে মিহি কণ্ঠে শুধায়,
-“নায়েল কেমন আছো?”
নায়েল কাঁধ ঝাঁকিয়ে, নির্বিকার অতিরঞ্জিত কণ্ঠে বলল,
– “ভালো আছি! এখন তো খুব বেশি ভালো আছি। বেলু কলতে এসেছি না! আমি এখন ঘুলবো, অনেক গুলো টেডি বিয়াল আর পান্ডা কিনব। পাপাকে কত বলেছি ঘুলতে নিয়ে চলো। কিন্তু পাপা গোমড়া মুখো পঁচা ছেলে! বলে, তাল ছময় নেই। তুমি কিন্তু আমায় ঘুলতে নিয়ে যাবে আর অনেক কিছু কিনে দেবে। দেবে তো?”
এরোজের চেপে রাখা কান্নারা উপচে বেরিয়ে আসে। ছোট্ট মুখটিকে দু’হাতের আজলায় নিয়ে অজশ্র চুমুতে ভরিয়ে তুললো। অশ্রুসিক্ত নয়নে চেয়ে ঘন ঘন মাথা নেড়ে বলে,
– “দেবো, সব দেবো। যা চাও সব দেবো।”
নায়েল ছোট মুখ করে দেখে চাচার কান্নারত মুখটি। ব্যথিত কণ্ঠে বলে,
-” তুমি তো কত বড়! তবে কাঁদছো কেন? বড়োরা কি কাঁদে? আমাল কছত হয়, কেঁদো না।”
নিজের ছোট ছোট হাত দু’টি দিয়ে এরোজের চোখ মুছিয়ে দিতে লাগল নায়েল। বদ্ধ নেত্রে সেই বাড়ন্ত ছোট ছোট হাত দুটোকে গালে ঠেকিয়ে রাখে চুপটি করে বসে রয় এরোজ।
অদূরে মৌনতার পরিবারের কান্নায় ভারী হয়ে উঠেছে পরিবেশ। রাতটা পেরিয়ে যায় কিন্তু তখনো ডাক্তাররা মৌনতার শারীরিক অবস্থার আশানুরূপ কোনো উন্নতির সুসংবাদ দিতে পারেনি।
রাত প্রায় একটা। পরিবারের সকলের জন্য বরাদ্দকৃত কামড়াটিতে তখন সকলের অবস্থান। তপোবন দীর্ঘক্ষণ নত মস্তকে থাকলেও দায়িত্ব তাকে বরাবরই ইচ্ছের বিরুদ্ধে দাঁড় করিয়ে ছাড়ে। নিজের দায়িত্বগুলো আজ পাহাড়ের মতো ভারী মনে হচ্ছে তার।
তবুও ইচ্ছের বিরুদ্ধে গিয়ে জীবনে কতশত দায়িত্ব পালন করতে করতে, আজ কারোর চোখে চোখ রাখতে তার ইতস্ততা হয়। নত মস্তকে মৌনতার বাবার সামনে হাঁটু গেড়ে বসে তপোবন। বয়সের ছাপে কুঁচকানো দূর্বল হাত দুটিকে নিজের হাতের মুঠোয় নিতেই ভদ্রলোক সন্তপর্ণে সেই হাতটি সরিয়ে নেয়।
তপোবন অবাক হয়নি বরং এই প্রত্যাখ্যান সে প্রত্যাশাই করেছিল।
সে নত মস্তকে কিছু বলতে গেলে নেওয়াজ সাহেব মুখ খুললেন। যেই নিঃসৃত এক একটা শব্দ তপোবনের পিতৃত্বের অনুভূতিতে সমৃদ্ধ হৃদয় ফালাফলা করে দিল।
–“আমার মেয়েটা যদি ইমরোজের জন্য এত বড় কাঁটা ছিল, তবে আমার কাছে ফিরিয়ে দিতো তপোবন। আমি কোনো প্রশ্ন করতাম না। কিন্তু ও এভাবে আমার বুক খালি করার পরিকল্পনা কি করে করতে পারে?
আমার মৌন, কারোর স্ত্রী হওয়ার আগে, কারোর মেয়ে। এটা কি ও ভুলে গিয়েছিল? আমার গোটা পরিবাটার কাছে এই প্রাণটা কতটা মূল্যবান তা কি ও জানে? আর ও সেই প্রাণটাকেই মেরে ফেলতে চাইছিল!
ও কি জানে না আমরা আমাদের মৌনতাকে কত সাধ করে পৃথিবীতে এনেছি? ওকে গর্ভে নিয়ে মাসুমা কতরাত পেট ভরে খেতে পারত না। আমি তাকে পর্যাপ্ত পরিমাণে সুখ স্বাচ্ছন্দ্যে রাখতে পারিনি। কিন্তু আমাদের এই দৈন্য কোনদিন ঐ একটুকরো জান্নাতের উপর পড়তে দেইনি।”
নেওয়াজ সাহেব রক্তাভ নেত্রে শ্বাস ফেললেন।
অসুস্থতার কারণে কথা বলতেও মাঝেমধ্যে কষ্ট হয়ে যায়। তবুও সে থামে না। ফের বলতে শুরু করে,
–“মাটির পুতুলের মতো আমার মেয়েটাকে বড় করেছি আমি। আর আজ বাবা হয়ে আমি কি-না আমার মেয়েটার মৃত্যুর ষড়যন্ত্রের নৃশংস গল্প শুনছি? মেয়ে বিয়ে দেওয়া কি পাপ, তপোবন? আমার মেয়েটা মৃত্যুর সাথে লড়ছে! ওর দোষ কি ছিল তপোবন? আজ পর্যন্ত ওকে স্বামীর সাথে উঁচু গলায় কথা বলার কথা শুনিনি আমি। আর না এমন শিক্ষা দিয়েছি। ও আর পাঁচটা মেয়ের মতো দুনিয়ার এই রঙ্গমঞ্চের চাকচিক্যের সাথে তাল মিলিয়ে চলা মেয়ে নয়। আমার মেয়েটা যে একটুকরো পরশ পাথর! তার জীবনের মানে শুধু ভালোবাসা বিলি করা আর সহনশীলতা। তাই বলে এর পরিবর্তে ওকে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হবে? এমনটা তো কথা ছিল না, তপোবন? তুমি তো আমার হাত ধরে কথা দিয়েছেলে যে— সবসময় আমার আমানতের রক্ষা করবে, তবে আজ পরিস্থিতি এত কঠিন কেন? একই ঘরে থেকেও তোমরা একটা কেউ একটু খেয়াল করোনি, আমার মেয়েটা কত আজাবের মধ্যে দিন কাটিয়েছে?”
