Home অপরাহ্নে উপসংহার অপরাহ্নে উপসংহার পর্ব ৪৭

অপরাহ্নে উপসংহার পর্ব ৪৭

অপরাহ্নে উপসংহার পর্ব ৪৭
তোনিমা খান

ঠিক তৃতীয়বারের মতো ভেঙে চুরমার হয়ে গেল সিকদার পরিবার। তকদির সিকদার আজ যেন ঠিক সেই ত্রিশ বছর পূর্বের বিদঘুটে পরিস্থিতিতে দাঁড়িয়ে আছে। তবে আজ চিত্রটা খানিক মর্মান্তিক। তিল তিল করে গড়ে তোলা সন্তানেরা আজ বাবার বুক থেকে দূরে সরে যাচ্ছে, একজন পিতার জন্য এর চেয়ে দুঃসহ যন্ত্রণা আর কী হতে পারে!
মৌনতা তার সন্তানের মতো, তার থেকেও বড় কথা হলো মৌনতা তার ঘরের সৌন্দর্য! ইমরোজ শুধু তার বুক খালি করেনি বরং তার গোটা পরিবারটা ছিন্নভিন্ন করে দিয়েছে।
বিধ্বস্ত বাবাকে একপলক দেখে তপোবন কামরা থেকে বেরিয়ে আসে। বুকের ভেতরটা এক অসহনীয় ভারে নুইয়ে পড়ছে। আপনজন আঘাত দিতে এতটা নিপুণ না হলেও পারত!
হাসপাতালের করিডোরে মন্থর পায়ে হাঁটতে হাঁটতে সে ফোনটা বের করল। গত তিন সপ্তাহে প্রয়োজন ছাড়া ফোনের কাছে যাওয়ার ফুরসত মেলেনি। মিসড কল লিস্টে তৃশানের চৌষট্টিটা কল দেখে সে ব্যাক করল।
রিসিভ হতেই গম্ভীর গলায় জানাল,

–“তৃশান, আমি একটু ঝামেলায় আছি। খুলনাতে এসে তোমার সাথে দেখা করব।”
অন্তঃস্থলে গুমড়ে মরা তৃশান দিশেহারা প্রায়। সে অবিশ্বাস্য সেই সত্যি আজ ও বিশ্বাস করতে পারেনি। অপেক্ষার প্রতিটি পল তার কাছে দুষ্কর মনে হচ্ছে। সে রুদ্ধশ্বাসে শুধাল,
–“আমায় শুধু একটা কথা বলুন, রূপকথা নিশ্চয়ই আপনাদের রিলেটিভ, তাই না? কেমন রিলেটিভ?”
অন্য পুরুষের কণ্ঠে নিজের স্ত্রীর প্রতি এমন ব্যাকুল কৌতূহল শুনে তপোবনের শ্রান্ত চোখ দুটো জ্বলে উঠল। সে দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
–“তুমি যাকে রিলেটিভ রিলেটিভ করছ সে আমার স্ত্রী, তৃশান। প্লিজ মাইন্ড ইয়োর ল্যাঙ্গুয়েজ! তোমার মধ্যে আমার স্ত্রী নিয়ে এত কৌতুহল দেখাটা অস্বস্তিকর।”
তৃশান যেন হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে ফেলল অবিশ্বাস্য কথায়। সে গর্জে উঠে বলল,
–“এটা কী করে সম্ভব? আপনি কি নিজের বয়স দেখেছেন? ২০ বছরের একটা মেয়ে কী করে আপনার স্ত্রী হয়? আপনার নিজেরই তো ওর বয়সী ছেলে আছে! কোন বিবেকে আপনি ওইটুকু একটা মেয়েকে নিজের স্ত্রী বলে দাবি করছেন?”

–“রূপকথা কেন আমার স্ত্রী? কিভাবে হয়েছে? সেই কৈফিয়ত নিশ্চয়ই আমি তোমায় দেব না, তৃশান। রূপকথা আমার স্ত্রী এটাই ধ্রুব সত্য। এটা বলতে আমার বিবেকে বাঁধার কথা না বরং অন্য একজনের স্ত্রী নিয়ে তোমার এত অনধিকার চর্চা, আগ্রহ বিবেকবর্জিত কাজ।
নিজের আচরণে লাগাম টানো, তৃশান। আমায় যেন, তোমার বাবার কাছে এটা জানাতে না হয়—যে তুমি কারোর দাম্পত্য জীবনে অযাচিত হস্তক্ষেপ করছ। রূপকথার থেকে দূরে থাকবে।”
তপোবন চোয়াল শক্ত করে বলেই ফোনটা কেটে দিল।
দীর্ঘ তিন সপ্তাহের রুদ্ধশ্বাস প্রতীক্ষা এক নিমিষেই নিঃস্ব হয়ে গেল। থম মেরে বসে থাকা তৃশানের চোখের সামনে ভাসছে কারোর রাগান্বিত মুখশ্রী, হুটহাট ভয় পেয়ে যাওয়া ভীতু মুখশ্রী। অত্যল্প সময়ে গড়ে তোলা একটা প্রেমময় রাজ্যের কতশত মোহনীয় মুহুর্ত! সবটা ভ্রম, সবটা ভুল, সবটা দুঃস্বপ্ন!
অসহ্য অস্থিরতায় তৃশান হঠাৎ করেই হাতের ফোনটা ছুঁড়ে মেরে চিৎকার করে উঠল। চোখে মুখে অজস্র স্বপ্ন, আকাঙ্ক্ষা ভেঙে যাওয়ার আর্তনাদ।
তৃশানের রক্তাভ নেত্র থেকে টপটপিয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ছে। অস্থির চিত্তে আওড়াচ্ছে,

–“সবটা ভ্রম, সবটা ভ্রম।”
বিকট শব্দে মৈতি হন্তদন্ত হয়ে ছেলের ঘরে ঢুকতেই অবাক হয়ে গেল। মেঝেতে বসে ছেলেকে কাঁদতে দেখে তিনি স্তম্ভিত। ছুটে গিয়ে তৃশানকে বুকে জড়িয়ে নিলেন তিনি। মাথায় হাত বুলিয়ে ব্যাকুল হয়ে শুধালেন,
–“এই আব্বা, কাঁদছিস কেন? মাকে বল, কি হয়েছে? এত বড় ছেলে কাঁদে নাকি?”
কারোর বুকে আশ্রয় পেতেই তৃশান এবার শব্দকরে কেঁদে উঠল। কান্নারত গলায় বলল,
–“মামনি, সবটা কি করে ভ্রম হতে পারে বলো? ফেইরি টেইল তো ছোট্ট , ও কি করে কারোর দ্বিতীয় স্ত্রী হতে পারে? আমার ফেইরি টেইল হারিয়ে গিয়েছে। সবটা ভ্রম ছিল, মামনি।”
মৈতি অবুঝপানে তাকিয়ে রইল ছেলের দিকে। বিগত অনেকদিন যাবৎ তার ছেলেটা আগের মতো নেই। গুন্ডামি করে না, ফাজলামি করে না, বাবাকে বিরক্ত করে না, সারাদিন ঘরে শুয়ে থাকে। সে অবুঝ কণ্ঠে শুধায়,
–“ফেইরি টেইল কে, আব্বা?”
মায়ের বুকে কাঁদতে কাঁদতে সুঠামদেহী ছেলেটি তন্দ্রাগ্রস্থ। বিড়বিড় করে আওড়ায়,
–“কেউ না। ফেইরিটেইল নেই। সবটা ভ্রম!”

