অপরাহ্নে উপসংহার পর্ব ৪৪
তোনিমা খান
–“এই মৌনতা? চোখ খুলুন, মৌনতা শুনছেন?”
এরোজ রক্তমাখা হাতেই উদ্ভ্রান্তের মতো মৌনতার গাল চাপড়াচ্ছে আর ডাকছে। আ’ত’ঙ্কে অচিরেই যে ভেতরের সুপ্ত এক সত্ত্বা বেরিয়ে আসছে। কিন্তু সর্বদা ঘরময় টো টো করে ঘুরে বেড়ানো মেয়েটি আজ যারপরনাই নিস্তেজ, নিস্প্রভ। ঠিক যেন এক নিথর লাশ!
অজানা আ’ত’ঙ্ক মিশ্রিত শঙ্কায় দেহ ক্রমশই বলহীন অনুভব করছে। জড়তা, ইতস্ততায় হাত পা গুটিয়ে আসছে। তবুও অন্তরাত্মা পাগলা ঘোরার ন্যায় ছটফট করছে এই মুহুর্তেই মানুষটির সব কষ্ট দূর করতে হবে।
এত রক্ত কেন? মানুষটার কি খুব কষ্ট হচ্ছে? নিঃশ্বাসের সাথে আর্তনাদ মিশে যাচ্ছে।
মানুষটাকে এভাবে সে কখনো দেখেনি। দেখতেও চায় না। এরোজের হাত পা থরথরিয়ে কাঁপছে। গলা শুকিয়ে আসছে। টলমলে চোখে পুনরায় তাকায় নিজের রক্তে রঞ্জিত হাতটির দিকে। শরীরের এক একটা কোষ জমে আসছে অজানা ভয়ে। বাড়ন্ত হাতটি বারবার থমকে যাচ্ছে।
নির্জনা বেগম অদ্ভুত নয়নে তাকায় অস্বাভাবিক আচরণে লিপ্ত ছোট ছেলের দিকে। সতর্ক চাহনি ফেলে শুধায়,
–”এরোজ এমন করছো কেন?”
এরোজের সম্বিৎ ফিরে। সে এলোমেলো চঞ্চল দৃষ্টিতে তাকায় সকলের দিকে। রূপকথা বিবর্ন মুখে বলে,
–”ছোট ভাইজান, ভাবির পুরো শরীর রক্তে ভিজে উঠেছে। ওনাকে হাসপাতালে নিতে হবে।”
–”হুঁ, আমি…আম্মা…ওনার এত ব্লিডিং হচ্ছে কেন? তুমি…তুমি এসো আমার সাথে।”
এরোজ তোতলাতে তোতলাতে বলেই দ্রুত কম্পিত হাতে পুনরায় অচেতন দেহটিকে কোলে তুলে নেয়। তুলতেই অফহোয়াইট কালারের রক্তমাখা সোফাটি দেখে তার দেহের রক্ত টগবগিয়ে উঠতে লাগল। বক্ষস্থলে দামামা বাজছে। মন বলছে, আর একটুও যদি দেরি হয় তবে সব শেষ হয়ে যাবে।
এরোজ আর এক মুহূর্ত বিলম্ব করে না উন্মাদের মতো ছুটে বেরিয়ে যায় বাড়ি থেকে।
নির্জনা বেগম দেহে আলগা একটা শাল জড়িয়ে নিয়ে ছেলের পিছে ছুটলো। যেতে যেতে রূপকথার উদ্দেশ্যে বলে,
–”ঘরের দিকটা সব সামলে নিও, বড় বউ মা। নায়েলকে নিয়ে মৃন্ময় আসলে বলবে, আমরা শিঘ্রই চলে আসব।”
রূপকথা দরজার হাতল ধরে বলে,
–”আপনি চিন্তা করবেন না, আম্মা। আমি সব সামলে নেবো।”
মুহুর্তেই মৌনতার রক্তে একে একে ভিজে উঠল এরোজ সহ গাড়ির সিট। নির্জনা বেগম অনবরত কোলে থাকা মাথাটিতে হাত বুলাচ্ছে আর ডেকে চলেছে মৌনতাকে।
বাহুতে চোখ মুছতে মুছতে উদ্ভ্রান্ত এরোজ বারবার পেছনে ফিরে দেখছে ঐ ভঙ্গুর, নিস্তেজ দেহটিকে। চোখের পানি বাঁধ ভাঙা হয়, যখন দেখল তার দেখা সেই মেয়েটির সাথে এই মেয়েটির কোনো মিল-ই নেই।
এ যেন এক নরকঙ্কাল!
আগে তো কখনো একটু পূর্ণ চোখে খুঁটে খুঁটে দেখার সাহস হয় নি। আর আজ যখন দেখল, তখন এমন বিপর্যস্ত এই অবস্থা কেন?
এক হাত স্টিয়ারিংয়ে রেখে, অন্যহাতে লাগাতার কাউকে ফোন করে যাচ্ছে এরোজ। কিন্তু কেউ রিসিভ করছে না। এরোজ রাগে হিসহিসিয়ে উঠল,
–”শা*লার একটাও এখন ফোন ধরছে না। প্রয়োজনের সময় সব ম*রে যায়।”
রেগে এরোজ ফোনটাকেই বারি মারল। কিয়ৎকাল বাদ ফোনটা রিসিভ হয়। উদ্ভ্রান্ত এরোজের মুখে একটু হাসির রেখা দেখাগেল। সে ডাক্তারের এপয়েনমেন্ট সহ সব রেডি করে ফেলে পথে বসেই।
ফোন রেখে অজশ্রবারের মতো পেছন ফিরে তাকায়। ঠোঁটের কোনে থাকা সরু রক্তের লাইনটি দেখে লালচে আঁখিদ্বয় থেকে এক ফোঁটা অশ্রু গড়িয়ে পড়ল। অন্তরালে লালন করা সুপ্ত অনুভূতির অধিকারী মানুষটার এই দশায়— যে ক্রমশই লুকিয়ে রাখা সত্তাটি বেরিয়ে আসছে তা টের পেল না এরোজ।
সে পুনরায় আর্তনাদের সুরে বলে ওঠে,
–”কত রক্ত আম্মা! তার কি হয়েছে? সকালেও তো ঠিক ছিল। আম্মা, মাথায় হাত বুলিয়ে দাও, ভালো করে হাত বুলিয়ে দাও। তার কষ্ট হচ্ছে অনেক!”