অনুভূতি নয়, এক অসহায় বাবার আহাজারি ছিল অশ্রুর প্রতিটা কনায় কনায়। তপোবনের নুয়ে পড়া শিড়ঁদাড়া আর সোজা হতে পারল না। কণ্ঠনালী সহ মন-মস্তিষ্ক ফিকে পড়ে ঐ বাবার আহাজারির কাছে। অন্তঃস্থল চিৎকার করে বলছে, পৃথিবীর সব স্বান্তনা তুচ্ছ এই বাবাটির অসহায়ত্ব, যন্ত্রনার কাছে।
তপোবন স্বান্তনা দিল না। কিয়ৎকাল বাদ নত মস্তকে বলে,
–“ভাইয়েরা বড় হয়ে গিয়েছে। তাদের ব্যক্তিগত জীবনে নাক গলালে তারা বিরক্ত হয়। তাই তাদের নিজের হালে ছেড়ে দিয়েছিলাম, তাঐ। কিন্তু ঘুণাক্ষরেও টের পাইনি আমার নীরবতায়, আমার ভাইটা পশু হয়ে যাবে। আমি কি করে আপনার এই যন্ত্রনার নিরাময় করব? আপনার এই যন্ত্রনার কারণটিকে তার যথাযথ শাস্তি ও বোধহয় এই যন্ত্রনা হ্রাস করতে পারবে না। আমার কাছে মাফ চাওয়ার অধিকারটুকুও নেই, তাঐ।”
নেওয়াজ সাহেব তপোবনের অশ্রুসিক্ত মুখপানে তাকায়। বৃদ্ধ কম্পিত হাত দুটো কোনমতে জড়ো করে বলে,
–“অনেক হয়েছে, তপোবন। মেয়ে বিয়ে দেয়ার মতো পাপের শাস্তি আমি পেয়ে গিয়েছি। তোমার ভাই আমার সবটা নিঃশেষ করে দিয়েছে। এবার যদি আমার মেয়েটা বেঁচে যায় তবে যেটুকু বাকি আছে সেটুকু আমায় ফিরিয়ে দাও। আমি আমার মতো করে আমার মেয়েটাকে সুস্থ করে নেবো। কিন্তু আর এক মুহূর্ত এই আজাবের মধ্যে রাখব না।”
তপোবন চোখ তুলে তাকায়। সুদৃঢ় কণ্ঠে বলে,
–“ও শুধু আপনার আমানত নয় তাঐ, আমার ছোট বোন ও। ওকে বাহিরে নিয়ে গিয়ে আমি সবচেয়ে উন্নত চিকিৎসার ব্যবস্থা করব। ও আবার আমাদের মাঝে সুস্থ সবল ভাবে ফিরে আসবে!”
নেওয়াজ সাহেবের ম্লান হেসে ধিমি কণ্ঠ বললেন,
–“আমায় স্বান্তনা দিও না, তপোবন। তোমার থেকে এই স্বান্তনা আমি নিতে পারছি না যেখানে তোমরাই আমার দুঃখের কারণ!”
–“আমি স্বান্তনা দিচ্ছি না, তাঐ। মৌনতা তো আমাদের ও দায়িত্ব…”
তপোবন বাক্যটি শেষ করতে পারে না। তার আগেই গর্জে উঠল এতক্ষণ যাবৎ নিজেকে সংযত করে রাখা নেওয়াজ সাহেব। ক্রন্দনরত গলায় চেঁচিয়ে উঠল অসুস্থ লোকটি।
–“দায়িত্ব? কিসের দায়িত্বের কথা বলছো তুমি? যখন দিনের পর দিন আমার মেয়েটাকে শেষ করে দিচ্ছিল, তখন তোমাদের কোনো দায়িত্ব ছিল না? একই ঘরে থেকেও, একটাবার তোমরা আমার মেয়েটার খোঁজ খবর নাও নি। অথচ ও দিনের পর দিন তোমার ভাই আর তার সংসারের জন্য কষ্ট সহ্য করে গিয়েছে। আমার বাড়িতে একটারাত থাকতে দিত না। আমি কখনো কোনো প্রতিবাদ করিনি এর জন্য। কারণ ওর স্থায়ী ঠিকানা ওর স্বামীর বাড়ি এটা ভেবে। কিন্তু এর প্রতিদান হিসেবে আমায় কি দিল? আমার মৃতপ্রায় মেয়েটাকে? আজ যদি আমার মেয়ের কিছু হয় তবে তার জন্য তোমরা সবাই দায়ী। তোমরা সকলে খু”নী! সিকদার পরিবার একটা খু”নী পরিবার!”
তপোবন সহ তকদির সিকদারের বদনে কম্পন ধরে অভিযোগে ভরপুর সেই চিৎকারে। কি করে বলবে যে —তাদের মেয়ে নিদারুণ ধৈর্য্য সহ্যের অধিকারী! যার স্নিগ্ধ হাসির আড়ালে চাপা পড়ে যায় এক পৃথিবী সমান ক্লেশ!
আই সি ইউর সেই গলির দিকে নিষ্পলক তাকিয়ে থাকা ছেলেটির মাঝে কোনরূপ হেলদোল দেখা গেল না। সে নিরবে নায়েলকে বুকে চেপে ধরে বসে আছে। একবারের জন্য ও ঐ গলি থেকে দৃষ্টি সরায়নি। চোখেমুখে রাজ্যের প্রতীক্ষারা আনাগোনা। এই বুঝি ডক্টর আসলো কোনো সুসংবাদ নিয়ে।
অসুস্থ নেওয়াজ সাহেবের মাত্রারিক্ত রাগ, চিৎকার তার শারীরিক সহনশীলতার উর্ধ্বে হওয়ায়, ভেঙে পড়তে নেয় তার দেহ। ক্রন্দনরত মৌমিতা ছুটে যায় বাবাকে আগলে নেয়ার জন্য। তার পূর্বেই তপোবন নুব্জ্য দেহটিকে আগলে নেয়। নেওয়াজ সাহেব ব্যথাতুর আর্তনাদ করে কান্নায় ভেঙে পড়ে। এই মুমূর্ষু শরীরে ঐ ফুলটির এই দশা যে সহ্য করা কষ্টদায়ক। নেওয়াজ সাহেব তপোবনের হাত আঁকড়ে ধরে আহাজারি করে বলে,
–“আমার মৌনতার তো এটা প্রাপ্য নয়, তপোবন। তবে কেন তাকে এভাবে শেষ করে দেওয়া হলো? আমার মেয়েটার কি দোষ ছিল, যার জন্য ওকে এভাবে শাস্তি দেওয়া হলো?”
–“তার প্রাপ্যটা তাকে দেওয়া এবং তাকে সুখী হতে দেখার জন্য হলেও, আপনার দেহে এখনো অঢেল শক্তির প্রয়োজন আঙ্কেল!”
