Home অপরাহ্নে উপসংহার অপরাহ্নে উপসংহার পর্ব ৪৮

অপরাহ্নে উপসংহার পর্ব ৪৮

অপরাহ্নে উপসংহার পর্ব ৪৮
তোনিমা খান

“আগামী প্রতিটি পথ কেন ওই মানুষটার সাথেই চলতে হবে?”
হৃদয়ের গহীনে জেঁকে বসা এই প্রশ্নের উত্তর তৎক্ষণাৎ না মিললেও, সময়ের বিবর্তনে মৌনতা অনুভব করল— যে জীবন তাকে এতটাই বিপর্যস্ত করেছে যে, কারো অবলম্বন ব্যতীত এই দুর্গম পথ পাড়ি দেয়া তার পক্ষে অসম্ভব।
কাতার এয়ারওয়েজের প্রথম ফ্লাইটটি ঢাকা থেকে দোহা। তিন ঘণ্টার ট্রানজিট। মৌনতার শারীরিক অবস্থা বিবেচনায় এরোজ সবথেকে কম সময়ের ট্রানজিটের ফ্লাইটটিই বেছে নিয়েছে।

বিজনেস ক্লাসের আরামদায়ক আসনে বসে মৌনতা জানালার ওপারে শূন্য দৃষ্টি মেলে দেয়। সেই দৃষ্টি বড্ড শ্রান্ত, অভিযোগে আচ্ছন্ন। এই দেশে ভালোবাসা, ভরসার বদলে বিশ্বাসঘাতকতা আর প্রাণঘাতী আঘাত দেয়া হয়। বুকভরা হাহাকার আর গলার কাছে দলা পাকিয়ে থাকা অব্যক্ত দুঃখগুলো সে সজোরে গিলে ফেলে। অতলে তলিয়ে যাওয়া আঁখিদ্বয় জানালা থেকে সরিয়ে নেয় সে; তার আর পিছু ফিরে তাকাতে ইচ্ছে করে না।
বরং পালাতে ইচ্ছে হয় মন না বোঝা মানুষগুলো থেকে।
কর্নকুহরে মেয়ের উচ্ছ্বসিত কণ্ঠ আন্দোলিত হতেই মৌনতা ফিরে তাকায় মেয়ের পানে।
আকাশ দেখার আনন্দে বাবার কথা ভুলে যাওয়া নায়েল এরোজের কোল থেকে নেমে হৈ হৈ করে মায়ের পাশে বসে পড়লো।
উল্লাসে মেতে উঠে বলে,

–“মাম্মাহ, আমলা একটু পলে আকাছে উলে যাব। কী মজা!”
মেয়ের কথায় মৌনতা ম্লান হেসে তাকায় ব্যস্ত ঘেমেনেয়ে একাকার সুঠাম দেহী মানুষটির দিকে। ক্ষীণ স্বরে ডেকে ওঠে,
–“শুনছেন?”
একটা ডাক—সকল ব্যস্ততা মিলিয়ে গেল। এরোজ এক পা এগিয়ে এসে মৃদু ঝুঁকে দাঁড়ায়। ব্যস্ত কণ্ঠে শুধায়,
–“শরীর খারাপ লাগছে? শোবেন? কিছু খেতে ইচ্ছে করছে? জুস খাবেন?”
যত্নমাখা কণ্ঠটি নারীটির কর্নকুহরে একটুও আন্দোলিত হলো না। বরং সে এখনো কারোর দেয়া তীব্র যন্ত্রণার তীব্রতায় ছটফট করছে। সে ছলছল নেত্রে বলল,
–“আমি এই সিটে বসব না।”
চিকচিক করা আঁখিদ্বয়ের পানে শান্ত দৃষ্টি ফেলল এরোজ। একহাত বাড়িয়ে দিয়ে বলল,
–“এটা আপনার সিট নয়। আপনার সিট মাঝে, আসুন।”
এগিয়ে দেয়া সেই হাতটি ধরার প্রয়োজন বোধ করল না মেয়েটি। বিষাক্ত অনুভূতি থেকে বাঁচতে সে দ্রুত গিয়ে মাঝের সিটে বসল। এরোজ নিজের বাড়িয়ে রাখা শূন্য হাতটির দিকে এক পলক চেয়ে সোজা হয়ে দাঁড়াল। হ্যান্ডব্যাগ থেকে ডালিমের জুসের একটি বোতল বের করে মৌনতার হাতে দিয়ে গম্ভীর গলায় বলল,

— “এটা দ্রুত খেয়ে নিন।”
মৌনতা জুসটি নিয়ে নায়েলের দিকে হাত বাড়িয়ে বলল,
— “নায়েল, মাম্মার কাছে এসো।”
নায়েল তীব্র বেগে নাকচ করে বলল,
–“নো মাম্মা, আমি আকাছ দেখব।”
কেউ হারায়, তো কেউ এক পশলা বৃষ্টির মতো অনাবিল সুখ খুঁজে পায়। কিন্তু…. বৃষ্টির ফোঁটা কি আদৌ আঁকড়ে ধরা যায়?
জানালার পাশে বসতেই কেউ গুটি গুটি কদমে নিজের সিট ছেড়ে এরোজের কোলে বসে পড়লো। সহসা দুটো হাত শক্ত করে জড়িয়ে ধরে ছোট্ট দেহটিকে। যেই সুখটাকে নিজের বুকে আঁকড়ে ধরতে আগে কারণের প্রয়োজন হতো, আজ থেকে সেই সুখটা সম্পূর্ণ তার দায়িত্ব। জানালার থেকে স্পষ্ট ভয়ার্ত ভূমি থেকে অবিলম্বে দৃষ্টি সরিয়ে নেয় এরোজ।
এই ভূমি শুধু দুঃখ দিতে জানে, প্রিয়জন ছিনিয়ে নিতে জানে।
সে সজল নয়নে নায়েলের কৌতূহলী মুখের দিকে তাকিয়ে স্নিগ্ধ হাসল। নায়েলের চুলে মুখ ডুবিয়ে আলতো চুমু খেয়ে ফিসফিসিয়ে বলল,

— “আজ থেকে তুমি আমার। আর কিছুক্ষণ! এরপরে তোমায় অনেক দূরে নিয়ে যাব যেখান থেকে কেউ তোমায় আমার থেকে ছিনিয়ে নিতে পারবে না। আর কোনো ভয় তাড়া করবে না।”
নায়েল শুনতে পেল সেই অস্ফুট স্বর। সে খিলখিল করে হেসে চঞ্চল কণ্ঠে বলল,
–“আলে আমি তো তোমাল-ই। আমলা একসাথে বেলু কলতে যাচ্চি কী মজা, তাই না বলো?”
এরোজ ঘন ঘন মাথা নাড়লো। ক্ষীণ স্বরে বলল,
–“তোমায় আমি সবসময় লুকিয়ে রাখব আমার বুকে।”
বিধ্বস্ত দেহ-মন আর মৃতপ্রায় শূন্য হাত নিয়ে দেশে ফেরা পুরুষটি আজ এক অলৌকিক সুখে পরিপূর্ণ! যাকে দুঃস্বপ্নেও চাওয়া বারণ ছিল, আজ সেই মানুষটি তার সাথে রয়েছে।
এরোজ বারবার আড়চোখে তাকাচ্ছে বদ্ধ নেত্রে শুয়ে থাকা নারীটির পানে, আরেকবার তাকাচ্ছে ঘড়ির দিকে। চোখেমুখে উপচেপড়া প্রতীক্ষা প্লেন কখন ফ্লাই করবে! জীবন এত যন্ত্রণা সহ্য করেছে যে এখন সামান্য লহমাটুকুর অপেক্ষা তার পক্ষে সহ্য হচ্ছে না।

