Home কার্নিশে আলতা মাখানো কার্নিশে আলতা মাখানো পর্ব ১৫

কার্নিশে আলতা মাখানো পর্ব ১৫

কার্নিশে আলতা মাখানো পর্ব ১৫
তন্ময়ী তিতিক্ষা

বিশাল মাঠে হাঁটু চেপে বসে আছে ষোঁড়শী আর্শি। তার ঠিক সামনেই দাঁড়িয়ে আছে ছেলেমেয়ের একটা দল। যারা ঘিরে ধরেছে আর্শিকে। তাদের মাঝেই বসেই ভীতু চোখে তাকিয়ে আছে আর্শি। মুখটা শুকিয়ে একদম কাঠ। চোখেও অশ্রু টলমল করছে। হাঁটু ছুলে গিয়ে একাকার অবস্থা। কিন্তু সামনে থাকা ছেলেমেয়ে গুলো জন্য কোথাও যেতে পারছে না। এরা আর কেউ না তারই ক্লাসমেট। তাদের মাঝে উঁচু লম্বা নিহাল হুট করে বলে উঠল,

“কিরে কাঁদুনি আর্শি? উঠতে পারছিস না? ব্যথা পেয়েছিস? আহারে…”
নিহালের কথার সাথে সাথে চারপাশে হাসির রোল পড়ে গেল।আর্শির বুকটা ধকধক করছে। অপমানের ভারে যেন শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে তার। এবার পাশ থেকে আরেকটি মেয়ে বলে উঠল,
“দেখ দেখ আবার কাঁদছে।”
“এই জন্যই তো নাম কাঁদুনি।”

হাসির শব্দগুলো যেন আর্শির কর্ণে ধারালো কিছু হয়ে বিঁধছে। আর্শি ঠোঁট কামড়ে ধরে কান্না আটকানোর চেষ্টা করল। কিন্তু পারল না। অশ্রু গড়িয়ে পড়ল সহসা। এদের কাজই যেন আর্শিকে সবসময় উত্যক্ত করা। সে কিছু বলতেও পারে না। সেই সাহস তো তার নেই। মাথা নিচু করে অশ্রু বিসর্জন দিতে থাকল আর্শি। এবার সুইটি নামের মেয়েটি তার পাশে বসে পড়ল। হাতের একটা পানির বোতল। হুট করে হাঁটুতে দেওয়ার নাম করে তা আর্শির গায়ে ঢেলে দিলো। পরক্ষণেই অসহায় দৃষ্টি নিক্ষেপ করল যেন ইচ্ছে করে কিছুই করেনি। পানি ছড়িয়ে গেল আর্শির সাদা স্কুল ইউনিফর্ম জুঁড়ে। কয়েক সেকেন্ডের জন্য কিছুই বুঝে উঠতে পারল না আর্শি। যখন বুঝতে পারল অতিশয় বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গেলো আর্শি। শরীরটা যেন হিম হয়ে গেল। গাল লাল হয়ে উঠল লজ্জা আর অপমানে। শরীরটা কুঁকড়ে গেল। তড়িঘড়ি করে স্কার্ফ দিয়ে শরীর ঢাকার চেষ্টা চালালো। কিন্তু তাতেও কোনো কাজ হলো না। লজ্জায় এবার ডুকরে উঠল আর্শি। হাঁটুর ব্যথায় চেষ্টা করেও উঠতে পারল না।

“সরি রে,হাত ফসকে পড়ে গেল।”
সুইটি মুখের অভিব্যক্তি যেন আর্শির জন্য খারাপ লাগছে। কিন্তু ঠোঁটের কোণে চাপা হাসিটা লুকাতে পারল না। আর্শির নিজেকে প্রচন্ড অসহায় অনুভব হচ্ছে। মাটির ভেতর ঢুকে যেতে পারলে বাঁচত। আকস্মিক দু’টো পায়ের অস্বস্তি দেখে চক্ষুদ্বয় উঁচু করে চাইল আর্শি। আযরান দাঁড়িয়ে। স্কুলের ইউনিফর্মে ভ্রুঁ কুঁচকে তাকিয়ে আছে তারই দিকে। আর্শির চোখ অশ্রুতে টলমল করছে। সে ঠিক জানে এখনই তাকে অপমান করবে এই আযরান। ছেলেটা কেন তাকে সহ্য করতে পারেনা সে জানে না। হুট করে কি মনে করে নিজের পরনের শার্টটা খুলে ফেলল আযরান। তা ছুঁড়ে মারল আর্শির মুখের ওপর। কিছু সেকেন্ড ব্যয় করে ফিরে চাইল সুইটির পানে। কিছুটা গম্ভীর কন্ঠে বলে উঠল,
“অন্য যা কিছু করবি বাট এইসব পানি ছোড়াছুড়ি যেন আর না দেখি।”
আর্শি হতবাক হয়ে তাকিয়ে রইল কয়েক সেকেন্ড। তারপর কাঁপতে থাকা হাতে শার্টটা জড়িয়ে নিল নিজের গায়ে। চারপাশে দাঁড়িয়ে থাকা সবাই একদম চুপ। সুইটি কপাল কুঁচকে ভেংচি কাটল। প্রতিউত্তরে বলল,