বাম হাতটিতে শক্ত পোক্ত এক হাতের মুঠোবন্দী হতেই নেওয়াজ সাহেব অশ্রুসিক্ত নয়ন তুলে তাকায়। এরোজ থমথমে মুখে পুনরায় বলল,
–” উঠুন, আঙ্কেল! ভেঙে পড়বেন না। পশুত্ব সবসময় জিতে যেতে পারে না। বাবারা তার সন্তানের জন্য সকল পশুর বিরুদ্ধে লড়তে জানে। আপনাকেও লড়তে হবে আপনার মেয়ের জন্য। ঐ পশুকে তার শাস্তি দিয়ে আপনার মেয়ের সুস্থতা আর সুখ নিশ্চিত করতে হবে। ইউ হ্যাভ টু বি মোর স্ট্রং।”
পুরুষালী পল্লবদ্বয় ভেজা, চোখ টলমলে! ছেলেটা কাঁদছে। তপোবন দমবন্ধকর অনুভূতি সামলাতে না পেরছ নত মস্তকে বেরিয়ে যায় হাসপাতাল থেকে।
অর্থবিত্তের জৌলুস, অহমিকা, দাপটে কোণঠাসায় আলোড়িত সিকদার বাড়িটি আজ কেমন তমসাবৃত হয়ে আছে। যেখানে নেই কোনো সুখের ছোঁয়া, আছে শুধুই প্রিয় মানুষগুলোর বর্বরতার পাশবিক চিত্র।
বিকাল তিনটায় বাড়ি ফেরে নির্জনা বেগম। শরীরের সাথে পেরে উঠেনি নির্জনা বেগম বয়স হয়েছে একটুতেই দেহ মন ভেঙে পড়ে। সেখানে অন্তরালে লালন করা সবচেয়ে ঘৃণ্য ভয়টাই আজ নৃশংস বাস্তবতা হয়ে প্রকট হয়েছে। নির্জনা বেগমের দম্ভ, ঋজু শিরদাঁড়া, মাতৃত্ব আর মাথা উঁচু করে বাঁচার সবটুকু শক্তি তার সন্তানের হাত ধরেই আজ ধূলোয় মিশে গেল। তাই তো এসেছে থেকে এখন পর্যন্ত দরজার খিল খোলেনি।
একটা বৈবাহিক সম্পর্কে শুধু একজন নারীর-ই শতভাগ এফোর্ট থাকবে আর স্বামী নামক মানুষটা তার দৃষ্টিটুকু সংযত রাখতে পারবে না? এ কেমন নিয়ম? নির্জনা বেগম পূর্ব অভিজ্ঞতায় এত বাজেভাবে দিক্ষিত— যে তার মস্তিষ্কে এঁটে গিয়েছে সংসার ভাঙনের মূল কারণ হয় একজন নারী! নারীরা স্বাধীনতার যোগ্য নয়! তাদের সৌন্দর্য বিছানায় আর স্বামীর পদতলে। এর বাইরে তারা দৃষ্টি মেলে তাকালে তারা হয় ব্যভিচার! খুন্তি আর স্বামীর সেবাই তাদের হাতের সৌন্দর্য হবে। এই বিকৃত চিন্তাগুলোর প্রতিরূপ হিসেবে গড়ে তোলে সে মৌনতাকে।
বিয়ের পর থেকেই ছেলের বউয়ের উপর এই বিকৃত চিন্তাধারা হাঁটতে বসতে প্রয়োগ করে। আর স্বল্প চাওয়ার মেয়েটি তা সানন্দে গ্রহন করে দিনশেষে স্বামীর সাথে সুখে ঘর করার জন্য। কিন্তু নিয়মগুলো এক পাক্ষিক কেন? ছেলের বউয়ের মতো ছেলের নাকে কনে ঢুকিয়ে দেওয়া উচিৎ ছিল —তার সৌন্দর্য স্ত্রীর মান, বিশ্বাস, একাগ্রতা এবং তার ধৈর্য্য কে সম্মান করা। দৃষ্টি সংযত করা, সংসারের প্রতি , স্ত্রী-সন্তানের প্রতি সদয় হওয়া। কিন্তু আফসোস নির্জনা বেগম শুধু তার ছেলেদের শ্রেষ্ঠ মা-ই হয়ে গেলেন কিন্তু একজন নারী কিংবা উত্তম শাশুড়ি হয়ে উঠতে পারেনি। তাই তো আজ তার নিজের গর্ব ই তাকে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিলো তার শিক্ষার খামতি!
রাত সাড়ে দশটা। শাশুড়ির বদ্ধ দরজার সামনে থেকে তৃতীয় বারের মতো খাবার হাতে ফিরে এল রূপকথা। সর্বদা হাঁক ডাক পিটিয়ে বেড়ানো মানুষটা এসে থেকে এমন নীরব হয়ে গেল কেনো? অতিরিক্ত খতিয়ে দেখার সাধ আর জাগলো না ছোট্ট মনটিতে। জীবনটা যেদিন থেকে বদলেছে সেদিন থেকে রপ্ত করা অভিজ্ঞতা গুলো একটু বেশিই কঠিন। চোখের সামনে একটা মানুষের সাথে এমন পাশবিকতা করে গিয়েছে একটা মানুষ। আর তাদের একটু টের পেতে দেয়নি ঐ মানুষটা। নীরবে হাসিমুখে সহ্য করে গিয়েছে একটু স্বামীর মন পাওয়ার জন্য। এতদিন ভাবত দূর্ভাগা বোধহয় সে একা! তার মতো কঠিন জীবন আর কারোর না—কিন্তু মানুষটা যে তাকে বাজেভাবে মিথ্যা প্রমাণ করলো! সে যে সবচেয়ে সুখী মানুষ! তার মাথার উপর এমন একটা ছায়া আছে যা তাকে পৃথিবীর সকল বর্বরতা থেকে আগলে নেয়। কিন্তু মৌনতা ভাবী? একটা নারী ঠিক কতটা ধৈর্য্য সহ্যের অধিকারী হয় সে আন্দাজা করতে পারল না।
মানুষটার বিশ্বাসের গভীরতা আর তীব্রতা যতটা ছিল, তার থেকেও দ্বিগুণ ভয়ঙ্কর ছিল মানুষটার পরিণতি।
রূপকথা খাবার রেখে আসে। বসার ঘরের মেঝেতে পা গুটিয়ে গুনগুনিয়ে কাঁদতে থাকা জবা আর মাজেদাকে দেখে উষ্ণ নিঃশ্বাস ফেললো সে। বলল,
–“আপা, চাচি না কান্না করে নামায পড়ে ভাবির জন্য একটু দোয়া করুন। দেখবেন সে সুস্থ হয়ে যাবে।”
জবা চোখের পানি মুছে মাথা নেড়ে বলল,
–“ঠিক কতা কইছেন ভাবিজান আমি এহনি যাইতেছি। আল্লাহর কাছে বিচার দিবো যেন ঐ নরপশুরে আল্লাহ উচিৎ শাস্তি দেয়। অয় কোনোদিন যেন সুখ না পায়। পৃথিবীর সব সুখ আমার মাইজ্জা ভাবিজানরে দেয় যেন। সে সুস্থ হইয়া যাক আগের মতোন।”
বলতে বলতেই জবা ফের ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল। আট বছর যাবৎ এই বাড়িতে কাজ করছে। কিন্তু যখন থেকে মৌনতা এই বাড়িতে আসে তার সুখ দুঃখের একটা সঙ্গী হয়, বন্ধু হয়। সে পরিবার, জীবনের সব চাহিদা ছেড়ে এই বাড়ির খুঁটি আঁকড়ে জীবন কাটাতো শুধু ঐ মানুষটার কারণে।
তপোবন ভাইজান বহুবার বলছে, বিয়ে করে সংসারী হইতে কিন্তু সে হয়নি। আল্লাহ ক্যান তার প্রিয় মানুষগুলারে কাইড়া নেয়?
