অপরাহ্নে উপসংহার পর্ব ৪৯
তোনিমা খান
ডায়রির তৃতীয় পান্নায় এঁটে গেল হাসিমাখা একটি ফ্যাকাসে মুখের প্রতিচ্ছবি। তার ঠিক নিচে গোটা গোটা অক্ষরে লেখা হলো,
–“তাকে ফিরে পাওয়ার আজ তৃতীয় দিন।”
“যেই চুলগুলো ছুঁতে না পারার যন্ত্রণায় আমি ছয় বছর তরপেছি, আজ তা আমি আবার ছুঁতে পেরেছি।
তার মুখে হাসি ফোটাতে পারছি। আমার রুপাঞ্জেলকে আগলে রাখার অধিকার পেয়েছি।”
ডায়রিটা বন্ধ হয়ে গেল। পুনরায় সেজে গেল দেয়াল জুড়ে সেঁটে থাকা বিশালাকৃতির বুকশেলফের অজস্র বইয়ের মাঝে।
তার ঠিক পাশের কাবার্ডটি খুলতেই অজস্র নিষিদ্ধ পানীয়ের বোতল ভেসে উঠল। বিগত আড়াই বছরের অভ্যাসের তীব্রতায় বারংবার হাতটি ছুটে যায় নিষিদ্ধ পানীয়ের দিকে। এরোজ খুব করে চায় নিজেকে দমাতে কিন্তু পারে না। কৃত্রিম উষ্ণতায় কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমছে, চোখে নিষিদ্ধ তৃষ্ণা।
সে হাঁসফাঁস করতে করতে একটা বোতল হাতে তুলে নেয়। উদ্ভ্রান্তের ন্যায় ছিপি খুলে মুখে দিতে যাবে, ঠিক তখনই কর্নকুহরে আন্দোলিত হয় কারোর মৃদু আর্তনাদ।
এরোজ চকিতে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকায় দেয়ালে এঁটে থাকা মনিটরের দিকে। মনিটরে ভাসছে বুকে হাত চেপে চোখেমুখ কুঁচকে আর্তনাদ করা মৌনতার ব্যথাতুর মুখশ্রী। সে ছুটে যায় মনিটরের দিকে। ভয়ার্ত কন্ঠে শুধায়,
–“এই মৌন, কি হয়েছে? কোথায় কষ্ট হচ্ছে? চিৎকার করলেন কেন?”
কিন্তু সে মৌনতার আর্তনাদ শুনতে পেলেও মৌনতা পারল না। অসহায় এরোজ হন্তদন্ত হয়ে ফোন খুঁজে ফোন করে লিরার কাছে। রিসিভ হতেই অনুনয় করে বলে,
–“হেই লিরা, মৌনতার কোথাও কষ্ট হচ্ছে। দ্রুত তার কাছে যাও।”
তার বলতে দেরি আছে লিরার যেতে দেরী নেই। মনিটরে লিরাকে দেখতেই এরোজ তপ্তশ্বাস ফেলল। দুই মিনিট বাদ ফের লিরার ফোন আসল। নারীটি নিজ ভাষায় বলল,
–“চিন্তার কিছু নেই এরোজ। সেন্ট্রাল লাইনে টান লেগেছিল, তাই ব্যথা পেয়েছে।”
ফ্যাকাসে মুখটি দেখতে দেখতেই এরোজ ক্ষীণ স্বরে বলল,
–“ওকে লিরা। দূরে যেওনা একটু আশেপাশেই থেকো।”
–“ডোন্ট ওয়ারি, এরোজ। আমি তার সর্বোচ্চ খেয়াল রাখব।”
লিরা তাকে আশ্বস্ত করে ফোন রাখল। মৌনতাকে যাবতীয় দিকনির্দেশনা দিয়ে কামরা থেকে বের হতেই মৌনতা অনতিদূরে রাখা পান্ডাটি হাতে নেয়। যন্ত্রণায় তার মুখটা নীলাভ হয়ে আছে। সে অশ্রুসিক্ত নয়নে পান্ডাটির পানে চেয়ে বলল,
–“এই অসুখ কবে সারবে?”
নিজ কক্ষে দাঁড়িয়ে থাকা এরোজ ছলছল নেত্রে চেয়ে বলল,
–“খুব শিঘ্রই।”
পান্ডাটি কোনো ম্যাজিক্যাল পান্ডা নয় বরং এটার পেছনে থাকা মানুষটা ম্যাজিক্যাল।
নিষিদ্ধ জিনিসের প্রতি তীব্র আকর্ষণ মিলিয়ে গেল প্রিয় মানুষটার আবদার আর কষ্টের কাছে। উদ্ভ্রান্ত এরোজ ছুটে গিয়ে আলমারি থেকে সব বোতল বের করে আনে। বেসিনে গিয়ে একে একে সব বোতলের পানীয় ফেলে দিল।
পোশাক বদলে ওযু করে জায়নামাজে দাঁড়াতেই আঁখিদ্বয় বাঁধভাঙা হয়।
সৃষ্টিকর্তার কাছে দুই হাত তুলতেই নিশুতি রাতে নিস্তব্ধতা ভঙ্গ হয় কারোর গুমড়ে গুমড়ে কান্নার শব্দে।
এরোজ ফিসফিসিয়ে বলল,
–“এবারের মতো তাকে সুস্থ করে ফিরিয়ে দিন, পরিবর্তে আমার পুরো জীবনটা আপনার নামে করে দেব। তবুও তার কষ্টগুলো দূর করে দিন।”
মাদকের চেয়েও তীব্র কোনো নেশা যদি থেকে থাকে, তবে তা হলো প্রিয় মানুষের সান্নিধ্য। নেশাগ্রস্ত হয়ে রাত কাটানো সেই পুরুষটিটি আজ সব ভুলে একনিষ্ঠ প্রার্থনায় মগ্ন।
মৃদু কান্না করে কেউ নড়েচড়ে উঠতেই এরোজ ধ্যানচ্যূত হয়। ঘাড় ঘুরিয়ে তাকায় অন্ধকারাচ্ছন্ন ঘরের মাঝবরাবর থাকা বিছানার পানে। দ্রুত এগিয়ে গিয়ে নড়েচড়ে ওঠা ছোট্ট দেহটিকে বুকে জড়িয়ে নিলো। স্নেহভরা আলিঙ্গন পেতেই বদ্ধ নেত্রে কান্না করতে থাকা নায়েলের চোখমুখ মসৃণ হলো।
এরোজ তাকে দোল দিতে দিতে বলল,
–“ছোট পাপা আছি তো, মা।”
নায়েল তার বুকে মুখ গুঁজে ঘুম জড়ানো কণ্ঠে আওড়ালো,
–“পাপা!”
এরোজের মুখশ্রী বিবর্ণ হয়ে গেল। পাপাকে এনে দেবো বলার ক্ষমতা নেই। কিন্তু পাপার মতো আদরে আগলে রাখার ক্ষমতা তো আছে। সে মৃদু হেসে আরো দৃঢ়ভাবে আগলে নেয় ছোট্ট দেহটিকে। বড্ড সাহস করে বলল,
–“এইতো পাপা!”
নায়েলের প্রত্যুত্তর এল না। সে পুনরায় গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন হয়ে গেল।
দূর্বিসহ রাতটুকু মনিটরের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতেই কেটে গেল। যেখানে তার গোটা সুখ মৃত্যুর সাথে লড়ছে সেখানে কি করে তার চোখে আরামের ঘুম নামবে?
সিকদার বাড়ির পুরুষদের পারিবারিক সংকট সামলে উঠতে উঠতে বানিজ্যের শোচনীয় অবস্থা!
