Home অপরাহ্নে উপসংহার অপরাহ্নে উপসংহার পর্ব ৪৬

অপরাহ্নে উপসংহার পর্ব ৪৬

অপরাহ্নে উপসংহার পর্ব ৪৬
তোনিমা খান

তমসায় ডুবে আছে মর্ত্যধাম! ঘড়ির ঘূর্ণায়মান কাঁটা তখন রাত এগারোটা পাঁচ মিনিট নির্দেশ করছে।
সমীরণে লিগনিনের কারণে সৃষ্ট পুরোনো কাগজের মিষ্টি সুগন্ধের দূর্দমনীয় আধিপত্য‌।
যশোর পুলিশ স্টেশনের পীত রঙা আলোয় সংকুচিত নয়ন, শ্রান্ত দেহ একটু মুক্ত নিঃশ্বাস ফেলল। হীম করা সেই মৌসুমকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে ললাট বেয়ে রক্ত মিশ্রিত শ্বেদ জল টপটপিয়ে পড়ছে।
ব্যস্ত হাতে পুরোনো ফাইল ঘাঁটতে থাকা দু’জন কনস্টেবল বিরক্তি মিশ্রিত নয়নে দেখে নিলো ভ্রাতৃত্বের এক নিকৃষ্ট বন্ধন। পৃথিবী এক লীলাভূমি! যেখানে সবকিছুর দু’টো দিক সহজলভ্য! একটা নেগেটিভ আরেকটা পজিটিভ কিংবা খারাপ-ভালো। এই দু’টো একে অপরের পরিপূরক! এই যে আমরা প্রতিটা ভ্রাতৃত্বের মধুর সম্পর্ক দেখে অভ্যস্ত হলেও— এই সম্পর্কের নিকৃষ্ট রূপ ও রয়েছে। আর তার’ই উৎকৃষ্ট উদাহরণ ইমরোজ সিকদার এবং এরোজ সিকদার। জাগতিক কামনা তাদের এমন পর্যায়ে এনে দাঁড় করিয়েছে—যে তারা একে অপরকে প্রাণঘাতী আক্রমণ করতেও কুন্ঠা বোধ করেনা।

নেশায় বুঁদ অন্তঃস্থল ক্ষিপ্র হলেও সেই ক্ষিপ্রতা তুচ্ছ পড়ে নারীটির চিন্তায়। এত বছরের অনুভূতি থেকে এতটকু তো নিশ্চিত মানুষটার হাসির মাঝে তার সুখ নিহীত।
নিজের সব ক্রোধ, ঘৃনা অবহেলায় ছুঁড়ে ফেলল এরোজ। দগ্ধ অনলে লালচে নেত্র শীতল হয়ে আসে। লম্বা শ্বাস ফেলে নিজেকে শান্ত করে চোখ তুলে তাকায় সম্মুখে হ্যান্ডকাফ পরা অবস্থায় ফুঁসতে থাকা ইমরোজের দিকে। পুরুষালী দেহে বিচ্ছিন্ন ব্যান্ডেজ!
তপোবন ক্ষিপ্ত নয়নে দুই ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে আছে। একহাতের শক্ত বাঁধনে ইমরোজ তখনো ক্ষিপ্র বদনে অস্থির হয়ে আছে। এরোজকে জখম না করতে পারলে তার শান্তি হবে না। প্রাথমিক কিছু চিকিৎসা সেবা দিয়ে, পুলিশ স্টেশনে আনা হয় দু’জনকে। সৃজা গুরুতরভাবে আঘাতপ্রাপ্ত হওয়ায় তাকে পুলিশের তত্ত্বাবধায়নে হাসপাতালেই রাখা হয়। ধারণা করা যায় তার এক কান শ্রবণশক্তি হারিয়ে ফেলেছে। সেই জের ধরেই এখানে এসেও একদফা মারপিট করেছে দু’জনে।
তখন বাধ্য হয়ে পুলিশ ইমরোজকে হ্যান্ডকাফ পড়ায়। তবে তপোবনের অনুরোধে এরোজকে পড়ায়নি। এমনিতেও ওটা একটা ষাঁড় গরু। ছুলেই গর্জে ওঠে।
এরোজ এলোমেলো দৃষ্টি ফেলল। অন্তরালে গুঁড়িয়ে দেয়ার বাসনা প্রগাঢ় হলেও তা মাথা চাড়া হতে দেয় না। মানুষটা যে এখনো এই জা”নো”য়া”রে”র সঙ্গই চায়। সে যদি যেকোনো মূল্যে এই নিকৃষ্ট সত্যটাকে যদি দুঃস্বপ্নে পরিণত করতে পারে, তবে মানুষটার মুখে হাসি ফুটে উঠবে।
ব্যস! এই চিন্তার বাইরে আর কোনো চিন্তা আঁটলো না এরোজের মস্তিষ্কে। ইমরোজের চোখে চোখ রেখে বিশদ ধারালো নম্র কণ্ঠে অনুনয় করে বলল,

— “যা হয়েছে— হয়েছে! ভুলে যা। সে আর নায়েল এখনো তোর অপেক্ষায় আছে। সবকিছু ভুলে তাদের কাছে ফিরে চল।”
— “প্রশ্নই আসে না।” ,ইমরোজ ক্ষিপ্ত কণ্ঠ।
–“একটা সংসার ভাঙা কতটা কষ্টের তা কি তুই জানিস না? মনে নেই আমরা কিভাবে মায়ের জন্য ছটফট করতাম? বাবা হয়ে তুই একই যন্ত্রণা নায়েলকে কি করে দিতে পারিস?
ভালোভাবে বলছি, মেনে নে। ফিরে চল, আমরা সবাই সব ভুলে যাব।”
এবার আর কোনো ছদ্মবেশ নয়, ইমরোজের ভেতরকার জঘন্য রূপটা বেরিয়ে এলো। অন্তঃস্থলের সব জঘন্য অনুভূতি আজ খোলা পান্না। যেই জঘন্য পান্না পড়তে গিয়েও হয়তো রুহ কেঁপে ওঠে। মনে সংশয় জাগে, এরপর কোনো নারী তার স্বামীকে ভালোবাসতে পারবে তো?
ইমরোজ ক্ষিপ্ত কণ্ঠে বলল,