চোখমুখে শুধু ভয়, এই বুঝি সবটা দুঃস্বপ্ন হয়ে গেল! এই বুঝি আবার সে সব সুখ হারিয়ে ফেলল।
কিন্তু এবার তার প্রতীক্ষা ফুরালো। অভিশপ্ত সেই ভূমি ত্যাগ করে বিমানটি আকাশে উড়তেই এরোজ ক্লান্ত দেহ সিটে এলিয়ে দিল। চোখের কোণে নোনাজল চিকচিক করলেও ঠোঁটের কোণে ছিল ভয় কেটে যাওয়ার এক অদ্ভুত প্রশান্তি।
তবে কেন জানি বারংবার তার প্রশান্তিগুলো ছিনিয়ে নেয়া হয়। এবার ও ব্যতিক্রম হলো না। বাংলাদেশ টু কাতার দীর্ঘ ছয় ঘন্টার ফ্লাইট, তিন ঘন্টার ট্রানজিট, আবার কানাডার ফ্লাইটে ওঠার পর ও দীর্ঘ একটা সময় মৌনতা সুস্থ ছিল।
কানডায় পৌঁছাতে আর মাত্র দুই ঘন্টা। কিন্তু তখনি মন্থর গতিতে মৌনতার দেহ ভারসাম্যহীন হতে লাগল। বিন্দু বিন্দু ঘাম, ঊর্ধ্বশ্বাস, অস্বাভাবিক শারীরিক অসুস্থতায় মেয়েটি হাঁসফাঁস করে উঠল। বদ্ধ নেত্রে মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে থাকা মাসুমা চমকে উঠল মেয়েকে এমন ছটফট করতে দেখে।
সে বিবর্ণ মুখে এরোজকে ডাকে। কম্বলে পেঁচিয়ে রাখা নায়েলের ঘুমন্ত দেহটি মাসুমার কাছে দিয়ে এরোজ ছুটে আসল ছটফট করতে থাকা দেহটির কাছে। কিন্তু তার দেহ হীম হয়ে আসে ঘন ঘন নিঃশ্বাস টানতে থাকা মৌনতার নাক গলিয়ে সরু রক্তের নালী গড়িয়ে পড়তে দেখে। সে ভয়ার্ত দৃষ্টিতে মেয়েটির গাল আলতো করে চাপড়ে দিয়ে শুধাল,

— “হেই মৌনতা? কোথায় কষ্ট হচ্ছে? আমায় বলুন…!”
মৌনতা কোনোমতে চোখ তুলে তাকালো। ফ্যাকাসে ঠোঁট নেড়ে কিছু বললেও শোনাগেল না। সে জোরে জোরে নিঃশ্বাস নিচ্ছে।
এরোজ দ্রুত ইমার্জেন্সি পার্সারের স্মরাণাপন্ন হলো। কিন্তু পার্সার আসতে আসতে মৌনতার পেট উপড়ে সবটা বেরিয়ে আসল। এরোজের গায়ে গলগল করে বমি করে দিতেই এরোজ দ্রুত অস্থির দেহটিকে আগলে নিলো। মাথা চেপে ধরতেই বাহুডোরে ভর ছেড়ে দেয়া মৌনতা নেত্র খুলে তাকায়।
চোখে স্পষ্ট আতঙ্ক। মানুষটার রাগ যে আকাশচুম্বী!
সে ভয়ার্ত কণ্ঠে কিছু বলতে যাবে তার আগেই এরোজ বিবর্ণ মুখে জোরপূর্বক হাসি ফুটিয়ে তুলল। নাক থেকে গড়িয়ে পড়া রক্তগুলো এক হাতে মুছতে মুছতে ক্ষীণ স্বরে বলল,
–“বমি করুন, বমি আঁটকে রাখতে নেই।”
–“আমি ইচ্ছে করে করি…” মৌনতা অশ্রুসিক্ত নয়নে কৈফিয়ত দিতে গিয়েও দিতে পারলো না পুনরায় গলগল করে বমি করে দিলো। তিন দফায় বমি করে মৌনতা একটু স্বস্তি পেল। দৈহিক যন্ত্রণায় মাথা নুইয়ে বসা মেয়েটির চোখ বেয়ে তখন অবাধে অশ্রু গড়িয়ে পড়ছে।
সে জোরে জোরে নিঃশ্বাস নিতে নিতে চোখ তুলে তাকালে দেখতে পেল এরোজ আর পার্সার মুখে একটা সুন্দর হাসি নিয়ে তাকিয়ে আছে। কারোর চোখেমুখে কোনো রাগ, ঘৃণা নেই।
পার্সার অতি বিনম্র কণ্ঠে নিজ ভাষায় বলল,

–“সমস্যা নেই ম্যাম, আপনি বমি করুন।”
তবে আর বমি হলো না। পার্সার সাপ্লিমেন্টারি অক্সিজেন মাস্ক পড়িয়ে দিল মৌনতাকে। কৃত্রিম অক্সিজেনের ছোঁয়ায় সে কিছুটা ধাতস্থ হলো।
সবটুকু বমি এরোজের গায়ে করায় বিমানবালাদের খুব একটা কষ্ট হলো না। এরোজ নিজের সাদা শার্ট আর কালো প্যান্টটির দিকে চেয়ে ওয়াশরুমে চলে গেল। নিজের পুরো পোশাক বদলে এসে মাসুমাকে বলল,
–“আন্টি, আপনি নাহয় আমাদের সিটে গিয়ে বসুন। আমি এখানে বসি প্রয়োজন হতে পারে।”
মাসুমা বিনা বাক্যব্যয়ে তার সিটে চলে গেল নায়েলকে নিয়ে। নায়েলকে সিটে শুইয়ে দিয়ে নিজেও একটু চোখ বুজলো। কিন্তু যেই মায়ের সন্তান ক্যান্সার নামক মরণব্যাধির সাথে লড়ছে তার কি ঘুম আসে? সেও ঘুমাতে পারল না শুধু ঘুমন্ত মেয়েটির দিকে তাকিয়ে রইল অশ্রুসিক্ত নয়নে।
আর এরোজ? হারিয়ে ফেলার অজস্র আতঙ্ক নিয়ে নির্নিমেষ চেয়ে রইল ঘুমন্ত মুখপানে। ডাক্তার বলেছিল, প্লাটিলেট ফল করলে ব্লিডিং হতে পারে, এমতাবস্থায় দ্রুত চিকিৎসা না দিলে বিপদ হয়ে যাবে। সে নির্ঘুম শুধু প্রহর গুনলো কখন দুই ঘন্টা শেষ হবে।
কিয়ৎকাল বাদ ব্যাগ থেকে একটা ক্যামেরা বের করে বিধ্বস্ত নারীটির একটি ছবি তুলল সে। সাথে সাথেই প্রিন্ট হয়ে বেরিয়ে এল ছোট্ট সেই ছবি। এরোজ মৃদু হেসে একটি নতুন ডায়েরি বের করল, যার প্রচ্ছদে লেখা
“তাকে ফিরে পাওয়ার ৩৬৫ দিন।”
প্রথম পাতাটি খুলে সেখানে ছবিটি রাখল আর গোটা গোটা অক্ষরে লিখল,
“তাকে ফিরে পাওয়ার প্রথম দিন।”