তপোবন এবং তকদির সিকদার সকাল সকাল অফিসে হাজির হয়। পারিবারিক একাত্বতায় যেদিন থেকে প্রশ্ন উঠেছে, সেদিন থেকেই কোম্পানির আয় ক্রমশই হ্রাস পেতে থাকে।
তপোবন জানে বাবার আর তার গড়া এই কোম্পানি ক্রমশই অন্ধকারে ডুবে যাবে। আর এটা নিশ্চিত করবে ইমরোজ। এই কোম্পানিতে যেদিন ভাগ বসবে সেদিন থেকেই তাদের নীড় লক্ষ্মী ছাড়া হবে!
মিটিং রুমে তখন গাম্ভীর্যতার ছোড়াছুড়ি। সাতক্ষীরার যেই প্রজেক্টের কাজ তারা করছিল সেটা ক্লায়েন্টের চাহিদা মোতাবেক হয়নি। বরং বিপুল পরিমাণ লসের খাতায় নাম লিখিয়েছে সিকাদার কোম্পানি।
প্রজেক্টের এক একটা কাজ নিখুঁতভাবে পর্যবেক্ষণের দায়িত্ব ছিল ইমরোজের উপর। ইমরোজ যখন দায়িত্ব ছেড়ে নিজ দুনিয়ায় মগ্ন হয় তখন কর্মচারীরা নিজের ইচ্ছে মতো চুরি সহ কাজে গাফিলতি করে। ফলস্বরূপ ক্লায়েন্টকে দেখানো ডিজাইন আর বাস্তবায়িত হওয়া প্রজেক্টের মাঝে বিস্তর ফারাক। আর এই গোঁজামিলের সম্পূর্ণ দায়ভার তপোবনের। মোটা অংকের জরিমানা গুনতে হবে তাকে।
নিজের সততায় আজ পর্যন্ত কখনো আঘাত লাগতে দেয়নি তপোবন। কারোর হক মারার ইচ্ছা তার নেই। চাইলেই সে ক্ষমতা আর চাটুকারিতার জোরে এই গোঁজামিল থেকে বেরিয়ে আসতে পারবে কিন্তু এটা তার নীতি বিরুদ্ধ।
থুতনি থেকে হাত নামিয়ে তপোবন দৃষ্টিরাখে ক্লায়েন্টের রাগান্বিত মুখটির দিকে। পাঞ্জাবি ঠিক করে চেয়ার ছেড়ে উঠতে উঠতে গম্ভীর গলায় বলল,
–“ম্যানেজারের থেকে চেক নিয়ে যাবেন। আপনার যত লোকসান হয়েছে তা পূরণ করতে যত লাগে বসিয়ে নেবেন। ধন্যবাদ!”
তপোবন বেরিয়ে যায় কামরা থেকে। তকদির সিকদার তখনো নত মস্তকে বসে। আজ পর্যন্ত তার কোম্পানির কোনো কাজ এভাবে বিফল হয়নি। এটা প্রথম!
মস্তিষ্কে চরম বিভ্রাট নিয়ে তপোবন ক্লান্ত বদনে মিটিং রুম থেকে বের হয়। নিজের অফিস রুমে ঢুকতেই তকদির সিকদার ঢুকলেন। চিন্তিত কণ্ঠে বলেন,
–“তুমি রাজি হলে কেন? আমরা অন্য কোন ব্যবস্থা করতে পারতাম!”
–“এটা আমার নীতি বিরুদ্ধ, আব্বু। এক টাকা খাবো, হালাল খাবো। আমার ও সন্তান সন্ততি রয়েছে। অন্যায় ভাবে খাওয়া আমার এক টাকার মূল্য তাদের মাধ্যমে কোনো একদিন সৃষ্টিকর্তা বাজেভাবে শোধ নেবে।”
তপোবনের গম্ভীর কণ্ঠে তকদির সিকদার নীরব রইলেন। তন্মধ্যে একজন স্টাফ এসে দরজায় নক করে বললেন,
–“স্যার, ইমরোজ স্যার এসেছেন আপনাদের সাথে দেখা করতে চান।”
তপোবন আর তকদির সিকদার ভঙ্গুর নেত্রে ব্যথাতুর নিঃশ্বাস ফেললেন। আবারো নিশ্চয়ই সম্পত্তির ভাগ বাটোয়ারা চাইবে।
অফিসকক্ষে পিনপতন নীরবতা। বাবা ভাইয়ের কঠিন মুখপানে চেয়ে ইমরোজ থমথমে মুখে বলল,
–“আমার মেয়ে কোথায়?”
–“যেখানেই থাকুক না কেন, ভালো আছে।”
বাবার শান্ত স্বরে ইমরোজ চাপা আক্রোশে গর্জে উঠল,
–“তোমরা কোন সাহসে আমার অনুমতি ব্যতীত আমার মেয়েকে কানডায় পাঠিয়েছো?”
তকদির সিকদার ম্লান হাসলেন ‘আমার মেয়ে’ সম্বোধন শুনে। বড্ড হাস্যকর লাগছে!
সে মিহি স্বরে বললেন,
–“বাবার দেয়া একের পর এক কষ্টে তিলে তিলে শৈশব হারানোর চেয়ে, বাবার থেকে দূরে থাকা শ্রেয় মনে হয়েছে আমার কাছে। অন্তত একটা স্বাভাবিক শৈশব পাবে আমার নাতনি।”
–“আমার মেয়ের শৈশব আমি তিলে তিলে নষ্ট করিনি তোমরা করেছো। ওই অসুস্থ পরিবেশে নায়েল কিভাবে ভালো থাকবে?”
–“তুমি তোমার মেয়ের ভালো থাকাও চিন্তা করো? তোমার মুখে এই কথা শুনতে অবাক লাগছে ইমরোজ। এই কদিন আগেই তুমি তাকে আর তার মাকে ফেলে আরেকটা বিয়ে করেছো ভুলে গিয়েছো কি?”
–“ভুলিনি। কিন্তু আমি যাই করিনা কেন আমার মেয়ের ভবিষ্যৎ ঠিক রেখেই করি। আর তোমাদের কোনো অধিকার নেই নায়েলকে আমার থেকে দূরে করার।”
–“তোমার মতো জানোয়ারের সাথে রেখে আমি আমার নাতনিকে তিলে তিলে মরতে দেখব? আমি এখনো জীবিত আছি ইমরোজ। যেই মানুষটা তার সন্তানের মাকে মারতে চাইতে পারে, সেই মানুষটার কাছে নায়েল কতটুকু নিরাপদ তা আমি ভালো করে জানি।”
–“আমার সন্তান একান্তই আমার, আব্বু। তুমি আমার ব্যক্তিগত জীবনে হস্তক্ষেপ করতে পারো না। আমার নায়েলকে চাই।”
–“উঁহু, নায়েল মোটেই তোমার একার সন্তান নয়। নায়েল মৌনতার ও সন্তান। আর তোমার মতো মানুষের কাছে কখনো নায়েলকে আমি দেবো না।”
–“তুমি দেয়া না দেয়ার কেউ না। আমি নায়েলের বাবা, ওর উপর আমার আইনগত অধিকার রয়েছে।”
–“তুমি যা ইচ্ছা করে নাও, ইমরোজ। কিন্তু আমি নায়েলকে তোমার আর সৃজার মতো মানুষের কাছে কখনো যেতে দেবো না। আর না তোমরা আমার বাড়িতে জায়গা পাবে।”
বাবার দৃঢ় কণ্ঠে ইমরোজ তাচ্ছিল্য হেসে বলল,
–“এখন কি একটা পরের মেয়ের জন্য তুমি নিজের ছেলের সাথে অন্যায় করে মহৎ সাজতে চাইছো?”