— “ঐ অর্ধমৃত, কঙ্কাল মেয়ে আমার আর নায়েলের যোগ্য নয়। উই বোথ ডিজার্ভ বেটার! নায়েল মৌনতার মতো ঘরকুনো, ব্যাকডেটেড গেঁয়ো মা ডিজার্ভ করে না। ও সৃজার মতো স্মার্ট, উচ্চশিক্ষিত, কর্মঠ মা ডিজার্ভ করে। আর এখন তো প্রশ্নই আসে না। একটা ক্যান্সার রোগীর পেছনে আমার এফোর্ট আর পয়সা নষ্ট করার মতো বোকা নই। ও তো বাঁচবেই না”
তপোবন আর এরোজ হতবিহ্বল হয়ে তাকিয়ে রইল। নিজের স্ত্রীর অসুস্থতায় একজন স্বামী কতটা পিশাচ হতে পারে, তা ভাবলে শরীরের লোম খাড়া হয়ে যাচ্ছে। যেই মেয়েটার জীবনসঙ্গী এমন জঘন্য তার জন্য বেঁচে থাকার প্রেরণা তো দূর, বেঁচে থাকাও দুঃস্বপ্ন।
তপোবনের দেহ ম্লান হয়ে আসে ভাই রূপে একটা নরপশু দেখে। অন্তঃস্থল থেকে ভালোবাসা স্নেহ শেষ ভরসা সবটুকু শেষ হয়ে গেল নিমিষেই।
এরোজ অস্থির দৃষ্টি ফেলল। বিচলিত কণ্ঠে বলল,

— “এই, মা তো মা হয়! স্মার্ট আর আনস্মার্ট কখনো মায়ের সংজ্ঞা হতে পারে? আর সে ব্যতীত শ্রেষ্ঠ তোদের জন্য কেউ হতেই পারে না। তুই চল, তারা অপেক্ষা করছে। তার অর্ধেক সুস্থতা তুই। তুই ফিরে গেলেই সে সুস্থ হয়ে উঠবে। চল, চল।”
এরোজের ব্যস্ত কণ্ঠে ইমরোজ চোখা নেত্রে তাকায়। সন্দিগ্ধ গলায় হিসহিসিয়ে শুধায়,
— “তোর এত উদ্বিগ্নতা কেন আমার আর মৌনতার জীবন নিয়ে? কই, তুই তো ঘরের কোনো বিষয়ে কখনো নাক গলাতে আসিস না। তবে এখন এত উদ্বিগ্নতা কেন দেখাচ্ছিস? তুই কোন সাহসে আমার গায়ে হাত তুলিস তাও আবার ঐ মৌনতার জন্য?”
এরোজের নেত্রদ্বয় হিংস্র হয়ে ওঠে। চোয়াল শক্ত করে বলে,

— “তুই যাকে ঐ মৌনতা, ঐ মৌনতা করছিস? সে তোর স্ত্রী। তোর বাচ্চার মা। তুই কি ভুলে যাচ্ছিস?”
— “না আমি ভুলে যাচ্ছি না। আর ভুলিনি বলেই তো বলছি, বড় ভাইয়ের স্ত্রী নিয়ে তোর এত মাথা ব্যথা কেন? আমার স্ত্রী আমি ছাড়ব, রাখব, মারব তাতে তোর কি? না-কি আমার পিঠপিছে এতদিন অন্যকিছু চলতো?”
বাক্যটি শেষ হতে পারলো না সপাটে এক চড় পড়লো ইমরোজের গালে। জীবনে প্রথম ভাইয়ের গায়ে হাত তুলে তপোবন অবিশ্বাস্য নয়নে তাকায়। হুঙ্কার ছেড়ে বলে,
— ” খবরদার ইমরোজ! চুপ, একদম চুপ। নিজের মতো সবাইকে এক কাতারে ফেলবি না। এতকিছুর পরেও তুই কি করে এমন কথা বলতে পারিস? পিশাচ হয়ে গেছিস? ওইখানে মেয়েটা এত কিছুর পরেও ছটফট করে যাচ্ছে সংসার ভাঙনের কষ্টে আর তুই? আমরা এক মুহুর্তের জন্য সব ভুলে যাবো ইমরোজ। তোর করা পৈশাচিকতা সব! বদলে তুই ফিরে চল স্ত্রী সন্তানের কাছে। নায়েলের কথা একবার ভাব। এই অসুস্থ সম্পর্ক আর পরিবেশে ওর উপর থেকে কি যাচ্ছে! মা অসুস্থ, বাবাকেও যদি পাশে না পায়।”,
তপোবনের শেষের কণ্ঠে অনুনয়। সকলে প্রাণপণে তখনো চেষ্টারত যেন মেয়েটির দূর্বিষহ জীবনটাতে স্বামী নামক ঢাল অটল রাখতে পারে। কিন্তু তাদের সকল প্রচেষ্টায় ক্ষণিকের মোহে অন্ধ ইমরোজ পানি ঢেলে দিল। গালে হাত দিয়ে বড় ভাইয়ের দিকে ক্রুব্ধ চোখে তাকায় ইমরোজ।
— ” তুমি আমার ব্যক্তিগত জীবনে হস্তক্ষেপ করার কোনো অধিকার রাখো না, ভাইজান। বড় বলে এখনো সম্মান করছি। নয়তো যেই হাত দিয়ে আঘাত করেছেন সেই হাত গুঁড়িয়ে দিতাম।”
তপোবন বিস্মিত নয়নে তাকায় ভাইয়ের দিকে। যেই হাতে কোলেপিঠে বড় করেছে, সেই হাতটা গুঁড়িয়ে দিতেও তার ছোট্ট ভাইটার একটুও দ্বিধাবোধ হবে না?
পুনরায় রাগান্বিত স্বরে বলল,

–“আমার জীবন, আমার সিদ্ধান্ত! আমি মৌনতাকে স্ত্রী হিসেবে চাই না। আমি সৃজাকে ভালোবাসি। ও আমার যোগ্য লাইফ পার্টনার। তাকেই বিয়ে করেছি আমি। আর নায়েলের কথা ভেবেই আমি এই সিদ্ধান্ত নিয়েছি। মৌনতা তো মরেই যাবে…”
ইমরোজ বাক্যটি শেষ করতে পারল না। তার আগেই এরোজের অবিশ্বাস্য কণ্ঠ ভেসে আসল।
— “বিয়ে করেছিস মানে?”
তপোবনের প্রাণপনে আওড়াচ্ছে যেন পরবর্তী বাক্যটি তার মনে জেঁকে বসা বিভৎস বাক্যটির সাথে মিলে না যায়। কিন্তু বাস্তবতা আজ সকলকে ভাবনাতীত ঘৃণ্য স্তরে এনে দাঁড় করালো।
ইমরোজ দৃঢ় কণ্ঠে বলল,
— ” হ্যাঁ, সৃজা আমার বিবাহিত স্ত্রী।”
সহসা অশ্রাব্য এক গালি আন্দোলিত হয় কামড়া জুড়ে।