যেখানেই সমাপ্তির রেখা টানা হয়, সেখান থেকেই সূচনার রেখা শুরু হয়। বইয়ের পান্নার ন্যায় মৌনতার জীবনের একটা দুঃসহনীয় পান্না শেষ। এখন নতুন পান্নায় পদার্পণ করার প্রতীক্ষা!
শীতেকালে পাতা ঝড়ে পড়া মানে গাছের মৃত্যু নয়। বরং বসন্তের আগমনে নিজেদের নতুন রুপে আর সুবাসে সাজিয়ে তোলার প্রক্রিয়া। তেমনি মৌনতা আর নায়েলের জীবন একটু একটু করে বদলে যাচ্ছে। হয়তো কোনো অজানা সুখের দুয়ারে কিংবা চিরস্থায়ী নিঃশেষের দুয়ারে।
মাত্র দুই সপ্তাহের ব্যবধানে মৌনতার দীর্ঘ ছয় বছরের বৈবাহিক জীবন এক বীভৎস দুঃস্বপ্ন হয়ে ধরা দিল। সামান্য একটা স্বাক্ষর—ব্যাস, সব শেষ! যে মানুষটা একসময় তার রন্ধ্রে রন্ধ্রে মিশে ছিল, আজ সে মৌনতার জীবনের এক ভয়ঙ্কর কালো অধ্যায়। সেই অন্ধকার অধ্যায় থেকে সে ভাগ্যক্রমে নিজের রক্ত-মাংসে গড়া একফালি চাঁদ পেয়েছে, যে আজও মৌনতার আঁচল আঁকড়ে ধরে আছে।
জীবনের বিভৎসতার কাছে হেরে যাওয়া মৌনতা ঠিক একটা মাটির পুতুলের ন্যায় অনুভূতিহীন, পাথরের ন্যায় বেডে পড়ে থাকে। কোনো কিছুর প্রতি তার আর আগ্রহ নেই, কোনো তাগিদ নেই। দুঃখ সইতে সইতে তার দেহ-মন আজ প্রস্তরসম। তবে তার এই নিথর অনুভূতিরা কেবল তখনই জেগে ওঠে, যখন সেই ‘চাঁদ’ নামক ছোট্ট সত্ত্বাটির হাতের স্পর্শ সে পায়। যার চোখে তাকালে শ্রান্ত মৌনতা আরেকটা লড়াই দেখতে পায়। তবে এবার লড়াইটা নিজের শরীরের সাথে।

কেটে যায় দুই সপ্তাহ। ধারণার অতিরিক্ত সময় লেগে গেল মৌনতাকে ফ্লাইটের জন্য ফিট করতে। দুই ঘন্টার তারতম্যে নতুন নতুন ডোনার খোঁজা এবং সতেজ রক্ত দিয়ে প্লাটিলেট স্বাভাবিক করার প্রক্রিয়া আগামীকাল পর্যন্ত বহাল থাকবে।
গতকালই মৌনতা, নায়েল আর মাসুমা বেগমের ভিসা চলে এসেছে। মৌনতা আর নায়েলের পাসপোর্ট আগে থেকে থাকলেও, তার পরিবারে কেবল মাসুমা বেগম আর নেওয়াজ সাহেবের পাসপোর্ট আগে থেকেই ছিল; কারণ তারা নেওয়াজ সাহেবের চিকিৎসার জন্য ভারতে গিয়েছিলেন। নেওয়াজ সাহেব বর্তমানে অসুস্থ বলে তার পক্ষে যাওয়া সম্ভব নয়, তাই মাসুমা বেগমই সঙ্গী হচ্ছেন। এই পৃথিবীতে মা-ই তো সেই মানুষ, যার সান্নিধ্যে সন্তানের মরণব্যাধিও যেন কিছুটা ফিকে হয়ে আসে। হয়তো মায়ের ছোঁয়ায় মৌনতার এই কঠিন লড়াইটা কিছুটা সহজ হয়ে যাবে।
মৌনতা এখন ফ্লাই করার জন্য পুরোপুরি তৈরি।
আগামীকাল রাত বারোটায় তাদের ফ্লাইট। কিন্তু সবচেয়ে চিন্তার বিষয় হলো যাত্রাপথে সাড়ে চার ঘন্টার ট্রানজিট। এতটা সময় মৌনতার শারীরিক অবস্থা স্থিতিশীল থাকবে কি না, তা নিয়ে সবাই শঙ্কিত।
বাবার পরে যেই মানুষটা একটা নারীর শক্তি, ভরসা, আশ্রয়স্থল হয় , সেই মানুষটি যখন প্রাণঘাতী আঘাত হানে— তখন বিশ্বাস আর ভালোবাসা অনুভূতিগুলো ঠিক কতটা বিদঘুটেভাবে মুখ থুবড়ে পড়ে তা কি বোঝে পুরুষ মানুষ?
নেওয়াজ সাহেব শুধু ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে নিজের মেয়েটির দিকে। এই মৃতপ্রায় কঙ্কাল মেয়েটিকে সে হাসিমুখে শশুর বাড়িতে পাঠায়নি, তবে তাকে কেন তার মেয়েটিকে এভাবে ফেরত দেয়া হলো?
মাথায় কারও স্পর্শ অনুভব করতেই মৌনতা দুর্বল চোখে তাকাল। নেওয়াজ সাহেব তড়িঘড়ি করে চোখের কোণে জমে থাকা নোনা জল মুছে ফেললেন। জোর করে মুখে হাসি ফুটিয়ে বললেন,

–“উঠেছিস? শরীর ভালো লাগছে? কিছু খাবি?”
মৌনতা স্থির নয়নে তাকিয়ে রইল। তবে আজ বহুদিন বাদ মেয়েটির স্বাভাবিক কণ্ঠস্বর শোনাগেল। সে ক্ষীণ স্বরে বলল,
–“সারাক্ষণ এখানে বসে থেকো না। শরীর খারাপ করবে। বাসায় গিয়ে বিশ্রাম নাও।”
নেওয়াজ সাহেব উপচেপড়া কান্না আঁটকে জোরপূর্বক হেসে বললেন,
–“যাব, কাল তোদের ফ্লাইটে উঠিয়ে দেয়ার পরে তো আমি একা হয়ে যাব। এরপর বিশ্রাম আর বিশ্রাম।”
–“এগুলো কেন করছো? বিদেশে চিকিৎসা করানোর এত টাকা পাবে কোথায়? আম্মা চলে গেলে তোমার দেখাশোনা কি করে হবে?”
নেওয়াজ সাহেব কোনোভাবেই ভেঙে পড়তে চান না। কিন্তু নিজেকে ধরে রাখতে পারেন না সে।
সে কঠোর চোখে তাকালেন নিজের জীবনের কঠিন অবস্থায় থেকেও অন্যের চিন্তা করা মেয়েটির দিকে।
সে অনুযোগ ভরা কণ্ঠে বললেন,

