Home কার্নিশে আলতা মাখানো কার্নিশে আলতা মাখানো পর্ব ১৪

কার্নিশে আলতা মাখানো পর্ব ১৪

কার্নিশে আলতা মাখানো পর্ব ১৪
তন্ময়ী তিতিক্ষা

শীতলতা বোধহয় প্রেমময় চুক্তিতে আবদ্ধ হয়েছে প্রকৃতির সাথে। প্রকৃতির ওপর তার প্রেমময় গভীরতা বাঁড়িয়ে চলছে তো চলছেই। রাত্রির এই শীতলতা আর্শির মনে যেন প্রশান্তি এনে দিচ্ছে। গাড়িতে বসে জানালা গলিয়ে আসা স্নিগ্ধ হাওয়া ছুঁয়ে যাচ্ছে তাকে। সময় ঠিক কয়টা আর্শির জানা নেই। তবে মধ্যরাতের প্রহর চলছে। এই রাতেই আযরান কোথায় গেল আর্শির জানা নেই। আর না সে জানতে চায়। আকস্মিক ছোটমার কথা মাথায় আসতেই ঢোক গিলল সে। এতকিছুর মাঝে মাথা থেকেই বেরিয়ে গিয়েছে। বিয়ে তো হলো ঠিকই কিন্তু মানুষটা তো বদলে গেল। কথাটা ভেবেই অভ্যন্তর থেকে একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো আর্শির। কিছুক্ষণ বাহিরে আনমনে তাকিয়ে থেকে গাড়ির জানালায় মাথা ঠেকিয়ে চোখ বুঝলো সে। মনে এসে হানা দিলো কতশত ভাবনারা৷ আযরানের সাথে আগে অস্বস্তি না হলেও বর্তমানে আযরানের সাথে তার বড্ড অস্বস্তি হচ্ছে। সে কি করে মানবে আযরানকে স্বামীরূপে? আযরানের জায়গায় তো নোমান থাকার কথা ছিল। নোমানের কথা মাথায় আসতেই চক্ষুকার্নিশ বেয়ে একফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ল। আনমনে বিরবির করল,

“এমনটা না করলে কি খুব ক্ষতি হতো নোমান? ভালোবাসার মানুষকে কি কখনো ঘৃণা করা যায়? আমি কি করে তোমাকে ঘৃণা করবো?”
নিজের নরম হাতের ভাঁজে শক্ত একটা হাতের অনুভব করল আর্শি। ধরাস করে উঠল হৃদপিন্ড। পাশ ফিরে তাকাতেই ক্ষীণ সময়ের জন্য থেমে গেল হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া। আযরান বসে আছে অতি নিকটে। একদম কাছে। ল্যাম্পপোস্টের জ্বলন্ত ছটা হালকাভাবে বিচরণ করছে আযরানের চেহেরায়। আকস্মিক আযরানের ঘনিষ্ঠ স্পর্শে কেঁপে উঠল আর্শি। হাতদু’টো ছুটিয়ে আনার চেষ্টা করল। কিন্তু পেরে উঠল না আযরানের শক্তির সাথে। হাতের বাঁধন দৃঢ় করল আযরান। প্রগাঢ় দৃষ্টি নিক্ষেপ করল আর্শির পানে।
আর্শি থমকালো। কিছু সেকেন্ড অপলক, অনিমেষ চেয়ে রইলো সামনে থাকা মানুষটার পানে। আযরান শক্ত করে চেপে ধরল আর্শির হাত। কন্ঠে তেজ ঢেলে বলে উঠল,
“আমার বউ কোনো পরপুরুষের জন্য চোখের পানি নষ্ট করবে এটা কিন্তু আমি একদমই মেনে নিবো না। তুই কাঁদবি..তবে সেটা কেবল আমার জন্য। আমি ভালোবাসলে অতি সুখে কাঁদবি অথবা আমার দেওয়া আঘাতে কাঁদবি। এছাড়া তোর কাঁদা নিষেধ।”