দূর্বিসহ সময়টুকু ফুরালো। পায়ে কারোর স্পর্শে মৌনতার গভীর নিদ্রা ভেঙে গেল। সে চোখ খুলে তাকালে এরোজ অন্তঃস্থলের সব ভয়, অস্থিরতা লুকিয়ে স্মিত হাসল। মৌনতার দুই পায়ে মোজা পড়াতে পড়াতে ক্ষীণ স্বরে বলল,
–“পৌঁছে গিয়েছি আমরা।”
মোজা পড়িয়ে এরোজ সোয়েটার, শাল বের করে মাসুমাকে এগিয়ে দিলো।
–“আন্টি, এগুলো দ্রুত পড়িয়ে দিন তাকে।”
এরোজ মাসুমার কোল থেকে ঘুমন্ত নায়েলকে তুলে নিলো। মাসুমা ঘোর থেকে বের হয়ে মেয়েকে সাহায্য করলো। কিন্তু তবুও তার দৃষ্টি এরোজের থেকে সরলো না। এটা চিরচেনা সেই উদাসীন, নেশায় বুঁদ হয়ে থাকা ছেলেটি নয়!
এরোজ দ্রুত নায়েলকে একদম তৈরি করে তার গালে দাঁড়ি দিয়ে ঘষা দিলো। মিহি স্বরে বলল,
–“এই যে আম্মাজান, উঠুন। আকাশ দেখবেন বলে পুরোটা সময় ঘুমিয়েই কাটিয়ে দিয়েছেন আপনি। আমরা এসে গিয়েছি, উঠুন।”
নায়েল পিটপিট করে চোখ খুললো। আলসেমি ভেঙে এরোজের গলা জড়িয়ে ধরে কাঁধে মাথা এলিয়ে দিলো। শুধায়,

–“আমলা আকাছ থেকে নেমে গিয়েছি?”
–“হুম, এখন তুমি ছোট পাপার বাড়িতে যাবে।”
–“তোমাল বালি?” , নায়েলের কৌতুহলী কণ্ঠে এরোজ তাকে কোলে বসিয়ে ললাটে চুমু দিয়ে বলল,
–“উঁহু, ছোট পাপার বাড়ি নয়, তুমি তো তোমার বাড়িতে যাবে।”
–“আমাল বালি?”
–“হুঁ, তোমার বাড়ি। সেখানে তোমার জন্য অনেক অনেক ডল, টয়’স আছে। যাবে?”
–“যাবো।”, অবুঝ নায়েল কিছু ডলের কারণে হাসিমুখে রাজি হয়ে গেল। কিন্তু সে তখনো জানে না তার আসল আনন্দ ডল নয় বরং তার পরিবার। যেটা অনেক আগেই ছিন্নভিন্ন হয়ে গিয়েছে।
মাসুমা মেয়ের নিস্তেজ দেহ দেখে এরোজকে শুধায়,
–“আমরা এখান থেকে কোথায় যাবো, এরোজ?”
–“বাসায় যেতে চেয়েছিলাম কিন্তু এখন তাকে হাসপাতালে নেয়াটা জরুরি। নয়তো বিপদ হয়ে যাবে। আপনার ক্লান্ত লাগছে নিশ্চয়ই?”
মাসুমা মেয়ের দূর্বল দেহটিকে বুকে জড়িয়ে ধরে ঘন ঘন মাথা নেড়ে বলল,

–“না না হাসপাতেই চলো। দেরি করা ঠিক হবে না। আমি একদম ঠিক আছি।”
টরন্টো পিয়ারসন এয়ারপোর্টে প্লেনটি ল্যান্ড করার সাথে সাথেই রানওয়েতে অপেক্ষা করছিল প্যারা-মেডিক টিম। এরোজ তাদের দেখে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল। স্বাভাবিক ইমিগ্রেশন প্রসেস এড়িয়ে সেখান থেকে সরাসরি মৌনতাকে হাসপাতালে নেয়া হলো।
হাসপাতালের হেমাটোলজি ইউনিটে ঢোকা মাত্রই মৌনতাকে ইমিডিয়েট স্ট্যাবিলাইজেশনে নেওয়া হয়। ফ্লাইটে অসুস্থ হওয়ায় দ্রুত তার ভাইটালস চেক করে প্লাটিলেট আর লোহিত রক্তকণিকা দেয়া হলো। প্লাটিলেট আবার ফল করেছে।
হাসপাতালের করিডোরে দাঁড়িয়ে থাকা এরোজ উষ্ণ নিঃশ্বাস ফেলল। কিউবিক কাঁচের গ্লাসটি থেকে দৃশ্যমান নিস্তেজ মায়ের দেহে অসংখ্য নল লাগানো দেখে নায়েল উৎসুক দৃষ্টি ফেলল। চঞ্চল কণ্ঠে শুধায়,
–“মাম্মাল কি হয়েছে, নানু? মাম্মা কেন ছবছময় ছুয়ে থাকে?”
মাসুমা বেগম ম্লান হেসে মস্তিস্কের ওপর চেপে বসা পাথর সমান কষ্টটা আড়াল করার চেষ্টা করলেন। বললেন,
— “মাম্মা একটু অসুস্থ তো নানুভাই, তাই বিশ্রাম নিচ্ছে।”
–“মাম্মা কেন ছবছময় অসুত্ত থাকে?”, নায়েল খানিক বিরক্ত হয়েই বলল। এরোজ তাকে বেঞ্চে বসিয়ে এলোমেলো চুলগুলো গুছিয়ে দিয়ে বলল,

