কিস অফ বিট্রেয়াল পর্ব ৫৪
লামিয়া রহমান মেঘলা
কয়েক মাস কেটে গেছে কক্সবাজারের সেই সমুদ্রঘেঁষা ভিলায়।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ভিলাটাও যেন নতুন এক ছন্দে অভ্যস্ত হয়ে উঠেছে। প্রতিটি সকাল শুরু হয় সমুদ্রের গর্জন, নোনাজলের গন্ধ আর হেমন্তের কোমল রোদের স্পর্শে। জানালার ফাঁক গলে সোনালি আলো এসে মেঝের ওপর আলপনার মতো ছড়িয়ে পড়ে। দূরে নীল সমুদ্রের ঢেউগুলো শান্ত ছন্দে তীরে আছড়ে পড়ে, যেন প্রকৃতি নিজেই ভালোবাসার কোনো অনন্ত গান গেয়ে চলেছে। বাতাসে হালকা শীতের আভাস, অথচ রোদের উষ্ণতা ঠিক ততটাই কোমল, যতটা কোমল দুটি মানুষের নীরব সংসারের সুখ।
সেরিন এখন সারাদিন সংসার সামলায়।
কায়ান কয়েকজন সার্ভেন্ট রেখেছে ঠিকই, কিন্তু ঘরের বেশিরভাগ কাজই সেরিন নিজের হাতে করতে ভালোবাসে। কায়ান অফিসে যাওয়ার সময় কোন পোশাকটি পরবে, তার জামা, জুতা, ব্যাগ, ঘড়ি, টাই কোথায় থাকবে, সবকিছুই সযত্নে গুছিয়ে রাখে সে। প্রতিটি কাজে যেন তার নিঃশব্দ ভালোবাসার ছোঁয়া লেগে থাকে।
প্রতিদিন খুব ভোরে ঘুম থেকে উঠে কায়ানের জন্য ব্রেকফাস্ট আর লাঞ্চ তৈরি করে দেয়। তারপর কায়ান অফিসে বেরিয়ে গেলে পুরো বাড়িটা যেন কিছুটা নির্জন হয়ে পড়ে।
তবে এমন নয় যে সে নিজের পড়াশোনা ছেড়ে দিয়েছে। অনেক পরিশ্রম আর স্বপ্নের বিনিময়ে সে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে সুযোগ পেয়েছে। কায়ান যতই রাগী হোক না কেন, কখনোই সেরিনের স্বাধীনতা কেড়ে নিতে পারেনি। আপাতত সে বাসা থেকেই নিজের পড়াশোনা চালিয়ে যাচ্ছে।
এরই মধ্যে কায়ান তাকে একটি ফোনও এনে দিয়েছে। এখন সেরিন শাশুড়িসহ পরিবারের সবার সঙ্গে নিয়মিত কথা বলে। ধীরে ধীরে নতুন সংসারটাকেই আপন করে নিয়েছে সে।
সকাল সকাল কায়ানকে অফিসে পাঠিয়ে দিয়ে সেরিন আবার ঘুমাতে এসেছে।
ভীষণ ঘুম পাচ্ছিল তার।
আজকের সকালটা যেন অন্যসব দিনের চেয়ে অনেক বেশি রৌদ্রোজ্জ্বল। হেমন্তের নির্মল আকাশে একটুকরো মেঘও নেই। জানালার বাইরে ঝলমলে রোদে সমুদ্রের জলরাশি রূপালি হয়ে উঠেছে। দূরের নারকেল গাছগুলো হালকা বাতাসে দুলছে। প্রকৃতি আজ যেন স্নিগ্ধতা আর প্রশান্তির সমস্ত রং মেলে ধরেছে।
দুপুর প্রায় বারোটার দিকে সেরিনের ঘুম ভাঙল।
ধীরে ধীরে উঠে বসে সে। রুমের এসি বন্ধ করে ফ্রেশ হতে চলে গেল।
ফ্রেশ হয়ে বাইরে বেরিয়ে দেখে সার্ভেন্টরা ইতোমধ্যেই পুরো ভিলা পরিষ্কার করে ফেলেছে।
নিজের লম্বা চুলগুলো ক্লিপে আটকে রান্নাঘরের দিকে যেতে যেতে সেরিন মিষ্টি হেসে বলল,
“আপনারা আজ খেয়ে যাবেন। আমি আজ আপনাদের জন্য রান্না করব।”
কথাটা শুনে সার্ভেন্টদের মুখ আনন্দে উজ্জ্বল হয়ে উঠল।