–“আমার অসুস্থতা আমায় যত না কষ্ট দেয় তার থেকেও বেশি কষ্ট দিচ্ছে তোর এই পরিণতি, মৌন। তুই এমনভাবে শশুরবাড়িতে পড়ে ছিলি যেন তোর বাবা মরে গিয়েছে, তুই এতিম।”
–“এমন কথা বলো না, আব্বু।”, মৌনতা টলটলে নেত্রে বলল।
–“তোর উপর আমার অভিযোগ কখনো শেষ হবে না, মৌন। আমার মেয়েটার কাছে আমি বেঁচে থেকেও একটা মৃত মানুষের মতো ছিলাম। এটা আমায় সারাজীবন কুঁড়ে কুঁড়ে খাবে।”, নেওয়াজ সাহেব কাঁদছেন। বুকটা দুমড়ে মুচড়ে যাচ্ছে আফসোসে। মেয়েটা একটু সাহস করে বাবাকে জানালে কি এত দেরি হয়ে যেত?
সে ফের অভিযোগ করে বলল,
–“বাবাকে একটু জানালে কি হতো, মৌন? বাবা হয়ে সন্তানকে এই অবস্থায় দেখা কতটা কষ্টকর সেটা মা হয়েও বুঝলি না। আমি কতটা নিষ্কর্মা বাবা!”
দীর্ঘ স্তব্ধতা ভেঙে মৌনতা গুমড়ে কেদে উঠল। ফিসফিসিয়ে বলল,
–“মা হয়েছি বলেই তো সন্তানকে একটা স্বাভাবিক জীবন দেয়ার জন্য শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত চেষ্টা করে গিয়েছি, কিন্তু দেখো আমি হেরে গিয়েছি। আমার নায়েলের মাথার উপর কেউ রইল না। তোমার কোনো দোষ নেই, আব্বু। আমি বোকা, আমার বোকামির শাস্তি পাওয়া উচিৎ। সেটা যদি মৃত্যু হয় তবে তাই শ্রেয়। কিন্তু তোমার উপর চাপ প্রয়োগ করে বেঁচে থাকার কোনো মানে নেই, আব্বু। জীবনটা বড্ড ভারী লাগছে।”

–“চুপ মৌন, একদম চুপ। তুই কি চাস আমি অপরাধবোধে মরে যাই? বাবাকে আর ছোট করিস না, মা। বাবারা সব পারে। আমিও পারব, তবুও আমার চোখের সামনে আমার সন্তানকে শেষ হয়ে যেতে দেখতে পারার ক্ষমতা আমার নেই। তাই তুই একটাও কথা বলবি না।”
–“তুমি অসুস্থ, আব্বু। আম্মা আমার সাথে গেলে তোমার দেখাশোনা করবে কে? ভিনদেশে থেকে চিকিৎসা করানো এত সহজ না, আব্বু।”
নেওয়াজ সাহেব চোখের পানি মুছে নেন। দৃঢ় কণ্ঠে বলেন,
–“আমি একদম সুস্থ। আমার মৌন সুস্থ হয়ে আবার বাবার বুকে ফিরে আসবে তার জন্য আমি অপেক্ষায় থাকব। তোর আপা আছে না আমায় দেখার জন্য। সৃষ্টিকর্তা সবসময় আছেন আমাদের পথ সহজ করার জন্য। তুই নিশ্চিন্তে যাবি আর চিকিৎসা করিয়ে একদম সুস্থ হয়ে ফিরে আসবি।”
মৌনতা ম্লান হাসল। বাবা বোধহয় ভুলেই বসেছে, প্রাণঘাতী রোগ নয় বরং মুক্তি তার রন্ধ্রে রন্ধ্রে ছড়িয়ে পড়ছে। সে ক্ষীণ স্বরে বলল,

–“স্বপ্ন দেখো না, স্বপ্নগুলো সবসময় দুঃস্বপ্ন হয়ে যায়। আমিও স্বপ্ন দেখেছিলাম এখন সেই স্বপ্নের কথা ভাবলেও গা শিউরে ওঠে।”
নেওয়াজ সাহেব অশ্রুসজল শ্রান্ত নয়নে চেয়ে বললেন,
–“যেই সন্তানের জন্য এত ধৈর্য্য এত দুঃখ সহ্য করা সেই সন্তানের কথা একটুও ভাবছিস না, মৌন।”,
মৌনতা তিরতির করে কেঁপে ওঠা ওষ্ঠদ্বয় কামড়ে ধরে বলল,
–“স্বপ্ন দেখতে ভয় হয়, আব্বু। আবার যদি দুঃস্বপ্ন হয়ে যায়?”
নেওয়াজ সাহেব মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন। দৃঢ় কণ্ঠে বললেন,
–“আমি জানি, আমার মৌন শক্তিশালী। এবার বাবা আর মৌন মিলে স্বপ্ন দেখব, যেই স্বপ্নকে সৃষ্টিকর্তা কখনো দুঃস্বপ্ন হতে দেবে না। শুধু আরেকটু লড়াই, আম্মা।”

এবার শুধু মৌনতা নয় বরং সকলে মিলে আরেকবার স্বপ্ন বুনলো। আরেকবার লড়াই করার সাহস জোগালো। সকলের চোখেমুখে একটাই প্রত্যাশা, যবনিকা অবশ্যই অবতরণিকার থেকে অধিক সৌন্দর্য আর সুখে মোড়া হবে।
সকাল এগারোটা নাগাদ দু’টো গাড়ি হাসপাতালের পার্কিং লটে থামতেই তপোবন এগিয়ে গেল। ওষ্ঠকোনা আলতো বেঁকে যায় স্ত্রী সন্তান আর পারমিতাকে দেখে। সে এগিয়ে গিয়ে আলগোছে পারমিতাকে বুকে জড়িয়ে নিলো। মাতৃস্নেহে সমৃদ্ধ পারমিতা হুঁ হুঁ করে কেঁদে উঠল সেই উষ্ণ আলিঙ্গনে। আক্ষেপের সুরে বলল,
–“আমার মৌনর সাথে এটা কি হয়ে গেল, তপু।”
তপোবন আনত মুখে বলল,