–“মাম্মা, এখন একটু অসুস্থ কিন্তু খুব শিঘ্রই আবার সুস্থ হয়ে যাবে। কিন্তু তুমি কি জানো, কেউ অসুস্থ থাকলে তাকে আদর করতে হয় ,ভালোবাসতে হয়। তুমি মাম্মাকে আদর করবে, ভালোবাসবে, ঠিক আছে?”
নায়েল অলস কণ্ঠে বলল,
–“ঠিক আছে। বালিতে যাবে না?”
এরোজ মলিন হেসে বলল,
–“যাবো মা, তোমার মাম্মা একটু সুস্থ হয়ে নিক। তারপরেই আমরা যাবো। তোমার কি খিদে পেয়েছে? কি খাবে?”
হাসপাতালের এই গুমোট পরিবেশ নায়েলের একদমই ভালো লাগছে না। সে বিমর্ষ স্বরে আবদার করল,
–“কাস্টাড খাবো।”
–“কাস্টার্ড?” এরোজ চিন্তায় পড়ল। তার কাছে এই মুহূর্তে কাস্টার্ড নেই। কিন্তু তার সেই চিন্তা মুহূর্তেই মিলিয়ে গেল পরিচিত এক উচ্ছ্বসিত কণ্ঠে। কেউ একজন মৃদু চিৎকার করে বলে উঠল,
— “এই যে আমাদের নায়েলের জন্য কাস্টার্ড হাজির!”
এরোজ ফিরে তাকাতেই তার চোখেমুখে স্বস্তির আভা খেলে গেল। সেজো খালার ছেলে নিশান্ত দাঁড়িয়ে আছে। নিশান্ত ছুটে এসে এরোজের বুকে হামলে পড়লো। পিঠ চাপড়ে ফিসফিসিয়ে বলল,

–“ব্রো, তুমি জিতে গিয়েছো।”
এরোজ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করতে পারলো না তন্মধ্যেই আরো একজন তার বুকে হামলে পড়ল। নিভা হড়বড়িয়ে বলল,
–“এগুলো সব আমার দোয়ার ফল, ব্রো। আ’ম সো হ্যাপি ফর ইউ।”
পৃথিবীতে তিনটা মানুষ-ই আছে যারা শুরু থেকে জানতো এরোজ কাকে হারানোর আফসোসের গুমড়ে মরতো। আর সেটা হলো তপোবন, নিশান্ত আর নিভা।
নিশান্ত আর নিভা তার সেজো খালার প্রথম দুই জমজ সন্তান। বাইশ বছর বয়স তাদের। তাদের চঞ্চলতায় প্রাণ ফিরে পায় চারপাশ। আরো একটা ছোট বোন আছে তাদের।
এরোজ সতর্ক দৃষ্টি ফেলে গুরুগম্ভীর কণ্ঠে বলল,
–“স্টুপিড! কোন জায়গায় কি বলতে হয় জানিস না? ছাড়, কাস্টার্ড দে।”
এরোজ দুই বিচ্ছুর থেকে জোরপূর্বক নিজেকে ছাড়িয়ে নেয়। নিশান্ত মোটেই রাগ হলো না তারা অভ্যস্ত ভাইয়ের ব্যবহারে।
তারা দু’জন লাফিয়ে পড়লো নায়েলের উপর। নিভা কাঁদো কাঁদো গলায় বলল,

— “এই কিউটি, তুমি কত সুন্দর! তোমাকে একদম পুঁচকে এক ইঁদুর ছানার মতো দেখে গিয়েছিলাম, আর এখন কী সুন্দর কথা বলো!”
নিভা তাকে বুকে জড়িয়ে দু’টো চুমু দিতেই নায়েল ঠোঁট উল্টাতে লাগল। এরোজ দ্রুত নায়েলকে নিজের কোলে নিয়ে বলল,
–“তোদের ভয় পাচ্ছে, ধরিস না। কাস্টার্ড দে।”
এরোজ কাস্টার্ড নিয়ে নায়েলের হাতে দিতেই সে থামলো। খিদে পেটে পছন্দের খাবারটি ভীষণ আগ্রহে খেতে লাগল। নিভা আর নিশান্ত মাসুমা বেগমের সাথে কুশল বিনিময় করে চঞ্চল কণ্ঠে শুধাল,
–“ভাবিকে কি ভেতরে নিয়ে যাওয়া হয়েছে?
আমরা কি একবার দেখা করতে পারব না?”
মাসুমা বেগম ম্লান হেসে বললেন,

–“আর একটু আগে আসলে হয়তো দেখতে পেতে।”
কথার মাঝেই করিডোর ধরে ধীর কদমে এগিয়ে এলেন নিশান্ত আর নিভার মা, নিশাত আহমেদ। এরোজ খালাকে দেখে এগিয়ে গেল। নিশাত আহমেদ ঠোঁট কামড়ে কান্না আটকানোর চেষ্টা করছিলেন, কিন্তু এরোজের বুকে মাথা রাখতেই তিনি ফুঁপিয়ে উঠলেন। আক্ষেপের সুরে বিলাপ করে বললেন,
— “আমাদের ইমরোজ এমন জঘন্য কাজ কী করে করতে পারল, এরোজ? আমার মৌনতা কত লক্ষ্মী একটা মেয়ে! আমি… আমি কিছুতেই এটা মেনে নিতে পারছি না।”
এরোজের শান্ত চোখের কোণে তখন ক্রোধের লেলিহান শিখা। সে দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
— “ওই পশুটার নাম এখানে তুলবে না খালামণি।
বহু কষ্টে ওই জাহান্নাম থেকে বের করে তাদের অনেক দূরে চলে এসেছি। ওই অভিশপ্ত ছায়া আর কখনো তাদের উপর পড়তে দেবো না।”
–“হুম, আমরা মৌনতাকে সুস্থ করে তুলবো।” নিশাত চোখের পানি মুছে বলল। হাত বাড়িয়ে এরোজের গালা ছুঁয়ে বলে,

–“আমার আব্বা দেশে গিয়ে কি বদলে গিয়েছে? এখানে থাকলে তো খালামনিকে জড়িয়ে ধরা তো দূর একটা আদুরে গলায় ডাক ও দিতো না।”
এরোজ ম্লান হাসল। নিশাত এগিয়ে যায় মাসুমার কাছে। চোখদুটো ফের অপরাধে সিক্ত হয়ে উঠল। মাথা আপনাআপনি নত হয়ে গেল। নত শির গিয়ে তার হাত আঁকড়ে ধরে বলল,
–“আপনাকে স্বান্তনা দেয়ার মতো কোনোকিছু নেই আমার কাছে বেয়ান। আপনার ক্ষতিপূরণ করার সাধ্য আমাদের নেই। শুধু আমি ক্ষমা চাইছি আমাদের ছেলেটার হয়ে। দুনিয়াবি মোহে আমাদের ছেলেটা কখন পশু হয়ে গেল বুঝতেই পারিনি।”
মাসুমা ত্যক্ত ইদানিং এই ক্ষমার বানী গুলো শুনে। এগুলো তার সন্তানটাকে আগের মতো তো করে দিতে পারবে না। তার মেয়েটা কত সুন্দর চঞ্চল ছিল! সে নীরব আলিঙ্গন করে অশ্রুসিক্ত নয়নে তাকায় কাঁচের গ্লাস ভেদ করে শায়িত দেহটির পানে। একটা ক্লান্ত বিধ্বস্ত হাঁড়ে মাংস জড়বস্তুর ন্যায় পড়ে আছে তার চঞ্চল মেয়েটা।
এরোজ বেঞ্চিতে বসে কাস্টার্ড খেতে থাকা নায়েলকে কোলে তুলে নিয়ে হাস্যোজ্জ্বল কণ্ঠে বলল,