“যা করেছি বেশ করেছি।”
“আচ্ছা?”
আযরান ভ্রুঁ উঁচাল। পরক্ষণেই মুচকি হাসি দিয়ে নিহালের উদ্দেশ্যে বলে উঠল,
“বোতলটায় করে পানি নিয়ে আয় নিহাল। সুইটি কাজটা আরেকবার রিপিট করুক।”
আযরানের কথাটা কানে যেতেই আর্শির বুকটা ধক করে উঠল। হাতের মুঠোয় ধরা শার্টটা আরও শক্ত করে চেপে ধরল। এবার বুঝি আবার অপমানিত হতে হবে তাকে সবার সামনে। নিঃশ্বাসটাও যেন আটকে এলো। বিষন্নতায় ছেঁয়ে গেল পুরো মুখশ্রী। অন্যদিকে সুইটির ঠোঁটের কোণে একরাশ বিজয়ী হাসি ফুটে উঠল। চোখে স্পষ্ট আনন্দ। সে সুযোগ পেয়ে গেছে আবারও আর্শিকে হেয় করার। খুশিতে আত্মহারা হয়ে বলে উঠল,
“এই তো, ঠিক কথা! আরেকবার হলে মজা হবে।”
দৌড়ে গিয়ে বোতল ভর্তি পানি নিয়ে এলো নিহাল। বোতলটা বাড়িয়ে দিল আযরানের দিকে। আযরানের চক্ষুদ্বয় এসে থামল আর্শির পানে। অশ্রুতে টলমল চক্ষুদ্বয় মেলে অসহায় দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে আর্শি। আযরানকে নিজের দিকে ফিরতে দেখে মিনতির স্বরে বলে উঠল,

“আযরান প্লিজ।”
আযরানের নেত্রপল্লব অদ্ভুতভাবে স্থির। চোখের মনি স্থবির,শান্ত। সর্বোপরি আর্শির দিকেই সীমাবদ্ধ। আর্শির চোখ যখন জলে টুইটুম্বুর ঠিক তখনই এক ঝটকায় পুরো বোতলের পানি ছুঁড়ে মারল আযরান। সাথে সাথে চক্ষুদ্বয় খিঁচে বন্ধ করে ফেলল আর্শি। কিন্তু কোনোরকম অনুভূতি না পেয়ে ধীরে ধীরে চক্ষুদ্বয় মেলে চাইল। আযরান ঠিক তারদিকেই তাকিয়ে। পানি ছুঁরেছে ঠিকই কিন্তু আর্শির দিকে নয়। বরং সুইটির ওপর।
“এইটা কি করলি আযরান? এই মেয়ের জন্য তুই আমার গায়ে পানি মারলি? এই তোর বন্ধুত্ব?”
চিৎকার করে উঠল সুইটি। ভিজে একাকার হয়ে গেল মুহূর্তেই। চুল, ইউনিফর্ম সব পানি দিয়ে চুপচুপে তার। নিহালসহ বাকি সকল বন্ধু অবাক হলো। অবাক হলো আর্শি নিজেও। সে নিজেই যেন বিশ্বাস করতে পারছে না কি হলো এখন।