–“দোষ সবটা আমাদের, মা। আমরা আপনজনকে ভালোবেসে অন্ধের মতো বিশ্বাস করি, আর তারা আমাদের নির্বিকার অন্ধ প্রমাণিত করে।”
–“তুই চিন্তা করিস না, আমার মৌন এমন কোনো কাজ কখনো করেনি যার জন্য সৃষ্টিকর্তা ওকে এত কঠিন শাস্তি দেবে। ও আবার সুস্থ সবল হয়ে ফিরে আসবে আমাদের মাঝে।”
–“হুঁ, উপরে চলো।”
তপোবন শাশুড়িকে ছেড়ে ছেলেকে বুকে জড়িয়ে নেয়। আদুরে স্বরে বলে,
–“আমার আব্বু কেমন আছে?”
তানশান জবাব দেয় না। সে ছলছল নেত্রে চেয়ে শুধায়,
–“মেজো মা আমাদের ছেড়ে চলে যাচ্ছে, পাপা?”
–“মেজো মা চিকিৎসা করাতে যাচ্ছে, আব্বু। আবার ফিরে আসবে।”
–“মেজো মা, দ্রুত সুস্থ হয়ে আবার দেশে ফিরে আসবে তো, পাপা?”
তপোবন ছেলের মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বলল,
–“ফিরে আসতে তো হবেই, অন্তত আমার নায়েল আর তানশানের জন্য হলেও তাকে সুস্থ হয়ে ফিরতে হবে।”
তানশান অসুখ শব্দটিকে ভীষণ ভয় পায়। সেটা ছোট হোক কিংবা বড়। অসুখ মানেই তার কাছে প্রিয়জন হারানোর ভয়।
ছেলেকে বুকে জড়িয়েই তপোবন অনতিদূরে দাঁড়িয়ে থাকা রূপকথার মাথায় হাত রাখল। মেয়েটার চোখমুখ শুকিয়ে গিয়েছে। নিচু স্বরে শুধাল,

–“ঠিক আছো?”
রূপকথা নিরুত্তর শুধু মাথা নাড়লো। কণ্ঠানালী থেকে নিঃসৃত হয় না একটি বাক্য। এই বৃহৎ সংসারে তার মাথার উপর থাকা শক্তপোক্ত একটি ঢাল যে নড়বড়ে হয়ে গিয়েছে। ঐ একটা মানুষের সহযোগিতায় সে স্বামী সন্তান, পড়াশুনা সবকিছুতে এগিয়ে ছিল। কিন্তু ঘুণাক্ষরেও টের পায়নি, এত শক্তপোক্ত মানুষটার হাসিমুখের আড়ালে বিভৎস যন্ত্রণা লুকিয়ে থাকত।
শেষবারের মতো খুলনা থেকে নিজের সর্বোস্ব নিয়ে চলে এলো এরোজ। যেই শহর শুধু দুঃখ দিতে জানে সেই শহরে আর কোনোদিন পা দেবে না। যেই শহরে মৌনতার সকল স্বপ্ন দুঃস্বপ্নে পরিণত হয়েছে, সেই শহরে আর তার পা দেয়া হবে না তার।
দ্বিতীয় গাড়িটি থেকে ড্রাইভার আর এরোজ প্রয়োজনীয় সবকিছু নামিয়ে নিচ্ছে। গতকাল এরোজ, রোজ আর মৌমিতা শেষ বারের মতো খুলনায় যায় নায়েল, মৌনতা আর মাসুমা বেগমের প্রয়োজনীয় সবকিছু নিয়ে আসতে।
তপোবনের আদেশে রূপকথা তানশান আর পারমিতাকেও আনা হয়। যাওয়ার আগে মৌনতার সাথে একবার দেখা করার জন্য।
তপোবন ধীর কদমে এগিয়ে যায় ব্যস্ত এরোজের কাছে। কেউ সযত্নে ঘর্মাক্ত ললাট মুছে দিতেই এরোজ চোখ তুলে তাকায়।
তপোবন মিহি স্বরে বলল,

–“লাগেজগুলো হোটেলে রেখে আসতি।”
এরোজ ব্যস্ত কণ্ঠে বলল,
–“যাব, একটু উপর থেকে আসি। পুরো খুলনাতে শীতের পোশাক তেমন ভালো পাইনি। বাসায় যা আছে তা শীত নিবারণ করার জন্য যথেষ্ট নয়। এখন এখানেই খুঁজতে হবে।”
তপোবন সায় জানিয়ে বলল,
–“চিন্তা করিস না খুঁজলেই পেয়ে যাব। তুই কাজ শেষ কর তারপর বের হবো।”
এরোজ মাথা নেড়ে দ্রুত ছুটে যায় উপরে। কদমে তার ভীষণ তাড়া, কাউকে দেখার তৃষ্ণা।
তপোবন ব্যস্ত ভাইয়ের দিকে এক পলক তাকিয়ে মৌমিতা আর রোজের দিকে তাকায়। বলল,
–“রোজ, মৌমিতা তোমাদের উপর ধকল গিয়েছে। তোমরা নাহয় হোটেলে চলে যাও। রেস্ট নিয়ে, খেয়ে আবার একটু পরে এসো।”
রোজ অসম্মতি জানালো।
–”আমি কোথাও যাব না ভাইজান। আমি মৌন বউয়ের কাছেই থাকব।”
বলেই সেও ছুটলো এরোজের পিছু পিছু। মৌমিতা ভাই বোনের থেকে দৃষ্টি সরিয়ে তাকায় তপোবনের দিকে। চোখেমুখে তার অজস্র কৌতুহল। সে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি ফেলে শুধায়,
–“ভাইজান, এরোজকে অন্যরকম লাগছে। আগে কখনো ওকে এতটা দায়িত্ববান, চিন্তিত দেখা যায়নি।”
তপোবন কিছুটা অপ্রস্তুত বোধ করলেও শান্ত মুখশ্রীর আড়ালে তা প্রকাশ হতে দিল না। ম্লান হেসে বলল,
–“পরিবারের বিপদে সে সবসময় এমনি দায়িত্ববান। অন্যায় একদম সহ্য করতে পারে না।”
মৌমিতার কৌতুহল তবুও দমলো না। সে উৎকণ্ঠা নিয়ে বলল,
–“আপনি দেখেননি, ও গতকাল খুলনায় গিয়ে কি কি করেছে। জেন্টল পার্ক শপে মারামারি লাগিয়ে দিয়েছিল, শীতের ভালো কালেকশন নেই কেন এর জন্য! পাগলের মতো পুরো শহর খুঁজেছে, মৌনতা আর নায়েলের গুরুত্বপূর্ণ কিছু ব্যতীত আর কিছুই নিতে দেয়নি। ওখানে গিয়ে পড়বে কি ওরা?”
তপোবন উষ্ণ নিঃশ্বাস ফেলে বলল,