— “কু//ত্তা//র বাচ্চা তোর এত হেডম আসে কোত্থেকে? ঘরে বউ বাচ্চা রেখে তুই দ্বিতীয় বিয়ে করিস কোন সাহসে?”
এরোজের এতক্ষণের চেপে রাখা আগ্নেয়গিরি বিস্ফোরিত হলো। পাশের বেঞ্চির সাথে হেলান দিয়ে দাঁড় করিয়ে রাখা এক গুচ্ছ মোটা লাঠি থেকে, উগ্র হাতে একটা লাঠি উঠিয়েই এরোজ সবেগে ইমরোজের দুই পায়ের মাঝ বরাবর লাগিয়ে দেয়। থানার কোনা কোনা প্রকম্পিত হয় ইমরোজের হঠাৎ গগনবিদারী চিৎকারে।
একটা দিয়েই খান্ত হয় না এরোজ বরং একের পর এক আঘাতে মেঝেতে লুটিয়ে পড়ে তরপায় ইমরোজ। আর তপোবন পাথরের ন্যায় দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে শুধু দেখল। আজ আর ইচ্ছে হয় না এরোজকে থামাতে; বরং পুলিশ থামাতে আসলেও সে হাত জাগিয়ে নাকচ করে।
আঘাত করতে করতেই এরোজ রাগে ক্ষোভে ঘৃণায় চিৎকার করে উঠল,

–” এই তুই কি মানুষ? তুই কি করে পারলি ওনার সাথে এমনটা করতে? তোর সন্তান সংসার আঁকড়ে বাঁচার অপরাধে তুই তাকে মানুষটাকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেয়ার পরেও, সে তোর জন্য অশ্রু ঝড়াচ্ছে। আর তুই কি-না সে থাকা অবস্থায় অন্য কারোর সাথে ঘর বাঁধিস? নায়েলের কি হবে একটাবার ভাবলি না?”
বলতে বলতেই এরোজের চোখের কার্নিশ ভরে ওঠে। এত এত জখম কি করে করতে পারল ইমরোজ? এই ক্ষতর কাছে মৃত্যু ও যেন তুচ্ছ। এমন জীবনের থেকে মৃত্যু শ্রেয়ই মনে হলো এরোজের কাছে। এত জখমের মলম সে কোথায় পাবে? মানুষটা বাঁচার শক্তি পাবে তো?
তপোবন বলহীন দেহে কাঠের বেঞ্চিতে ধপ করে বসে পড়ে। চোখের সামনে একটা হাস্যোজ্জ্বল পরিবারের স্বপ্নগুলো ধীরস্থির উদাসীন, ফ্যাকাশে হতে লাগলো। সেই রাতের সমাপ্তি ঘটে তৃতীয়বারের মতো সিকদার পরিবারটি ভাঙার মাধ্যমে এবং সমাপ্তি ঘটে ইমরোজ নামক এক পশুর চরিত্রহীনতার কাছে বাবা ও স্বামী নামক সত্ত্বার হেরে যাওয়ার বিভৎস এক গল্পের।
পরোকিয়ার কাছে হেরে গেল বিবাহ নামক পবিত্র সম্পর্ক!

ভোরের আলো ফোটার আগে সকলে জৈবিক সকল দায়িত্ব, টানাপোড়েন ছেড়ে পুনরায় হাসপাতালে ফিরে আসে সিকদার বাড়ির এক টুকরো সুখের কাছে।
ততক্ষণে বাতাসের গতিতে ছড়িয়ে পড়েছে ইমরোজের বিয়ের কথাও। তকদির সিকদার এর অভিযোগের ভিত্তিতে ইমরোজ পুলিশের তত্ত্বাবধায়নে হাসপাতালে ভর্তি রয়েছে।
ডক্টরের তলবে তপোবন, তকদির সিকদার, নেওয়াজ সাহেব আর এরোজ ডক্টরের কেবিনে অপেক্ষারত।
হেমাটোলজি বিভাগের স্বনামধন্য এবং অভিজ্ঞ ডক্টর আবু জাফর ব্যস্ত কদমে এসে নিজের চেয়ারে বসেন। পেশাগত গম্ভীর গলায় বলল,

–“মৌনতার শারীরিক অস্থিতিশীলতা আমরা সাময়িকভাবে আয়ত্তে আনতে সক্ষম হয়েছি। কিন্তু সে শারীরিকভাবে ও মানসিকভাবে ভীষণ বিধ্বস্ত, যা তার ইমিউন সিস্টেমের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে। আমরা আপাতত তাকে সিডেশন দিয়ে রেখেছি, কিন্তু এটা দীর্ঘমেয়াদী সমাধান নয়। ওর বোন ম্যারো রিপোর্ট কনফার্ম করেছে যে, মৌনতা একিউট মাইলয়েড লিউকেমিয়া এর ইনিশিয়াল ফেজে আছে।
কিন্তু তার দৈহিক সক্ষমতা এখনো যতটা স্ট্যাবল আছে তা দ্রুত এবং উন্নত চিকিৎসা করালে একটা ভালো ফলাফল পাওয়া যাবে। আমি একদমই বলছি না, যে চিকিৎসা করানোর সাথে সাথে মৌনতা আগের মতো সুস্থ হয়ে যাবে। বরং এটা বোঝাতে চাইছি, তাকে যদি এই মুহুর্তে সঠিক চিকিৎসা দেয়া হয় তবে বেশ কিছু বছর সে স্বাচ্ছন্দ্যে বাঁচতে পারবে।”
“বেশ কিছুবছর” এরোজ ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইল। ক্ষীণ স্বরে শুধায়,

–“বেশ কিছু বছর কেন?”
ডাক্তার দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন,
–“ওয়েল, ক্যান্সার চিকিৎসায় আমরা সাধারণত ‘কিউর’ শব্দের চেয়ে ‘রেমিশন’ শব্দটা বেশি ব্যবহার করি। এই চিকিৎসার জার্নিটা খুব নিষ্ঠুর। এটা একটা ভরসা মাত্র। কারণ, চিকিৎসা চলাকালীন-ই আশি শতাংশ মানুষ আত্মসমর্পণ করে দেয় শারীরিক যন্ত্রনার কাছে। চিকিৎসার পদ্ধতির যে বিরূপ প্রতিক্রিয়া শরীর দেয় তা সহ্য করাই চ্যালেঞ্জিং। খুব কম মানুষই ঐ যন্ত্রণা জয় করে ফিরতে পারে। কিন্তু যতদূর শুনলাম, জানলাম মৌনতাকে বেশ শক্তপোক্ত একজন নারী মনে হয়েছে। জিতে যাওয়ার সম্ভাবনা বেশি। তাই আমি, এই পর্যায়েই সাজেস্ট করব আপনারা তাকে বিদেশে নিয়ে যত দ্রুত সম্ভব চিকিৎসা করান। এতে মানসিক শক্তিও বৃদ্ধি পাবে আর শারীরিক ও।”
নেওয়াজ সাহেব শুকনো ঢোক গিললেন, বিদেশে নিয়ে চিকিৎসা করানোর মতো ব্যয়বহুল চিত্র অক্ষীপটে ভেসে উঠতেই।
তবে তপোবন আর তকদির সিকদারের মাঝে কোনো উদ্বেগ দেখাগেল না। তপোবন ব্যস্ত কণ্ঠে বলল,