–“একে দেখো, খালামনি। আমার মা। তুমি যত না বলতে তার থেকে বেশি আদুরে।”
নিশাত স্নেহভরা নয়নে নায়েলকে ছুঁয়ে দিল। আদুরে গলায় বলল,
–“দাদুমনি আসবে, নায়েল?”
নায়েল নাকচ করল। এরোজ আদুরে গলায় বলল,
–“মা দাদুমনি তোমায় ভালোবাসে যাও তার কোলে।”
কিন্তু তাতেও গেল না নায়েল। এরোজ শ্রান্ত মুখে হেসে বলল,
–“একটু চিনে গেলে যাবে। এখন অচেনা দেখে যেতে চাইছে না।”
নিশাত স্নেহভরা নয়নে চেয়ে তার ছোট্ট হাতে ঠোঁট ছুঁইয়ে দিয়ে বলল,
–“দাদুমনি এখন তোমায় নিয়ে যাব আমার কাছে। না এসে কোথায় যাও তাও দেখব।”
নিশাত তাকায় এরোজের মুখপানে। ছেলে মেয়ে উল্লাসে ফেটে পড়েই সেদিন বলে ফেলে তাদের ভাইয়ের এই দশার আসল কারণ! সে চাপা স্বরে ডেকে ওঠে,

–“এরোজ?”
–“হুঁ।”
এরোজ খালার মুখপানে তাকায়। নিশাত স্মিত হেসে শুধায়,
–“শুধুই কি ভাইয়ের কৃতকর্মের প্রায়শ্চিত্ত?”
–“উঁহু।”
–“তবে?”
–“আমার স্বপ্নে দেখা দু’টো পরী আমি ভাগ্যক্রমে বাস্তবে পেয়ে গিয়েছি খালামনি। এখন শুধু তাদের লুকিয়ে রাখব। পৃথিবীর সব সুখ তাদের পায়ের কাছে এনে রাখব। কিন্তু দেখো পথটা কত দূর্গম! সৃষ্টিকর্তা সবসময় আমার সাথে কেন এমন করে?”, এরোজের দৃষ্টি টলমলে। নিশাত তার বাহুতে হাত রেখে বলল,
–“সৃষ্টিকর্তার উপর অভিযোগ করতে নেই, শুধু দোয়া করতে হবে এরোজ। তুই কি জানিস, দোয়া ভাগ্য বদলে দিতে পারে? ”
–“সত্যি?”
–“একবার মন থেকে রবের দুয়ারে হাত পেতেই দেখ।”
নিশাতের কথায় এরোজ ঘাড় ঘুরিয়ে তাকায় কাঁচের গ্লাস ভেদ করে। চাইতে তো হবেই, তাকে ভাগ্য বদলাতে হবে যেকোনো মূল্যে। ভাগ্য এতটা কঠোর হতেই পারে না।
তারা সেখানেই বসে অপেক্ষা করল। জীবনটা খানিক দূর্বিসহ এলোমেলো হয়ে গেলেও কিছু করার নেই। ছোট্ট নায়েল ঝিমাতে ঝিমাতে ফের ঘুমিয়ে পড়ল।
কিয়ৎকাল বাদ একজন নার্স এসে এরোজকে একটি ফর্ম এগিয়ে দিয়ে নিজ ভাষাতে বললেন,
–“মিস্টার এরোজ, আমাদের দ্রুত উনার সেন্ট্রাল লাইন সেট করতে হবে। উনার প্লাটিলেট এখন বিপজ্জনকভাবে কম। আমরা ট্রান্সফিউশন শুরু করেছি। আপনি এখানে একটা সই করে দিন আর নিচে রিসিপশনে গিয়ে পেমেন্ট করে দিন।”
এরোজ প্রকম্পিত হাতে সই করল কাগজটিতে। হাসপাতালের এই সাদা করিডোরে, ওষুধের গন্ধ আর যন্ত্রের শব্দের মাঝে শুরু হলো জীবনের এক নতুন যুদ্ধ—এক নতুন অধ্যায়।

–“মিঃ ইমরোজ আর ইউ অলরাইট নাউ?”
ডাক্তারের প্রাণোচ্ছ্বল কণ্ঠে হাসপাতালের বেডে শুয়ে থাকা ইমরোজ চোখ খুলে তাকায়। মিহি স্বরে বলল,
–“ইয়েস ডক্টর।”
–“আমি আপনার স্ত্রীর সাথে কথা বলেছি। আপনাকেও জানানো উচিৎ। গুরুতর জখম হওয়ার কারণে ভবিষ্যতে আপনার বাবা হওয়ার সম্ভাবনা অত্যন্ত ক্ষীণ। মাত্র ৩ পার্সেন্ট সম্ভাবনা রয়েছে।”
ক্রোধের অনলে দগ্ধ ইমরোজের চোয়াল শক্ত হয়ে এল। এরোজের প্রতি রাগ ঘৃণা তরতর করে বৃদ্ধি পায়। ভেতরে একটা প্রচণ্ড ধাক্কা লাগলেও সে নির্বাক থেকে কেবল মাথা নেড়ে সায় দিল। ডাক্তার মৃদু হেসে আশ্বস্ত করার সুরে বললেন

–“ডোন্ট বি প্যানিক! সৃষ্টিকর্তার রহমত থাকলে তিন পার্সেন্ট ই যথেষ্ট বাবা হওয়ার জন্য। আমি শুনেছি আপনার একটা মেয়ে আছে।”
–“জি।”, ইমরোজ ছোট্ট করে জবাব দিল।
ডাক্তার লম্বা নিঃশ্বাস ফেলে বলল,
–“তাহলে তো চিন্তাই নেই। আপনার সম্পূর্ণ চেকআপ শেষ আপনি এখন যেতে পারেন। পায়ের ফ্রাকচার ঠিক হতে এক মাসের মতো সময় লাগবে। পুরোটা সময় বেডরেস্টে থাকবেন। আর পনেরো দিন পর আবার দেখা করবেন। আমি প্রয়োজনীয় ওষুধ লিখে দিয়েছি।”
দীর্ঘ বাইশ দিন বাদ হাসপাতাল থেকে ছুটি নিয়ে বাড়ি ফিরল ইমরোজ। তবে নিজের বাড়ি নয় বরং নিজের কেনা ফ্লাটে উঠল।
বাবা স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, সে যদি ওই বাড়িতে পা রাখে হয় তাকে খুন করবে, নয় নিজেকে। ইমরোজ এই মুহূর্তে কোনো ঝামেলা চাইছে না কিন্তু ছেড়েও দেবে না। ওই বাড়ির ওপর তার সমান অধিকার রয়েছে।
হুইলচেয়ারে বসা ইমরোজকে নিয়ে নিজেদের ফ্লাটে ঢোকে সৃজা। তার বাম কানে এখনো ব্যান্ডেজ। ডাক্তার জানিয়েছে ঐ কানে আর কোনোদিন সে শুনতে পারবে না।
ইমরোজকে লিভিং রুমে রেখে এক গ্লাস পানি নিয়ে আসে। ইমরোজের দিকে গ্লাসটা বাড়িয়ে দিলেও ইমরোজের হেলদোল দেখা গেল না। অন্ধকার মুখশ্রীর আড়ালে লুকিয়ে গিয়েছে ইমরোজের চিরচেনা আদল। সে জিজ্ঞাসা করে,