–“ও তো এমনি, মৌমিতা। সব বিষয়ে বাড়াবাড়ি উগ্রতা না করলে হয় না। আর এখান থেকে যত পোশাক আশাক নাও না কেন, এই মুহূর্তে টরেন্টোর শীতের কাছে এগুলো কিছুই না। এইসব পোশাক ওখানে পড়ে টিকতে পারবে না ওরা। তাই বোধহয় ও বাড়তি ঝামেলা করতে চায়নি।”
–“ওহ্, হতে পারে।”, মৌমিতা নিচু স্বরে বলল। তবুও চোখমুখে অজস্র প্রশ্ন। বিগত তিন সপ্তাহ যাবৎ মৌনতার চিকিৎসার প্রয়োজনে, পাসপোর্ট ভিসা এইসব নিয়ে যত ছোটাছুটি করতে হয়েছে সবটা এরোজ নিজ দায়িত্বে করেছে। কোথাও কোনো ত্রুটি রাখেনি। বিগত ছয় বছরে এতটা দায়িত্বপরায়ন এরোজকে সে কখনো দেখেনি।
ব্যস্ত কদমে এগিয়ে চলা এরোজের গতিশ্লথ হয় ঠিক কাঙ্খিত কেবিনের সামনে এসে। দেহে ভর করে অলসতা। বিছানায় শায়িত নারীটিকে নড়তে চড়তে দেখে ঠোঁটের কোনে সুপ্ত হাসির কিঞ্চিৎ উজ্জ্বলতা দেখাগেল।
যেই মানুষটাকে কেউ সৌন্দর্য আর অসুস্থতার দোহাই দিয়ে মৃত্যুর দ্বারপ্রান্তে ছেড়ে দিয়েছে। সেই মানুষটাকে কেউ সুযোগ পেলেই বিমুগ্ধ নেত্রে দেখে।
রোজ অপলক তাকিয়ে রইল তার ভাইয়ের দিকে। আজ যেন উগ্র ছেলেটির সকল উগ্রতা, উন্মাদনরা একটা নাম পেল। আর সেটা হলো “মৌনতা”
রোজ ফ্যাসফ্যাসে কণ্ঠে ডাকল,
–“ভাইজান।”
—”হুঁ।” মোহগ্রস্ত এরোজের ছোট্ট জবাবে
রোজ অশ্রুসজল চোখে হাসল,

–“অজস্র ক্ল ক্লিপ আর হেয়ার এক্সেসরিজ কেনার কারণ আমার মৌন বউ? রূপাঞ্জেল কার্টুন পছন্দ করার কারণ, আমার মৌন বউ! প্রতি মাসে এক বক্স করে বুবু লুবু চকলেট পাঠানোর কারণ, মৌন বউ? ছয় বছর আগে আমার ছোট ভাইজানের হারিয়ে যাওয়ার কারণ, মৌন বউ। কখনো বলোনি কাউকে এতটা ভালোবাসো।”
কিউবিক গ্লাসটি ভেদ করে ফ্যাকাসে মুখটি দেখতে দেখতেই এরোজ ক্ষীণ স্বরে বলল,
–“সৃষ্টিকর্তা কখনো বলার অধিকার-ই দেয়নি।”
–“এতটা যন্ত্রণা সহ্য করেও কাউকে এতটা ভালোবাসা যায়?”
রোজের প্রশ্নে এরোজ স্মিত হেসে বলল,
–“ভাগ্যিস সে আমার ভালোবাসা নয়।”
–“মানে?”, রোজ কপাল কুঁচকে নিলো। এরোজ মোহগ্রস্ত কণ্ঠে বলল,
–“ভালোবাসা রঙ বদলায় কিন্তু সে আমার বদ অভ্যাস। সেই বদ অভ্যাস—যার সাথে আমার যখন যেভাবে দেখা হবে, আমি তাকে তখন সেভাবে আগলে নেবো।”
রোজের মুখে হাসি ফুটে উঠল। কর্নকুহর যেন এতটুকু শোনার জন্যই তৃষ্ণার্ত ছিল। সে ছলছল নেত্রে চেয়ে বলল,
–“তোমার বদ অভ্যাস সারাজীবন তোমার হয়ে থাকুক। সে আবার সুস্থ হয়ে আমাদের মাঝে ফিরে আসবে তো!”
এরোজ ফিরে তাকায় বোনের দিকে। চোখেমুখে অদম্য দৃঢ়তা নিয়ে বলল,
-“নিয়তির সাথে লড়াইয়ে যদি এবার জিতে যাই তবে তার উপর এই দেশের ছায়াও আর কখনো পড়তে দেব না।”
জীবনের বিভৎস মোড়ে দাঁড়িয়ে থাকা রোজের চোখেমুখে আশ্চর্যভাবে আর কোনো দুঃখের রেশ দেখাগেল না। সে অশ্রুসিক্ত নয়নে চেয়ে হাসিমুখে বলল,
–“পৃথিবীর যে প্রান্তেই থাকো না কেন, সুখ তোমাদের নিত্যদিনের সঙ্গী হোক। আমার মৌন বউয়ের কষ্টগুলো দ্বিগুণ সুখ হয়ে ফিরে আসুক। দুঃখ যেন তোমাদের আর ছুঁতে না পারে।”

কারোর জন্য প্রবল আকাঙ্ক্ষিত লগ্ন, আর কারোর জন্য প্রবল অনাকাঙ্ক্ষিত অমোঘ লগ্নটি অবশেষে সমাগত।
পরদিন বিকাল দুইটা। মৌনতা হাসপাতাল থেকেই সরাসরি বিমানবন্দরের উদ্দেশ্যে রওনা হবে। তাই হাসপাতাল যেন আজ সিকদার বাড়ির ছোটখাটো মিলনায়তনে পরিণত হয়েছে। পরিবারের সকলে তখন ব্যস্ত মৌনতাদের বিদায় দিতে। তখনি হন্তদন্ত হয়ে মৌনতার কেবিনে ওয়াহেদ, নিঝাম আর নিহাম ঢুকলো।
রূপকথার বিমর্ষ চিত্ত কেপে উঠল বাবা নামক মানুষটির ঘৃণ্য মুখটি দেখতেই। সে ঘৃণায়, অস্বস্তিতে অস্থির নিঃশ্বাস ফেলল। ওয়াহেদের পা থেমে যায় নিজের মেয়েটাকে দেখেই। এতক্ষণের অপেক্ষারা এসে থমকায় ঐ স্নিগ্ধ মুখপানে। শাড়ি গহনায় পাক্কা গিন্নি লাগছে। সে চোখ ভরে দেখতে গেলেই নির্জনা বেগমের কণ্ঠে নড়েচড়ে উঠল।
নির্জনা বেগম অবাক হয়ে শুধায়,
–“তোরা এখানে?”
নিঝাম বসতে বসতে বলল,