–“ওর সঠিক চিকিৎসা করাতে যা করা লাগে আমরা করব। আপনি শুধু আমাদের একটু বেস্ট গাইড দিন।”
এরোজ ব্যগ্র কণ্ঠে বলল,
–”আমরা কানডায় চিকিৎসা করাতে চাচ্ছি।”
ডক্টর প্রসন্ন হলেন‌‌। আশ্বস্ত করে বললেন:
–“নিঃসন্দেহে এটি একটি চমৎকার সিদ্ধান্ত। টরন্টোর ‘প্রিন্সেস মার্গারেট ক্যান্সার সেন্টার’ এই মুহূর্তে বিশ্বের অন্যতম সেরা ক্যান্সার রিসার্চ ও ট্রিটমেন্ট হাসপাতাল। আমি ব্যক্তিগতভাবে এটাই সাজেস্ট করতে চাচ্ছিলাম। আমার সেখানকার অনকোলজি ডিপার্টমেন্টের সাথে যোগাযোগ রয়েছে।
আমরা তবে আজকেই মৌনতার সব লেটেস্ট প্যাথলজি রিপোর্ট, বায়োপসি স্লাইড সব রিপোর্টগুলো পাঠানোর পর সেখানকার একটি বিশেষ বোর্ড সেগুলো রিভিউ করবে। প্রাথমিক কনসালটেশন রিপোর্ট পেতে ৩ থেকে ৫ দিন সময় লাগে।
তারা কেসটি গ্রহণ করলে আমরা একটি ‘লেটার অফ একসেপটেন্স’ পাব, যা দিয়ে আমরা দ্রুত মেডিক্যাল ভিসার আবেদন করতে পারব।”
পরপরই বললেন,

–“তবে সবচেয়ে জরুরি বিষয় হলো মৌনতার বর্তমান অবস্থা। মৌনতার শরীরে প্লাটিলেটের মাত্র এখনো স্বাভাবিক হয়নি। বিমানে দীর্ঘ ১৫-১৬ ঘণ্টার ধকল সামলানোর জন্য ওকে ‘ফিট টু ফ্লাই’ হতে হবে। আমি আগামী কয়েকদিন ওর হিমোগ্লোবিন এবং ভাইটালস স্থিতিশীল করার চেষ্টা করব। সব ঠিক থাকলে এবং ভিসা প্রসেসিং দ্রুত হলে, আশা করছি আগামী ১০ থেকে ১৫ দিনের মধ্যেই আপনারা ওকে নিয়ে কানাডার উদ্দেশ্যে রওনা হতে পারবেন। আমি নিজে এয়ারলাইন্সের জন্য প্রয়োজনীয় মেডিক্যাল ক্লিয়ারেন্স সার্টিফিকেট লিখে দেব।”
সকল আলাপচারিতা শেষে তারা মৌনতাকে আগামী বিশ দিনের মধ্যে ‘ফিট টু ফ্লাই’ করে কানাডা পাঠানোর সিদ্ধান্তে উপনীত হয়।
কিন্তু কড়িডরের চেয়ারে বসা নেওয়াজ সাহেব এর মুখশ্রী ভীষণ পাংশুটে। ডাক্তার জানালেন অর্থের কোনো পিছুটান থাকলে চিকিৎসা সফল হওয়া মুশকিল হয়ে যাবে। আর অর্থের পিছুটান না থাকলে মৌনতার বাঁচার সম্ভাবনা রয়েছে। একজন বাবা হয়ে মেয়ের বাঁচা মরার সন্ধিক্ষণে পিষ্ট হওয়ার মতো যন্ত্রনাদ্বায়ক পরিস্থিতিতে দাঁড়িয়ে থাকা অসহায় বাবা নেওয়াজ সাহেব। মন বলে যেকোনো মূল্যে সন্তানকে রক্ষা করতে হবে কিন্তু বাস্তবতা বলে, এত টাকা পাবে কোথায়?
সে চিন্তায় মিইয়ে গেল। ধিমি কণ্ঠে তপোবনকে বলল,

–“তপোবন, কোনো সিদ্ধান্ত নেয়ার আগে আমায় একটু সময় দাও। আমার তো টাকা জোগাড় করতে হবে।”
এরোজ রক্তাভ চোখ তুলে তাকায় বাবা ভাইয়ের দিকে। নীরব ইশারা বুঝতে সময় লাগে না তকদির সিকদারের। সে নেওয়াজ সাহেবের পাশে বসে বিনম্র কণ্ঠে বললেন,
–“বেয়াই, আমি আমার পরিবার সকলে আপনার কাছে অপরাধী। আপনি যা শাস্তি দেবেন আমরা মাথা পেতে নেবো। কিন্তু মৌনতার আজকের পরিস্থিতি আমাদের কারণে তাই ওর চিকিৎসাটাও আমাদের করাতে দিন। নয়তো মরেও শান্তি পাবো না বেয়াই।”
নেওয়াজ সাহেব টলটলে নেত্রে তুলে তাকায়। অশ্রুরুদ্ধ কণ্ঠে বলে,
–“বিশ্বাস করুন, আমার মেয়েটার উপর আপনাদের ছায়া দেখলেও আমার ভয় হয়। কঙ্কাল ব্যতীত কিছু নেই। সেটুকুও যদি আপনারা শেষ করে দিন?”
তকদির সিকদারের মাথা নিচু হয়ে গেল আপনাআপনি। সাহস পেল না ফের মাথা তোলার। তবে তপোবন সে মাথা নত করে না। দুঃখ যখন দিয়েছে, দুঃখের উপশম ও করবে।
তপোবন নেওয়াজ সাহেবের সামনে হাঁটু ভেঙে বসে।
বৃদ্ধার দুই হাতটা নিজের মুঠোয় নিয়ে বলল,

–“তাঐ, আপনি যতদিনে টাকা জোগাড় করবেন ততদিনে মৌনতার শরীরে ক্যান্সার আরো ছড়িয়ে পড়বে। তখন চিকিৎসা করালেও কোনো লাভ হবে না। আপনি কি নিজের কারণে আপনার মেয়েটাকে চোখের সামনে শেষ হতে দেখতে পারবেন? নায়েলের কথা একটাবার ভাবুন। যার মা থাকে না, তার দুনিয়াতে কেউ থাকে না। এখন অতিদ্রুত মৌনতার চিকিৎসা করালে ও আবার আমাদের মাঝে ফিরে আসবে। আমরা ওর চিকিৎসাটা এখন করাই আপনি নাহয় টাকা জোগাড় করে আমাদের শোধ করে দেবেন। প্লিজ তাঐ, মেয়েটার কষ্টের কথা চিন্তা করে হলেও আমাদের আর একবার সুযোগ দিন।”
বয়স্ক লোকটির কোনো ইনকাম সোর্স নেই। পাঁচ তলা বাড়িটা থেকে যা বাড়ি ভাড়া আসে তা দিয়েই সংসার, ওষুধের খরচ চলে। নিজের ঘৃণা আত্মসম্মানবোধের কারণে মেয়েটাকে শেষ করে দেবে? মন মস্তিষ্ক ওখানেই থমকায়। তার মেয়েটার কষ্ট দূর করতে হবে।
সে ক্ষীণ স্বরে বলল,