ইমরোজের তীর্যক কণ্ঠে তকদির সিকদার অতি দুঃখে হেসেই ফেললেন। হাসতে হাসতে বললেন,
–“উঁহু, সারাজীবন যেই পশুকে মানুষ বানানোর চেষ্টা করেছি। সেই পাপের প্রায়শ্চিত্ত করছি এখন। মেয়েটা মৃত্যুর সাথে লড়ছে, ইমরোজ। আমার নায়েল, তিনদিন ধরে তার মায়ের সাথে দেখা করতে পারছে না। তবুও তোমার চোখেমুখে বিন্দুমাত্র অনুশোচনা নেই।”
–“কারণ আমি কোনো অপরাধ করিনি।
আমি একটা মানুষ আব্বু। আমার নিজের পছন্দ, ইচ্ছা, চাহিদা আছে। কিন্তু তাতে তোমরা হস্তক্ষেপ করো প্রতিবার। আমি যদি সরাসরি বলতাম, আমি সৃজাকে বিয়ে করতে চাই তবে কি তোমরা মানতে?”
–“তোমার স্ত্রী সন্তান তুমি বলতে পাগল ছিল, আর তার পরিবর্তে তুমি তাদের নরক যন্ত্রণা দিয়েছো। প্রতিবার শুধু অন্ধের মতো নিজের চাহিদা দেখে গেলে। আসলে পৃথিবীর সব সুখ পেয়ে গেলেও তোমাদের মতো চরিত্রহীন লম্পটদের চাহিদা পূরণ হয় না। আবার বলছো, আমরা তোমার পাশবিকতায় তোমার সঙ্গ দেবো?”
–“তোমরা প্রতিবার আমার সাথে অন্যায় করো। এরোজ সারাজীবন নিজ মর্জিমাফিক জীবনযাপন করেছে আর তাতে তোমরা সায় দিয়েছো। অথচ আমি যখন নিজের জন্য কিছু করতে গেলাম, তখনি আমি পশু হয়ে গেলাম? বাহ্ আব্বু! সন্তানদের নিয়ে তোমার এই ভেদাভেদ দেখে আমার সত্যিই ঘৃণা হচ্ছে বাবা মা শব্দগুলোর প্রতি।”
ছেলের কথায় তকদির সিকদার স্থিরচোখে তাকান। তপোবন নির্বাক শুধু চোয়াল শক্ত করছ তাকিয়ে আছে ভাইয়ের দিকে। যেখানে বাবা আছে সেখানে সে কথা বলতে চায় না। কিন্তু চোখেমুখে অজস্র অভিযোগ!
ওর সংসারে যেন কোনো প্রকার ঝামেলা না হয় সেই জন্যই সে জোরপূর্বক এরোজকে বিদেশে পাঠায়। অথচ সেই ভাই কিনা এখন তাদের উপর আঙুল তোলে!
তকদির সিকদার থমথমে মুখে বললেন,
–“বাবা মা শব্দগুলো নিয়ে প্রশ্ন তুলছো? তুমি নিজেও তো বাবা। সেই বাবা, যে কি-না নিজের চাহিদার জন্য তার সন্তানের মাকে মেরে ফেলতে চেয়েছিল? একটাবার ভেবেছো তোমার চার বছরের অবুঝ মেয়েটা মা ছাড়া বাঁচবে কি করে?”
–“আমি যথেষ্ট আমার মেয়ের জন্য। আমি কোনোভাবেই ওর কোনো ক্ষতি হতে দেবো না। সৃজা নায়েলকে খুব ভালোবাসে।”
–“তুমি এই মুহুর্তে আমার চোখের সামনে সরো। আমার ঘৃণা হচ্ছে তোমার মুখ দেখতেও। পশুরা বিবেকহীন হয়। আর বিবেকবুদ্ধি হীনকে কিছু বোঝানো যায় না।”
–“ঠিট আছে সরে যাবো, আগে আমার প্রাপ্য আমায় বুঝিয়ে দেবে। ওই বাড়িতে আমার ও সমান অধিকার রয়েছে। ভাইজান, এরোজ, রোজ যদি থাকতে পারে তবে আমিও থাকতে পারব ওই বাড়িতে। তুমি আমায় আটকানোর কোনো অধিকার রাখো না।”
সম্পদের বাটোয়ারা মানে সম্পর্কের ভাঙন। সারাজীবন এই একটা বিষয়কে ভয় পেলেও আজ আর ভয় হলো না তকদির সিকদারের। সে ক্ষীণ স্বরে বললেন,
–“শিঘ্রই তোমায় তোমার প্রাপ্য বুঝিয়ে দেয়া হবে কিন্তু আমার বাড়ির কোনো ভাগ বাটোয়ারা হবে না।”
–“কেন হবে না? ভাইজানরা যদি থাকতে পারে আমি কেন পারব না?”
–“কারণ ওটা আমার বাড়ি। ওটা আমি আমার আর আমার নাতি নাতনিদের জন্য বানিয়েছি। তার উপরে তোমাদের চার জনের-ই কোনো অধিকার নেই। আমি ওই বাড়িতে যাকে ইচ্ছা তাকে রাখব। ভাগ বাটোয়ারা হবে আমার অফিস আর বাকি পুরো সম্পত্তির। আর সেখানে সবাই সমান ভাগ পাবে।”
তপোবন টলটলে নেত্রে চেয়ে দেখে নিজের পরিবারটার ভাঙনের প্রারম্ভ! বুকটা দুমড়ে মুচড়ে যাচ্ছে তবুও কিচ্ছুটি বলল না।
তকদির সিকদার ফের বললেন,
–“আমি শিঘ্রই বন্টনের ব্যবস্থা করছি। তোমায় জানানো হবে। এখন বের হও এখান থেকে।”
ইমরোজ চাপা রাগে গজগজ করতে করতে বলল,
–“তুমি একটা পরের মেয়ের জন্য নিজের ছেলেকে দূরে করে দিচ্ছো?”
সহসা তকদির সিকদার গর্জে উঠলেন,
–“আর একবার পরের মেয়ে বলবে না। ও আমার মেয়ে! আজ আমার নিজের মেয়েও এই পরিস্থিতিতে থাকতে পারত! তুমি বাবা হিসেবে নিকৃষ্ট হতে পারো কিন্তু আমি না। খবরদার আমার মেয়েকে নিয়ে আর একটাও বাজে কথা বলবে না। বিগত ছয় বছর যাবৎ মৌনতা একা হাতে গোটা সংসার সামলেছে, আমাদের সবার জন্য নিরলস পরিশ্রম করে গিয়েছে। কখনো কোনো অভিযোগ করেনি, এমনকি স্বামী পরকিয়ায় লিপ্ত জেনেও ধৈর্য্য সহকারে সংসার করে গিয়েছে। ও আমার ঘরের সৌন্দর্য!”
হুইলচেয়ারে বসা ইমরোজ রক্তাভ নেত্রে বলল,
–“সারাদিন রান্না করা আর ঘরের মানুষের খেয়াল রাখায় মৌনতা তোমার ঘরের সৌন্দর্য হয়ে গিয়েছে। অথচ আমি যে এই অফিসের পেছনে আমাদের সংসারের পেছনে হাড়ভাঙা পরিশ্রম করেছি তা? দিনের পর দিন কনস্ট্রাকশন সাইটে থেকে প্রজেক্ট সফল করেছি তা? আমার পারিশ্রমিক কোথায়?”