–“মৌনতা কানডা চলে যাচ্ছে আমরা দেখা করতে আসব না?”
তপোবন নিজের অবাকের রেশ কাটিয়ে তাকায় অস্থির স্ত্রীর পানে। সকলের আড়ালে দ্রুত একহাতে আলতো আগলে নিয়ে চাপা স্বরে আশ্বস্ত করে বলল,
–“শান্ত হও, এত অস্থিরতার কিছু নেই। আমি আছি তো।”
সদ্য কেবিনে ঢোকা এরোজের চোখেমুখে ক্রোধের আগুন জ্বলে উঠল ওয়াহেদকে দেখে। সে গর্জে উঠতে যাবে তার আগেই তপোবন দ্রুত তাকে আঁটকে দেয়। কিছুটা জোরপূর্বক স্ত্রী আর ভাইকে নিয়ে বেরিয়ে গেল কামরা থেকে।
এরোজ ভাইয়ের হাত থেকে নিজেকে ঝাড়া দিয়ে ছাড়িয়ে নিলো। ক্ষিপ্ত কণ্ঠে বলল,
–“ওই লোক এখানে কি করছে? তুমি কিছু বলোনি কেন? নাটক করতে এসেছে এখানে? পুরো গোষ্ঠী চরিত্রহীন, নাটকবাজ।”
তপোবন ধমকে উঠল ভাইকে,
–“কাণ্ডজ্ঞান কি সব হারিয়েছিস এরোজ? হাসপাতালে সিন ক্রিয়েট করবি? আর মাত্র এক ঘণ্টা। কোনোভাবে নিজেকে সংযত কর।”
এরোজের চোখেমুখ রাগে শক্ত হয়ে আসে। সে রূপকথার দিকে আঙুল তাক করে বলল,

–“ওই মেয়েটার উপর কি যাচ্ছে তা কি তুমি বোঝো না? এইসব মানুষদের ছাড় দিতে নেই বরং যেখানে পাওয়া যাবে সেখানেই হেডম গুড়িয়ে দিতে হয়। এই চরিত্রহীনতার কারণে প্রিয়জন হারানো কতটা কষ্টের তা কি তুমি জানো না?”
–“জানি কিন্তু হুটহাট কোনো কাজ করা উচিৎ নয়, এরোজ। তারা মৌনতার সাথে দেখা করতে এসেছে, এখানে কোনো সিনক্রিয়েট করবি না।”
–“এভাবে করে করেই তোমরা আমার সর্বোস্ব কেড়ে নিয়েছো। ছয় বছর আগে বলেছিলে সে সুখী থাকবে আমি হাসিমুখে দূরে সরে গিয়েছি। কিন্তু আজ? আজ সে জীবন মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে পিষ্ট হচ্ছে। তার কিছু হলে আমি কাউকে ছেড়ে কথা বলব না।”
বলেই এরোজ গটগট করে চলে যায়।
নিঝাম কপাল কুঁচকে বোনের উদ্দেশ্যে শুধায়,
–“কি হলো? তপোবন ওর বউ আর এরোজকে নিয়ে চলে গেল কেন? এটা কেমন আচরণ? ওয়াহেদ প্রথমবারের মতো এসেছে, রূপকথার সাথে পরিচয় করিয়ে দেবে না?”
ওয়াহেদ এলোমেলো দৃষ্টি ফেলে বলল,
–“আহ্ নিঝাম! এখন এইসময়ে এগুলো কি খুব প্রয়োজন? আমরা এসেছি মৌনতাকে দেখতে। ওদের সাথে পড়ে তো কথা হবেই। বাদ দাও।”

–“নাহ, বাদ দেব কেন? এটা বেয়াদবি। তপোবনের সাহস কি করে হয় আমার স্বামীর সাথে বেয়াদবি করার?”
নির্জনা বেগম চোখ মুছতে মুছতে বলল,
–“তপোবনের দ্বারা বেয়াদবি অসম্ভব, নিঝাম। সবসময় বাড়াবাড়ি করাটা কি খুব প্রয়োজন? ওদিকে কত কাজ। আর এক ঘন্টা আছে এর মধ্যে সব গুছিয়ে বের হতে হবে।”
নিঝাম ফোঁস ফোঁস করতে করতে চুপ রইল। বিছানায় আধশোয়া হয়ে বসে থাকা মৌনতার শেষবারের মতো চেকাপ চলছে। ব্লাড প্রেশার, রক্ত পরীক্ষা করা হয়েছে। সে কিয়ৎকাল বাদ বক্রোক্তি করে বলল,
–“আমি তোমার‌ শাশুড়িকে একদিন বলেছিলাম, তোমার যা মারর মতো চলাফেরা তাতে এমন দিন দেখা খুব অস্বাভাবিক না।”
নিঝামের কুরুচিপূর্ণ কথায় নেওয়াজ সাহেব সহ উপস্থিত সবার মেজাজ তুঙ্গে উঠে গেল। তকদির সিকদার রেগে কিছু বলতে যাবে তার আগেই মৌমিতা দাঁতে দাঁত চেপে বলল,

–“আপনার ওই জানোয়ার ভাগ্নেকে কোনো রানীও সন্তুষ্ট করতে পারবে না, খালামনি। তাই দয়াকরে ভাষা সংযত করে কথা বলুন। মৌনতা আপনাদের বাড়ির আর বউ নয় যে যা ইচ্ছা তাই বলে দেবেন।”
সেখানে আরেকদফা দ্বন্দ্ব লেগে যেতেই অসহনীয় যন্ত্রণায় মৌনতার চোখের কার্নিশ ভিজতে লাগল। পারমিতা মৌনতাকে বুকে জড়িয়ে নেয়। তকদির সিদকার এই পর্যায়ে চুপ থাকতে পারলেন না। সে গর্জে উঠে বলল,
–“ওয়াহেদ তোমার স্ত্রীকে নিয়ে একটু বের হও এখান থেকে। কোথায় কি বলতে হয় নুন্যতম জ্ঞানটুকু ও তার নেই।”
–“আমার জ্ঞান নেই?”, নিঝাম তকদির সিকদারের সাথেও বাকবিতন্ডা লাগিয়ে দিতে নিলে ওয়াহেদ তাকে টেনেহিঁচড়ে বাইরে নিয়ে যায়।

ঘুমন্ত নায়েলের পেটে রুক্ষ দাঁড়ি যুক্ত গালটি ঘঁষে দিতেই নায়েল ঘুমের ঘোরেই খিলখিলিয়ে হেসে উঠল। আধো আধো চোখ মেলে তাকালে একটা হাসিমাখা ধূসর নেত্র দৃষ্টি নিবদ্ধ হয়। সে আলসেমাখা কণ্ঠে বলল,
–“নটি, ছোট পাপা। ডোন ডিস্টাব!”
এরোজ স্মিত হেসে তাকে হাসপাতালের বেড থেকে বুকে তুলে নিলো। গালে শব্দ করে চুমু দিয়ে বলল,
–“আম্মাজান, আপনি কি ভুলে গিয়েছেন আপনি আজ হেলেপেলিতে উঠবেন? যাবেন না আকাশ দেখতে?”
এরোজের কথায় নায়েলের ঘুম নিমেষেই উধাও। সে বড় বড় চোখে চেয়ে বলল, –”এক্ষুণি?”
–”হুঁ, আমাদের এক্ষুণি প্লেনের কাছে যেতে হবে। তার জন্য দ্রুত তৈরি হয়ে নাও।”
নায়েল অলসতা ভুলে গেল। সে প্রবল উৎসাহে বলল,
–“চলো চলো লেডি হই তালাতালি। আমলা হেলেপেলিতে উঠব ইয়েএএএএ! আকাছ দেখব, মেঘ দেখব, বৃষ্টি পলে কোত্থেকে তাও দেখব।”
তপোবন আর রূপকথা মৃদু হাসল নায়েলের কথায়। নির্জনা বেগম আর পারমিতা কাপড়ের ব্যাগ থেকে খুঁজে খুঁজে পছন্দসই পোশাক বের করে এগিয়ে আসল। নির্জনা বেগম ছলছল নেত্রে নাতনিকে দেখে, আদুরে গলায় বলল,