–“আমি তোমাদের সব টাকা পরিশোধ করে দেবো।”
তপোবনের মুখে হাসি ফুটে উঠল। সে হাসিমুখে বলল,
–“অবশ্যই তাঐ।”
তপোবন এগিয়ে আসে ভাইয়ের কাছে। উদাসীন দৃষ্টি সর্বহারা ছেলেটির ছলছল নেত্রপানে স্থির। ক্ষীণ স্বরে বলল,
–“হয়ে গিয়েছে।”
এরোজ উগ্র হাতে চোখের পানি মুছে নেয়। বিগত দু’দিন যাবৎ চোখটা অযথাই ভিজে ওঠে।
সে শক্ত কণ্ঠে বলল,
–“এবার শেষ অভিশাপটুকু থেকে তাকে মুক্ত করবে। শরীর আর উপর ওয়ালা ব্যতীত ঐ মানুষটাকে আর কেউ বিন্দুমাত্র কষ্ট‌ তাকে দিতে পারবে না।”
তপোবন স্মিত হাসল ভাইয়ের দৃঢ় কণ্ঠে।ভাগ্যের পরিহাস কি নির্মম! এক ভাই কষ্ট দেয় আর এক ভাই সেই কষ্টের নিরাময় হতে চায়।

এরপর….একটা সংসার টিকিয়ে রাখার যুদ্ধ লড়তে লড়তে বিভৎসভাবে হেরে যাওয়া মানুষগুলো লড়াইয়ের অন্তিম পাতায় এসে দাঁড়ায়।
সুখের হপ্তা চোখের পলকে গেলেও, দুঃখের হপ্তা কাটল কচ্ছপের গতিতে। পুরো হপ্তাটিতে ডিপ সিডেশন এর মাধ্যমে মৌনতাকে বেশিরভাগ সময়ই ঘুম পাড়িয়ে রাখা হতো। নয়তো যতক্ষণ জেগে থাকত
ততক্ষণ-ই জীবনের পাশবিক চিত্র তাকে কুঁড়ে কুঁড়ে খেত।
একজন নারীর জন্য সংসার হয় আস্ত এক মায়ার বাঁধন। প্রতিটা মানুষের জীবনে একটা না, একটা অপশন থাকেই। ভালো কিছুর আশায় খারাপ কিছু থেকে বেরিয়ে আসার। কিন্তু কতজন সেই অপশন বেছে নেয়?
মানুষ তো গুমড়ে মরে সেই খারাপ কিছুর মধ্যে ভালো কিছু খোঁজার চেষ্টায়। বিয়ে কি এতোটাই ঠুনকো বিষয়? লোকে তো বলে বিয়ে নাকি সাত জন্মের সম্পর্ক!

একজন নারীর জন্য বিয়ে হলো জীবনের সবচেয়ে সুন্দর এবং গুরুত্বপূর্ণ একটি অধ্যায়। জীবনের চব্বিশ-পঁচিশটা বছর একজন নারী অপেক্ষা করে, নিজের দৃষ্টি সংযত করে, কারোর হকের হেফাজত করে, নিজেকে তৈরি করে এবং দিনশেষে সব কিছুর অর্জনের পরে বিয়ে নামক পবিত্র বন্ধনের মাধ্যমে নিজের সুখ দুঃখের ভাগিদারকে পাওয়ার জন্য। এই আকাঙ্ক্ষা লালন করে না এমন নারী বিরল।
বিয়ে করার সময় কোনো নারী এটা ভেবে ঐ বন্ধনে আবদ্ধ হয় না— যে কোনো প্রতিকূল পরিস্থিতি আসলেই বেরিয়ে আসবে সেই বন্ধন থেকে। সে তো এই বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছে মৃত্যু পর্যন্ত এই মায়ার বদ্ধন আঁকড়ে ধরে বাঁচার জন্য! কত স্বপ্ন! কত গভীর সম্পর্ক! কত একান্ত মুহূর্ত!
নিজেদের অংশ পৃথিবীতে আসার সেই বিরল মুহূর্ত! নিজের সুখ দুঃখ সবটা সপে দিয়েছে কি একদিন অচেনার মতো দু’জন একে অপরের সম্মুখে দাঁড়াবে বলে? কেউ কি বোঝে, মৌনতা নিজের শেষ নিঃশ্বাস ঐ একজন ব্যক্তির সান্নিধ্যেই কাটাতে চাইতো?
আজ একজনের সাথে নিজের সবটা বিলিয়ে দিয়ে কাল আবার আরেকজনের সাথে! এটা ভাবতেই পারে না মৌনতা! থাকুক না বেস্ট কিছু সেগুলো তার চাই না। তার মন তো শুধু বাঁধা স্বামীর মাঝেই। তবে কি সবকিছু সবসময় আমাদের ভাবনা মোতাবেক হয়? হয় না!

যেই মেয়েটা স্বামীকে অন্ধের মতো বিশ্বাস করেছে তাকে সামনের মানুষটা অন্ধ বলেই প্রমাণিত করে।
যেই মেয়েটা ডিভোর্সি’র তকমাকে ভয় পায় —তাকে ডিভোর্সি হিসেবে বাঁচতে বাধ্য করা হয়।
যেই মেয়েটা স্বামীর ভালোবাসা পেতে চায়—তাকে দেয়া হয় অবহেলা, লাঞ্ছনা।
যেই মেয়েটা স্বামীর হাত আঁকড়ে ধরে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করতে চায় তাকে পৃথিবীতে বোকা, অশিক্ষিত, ন্যাকা নারী হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়। কারণ? আজকাল স্বাধীনচেতা আমরা স্ট্রংনেস, শিক্ষাগত যোগ্যতার যাচাই করি পারস্পরিক সম্পর্ক দ্বারা। কেউ কখনো খতিয়ে দেখতে চায় না ঐ মানুষটা ঐ সম্পর্কে কতটা গভীরভাবে নিজের শেকড় গেড়েছে। কিন্তু মানব মন যে অবুঝ হয়! সম্পর্ক, আবেগ, ভালোবাসার কাছে— স্ট্রংনেস, শিক্ষিত-অশিক্ষিত এই বিষয়গুলো ফিকে পড়ে। তারা এইসব কিছু ছাপিয়ে ভালোবাসার মানুষটিকে আঁকড়ে ধরে বাঁচতে চায়। যদিও বা সামনের মানুষটার কাছে সেই শেকড় উপড়ে ফেলা বড্ড মূল্যহীন।
অনেক তো হলো সম্পর্ক টিকিয়ে রাখার জন্য মেয়েটার প্রচেষ্টা এবং এত চেষ্টার কৈফিয়ত দেয়া। আসুন, এবার এই প্রচেষ্টার ফলাফল দেখি। কেননা পরিশেষে যদি এমন ফলাফল লেখা থাকে তবে আমি মনে করি স্বাধীনচেতা স্ট্রং মানুষগুলোর চিন্তাধারাই একদম সঠিক!