–“কি হলো, কি ভাবছো?”
ইমরোজ ধ্যানচ্যূত হয়। হতচকিত হয়ে শুধায়,
–“হ্যাঁ, কি বললে?”
–“কি ভাবছিলে?”
ইমরোজের মুখশ্রীতে নিরুদ্বেগ ক্রোধ ছেয়ে গেল। মেঝেতে দৃষ্টি রেখে, দাঁতে ঠোঁট চেপে বলে,
–” তোমার কি মনে হয় না, এরোজের মধ্যে কোনো সমস্যা আছে? ও এত কেনো পজেসিভ মৌনতাকে নিয়ে? পাগলের মতো করেছে তুমি দেখোনি? ও মাতাল হলেও আজ পর্যন্ত কখনো আমার গায়ে হাত তোলেনি। কিন্তু? আমি নিশ্চিত ওর আর মৌনতার মাঝে কিছু ছিল!”
সৃজা সরু চোখে তাকায়। থমথমে মুখে বলে,
–“থাকলেও তোমার কি? তুমি এত ভাবছো কেনো?”
ইমরোজ অবাকপানে তাকায় সৃজার দিকে। রাগ ঝেড়ে বলে,
–“আমার কি মানে? আমার স্ত্রী হয়ে ও আমার-ই ভাইয়ের সাথে…”
ইমরোজের কথার মাঝেই সৃজা চাপা আক্রোশে গর্জে উঠল,
–“মৌনতা আর তোমার স্ত্রী নেই ! ওকে নিয়ে এত ভাবনা আসছে কোত্থেকে তোমার মাঝে? তুমি আমায় ভালোবাসো, আমায় পেয়েছো যেকোনো মূল্যে এটাই কি যথেষ্ট নয়? তা না, তুমি এখনো মৌনতাকে নিয়ে ভেবে যাচ্ছো?”
ইমরোজ অপ্রস্তুত হলো। সে নিজের রাগ দমিয়ে নেয়। নরম স্বরে বলল,

–” মানে আমি বোঝাতে চাইছি, আমার স্ত্রী থাকা অবস্থায় কি ওর সাথে কোনো সম্পর্ক ছিল?”
–“থেকে থাকলেও বা কি? তুমি যদি স্ত্রী সন্তান রেখে প্রেম করতে পারো, ও পারে না?”
যুক্তিতে হেরে গেল ইমরোজ। কিন্তু কোনোমতেই অন্তঃস্থল শান্ত করতে পারল না।
গত দুইদিন ধরে এটাই তার অন্তঃস্থল খেয়ে যাচ্ছে মৌনতা আর এরোজের কোনো কাহিনী রয়েছে। আর এই ভাবনার সূচনা হয় তার এক পরিচিত ছোট ভাই জানিয়েছে, এরোজ মৌনতাকে কানডায় নিয়ে যাচ্ছে চিকিৎসার জন্য। এত দরদ? এত কিসের টান যে মৌনতাকে ও বিদেশে নিয়ে চিকিৎসা করাচ্ছে?
সে যেটা চাইতো সেটা পেয়ে যাওয়ার পরেও এই একটা জিনিস তার সুখ ছিনিয়ে নিচ্ছে। সে মানতেই পারছে না এটা! কেন মৌনতা আর এরোজের মধ্যে কিছু হবে? যদি হয়েও থাকে তবে সে কেন এটা মানতে পারছে না?
সৃজাকে নিজের দিকে সন্দিহান দৃষ্টিতে তাকাতে দেখে ইমরোজ জোরপূর্বক নিজের অসহ্য অস্থিরতা সামলায়।
সৃজা শানিত কণ্ঠে শুধায়,

–“কি ভাবছো ইমরোজ?”
–“নায়েল…নায়েলের কথা ভাবছি। ওর সাথে কথা বলার চেষ্টা করছি কিন্তু কেউ ফোন ধরছে না। শুনেছি ওকেই কানডায় নিয়ে যাচ্ছে অথচ আমার থেকে অনুমতি পর্যন্ত কেউ নেয়নি। আর এসব কিছুর পেছনে রয়েছে আব্বু আর ভাইজান।”
–“মেয়ের জন্য এত ভালোবাসা তোমার?”
–“মানে? আমার মেয়ের জন্য আমার ভালোবাসা থাকবে না?”
–“মেয়ের প্রতি অত মায়া থাকলে তুমি পরকীয়ায় জড়াতে না।”
—“আমি নায়েলকে প্রাণের চেয়েও বেশি ভালোবাসি সৃজা, কিন্তু মৌনতাকে নয়।”
—“তবে মৌনতাকে নিয়ে এত জল্পনা-কল্পনার প্রয়োজন নেই। তোমার চোখেমুখে ওর জন্য এত অস্থিরতা কেন?”
ইমরোজ ফোঁস করে নিঃশ্বাস ফেলল। কিয়ৎকাল বাদ কথা ঘুরিয়ে নম্র কণ্ঠে শুধায়,
–” তুমি তো ঐ ব্যাপারে কিছু বললে না?”
–“কোন ব্যাপার?”
–“আমার বাবা হওয়ার চান্স মাত্র তিন পার্সেন্ট! তোমার কোনো সমস্যা নেই?”
এহেন প্রশ্নে সৃজাকে হঠাৎ মৃদু বিচলিত হতে দেখা গেল। সেই বিচলন সামলে সে জোরপূর্বক হেসে আবেদনময়ী কণ্ঠে বলল,

