Home ভুলভাল অন্তরাল ভুলভাল অন্তরাল পর্ব ২২

ভুলভাল অন্তরাল পর্ব ২২

ভুলভাল অন্তরাল পর্ব ২২
মুশফিকা রহমান মৈথি

মানুষ সৌন্দর্যের পূজারী। সেই সৌন্দর্য্য যদি হয় মায়াবী তবে তাতে হাটু ভাঙ্গা অসম্ভব কোনো বিষয় না। বিশেষ করে সেই নারী যদি হয় প্রীতির মতো মায়াবী সুন্দরী। ইতিহাস সাক্ষী, সুন্দরী নারীদের কোনো পুরুষ বন্ধুত্বের সীমাবদ্ধতায় রাখতে চায় না। কখনো না কখনো তাদের প্রতি আকৃষ্ট হয় এবং প্রেমিক হবার জন্য থাকে বদ্ধ পরিকর। তাদের প্রতি সহানুভূতি থাকে বেশি। কোনো পুরুষ বন্ধুর প্রতি তাদের এতোটা মমতা থাকে না যতটা নারীর বান্ধবীর প্রতি থাকে। নারীর যেকোনো অভিযোগ তাদের কাছে আদেশের রুপ নেয়। প্রেম তাদের চোখে ছলকায়। তাদের কাজে প্রেম উঁকি দেয়।

প্রীতির ক্ষেত্রে সেই প্রেম আরোও সুস্পষ্ট। মেয়েটি শুধু সুন্দরী নয়, সে অত্যন্ত কোমল, বিনয়ী, মায়াবী। তার চোখের দৃষ্টি যেকোনো পুরুষের হৃদয় কাঁড়বে। শুধু কাঁড়বে না, লোহার শেকলে বেঁধে রাখার ক্ষমতাও সেই দৃষ্টিতে আছে। এমনটাই হয়েছে এই বারোজনের সাথে। তারা বিমুগ্ধ হয়েছে প্রীতির মুখশ্রীর স্নিগ্ধতায়, মুগ্ধ হয়েছে তার কথায়, মুগ্ধ হয়েছে তার চলন ভঙ্গিমায়। তীব্র বাসনা জন্মেছে এই নারীকে প্রেমিকা কিংবা অর্ধাঙ্গিনীর রুপে নিজের জীবনে পাওয়ার। ফলে তার প্রতি গুরুত্ব ছিলো সর্বাধিক।
পুরুষের গুরুত্ব পৃথিবীর অষ্টম আশ্চর্য। সেই আশ্চর্যকে পায়ে ঠেলে দেওয়াটা নিশ্চয়ই বোকামি। প্রীতি তাই কাউকেই নিরাস করে নি। হ্যা, সে কারোর সাথে প্রেম করে নি বটে। তার প্রেমিক সর্বদা আফনান ই ছিলো। তবে সে এই প্রেমে গদগদ পুরুষদলকে উপেক্ষাও করে নি। মিষ্টি করে কথা বলেছে, হেসেছে, ঘুরতে গিয়েছে। নিজের যেকোনো প্রয়োজনে তাদেরকে একটা ফোন করলেই তারা ছুটে এসেছে। ঘুণাক্ষরেও তাদের বুঝতে দেয় নি তার প্রেমিক আছে। তাদের একটা ক্ষীণ আশা দিয়েছে,
“তোমরা চালিয়ে যাও। আমার মন গলবেই।”