রূপকথা ছেলের ঘরে উঁকি দেয়। পুরো ঘরের ন্যায় ঐ মুখটিতেও আজ আঁধারের ঘনঘটা। মায়ের ডায়রি পড়ছে আর কাঁদছে। সে বিরক্ত করল না ছেলেকে। কখনো কখনো মায়ের মতো কাউকে নয় বরং মাকেই খুব প্রয়োজন হয়।
ডায়রির শেষ পৃষ্ঠাটা পড়তে পড়তেই তানশান ফুঁপিয়ে কাঁদছে। অনুযোগ ভরা কণ্ঠে বলল,
–“মাম্মা, আল্লাহ কেন আমার সাথে সবসময় এমন করে? সবাইকে কেন আমার থেকে কেড়ে নিতে চায়? তোমার মতো মেজো মাকেও কঠিন রোগ দিয়েছে। তুমি তো আল্লাহর কাছে আছো তাকে একটু বলো না, মেজো মাকে সুস্থ করে দিতে। প্লিজ মাম্মা।”
ছেলের আর্জি শুনে রূপকথার মুখে মলিন হাসি ফুটে উঠল। নীরবে সরে যায় দরজা থেকে। ঘরে যেতেই বহুল প্রতীক্ষিত কাঙ্খিত নাম্বারটি থেকে ফোন আসে। কানে ঠেকালে নিস্তব্ধতা, চাপা যন্ত্রনারা এসে বাড়ি খেল।
রূপকথা ক্ষীণ স্বরে শুধায়,
–“ভাবির কি অবস্থা?”
তপোবন টলটলে নেত্রে তাকিয়ে রইল ব্যস্ত শহরের পানে। বলল,
–“আমার ভাই, ঐ রুগ্ন দেহটাকে এত বাজেভাবে ভেঙেছে যে—এবারের মতো বেঁচে গেলেও আর কোনোদিন মেয়েটা একটা সুস্থ সুন্দর জীবন পাবে না, রূপকথা। এমন কঠিন রোগ বাসা বেঁধেছে এরপর বেঁচে থাকাই ওর জন্য হুমকিস্বরূপ হয়ে দাঁড়াবে। আমি এখানে দাঁড়িয়ে থাকতে পারছি না, ওর বাবা মায়ের মুখের দিকে তাকাতে পারছি না, রূপকথা। আমার দম বন্ধ হয়ে আসছে আমার পৃথিবীটা পাশবিকতায় ভরা।”
রূপকথার চোখ লাল হয়ে উঠল। সে শুনেছে সবটা কিন্তু মানতেই পারে না তাদের সামনে হাসিখুশি চলাফেরা করা মানুষটার ভেতরটা এভাবে তিলে তিলে শেষ করে দিচ্ছিল। ঘৃণায় ভেতরট বিষিয়ে আসে তার।
সে ঐ মানুষটাকে হারাতে চায় না। অসম্ভব হলেও সৃষ্টিকর্তার কাছে আর্জি রাখে, এই জীবনে ঐ মানুষটাকে একটু সুখী হতে দেখার।
সে ক্ষীণ স্বরে বলল,
–“কে বলেছে ভাবি আর কখনো সুস্থ সুন্দর জীবন পাবে না। সৃষ্টিকর্তা যদি কষ্ট দেয় তবে সেই কষ্ট দূর করার জন্য সুখ ও দেয়। আমরা সবাই তার জন্য দোয়া করব, সে আবার আগের মতো সুস্থ হয়ে উঠবে।”
তপোবন জবাব দেয় না। কেনন বরাবরই নিকৃষ্ট বাস্তবাতার কাছে সুখগুলো ফিকে পড়ে। জীবন যে এই পর্যন্ত এই অভিজ্ঞতাই দিয়েছে।
–“তানশান কি করছে?”
–“কাঁদছে আর তার মাম্মার কাছে বলছে, আল্লাহকে একটু বলতে যেন তার মেজো মাকে আল্লাহ সুস্থ করে দেয়।”, রূপকথার মিহি স্বরে তপোবন ম্লান হাসল।
তানশান ভাবে, তার মা আল্লাহর সাথে কথা বলতে পারে, গল্প করতে পারে। আল্লাহর সাথে তার মায়ের খুব ভালো সম্পর্ক!
দীর্ঘ চব্বিশ ঘন্টার টাইম লুপ! বদলেছে অনুভূতির বিভীষিকাময় তীব্রতা। বদলে গিয়েছে সম্পর্কের ভিত্তি। ঘৃণা, ক্লেশ, হারানোর যন্ত্রণায় কাতর কিছু আপনজন—নির্ঘুম, ক্ষুধার্ত মানুষগুলো অপেক্ষা করছে কখন মেয়েটি চোখ খুলবে আর তাদের কামনীয় সুপ্ত বেদনা মিশ্রিত হাসি হাসবে।
ঘড়িতে তখন দুপুর বারোটা দশ মিনিট। ডাক্তার মৌনতাকে পর্যবেক্ষণ করে ‘সাময়িক সুস্থ’ বলে জানান।
কিছুক্ষণ আগেই জানায় মৌনতার জ্ঞান ফিরেছে। চূড়ান্ত পরীক্ষা নিরীক্ষা করে তাকে নরমাল কেবিনে শিফট করা হয়। একে একে সবাই দেখা করে যায় নীরবে নিভৃতে। সবার চোখে শুধু চাপা আর্তনাদের ছায়া। কিন্তু কেউ টু শব্দটি করল না।
সবশেষে মৌমিতা ঢোকে বোনের কেবিনে। চোখেমুখে উপচেপড়া ক্ষোভ আর আক্রোশ। দৈহিক যন্ত্রণায় অস্থির গতর সামলে ঝাঁপসা দৃষ্টি মেলে তাকায় মৌনতা। দৃষ্টিসীমায় বড় বোনের মুখটি স্পষ্ট হতেই সে ম্লান হাসে। কণ্ঠ নিঃসৃত হওয়ার বিন্দুমাত্র শক্তি না থাকলেও অন্তঃস্থলের মাতৃত্ব তো উদগ্রীব!
কিয়ৎকাল নিজেকে ধাতস্থ হওয়ার সময় দিয়ে সে ধিমি কণ্ঠে ডেকে ওঠে,
-আপা! নায়েল?”