আর্শির বুকের ভেতরটা ধড়ফড় করে উঠল। চোখ দুটো রাগে লাল হয়ে উঠেছে। আযরানের কথাগুলো যেন তার ভেতরের সব সংযম ভেঙে দিল। হঠাৎই ঝটকা মেরে হাত ছাড়িয়ে নিল সে। রাগে কাঁপতে থাকা কন্ঠে বলে উঠল,
“কি ভাবিস নিজেকে? আমি কোনো পুতুল না, যাকে তুই ইচ্ছে মতো হাসাবি, কাঁদাবি। আমি কাঁদবো কার জন্য, সেটা তুই ঠিক করে দিবি? এই অধিকার কে দিয়েছে তোকে?”
আর্শির চোখে জমে থাকা জল এবার রাগের উত্তাপে ঝিলিক দিয়ে উঠল। তৎক্ষনাৎ মুখ ঘুরিয়ে নিল। আর এক মুহূর্তও আযরানের দিকে তাকাতে চায় না সে। আযরান কিছুক্ষণ নিশ্চুপ হয়ে তাকিয়ে রইল তার পানে। চক্ষুদ্বয়ে সেই একই তীক্ষ্ণতা। হঠাৎই কাছে ঝুঁকল আযরান। আর্শি কিছু বুঝে উঠার পূর্বেই ওষ্ঠযুগল ছুঁয়ে দিল আর্শির গালে। গভীর এক চুম্বন এঁকে দিয়ে কিছুটা সরে এলো। আর্শি পুরোপুরি স্তব্ধ। নেত্রপল্লব বড় বড় করে তাকালো আযরানের দিকে। আযরান ঠিক বুঝলো আর্শির আশ্চর্যতা। কিন্তু মুখভঙ্গি একদম ভাবলেশহীন যেন কিছুই হয়নি। এমন অপ্রস্তুত, অপ্রত্যাশিত কিছু আর্শি কল্পনাও করেনি। আযরান এবার ফিসফিস করে বলে উঠল,
“রাগ করে থাক তাতে সমস্যা নেই। কিন্তু মনে রাখিস তুই শুধু আমার।”
কথাটা বলেই পুনরায় ওষ্ঠযুগল ছোঁয়ালো। ঠিক তখনই দু্’জনের শ্রবণশক্তি প্রবেশ করল,
“হ্যালো! ভিতরে কি কেউ আছেন? কাদের জানি দেখা যায়।
ওমা আযরান ব্রো দেখি। কি আকাম করছিস ভাই? দিলি তো সিঙ্গেলদের বুকে আগুন জ্বালিয়ে। এই পবিত্র রাতে অপবিত্র কাজ করছিস। ছি..ছি! এইসব ভালো না। পাপ কাজ ছেড়ে ধর্মের পথে আয় বৎস।”
মুহূর্তেই হকচকিয়ে গেল আর্শি। তড়িঘড়ি করে সরে বসলো। গাল দুটো রক্তিম আকার ধারণ করেছে ততক্ষণে। চোখে মুখে অপ্রস্তুত ভাব। অপরদিকে আযরান কিন্তু বিচলিত হলো না। বরং ভ্রু দুটো কুঁচকে গেল । বিরক্তি স্পষ্ট চোখে মুখে। এবার মাথা ঘুরিয়ে তাকাল জানালার দিকে।

ল্যাম্পপোস্টের আলোয় দেখা গেল, গাড়ির কাঁচের পাশে কৌতূহলী ভঙ্গিতে উঁকি দেওয়া মিহিরকে। মুখে দুষ্টু হাসি বিদ্যমান। আযরান বেশ বুঝতে পারবো মিহিরের মনোভাব। তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকালো জানালার কাঁচের ওপাড়ে থাকা মিহিরের দিকে। মিহির ভ্রুঁ নাচালো। বলে উঠল,
“ব্রো, ডিস্টার্ব করলাম নাকি? কিন্তু কি করব বল, এত রোমান্টিক সিন লাইভে মিস করতে মন চাইল না। কিন্তু ভাই তোকে আনরোমান্টিক খাটাস ভাবতাম। তুই তো দেখি ফাঁটিয়ে দিচ্ছিস।”
আযরান বিরক্ত হলো। ধীরে ধীরে দরজার লক খুলতে খুলতে গম্ভীর স্বরে বলে উঠল,
“মিহির তুই যদি আর এক সেকেন্ডও এখানে দাঁড়িয়ে থাকিস, তাহলে তোর লাইভ শোটা একদম অ্যাকশন মুভিতে কনভার্ট হয়ে যাবে বেয়াদব।”