হ্যাঁ, সংসার জীবনে নিজের সর্বোচ্চ টা দিয়েও সেই মায়ার সংসার এবং স্বামী পিছু ছুটে গেল মৌনতার।
কেটে গিয়ে এক সপ্তাহ। এই দিনগুলোতে বহুকিছু পিছু ছুটে গিয়েছে।
ইমরোজের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করে মৌনতার পরিবার। স্ত্রী হত্যার প্রচেষ্টা—ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে গণ্য। ধারা-৩০৭ অনুযায়ী দশ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড ও জরিমানা আদায় করার সিদ্ধান্তে, ইমরোজকে হাসপাতাল থেকে পুলিশের আয়ত্তে নেয়া হয়।
নেওয়াজ সাহেব শারীরিক দিক থেকে যতটা ভঙ্গুর ছিলেন মনের দিক থেকে একদমই নিঃশেষ হয়ে যান মেয়ের সাথে ঘটা এই ঘটনার পর। তার মধ্যে মেয়ের সুস্থতা ব্যতীত আর কোনো চিন্তাই দেখা যায়নি। তাই ইমরোজের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ নেয়ার প্রবণতা তার মাঝে দেখা যায়নি। কিন্তু মৌমিতার হাজব্যান্ড এই বাড়ির আরেক বড় ছেলে। মৌনতাদের তিন ভাই বোনের আরেক অভিভাবক। সে কোনোমতেই ছাড় দেবে না ইমরোজকে। তাই তাদের এই প্রচেষ্টা! আর তাদের এই প্রচেষ্টাকে জোরদার করে সিকদার পরিবার।

কিন্তু তাদের এই প্রচেষ্টা অকৃতকার্য করে মৌনতা। অর্ধমৃত প্রায় মেয়েটির কারোর প্রতি কোনো অভিযোগ নেই। যার জীবন অনিশ্চিত তার আবার কিসের ক্ষোভ, ক্লেশ, বেদনা! যেখানে শতভাগ দোষী সে নিজে। অপরাধ করা এবং অপরাধ সহ্য কর উভয় দোষী! তারা বাধ্য হয় ইমরোজের উপর থেকে অভিযোগ তুলে নিতে।
মৌনতা তখনো ঢাকার এভারকেয়ারে চিকিৎসাধীন। কানাডার ‘প্রিন্সেস মার্গারেট ক্যান্সার সেন্টার’ মৌনতার কেস গ্রহণ করে এবং একসেপটেন্স এর লেটার পাঠায়। সেখানে দুইজন মেডিক্যাল অ্যাটেনডেন্ট এর কথা উল্লেখ করা হয়েছে। তাই সবার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী মৌনতার মা আর নায়েল যাবে মৌনতার সাথে।
আর দুই সপ্তাহের মধ্যে মৌনতা কানডা যাওয়ার জন্য প্রস্তুত হয়ে যাবে।
এরপর আসে সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। ইমরোজ নায়ক অভিশাপ থেকে চির মুক্তির জন্য সেদিন দুই পরিবার সহ খুলনার রাজনৈতিক ক্ষমতাধর ব্যক্তিবর্গ নিয়ে বৈঠক বসে। এই বিদঘুটে সম্পর্কের ভিত্তি নিশ্চিত করার নিমিত্তে। নিখোঁজ প্রায় স্বামীর একটু প্রকাশ্যে আসার অপেক্ষা করছিল মৌনতা।

ছয়টা বছর যার সাথে সংসার করল, যার সন্তানের মা তার থেকে মৃত্যুর মতো শ্রেষ্ঠ উপহার পেয়ে মেয়েটি তখন নির্বাক হয়ে পড়ে। কোনো ক্লেশ, অভিযোগ, যন্ত্রনা কিছুই অনুভব হয় না। একটু দেখতে চায়! জবাবদিহিতা চাইবে না শুধু বদলে যাওয়া সবচেয়ে কাছের মানুষটির ভয়ঙ্কর রূপ দেখে চোখ জুড়াবে।
তার অপেক্ষার অবসান ঘটে। আজ আর মৌনতাকে সিডেশন দেয়া হয়নি। প্লাটিলেট এখন পঁচিশ হাজারে এসেছে। মৌনতা আজ একটু হাঁটা চলা করেছে।
বিকাল নাগাদ দুই পরিবারের গুরুজনরা ঢাকায় আসে। তন্মধ্যে আজ নির্জনা বেগম ও আছেন।
তারা সকলে সন্ধ্যায় হাজির হয় মৌনতার কেবিনে। ঘুমন্ত মেয়েকে বুকে জড়িয়ে শুয়ে ছিল মৌনতা। পড়নে শাড়ি। এখনো শাড়ি পড়া ছাড়েনি। মানুষটার সবসময় বলতো সে বাড়িতে থাকলে শাড়ি পড়তে!
সকলকে দেখে মৌনতা চকিতে উঠে বসে। অস্থির দৃষ্টিতে কাউকে খোঁজে। কিন্তু বরাবরের মতো তার সঙ্গ দেওয়ার জন্য পুরো পৃথিবীটা থাকলেও, তার একান্ত নিজস্ব পৃথিবীটার মুখ দেখতে পেল না।
তারা কি জানে না, তার পুরো পৃথিবী নয়, তার শুধু স্বামী নামক মানুষটাকেই পাশে চাই? না জানে না!
তাই তো পুরো পৃথিবী তার পাশে থাকলে ও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মানুষটা নেই।
বেড থেকে নেমে আসে মৌনতা। ডান হাতে শাড়ির আঁচলে ঠোঁটের ডগায় জমে থাকা ঘামগুলো মুছলো। বাম হাতের উপরিভাগে তখনো জ্বলজ্বল করেছে লাগাতার ক্যানুলা লাগানোর কালচে দাগ। রুগ্ন মুখটি তুলে উদাসীন দৃষ্টি ফেলল। শীতল কণ্ঠে শুধায়,