মৌমিতার অশ্রুরা তখন বাঁধভাঙা। অবর্ণনীয় ক্লেশ লুকিয়ে থমথমে মুখে বলল,
–“বাইরে খেলছে।”
–“একটু ডাকো।”
–“আসলেই কোলে উঠতে চাইবে। ডাক্তার বলেছে একটুও নড়াচড়া করা যাবে না আর না বেশি কথা বলা যাবে।”
ফের বোনের থমথমে কণ্ঠে মৌনতা টলটলে নেত্রে তাকায়। আদুরে গলায় ডেকে ওঠে,
–“আপা!”
মৌমিতা নিজের ক্ষোভ আঁটকে রাখতে পারে না। সে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল। তিরস্কার করে বলে,
–“নেই তোর আপা। মরে গেছে।
–“এমন কথা বলতে নেই, আপা।”
মৌমিতা ফুঁপিয়ে কাঁদতে কাঁদতে বলল,
–“তো কেমন কথা বলব? তুই তো কত আগেই আমাদের মেরে দিয়েছিস, তাই তো এতিমের মতো স্বামীর অত্যাচার সহ্য করেও পরে ছিলি ঐ বাড়িতে। তোর মা-বাবা ভাই বোন কিছু নেই? তুই এতিম? কত সময় ধরে এসব সহ্য করছিস?”,
ক্রন্দনরত গলায় শুধায় মৌমিতা। পুনরায় বলতে শুরু করে,
– একটাবারের জন্য আমাকে একটু বলিসনি এত দুর্বিষহ জীবন পার করছিস? এত কষ্ট সহ্য করে ঐ পিশাচের সাথে থাকতে কেন হবে? তোর বাবার, বোনের এখনো যা আছে তাতে তোকে আর তোর মেয়েকে সোনায় সোহাগা করে রাখতে পারব। কিন্তু তুই কি করলি?
মৌনতা কথার মানে বুঝলেও তাকে অবুঝ দেখা গেল। আপা কি সব জেনে গিয়েছে? সে অবুঝ সতর্ক কণ্ঠে শুধায়,
–“তুমি কিসের কথা বলছো আপা?”
–“ সেই পিশাচের কথা বলছি যার কথা তুই এতদিন ধরে লুকিয়ে গিয়েছিস? কি পেলি এত স্বামী ভক্তির? দিনশেষে তোকে এভাবে গুঁড়িয়ে ভেঙে দিল? তোকে মেরে ফেলতেও ঐ পিশাচ দ্বিধাবোধ করেনি।”
মৌনতার দেহাবয়ব বিচলিত, অস্থির হয়ে পড়ে। নড়তে গেলে মৌমিতা কঠিন গলায় বলল,
–“ডাক্তার নড়াচড়া করতে বারণ করেছে, মৌন। একটুও নড়বি না।”
মৌনতা অস্থিরতা সামলাতে পারে না। পা সহ নিম্নদার ফেটে যাচ্ছে। অদেখাই রয়ে যায় সেই দৈহিক কষ্ট জীবনের টানাপড়েনে! জিজ্ঞেস করে,
–”এসব কি বলছো আপা? ইমরোজ? আমাকে মারতে চাইছে? এমনটা কি করে বলতে পারলে? কেউ কি তার স্ত্রী তার সন্তানের মাকে মারতে চাইতে পারে?”
–“না পারে না। কিন্তু ইমরোজ পেরেছে। নিজের স্ত্রীর দেহে কঠিন রোগ রোগ জেনেও ও লুকিয়ে গিয়েছে যেন ওর পথের কাঁটা আপনাআপনি দূর হয়ে যায়।”
–“কি সব বাজে কথা বলছো? এমন কথা কেন বলছো আপা? আমি জানি সে ভুলপথে আছে কিন্তু কোনো না কোনোদিন অবশ্যই সঠিক পথে ফিরে আসবে। আমি কি এতটাই খারাপ যে, আমায় আমার স্বামী মেরে ফেলতে চাইবে? তুমি রাগের বশে এসব বলছো, তাই না? কোথায় ইমরোজ? নায়েলের সাথে আছে তাই না? নায়েললল! ইমরোজজজজ!”
বলতে বলতেই কেঁদে ওঠা মেয়েটি চিৎকার করে ডাকতে লাগল নায়েল আর ইমরোজকে। মনে মনে শুধু একটাই প্রার্থনা কোনো দুঃস্বপ্ন ও যেন আপার কথাটিকে সত্যি প্রমাণ না করতে পারে। মেয়েটি প্রাণপণে এটাই চাইছে। সহসা একটা চড় এসে পড়লো অন্ধপ্রায়, নির্বোধ মেয়েটির গালে। যে কি-না জীবনে চরম ভাবে হেরে যাওয়ার পরেও মিরাকেলের আশা রাখছে। গালে হাত দিয়ে মৌনতা অবাক পানে তাকায় বোনের দিকে।
মৌমিতা আর সহ্য করতে পারে না ক্রন্দনরত গলায় চেঁচিয়ে উঠল,
–“অনেক হয়েছে, মৌন! ভ্রম থেকে বেরিয়ে আয়। ইমরোজ নেই। ঐ নরপশু তো পালিয়েছে। সে নিজের স্ত্রীর অসুস্থতার কথা লুকিয়ে গিয়ে তার মৃত্যু নিশ্চিত করে আর পরোকিয়ার প্রেমিকের সাথে পালিয়েছে। গতকাল থেকে ইমরোজ একটাবার তোর খোঁজ নেয়নি বরং তাকে খুঁজেই পাওয়া যাচ্ছে না। আর তুই কি-না এখনো ইমরোজ ইমরোজ করছিস? কোন মাটির তৈরি তুই? একটা স্বামী গেলে দশটা স্বামী আসবে মৌন কিন্তু এগুলো কি? তুই কি মূর্খ? কেন ঐ পিশাচের মুখের উপর লাথি দিয়ে চলে যাসনি? দিনের পর দিন ওর করা অত্যাচার সহ্য করে কি পেয়েছিস? বিশ্বাসঘাতকতা?
অতি শোকে সর্বশান্ত হয়ে গেলো মৌনতা। নির্মল চাহনি ফেলে কিয়ৎকাল বাদ শুধায়,
–“আমার কি হয়েছে, আপা?”
মৌমিতা এবার চুপসে গেল। সে এলোমেলো দৃষ্টি ফেলে বলে,
–“কিছু হয়নি। এসব কথা এখন থাক, মৌনতা। শুধু ইমরোজের নাম আর মুখে নিবি না দয়াকরে।”
মৌনতা অশ্রুসিক্ত নয়নে হাসল। মিহি স্বরে বলল,
–“আপা, আমি তোমার ধারনার বাইরে ধৈর্য্য, সহ্যের ক্ষমতা লালন করি। বলো! আমার কি হয়েছে? আমায় যা ভাঙার তা আমার স্বামী ভেঙে দিয়েছে আর কিছু ভাঙতে পারবে না।”
মৌমিতা ঠোঁট কামড়ে কান্না আটকায়। কষ্টে উচ্চারণ করে,
–“লিউকোমিয়া!”