–“তোমার পারিশ্রমিক তোমায় যথাযথভাবে বুঝিয়ে দেয়া হবে। একটুও কমতি হবে না।”
–“আমি আমার বাড়িতে আমার পরিবারের সাথে থাকতে চাই।”
তকদির সিকদার কঠিন চোখে তাকালেন। চরিত্রহীন শব্দটা সে আজও মানতে পারে না। এই শব্দটির জোড়েই তার বুকভরা ভালোবাসা পায়ে পিষে কেউ তাকে নিঃস্ব করে চলে গিয়েছে।
সে ঘৃণাভরা কণ্ঠে বলল,
–“আমার বাড়িতে তোমার আর সৃজার পা পড়লে রক্তারক্তি হয়ে যাবে, ইমরোজ। আমার ঘরে কোনো চরিত্রহীনের জায়গা নেই।”
দীর্ঘ বাকবিতন্ডায় হেরে গেল ইমরোজ। বুঝেগেল সৃজাকে নিয়ে সরোবরে ঢোকা অসম্ভব!
বিস্তীর্ণ সবুজ ঘাসের গালিচার ওপর দাঁড়িয়ে থাকা অফ হোয়াইট অট্টালিকাটির প্রতিটা বারান্দায় সেজে আছে অজস্র বাগানবিলাস ফুল। বাইরে থেকে অট্টালিকাটি অপার্থিব সৌন্দর্যে মোড়া হলেও ভেতরটা ঠিক ততটাই বিষণ্নতায় মোড়া।
ঘরটি আজ নির্জীব হয়ে আছে তার গিন্নির হাতের যত্নমাখা স্পর্শ ব্যতীত।
সিকদার বাড়ির পুরো দায়িত্ব এসে পড়েছে রূপকথার উপর। বয়স আর দায়িত্বের মধ্যে বিস্তর ফারাক থাকলেও মেয়েটি ভীষণ দক্ষতার সাথে তা কাঁধে তুলে নিয়েছে। সকলের বিমর্ষতায় একটুখানি হাসির করণ হয় সে। সারাদিন কাজ করে রাতে পড়াশুনাও করে।
আর তপোবন! পরিবারের বড় ছেলেটির কাঁধে অনেক দায়িত্ব। কারোর পাপের ভার, কারোর ফেলে যাওয়া দায়িত্বের ভার, আর নিজের পরিবারের ভার—সবটা সে দক্ষ হাতে সামলে নিচ্ছে। পরিবারের এই দুঃসময়ে সে যতটা পারে পরিবারকে সময় দেয়ার চেষ্টা করে। শুধু নিজের পরিবার নয়, মৌনতার পরিবারের ও পুরো খেয়াল রাখে। মৃন্ময়ের প্রয়োজন থেকে শুরু করে নেওয়াজ সাহেবের শরীরের খোঁজ খবর সব তার কাছে থাকে।
রূপকথা তখন মনোযোগ সহকারে সন্ধ্যার নাস্তা বানানোর প্রস্তুতি নিচ্ছিল। এতটাই মনোযোগ দিয়ে কাজ করছে যে জাগতিক সব ভুলে বসেছে। শাড়ি ছাপিয়ে উত্তপ্ত দুটি হাত মসৃণ উদরে লেপ্টে গেল। কাঁধে কেউ অলস গতিতে থুতনি রাখতেই নিজকর্মে নিমগ্ন মেয়েটি হকচকিয়ে গেল। তপোবন দু’হাতের শক্ত বন্ধনে কম্পন টুকু সামলে নিলো। মিহি স্বরে শুধায়,
–“এত মনোযোগ দিয়ে কি করা হচ্ছে?”
চোখেমুখে ছেয়ে যাওয়া মৃদু লাজ ভুলে রূপকথা হাঁফ ছাড়ল। মিহি স্বরে বলল,
–“আপনি? কখন এলেন আমি টের পাইনি। পাস্তা বানাচ্ছি তানশান আর রোজ আপুর জন্য।”
তপোবন দৃষ্টি রাখে ছোট্ট মেয়েটির ঘর্মাক্ত মুখপানে। দায়িত্বের ভার যে একটু বেশিই ভারী, তা চোখেমুখে স্পষ্ট!
রূপকথা ঘাড় কাত করে শুধায়,
–“কি দেখছেন?”
তপোবন স্মিত হেসে তার গালে আলতো ঠোঁট ছুঁইয়ে দিয়ে বলল,
–“আমার ঘরের দায়িত্ববান গিন্নিকে দেখছি।”
রূপকথা মৃদু হাসল। তপোবন তার হাত থেকে ছুড়ি আর চপিং বোর্ড নিয়ে বলল,
–“দাও, আজ আমি পাস্তা বানাই।”
–“আপনি তো তানশানের খাবার ছাড়া কিছু রান্না করতে পারেন না।”
তপোবন চিকেন কাটতে কাটতে বলল,
–“না পারলে শিখে নেবো। আগে বাচ্চার জন্য রান্না শিখেছি, এখন বাচ্চা বউয়ের জন্য শিখব।”
–“আমি বাচ্চা নই।”, রূপকথা কপাল কুঁচকে বলল। তপোবন স্মিত হেসে বলল,
–“হুম, আপনি তো আমার মুরুব্বি।”
রূপকথা হেসে উঠল। তাদের কথার মাঝেই রোজ আর তানশান উদাসীন বদনে ঢুলতে ঢুলতে রান্নাঘরে ঢোকে। তার পেছনে জবাও পাণ্ডুর মুখে ঢুকলো।
তপোবন চাকু হাতে ফিরে তাকায় তিন উদাসীন মুখপানে। বিষন্ন হয় অন্তঃস্থল! শুধায়,
–“কি হলো এভাবে মন খারাপ করে আছো কেন তোমরা?”
রোজ উদাসীন দৃষ্টিতে তাকায় ভাইয়ের দিকে। মলিন মুখে বলে,
–“ছোট ভাইজান ফোন ধরছে না, ভাইজান।”
তপোবন ঘড়ি দেখল। এরোজ জানিয়েছিল এই সময়ে ব্যস্ত থাকবে। সে বোনের মাথায় হাত রেখে বলল,
–“ছোট ভাইজান তো অনেক ব্যস্ত থাকে, রোজ।”
–“মৌন বউ কেমন আছে? গতকাল থেকে কথা বলতে পারছি না।”
তপোবন একটু ছল করলো। হাত ধুয়ে পকেট থেকে ফোন বের করে বলল,
–“সে কি তোমরা জানো না আমাদের মৌনতা কত স্ট্রং? এই দেখো সে হাসছে। শিঘ্রই সে সুস্থ হয়ে ফিরে আসবে আমাদের কাছে।”
তপোবনের কথায় রোজ, তানশান, জবা আর রূপকথা হুড়মুড়িয়ে তার ফোনের উপর ঝুঁকে পড়ে। তানশান হড়বড়িয়ে বলল,
–“মেজো মা হাসছে? সে খুব শিঘ্রই সুস্থ হয়ে যাবে?”
–“হ্যাঁ, ডক্টর কাল মিটিং এ বসবে তারপর মৌনতার ফাইনাল চিকিৎসা শুরু হবে। এরপর-ই সে সুস্থ হয়ে যাবে।”
নিছকই মন ভুলানো কথা। অথচ তাতেই সকলের মুখে হাসি ফুটে উঠল। রোজ ছলছল নেত্রে চোখ ভরে দেখে মৌনতার হাসিমুখ। হাত বাড়িয়ে ছুঁয়ে দেয় ছবিটা। তার সুখ দুঃখের সাথি এই মানুষটা। মায়ের মতো ভালোবাসে।
জবা ছলছল নেত্রে বলল,
–“কতদিন পর মাইজ্জা ভাবিজানরে একটু হাসতে দেখলাম, ভাইজান। যাওয়ার আগে একটু দেখাও করতে পারলাম না।”
তপোবন তার মাথায় হাত রেখে বলল,
–“একেবারে আমাদের সুস্থ সবল আগের মৌনতাকে দেখবি, চিন্তা করিস না।”
জবা গাল ভরে হেসে মাথা নাড়লো। সকলকে সাময়িক খুশি করতে পেরে তপোবন স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল। চঞ্চল কণ্ঠে শুধাল,
–“এখন আমায় বলো তোমরা কি খাবে? আজ আমি তোমাদের সবাইকে রান্না করে খাওয়াবো।”
রোজ আর তানশান বহুক্ষণ ভেবেচিন্তে বলল,
–“বার্গার!”