ধরি মাছ, না ছুঁই পানি– লাইনটা এই নারীর ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। আর এই প্রেমে অন্ধ গাধা পুরুষেরা নিজের আপ্রাণ প্রচেষ্টা চালিয়ে গিয়েছে কখনো না কখনো প্রীতিকে তারা জয় করবে এই ভেবে। প্রীতি তাদের এটাও জানায় নি সে পালিয়ে বিয়ে করে ফেলেছে। প্রতিনিয়ত তাদের সাথে কথা বলেছে। এমনকি বিয়ের পরেও। তাদের থেকে উপহার নিয়েছে। “আমার মন ভালো নেই”– একটা কথাই যথেষ্ট ছিলো। আফনান এই বিষয়ে অজ্ঞাত। সে কেবল দুচোখ মুদে তার স্ত্রীকে ভালোবেসেছে। মনে মনে যথেষ্ট সন্তুষ্ট সে নিজের ভাগ্যের প্রতি। সে প্রীতির সাথে বেমানান অথচ মেয়েটি কখনোই তার শারীরিক সৌন্দর্যকে প্রাধান্য দেয় নি। এমন নারীকে মাথায় তুলে রাখা উচিত। তার মতো বলদ পুরুষকে সে ছাড়া কোন মেয়ে এতোটা ভালো বাসতো?
প্রীতি তার এই ছলনা হয়তো চিরটাকাল চালিয়ে যেত। এটা ইচ্ছাকৃত নয়। তাকে যখন কেউ প্রশংসা করে, গুরুত্ব দেয়, আহ্লাদ করে– তার ভালো লাগে। তার ধারণা এটা তার প্রাপ্য। বাবা কখনো তাকে এতোটা আদর করে নি। ধুরছাই করেছে। মা মেরুদণ্ডহীন প্রাণী। তার বাবার অবজ্ঞাকে মলিন করে দেওয়ার কোনো ক্ষমতা নেই। পৃথিবী যদি তাকে আহ্লাদ করে ক্ষতি কি! আফনানও যে সর্বদা আহ্লাদ করবে তার কি ভরসা? সে তো প্রেম করছে না। শুধু কথা বলে, হাসে। এটা অন্যায় হতে পারে না। প্রেমে গলে যাওয়া এই পুরুষেরা তাই করে যা তাদের ইচ্ছে হয়। সে তো কিছুই বলে না। শুধু বলে, “আমার ভালো লাগছে না।”– তারাই তাকে বিকাশে টাকা পাঠায়, গিফট কিনে পাঠায়, তার মন ভালো করার জন্য মরিয়া হয়ে উঠে। এখানে তার দোষ কোথায়!
অথচ এখন যখন প্রতিটা পুরুষকে নিজের সামনে দেখছে তার গলা শুকিয়ে আসছে। হাত পা ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে। ভয়ে বুকটা ধুকপুক করছে। ফ্যাকাশে হয়ে গেছে মুখটা। কেমন মৃত মৃত লাগছে তাকে। আফনান শুধালো,

“আপনারা কে? চিনতে পারলাম না!”
বারোজনের একজন বললো,
“আমরাও আপনাকে চিনি না। দু দিন আগ পর্যন্ত তো জানতামও না প্রীতির বিয়ে হয়েছে। এতো কথা হয় অথচ জানালোই না।”
আফনানের হাসি উঁবে গেলো। চোখে মুখে এক বিস্ময় প্রকাশ পেলো। ছেলেগুলোর কথা তার মস্তিষ্কে বোধগম্য হচ্ছে না। সে অবাক চোখে চাইলো স্ত্রীর দিকে। প্রীতির মুখটা ফ্যাকাশে। তাদের বিয়ে হয়েছে প্রায় ছাব্বিশ দিন। অথচ প্রীতি এখনো কাউকে কিছুই জানায় নি? কেন? ছেলেগুলো যথেষ্ট সুদর্শন, সুঠাম দেহী। সে কি লজ্জা পায় আফনানকে নিয়ে? এই প্রশ্নটাই মাথায় সবার প্রথমে এলো। বারোজনের একজন একটা লিস্ট আফনানের হাতে ধরিয়ে বললো,

“ভাইজান আপনি জিতছেন। এই জিত উপলক্ষে আপনার উচিত আমাদের কিছু দেওয়া। আমরাও লাইনে ছিলাম বিগত পাঁচ বছর। ইনভেস্ট করলাম, অথচ শুধু প্রীতির হাসি, মিষ্টি কথাই আমাদের নসিবে জুটলো। তাই আমাদের ইনভেস্টমেন্ট এখন ফেরত পাওয়ার দাবি করছি। আপনি তো প্রীতিকেই পেয়ে গেলেন। লিস্টের এই জিনিসগুলো আপনার বউ বিগত বছরে আমাদের থেকে নিয়েছে। তাই আমরা এগুলো ফেরত চাই!”
প্রীতির চোখ মুখে অস্ফুট রাগ উঁকি দিলো। এগুলো তো সে চায় নি। এই পুরুষেরা নিজেই দিয়েছে। সে শুধু বলেছিলো তার ভালো লাগছে না। আফনানের মুখ কালো হয়ে ঝুলে পরলো। এতোসময়ের ভ্যাবলা মস্তিষ্ক এখন সজাগ হলো। লিষ্টটা হাতের মুঠোয় দলিত করে তীব্র অভিমান এবং অবিশ্বাস নিয়ে চাইলো প্রীতির দিকে। প্রীতি সেই চাহনীতে ধাক্কা খেলো। সে চাপা কণ্ঠে বললো,
“এদের সাথে আমার কোনো সম্পর্ক নেই।”