–“দাদুমনির কাছে এসো নায়েল, দাদুমনি তৈরি করে দিচ্ছি।”
নায়েল দাদুর কোলে ঝাঁপিয়ে পড়ে। পারমিতা আর নির্জনা বেগম তাকে তৈরি করে। নির্জনা বেগমের অশ্রু গুলো তখন বাঁধভাঙা। সে কাঁদতে কাঁদতে নায়েলকে তৈরি করে। নায়েল ব্যথিত নয়নে চেয়ে বলল,
–“আলে কাঁদে না, কাঁদে না তুমিও যাবে আমাদেল সাথে। আমলা একসাথে আকাছ দেখব।”
এরোজ ব্যাগপত্র চেক করতে করতে তীক্ষ্ম দৃষ্টি ফেলল মায়ের দিকে। তাচ্ছিল্য হেসে বলল,
–“আম্মা, কাঁদছ কেন? কেঁদো না, আমার ভীষণ হাসি পাচ্ছে তোমার কান্না দেখে। সারাজীবন তো তুমি তোমার দুশ্চরিত্র ছেলের কাছে বলি দেয়ার জন্য এমনি লক্ষ্মী, রূপবতী, ধৈর্য্যবান একটা বউমা চাইতে। ভাগ্যক্রমে পেয়েও গিয়েছো, আর সে বলিও হয়েছে। সে এখন মৃত্যুর সাথে লড়ছে আম্মা তোমার তো খুশি হওয়ার কথা। তবে এখন কাঁদছ কেন? একটুও কাঁদবে না। এগুলো নাটক লাগে।”
নির্জনা বেগম হতবাক হয়ে গেল ছেলের কথায়। অস্ফুট স্বরে বলল,
–“এরোজ! আমি কখনো এমনটা চাইনি।”
সহসা গর্জে উঠল,

–“এটাই চেয়েছো তোমরা। তোমরা জানতে ইমরোজ কেমন, তবুও তোমরা একটা সাধারণ, নরম মেয়ে খুঁজতে যেন ও তাকে পুতুলের মতো ব্যবহার করতে পারে। আর যখন পুতুলটার ক্ষমতা শেষ হয়ে গেল তখন ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছে মৃত্যুর কোলে।”
–“আমি ভেবেছিলাম ও একটা ভালো জীবনসঙ্গী পেলে শুধরে যাবে, এরোজ।”,নির্জনা বেগম অশ্রুরুদ্ধ কণ্ঠে বলল।
এরোজ রক্তাভ নেত্রে তাকায় মায়ের দিকে। ঘৃণাভরা কণ্ঠে বলল,
–“তোমরা স্বার্থপর! মেয়ে হয়ে জেনেশুনে আরেকটা মেয়েকে বলি দিয়েছো তোমরা। আমি তোমাদের কোনোদিন ক্ষমা করব না।”
–“আম্মার কোনো দোষ নেই এরোজ। মৌনতার খোঁজ আমিই তাকে দিয়েছিলাম।”
ভাইয়ের কথায় এরোজ দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
–“সেটাই বলেছি, তোমরা সবাই অপরাধী।”
তপোবন নত শির মেনে নিলো ভাইয়ের অপবাদ।

বিকাল তিনটায় মৌনতার যাবতীয় চেকাপ সম্পন্ন করে হাসপাতাল থেকে ডিসচার্জ করা হয়। মৌনতার অভ্যাস দায়িত্বগুলো পিছু ছুটে গিয়েছে। শাড়ির পরিবর্তে বদনে শোভা পাচ্ছে একটা সাদা ধবধবে থ্রিপিস সাথে লাল ওড়না।
তারা বের হওয়ার জন্য প্রস্তুত কিন্তু রোজ আর তানশান শক্ত করে জড়িয়ে ধরে আছে তাকে। ছাড়ছেই না।
মৌনতা ঠোঁট কামড়ে কান্না আটকায়। মুখ ফুটে বলতে পারে না, এই পরিবার আর পরিবারের লোকদের দেখলে তার বুকটা আফসোসে গুঁড়িয়ে যায়। ভীষণ কষ্ট হয়। এই পরিবারটা আর তার নেই।
সে শুকনো ঢোক গিলল। কঠিন স্বরে বলল,
–“ছাড়ো, দয়াকরে আমার কষ্ট আর বাড়িও না। তোমাদের দেখলে আমার কষ্ট হয়। তোমরা আমার পরিবার ছিলে কিন্তু এখন তোমরা আমার কেউ না। এটা আমায় মৃত্যুর ন্যায় যন্ত্রণা দেয়। প্লিজ ছাড়ো।”
তানশান আর রোজের হাত ঢিলে হয়ে আসে। তাদের প্রিয় মানুষটা কষ্ট পাচ্ছে তাদের কারণে? ব্যস্! তারা দূরে সরে যায়। তানশান ক্রন্দনরত গলায় বলে,
–“আমরা সবসময় তোমার পরিবার ছিলাম আর আছি। তোমায় আর কষ্ট পেতে হবে না আমাদের জন্য।”
রোজ চোখের পানি মুছে হাসিমুখে বলল,

–“তুমি সবসময় আমার মৌন বউ হয়ে থাকবে।”
মৌনতা নিরুত্তর সেই কথাগুলো এড়িয়ে যায়। ধীর কদমে এগিয়ে যায় অদূরে দাঁড়িয়ে থেকে চোখের পানি মুছতে থাকা রূপকথার দিকে। মৌনতাকে দেখেই রূপকথা ছলছল নেত্রে চেয়ে বাচ্চাদের মতো বলল,
–“আমায় কে আম্মার ধমক থেকে বাঁচাবে? এত বড় সংসার কি করে আমি সামলাবো?”
চোখমুখ উপচে কান্না বেরিয়ে আসা রোধ করে মৌনতা। ক্ষীণ স্বরে বলে,
–“সময় মানুষকে সব কঠিন পরিস্থিতির জন্য যোগ্য করে তোলে। তুমিও পারবে। কিন্তু সংসারের জাঁতাকলে কখনো নিজের স্বপ্নগুলো হারাতে দিও না। পড়াশুনা করবে, অনেক বড় হবে, নিজের পায়ে দাঁড়াবে।”
মৌনতা আলগোছে তাকে বুকে জড়িয়ে নেয়। রূপকথা ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল উষ্ণ আলিঙ্গনে।
নেওয়াজ সাহেব, তপোবন সকলে তাড়া দিলো। তপোবন এগিয়ে এসে মৌনতাকে একহাতে আগলে নিলো। মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে স্নেহের কণ্ঠে বলল,