মিহির বোকার মতো দাঁড়িয়ে রইল। ঠোঁটের কোণে বেখাপ্পা হাসি ঝুলছে। যেন পরিস্থিতিটা পুরোপুরি বুঝেও না বোঝার ভান করছে। গাড়ির কাছে হালকা হাতে টোকা দিয়ে মিহির বলে উঠল,
“আচ্ছা আচ্ছা..যাচ্ছি যাচ্ছি।”
কথাটুকু বলে ঠাঁই দাঁড়িয়ে রইল মিহির। একচুলও সরল না।
ঠিক তখনই হুট করে কারো শক্ত হাত এসে মিহিরের চুল মুঠো করে ধরে টান দিল।
“আআআআরে মা গো!”
চিৎকার করে লাফিয়ে উঠল ছেলেটা। ব্যথায় চোখ-মুখ কুঁচকে গেল। তড়িঘড়ি করে পিছনে ফিরে তাকাতেই সামনে নজরে এলো নীলাকে। নিমিষেই তার বুকটা ধক করে উঠল। নীলা কটমট করে তাকিয়ে আছে। চোখ দুটো লালচে, মুখভঙ্গি এমন এখনই টান দিয়ে মিহিরের মাথার চামড়া তুলে ফেলবে। মিহির একটা ঢোক গিলল। নীলার দিকে ভীতুর মতো তাকিয়ে বলে উঠল,

“ছাড় মেরি মা! খুব লাগছে।”
নীলা পুনরায় চুলগুলো টেনে ধরল শক্তহাতে। কটমট করে বলল,
“জাউড়া! তুই এখানে কি করছিস? ওদের শান্তিতে থাকতে দিবি না? সব জায়গায় ঢুকে পড়তে হয়?”
“না মানে আমি তো শুধু..”
“চুপ! চল এখান থেকে।”
মিহির কুঁকড়ে গেল একেবারে। হাত দিয়ে নিজের চুল ছাড়ানোর চেষ্টা করতে করতে মিনমিন করে বলল,
“আস্তে টান..টাক পড়ে যাবে আমার।”
নীলা আর কথা বাড়ালো না। একপ্রকার টেনেহিঁচড়ে মিহিরকে নিয়ে সেখান থেকে প্রস্থার করল। এতক্ষণে স্বস্থির নিশ্বাস ফেলল আর্শি। এই দু’টোর কর্মকান্ড দেখে তারা অভ্যস্ত। তাই খুব একটা অবাক হলো না। বড় একটা নিঃশ্বাস ফেলে নিজেকে শান্ত করল। পাশ ফিরে চাইতেই আযরানের সাথে চোখাচোখি হয়ে গেল। তৎক্ষনাৎ দৃষ্টি ফিরিয়ে নিল আর্শি। নিচু স্বরে বলে উঠল,

“আমাকে হোস্টেলে দিয়ে আয়।”
“উঁহু বাড়ি যাবি আমার সাথে। বউয়ের থেকে আলাদা থাকার মতো ধৈর্য আমার নেই।”
কথাটুকু বলেই গাড়ি স্টার্ট করল আযরান। আর্শির কপাল কুঁচকে গেল। চিন্তিত স্বরে বলল,
“কিন্তু! বাসায় জানলে ঝামেলা হবে আর আমি ঝামেলা চাইছি না আযরান। হোস্টেলেই চলে যাবো আমি।”
“আমি সামলে নিবো চুপচাপ বসে থাক।”

রাত্রি পেরিয়ে ভোর হতে চলল। অল্পসল্প পাখির কিচিরমিচির শোনা যাচ্ছে দূর হতে। ড্রয়িংরুমের সোফায় চিন্তিত হয়ে বসে আছেন সিতারা হায়দার। ছেলের চিন্তায় যেন ঘুম হারাম হয়ে গেছে। আযরান সারারাত ফিরেনি। পুরোরাত তিনি ছেলের অপেক্ষায় ড্রয়িংরুমে বসিয়েই কাটিয়েছেন। হুট করেই নীরবতা ভেঙে ট্রিং ট্রিং করে বেজে উঠল কলিংবেল।
সিতারা হায়দার চমকে উঠলেন। মুহূর্তেই আশার আলো ফুঁটে উঠল উনার মুখশ্রীতে। সিউর আযরান এসেছে। আর দেরি না করে তড়িঘড়ি করে দরজার দিকে ছুটে গেলেন তিনি। কাঁপতে থাকা হাতে দরজার লক খুললেন। দরজা খুলতেই সামনে দাঁড়িয়ে থাকা আযরানকে দেখে প্রথমে যেন স্বস্তির ঢেউ বয়ে গেল তার মধ্যে। কিন্তু সেই স্বস্তি বেশিক্ষণ স্থায়ী হলো না। মুখ গম্ভীর করে এক নিঃশ্বাসে বলতে শুরু করলেন,
“কোথায় ছিলি তুই সারারাত? ফোন অফ কেন? ঠিক আছিস তো? আমি যে কতবার কল করেছি একবারও ধরিসনি! তোর কি কোনো চিন্তা আছে? আমি যে সারারাত বসে ছিলাম…”