মাঝেমধ্যেই সেরিন তাদের জন্য রান্না করে। মেয়েটিকে তারা ভীষণ ভালোবাসে। তাই প্রতিদিন সকাল থেকেই মনোযোগ দিয়ে সব কাজ শেষ করে দেয়, যেন সেরিনকে কোনো কষ্ট করতে না হয়।
রান্নাঘরে গিয়ে সেরিন একে একে নানা রকম রান্নার প্রস্তুতি নিতে শুরু করল। অনেকগুলো পদ রান্না করতে হবে বলে একজন সার্ভেন্টও এসে তাকে সাহায্য করতে লাগল।
সব রান্না শেষ হতে হতে সেরিন ঘামে একেবারে ভিজে গেল।
তার পরনে সাদা টি শার্ট আর প্লাজো। কপাল বেয়ে ঘামের ফোঁটা গড়িয়ে পড়ছে। পরিশ্রমের ক্লান্তি থাকলেও মুখজুড়ে তৃপ্তির এক কোমল হাসি।
রুমে ফিরে টিস্যু দিয়ে মুখের ঘাম মুছে চুলে তেল দিতে বসল সে।
ঘামে ভেজা টি শার্ট শরীরের সঙ্গে লেগে আছে। সমুদ্রের দিকের দরজাটা খুলে রেখেছে সে। বাইরে থেকে ধেয়ে আসা শীতল নোনতা বাতাস মুহূর্তেই ঘরের আবহ বদলে দিচ্ছে। হেমন্তের সেই স্নিগ্ধ বাতাস আলতো করে তার এলোমেলো চুল ছুঁয়ে যাচ্ছে। কায়ান বা অন্য কেউ বাড়িতে নেই ভেবেই ওড়না ছাড়াই নিশ্চিন্তে বসেছিল সেরিন।
ধীরে ধীরে চুলে তেল মাখছিল সে।
ঠিক তখনই হঠাৎ নিজের কোমরে দুটি শক্ত হাতের স্পর্শ অনুভব করে কেঁপে উঠল সেরিন।
তার শরীরের কাঁপুনি টের পেয়ে কায়ান শান্ত স্বরে বলল,
“রিল্যাক্স। ইটস মি।”
সেরিন ধীরে ধীরে শান্ত হয়ে এল।
নরম কণ্ঠে বলল,
“আমার শরীরে ঘাম।”
কায়ান মৃদু হেসে তার ঘামে ভেজা ঘাড়ে আলতো করে ঠোঁট ছুঁইয়ে দিল।
তারপর নিচু স্বরে বলল,
“এই শরীর, এই মন, এই আত্মা, সবকিছুর ওপর অধিকার আমার। তোমার ঘ্রাণ যেমন আমার, তেমনি তোমার গায়ের প্রতিটি সুবাসও আমি আপন করে নেব।”
কায়ানের এই কথাগুলো সেরিনকে মুহূর্তেই দুর্বল করে দিল।
কায়ান আলতো করে তাকে নিজের দিকে ফিরিয়ে নিল। তাদের চোখ এক মুহূর্তের জন্য একে অপরের গভীরে হারিয়ে গেল।
সেরিন ধীরে ধীরে চোখ বন্ধ করে নিল।
নিঃশব্দ সেই বিকেলে, সমুদ্রের অবিরাম গর্জন আর হেমন্তের শীতল বাতাসকে সঙ্গী করে তারা দুজন একে অপরের খুব কাছাকাছি এসে রইল।
সেরিনের নিঃশ্বাস ধীরে ধীরে ভারী হয়ে উঠছিল। ঘামে চিকচিক করা মুখে জানালা দিয়ে আসা সোনালি আলো পড়তেই তাকে আরও অপরূপ লাগছিল।
কায়ান একদৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে রইল। চোখে গভীর ভালোবাসার আবেশ, ঠোঁটের কোণে নীরব হাসি।
মুহূর্তটা যেন থমকে দাঁড়িয়েছিল শুধু তাদের দুজনকে ঘিরেই।
দীর্ঘ প্রেমমুগ্ধ একসঙ্গে কাটানো সময়ের পর কায়ান আলতো করে সেরিনকে পাঁজাকোলে তুলে রুমে নিয়ে এলো।
সেরিন তখন বেশ ক্লান্ত। মুখজুড়ে প্রশান্তির কোমল ছাপ, চোখেমুখে অবসাদের মৃদু ছায়া।
কায়ান অত্যন্ত যত্ন করে তাকে বিছানায় শুইয়ে দিয়ে নরম কণ্ঠে বলল,
“খাবার আনছি। তুমি রেস্ট করো।”
সেরিন ধীরে ধীরে উঠে বসে মাথা নেড়ে বলল,
“না।”
কায়ান ভ্রু তুলে মৃদু বিস্ময়ে জিজ্ঞেস করল,
“কেন না?”