নির্জনা বেগম হতবাক হয়ে তাকিয়ে তাকিয়ে দেখছে উদ্ভ্রান্ত এরোজকে। সন্দেহ বাতিক মন তার! সে শঙ্কিত দৃষ্টিতে এক পলক তাকায় মৌনতার পানে।
ছেলের এমন দশায়, মস্তিষ্কে হঠাৎ প্রচুর অসংলগ্ন এক চিন্তা এঁটে বসে। সে কি ভুল কিছু ভাবছে?
শুধুই কি দেবরের জায়গা থেকে এরোজের এই উদ্বিগ্নতা? তবে কেন এত অসংলগ্ন লাগছে তার কাছে এরোজের আচরণ।
বহুক্ষণ চুপচাপ থাকলেও, নির্জনা বেগম আর নিতে পারল না এরোজের এত উদারতা।
এখানটাতে ইমরোজ থাকলে সে খুশি হতো। কিন্তু দূর্ভাগ্যবশত নেই!
সে সব সহ্য করতে পারে কিন্তু নিজের সন্তানদের চরিত্রে দাগ সে সহ্য করতে পারবে না। সে জ্বলন্ত দৃষ্টিতে তাকায় এরোজের দিকে। হুঙ্কার ছেড়ে বলল,
–”বড় ভাইয়ের স্ত্রীর প্রতি তোমার এত যত্ন, চিন্তা— বড্ড ভয়ঙ্কর লাগছে, এরোজ। সামনে ফেরো। আর একবার পিছু ফিরলে আমার থেকে খারাপ কেউ হবে না।”
এরোজ চমকে উঠল মায়ের কথায়। অপ্রস্তুত তার দৃষ্টি। দিক দিশেহারা উদ্ভ্রান্ত বদন ম্লান হয়ে আসে।
কথার বানে— স্বচ্ছ আবরণে যেন কলঙ্ক লেপ্টে গেল। মায়ের সাথে দৃষ্টি মেলানোর সাহস আর হয় না। না চাইতেও দৃষ্টি সরাতে হয়। তবে কি চরিত্রহীন নামক ঘৃণ্য কলঙ্কটি তার গায়েও লেগে গেল? না না সে চরিত্রহীন নয়। সে কখনোই এতো নিকৃষ্ট হতে পারে না।
এরোজ বাচ্চাদের মতো বাহুতে চোখ মুছে, দৃঢ় কণ্ঠে নিচু স্বরে বলে ওঠে,
–”আমি চরিত্রহীন নই, আম্মা।”
নির্জনা বেগমের হাত থেমে যায়। চিন্তিত দেহটি হঠাৎ করেই ম্লান হয়ে পড়ল। সে স্থির দৃষ্টিতে তাকায় সুবিশাল পুরুষটির ক্রন্দনরত মুখপানে।
বুকের উপর পাথর চেপে চরম অস্বস্তিকর একটা প্রশ্ন করল,
–” আমি যদি ভুল না হই তবে—মৌনতাই কি সেই মেয়ে?”
মায়ের কথায়, এরোজ ঘন ঘন না বোধক মাথা নাড়ল। হন্তদন্ত হয়ে বলে,
–”না আম্মা, উনি আমার রূপাঞ্জেল কখনোই না। উনি তো আমার জন্য পাপ! ওনাকে ভাবনায় আনাও আমার জন্য পাপ। কিন্তু আমার রূপাঞ্জেল! আমার রুপাঞ্জেল তো আমার জন্য পাপ নয়। আমার বেঁচে থাকার কারণ, আমার সকল উদাসীনতার কারণ। এই কথা আর কখনো মুখে আনবে না। তোমারও পাপ হবে!”
নির্জনা বেগমের দেহ বল ছেড়ে দেয়। বুঝতে বাকি থাকেনা—সে এক ছেলের সুখ নিশ্চিত করতে গিয়ে, আরেক ছেলের সুখ কেড়ে নিয়েছে।
মৌনতার হাতটি আঁকড়ে ধরে সে ক্লান্ত, অবসন্ন দেহটি সিটে এলিয়ে দেয়। চোখের কার্নিশ বেয়ে এক ফোঁটা অশ্রু গড়িয়ে পড়ল। ফিসফিসিয়ে আওড়ায়,
–”এ কি বিশ্রী পরিস্থিতিতে ফেললে খোদা! আমার সন্তানদের সুখ এখন তোমার হাতে। সব ঠিক করে দাও। আর এই বিশ্রী, অস্বস্তিকর পরিস্থিতি থেকে রক্ষা করো আমায়।”
দ্রুত গতিসম্পন্ন গাড়িটি সবেগে নিজের গতি শ্লথ করে সিটি মেডিক্যালের সামনে।
নিথর দেহটিকে পুনশ্চ কোলে তুলে নিতে নিতে এরোজ ব্যাকুল কণ্ঠে চেতনাহীন দেহটিকে সুখের আশ্বাস দিয়ে বলল,
–“কিছু হবে না, আর একটু তারপরেই সব কষ্ট দূর হয়ে যাবে।”
সে পুনরায় মৌনতাকে পাঁজাকোলা করে ছুটতে লাগল। মানুষটা অনেক কষ্ট পাচ্ছে যে! এই কষ্ট যতক্ষণে হ্রাস না করতে পারবে তার শ্বাস নেয়া দুস্কর!