তপোবনের হাসি হাসি মুখ নিভে গেল। থমথমে মুখে জবা আর রূপকথার দিকে তাকিয়ে শুধায়,
–“আর তোমরা?”
রূপকথা আর জবাও গাল ভরে হেসে সমস্বরে বলল,
–“বার্গার।”
তপোবন দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
–“সবকটাকে এক দড়িতে বেঁধে পেটাতে হয়। হেলদি খাবার বলতে পারো না? সারাদিন শুধু আজেবাজে খাবার।”
রূপকথা হাসি থামিয়ে নেয়। থমথমে মুখে বলে,
–“আপনি পারবেন না বললেই পারেন। ধমকাচ্ছেন কেন?”
–“কতবড় অপবাদ! কে বলেছে আমি পারি না? এক ঘন্টার মধ্যে তোমাদের রুবার্স ক্যাফের চেয়েও শতগুণ টেস্টি বার্গার বানিয়ে খাওয়াবো।”
–“আর না পারলে?”, রোজের ব্যগ্র কণ্ঠে তপোবন কপাল কুঁচকে দৃঢ় কণ্ঠে বলল,
–“একশবার পারব।”
–“ধরো পারলে না, তখন?”, পুনরায় রোজের কথায় তানশান চঞ্চল কণ্ঠে বলল,
–“তবে পাপা আমাদের সবাইকে আজ বাইরে নিয়ে ডিনার করাবে।”
–“একদম ঠিক কতা কইছো, তানশান বাবা। বহুদিন হইছে ঐ চাইনিজ খাবার খাইনা।”
সকলে বেশ প্রফুল্ল তানশানের কথায়। তপোবন সকলের দিকে সরু চোখে চেয়ে গুরুগম্ভীর কণ্ঠে বলল,
–“ওকে চ্যালেঞ্জ এক্সেপ্টেড। কিন্তু শর্ত হচ্ছে, যতক্ষণ না আমার বার্গার বানানো হচ্ছে ততক্ষণ তোমরা তিনজনে ডাইনিং টেবিলে বসে পড়বে। আমি দেখবো।”
–“আচ্ছা ঠিক আছে।”, তিনজন রাজি হয়ে গেল।
রূপকথা, তানশান আর রোজ বইখাতা নিয়ে ডাইনিং টেবিলে এসে পড়তে লাগল। ঘরের পরিবেশ কিছুটা প্রাণোচ্ছ্বল করতে পেরে তপোবন বুকভরা নিঃশ্বাস ফেলে বার্গার বানাতে মগ্ন হয়।
তপোবনের সবচেয়ে চমৎকার বিশেষত্ব হলো তাকে যেই পরিস্থিতিতে ফেলা হোক না কেন সে ঠান্ডা মস্তিষ্কে ভীষণ দক্ষতার সাথে সেই পরিস্থিতির মোকাবিলা করতে পারে। সেটা হোক নিজের অসম বৈবাহিক সম্পর্ক কিংবা রান্না করা। দুটোই সে চমৎকারভাবে সামলে নিয়েছে।
দীর্ঘ দেড় ঘণ্টার পরিশ্রম করে তপোবন বার্গার বানাতে সক্ষম হলো।
রূপকথা, তানশান, রোজ আর জবা যখনি বার্গার মুখে দিলো তাদের মুখ বিষন্নতায় ছেয়ে গেল। রুবার্স ক্যাফের চেয়েও বেশি সুস্বাদু!
তপোবন ভ্রু নাচিয়ে শুধায়,
–“কি কেমন? ভালো হয়েছে না?”
রোজ কাঁদো কাঁদো গলায় বলল,
–“দিস ইজ নট ফেয়ার, ভাইজান। তুমি এভাবে চ্যালেঞ্জ জিতে যেতে পারো না।”
তানশান ও রেগে গেল।
–“এটা এত ভালো কি করে হলো? পাপা তো এগুলো আগে বানায়নি।”
তপোবন স্বগৌরবে টিশার্টের কলার ঝাঁকায়। দম্ভ নিয়ে বলল,
–“পাপা সব পারি! আমায় কোনো চ্যালেঞ্জে হারানো অসম্ভব!”
জবা বিষন্ন কণ্ঠে বলল,
–“এইডা ঠিক না, ভাইজান। আমরা আরো কত আশা কইরা আছিলাম আফনে আমগো বাইরে নিয়া যাইবেন।”
তপোবন হাসল সকলের করুণ দশা দেখে। সে থুতনিতে হাত ঠেকিয়ে তাকায় নীরবে গোগ্রাসে খেতে থাকা স্ত্রীর পানে। শুধায়,
–“কি হলো মুরুব্বি আপনি কিছু বললেন না কেন? কেমন হয়েছে?”
রূপকথা চেটেপুটে খেতে খেতে বলল,
–“এখন থেকে আর রেস্তোরাঁয় যাবো না, তানশানের পাপা। এখন থেকে আপনিই আমাদের বার্গার বানিয়ে খাওয়াবেন।”
তপোবন হতাশার নিঃশ্বাস ফেলে বলল,
–“এ তো মহা মুশকিলে পড়লাম!”
রূপকথা ফিক করে হেসে উঠল। তানশান, রোজ, জবা বাজেভাবে আশাহত হয়ে ঝিমাচ্ছে। তপোবন মৃদু হেসে তিনজনের মাথা এলোমেলো করে দিয়ে বলল,
–“এত মন খারাপ করতে হবে না। পড়া শেষ করো সবাই। নয়টার দিকে বাইরে যাবো সবাই, যত ইচ্ছা তত চাইনিজ খাবে।”
সহসা তিনজন হৈ হৈ করে উঠল। তিনজন দ্রুত মনোযোগ সহকারে পড়তে শুরু করল। আর জবা তাদের পাশে বসে তাড়া দিচ্ছে, যত তাড়াতাড়ি পড়া শেষ করবে তত তাড়াতাড়ি বাইরে যেতে পারবে।
তপোবন তাদের পড়তে দিয়ে মায়ের কাছে যায়। চাপিয়ে রাখা দরজা খুলতেই আঁধারে নিমজ্জিত কামরায় রকিং চেয়ারে দুলতে থাকা বিধ্বস্ত মায়ের উদাসীন দেহ দৃষ্টি নিবদ্ধ হয়। সে ডেকে উঠল মাকে,
–“আম্মা!”
নির্জনা বেগম নড়েচড়ে উঠলেন। ভেজা চোখের কার্নিশ দ্রুত মুছে অস্ফুট স্বরে বললেন,
–“তপোবন, এসো।”
তপোবন ধীর কদমে ঢুকে লাইট জ্বালাতেই নির্জনা বেগম দৃষ্টি লুকান। তপোবন মায়ের সামনে বসে হাত বাড়িয়ে আঁকড়ে ধরে মায়ের হাত। আদুরে স্বরে ফের ডেকে ওঠে,
–“আম্মা!”