আযরান এগিয়ে এলো। একহাতে মাকে আগলে নিয়ে মাথায় আলতো করে চুমু খেল। মাকে আশ্বস্ত করে বলে উঠল,
“আম্মু শান্ত হও। আমি একদম ঠিক আছি। একটা কাজে আটকে ছিলাম। তাই ফোন অফ ছিল।”
সিতারা হায়দার থামলেন না বরং ছলছল করা চক্ষুদ্বয় নিক্ষেপ করে বলে উঠল,
“এইভাবে চলতে থাকলে কিন্তু আমি…”
আর বলতে দিল না আযরান। হঠাৎই পাশ ফিরে দাঁড়িয়ে শান্ত স্বরে বলে উঠল, “ভিতরে আয়।”
সিতারা থমকে গেলেন। কথাটা যেন ঠিক বুঝতে পারলেন না কাকে উদ্দেশ্য করে বলল। ভ্রু কুঁচকে তাকালেন আযরানের দিকে। এরপরই তার দৃষ্টি গেল আযরানের পেছনের দিকে,
দরজার ঠিক বাইরে। কিছুটা সংকোচে দাঁড়িয়ে আছে আর্শি। মাথায় ঘোমটা টানা, চোখে মুখে স্পষ্ট অস্বস্তি আর ক্লান্তির ছাপ। এক মুহূর্তে সিতারা হায়দারের নেত্রপল্লব বিস্ময়ে বড় হয়ে গেল। তড়িৎ গতিতে ছেলের পানে তাকিয়ে প্রশ্ন করল,

“আর্শি এখানে কি করে আব্বু? আর তোর সাথে কেন?”
“আর্শিকে আমি বিয়ে করেছি আম্মু।”
“কিহ?”
কথাটা যেন বজ্রপাতের মতো আঘাত করল সিতারা হায়দারের শ্রবণশক্তিতে। বিস্ময়কর দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল ছেলের দিকে।আযরানের দৃষ্টি তখনও শান্ত। ছেলের মুখের দিকে তাকিয়ে আঁতকে উঠলেন সিতারা। আযরানের দৃষ্টিই বলে দিচ্ছে মিথ্যা বলছে না। নিস্তব্ধের ন্যায় দাঁড়িয়ে রইলেন কিছুক্ষণ। হুট করে এগিয়ে গেল আর্শির নিকট। আর্শি পাথরের মূর্তি হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। হাত দুটো আঁচলের ভাঁজে শক্ত করে চেপে ধরেছে। সিতারা হায়দারকে এগিয়ে আসতে দেখে আরও কিছুটা ঘাবড়ালো আর্শি।
“আযরান কি বলছে এইসব আর্শি?”
সিতারা হায়দারের মুখশ্রী মুহূর্তেই বদলে গেল। যে মুখে এতক্ষণ চিন্তা আর মায়া ছিল। সেখানে এখন কঠোরতা। এইপ্রথম বড়মার কোনো কথার আর্শির ভয় হচ্ছে। তীব্র ভয়। উত্তর দেওয়ার মতো কথা খুঁজে পেল না। মাথা নিচু করে সেভাবেই দাঁড়িয়ে রইল সে। এই নীরবতাই যেন আগুনে ঘি ঢেলে দিল।আকস্মিক তীক্ষ্ণ শব্দ প্রতিধ্বনিত হলো। আর্শির মুখটা একপাশে হেলে পড়ল। কেঁপে উঠল বক্ষস্থল। কয়েক সেকেন্ড বুঝতেই পারল না কি হলো। গালটা জ্বালা করে উঠল নিমিষেই। নেত্রে জল চলে এলো সঙ্গে সঙ্গে। আযরানও চমকালো প্রচন্ডভাবে। তড়িৎবেগে আর্শিকে আগলে ধরল।