দোতলায় উঠতেই রক্তাক্ত দেহটি দেখে নার্সদের মধ্যে হুলস্থুল পড়ে গেল। একজন নার্স আঁতকে উঠে বললেন,
“অবস্থা তো অত্যন্ত আশঙ্কাজনক! এত রক্তক্ষরণ হলো কী করে? আল্লাহ জানে দেরি হয়ে গেল কি না। দ্রুত স্ট্রেচার নিয়ে আসুন!”
নার্সের কথায় এরোজের মুখ পাংশুটে হয়ে গেল। স্ট্রেচার আসা মাত্রই তারা মৌনতাকে নিয়ে ও.টি রুমের অভিমুখে ছুটল। ঠিক তখনই ডঃ উমিত কুমার দ্রুতকদমে এগিয়ে এলেন। কিন্তু স্ট্রেচারে মৌনতাকে দেখে তিনি যেন বজ্রাহত হলেন। বিস্ময় আর সংশয় নিয়ে তিনি এরোজের দিকে তাকিয়ে শুধালেন,
–“এরোজ, মৌনতা এখনো খুলনায়?
এরোজ দিগভ্রান্তের মতো তাকালো। ডঃ উমিত তাদের পূর্বপরিচিত। সে রুদ্ধকণ্ঠে শুধাল,
–’কি বলছেন ডক্টর? তার কি কোথাও যাওয়ার কথা ছিল?”
ডাক্তার মৌনতাকে পরীক্ষা করতে করতে মাথা নেড়ে বললেন,
–“হ্যাঁ, ইমরোজ তো আমাকে জানিয়েছিল ও মৌনতাকে বিদেশে নিয়ে চিকিৎসা করাবে। আপাতত কদিন ঢাকায় চিকিৎসাধীন রাখার কথা ছিল।”
ভয়, আতঙ্ক আর তীব্র কৌতূহলে এরোজের কপালে চিন্তার ভাঁজ গভীর হলো। প্রশ্ন করার অবকাশটুকুও মিলল না, ডঃ উমিত হঠাৎ চেঁচিয়ে উঠলেন,
–“ইমার্জেন্সি, একে দ্রুত আইসিইউ-তে নিন!”
এরোজের কণ্ঠ দিয়ে শুধু অস্ফুট স্বরে বের হলো,
– “আই সি ইউ?”
সে বিমূঢ় হয়ে আবারও শুধাল,
–“আইসিইউ কেন ডক্টর? তার হয়েছেটা কী? আর ইমরোজই বা তাকে বিদেশে নিয়ে যাবে কেন?”
এরোজের একের পর এক প্রশ্ন শুনে ডঃ উমিত ক্রুব্ধ দৃষ্টিতে তাকালেন। দাঁতে দাঁত চেপে বললেন,
–“তোমাদের আচরণে আমি স্তম্ভিত, এরোজ! এমন ভান করছ যেন কিছুই জানো না। মৌনতার লিউকোমিয়া পজিটিভ! আমি ইমরোজকে তখনই সতর্ক করেছিলাম যে যেকোনো মুহূর্তে ওর প্লাটিলেট বিপদসীমার নিচে নেমে যেতে পারে। আর তোমরা এখনো ‘কী-কেন’ করছো? হাউ রিডিকিউলাস!
কথাগুলো বলেই ডাক্তার দ্রুত আই সি ইউ এর দিকে চলে গেলেন। এরোজ স্থবির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। মাটির তলার জমিন যেন একটু একটু করে সরে যাচ্ছে। কর্ণকুহরে ‘লিউকোমিয়া’ নামক মরণব্যাধির শব্দটি সিসার মতো বিঁধছে। হৃৎপিণ্ডে যেন কেউ সজোরে হাতুড়ির আঘাত হানল। সর্বহারা পথিকের ন্যায় তার নিঃশ্বাস রুদ্ধ হয়ে আসতে চাইল।
নির্জনা বেগম অবিশ্বাসের দৃষ্টিতে এরোজের বাহু আঁকড়ে ধরে আর্তনাদ করে উঠলেন,
–”এরোজ ডাক্তার কি বলল? লিউকোমিয়া? মৌনতা ব্লাড ক্যান্সারে আক্রান্ত? ইমরোজ এটা জানত? কিন্তু আমাদের কাউকে তো কিছু বলেনি।”
মুহূর্তের মধ্যে এক বীভৎস ষড়যন্ত্রের ছক এরোজের চোখের সামনে স্পষ্ট হয়ে উঠল। নিজের আপন ভাইয়ের এমন অকল্পনীয় ভয়ঙ্কর বর্বরতায় তার গা শিউরে উঠল। মস্তিষ্কের সব চিন্তা যেন এক নিমেষে স্থবির হয়ে গেল।
মিনিটের ব্যবধানে ডাক্তারদের আনাগোনা বেড়ে গেল। লিফট থেকে তপোবন আর রোজ দ্রুতপদে বেরিয়ে আসতেই দেখল মা আর ভাইয়ের পাংশুটে মুখ। তপোবন বিচলিত কণ্ঠে শুধাল,
–“এরোজ, কী হয়েছে? মৌনতা কোথায়? হঠাৎ কী হলো ওর? ডাক্তার কী বললেন?”
ভাইয়ের প্রশ্নে এক কোণায় পাথরের মতো বসে থাকা এরোজের কোনো হেলদোল হলো না। সে তখন এক জীবন্ত জড়পদার্থ।
রোজ মায়ের সামনে হাঁটু গেড়ে বসে তাঁর হাতদুটো আঁকড়ে ধরে শুধায়,
–”মৌন বউয়ের কি হয়েছে, আম্মা?”
মেয়ের প্রশ্নে পথরের ন্যায় অনুভূতিহীন বসে মেয়ের প্রশ্নে নত মস্তকে বসে থাকা নির্জনা বেগম মাথা তুলে তাকালেন। পরক্ষণেই তাঁর বাঁধভাঙা কান্না বেরিয়ে এল। তপোবন দ্রুত মাকে বুকে টেনে নিল। মাথায় হাত বুলিয়ে ব্যাকুল হয়ে শুধাল,
–”আম্মা, কাঁদছেন কেন? কি হয়েছে মৌনতার? সকালেও তো সুস্থ ছিল। ডাক্তার কি বলল?”