সাথে সাথে একটা ছেলে তাদের ম্যাসেঞ্জার খুলে আফনানের সামনে রাখলো। প্রতিটা ম্যাসেজ উন্মুক্ত আফনানের সামনে। আফনান মূর্তির মতো বসে রইলো। ম্যাসেজগুলো গত পরশুর। প্রীতি তাদের সাথে আহ্লাদী ঢঙ্গে কথা বলছে। তার মধ্যে কোনো নোংরা কথা নেই। অথচ কথাগুলোতে কেমন প্রেম প্রেম মিশানো, খুনসুটিপূর্ণ। মনে হচ্ছে দুজন প্রেমেপরা যুবক-যুবতী কথা বলছে। একজন বিবাহিত নারীর পরপুরুষের সাথে এমন রস মিশিয়ে কথা বলাটা কি ন্যায়! আফনান নিজের দ্বিধায় পিষ্ট হলো। হৃদয় তার ব্যথিত। সে কোনো ব্যাকডেটেড পুরুষ নয়। তবুও স্ত্রীর অন্য পুরুষের সাথে এভাবে কথা বলা তার সহ্য হলো না। খুব প্রতারিত মনে হচ্ছে নিজেকে। সে স্তব্ধ। প্রীতি তার হাত ছুঁতে যাবে সে হাত সরিয়ে নিলো। এখন বিয়ের অনুষ্ঠান চলমান। দুই পরিবার রয়েছে। উঠে চলে গেলে একটা সিন ক্রিয়েট হবে। তাই সে বসে রইলো।
দূর থেকে প্রীতির ভোঁতা মুখটা দেখছে কাজিনমহল। স্টেজে কি হচ্ছে তারা বুঝতে পারছে না। শুধু দেখা যাচ্ছে বারোজন প্রীতি এবং তার স্বামীকে মাঝখানে রেখে ছবি তুলছে, সেলফি তুলছে। আর আফনানের মুখটা ঝুলে গেছে। সে হাসতে পারছে না। অঞ্জনা অবাক স্বরে বলল,

“এরা কারা?”
“প্রীতি আপুর পাপ!”
কাজিন মহলের চোখে বিস্ময়। পৃথুলা এবং রিদমের চোখ অক্ষিকোটরের থেকে বেরিয়ে আসতে গেলো। তাশদীদ হা হয়ে গেছে। এই ছেলে খুব কম অবাক হয়। সবকিছুতে তার প্রতিক্রিয়া থাকে,
“ও আচ্ছা!”
এবার তেমন হলো না। সে এক, দুই, তিন করে গুণলো। মোট বারোজনকে। অবাক স্বরে বললো,
“বারোব্যাটারী?”
কাঞ্চন বাঁকা হাসলো। এদের খোঁজ সে পেয়েছে অলৌকিক ভাবে। হাসপাতালে যখন স্নিগ্ধ ভর্তি ছিলো তখন এদের একজনের সাথে তার দেখা হয়। দেখাটাও কাকতালীও ঘটনা। বারোজনের একজন ওই হাসপাতালের মেডিকেল অফিসার। একদিন তাদের ফ্লোরে ছেলেটার ডিউটি পড়ে। সে স্নিগ্ধকে চেক করার সময় বারবার বলছিলো,

“আপনারা পটনভী? আমি তো জানতাম এই টাইটেলটা খুব আনকমন!”
কাঞ্চন হেসে বললো,
“হ্যা, আনকমন ই। খুব বেশি শোনা যায় না।”
ছেলেটা মৃদু হাসলো। তারপর বেরিয়ে যেতে যেতে বললো,
“আমার কাছে এখন খুব আনকমন লাগছে না। শোনা শোনাই লাগছে। আমার পরিচিতও এক পটনভী রয়েছে।”
পটনভী সারনেম আসলেই আনকমন। কাঞ্চনের তাই একটু খটকা লাগলো। তাদের বংশ সুবিস্তৃত। তাই এই ডাক্তারের পরিচিত পটনভী যে তার বংশের কেউ হবে না কে বলতে পারে? তাই কৌতুহলবশতই শুধালো,
“আপনার পরিচিত পটনভীর নামটা জানতে পারি? এমন হতেই পারে সে আমার বংশের কেউ!”
ছেলেটার চোখমুখ উজ্জ্বল হয়ে গেলো। সে অনেকটা আগ্রহী গলায় বললো,
“হ্যা শিওর। ওর নাম প্রীতি।”
“আপনি প্রীতি আপুর বন্ধু?”
“চেনো তুমি?”
“হ্যা, আমার কাইন্ডা চাচাতো বোন!”