–“আমি জানি, আমাদের মৌন অনেক স্ট্রং। সে আবার আগের মতো সুস্থ সবল চঞ্চল হয়ে ফিরে আসবে আমাদের মাঝে।”
মৌনতা শুধু শুকনো হাসল। তপোবন তাড়া দিয়ে বলল,
–“এসো, এখনো অনেক কাজ বাকি আছে।”
সারাজীবন একটা সুখী সংসার জীবনের স্বপ্ন দেখা মেয়েটির গোটা সংসার জীবন পিছু ছুটে গেল। নিজের সর্বোস্ব দিয়ে ভালোবাসার পরিবর্তে পেল মরণব্যাধি আর নিজের ছোট্ট একটি অংশ।
এয়ারপোর্টে ঢোকার সেই চরম হৃদয়স্পর্শী মুহুর্তটিতে সকলের মুখশ্রী হঠাৎ বিবর্ণ হয়ে গেল নায়েলের আকস্মিক আবদারে।
–“দাদুভাইহ দাদুমনি পাপা কোথায়? পাপাকে ডেকে নিয়ে আসো। পাপা যাবে না আমাদেল সাথে আকাছ দেখতে?”
সকলে নিরুত্তর ব্যথিত নয়নে তাকালো নায়েলের উৎকণ্ঠাভরা মায়াবি মুখপানে। মৌনতা নিজের কেঁপে ওঠা বদন সামলে নেয়। শুকনো ঢোক গিলে মায়ের থেকে মেয়েকে নিজের কোলে নিয়ে দৃঢ় কণ্ঠে বলল,
–“মা, পাপা নেই। পাপা আমাদের সাথে যাবে না। আমরা একাই যাব আকাশ দেখতে।”
নায়েল অবাক কণ্ঠে শুধায়,

–“পাপা নেই কেন? পাপা কোথায়?”
–“পাপা হারিয়ে গিয়েছে, মা। তোমার পাপা নেই। আর কখনো তোমার পাপা আসবে না।”, সরব মৌনতার কঠিন কণ্ঠে নির্জনা বেগম, তকদির সিকদার সহ সকলে চমকে উঠল। কিন্তু কেউ টু শব্দটি করল না। নায়েল আরেকদফা অবাক হয়ে অজস্র প্রশ্ন করলেও তার কোনো জবাব দিলো না কেউ।
তপোবন নায়েলের মাথায় চুমু দিয়ে বলল,
–”যাও মৌন, চেক ইন এ দেরি হয়ে যাবে।”
বিশাল এয়ার পোর্টের দিকে চেয়ে মৌনতা ক্ষীণ স্বরে আওড়ালো,
–“ওহ্ এখন তো পথটা আমার একার।”
মৌনতার ক্ষীণ স্বরে বলা কথাটি শুনলো তপোবন। সে মৃদু হেসে মৌনতার মাথায় হাত রেখে বলল,
–“জীবনের কোনো পথ তোমায় একা চলতে হবে না।”

ভারী অদ্ভুত কথা! যেখানে একাকী গোটা একটা দেশ পাড়ি দিতে হবে, সেখানে কি করে সে একা নয়? বাবা, স্বামী ছাড়া কখনো বাইরে না বের হওয়া মেয়েটি একা দূরদেশে কি করে চলবে তা কি কেউ ভেবেছে?
কেউ ভাবেনি, অন্তত মৌনতা তাই মনে করেছিল। কিন্তু সে যখন পা বাড়াতে গেল, তখনই কেউ একজন তার কদমে কদম মেলাল। ব্যস্ত কদমে কেউ এগিয়ে এসে নায়েলকে কোলে তুলে নিতেই মৌনতা হকচকিয়ে গেল। মাসুমা বেগম আগে থেকেই জানতেন তারা এরোজের সাথে যাচ্ছে, তাই তিনি নীরবে সামনে এগিয়ে গেলেন। তপোবনের মুখে স্বস্তির হাসি ফুটে উঠল।
কিন্তু মৌনতা তখনো জানে না তারা এরোজের সাথে যাচ্ছে। এরোজ নায়েলকে বুকে জড়িয়ে নিয়ে পোর্টারকে বলল,
–“আপনি এগিয়ে যান।”
এরোজকে লম্বা লম্বা কদমে এয়ার পোর্টের ভেতরে ঢুকতে দেখে মৌনতা কৌতুহলী গলায় শুধায়,
–“আপনি কোথায় যাচ্ছেন, ছোট ভাইজান?”
এরোজ পা থামিয়ে ফিরে তাকায় প্রশ্নবিদ্ধ মুখপানে। গুরুগম্ভীর কণ্ঠে বলল,
–“‘ছোট ভাইজান’ সম্বোধনে ডাকার অধিকারটা বোধহয় আপনি হারিয়ে ফেলেছেন। আর কখনো ভাইজান বলে ডাকবেন না, মৌনতা।”
আরো একবার মনে করিয়ে দিল সেই বিদঘুটে স্মৃতি! মৌনতা দূর্বল নেত্রে তাকিয়ে ম্লান কণ্ঠে বলল,

–“দুঃখিত! ভুলে গিয়েছিলাম। আপনি বলুন, কি নামে ডাকলে আপনি খুশি হবেন?”
–“আমার বাবা মা আমার নাম রেখেছে ডাকার জন্যই। আপনি নির্দ্বিধায় সেই নামেই ডাকতে পারেন।”
–“আপনি আমার থেকে বড়। আমি কি করে আপনাকে নাম ধরে ডাকব?”
–“আমি আপনার মায়ের ছেলেও তো নই। তবে ভাই বলে কেন ডাকবেন?”
গুরুগম্ভীর সোজাসাপ্টা প্রত্যুত্তরে মৌনতা আর কথা বাড়ালো না। পুনরায় শুধায়,
–“আপনি এয়ার পোর্টের ভেতরে কোথায় যাচ্ছেন? এখানে ঢুকলে আর বের হওয়ার সুযোগ নেই।”
–“বের হওয়ার ইচ্ছা থাকলে তো ঢুকতাম না। আপনি আমার সাথেই কানাডা যাচ্ছেন। তাড়াতাড়ি আসুন, ফরমালিটিজ পূরণ করতে হবে।”
এরোজের নির্লিপ্ত কণ্ঠে মৌনতা অবাক কণ্ঠে শুধায়,

অপরাহ্নে উপসংহার পর্ব ৪৬

–“আপনি কেন যাবেন আমাদের সাথে?”
এরোজ শান্ত দৃষ্টি ফেলল দূর্বল মুখপানে। ক্ষীণ স্বরে বলল,
–“আগামী প্রতিটা পথ আমার সাথেই চলতে হবে আপনাকে।”

অপরাহ্নে উপসংহার পর্ব ৪৮