নির্জনা বেগম জবাব দেয় না। সে হাউমাউ করে কাঁদতে লাগলো তপোবনকে জড়িয়ে ধরে। তপোবন অবুঝের ন্যায় পুনরায় শুধায়,
–”আম্মা কিছু তো বলবে? এভাবে কেঁদে যাচ্ছো কেনো? মৌনতা ঠিক হয়ে যাবে চিন্তা করো না।”
নির্জনা বেগম মাথা নেড়ে আর্তনাদ করে উঠলেন,
–“কিচ্ছু ঠিক হবে না তপোবন। সব শেষ হয়ে গিয়েছে। ইমরোজ এমনটা কি করে করতে পারল, তপোবন?”
তপোবন তখনও অন্ধকারেই রয়ে গেছে। সে জানে না তার আদরে বেড়ে ওঠা ভাইটি আজ শুধু চরিত্রহীন নয়, বরং এক নরপশুতে পরিণত হয়েছে— যে তিলে তিলে নিঃশেষ করে দিয়েছে একটি প্রাণকে। সে ধীর কণ্ঠে শুধাল,
–“মা, একটু পরিষ্কার করে বলো। ইমরোজকে তো রাশেদ খুঁজছে, কিন্তু কোনো হদিস পাচ্ছে না।”
–“পাবেও না।”
ভাইয়ের ভরাট কণ্ঠে তপোবন এরোজের দিকে তাকায়। কপাল কুঁচকে শুধায়,
–”কেন?”
রাগে এরোজের হাতের প্রতিটি শিরা ফুলে উঠেছে। তার দু’চোখে তখন আগ্নেয়গিরির ন্যায় উত্তপ্ত লাভার ছড়াছড়ি।
মস্তিষ্কে একটা কথাই ঘুরপাক খাচ্ছে শুধু যেকোনো মূল্যে তার ইমরোজকে চাই।
লালচে টলমলে অগ্নি দৃষ্টি তুলে তাকায় এরোজ। অত্যাধিক পরিমাণে শান্ত কণ্ঠে বলে,
–”ও বেশ ভালোকরে জানে, ও যদি আমার সামনে পড়ে তবে আমি ওকে জানে মেরে ফেলব। তাই!”
তপোবন ধমকে উঠল,
— “এই মুহূর্তে এসব আজেবাজে কথা কেন বলছিস? আম্মা, আপনি কেন কাঁদছেন বলবেন কি?”
–”তার ছেলে একটা খুনী ভাইজান। সে কাঁদবে না তো কে কাঁদবে? তার মতো হতভাগা মা কে আছে— যে কি-না নিজের জানোয়ার ছেলেকে ভালো বানাতে গিয়ে, একটা অবলা নারীকে বলি দিয়েছে। একটা ছোট্ট শিশুকে পৃথিবীর সবচেয়ে জানোয়ার বাবার সাথে পরিচিত হতে হচ্ছে। যেই বাবা কি-না পরোকিয়ার প্রেমকে সফল করার জন্য তার মাকে মেরে ফেলার চেষ্টা করেছে।”
তপোবনের হাতের বাঁধন শিথিল হয়ে এল। সে স্তম্ভিত কণ্ঠে শুধায়,
–”কি বলছিস এরোজ? মতি ভ্রষ্ট হয়েছে তোর? ইমরোজ মৌনতাকে খুন করতে চেয়েছে মানে? দেখ এরোজ, আমি তোকে বারবার সাবধান করছি ওদের মধ্যে যাই হয়ে যাক না কেন তোর আবেগ কোনোভাবেই প্রকাশ পায় না যেন! সবসময় আমি তোকে সাপোর্ট করব না এরোজ, অন্তত এই বিষয়ে কখনো না।”
তপোবন কঠোর গলায় বলে। এরোজ পারে না নিজেকে সামলাতে। জনমানবপূর্ণ হাসপাতালের গুমোট পরিবেশ আর নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করেই সে সজোরে গর্জে উঠল,
–”চাই না কারোর সাপোর্ট! ব্লাড ক্যান্সারে আক্রান্ত মৌনতা। আর তোমার গুণধর ভাই সেটা জেনেও লুকিয়ে গিয়েছে। নিজের বাচ্চার মাকে মারতে চেয়েছে ওই পিশাচ! কেন জানো? ঐ সৃজার জন্য!”
পৃথিবী কি খুব ছোট? না-কি জীবন সংকীর্ণ? কেন ঘুরে ফিরেই জঘন্য সব দুঃখগুলো তাদেরকেই আঁকড়ে ধরে? রক্তের সম্পর্কের মানুষগুলোর এমন ভোলবদল এত বীভৎস হয় কেন?
ইমরোজ? সেই ছোট্ট ইমরোজ যে কি-না ভাইয়ের গেঞ্জি ধরে পিছু পিছু ঘুরতো, আজ সেই ইমরোজ কি-না নিজের স্ত্রীকে মারার মতো ঘৃণ্য পরিকল্পনায় লিপ্ত ছিল? এতটা অধঃপতন? মানতে পারছে না তপোবনের। সে জানে চরিত্রহীন ব্যক্তি পশুর সমান, তাই বলে এতটা নরপশু— যে নিজের সন্তানের মাকেও খুন করতে দুই বার ভাববে না?