–“তোমার কি মনে হয় এই তুচ্ছ একটা কারণ আমাদের ভালোবাসা কমাতে পারবে? আমি তোমায় ভালোবাসি ইমরোজ, সবকিছুর উর্ধ্বে গিয়ে। স্ত্রী সন্তান থাকা অবস্থায় আমি যদি তোমায় ভালোবাসতে পারি, তবে এটা তো কিছুই না। তোমার বাবা হওয়ার চান্স তিন পার্সেন্ট হোক বা নাই থাকুক, আমার কোনো সমস্যা নেই। আমার শুধু তুমি হলেই হবে।”
ইমরোজের আ’ত’ঙ্ক জর্জরিত অন্তঃস্থল একটু শীতল হয়। তবুও অসন্তোষ থেকেই যায়। সে চিন্তিত কণ্ঠে বলে,
–“তবুও আমাদের সন্তান তো চাই। সন্তান না থাকলে সংসার হয়? তোমার আর আমার অংশ চাই আমার।”
সৃজা চঞ্চল দৃষ্টি ফেলে সূচালো কণ্ঠে বলে,
–” তুমি কি অনুভুতি হীন হয়ে গিয়েছো, ইমরোজ? আমাদের সন্তান তো রয়েছে। নায়েল-ই আমাদের একমাত্র সন্তান। তোমার আমার অংশ বলে কোনো কথা নেই!”
ইমরোজ বিমুগ্ধ নয়নে তাকায় সৃজার পানে। স্মিত হেসে হাত বাড়িয়ে মেয়েটিকে নিজের কোলে বসায়। মোহনীয় কণ্ঠে বলে,
–“আজ সত্যিই মনে হলো সবকিছুর উর্ধ্বে গিয়ে, তোমায় নিজের স্ত্রী হিসেবে পেয়ে আমি জিতে গিয়েছি। তোমার মতো জীবনসঙ্গী পেয়ে আমার জীবনটা আজ থেকে সমৃদ্ধ হয়ে গেল। শিঘ্রই নায়েলকে নিয়ে আসব আমাদের কাছে। তারপর আমরা তিনজনে সুখে শান্তিতে থাকব। কিন্তু সেই সুখের সংসারে আমার তোমার থেকেও একটা ছোট্ট অংশ চাই।”
সৃজার গলদেশে নাক ঘষতে ঘষতে বলল ইমরোজ। সৃজা কোনো জবাব দিলো না শুধু কৃত্রিম হাসল। কিয়ৎকাল বাদ আক্ষেপ জড়িত কণ্ঠে বলল,

–“তোমার উচিৎ হয়নি ঐ বাড়ির অধিকার ছেঁড়ে দেওয়া। আর না উচিৎ হয়েছে সম্পত্তির ভাগ চাওয়া। আমার একটা পরিবারের শখ ছিল ইমরোজ। তুমি এখন একা কি করবে?”
–” একা কি করব মানে? কোম্পানি থেকে সম্পূর্ণ ভাবে বের হওয়ার আগেই আমি নিজের কোম্পানি দাঁড় করাবো। আর কারোর অধীনে থাকতে হবে না আমাদের। আমরা নিজেদের কোম্পানির মালিক হবো। আর আমি কোনোদিন ওই বাড়ির ওপর থেকে অধিকার ছাড়ব না।”
–“সত্যিই ইমরোজ?”, সৃজা আহ্লাদি গলায় বলে উঠল। খুশিতে আত্মহারা সে! ইমরোজ হাসিমুখে বলল,
–“একদম!”

জীবনের বিভৎস মোড় কতটা বিভৎস আর যন্ত্রনাদ্বায়ক তা আটচল্লিশ ঘন্টার মধ্যে ফুটে উঠল। দীর্ঘ আটচল্লিশ ঘন্টায় সকল টেস্ট আর কঠোর পর্যবেক্ষণের পর রাত দশটা নাগাদ একজন দেখা করতে পারল মৌনতার সাথে।
হাত স্যানিটাইজ করে এবং মুখে মাস্ক এঁটে এরোজ ধীরপায়ে কেবিনে প্রবেশ করল। চারপাশ নিস্তব্ধ। সাদা বিছানায় শায়িত সেই পাণ্ডুর অবয়বটির শিয়রে বসতেই এরোজের বুকটা কেঁপে উঠল। মৌনতার গলার ডান পাশে গেঁথে দেওয়া হয়েছে সেন্ট্রাল ভেনাস ক্যাথেটার—একটি স্বচ্ছ প্লাস্টিকের নল। কলার বোনের ঠিক ওপরে সাদা ব্যান্ডেজ আর প্লাস্টিকের আস্তরণ ভেদ করে রক্তবর্ণের সূক্ষ্ম রেখাটি হৃদপিণ্ডের দিকে চলে গিয়েছে। উন্মুক্ত দেহের যত্রতত্র কালশিটে দাগ, যেন মরণব্যাধির সাথে লড়াইয়ের ক্ষতচিহ্ন।
কারো উপস্থিতির আভাসে তন্দ্রাচ্ছন্ন মৌনতা পলক মেলল। কিন্তু নড়াচড়া করার উপায় নেই; গলার সেই লাইনটি সরাসরি হৃদপিণ্ডের সাথে যুক্ত। আধবোজা চোখে দৃষ্টি মিলতেই এরোজ ম্লান হাসল। অতি ক্ষীণ কণ্ঠে শুধাল,
–“হাউ আর ইউ?”
বড্ড অযৌক্তিক একটা প্রশ্ন! স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকা নেত্রদ্বয়ের কার্নিশ বেয়ে টুপ করে এক ফোঁটা অশ্রু গড়িয়ে পড়ল। শুকিয়ে কাঠ হয়ে থাকা ওষ্ঠদ্বয় নেড়ে অস্ফুট স্বরে নিজেও অযৌক্তিক এক জবাব দিল,

–“ফাইন।”
এরোজ জানে এগুলো মিথ্যা। কিন্তু এই একটু মিথ্যাই যে তাদের প্রতিদিনকার সাহস হয় যন্ত্রনাদ্বায়ক এই যুদ্ধ লড়াইয়ের।
–“নায়েল, আম্মা?”
পুনরায় অস্ফুট স্বরে এরোজ গায়ের শালটি আরেকটু জড়িয়ে নিয়ে বলল,
–“তারা ঠিক আছে।”
–“আমি কবে ছুটি পাবো?”
সরব মৌনতার প্রশ্নে এরোজ নীরব হয়ে গেল। মৌনতার চোখ থেকে আরেক ফোঁটা অশ্রু গড়ালো জবাব না পেয়ে। দু’টো দিন তার কাছে অসহনীয় লাগছে, সে কি করে অনির্দিষ্টকালের জন্য এখানে থাকবে নিজের ছোট্ট সন্তানটিকে ছাড়া?
বাচ্চা একদমই এলাউ না হেমাটোলজি ইউনিটে। সংক্রামনের ঝুঁকি থাকে। খুব কম সময়ের জন্য দূর থেকেই নায়েলের সাথে দেখা করতে পারবে সে।
এরোজ স্মিত হেসে সাথে করে আনা একটা বক্স থেকে ছোট্ট একটা সিলিকনের পান্ডা বের করল। সেটা মৌনতার হাতের উপর রাখলে সে কৌতুহলী হয়।