মৌনতার দেহাবয়ব ম্লান হয়ে আসে। শত কষ্ট সহ্য করেও স্বামী সন্তানের সাথে একটা সুন্দর জীবনের যে রঙিন আকাঙ্ক্ষারা মুহুর্তেই ফ্যাকাশে বরণ ধারণ করে। দেহের সকল উদ্বেগ মিলিয়ে গেল। ক্লান্ত, উদাসীন নিঃশ্বাসের সাথে কণ্ঠনালী ঠিকরে বেরিয়ে আসে,
–“সব শেষ?”
মৌমিতা নিষ্পলক চেয়ে থাকে সদ্যই মলিন হয়ে পড়া দেহটির দিকে। দ্রুত এগিয়ে গিয়ে বুকে জড়িয়ে ধরে রুগ্ন দেহটিকে। মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বলে,
–“কোনো চিন্তা করবি না, মৌন। এখন দেশ বিদেশে উন্নত চিকিৎসা রয়েছে এই রোগের। তুই আবার আগের মতো সুস্থ হয়ে উঠবি।”
মৌনতা নিরুত্তর অন্তহীন দৃষ্টিতে তাকিয়ে ম্লান হাসল। মস্তিষ্কে চলা শত শত দ্বন্দ্বরা আজ ছুটি পেয়েছে। অবসর পায় অভ্যন্তরে এতদিনের পুষে রাখা যন্ত্রণারাও। কিয়ৎকাল সেভাবেই নীরবে কেটে যায়।
মৌমিতা খেয়াল করে কিছুক্ষণ আগের চঞ্চল মেয়েটি পাথরের ন্যায় স্থবির, অনুভূতিহীন হয়ে পড়েছে।
মৌমিতা বোনের এই নিরাবতা সহ্য করতে। সে আরো দৃঢ়ভাবে বুকে জড়িয়ে নিয়ে আদুরে গলায় ডাকে,
–“মৌন!”
বোনের কাঁধে মাথা এলিয়ে দিয়ে মৌনতা উদাসীন নেত্রে বলল,
–“আমার অপরাধটা কি ছিল আপা? একটা সংসার-ই তো চেয়েছিলাম। অন্যের সুখের সংসার দেখলে আমার খুব লোভ হতো। তাই আমিও আর পাঁচটা মেয়ের মতো চেয়েছি—যে আমার স্বামী ও আমায় ভালোবাসবে, চোখে হারাবে, আখলে রাখবে আমায় আর আমার সন্তানকে। আমরা একসাথে ঘুমাবো, ঘুরতে যাব, আমাদের তিনজনের একটা সুখের সংসার হবে।
কিন্তু এই অপরাধে আমায় মেরে ফেলতে চাইবে আমার স্বামী? আমি অনেক বড় কিছু চেয়ে ফেলেছি আপা?”
মেয়েটির আফসোসে ভরা কণ্ঠে মৌমিতা ঠোঁট কামড়ে কান্না আটকায়। চোখ তুলে তাকায় বোনের ফ্যাকাসে মুখটির দিকে। কপালে চুমু দিয়ে বলে,
–“তোর কোনো অপরাধ নেই, সোনা। ওরা পিশাচ…!”
মৌনতা ম্লান হেসে বলল,
–“আপা, বলোতো কেমন হতো যদি এইসব আমার দুঃস্বপ্ন হতো? খুব সুন্দর হতো, তাই না? ইমরোজ আমায় ভালোবাসতো। আমি অসুস্থ শুনলে পুরো দুনিয়া এক করে ফেলতো! আমায় আগলে রাখতো! এই মুহূর্তে আমার পাশে থাকতো আর বলতো, “তোমার কোনো ভয় নেই মৌন!” তুমি জানো, দিনের পর দিন যখন ইমরোজের গা থেকে অন্য নারীর সুবাস পেতাম, তখন আমার মনে হতো এই তো আমি ধীরে ধীরে শেষ হয়ে যাচ্ছি। তবুও আমি হাসিমুখে অপেক্ষা করতাম ঐ পথ থেকে ইমরোজের ফিরে আসার। আমি আমার পারফিউম তার শার্টে স্প্রে করে দিয়ে মনকে স্বান্তনা দিতাম!
সৃজা যখন ইমরোজের বুকে মাথা রেখে ছবি তুলতো, তখন আমিও চাইতাম ইমরোজের বুকে মাথা রেখে ছবি তুলতে। কিন্তু ইমরোজ বিরক্ত হতো, গা ঘেঁষাঘেঁষি তার পছন্দ নয়। অথচ রাতে ঠিকই আমায় তার কাছে আগলে নিতো! আমার খুব ইচ্ছা করতো তখন জিজ্ঞাসা করতে, এখন কি গা ঘেঁষাঘেঁষি খারাপ লাগছে না? হয়ে উঠতো না। মনে হতো, এই বুঝি রেগে যাবে ইমরোজ। আর আমাদের মা মেয়ের থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবে।
বিগত দেড় বছর যাবৎ মনে হয়েছে আমি একটু একটু করে মৃত্যুর দিকে এগোচ্ছি। আজ সেটাই চূড়ান্ত হয়ে গেল। ভালো লাগছে খুব! আমি খুব খুশি! এত যন্ত্রণা তো সহ্য করা যায় না! তুমিই বলো সহ্য করা যায়? যায় না তো! ভালো হয়েছে খুব ভালো হয়েছে। আমার মরা’ই উচিৎ। যেখানে পুরো পৃথিবীর নারীরা স্বামীর ভালোবাসা পায় সেখানে আমি পেলাম অবহেলা, বিশ্বাঘাতকতা, নৃশংসতা। আমার বেঁচে থাকার কোন অধিকার নেই!”
বলতে বলতেই মেয়েটির কালচে চোখের কার্নিশ বেয়ে অবাধে অশ্রু গড়িয়ে পড়ল। কণ্ঠনালী রোধ হয়ে আসে ঊর্ধ্বশ্বাসের কারণে। বদন অস্বাভাবিক ভাবে ঘেমে ওঠে। চোখের সামনে সব ধোঁয়াশা হয়ে আসতেই মেয়েটি ধীরে ধীরে ফের নিস্তেজ হয়ে পড়ল মৌমিতার বুকে।
মৌমিতা কাঁদতে কাঁদতে অচেতন মুখটিতে চুমুতে ভরিয়ে তোলে।
দরজার কাছে দাঁড়িয়ে থাকা সুবিশাল দেহটি সহ অন্তঃস্থলে কাঁপন ধরায়, স্বামী সংসার বাঁচানোর শেষ প্রচেষ্টায় বাজেভাবে ব্যর্থ হওয়া নারীটির আর্তনাদ।
অন্তঃস্থল বলেই ফেলে,
“কি হতো! এ যাত্রায় মেয়েটির পৃথিবীটাকে টুকরো টুকরো করে ভেঙে না দিলে? কি হতো! এযাত্রায় মেয়েটির বোকা প্রচেষ্টাগুলোকে সফল করে দিলে?”