আযরান বোতলটা ফেলে দিল মাটিতে। চোখ তুলে তাকাল সুইটির পানে। শান্ত স্বরে বলে উঠল,
“রিপিট করতে বলেছিলাম..তাই করলাম। কেমন লাগলো?”
কথাটুকু বলেই আর্শির পানে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকাল আযরান। মুহুর্তে ঘাবড়ে গেল মেয়েটা। ভয়মিশ্রিত চোখে তাকাতেই সামনে থাকা ছেলেটা ভ্রুঁ কুঁচকাল। আকস্মিক তীক্ষ্ণ গলায় ধমকে বলে উঠল,
“উঠ, এভাবে মরার মতো ভেজা শরীর নিয়ে বসে আছিস কেন বেয়াদব।”
হকচকিয়ে চক্ষুদ্বয় মেলে চাইল আর্শি। আশেপাশে নজর দিয়ে বুঝতে পারল না কোথায় আছে। চোখ দু’টো একবার হাতের সাহায্যে ঘষে নিল। এটা তো একটা পার্ক। এতক্ষণ সে ঘুমাচ্ছিলো তাহলে? একটা ছোট্ট নিঃশ্বাস ফেলতেই হুট করেই আযরানের কথা মনে পরে গেল। সাথে সাথে ঘাড় ঘুরিয়ে পাশে তাকাল আর্শি। মুহুর্তে ধ্বক করে উঠল আর্শির মন। আযরান তার দিকেই তাকিয়ে। ক্লান্ত চক্ষুদ্বয় ঘুমে নিভু নিভু। আর্শির কি হলো কে জানে হুট করে কাঁপুনি ধরল শরীরে। এতক্ষণ দেখা স্বপ্নের কথা মাথায় ঘুরপাক খেল। এটা তাদের ছোটবেলারই একটা ঘটনা। এমন কত অহরহ ঘটনা ঘটেছে তার হিসাব ছাড়া। তাকে দেখতে না পারা আযরানই কিনা তারই স্বামী? কি অদ্ভুত! ঝটপট সরে বসল আর্শি। এতক্ষণ হয়তো আযরানের কাঁধে মাথা রেখেই ঘুমিয়ে ছিল সে। নিজের ধূসর চক্ষুদ্বয় আর্শির পানে মেলে দিয়ে আযরান বলে উঠল,

“ঘুম হলো?”
এইটুকু প্রশ্নই যেন হৃদয়ে কড়া নাড়ল আর্শির। বাড়ি থেকে বেরিয়ে এসে এখানেই বসেছিল তারা। কখন যে তার চোখ লেগে গেছে খেয়াল করেনি। আযরানের প্রশ্নের জবাবে কি বলবে ভেবে পেল না। শুধু অল্প করে মাথা নেড়ে সাঁই জানালো। আযরান আড়মোড়া ভেঙে উঠে দাঁড়াল। আশেপাশে নজর ঘুরাতেই দেখতে পেল হাতে গোনা কয়েকজন মানুষকে। বেশ সকাল হয়েছে। পুনরায় আর্শির দিকে তাকাতেই দৃষ্টি স্থির হয়ে গেল সেদিকে। আর্শির পরনে কালকের শাড়িটা। যেটা পরেই তাদের নিয়ে হয়েছে। মাথার চুলগুলো কিছুটা এলোমেলো হয়ে আছে। আযরান হুট করে এগিয়ে এলো। একহাতে আর্শির চুলগুলো গুছিয়ে দিয়ে ঘোমটা টেনে দিলো মাথায়। পরক্ষণেই আর্শির হাত আকঁড়ে ধরে বলল,
“চল নাস্তা করে তোকে হোস্টেল ছেড়ে আসবো।”
আর্শি থমকে গেল। হাতটা এখনো আযরানের মুঠোয় ধরা। সেই স্পর্শে কেমন অদ্ভুত কাঁপুনি ছড়িয়ে পড়ছে শরীরজুড়ে। অথচ এই ছেলেটাই ছোটবেলায় তাকে কাঁদিয়ে ছেড়েছে বহুবার। কতবার অপমান করেছে, ধমক দিয়েছে। আর্শি আস্তে করে হাত ছাড়ানোর চেষ্টা করতেই আযরান ভ্রুঁ কুঁচকে তাকাল।
“এইভাবে টানাটানি করছিস কেন? পালানোর প্ল্যান আছে নাকি?”
“হাত ছাড়! আমি একাই যেতে পারি।”
“চুপচাপ চল এভাবে চল। নাহলে কোলে করে নিয়ে যাবো এখন।”
থতমত খেয়ে গেল আর্শি। আর কোনো কথা বাড়ালো না। চুপচাপ সেভাবেই আযরানের পিছু পিছু চলতে লাগলো।