ছেলেটার মধ্যে আগ্রহ আরোও তিনগুণ হয়ে গেলো। সে রীতিমত কাঞ্চনকে লাঞ্চ খাওয়াতে চাইলো। কাঞ্চন মানা করলে সে তার জন্য হাসপাতালের দামী কফি এবং স্যান্ডউইচ কিনে দিলো। গদগদ গলায় বললো,
“প্রীতির পরিবার মানে আমার পরিবার। যা সমস্যা হবে একটা কল করো। ঠিক আছে?”
কাঞ্চনের মাথার এন্টেনা তখন কিছু একটা ফ্রিকুয়েন্সি ক্যাচ করলো। আন্দাজেই একটা ঢিল মারলো সে,
“আপনি প্রীতি আপুকে পছন্দ করেন!”
ছেলেটা উত্তর দিলো না। বরং হাসলো। লাজুক হাসি। কাঞ্চনের বুঝতে বাকি রইলো না। সে প্রচন্ড নির্দয় মানবী তাই ছেলেটার মনটা পিষে দিতে দ্বিধাবোধ করলো না। খুব বেচারী মুখে বললো,
“আহারে! প্রীতি আপুর তো বিয়ে হয়ে গেছে।”
ছেলেটার মুখের হাসি সাথে সাথে উবে গেলো। কেমন বজ্রাহত দৃষ্টিতে সে তাকিয়ে রইলো কাঞ্চনের দিকে। কাঞ্চন পাষন্ড অভিনেতা। সে তার কষ্টকে সান্ত্বনা না দিয়েই শুধালো,
“আপনি জানেন না?”

ছেলেটির মুখে কোনো কথা নেই। কাঞ্চনের সন্দেহ গাঢ় হলো। সে মুখ ভোঁতা করে বললো,
“মনে হয় বলতে ভুলে গেছেন। থাক ভাই কষ্ট পেয়েন না।”
ছেলেটি আর একটা কথাও বললো না। প্রেম তার বুকে লালিত হয়েছে তীব্রভাবে। কোথাও না কোথাও প্রতারিত হওয়া প্রেমিকের ছাপ প্রকাশ পেলো তার মুখশ্রীতে। কোনো মতে হেটে সে চলে গেলো সেখান থেকে। কাঞ্চনের মাথায় তখন বিশ্রী প্রতিশোধের বিটকেল বুদ্ধি উদয় হলো। প্রীতি আপুর ভালোমানুষী মুখোশটা ছিড়ে ফেলতে ইচ্ছে হলো। এই নারী তার জীবনে রেখা পালটে দিয়েছে। তাকে একটু শাস্তি না দিলে অন্যায় হবে না? এই খোরাফাতি বুদ্ধিটাকে মাথায় চেপে রেখেছিলো কাঞ্চন। নিজের মধ্যে লুকিয়ে থাকা একটু ভালো সত্তাটা মানা করছিলো। কিন্তু শয়তান সত্তাটা বারবার কানে ফু দিয়ে বলছিলো,
“তোর জীবন তেজপাতা বানিয়ে ওই মহিলা ঢং করে সুখী হবে তা কি করে হয়? এতো ভালো মানুষ তো তুই না!”

শয়তানী কাঞ্চনের উস্কানিতে কাঞ্চন বাঁধা পড়লো। বাড়ি ফিরে ছলে বলে প্রীতির মোবাইলটা হাতালো সে মেহেদী দেবার সময়। লক খুললো ছবি তোলার বাহানায়। প্রীতি কি জানতো তার পাপ ধরা পড়বে? সে বিশ্বাস করলো কাঞ্চনকে। কাঞ্চন সেই ফাঁকে তার সব ম্যাসেজ পড়ে ফেললো। মহিলা ধান্দাবাজ না, চরম ধান্দাবাজ। একে শিক্ষা না দিলে সিরিয়ালের ভ্যাম্প পদবীটা হারাবে কাঞ্চন। তাই সবার ফোন নাম্বার একটা লিস্ট করলো। প্রেমিকগুলোর হাওয়াই মহলে বুলডোজার চালালো। প্রীতি তাদের সাথে প্রেম করে নি, কিন্তু প্রেম প্রেম আচারণ করেছে। তাও সেই আচারণ চলমান ছিলো বিয়ের পরেও। এটা কাঞ্চনের চোখে অপরাধ। তাই ছোট একটা শাস্তি তো পাওনা ছিলো প্রীতি। মহিলার নাটকের একটা পর্দা উঠানো উচিত। ব্যাস আজ সেই নাটকের পর্দা উঠলো। নাটকবাজ, ভালো মানুষী প্রীতি আজ খাবি খাচ্ছে। পৈশাচিক আনন্দ পাচ্ছে কাঞ্চন। আসলেই সে একটা খারাপ নারী। বোনের এমন অবস্থাতে আনন্দ পাচ্ছে! ছিঃ।
স্নিগ্ধ তীর্যক চোখে কাঞ্চনের দুষ্ট মুখটা দেখছে। চোখ হাত দিয়ে ঢেকে হাসলো সে। তার বউ ধীরে ধীরে সাংঘাতিক মহিলাতে পরিণত হচ্ছে। অথচ কেন যেন তার মন্দ লাগছে না।
অঞ্জনা আফসোসের সাথে বললো,