ভেবেছিল এই ছায়া আর কোনদিন নিজেদের উপর পড়তে দেবে না। এর জন্যই তো, যেদিন থেকে জানতে পারে তার ছোট ভাইয়ের ভালোবাসার মানুষটি, তার-ই মেজো ভাইয়ের স্ত্রী।
সেদিন থেকে এরোজকে সে চোখে চোখে রাখে, আবেগকে সামলাতে সহায়তা করে, অনৈতিক সব চাওয়া পাওয়া পূরণ করেছে এমনকি হুমকি দিয়ে দেশের বাইরেও পাঠিয়েছে। তবুও সেই আবেগের কারণ প্রকাশ পেতে দেয়নি।
কিন্তু কি হলো? পারল কি? যার সুখের জন্য সে এতকিছু করেছে সেই ভাই নিজেই তার সুখকে তিলে তিলে মেরেছে।
রোজ চমকায় দুই ভাইয়ের কথোপকথনে। অবিশ্বাস্য দৃষ্টি তার। কর্নকুহরে ভেসে বেড়ায় তার মৌন বউয়ের ক্যান্সার! আর তার ভাই, তার মৌন বউকে মারতে চেয়েছে? ঘৃণা, ভয়ে গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠল রোজের।
সে চোখ তুলে তাকায় ছোট ভাইজানের দিকে।
বড় ভাইজান কেন বললো ছোট ভাইজানকে তার আবেগ সামলাতে? কিসের সেই আবেগ? কার জন্য এই গোপন দহন? তবে কি মৌন ভাবিই এরোজের সেই না বলা দীর্ঘশ্বাস?
প্রশ্নগুলো দানা বাঁধার আগেই আইসিইউ থেকে সিটি মেডিকেলের ওনার সহ তিনজন ডাক্তার বেরিয়ে এলেন। এরোজ হিতাহিত জ্ঞানশূন্য হয়ে ডঃ উমিতের সামনে গিয়ে দাঁড়াল। উদ্ভ্রান্তের ন্যায় শুধাল,
–”ডক্টর, মৌন…ভাবি কেমন আছে? ঠিক আছে না?”
ডক্টর উমিত নিরুত্তর! দ্রুত কদমে তাদের পাশ কাটিয়ে যেতে যেতে বলল,
–”তপোবন, এরোজ তোমরা আমার সাথে আসো।”
কক্ষের গুমোট আবহাওয়া আরও ভারী হয়ে উঠল এক নারীর ওপর চলা বর্বরোচিত নির্যাতনের উপাখ্যান শুনে।
সবসময় কি ইমরোজের মতো মানুষগুলো তাদের কৃতকর্মের শাস্তি পায় না-কি অজানাই রয়ে যায়! পৃথিবীতে যে এমন ইমরোজ অজশ্র রয়েছে। রয়েছে এমন মৌনতা। কিন্তু আগলে নেয়ার মতো, ভালোবাসার মতো এরোজরা থাকে না। এগুলো গল্পেই সুন্দর!
ডাক্তারের পরবর্তী কথায় তপোবনের পায়ের তলার মাটি সরে গেল। ডঃ উমিত সরাসরি বললেন,
–“তপোবন, এটা এখন একটা পুলিশ কেস। তোমার ভাই তার স্ত্রীকে হত্যার চেষ্টা করেছে। আমরা সর্বোচ্চ ঝুঁকি নিয়ে চিকিৎসা শুরু করেছিলাম, কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত ফলাফল আমাদের অনুকূলে নয়। আমরা ধারণা করছি মৌনতা ‘একিউট মাইলোয়েড লিউকোমিয়ায়’ আক্রান্ত। এক্ষেত্রে শরীর রক্ত জমাট বাঁধার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে, ফলে অভ্যন্তরীণ রক্তক্ষরণ রোখা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে।
আর এটা অনেক ক্ষেত্রে প্রকাশ পাওয়ার আগেই অতিরিক্ত ব্লিডিং এর করণে রোগী মারা যায়। সেখানে আমি এক সপ্তাহ আগেই ইমরোজকে জানিয়েছিলাম ইমিডিয়েটলি যদি মৌনতার উন্নত চিকিৎসা করানো হয়, বোন ম্যারো ট্রান্সপ্লান্ট করা হয় তবে মৌনতার সুস্থ হওয়ার চান্স আছে। লিউকোমিয়ার সবচেয়ে ভয়ঙ্কর ধরণ হলো ‘একিউট মাইলয়েড লিউকোমিয়া’। এটা জানা সত্ত্বেও ও এমন নৃশংস আচরণ করেছে তার স্ত্রীর সাথে।”
তপোবন বিবর্ণ মুখে অস্ফুট স্বরে বলল,
– “কিন্তু ডাক্তার, ও তো সকাল পর্যন্ত স্বাভাবিক ছিল। সবসময় শুধু বলত, ওর ডান পায়ে ব্যথা।”
–”আমরা ধারণা করছি, মৌনতার ডান পায়ের বোন ম্যারো থেকেই ক্যান্সারের উৎপত্তি। তবে তার চেয়েও ভয়াবহ হলো তোমাদের অগোচরে তার ওপর চলা পৈশাচিক শারীরিক নির্যাতন। ওর ভেঙে পড়া শরীরে নিয়মিত পাশবিক বলপ্রয়োগ করা হয়েছে।
রেগুলার দৈহিক সম্পর্কের কারণে অতিরিক্ত ব্লিডিং হয় যার কারণে মৌনতার শরীর আরো দ্রুত ভেঙে গিয়েছে।
আর আজকেও সার্ভিক্স পয়েন্ট থেকে মাত্রারিক্ত ব্লিডিং এর করণেই আমরা ব্যর্থ।
তবে আমি অবাক হচ্ছি মৌনতার দৈহিক ক্ষমতা আর মানসিক শক্তি দেখে। ও এমনভাবে নিজেকে ট্রিট করেছে, যেন ও সুস্থ সবল একজন মানুষ। যার কারণে ওকে অসুস্থতা তেমন গ্রাস করতে পারেনি।
ডাক্তার দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন,