দৃষ্টি লুকাতে থাকা নির্জনা বেগম ছেলের দিকে তাকাতেই চোখমুখ ঠিকরে চাপা কান্না বেরিয়ে আসল। আর্তনাদ ভরা কণ্ঠে বলল,
–“আমার সংসার, তপোবন।”
তপোবন দীর্ঘশ্বাস ফেলে মাকে বুকে জড়িয়ে নেয়।
–“বারবার এই সংসারটা কেন ভেঙে দেয় সৃষ্টিকর্তা? ইম…ইমরোজ কি করে আমার নায়েল আর মৌনতার সাথে এত নিষ্ঠুরতা করতে পারল?”, নির্জনা বেগম ফুঁপিয়ে কাঁদছে।
তপোবন ক্ষীণ স্বরে বলল,
–“আল্লাহ যা করেন আমাদের ভালোর জন্য করেন আম্মা।”
–“আমার সন্তানেরা আমার গর্ব ছিল তপোবন। কিন্তু আজ…সব শেষ! ইমরোজ সব গুঁড়িয়ে দিয়েছে। আমি নিজের সাথে চোখ মেলাতে পারছি না তপোবন।”
–“আপনার কোনো দোষ নেই , আম্মা। সবটা ভাগ্য!”
–“ভাগ্য এত নিষ্ঠুর না হলেও পারত।”
নির্জনা বেগম ভেতরের ভারগুলো সবটা ছেলের কাছে রাখে। তপোবন মাকে শান্ত করে বলল,
–“আম্মা, চলুন আজ বাইরে খেতে যাই।”
–“আমার দাদুমনি আর মৌনতা কেমন আছে ওখানে আর আমি বাইরে খেতে যাব? আমার গলা দিয়ে খাবার নামে না তপোবন।”
মায়ের অশ্রু গুলো সযত্নে মুছে নেয় তপোবন। বলল,
–“তারা ভালো আছে আর ভালো থাকবে, আম্মা। আপনার পাগল ছেলে তাদের ভালো রেখেই ছাড়বে। আপনি একদম নিশ্চিন্তে থাকুন আর শুধু রবের দুয়ারে প্রর্থনা করুন মৌনতার যাত্রটা যেন একটু সহজ হয়।”
নির্জনা বেগম নির্নিমেষ চেয়ে বললেন,
–“আমার এরোজের সব কষ্টের কারণ আমরা তপোবন?”
–“ওই যে বললাম, ভাগ্য। এটা আমাদের হাতে নেই আম্মা।”
পৌঢ়া মাথা নেড়ে সায় জানায়। তপোবন স্মিত হেসে বলল,
–“তবে চলুন। আব্বু ক্লাব থেকে সোজা রেস্তোরাঁয় আসবে। একসাথে সবাই গেলে সবার মন ভালো হয়ে যাবে। রোজ তানশানের খুব মন খারাপ।”
–“আচ্ছা ঠিক আছে।”, নির্জনা বেগম ছেলের মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন। জীবনের প্রতিটা কঠিন পর্যায়ে এই ছেলেটা শক্তহাতে তার সঙ্গ দিয়েছে। এমনকি সৎ মা থেকে মা হয়ে ওঠার পথটাও তপোবনই সহজ করেছিল।
নয়টা বাজতেই সকলে পড়া শেষ করে একদম তৈরি বাইরে যাওয়ার জন্য। এরপর পুরো পরিবারের সবাইকে নিয়ে একটা চমৎকার সুখময় নৈশভোজ শেষ করে তারা একটু শপিং করলো, ঘোরাফেরা করলো। সকলের মন খারাপে একটু একটু করে ফিকে পড়তে লাগল।
কিন্তু এতসবকিছুর মাঝে রূপকথাকে ভারী শ্রান্ত দেখালো। সকলে তখন নিউমার্কেট এড়িয়াতে জুস খাচ্ছিল। তপোবন ধীর কদমে স্ত্রীর পাশে এসে দাঁড়াল। নিচু স্বরে শুধাল,
–“মন খারাপ মুরুব্বি?”
রূপকথা শ্রান্ত চোখে তাকায়। শ্রান্ত স্বরেই বলল,
–“একটু ক্লান্ত!”
তপোবন হাত বাড়িয়ে আগলে নিলো ছোট্ট মেয়েটিকে। নম্র স্বরে বলল,
–“আর দশ মিনিট তারপরেই বাসায় চলে যাবো।”
–“সমস্যা নেই।”
–“ফুচকা খাবে?”
তপোবনের এহেন প্রস্তাবে রূপকথা উজ্জ্বল দৃষ্টি ফেলল। তপোবন হতাশার নিঃশ্বাস ফেলল মেয়েটির চাপা আনন্দ দেখে। হতাশার সুরেই বলল,
–“আমার বউ আমার নাম শুনলেও এত খুশি হয় না, যতটা খুশি হয় ফুচকার নাম শুনলে।”
রূপকথার ভ্রু কুঁচকে বলল,
–“ফুচকার সাথে আপনার কি সম্পর্ক?”
তপোবন কাঁধ ঝাঁকালো।
–“কোনো সম্পর্ক নেই কিন্তু আমার কেন জানি নিব্বা নিব্বির মতো হিংসা হচ্ছে। আমার বউ আমার থেকে বেশি ফুচকাকে ভালোবাসে। এর থেকে বাজে কথা আর কিছু হতেই পারে না।”
রূপকথা মিটিমিটি হাসল। ভালোলাগে যখন মানুষটা তার প্রতি ভালোবাসা, হিংসা প্রকাশ করে।
সে মিনমিনে স্বরে বলল,
–“ফুচকার থেকেও, যে ফুচকা খাওয়ায় তাকে বেশি ভালোবাসি।”
তপোবন নুইয়ে গেল।
–“কি বললে শুনতে পেলাম না?”
–“আপনি শুনতে পেয়েছেন এখন অভিনয় করছেন।”, রূপকথা সরব ঠোঁটে ঠোঁট চাপল। তপোবন মিটিমিটি হেসে বলল,
–“সত্যি শুনিনি, আবার বলো।”
–“শোনার প্রয়োজন নেই।”, রূপকথা রেগে বলেই হাঁটা দিলো ছেলের কাছে। তপোবন গা দুলিয়ে হেসে আঁকড়ে ধরে মেয়েটির হাত। আস্তেধীরে ফের নিজের পাশে আগলে নিয়ে ক্ষীণ স্বরে বলল,
–“ভালোবাসি মুরুব্বি। একটু ফুচকা খাইয়ে যদি এত সুন্দর কথা শোনা যায়, তবে আজ থেকে প্রতিদিন আপনার জন্য ফুচকা বরাদ্দ করা হলো।”
–“সত্যি?”, রূপকথা বড় বড় নেত্রে তাকালো। তপোবন মেকি হেসে বলল,
–“কিন্তু পরিবর্তে রোজ ভালোবাসি বলতে হবে।”
আনন্দে আত্মহারা রূপকথা হড়বড়িয়ে বলল,
–“ভালোবাসি, ভালোবাসি, ভালোবাসি।”
তপোবন চোখ ভরে দেখে হাসিমাখা মুখটি। দুষ্টু হেসে বলল,
–“তিনদিনের ভালোবাসা পেয়ে গিয়েছি। আবার ফুচকা পাবে চারদিন পরে।”
রূপকথা রেগে গেল। রেগে লোকটার পেটে আলতো ঘুষি মেরে বলল,
–“চিটারি করবেন না।”
তপোবন হাসতে হাসতে মেয়েটির হাত ধরে এগিয়ে যায় ফুচকার কাছে। যেতে যেতে হাঁক ছেড়ে বলে,
–“রোজ, জবা তোমরা ফুচকা খেতে চাইলে ভাইজানের পিছু পিছু আসতে পারো।”
ফুচকার নাম শুনতেই রোজ আর জবা এক ছুট লাগালো। কিন্তু তানশান গেল না। বাবা মোটেই এলাউ করে না তার ফুচকা খাওয়া অথচ তার খেতে ইচ্ছে করছে। সে দাদু আর দাদার সাথে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে জুস খেয়ে কিয়ৎকাল বাদ নিজেও ফুচকার কাছে গিয়ে দাঁড়াল।
তপোবন ছেলেকে দেখে একহাতে আগলে নিলো বুকের সাথে। সন্দিহান হয়ে শুধায়,
–“কি হলো পাপা আপনি এখানে? আপনিও কি খাবেন এক প্লেট?”