“আহারে! আফনান ভাইয়ের সুখের উপর তুই গরম পানি ঢেলে দিছিস। নেহায়েত ভালো লোক। তাই মূর্তির মতো এখনো বসে আছে!”
কাঞ্চন একটা কোল্ড ড্রিংকের বোতল খুলে এক ঢোক খেয়ে বললো,
“কার্মা ইজ এ বিচ। আফনান ভাইয়ের অন্ধ ভালোবাসা তার কার্মা। এখন ছোবল দিচ্ছে। এটা তোদের জন্যও একটা ওয়ার্নিং। খবরদার, আমার সাথে ইন্টিপিন্টি করবি না। এমন পাপ খুড়ে বের করবো। তোদের স্নিগ্ধ ভাইয়ের উচিত আমার পা ধোঁয়া পানি খাওয়া। একটুর জন্য বেঁচে গেছে! আমার কল্যাণ। শালা আস্তা নিমকহারাম!”
কথাটা শেষ করার আগেই স্নিগ্ধ এসে দাঁড়ালো ঠিক তার পেছনে। কাজিনমহল জমে গেলো। কাঞ্চন তাদের জমে যাওয়া মুখ দেখে থেমে গেলো। স্নিগ্ধ ঝুকলো। মুখখানা কাঞ্চনের কানে মিশিয়ে বললো,
“আমি তো প্রস্তুত। আপনি আমার পাজোড়া আমার কোলে রাখলেই তো পারে। আমি শুধু পা ধোঁয়া পানি নয়, পায়েও চুমু খেতে প্রস্তুত। ছুঁতে গেলেই তো বাইন মাছের মতো ছটফট করেন!”
কাঞ্চনের কান লাল হয়ে গেলো। সে কান ডান হাতে চেপে ধরে বিস্ফারিত নয়নে তাকালো পেছনে। স্নিগ্ধ ভ্রু নাঁচিয়ে বললো,
“কি হলো? ভয় পেলেন বুঝি? আজ রাতে ট্রাই করা যাক?”
“আমাকে ডাকছে!”
বলেই একপ্রকার দৌড় দিলো কাঞ্চন। স্নিগ্ধ কাজিনমহলের দিকে তাকাতে তারাও ছিঁটকে পড়লো চারদিকে।

রিদম আজ বেশ সেজেছে। একটা কালো পাঞ্জাবী পরেছে। আফগান পায়জামা। কালো রঙ্গে তাকে বেশ মানায়। ট্রিম করেছে দাঁড়ি। চুলগুলো একটু বড় হয়েছে। সে কাটে নি। বারবার চুলে হাত ঘুরাচ্ছে। সিল্কি চুলগুলো কপালে এসে পড়ছে। চোখে আজ শেডওয়ালা চশমা। তার চোখে কোনো সমস্যা নেই। তবুও চশমা পড়ে। কারণ মানায় বেশ।
এতো মাঞ্জা মারার কারণ বিয়ে বাড়ি। বিয়ে বাড়িতে সুন্দরী নারীর অভাব নেই। সবাই সেজেগুজে এসেছে। বলা তো যায় না হয়তো এরমধ্যেই আমদানীর মাকে সে পেয়ে যাবে। বয়স তো কম হলো না, এবার একটু স্থায়ী সম্পর্কে যাওয়াই যায়। ভাবতে ভাবতেই একটি মেয়ের সাথে ধাক্কা লাগলো। মেয়েটির মুখে বিরক্তি ফুটে উঠলো। তথাকথিত বাক্য,