–“ওকে এখুনি ইমিডিয়েটলি ঢাকায় শিফট করতে হবে। আমরা আপাতত প্লাটিলেট আর এফএফপি দিয়ে ব্লিডিং কিছুটা নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করেছি। কিন্তু এর ব্যতীত আমাদের হাতে করার মতো কিছু নেই। ও যদি এইবার সার্ভাইভ করে যায় তবে তো আলহামদুলিল্লাহ। দ্রুত চিকিৎসা সেবা দিলে হয়তো বেশ কয়েকবছর বাঁচার সম্ভাবনা রয়েছে। আর যদি … ” ডক্টর উমিত শেষ করতে পারে না।
অশ্রুসিক্ত নয়নে এরোজ উন্মাদের মতো বলে ওঠে,
–যদি? যদি কেন বলছেন? মৌনতা অবশ্যই সার্ভাইভ করবে। তাকে সার্ভাইভ করতেই হবে। তার জন্য নায়েল অপেক্ষা করেছে। সে জানে তো, নায়েল তাকে ছাড়া থাকতে পারে না। সে সার্ভাইভ করবে। আমরা তার চিকিৎসা করাব। সবচেয়ে বেস্ট চিকিৎসা করাবো। আমার… , এরোজের কণ্ঠনালী লাগাম টানে। শুকনো ঢোক গিলে পুনরায় বলে,
–”নায়েলের মাম্মাকে সুস্থ হতে হবে। নায়েলের জন্য হলেও সুস্থ হতে হবে। সে বাঁচবে, দীর্ঘদিন বাঁচবে।”
বলতে বলতেই তপোবনের পোশাকের আস্তিন মুচড়ে ধরলো এরোজ। দেহ সহ চোখেমুখে উপচে পড়া উত্তেজনা। চোখ বেয়ে অনর্গল গড়িয়ে পড়ছে কিছু অব্যক্ত যন্ত্রণারা।
সে ভাইকে তাড়া দিয়ে বলে,
–”ভাইজান চলো তাকে ঢাকায় নিয়ে যেতে হবে। দেরি হয়ে যাচ্ছে ভাইজান।”
তপোবন লালচে আঁখিদ্বয় তুলে তাকায় ভাইয়ের পানে। ছোট বাচ্চাদের মতো ছটফট করছে। সে লহু স্বরে বলে,
–”শান্ত হ এরোজ।”
এরোজ উত্তেজনা সামলাতে না পেরে ঝরঝরিয়ে কেঁদে উঠল। ক্রুব্ধ স্বরে চেঁচিয়ে বলল,,
–”শান্ত? শান্ত হবো আমি? তুমি এখনো আমায় শান্ত হতে বলছো? ঐ কু**বা** দিনের পর দিন একটা মানুষের সাথে জানোয়ারের মতো আচরণ করে গিয়েছে, আর আমি এখনো শান্ত হয়ে বসব? তাকে আমি সুস্থ সবল দেখতে চাই ভাইজান নয়তো আমি ইমরোজের লা*শ ফেলবো নিজের হাতে। ও আমার ভাই বলে আমি ছেঁড়ে দেবো না ওকে।”
ডক্টর উমিত বিরক্তিকর নিঃশ্বাস ফেললেন এরোজের উন্মাদনায়। এই চিন্তা তার কাছে হাস্যকর, মিথ্যা লাগছে। লাগবেই না কেন, একই রক্তের এক ভাই এত জঘন্য নৃশংসতা করেছে আর এক ভাই সেটা দেখে তরপাচ্ছে। সে তার দিক থেকে দৃষ্টি সরিয়ে ক্ষোভ নিয়ে বলে,
–”সাইলেন্স! তোমাদের মতো এত স্বনামধন্য, শিক্ষিত একটা পরিবারের থেকে এমনকিছু ভাবতেই আমার কষ্ট হচ্ছে, তপোবন। ইমরোজ যেটা করেছে সেটা অপরাধ। আমি আশা রাখব মেয়েটাকে ন্যায় বিচার দেওয়াবে তোমরা।”
তপোবনের কণ্ঠ বের হয় না। সে বহুকষ্টে মাথা নাড়লো শুধু।
ডক্টর উমিত তাড়া দিয়ে বলল,
–”আমি যোগাযোগ করেছি ঢাকার বিশিষ্ট কয়েকজন অনকোলজিস্টের সাথে। তুমি এয়ার এম্বুলেন্সের সাহায্য নিতে পারো। হসপিটাল কতৃপক্ষ তোমায় সাহায্য করবে। এতে করে দ্রুত চিকিৎসার আওতায় আনা যাবে।”
তপোবন মাথা নেড়ে সায় জানিয়ে দ্রুত বেরিয়ে যায় কক্ষ থেকে। ভাইকে দেখতেই রোজ অশ্রুসিক্ত নয়নে শুধায়,
–”ভাইজান? ভাই…ভাইজান মৌন বউ ঠিক আছে? ওর জ্ঞান ফিরেছে?”
তপোবন ম্লান চোখে বোনের পানে তাকায়। মাথায় হাত রেখে বলে,
–”মৌনতা সুস্থ হয়ে যাবে। এখন ভাইজানদের সাথে চলো। ওখানে একজন মেয়ে মানুষের প্রয়োজন হবে।”
হাসপাতালে কিছুক্ষণের মাঝে তকদির সিকদার সহ তার নিকটস্থ আত্মীয়, মৌনতার পরিবারে ভরে গেল।
মেয়ের সাথে ঘটে যাওয়া একের পর এক নৃশংতার কথা শুনে মৌনতার মা জ্ঞান হারায়। ছোটবেলা থেকে আজ পর্যন্ত কখনো কেউ মেয়েটার উপর অভিযোগ তুলতে পারেনি, এমনভাবে বড় করেছে।
স্বামী, সংসার মাথায় করে বাঁচতে হয় এটাই মেয়েদের সৌন্দর্য হয়।
এই বলে বলে বড় করা মেয়েটির কপালে এমন নির্মম দূর্ভোগ কোনো মা সহ্য করতে পারবে না।
নির্জনা বেগম পাথরের মতো বসে রইলেন। মৌনতার অসুস্থ বাবার কাছ থেকে এই বীভৎস সত্যি লুকানো সম্ভব হলো না। বাতাসের আগে রটে গেল স্বামী সংসার আঁকড়ে বাঁচতে চাওয়া এক নারীর ওপর চলা পাশবিকতার গল্প।
ছেলের নৃশংসতায় তকদির সিকদার বাঁকহারিয়ে ফেললেন। এটা তার সন্তান? সেই ছোট্ট ইমরোজ যাকে কোলেপিঠে চড়িয়ে ভালো মন্দ’র ফারাক শিখিয়েছে? যে নিজেই নিজের জীবন দিয়ে চরম ভুক্তভোগী সে কি করে পারল ফুলের মতো মেয়েটির সাথে পশুর মতো আচরণ করতে?