বাবার কথায় তানশান মিনমিন করতে করতে মাথা নাড়লো। সে খাবে। তপোবনে হতাশার নিঃশ্বাস ফেলে বলল,
–“সৎ সঙ্গে স্বর্গবাস, অসৎ সঙ্গে সর্বনাশ।”
বলেই স্ত্রীর দিকে তাকালে সে বোকাসোকা হাসল। তপোবন ঠোঁট কামড়ে হাসি আটকায় বোকাসোকা অপরাধীর ন্যায় মুখটি দেখে। সে আজ কাউকে হতাশ করলো না। ছেলেকেও ফুচকা খাওয়ালো।
রাতের খাবার খেয়েও সকলকে গোগ্রাসে ফুচকা খেতে দেখে তপোবন মৃদু অবাক হয়ে শুধাল,
–”তোমরা ঢুকাচ্ছো কোথায় এগুলো? মাত্র না ডিনার করে আসলে?”
রোজ খেতে খেতে নিজের পেট দেখিয়ে বলল,
–“এখানে একটা টেঙ্কি আছে ভাইজান।”
তপোবন হো হো করে হেসে উঠল বোনের কথায়। মাথায় হাত দিয়ে বলল,
–”সবকটা দুষ্টু হচ্ছো।”
বলতে বলতেই সে উদাসীন হয়। তার ছোট্ট মা’টা এখানে থাকলে উল্লাসে প্রজাপতির মতো উড়তো।
সুখময় প্রহরটি দ্রুত কেটে গেল। সারাদিনের দায়িত্ব শেষে ছেলের ঘর থেকে নিজের ঘরে ঢুকতেই রূপকথাও শ্রান্ত বদনে ওয়াশ রুম থেকে বের হয়। সে মৃদু হেসে দু’হাত বাড়িয়ে দিল মেয়েটির দিকে। রূপকথা ম্লান হেসে লেপ্টে গেল বক্ষমাঝে। তার পুরো দিনের সকল ক্লান্তি এভাবেই শেষ হয় এই প্রশস্ত বক্ষে।
পৃথিবী কি আজব! যেখানে একপ্রান্তে মিলনের গল্প রচিত হচ্ছে সেখানে অন্যপ্রান্তে বিচ্ছেদের যন্ত্রণাদ্বায়ক গল্প রচিত হচ্ছে।
বোর্ড মিটিং রুমে সাত জন বিশিষ্ট ডক্টরের সামনে বসা এরোজ আর মাসুমার দেহ ম্লান হয়ে আসে ডাক্তারের কথা শুনতেই।
–“মৌনতার ব্লাড রিপোর্ট অনুযায়ী ওর ব্লাস্টে ক্যান্সার কোষ সংখ্যা খুব দ্রুত বাড়ছে। এম-টু সাব-টাইপে আমাদের হাতে আর এক সেকেন্ড নষ্ট করার সময় নেই। আমরা যদি এখনি ওর ফাইনাল ট্রিটমেন্ট শুরু করি, তবে ওর বাঁচার সম্ভাবনা রয়েছে ষাট পার্সেন্ট।”
“ষাট পার্সেন্ট?” এরোজ ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইল। বাকি চল্লিশ পার্সেন্ট যদি জিতে যায়? সে ক্ষীণ স্বরে বলল,
–“আপনি এখুনি চিকিৎসা শুরু করুন।”
ডাক্তার তাকে চিকিৎসার তিনটা ধাপ বুঝিয়ে বললেন।
–“আগামী সাতদিনের জন্য মৌনতার ’ ইনটেনসিভ ইনডাকশন সারকেল’ শুরু হবে। এটাই সবচেয়ে বড় কেমোথেরাপি। এক রাউন্ড শেষে যদি বোন ম্যারো টেস্টে ক্যান্সার কোষ পাঁচ পার্সেন্ট এর নিচে নেমে এসেছে, তবেই পরবর্তী ধাপে যেতে পারব আমরা। নয়তো দ্বিতীয়বার ইনডাকশন দিতে হতে পারে। এরপরের ধাপে মৌনতার পাঁচটি সাইকেলে কেমোথেরাপি দেয়া হবে।…”
–“পাঁচটা?”, এরোজ অস্ফুট স্বরে আওড়ায়। সে জানে এই সারকেলের প্রতিক্রিয়া কতটা ভয়ঙ্কর! তিন সারকেলে গিয়েই বহু মানুষ হার মেনে নেয়, মৌনতা কি করে পাঁচটা সারকেল সম্পন্ন করবে?
চোখেমুখে অজস্র ভয় দেখে ডক্টর মৃদু হেসে আশ্বস্ত করে বলল,
–“প্রক্রিয়াটা একটু জটিল কিন্তু একবার সফল হলে মৌনতার সুস্থ হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।”
এরোজ শুকনো ঢোক গিলে মাথা নাড়লো। ডক্টর পুনরায় বলল,
–“মৌনতার এ.এম.এল এম-টু সাব-টাইপে অনেক সময় t(8;21) নামক একটি জেনেটিক মিউটেশন থাকে। যেটা থাকলে বোন ম্যারো ট্রান্সপ্লান্টের প্রয়োজন হয় না। কিন্তু আনফর্চুনেটলি আমরা মৌনতার রিপোর্টে এমন কোনো মিউটেশন পাইনি। এম-টু টাইপটি ‘ফেভারেবল রিস্ক’ ক্যাটাগরিতে আছে। এর মানে হলো, শুধু কেমোথেরাপি দিয়েই ওকে পুরোপুরি সুস্থ করা সম্ভব নাও হতে পারে। আমাদের বোন ম্যারো ট্রান্সপ্লান্ট প্রয়োজন পড়বে।”
এরোজ ঘন ঘন মাথা নেড়ে বলল,
–“আমায় এখন কি করতে হবে ডক্টর? যা করতে হয় বলুন আমি সব করব শুধু চিকিৎসা দ্রুত আর সফলভাবে হতে হবে।”
ডক্টর প্রসন্ন হন। বললেন,
–“এক্ষেত্রে মৌনতার পরিবারের কারোর সাথে ওর টিস্যু মিললে তার বোন ম্যারো প্রয়োজন হবে। কিংবা আপনি বললে, আমরা আন্তর্জাতিক বোন ম্যারো ব্যাংক থেকে এমন কাউকে খোঁজা শুরু করব যার টিস্যু টাইপ মৌনতার সাথে মিলে যায়। কিন্তু বিষয়টা ব্যয়বহুল!”
–“তার পরিবারের সবাই এখানে নেই। আপনি আন্তর্জাতিক বোন ম্যারো ব্যাংক থেকেই কাউকে খোঁজ করুন। যত টাকা লাগে আমি দেবো।”
ডক্টররা আলোচনা করে পুরোপুরিভাবে চিকিৎসার জন্য তৈরি হয়ে গেল। জানানো হলো আগামীকাল সকাল সাতটা থেকে মৌনতার চিকিৎসা শুরু হবে। আজকের রাতটুকু তাকে মানসিকভাবে স্থির করতে দেয়া হয়।
এরোজ যেতে যেতেও ফিরে আসে। অনুনয় করে বলল,
–“আমি কি তাকে কিছু ঘন্টার জন্য বাড়িতে নিয়ে যেতে পারি?”