–“এটা কি?”
এরোজ মিহি স্বরে বলল,
–“এটা একটা ম্যাজিক্যাল পান্ডা। আপনার যখন যা ইচ্ছা হবে ওর কাছে বলবেন, দেখবেন সেটাই পূরণ হয়ে যাবে।”
মৌনতা দূর্বল কণ্ঠে বিরক্ত হয়ে বলল,
–“কি অদ্ভুত! একটা ছোট্ট পান্ডা আমার সব ইচ্ছা পূরণ করবে?”
–”হুঁ, শুধু হসপিটাল থেকে ছুটি চাওয়া যাবে না। আর সবকিছু চাওয়া যাবে।”
–“আর সব আমি পেয়েও যাবো?”
–“হুম।”
–“এটা যদি মিথ্যা হয়? আমি যদি না পাই?”
–“চেয়েই দেখুন।”
–“এখুনি?”
–“হু।”

–“নায়েল। আমি নায়েলকে দেখতে চাই, ছুঁতে চাই।”, মৌনতা পান্ডাটা আলতো হাতে ধরে বলল।
বলেই সে উৎসুক চোখে এরোজের দিকে তাকাল। এরোজ স্মিত হেসে গায়ের বড় ওভারকোট আর শালটি সরিয়ে ফেলল। সহসা বেরিয়ে এল নায়েলের ঘুমন্ত দেহ। বেবি ক্যারিয়ারে করে এরোজ তার বুকের সাথে বেঁধে নায়েলকে নিয়ে এসেছে। সে চাচার বুকের ঊষ্ণতায় অঘোরে ঘুমাচ্ছে।
মৌনতা সরব ঠোঁট ছড়িয়ে হেসে উঠল। হাসতে হাসতে একটাসময় হাসিটা প্রগাঢ় হলো।
এরোজ চোখ ভরে দেখে বিরল ঐ হাসিটি। দীর্ঘ পঁচিশ দিন বাদ এই মুখে একটু হাসির দেখা মিললো।
মৌনতা হাসতে হাসতে বলল,
–“এটা ইয়ার্কি ছিল? ডক্টর কি করে পারমিশন দিয়েছে?”
–“ডক্টর এখন নেই। এখানে একজন নার্স আছে লিরা। আমার পরিচিত, ও সাহায্য করেছে।”
এরোজ সাবধানে নায়েলকে মৌনতার কাছে একটু নিচু করে ধরল। নড়াচড়া করতে না পারায় মৌনতা শুধু আঙুল দিয়ে মেয়েকে আলতো করে ছুঁল।
ছলছল নেত্রে চেয়ে বলল,

–“ও অনেক বড়। বেবি ক্যারিয়ারে ক্যারি করতে কষ্ট হয় না?”
–“উহু, আমার দেহের কাছে আপনার মেয়ে ছোট্ট একটা পিপীলিকা।”
মৌনতা কৃতজ্ঞতার দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল,
–“ধন্যবাদ।”
–“ধন্যবাদ আমায় নয়, পান্ডা কে দিন।”
মৌনতা মৃদু হেসে নিজের বেশভূষা অবলোকন করে বিতৃষ্ণা ভরা নিঃশ্বাস ফেলল। পড়নে হসপিটাল গাউন। সে ক্ষীণ স্বরে অভিযোগ করে বলল,
–“এখানকার ডক্টররা ভালো না।”
–“কেন?”, এরোজ ফের নায়েলকে ওভার কোট আর শালের আড়ালে লুকিয়ে নিলো। ওয়েদার আপডেট অনুযায়ী আধা ঘন্টা বাদ স্নো পড়বে।
–“কি উদ্ভট পোশাক পড়িয়ে রেখেছে। একটা ওড়নাও পড়তে দেয় না।”, মৌনতার কণ্ঠ ভীষণ করুন। এরোজ মৃদু হাসল। বলল,

–“হসপিটালের নিয়ম এটা। চিকিৎসার জন্য এই পোশাক আরামদায়ক।”
মৌনতা বদ্ধ নেত্রে ত্যাক্ত নিঃশ্বাস ফেলল। এরোজ মিহি স্বরে বলল,
–“কিন্তু আমি আপনাকে সাহায্য করতে পারি।”
মৌনতা চোখ ঘুরিয়ে তাকায়।
–“কিভাবে?”
–“লেট মি শো ইউ।”, বলেই এরোজ উঠে দাঁড়ায়। আলতো ঝুঁকে গিয়ে নারীটির দেহে বিন্দুমাত্র স্পর্শ কিংবা নাড়াচাড়া না করে প্রকম্পিত হাতে মোটা খোপাটা খুলে ফেলল। রেশমের ন্যায় চুলগুলো বালিশে ছড়িয়ে পড়তেই এরোজ আলতো ছুঁয়ে দিল চুলগুলো। চোখেমুখে তৃপ্তির রেশ। জীবনে দ্বিতীয়বার সে অতিপ্রিয় এই চুলগুলোকে ছুঁতে পারছে। কখনো কল্পনাতেও আনেনি এই সুযোগ আবার আসবে!
সে বিমুগ্ধ চিত্তে চুলগুলো এই দুই ভাগ করে ঘাড়ের দুইপাশে সামনে থেকে ছড়িয়ে দিতেই পুরো বক্ষদেশ ঢেকে গেল।
মৌনতা তপ্তশ্বাস ফেলে বলল,

–“এই উপায় এপ্লাই করা শেষ। একটু পর একটা নার্স এসে আবার এগুলো বেঁধে দেবে। ডক্টর এলোমেলো চুল দেখলে বিরক্ত হয়।
এরোজ শুনলো, তবুও নিজ কর্মে অটল থেকেই দুই পাশে দু’টো বেনুনী করে দিল। মৃদু হেসে বলল,
–“এখন আর চুলগুলো ডক্টরকে বিরক্ত করবে না।”
ভিজিটিং টাইম মাত্র আধা ঘন্টার।
মৌনতা খুব বেশি কথা বলতে না পারলেও নায়েলের কথা বলতে আর শুনতে তার কষ্ট হয় না। নতুন পরিবেশে নায়েলের মানিয়ে নেয়ার গল্প শুনতে শুনতেই ভিজিটিং আওয়ার শেষ হয়ে গেল।

অপরাহ্নে উপসংহার পর্ব ৪৭

কারোর চোখে ফের অতৃপ্ত তৃষ্ণা আঁছড়ে পড়ল। বক্ষজুড়ে হাহাকার। কাল সকাল ছাড়া আর দেখা হবে না। অপেক্ষা করতে করতে ক্লান্ত, তবুও অপেক্ষা ফুরায় না। কিন্তু যত দেরিতেই অপেক্ষা ফুরাক না কেন! উপসংহারটা একটু সুখময় হোক! এই প্রার্থনা নিয়েই এরোজ বেরিয়ে যায়। মৌনতা নিঃসাড় দেহে শুধু চেয়ে থাকে নিজের ছোট্ট অংশটির ঝুলন্ত পা দুটোর দিকে।
ভালোবাসার বিনিময়ে এত করুণ উপহার পাবে জানলে কাউকে দুঃস্বপ্নেও ভালোবাসত না।

অপরাহ্নে উপসংহার পর্ব ৪৯