সে আর এদিক ওদিক তাকায় না। সোজা পুলিশ স্টেশনে ফোন দেয়, যেকোনো মূল্যে ইমরোজকে খুঁজে আনতে।
ত্রিশ মিনিটের মাঝে ইমার্জেন্সি এয়ার এম্বুলেন্সের ব্যবস্থা করা হয়। এরোজ, তপোবন আর রোজ মৌনতার সাথে এয়ার এম্বুলেন্সে করে ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা হয়। বাকি পরিবারের সকলে গাড়িতে রওনা হয়।
নিস্তেজ বদনে এরোজ এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে সাদা চাদরে আবৃত সেই নিথর দেহটির দিকে। শুধু মুখটি দেখা যাচ্ছে। এই মুখটিতে যদি সাদা কাপড় উঠে যায় তার চোখের সামনে, তবে তার আত্মাও অতৃপ্ততার যন্ত্রণায় চিরকাল তরপাবে।
ওই মুখের ওপর যবনিকা টেনে দেওয়ার অর্থ, এই বুকের গহীনে ধুকপুক করা হৃৎস্পন্দনটুকুও চিরতরে স্তব্ধ হয়ে যাওয়া। সৃষ্টিকর্তা তাকে এত শাস্তি দিতেই পারে না। তার থেকে ছিনিয়ে নিয়েছে, সে মেনে নিয়েছে কিন্তু তার চোখের সামনে থেকে চিরতরে এই রুহটাকে ছিনিয়ে নিতে সে পারে না।
জানালার ওপাশে মেঘেদের আনাগোনা। শূন্যতায় দৃষ্টি রেখে এরোজ হঠাৎ অস্ফুট স্বরে ফিসফিসিয়ে বলে উঠল,
–“হয়তো আমি আপনার অপ্রিয় এক বান্দা। আমার প্রার্থনা হয়তো শুনতে চান’না। কিন্তু এই মানুষটা আর সে জড়িত ঐ ছোট্ট প্রাণটির জন্য হলেও এবারের মতো ফিরিয়ে দিন। নায়েলকে গিয়ে কি জবাব দেবো? তার মাম্মাকে সুস্থ সবল না নিতে পারলে যে ঐ পিশাচ জিতে যাবে। শত শত মৌনতা হেরে যাবে!”
মানুষ যখন কোনো পাপে লিপ্ত হয়, তখন তার মস্তিষ্ক সেই অপরাধকে ‘সঠিক’ এবং ‘অনিবার্য’ প্রমাণ করার জন্য নিজস্ব এক ভ্রান্ত দর্শন তৈরি করে। অবচেতন মন তখন কেবল নিজেকে সান্ত্বনা দেওয়ার নিরন্তর প্রয়াস চালায়—সে যা করছে, ঠিক করছে। মানুষের মস্তিষ্ক যখনই আত্মকেন্দ্রিক হয়ে পড়ে, তখনই পুরো দুনিয়া তার কাছে ভুল মনে হয় আর নিজেকেই একমাত্র সঠিক বিচারক মনে হয়। আর এই আত্মকেন্দ্রিক চিন্তার দ্বারা নেয়া অধিকাংশ সিদ্ধান্তই হয় ধ্বংসাত্মক।
ইমরোজের মস্তিষ্ক তখন ব্যস্ত ছিল নিজের কাজটাকে সঠিক এবং ন্যায্য প্রমাণ করতে। সৃজাকে নিজের করে রাখার আকাঙ্ক্ষা তাকে এতটাই অন্ধের মতো গ্রাস করে—যে ন্যায় অন্যায়, পাশবিকতা সম্পর্কে জ্ঞান হারিয়ে ফেলে। আর সেই কারণেই সে এই পাশবিক ভুল করে বসে।
যার পরিণতি সে ভাবেনি। সত্য কখনো লুকিয়ে থাকে না। আজ হোক কাল হোক তা প্রকাশ্যে আসবেই। সে যতটা সহজ মনে করেছিল, কাজটা ততটা সহজ নয়।
মাস্কের আড়ালে থাকা দুটি ভয়ার্ত মুখ একে অপরের দিকে আশ্বস্তের চাহনি নিক্ষেপ করে। কী-কার্ড দিয়ে হোটেলের তালা খুলে ইমরোজ আর সৃজা দ্রুত ঢুকে পড়ে। ঢুকেই ইমরোজ হাতের ট্রলিটা ছুঁড়ে মারল মেঝেতে। মাথার চুল আঁকড়ে ধরে বসে পড়ে সোফায়। ঘর্মাক্ত বদন তার। উদ্বিগ্ন কণ্ঠে বলতে লাগল,
–”সব শেষ, সৃজা। মৌনতা অসুস্থ হয়ে পড়েছে। তাহমিদ দেখেছে, ওকে সিটি মেডিক্যালে নেয়া হয়েছে। ডক্টর উমিত যদি সব বলে দেয়। ওহ্ শিট! আমার আগেই ঐ উমিতের সাথে ডিল করা উচিৎ ছিল। সব শেষ! এতক্ষণে নিশ্চিত সবাই জেনে গিয়েছে। ভাইজান আব্বু, এরোজ তারা কেউ আমায় ছেড়ে কথা বলবে না। অন্যায়ের সামনে তারা ছেলে,ভাই কাউকে পরোয়া করবে না।”
সৃজা বিরক্তি নিয়ে তাকায় ইমরোজের দিকে। রাগ ঝেড়ে বলে,