এরোজের অশ্রুসিক্ত নম্র মুখটি অস্বাভাবিক ভাবে শক্ত হয়ে উঠল ঐ কান্নারত মুখটি দেখে! দেড় বছর? দেড় বছর যাবৎ জাহান্নামের এই জীবন অতিবাহিত করেও, একজন নারী কিভাবে সেই জাহান্নামের জীবনের জন্য কান্না করছে? সে আরেকবার এক পলক দৃষ্টি মূর্ছা যাওয়া নারীটির দিকে চেয়ে বেরিয়ে এলো হাসপাতাল থেকে।
গাড়িতে বসে কাউকে ফোন লাগায়। চোখেমুখে তার মৃদু হিং*স্রতা স্পষ্ট। গাড়ি স্টার্ট দিতে দিতে শুধায়,
–“ খোঁজ পেয়েছিস?”
সৈকত ইতস্তত করে বলে,
–“শুভ বলেছে, গতকাল রাত দশটার দিকে একবার ফোন অন করেছিল। তখন লোকেশন ছিল সাতক্ষীরায়। আমি পরিচিত একজনকে দিয়ে খোঁজ নিয়েছিলাম, একটা আবাসিক হোটেলের ঠিকানা ওটা। হোটেলের মালিক তথ্য দিতে চায়নি।”
এরোজ চোয়াল শক্ত করে বলে,
–”ঠিকানাটা পাঠা।”
ফোনের পর্দায় ঠিকানাটা ভেসে উঠতেই এরোজের দৃষ্টিতে এক নিমেষের তীক্ষ্ণতা খেলে গেল। অতঃপর হাওয়ার বেগে ছুটলো গাড়িটি। তপোবন ছুটতে ছুটতে এসেও ধরতে পারল না ভাইকে। তার আগেই গাড়িটি গ্যারেজ থেকে বেরিয়ে যায়। এক অশুভ দুশ্চিন্তা তপোবনকে গ্রাস করল।
এরোজের হাতে যদি কোনমতে ইমরোজ পড়ে তবে ও জনে মেরে ফেলবে এতে কোনো সন্দেহ নেই। জীবনে কম বিশ্রী ঘটনা তো ঘটলো না। এখন কি এক ভাইয়ের হাতে আরেক ভাইকে মরতে দেখার মতো দৃশ্যের ও সাক্ষী হতে হবে?
সে দ্রুত যশোরের পুলিশকে ফোন করে। ওপাশ থেকে দায়িত্বরত কর্মকর্তার নির্লিপ্ত কণ্ঠ আর ব্যর্থতার ফিরিস্তি শুনে সে হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে হিসহিসিয়ে বলল,
–“এরোজ এখানে বসে ইমরোজের ঠিকানা বের করে ফেলেছে অথচ আপনারা আপনাদের পুরো ফোর্স লাগিয়েও খুঁজে পাচ্ছেন না? আদৌ খুঁজেছেন কি? না-কি পকেট আরো গরম করতে হবে? আমি এরোজের লোকেশন পাঠাচ্ছি ওর পিছু অন্তত নিতে পারবেন?”
তপোবন ফোনটা কাটতেই এসপি সাহেব প্রচণ্ড রাগে সেটি টেবিলের ওপর আছাড় মারলেন। দাঁতে দাঁত চেপে বিড়বিড় করে বললেন,
–“শা*লা*র রাজনীতিবিদ! নিজেদের পা চাটা চামচা পেয়েছে! ফ্যামিলি ম্যটারেও পুলিশদের দিয়ে দৌড় করাবে! আরে সরিষা ক্ষেতে যাওয়ার সময় ভাইকে আটকাতে পারিসনি?”
বিছানায় আধশোয়া হয়ে বসা ইমরোজ ক্লান্ত চিন্তিত বদনে মাথা এলিয়ে দেয় হেডবোর্ডে। অশান্ত মস্তিষ্কে এক সেকেন্ডের জন্য নিশ্চিন্তে ঘুমাতে পারেনি। মাথাটা ফেটে যাচ্ছে!
চেয়েছিল মুখ লুকিয়ে না থেকে যাবে সবার সামনে। কিন্তু সাহস হয়নি!
ইমরোজের এমন অস্থিরতায় পাশে শুয়ে থাকা সৃজা বিরক্ত হয়ে উঠে বসল। গায়ের কম্ফোর্টার সরিয়ে নাইট ড্রেসের ওপর আলগা শ্রাগটি জড়িয়ে নিয়ে তিরিক্ষি মেজাজে বলল,
–“শুধু শুধু এখানে বসে নিজেও চিন্তা করছো আমায় ও চিন্তায় ফেলছো! কি হতো গেলে? এখন তো সবার সন্দেহকে সত্যিই প্রামাণ করে দিলে! প্রত্যেকবার নিজে ভুল সিদ্ধান্তের নিবে আর এভাবে প্রস্তাবে। নিজের সাথে সাথে আমাকেও লুকিয়ে থাকতে হচ্ছে। এটা কোনো জীবন?”
ইমরোজ রেগে গেল,,
–“কার জন্য ভুল সিদ্ধান্ত নিতে হয় প্রত্যেকবার আমায়? তোমার জন্য! শুরু থেকেই কি তুমি চাপ দাও নি? তোমার চাপের কারণেই আমি ভুল সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়েছি। সেদিন যদি ভরা সমাজে এরোজের মুখের ওপর না করে দিতে তাহলে আর আমায় ভয় পেয়ে তোমায় এত তাড়াতাড়ি বিয়ে করতে হতো না।
আর কিছুদিন ধৈর্য্য ধারণ করলেই ল্যাটা চুকে যেতো নিজে থেকেই। কিন্তু এখন! সব শেষ! তুমি কি ভাবো, আমি আর ঐ বাড়িতে পা দিতে পারব? আব্বু কোনোদিন মানবে না আমাদের। আব্বু আর ভাইজান সবচেয়ে ঘৃণা করে চরিত্রহীন ব্যক্তিকে!
সৃজার মুখশ্রী বিবির্ণ হয়ে পড়ে। আতঙ্কিত কণ্ঠে শুধায়,
–“কি বলছ ইমরোজ? বাড়িতে ঢুকতে দেবে না মানে? তুমি যাই করে থাকো না কেন! তুমি ঐ বাড়ির ছেলে। ওই বাড়ির প্রতিটি ইটের ওপর তোমার আইনগত অধিকার আছে। তুমি নিজের প্রাপ্য কখনো ছেড়ে দেবে না।”
-প্রশ্নই আসে না। আমায় ভাবতে দাও। চুপ করো এখন। আমায় আমার অধিকার দিতেই হবে। এই ব্যাপারে এক রত্তি ছাড় দেবো না আমি। আমার ও এফোর্ট রয়েছে এই কোম্পানি আর সংসারের পেছনে!