–“এসেছো সকলে? কি হলো ওখানে? ইমরোজ কি বলল? সে আসেনি কেন? সাথে করে আনার কথা ছিল না? আনোনি কেন? আমাদের একটা মেয়ে আছে সে কী ভুলে গিয়েছে? সবটা এত সহজে শেষ হয়ে যেতে পারে না।”
তকদির সিকদার, নির্জনা বেগম, তপোবন একাধারে নত মস্তকে বসে আছে। মৌমিতা আর রোজের চোখের কার্নিশ তখন টলমলে।
কেবিনের দরজার কাছে সটান হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা এরোজ স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে আড়ং কটনের সুতির শাড়ি পড়া রুগ্ন দেহটির দিকে। চোখে ভর করে অদ্ভুত স্নিগ্ধতা কিন্তু কানে বেজে চলেছে ভাইয়ের সেই কথাটি!
আনস্মার্ট , ব্যাকডেটেড গেঁয়ো—অথচ তারকাছে তো আস্ত এক ঐশ্বরিক সৌন্দর্যের ধনকুবের মনে হচ্ছে নারীটিকে। যেখানে পুরো পৃথিবী আধুনিকতায় নিজেদের স্বস্তা করে চলেছে, সেখানে এই নারীটি এখনো সেই মা, দাদি দের ঐতিহ্য বয়ে চলে। পৃথিবীতে এর থেকে স্নিগ্ধ, সুন্দর মোহনীয় পোশাক হতে পারে না, আর না হতে পারে এমন স্নিগ্ধ বদন।

কামরাজুড়ে পিনপতন নীরবতা। মৌমিতা আর মৌমিতার স্বামী নিরবে ঘরে কোনে দাঁড়িয়ে। নেওয়াজ সাহেব নিরবতা ভাঙলেন। হাতের কাগজখানা নিয়ে এগিয়ে যায়। ভাঁজ খুলতে খুলতে মেয়ের সামনে এসে দাঁড়ায়। চোখে চোখ রাখলে নিজেকে সবচেয়ে অসহায়, নিরুপায়, ব্যর্থ বাবা ছাড়া আর কিছু মনে হয় না। সন্তানের দূরদিনে বাবার মন যে নিজেকেই দোষারোপ দিয়ে চলেছে। কি হতো যদি বিয়েই না দিতো! অন্তত আজ তার মেয়েটার জীবন মরণ নিয়ে অনিশ্চয়তা তো আর সৃষ্টি হতো না।
অন্তরে গুঁড়িয়ে গেলেও চোখে মুখে কাঠিন্যতা রেখে হাতের কাগজটি এগিয়ে দেয় নেওয়াজ সাহেব। শ্রান্ত, অনুভূতিহীন ধিমি কণ্ঠে বলে,

–“কাগজটাতে সাইন করে দাও।”
ভয় কেন সর্বদা সত্যি হয়ে সামনে আসে? মৌনতা ভয়ার্ত চোখে তাকায় বাবার পানে। কম্পিত হাতে কাগজটি স্পর্শ করে শুধায়,
–“আব্বু! এটা কি?”
–“ডিভোর্স পেপার! সাইন করো।”, নেওয়াজ সাহেব শক্ত কণ্ঠে বলে। সহসা মৌনতার কম্পিত হাতটি সহ পুরো দেহ একটা ঝাঁকুনি খেলো। কাগজটি পড়ে যেতে গেলেও পড়তে দেয় না নেওয়াজ সাহেব। শক্ত হাতে মেয়ের হাতটি সহ কাগজটি ধরে ফেলে। পুনশ্চঃ সেটি মেয়ের হাতে ধরিয়ে দিয়ে, একই কণ্ঠে বলে,
–“আর কিছু বাকি নেই, মৌন! সব শেষ! সাইন করো।”
মৌনতা ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল। বাবার হাতটি ঝাড়া দিয়ে ছিটকে দূরে সরে যায়। পেছাতে পেছাতে কেউ তার বাহু শক্ত করে আঁকড়ে ধরলো। মৌনতা চমকে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকায় মৌমিতার শক্ত মুখপানে। মৌমিতা’র দৃষ্টি ঠিক কাগজটির পানে। মৌমিতা দৃষ্টি সরায়। চোখ রাখে বোনের চোখে। কঠোর গলায় বলে,
–“সাইন কর, মৌনতা।”
জীবনের সবচেয়ে ভয়নাক কল্পনাকে সত্যি হতে দেখে মেয়েটি কাঁপতে লাগল। কম্পিত হাতে বোনের শক্ত বাঁধন থেকে নিজেকে ছাড়াতে চায়। জোরপূর্বক এক পা দুই পা পেছাতে গেলেও পারে না। মৌমিতা শক্ত হাতে তাকে টেনে পুনরায় দাঁড় করায় কাগজটির সামনে।
মেয়েটি হাত ছাড়াতে ছাড়াতে যখন লাগাতার ব্যর্থ হয় তখন ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল। ভয়ার্ত কণ্ঠে বলে,

–“ছাড়ো আপা, ছাড়ো। আমি সাইন করব না। করব না সাইন। আমার নায়েল বাবার অপেক্ষা করতে করতে ঘুমিয়ে পড়েছে। উঠলে বাবাকে চাইবে। আমি ওকে কী জবাব দেবো?”
–“ইমরোজ অন্যত্র ঘর বেঁধেছে মৌন। সে আর কোনদিন ফিরে আসবে না। ইমরোজ সৃজাকে বিয়ে করেছে অনেক আগেই।”
মৌমিতার শক্ত কণ্ঠে মৌনতা হঠাৎ স্থবির হয়ে পড়ে। আর জোরাজুরি করার শক্তি পেল না তার দেহ। একদম স্রোতহীন নদীর ন্যায় পড়ে রয় শক্ত বাঁধনের মাঝে। ঘাড় ঘুরিয়ে তাকায় বোনের ঐ শক্ত মুখপানে। নিস্তেজ, ধিমি কণ্ঠে শুধায়,
–“ইমরোজ বিয়ে করে নিয়েছে?”
–“হ্যাঁ।”, মৌমিতা ছলছল নেত্রে ছোট্ট করে জবাব দেয়। দৃষ্টি রাখে অনুভূতিহীন নিস্তেজ মুখটিতে। হাত বাড়িয়ে তালাকের কাগজটি নিজের হাতে নেয়। সেটি মৌনতার মুখের সামনে তুলে ধরে বলে,
–“ও সাইন করে পাঠিয়েছে। এখন তোর সাইন করার পালা।”
মৌনতা দেখলো কাগজটিকে। কাগজটি নিজের হাতে নিয়ে মন্থর গতিতে কাগজটি মেলে ধরতেই সর্বশান্ত হয়ে আসে দেহ। ইমরোজের সাইনটা জ্বলজ্বল করছে। নিস্তেজ দেহটি ঢলে পড়ে।
ঢলে পড়া দেহটিকে আঁকড়ে ধরে মৌমিতা বসে পড়ল। উদ্বিগ্নতায় বিবর্ণ মুখ তার। মিহি স্বরে ডেকে ওঠে,