ডক্টর তীব্র বেগে নাকচ করে বললেন,
–“অসম্ভব! ইনটেনসিভ সারকেলের আগে মৌনতা কোনোভাবেই হাসপাতালের বাইরে যেতে পারবে না।”
–“শি হ্যাজ আ চাইল্ড, প্লিজ ডক্টর!”
–“আ’ম স্যরি মিঃ এরোজ! দিস ইজ নট পসিবল।”
এরোজ আর মাসুমা ভঙ্গুর দেহে বেরিয়ে আসল। হাসপাতালের নিচ তলায় তখন নায়েল ছোটাছুটি করছে নিশান্ত আর নিভার সাথে। কিছুটা ভাব হয়েছে তাদের সাথে।
কিন্তু এরোজ অসহায়ত্ব অনুভব করে। একই হাসপাতালে থেকেও মায়ের সাথে দেখা করাতে পারছে না নায়েলকে। দূর থেকে একটু দেখালেও নায়েল কান্নাকাটি করে কাছে যাওয়ার জন্য। কিন্তু না দেখলে ভুলে থাকে মাকে। তাই এরোজ আর দেখালো না।
মাসুমা মেয়ের সাথে দেখা করে বের হতেই এরোজ হাত স্যানিটাইজ করে ধীর কদমে ঢুকলো। চারদিনের অভ্যাস অনুযায়ী হাতে থাকা ল্যাভেন্ডার ফুলগুলো বেডসাইড ফ্লাওয়ার ভাসে রাখলো। মৌনতা ঘাড় ঘুরিয়ে তাকায়। শুধায়,
–“রোজ রোজ এই ফুল কেন আনেন?”
এরোজ ফুলগুলো রাখতে রাখতে শান্ত স্বরে বলল,
–“পথে বাঁধে তাই নিয়ে আসি।”
মৌনতা চেয়ে দেখে ফুলগুলো। এই সুগন্ধ তার খুব প্রিয়। কলেজ থেকে এই সুগন্ধি ব্যবহার করে আসছে। আজ স্বচক্ষে দেখতে পেয়ে ভালো লাগছে।
সে তাকায় শুকনো মুখপানে। কিছুদিন হলো মানুষটাকে দেখলে ভয় লাগে না, রাগ হয় না। সে ক্ষীণ স্বরে শুধাল,
–“হসপিটালের প্রতিদিনের বিল কত আসে?”
এরোজ হাতের ব্যাগ থেকে স্ট্রবেরি, ব্লুবেরি, চেরিগুলো গুছিয়ে রেখে চেয়ার টেনে বসল। শান্ত দৃষ্টি ফেলে বলল,
–”এগুলো আপনার জানা প্রয়োজনীয় নয়।”
–“প্রয়োজনীয়। নার্স বলেছে, আমাকে নাকি হসটিটালের সবচেয়ে ভি আই পি চিকিৎসা সেবা দেয়া হয়। যার প্রতিদিন বিল আসে প্রায় তিন লাখ টাকা। তারমানে চারদিনে বারো লক্ষ টাকা! এই টাকাগুলো আসে কোত্থেকে?”
–“আপনার বাবা দেয়।”
মৌনতা হতবাক হয়ে গেল। আশ্চর্য হয়ে বলল,
–“মজা করছেন আমার সাথে? আব্বু এত টাকা কোথায় পাবে?”
এরোজ মৃদু হেসে বলল,
–“বাবারা তার সন্তানের জন্য সব পারে।”
মৌনতার বিশ্বাস হলো না। অবিশ্বাসের দোলাচল নিয়ে চুপ করে রইল।
এরোজ চেরির বক্স খুলতে খুলতে বলল,
–“চেরি খাবেন!”
–“উঁহু।”
–“ব্লু বেরি?”
–“উঁহু।”
–“স্ট্রবেরি?”
–“উঁহু।”
–“এগুলো আপনার পছন্দের।”
এরোজের কথায় সরব মৌনতা কপাল কুঁচকে তাকায়। শুধায়,
–“আপনি কি করে জানলেন?”
–“আপনার মা বলেছে।”
–“ওহ্, হুম। কিন্তু এখন খেতে ইচ্ছে করছে না।”
–“কি খেতে ইচ্ছে করছে?”
–“কিছুনা, নায়েলের কাছে যাব।”, মৌনতা ছলছল চোখে বলল। এরোজের দেহাবয়ব ম্লান হয়ে আসল। মলিন মুখে বলল,
–“আগামীকাল থেকে আপনার চিকিৎসা শুরু হবে। এটা এক সপ্তাহ চলবে। এরপর কিছুদিনের জন্য ছুটি পাবেন।”
–“তার আগে দেখা করতে পারব না?”
–“উহুঁ!”
মৌনতা চোখের পানি মুছে নিলো। দূর্বিসহ অপেক্ষা আরো এক সপ্তাহের। এরোজ চেরি ফলের বিচি বের করে তার মুখের সামনে ধরল। মৌনতা ফিরে তাকায় গুরুগম্ভীর মুখপানে।
এরোজ অতি শীতল দৃষ্টি দেখে আড়ষ্ট কণ্ঠে বলল,
–“পরে খাবো, রেখে দিন।”
তার কথা কথার জায়গায় থেকে গেল চেরিটা তার মুখে ঢুকিয়ে দিয়ে এরোজ গম্ভীর গলায় বলল,
–“বিকাল থেকে কিছু খাননি না-কি?”
মৌনতা হতবাক! আকস্মিকতা হজম করে মিহি স্বরে বলল,
–“খেয়েছি কিন্তু সব বমি করে ফেলে দিয়েছি। বাজে খাবার, কোনো স্বাদ নেই।”
–“আপনি অসুস্থ, আপনাকে তো বিরিয়ানি পোলাউ দেবে না।”
–“আমি তা চাইনি। কিন্তু মিনিমাম স্বাদযুক্ত খাবার তো দেবে।”
–“তাড়াতাড়ি সুস্থ হয়ে যান। সব খেতে পারবেন কিন্তু এখন কষ্ট হলেও এগুলো খেতে হবে।”
বলতে বলতেই আরো তিন চারটা চেরি মৌনতার মুখে ঢুকিয়ে দিল। জড়তা আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরে মৌনতাকে। এরোজ স্মিত হেসে তার জড়তা দেখে।
ভিজিটিং আওয়ার শেষ হয়ে গেল। আগামীকাল সকাল ব্যতীত আর দেখা হবে না। এরোজ ওভার কোর্ট হাতে নিয়ে ধীর কদমে নারীটির শিয়রে এসে দাঁড়াল।
প্রকম্পিত হাতটি নারীটির মাথায় রাখতেই হতবাক দৃষ্টিতে দৃষ্টি মিলে যায়। তবে নারীটির অবাক দৃষ্টিতে এরোজের মাঝে কোনো উদ্বেগ দেখা গেল না। বরং মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে দৃঢ় কণ্ঠে বলল,
অপরাহ্নে উপসংহার পর্ব ৪৮
–“Let’s fight again for the last time. If there is a moral compass in the heavens, we will definitely conclude in triumph.”
“চলুন, শেষ বারের মতো আরো একবার লড়াই করি। যদি আরশে কোনো নৈতিকতার কম্পাস থাকে তবে নিশ্চয়ই সমাপ্তিতে আমরা বিজয়ী হবো।”
মৌনতা ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইল। ঘোর গ্রস্থ হয়ে বলল,
–“লড়াইটা আমার একার।”
–“কিন্তু বিজয়টা আমার।”, এরোজ ক্ষীণ স্বরে বলল।