“আম্মু! ওর গায়ে কেন হাত তুলছো!”
আর্শির চোখ বেয়ে এবার নিঃশব্দে জল গড়িয়ে পড়ছে।
এই মানুষটাই একসময় তাকে বুকে টেনে নিয়েছিল। আজ সেই হাতেই চড় খেল সে। এইসব কিছু হচ্ছে আযরানের জন্য। সিতারা হায়দার ঘুরে তাকালেন আযরানের দিকে। কন্ঠে তেজ, অগ্নিঝড়া দৃষ্টি মেলে বলে উঠল,
“চুপ একদম চুপ আযরান। তুই আমাকে জিজ্ঞেস করছিস? এই মেয়ে তোর থেকে বড়। সম্পর্কের কোনো হিসাব রাখিসনি? মানুষ কি বলবে ভেবে দেখছিস একবার? আর..ওর মতো মোটা মেয়েকে তোর সাথে যায়? ওকে আমি কিছুতেই বউমা হিসেবে মেনে নিবো না।”
আযরানের চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল। দাঁত চেপে তাকিয়ে রইল মায়ের দিকে। অন্যদিকে আর্শি এখনও একইভাবে দাঁড়িয়ে মাথা নিচু করে। গালে লালচে ছাপ স্পষ্ট। মমতার সেই পরিচিত আশ্রয়টা যেন এক মুহূর্তেই ভেঙে চুরমার হয়ে গেল সিতারা হায়দারের কথায়। বড়মাও সবার মতো তাকে কক্ষাট করবে সে কখনো ভাবতেই পারেনি। না চাইলেও অশ্রু অঝরে গড়িয়ে পরতে লাগল চক্ষু বেয়ে।

আযরানের চোয়াল শক্ত হয়ে আছে। বুকের ভেতরে যেন আগুন জ্বলছে। আর সেই আগুনের কেন্দ্রবিন্দুতে দাঁড়িয়ে আছে তার নিজেরই মা। আর্শির কাঁপতে থাকা শরীরটা নিজের কাছে টেনে নিল আযরান। একহাতে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল যেন আর্শিকে পৃথিবীর সব আঘাত থেকে আড়াল করে রাখতে চাইছে। এবার শান্তস্বরে বলে উঠল,
“আপনি ওকে অপমান করলেন, সেটা আমি সহ্য করলাম। কারণ আপনি আমার মা। কিন্তু..”
একটু থামল সে। দৃষ্টি সরাসরি মায়ের চোখে স্থির করল।
“আমার বউয়ের গায়ে হাত তুলেছেন।এটা আমি একদমই মেনে নিতে পারবো না।”
আযরানের মুখে আপনি সম্মোধন শুনে চমকালেন সিতারা হায়দার। তবুও রাগে ফুঁসে উঠে বললেন,
“তুই এখন আমাকে শিখাচ্ছিস? একটা বাইরের মেয়ের জন্য…”
“ও কোনো বাইরের মেয়ে না আম্মু। ও আমার বউ।”
আযরান এবার এক পা এগিয়ে এলো। গলার স্বর আরও দৃঢ় হয়ে উঠল,
“সম্মান না দিলে অন্তত অপমান করবেন না। বয়স, শরীর এইসব নিয়ে কথা বলার আগে একবার ভাবতেন..যাকে নিয়ে বলছেন, সে এখন এই বাড়ির বউ।”

“ওকে আমি এই বাড়ির বউ কখনোই মানবো না। ওকে বেরিয়ে যেতে বল।”
আর্শি মাথা নিচু করে নিরবে কেঁদে চলেছে। এবার সিতারা হায়দারের কথায় আযরানের হাত ছাড়ানোর চেষ্টা করল। আরও শক্ত করে হাতটা চেপে ধরল আযরান। সিতারা হায়দারকে উদ্দেশ্য করে বলে উঠল,

কার্নিশে আলতা মাখানো পর্ব ১৩

“ঠিক আছে।যে বাড়িতে আমার বউয়ের সম্মান নেই। সেই বাড়িতে আমার থাকার কোনো মানে হয় না।”
কথাগুলো বলার সময় আযরানের চক্ষে কোনোপ্রকার দ্বিধা ছিল না। একদম সোজা, দৃঢ় সিদ্ধান্ত। আর্শি স্তব্ধ। এতকিছুর মাঝেও তার বুকটা কেঁপে উঠল।এই মানুষটা সত্যিই তার জন্য দাঁড়িয়ে গেল? আযরান আর একবারও পেছনে তাকালো না। বরং আর্শির হাত টেনে উদ্দেশ্য করে বলে উঠল,
“চল।”

কার্নিশে আলতা মাখানো পর্ব ১৫