“দেখে চলতে পারেন না?”
রিদম একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললো,
“নাহ! আমি এখন থেকে দেখে চলা ছেড়ে দিয়েছি!”
মেয়েটা অবাক হলো। পিটপিট করলো চোখ। রিদম হেসে বললো,
“সুন্দরী মেয়েদের না দেখে রাস্তার দিকে চোখ দিয়ে রাখলে সেটা সৌন্দর্য্যের প্রতি অন্যায় হবে। আমি ন্যায়বান ব্যক্তি!”
“ফ্লার্ট করছেন?”
“হতে পারে।”
মেয়েটি হাসলো। হাসিটা খুব মিষ্টি। রিদম নরম স্বরে বললো,
“আপনার হাসিটা খুব সুন্দর এটা কেউ বলেছে?”
মেয়েটি লজ্জা পেতেই যাচ্ছিলো। ঠিক তখন ই পৃথুলার ধাঁরালো স্বর শোনা গেলো,
“এই বাক্য ওকে কেউ না বললেও, উনি নবম যাকে তুই এই বাক্য বলেছিস!”
মেয়েটি লজ্জা পাওয়ার যাত্রায় ব্রেক কষলো। রিদম ঘাড় ঘুরিয়ে তীক্ষ্ণ চোখে চাইলো। পৃথুলা বুকে হাত বেঁধে আছে। মেয়েটি আজকে শাড়ি পড়েছে। তার দিকে তাকালেই রিদমের গলা শুকিয়ে যাচ্ছে। পাঁজরের হাড্ডির ভেতর হরদম স্পন্দিত নরম হৃদয়টা কেমন যেন আঁকুপাঁকু করছে। গা ঘাম দিচ্ছে। এক শূন্যতা হৃদয়ে হানা দিচ্ছে। মনে হচ্ছে ভেতরে কিছু একটা খামচাচ্ছে। এ কি যন্ত্রণা! মস্তিষ্ক বিদ্রোহ করছে। অথচ ব্যর্থ হচ্ছে বারেবারে। পৃথুলা এগিয়ে এসে দাঁড়ালো রিদমের গা ছুঁই ছুঁই করে। ঠোঁটের কোনে একটা রহস্যময়ী হাসি ছড়িয়ে বললো,

“প্রতিবার এই কথা বলে এবং অপজিটের মানুষটিকে লজ্জা দেয়। আপনি নবম। বুদ্ধিমানের জন্য ইশারা যথেষ্ট। আপনাকে বুদ্ধিমতী লাগছে।”
মেয়েটি ভ্রু কুচকে রাগী চোখে রিদমের দিকে একবার চেয়েই হনহন করে চলে গেলো। রিদম চরম বিরক্তি নিয়ে চাইলো পৃথুলার দিকে। গজগজ করে বলল,
“শাকচুন্নী কোথাকার! ঘাড় থেকে নেমেও লম্বা হাতে ঘাড় চেপে রেখেছিস! এই তোর না বিয়ে হবে দুদিন পর!”
“বিয়ে হবে বলে অন্যের জীবন নষ্ট করবো?”
“আমার জীবনের কাল নাগিনী হয়ে আছিস কেন?”
পৃথুলা একটু এগিয়ে চোখে চোখ রেখে বললো,
“ওই যে আমি তোর কিউট লিটল রেড ফ্লাগ। ধরবোও না, ছাড়বোও না।”
রিদম এবার তার বাহু চেপে ধরলো। পৃথুলার মুখে সেই যন্ত্রণার ছাপ ছড়িয়ে পড়লো। রিদম গজগজ করতে করতে বললো,
“আমাকে উস্কাস না পৃথুলা, একেবারে জ্বালিয়ে দিবো। ছাই হয়ে আমার গায়ে মিশে থাকবি।”
“আমাকে সামলানো তোমার কম্য নয়!”
বলেই হাতটা ছাড়ালো সে। রিদমের চোখে চোখ রেখে বললো,
“ঘুড়ির মতো এ আকাশ ওই আকাশ না উড়ে একটু পাখির মতো বাসা বাঁধা শেখ। অন্তত অপোজিটের মানুষটি জ্বলবে না।”

বলেই সে অঞ্জনাদের কাছে চলে গেলো। ওখানে বেশ হুল্লোড়। রিদ্ধি আপু রাজশাহী থেকে দুই ছেলেমেয়ে নিয়ে এসেছে। রিদ্ধি পটনভী সেই পটনভীদের একজন যারা পটনভী পরিবারে বিয়ে করে নি। রিদ্ধি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের এসিস্ট্যান্ট প্রফেসর। ছোট ছেলেটা হয়েছে আজ ছয়মাস। বড়মেয়েটার বয়স আড়াই বছর। তার স্বামী মেরিন ইঞ্জিনিয়ার। সবসময় শিপে শিপে থাকেন। বছরে দু বার তিনি বাড়ি ফিরেন। রিদ্ধি আপু থাকেন শ্বশুরবাড়ি। এই মহিলা “নেই কাজ তো পটনভী ভাজ” এর উদ্যোক্তা। রিদ্ধি এসেছে আধা ঘন্টা আগে। জ্যামে দেরি হয়ে গেছে। এসেই বোনেদের বললো,
“এই খালারা, তোমাদের সম্পত্তি সামলাও। তিনদিন আমি রেস্ট নিবো।”
কোলের বাচ্চাটা কাঁদছে। ফর্সা মুখটা লাল হয়ে গিয়েছে। ঠোঁট ফুলিয়ে ফুলিয়ে কাঁদছে। চোখ পানিতে ছলছল করছে। অঞ্জনা প্রথমে কোলে নিলো কিন্তু কান্না থামার বদলে আরোও বেড়ে গেলো। রিদ্ধি হাসতে হাসতে বললো,