–“মৌন?”
মৌনতা চোখ তুলে তাকায়। শান্ত তার দৃষ্টি। শান্ত কণ্ঠে বলে,
–” কলম দেবে না? সাইন করব কি করে?”
এরোজ সহ সকলে উদাসীন দৃষ্টি ফেলল নারীটির মুখপানে। মৌমিতা টেবিলের উপর থেকে কলম টা এনে হাতে দিতেই মেয়েটি সাগ্রহে সেটি আঁকড়ে ধরে।
নিজের সর্বোচ্চ শক্তি দিয়ে কলমটিকে আঁকড়ে ধরলেও থরথরিয়ে কাঁপতে লাগল কলমটি। বহু চেষ্টা করেও কলমটি কাগজের নির্দিষ্ট জায়গায় বসাতে না পারলে, একটি হাত শক্ত করে তার হাতটিকে কলম সহ আঁকড়ে ধরল। মৌনতা ঘাড় কাত করে তাকায় বাবার দিকে। নেওয়াজ সাহেব বলে,
–“সাইন কর।”
মাথার উপর আরেকটা স্পর্শ পেলে মৌনতা ঘাড় ঘুরিয়ে তাকায়। তপোবনের শ্রান্ত মুখটি ভেসে উঠল। বিষাদে ভরা কণ্ঠে তপোবন সাহস জুগিয়ে বলে,

–” আমাদের মৌন স্ট্রং! আমি জানি একদিন সব কষ্টকে জয় করে সে হাসবে। সাইন করো!”
–“আমার হাসি আর সুখ দুটোই ছিনিয়ে নিয়ে গিয়েছে, ভাইজান।”
ম্লান ফ্যাসফ্যাসে কণ্ঠে বলেই মৌনতা ধীরগতিতে সাইন করে পেপারটিতে। ব্যস! একটা সাক্ষর! গোটা এক অসফল বৈবাহিক জীবন পিছু ছুটে গেলো তার। যেই মানুষটার সাথে দু’দিন আগেও একান্ত মুহূর্ত কাটালো সেই মানুষটা এখন তার জন্য পরপুরুষ!
–“নায়েলের বাবা তো থেকেও নেই‌ আর মা ও থাকবে না। এই পৃথিবীতে নায়েলের নিজের বলে আর কেউ থাকলো না।”
বিড়বিড় করতে করতেই মেঝে ঘেঁষে বসে থাকা দেহটি নিস্তেজ হয়ে পড়ে। যন্ত্রনা থেকে মুক্তির এর থেকে ভালো উপায় আর হতে পারে না। রুগ্ন দেহটি দু’হাতের মাঝে ঢলে পড়তেই নেওয়াজ সাহেব শক্ত হাতে আগলে নিলো। কেউ বিচলিত হলো না!
ডাক্তার বলেছিল অতিরিক্ত মানসিক চাপ মেয়েটি সহ্য করতে পারবে না। নেওয়াজ সাহেবের এক হাতের তালুতে থাকা মুখটির দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল এরোজ। অন্তরালে শুধু আহাজারি করে বেড়াচ্ছে,

–“এই মানুষটার কি দোষ ছিল?
পরনারীর ভয়ঙ্কর আগমনে সেখানেই শেষ হয় একটি পরিপূর্ণ সুখী পরিবার। শেষ হয় মৌনতার ছয় বছরের সাজানো গোছানো সংসারটি। নাজুক হয়ে পড়ে নায়েলের বাবা নামক আশ্রয়স্থল।
নিজের সবটুকু দিয়েও মৌনতা শেষ পর্যন্ত তার শখের গড়া সংসারটি টিকিয়ে রাখতে পারল না।
কক্ষটি তমসায় মিলিয়ে গেল। নিস্তেজ মৌনতার ঠাঁই হলো ঐ সাদা বেডে। হাতে পুনরায় লাগানো হলো ক্যানুলা। যেগুলো এখন তার নিত্য দিনকার সঙ্গী।
জনমানবহীন কামড়াটির এক কিনারায় দাঁড়িয়ে থাকা এরোজ ধীর কদমে এগিয়ে যায় বেডের কাছে‌। ঠিক ততটা কাছে যায়, যতটা কাছে গেলে চিরচেনা ল্যাভেন্ডার এর সুবাস নাসারন্ধ্রে তীব্র আধিপত্য বিস্তার করে। আঁধারের মাঝে স্পষ্ট শুভ্র দুটি মুখের দিকে আলতো ঝুঁকে দাঁড়ানো ছেলেটির অশ্রুভেজা নয়নে স্মিত হাসল। মায়ের বুকের ওমে নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে আছে নায়েল। অসুস্থতা আর যন্ত্রণার সবটুকু দেয়াল ভেদ করে এক অদ্ভুত স্বর্গীয় শান্তি যেন এই বিছানায় ভর করেছে।
পুরুষালী দেহটি না চাইতেও আলতো ঝুঁকে দাঁড়াল নারীটির মুখের ওপর। তপ্ত নিঃশ্বাস ছুঁয়ে গেল মৌনতার শীতল কপাল। এরোজ খুঁটে খুঁটে দেখে স্নিগ্ধ মুখশ্রীটি। আজ কতগুলো বছর পর এই মুখটিকে চোখ ভরে দেখার অধিকার পেল। কিন্তু বিনিময়ে ভাগ্য যে এত চড়া মূল্য নেবে, তা ভাবেনি। এরোজ অতি ক্ষীণ স্বরে ফিসফিসিয়ে বলল,

–“আপনাকে এভাবে দেখতে হবে জানলে হয়তো সৃষ্টিকর্তার কাছে প্রার্থনা করতাম, আমাদের আর কখনোই দেখা না হোক।”
অবচেতনেও নারীটির বদ্ধ নেত্রের কার্নিশ বেয়ে তপ্ত অশ্রু গড়াচ্ছে। এরোজ কম্পিত হাতটি বাড়ায়, বড্ড সাহস করে মুছে ফেলল অশ্রুটুকু। ক্ষীণ স্বরে বলল,

অপরাহ্নে উপসংহার পর্ব ৪৫

–“সৃষ্টিকর্তার থেকে আরেকটু লহমা চেয়ে নেবো, মৌন। তবুও ধরণী থেকে এই ল্যাভেন্ডারের সুবাসটুকু হারাতে দেব না। এই চোখে আর দুঃখের অশ্রু ঝড়বে না। আপনার একটা ঘর হবে, একটা সংসার হবে, কেউ আপনাকে চোখে হারাবে, আর পাঁচটা মেয়ের মতো আপনার ও স্বামী সন্তান নিয়ে একটা সুখের সংসার হবে। আর একটু লড়াই মৌন, দুঃখুগুলোকে দুঃস্বপ্নে পরিণত করতে হবে।”

অপরাহ্নে উপসংহার পর্ব ৪৭