সৃজা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল। হঠাৎ করেই দরজায় সজোরে কড়াঘাত হতেই ইমরোজের অন্তরাত্মা কেঁপে উঠল। ধীরে ধীরে সেই কড়াঘাত ক্ষিপ্ত হারে বাড়তে লাগল। সৃজা বিচলিত নয়নে তাকায় ইমরোজের দিকে। ইমরোজ শুকনো ঢোক গিলে তাকে ব্যর্থ স্বান্তনা দেয়।
কম্ফোর্টার দিয়ে বেরিয়ে শর্টসের উপরে বাথরোব পড়ে নিয়ে সাহস করে পা বাড়ায় দরজার দিকে। যেতে যেতেই মনে হলো দরজা ভেঙে ঢুকে পড়বে কেউ।
সে বুকভরা সাহস নিয়ে দরজার লক খুললো। খুলতেই কিছু বোঝার আগেই সদ্য শেষ করা কেরু মদের বোতলটি সজোরে তার মাথায় চুরমার হয়ে গেল।
কাঁচের টুকরো আর মদের তীব্র গন্ধে ঘরটা ভারী হয়ে উঠল। ইমরোজের চোখের সামনে সবকিছু ঝাপসা হয়ে এল। আর্তনাদ করার সুযোগটুকু পাওয়ার আগেই একটি শক্তিশালী মুষ্টির আঘাতে তার চোয়ালের হাড় মড়মড় করে উঠল।
এরোজ হিংস্র পশুর ন্যায় ঝাঁপিয়ে পড়ল তার উপর,
–“শু//য়ো//রে//র বা//চ্চা! বউ বাচ্চাকে ওখানে মরতে রেখে তুই এখানে বসে ন”ষ্টা”মি করছিস?”
সৃজা ভয়ার্ত কণ্ঠে চিৎকার করে উঠল।
–“ইমরোজজ!”
সে ছুটে গিয়ে এরোজকে থামাতে যায়। এরোজকে সজোরে ধাক্কা দিয়ে কর্কশ স্বরে বলল,
–“এরোজ! তোমার সাহস কি করে হয় বড় ভাইয়ের উপর হাত তোলার?”
এরোজ তড়াক চাহনিতে তাকায় অশ্লীল পোশাকে আবৃত মেয়েটির দিকে। মুহুর্তেই ইমরোজকে ছেড়ে সে তেড়ে যায় তার দিকে, হিংস্র কণ্ঠে বলে ওঠে,
–“শা/লী/র স্লাট! আগে তো তোকে মেরে নেই। তোকে আজ জাহান্নাম দেখিয়ে ছাড়ব।”
বলেই সপাটে বাম গাল বরাবর দেহের সর্বশক্তি দিয়ছ একটা চড় বসিয়ে দেয় এরোজ। সৃজা মাথা ঘুরে গেল কিন্তু মাথা তোলার সু্যোগ পায় না তার আগেই আরেকটা প্রকান্ড পুরুষালী দৈত্যের ন্যায় শক্তিশালী চড়ে চোয়াল খুলে পড়ার জোগাড়। একাধারে কয়েকটা ঝপাঝপ চড় পড়তেই থাকে। সৃজার ঠোঁটের কোনা ফেটে রক্ত ঠিকরে বেড়িয়ে আসে।
সে মেঝেতে লুটিয়ে পড়লে এরোজ হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে তার গলা চেপে যেন সে বদ্ধ উন্মাদে পরিণত হয়েছে। শরীরে ভর করে অস্বাভাবিক দানবীয় শক্তি। বাতাবরণে বিষাক্ততা সৃষ্টিকারী ঐ শ্বাস প্রশ্বাসকে বন্ধ না করে দম ফেলবে না।
ইমরোজ তখনো নিজেকে সামলে উঠতে পারছে না। মুখশ্রী তার রক্তাক্ত। কপাল চুঁইয়ে চুঁইয়ে রক্ত গড়িয়ে পড়ছে। চোখের সামনে সব ঝাঁপসা হয়ে আসছে।
তবুও সৃজার গোঙানি শুনে সে টলতে টলতে উঠে দাঁড়াল এবং সর্বশক্তি দিয়ে এরোজের মুখে এক ঘুষি বসাল। কিন্তু এতে এরোজ দমার বদলে আরও হিংস্র হয়ে উঠল। সে সৃজাকে দেয়ালের সাথে চেপে ধরল। পা মাটি থেকে শূন্যে উঠে যাওয়ায় সৃজার চোখ উল্টে যেতে লাগল।
ক্ষোভে ফুঁসতে থাকা এরোজ হিসহিসিয়ে বলল,
–“ তুই মেয়ে না-কি অন্যকিছু? কি করে পারলি একটা মেয়ে হয়ে আরেকটা মেয়ের জীবন শেষ করে দিতে? তুই জানিস না ও বিবাহিত? ওর বাচ্চা আছে, কু//ত্তা//র বা//চ্চা? তারা তরপাচ্ছে ওর জন্য আর তুই কি-না!”
সৃজা মরণপণ যন্ত্রণায় পা ছুড়ছে। মুহুর্তেই মেয়েটি মৃত্যু যন্ত্রণায় ছটফট করতে লাগল।
কিন্তু তন্মধ্যেই একটা ধাতব পদার্থ নির্দয়ভাবে ছুঁয়ে গেল এরোজের মাথা।
এরোজের হাত শিথিল হয়ে আসে। মাথা আঁকড়ে ধরে বসে পড়ে মেঝেতে। ইমরোজ চোয়াল শক্ত করে ফুলদানিটা দিয়ে এরোজের মাথায় আরেকটা আঘাত দিতে যাবে, তার আগেই এরোজ সবেগে তার নাক বরাবর একটা ঘুষি বসিয়ে দিল। ইমরোজের নাক ফেটে রক্ত বেরিয়ে আসে।
অপরাহ্নে উপসংহার পর্ব ৪৪
এরোজ আবারও ঝাঁপিয়ে পড়তে চাইল, কিন্তু ঠিক তখনি পুলিশ ঝড়ের বেগে ঘরে ঢুকে পড়ল। দু’জন কনস্টেবল দ্রুত উন্মত্ত এরোজকে নিজেদের আয়ত্তে নিয়ে নেয়।
দেয়াল ঘেঁষে পড়ে থাকা সৃজা নিস্তেজ দেহে কাঁশতে লাগল। সে অনুভব করল তার কান দিয়ে গরম কিছু গড়িয়ে পড়ছে।
ঘন ঘন শ্বাস নিতে নিতে সে নিজের কানে হাত দেয়। রক্তে ভেজা হাত দেখে তার দুচোখ ছানাবড়া হয়ে গেল। চারপাশের সব শব্দ যেন হঠাৎ থেমে গেছে; তার শ্রবণশক্তি স্তব্ধ। সে আতঙ্ক জর্জরিত কণ্ঠে চেঁচিয়ে উঠল,
“ইমরোজ!”