“এইটা হয়েছে ডিট্টো পটনভী। রাগ নাকের উপর। একটু আগেই কিন্তু দুধ খাইয়েছি। তাও কাঁদছে মহারাজ।”
অঞ্জনার দিকে হাত বাড়ালো কাঞ্চন। আহ্লাদ করে বললো,
“আসবেন আমার কোলে, বাবা?”
ছোট্ট মানুষটা কি বুঝলো কে জানি? ঝুকে পড়লো তার দিকে। কাঞ্চন খুব সুন্দর করে তাকে কোলে নিলো। পিঠে হালকা হাতে চাপড় দিতে দিতে বললো,
“অনেক পঁচা এরা, শুধু দুষ্টুমি করে। আমরা ভালো ছেলে, কাঁদিনা।”
ছোট্ট তুলতুলে শরীরটাকে বুকে মিশিয়ে দুলছে কাঞ্চন। কান্নার মাত্রা কমে গেলো। রিদ্ধি আপু বললেন,
“কাঞ্চন দুই এইটাকে সামলা, আমি বড়টাকে খাইয়ে আসি!”
“তুমি খাবে না?”
“আমার আর খাওয়া? দুটো বাচ্চার কামলা দিতে দিতে জীবন শেষ। একটার ডিউটি শেষ হয় আরেকটার শুরু হয়।”
অঞ্জনা হেসে বললো,
“ভয় দেখিও না। আমরা এখনো অবিয়াত্তা!”
“ভয় না, আমি তো মন থেকে বলি বিয়ে কর, বাচ্চা নেও। মজা কতপ্রকার সব বুঝবা। আমাদের শান্তি যখন দুটো সুস্থ থাকে, হাসে খেলে। এগুলোই আমাদের জীবনের আনন্দ। বাই দ্যা ওয়ে, প্রীতি আর ওর বর এমন ছ্যাকাখাওয়া পাবলিক হয়ে আছে কেন?”
“পাপের ফল পেয়েছে। তাই একটু বেশি আনন্দিত!”
বলেই কাঞ্চন হাসলো। রিদ্ধি আপুর মেয়ে তার জামা টানছে। তার ক্ষুধা লেগেছে। রিদ্ধি তাকে নিয়ে খাওয়ার জায়গায় চলে গেলো। কাঞ্চন ছোট্ট ছেলেটাকে কোলের সাথে মিশিয়ে রাখলো। তার কান্না থেমে গেছে। পৃথুলা এসে দেখলো, মহারাজ কাঞ্চনের বুকে বেড়ালের বাচ্চার মতো ঘুমিয়ে গেছে। সে হেসে বললো,

“তোর গায়ে কি ঘুমের ঔষধ আছে নাকি? বাচ্চাকাচ্চা তোর কোলে গেলেই ঘুমায়ে যায় কেমনে?”
পৃথুলার কথায় মৃদু হাসলো কাঞ্চন। তার গায়ের সাথে মিশে আছে ছয়মাসের তুলোর মতো নরম দেহটা। নড়াচড়া নেই। মুখটা একটা খোলা। হাত পা ছড়িয়ে দিয়েছে। শুধু ছোট্ট হাতের ফাঁকে কাঞ্চনের লাল ওড়না। কাঞ্চন তার ছোট্ট মাথায় থুতনি ঠেঁকিয়ে জড়িয়ে ধরে রইলো। মৃদু স্বরে বললো,
“একটা সময় আমার খুব শখ হতো, আমার এমন একটা আটার দলার মতো বাবু হবে। আমি তাকে অনেক আদর করবো। আমার একটা সোনার পরিবার হবে।”
“আর এখন? এখন তো তোর সুযোগ আছে!”
অঞ্জনার প্রশ্নে বিষন্ন হাসলো কাঞ্চন। বুক চিরে দীর্ঘশ্বাস বের হলো। নরম গলায় বললো,
“লোভ ততটুকুই করা উচিত যতটা ভাগ্যে লেখা। যা নসিবেই নেই সেটার লোভ করলে বিপদ নিজেরই। এখন আমি শুধু শান্তি চাই। একদলা মুক্তির নিঃশ্বাস।”
“তুই এতো পালাই পালাই করিস কেন? হতেই পারে স্নিগ্ধ ভাইয়ার কাছে তুই এমন একটা সুন্দর পরিবার পাবি!”
কাঞ্চন রুক্ষ্ণ গলায় উত্তর দিলো,
“আমি চাই না। আমরা একে অপরকে ভালোবাসি না। সেখানে একটা প্রাণ আসা মানে তাকে সারাজীবন আমাদের মধ্যে পিষতে হবে। একটা সময় তার দমবন্ধ হয়ে যাবে। শুধু মাত্র নিজেদের স্বার্থের জন্য আমি আমার বাচ্চার উপর জুলুম করবো না।”
বিষন্নতা ঠিকড়ে পড়লো তার গলায়। অঞ্জনা হাই তুলে বললো,
“তাহলে আবার ভালোবাসা শুরু করে দে।”
“ন্যাড়া একবার বেলতলায় যায়!”