–”তো এই বুদ্ধি কার ছিল? তোমার না আমার? এখন বোঝ! ইমরোজ আমার উপর যেন একটা আঁচড় কেউ না দিতে পারে। এটা সম্পূর্ণ তোমার দোষে হয়েছে। রোগের কথা লুকানোর বুদ্ধি তোমার ছিল। কি হতো সবাইকে বলে দিলে? মরেই তো যাবে, তুমি এই বলে ছেঁড়ে দিতে ওকে।”
–”শাট আপ সৃজা। সব দিকেই আমার ক্ষতি ছিল! মৌনতা আমার ঘরের সবার কাছে কি তা তুমি জানো না। হে আল্লাহ রেহাই দাও এই ঝামেলা থেকে।”, ইমরোজ বসা থেকে উঠে দাঁড়ায়। পায়চারি করতে করতে বলল। সৃজা নরম কন্ঠে বলল,
–”তুমি বেশি চিন্তা করছো, ইমরোজ। আমার মনে হয় না সব এখনো হাতের বাইরে গিয়েছে। তারা কেউ তো আর আমার কথা জানে না। তবে কেন তুমি এই কাজ মৌনতার সাথে করবে। তুমি পুরোপুরি অস্বীকার করবে এই কথাটা। আমার মনে হয় তোমার লুকানোতে সকলের সন্দেহ আরো বাড়বে তোমার প্রতি। তোমার উচিৎ এই মুহূর্তে মৌনতার পাশে থাকা।”
–”তুমি কি সত্যিই বলছো? আমার কি যাওয়া উচিৎ?”, ইমরোজ ভয়ার্ত কণ্ঠে বলে। সৃজা মাথা নেড়ে বলে,
–”অবশ্যই যাওয়া উচিৎ।”
ইমরোজ গভীর ভাবনায় পড়ে। তার কেন যেন মনে হয় মৌনতা তার উপর সন্দেহ করতো! মৌনতা কি আদৌ জানে কিছু?
বিকল পাঁচটা তখন। হাসপাতালের করিডরের সিটে এরোজ, তপোবন আর রোজ নিরব, নিস্তেজ, ম্লান বদনে ঝিমিয়ে বসে আছে। প্রত্যেকের চোখমুখ শুকনো, ক্ষুধার্ত, আ’ত’ঙ্ক জর্জরিত। তপোবনের পকেটে অনবরত ফোন ভাইব্রেট করছে। অনিচ্ছাকৃত, অলস হাতে তপোবন ফোনটি বের করে। স্ক্রীনে তানশানের মুখটা ভেসে আছে। তপোবন রিসিভ করে না। সেভাবেই রেখে দেয়, কি জবাব দেবে? তার মেজো মা এখন কেমন আছে?
হঠাৎ পাশের গলি থেকে আসা মৃদু কোলাহলে তপোবন চোখ তুলে তাকাল। কিন্তু পরবর্তী মুহূর্তটির জন্য তারা কেউ প্রস্তুত ছিল না। তাদের অন্তহীন প্রতীক্ষাকে স্তব্ধ করে দিয়ে একজন নার্স দ্রুতপদে এগিয়ে এলেন। পেশাগত কাঠিন্যের সাথে অনুভূতিহীন কণ্ঠে বললেন,
–“অতিরিক্ত রক্তক্ষরণের কারণে যে রোগীকে আইসিইউতে নেওয়া হয়েছিল, তিনি মারা গেছেন। ডাক্তার তার পরিবারের লোকদের ডেকেছেন। আপনারা দ্রুত যান।”
রোজ অবিশ্বাস্য নয়নে তাকিয়ে চিৎকার করে উঠল ‘ভাইজান’ বলে।
তপোবনের হাত শিথিল হয়ে যায়। ফোনটা স্বশব্দে টাইলসের মেঝেতে আছড়ে পড়ল। তাদের মনে হলো তারা এক বিশাল ব্লাক হোলের অতল গহ্বরে হারিয়ে যাচ্ছে, যেখানে চারপাশটা মহাকর্ষীয় টানে নিথর আর অনুভূতিহীন।
ক্ষণকাল বাদে তাদের সেই জড়বস্তুর ন্যায় থমকানো পরিবেশটাকে চুরমার করে দিল কারোর হু হু করে কান্নার শব্দ।
নত মস্তকে বেঞ্চিতে বসে থাকা সুঠামদেহী পুরুষটি হু হু করে কাঁদতে কাঁদতেই একটাসময় চোখমুখে আঁকড়ে ধরে হাউমাউ করে কেঁদে উঠল। তপোবনের কর্ণদ্বয়ে তখনো বাড়ি খাচ্ছে, সদর দরজা খুলতেই ভেসে ওঠা হাসিমুখটি থেকে নিঃসৃত মিষ্টি কণ্ঠ,
অপরাহ্নে উপসংহার পর্ব ৪৩
–“ভাইজান আমাদের জন্য আনারস মাখা এনেছেন? ঝালমুড়ি এনেছেন?”
চোখের কার্নিশ বেয়ে নোনাজল গুলো নীরবে অনুভূতিহীন গড়িয়ে পড়তে লাগল। মস্তিষ্কে ঘুরপাক খাচ্ছে মেয়েটি যে যুদ্ধ লড়ার পূর্বেই হেরে গেল। আসলেই কি তাই? মেয়েটি যুদ্ধ লড়ার পূর্বেই হেরে গিয়েছে না-কি বিগত দেড় বছর যাবৎ করা শারীরিক ও মানসিক যুদ্ধের সাথে লড়তে লড়তে হেরেছে?