সেরিন শান্ত স্বরে বলল,
“আমি আজ সবার জন্য রান্না করেছি। ওনাদের খাবার দিতে পারবেন?”
কায়ান ঠোঁটের কোণে হাসি টেনে বলল,
“ডার্লিং, আমি ওনাদের কীভাবে খাবার দেব?”
সেরিন সঙ্গে সঙ্গে ঠোঁট উল্টে অভিমানী ভঙ্গিতে বলে উঠল,
“তাই তো। আপনি খুব পচা। আমাকে ভেঙে চুরে রেখে দেন।”
তার সেই শিশুসুলভ অভিমান আর সরল কিউটনেস দেখে কায়ান হেসে ফেলল। আলতো করে সেরিনের গালে ঠোঁট ছুঁইয়ে স্নেহভরা চুমু এঁকে দিয়ে বলল,
“আমিই সব গুছিয়ে দিচ্ছি।”
এরপর আবারও সেরিনকে কোলে তুলে ডাইনিং টেবিলের কাছে নিয়ে এলো সে।
এক এক করে সমস্ত খাবার নিজ হাতে সুন্দর করে টেবিলে সাজিয়ে দিল।
ভিলার সার্ভেন্টদের চোখেও কায়ান একজন সত্যিকারের ভদ্রলোক। তাদের কাছে সে যেন স্বপ্নের পুরুষ। নিজের স্ত্রীকে যে মানুষটি এতখানি ভালোবাসা, সম্মান আর যত্নে আগলে রাখে, তাকে শ্রদ্ধা না করে উপায় নেই।
হয়তো সেই যত্নের ছোঁয়াতেই দিন দিন আরও উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে সেরিন। তার গায়ের রঙ আগের তুলনায় আরও দীপ্তিময় হয়ে উঠেছে। হাসিতে লেগে থাকে এক অনির্বচনীয় আলো। মুখের প্রতিটি অভিব্যক্তিতে ফুটে ওঠে পরিতৃপ্তির শান্ত সৌন্দর্য।
কথায় আছে, নারীর রূপ ফুটে ওঠে তার প্রিয় মানুষের যত্নে।
সেরিন নিজ হাতে সবার প্লেটে খাবার তুলে দিল।
পরিবারের মতোই একসঙ্গে বসে সবাই দুপুরের খাবার শেষ করল। ভিলার চারপাশে তখনও হেমন্তের কোমল রোদ ছড়িয়ে আছে। সমুদ্রের দিক থেকে ভেসে আসা শীতল বাতাস আর মানুষের আন্তরিক হাসিমুখ মিলিয়ে সেই দুপুরটাকে আরও উষ্ণ, আরও আপন করে তুলেছিল।
সন্ধ্যা ঠিক সাতটা।
কক্সবাজারের আকাশে তখন গোধূলির শেষ রঙটুকুও ধীরে ধীরে মিলিয়ে যাচ্ছে। দূরে সমুদ্রের কালচে নীল জলরাশি ঢেউ তুলে তীরে আছড়ে পড়ছে। বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছে নোনাজলের গন্ধ, আর চারপাশে জ্বলে উঠেছে রেস্টুরেন্টের উষ্ণ হলুদ আলো।
সেরিন আর কায়ান আজ বাইরে এসেছে। সমুদ্রের ধারে একটি অভিজাত রেস্টুরেন্টে পাশাপাশি বসে কক্সবাজারের বিখ্যাত সি ফুড উপভোগ করছে দুজন।
ঠিক তখনই হঠাৎ সেরিনের ফোনে আহির ভিডিও কল ভেসে উঠল।
মুখে মৃদু হাসি ফুটিয়ে সেরিন কলটি রিসিভ করল। ড্রিংকসের গ্লাসের সঙ্গে ফোনটি হেলান দিয়ে দাঁড় করিয়ে রাখতেই স্ক্রিনে ভেসে উঠল আহির হাসিমাখা মুখ।
“হাই, সেরিন।”
সেরিনও হাত নেড়ে হাসিমুখে বলল,
“হাই আপু। কেমন আছো?”
“আলহামদুলিল্লাহ, ভালো। তুমি কেমন আছো?”
“আলহামদুলিল্লাহ।”
“কোথায় তুমি?”