রৌদ্রময় উতপ্ত দুপুর। সূর্যের আলোটা আজ যেন একটু বেশিই তীক্ষ্ণচোখ ঝলসে দেওয়ার মতো উজ্জ্বলতা নিয়ে ছড়িয়ে পড়েছে চারদিকে। হোস্টেলের গেট থেকে বেরিয়ে এল আর্শি।
আজ তার পরনে হালকা রঙের একটা সালোয়ার-কামিজ। চুলগুলো খোঁপা করে বাঁধা। চোখের নিচে হালকা ক্লান্তির ছাপ।গত রাতের অদ্ভুত ঘটনা আর স্বপ্নের রেশ এখনো কাটেনি পুরোপুরি। রাস্তায় খুব একটা ভিড় নেই কিন্তু পুরোপুরি ফাঁকাও নয়। কিছু রিকশা, কিছু পথচারী সব মিলিয়ে একটা স্বাভাবিক পরিবেশ বলা চলে। আর্শি নিজের ওড়নাটা একটু ঠিক করে নিল। মনে বারবার ঘুরে আসছে একটা মুখ আযরান।
ছেলেটার আচরণটা সে আজও বুঝতে পারে না। সকালে তাকে হোস্টেল পৌছে দিয়ে কোথায় গেছে কে জানে। বলেছে কোনো একটা ব্যবস্থা করে ফিরবে। কিন্তু কি ব্যবস্থা করবে আযরান? তার জন্য বাড়ি ছেড়ে দেওয়া কি খুব দরকার ছিল? একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো নাসারন্ধ্র গলিয়ে।
“মানুষ এতটা বদলায় কিভাবে?”

নিজের মনেই প্রশ্ন করল আর্শি। কিন্তু উত্তর পেল না। কিছুক্ষণ পর একটা গলির ভেতরে ঢুকল। এই পথটা আর্শির চেনা।প্রতিদিনই এই পথ দিয়েই টিউশনিতে যায়। একটা দু’তলা বাড়ির সামনে এসে আর্শির পদচারণ থেমে গেল। লোহার গেটটা হালকা খোলা। ভেতরে ঢুকে কলিং বেল চাপতেই কিছুক্ষণ নীরবতা। তারপরই দরজাটা খুলে গেল। দরজার ওপাশে দাঁড়িয়ে স্টুডেন্টের পা। আর্শি উনাকে দেখেই সালাম দিল। মহিলাটি সালামের জবাব দিয়ে মুখ ঘুরিয়ে চলে যেতে গিয়ে আবার কি মনে করে ফিরে চাইল। গমগমে কন্ঠে বলে উঠল,
“যাওয়ার সময় আমার সাথে একটু দেখা করে যেয়ো।”

আর্শি মাথা নেড়ে শুধু আচ্ছা উচ্চারণ করল। সাথে সাথে মুখ ঘুরিয়ে চলে গেল। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল আর্শি। আর কত দীর্ঘশ্বাস ফেলতে হবে তার ইয়াত্তা নেই। রিদমের আম্মুর তার সাথে সবসময় কেমন যেন রুক্ষ। শুধু পেটের দায়ে টিউশনিটা হাতছাড়া করতে চায় না। নাহলে কবেই ছেড়ে দিতো আর্শির।
পড়ানো শেষ করে সবে বেরিয়েছে আর্শি। চক্ষুবেয়ে অনবরত গড়িয়ে পড়ছে অশ্রুকণা দু’পা এগিয়েই থেমে গেল সে। বুকের ভেতরটা কেমন চাপচাপ ব্যথা করছে। রাস্তার একপাশে দাঁড়িয়ে, দু’হাত দিয়ে মুখ ঢেকে ডুকরে উঠল আর্শি,
“আমার সাথেই কেন সবসময় এমন হয় আল্লাহ?”

কার্নিশে আলতা মাখানো পর্ব ১৪

কণ্ঠটা কেঁপে উঠল। কথাগুলো যেন বুকের ভেতর জমে থাকা হাজারটা কষ্ট ছিঁড়ে বেরিয়ে আসছে। ফুঁপাতে ফুঁপাতেই হুট করে কাঁধে কারো স্পর্শ পেয়ে চমকে উঠল আর্শি। অশ্রুসিক্ত নেত্রপল্লব ঘুরিয়ে তাকাতেই সামনে থাকা মানুষটাকে দেখে বেশ অবাক হলো। এইখানে এখানে কি করছে এই মানুষটা?

কার্নিশে আলতা মাখানো পর্ব ১৬