“ঘুরতে এসেছিলাম বাইরে।”
আহি মুগ্ধ চোখে কিছুক্ষণ সেরিনের দিকে তাকিয়ে থেকে বলল,
“ওহো, সেরিন। তুমি দিন দিন কত সুন্দরী হয়ে যাচ্ছ।”
কথাটা শুনে সেরিনের ঠোঁটে লজ্জামাখা এক টুকরো হাসি ফুটে উঠল।
পাশ থেকে কায়ানও উঁকি দিল ফোনের স্ক্রিনে।
আহি হেসে বলল,
“ভাইয়া, কেমন আছিস?”
কায়ান স্বাভাবিক কণ্ঠে উত্তর দিল,
“খুব ভালো। তোর কী খবর? আম্মা বেগম?”
“সবাই ভালো, আলহামদুলিল্লাহ।”
আহি যখন কথা বলছিল, তখন শিমুলও তার পাশেই ছিল।
স্ক্রিনের ওপারে হাসিমুখে বসে থাকা সেরিনকে দেখে বুকের ভেতর অদ্ভুত এক হাহাকার অনুভব করল সে।
কায়ান সত্যিই সেরিনকে আগলে রেখেছে। সব কষ্ট থেকে আলাদা করে নিজের ভালোবাসা আর যত্নে ঢেকে রেখেছে। আর সে নিজেই একসময় নিজের হাতে নষ্ট করেছে সেই সম্পর্কের সম্ভাবনা।
ভাবতেই দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এল শিমুলের।
সেরিনের নির্মল হাসিটা যেন তার বুকের ভেতর নিঃশব্দ ব্যথা হয়ে বিঁধছে। বারবার মনে পড়ে যাচ্ছে নিজের করা ভুলগুলোর কথা। সেই অনুশোচনার সঙ্গে অজান্তেই মিশে যাচ্ছে সামান্য একটুখানি হিংসাও।
ঠিক তখনই আহি বলল,
“ভাইয়া, সেরিন, অনেক দিন তো হলো। এবার ফিরে আয়। কিছু দিন থেকে যা।”
কায়ান ভ্রু তুলে শান্ত গলায় বলল,
“কেন?”
কায়ানের এমন প্রশ্ন শুনে উপস্থিত সবাই খানিকটা অবাক হয়ে গেল।
সেরিনও বিস্মিত চোখে পিটপিট করে কায়ানের দিকে তাকিয়ে রইল।
কায়ান হেসে আবার বলল,
“আই মিন, কিছু হয়েছে?”
আহি হালকা লজ্জা মিশ্রিত কণ্ঠে বলল,
“না। আমি বিয়ে করব এবার। আয়, ছেলে দেখ ভাইয়া।”
কায়ানের ঠোঁটে মৃদু বাঁকা হাসি ফুটে উঠল।
“ছেলে তো তোর ঠিকই আছে। আমার পছন্দ। সমস্যা নেই। সমস্যা থাকলে তোর সম্পর্কই হতে দিতাম না।”
কথাটা শুনে আহির চোখ বিস্ময়ে বড় হয়ে গেল।
তার ভাই সব জানে?
সে যে প্রেম করে, সেটাই তো কোনো কাকপক্ষীও জানে না।
কায়ান রহস্যময় এক হাসি হেসে বোনের দিকে তাকিয়ে বলল,
“চিন্তা করিস না। কালই আসছি। আর শোন, আমি তোর ভাই। তোর প্রতিটা পদক্ষেপের ওপর আমার নজর থাকে। জেহান ভালো না হলে তোকে প্রেমই করতে দিতাম না।”
আহি আর কিছু বলার সুযোগ পেল না।
যে সম্পর্কটাকে এতদিন সে নিজের গোপন সত্য ভেবেছিল, সেটাই তার ভাইয়ের কাছে ছিল একেবারে স্বাভাবিক জানা একটি বিষয়।
নীরবে কল কেটে দিল আহি।
ফোনের স্ক্রিন নিভে যেতেই সেরিন বিস্ময়ভরা চোখে কায়ানের দিকে তাকিয়ে বলল,
কিস অফ বিট্রেয়াল পর্ব ৫৩
“আপনি কি গোয়েন্দা?”
কায়ান মৃদু হেসে আলতো করে সেরিনের কোমর জড়িয়ে নিল।
তারপর নিচু, স্থির কণ্ঠে বলল,
“উহু, শুধু নিজের যা কিছু, তার ওপরই আমার নজর থাকে। অন্য কিছুর ওপর আমার অধিকারও নেই, নজরও নেই।”