খাওয়া দাওয়ার পর্ব শেষ হতে হতে বিকাল হলো। একদম শেষ টেবিলে বসলো কাজিনমহল। কাজিনমহলের সাথে স্নিগ্ধও বসলো। সবাইকে খাওয়াতে খাওয়াতে দেরি হয়ে গিয়েছে। সে বসলো কাঞ্চনের পাশে। কাঞ্চনের কোলে এখনো রিদ্ধি আপুর ছেলেটা। সে এতো সুন্দর করে ঘুমাচ্ছে যে কাঞ্চন তাকে কোল থেকে নামাতে পারলো না। নরম তুলতুলে মুখটাকে দেখতেও ভালো লাগছে। গুলুমুলু শরীরটা বুকে মিশে আছে। বাচ্চাকাচ্চা খুব ভালো লাগে কাঞ্চনের। বাচ্চাকাচ্চাও কাঞ্চনের কাছে ভালো থাকে। তাই কাজিনদের যাদের বাচ্চা আছে তারা পটনভী মঞ্জিলে আসলেই কাঞ্চনকে পেয়ে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে। রিদ্ধি আপুও মেয়েকে খাইয়ে ঘুম পাড়াতে গিয়েছেন। স্বস্তি, কাঞ্চন আছে।
কাঞ্চন বসে আছে সবার সাথে কিন্তু খেতে পারছে না। ক্ষুধাও পেয়েছে। বাচ্চা কোলে নিয়ে খাওয়ার অভিজ্ঞতা তার নেই। অঞ্জনা তাকে খাইয়ে দিবে বলে মনে মনে সিদ্ধান্ত নিলো। কিন্তু সেই সুযোগ পেলো না। স্নিগ্ধ একটা প্লেটে বিরিয়ানি নিলো। আলু নিলো তিনটে। স্নিগ্ধ আলু খায় না। কিন্তু সে আলু প্লেটে তুললো। সালাদে টমোটোগুলো শুধু প্লেটে তুললো। তারপর চেয়ার সমেত কাঞ্চনকে টেনে নিজের কাছে নিয়ে এলো। লোকমা তুললো কাঞ্চনের মুখের সামনে। গম্ভীর গলায় বললো,
“হা কর!”

কাজিনমহলের চক্ষুচড়ক গাছ। তারা একে অপরের দিকে তাকাচ্ছে। স্নিগ্ধ ভাই কাউকে খাইয়ে দিবে? লম্বাদেহী, শুভ্র বদনের এই দাম্ভিক পুরুষের এমন কার্য অষ্টম আশ্চর্যের কাতারে পড়ে। স্নিগ্ধের এমন রোজকার আহ্লাদ তাদের হজম শক্তি নষ্ট করে দিচ্ছে। ছেলেবেলা থেকে যে স্নিগ্ধকে তারা দেখে এসেছে, এই স্নিগ্ধ সেটা নয়। একটা মানুষ এতো বদলায়? একেবারে ১৮০ ডিগ্রী? অঞ্জনা ফিসফিস করে বললো,
“পেটে গুলি খেলে মাথার তারে জট লেগে যায়?”
“কে জানে ভাই, আমি খাই নাই।“
উত্তর করলো রিদম। রিদমের চশমাটা খুলে নিজের চোখে পরে নিলো তাশদীদ। তারপর বললো,
“এখন খাবার টেবিলে এই বর বউয়ের আলগা পীরিত দেখতে পারবো না ভাই। আচ্ছা হু, মে আন্ধা হু। বিল্লি তোর জন্য সবচেয়ে ভালো, তুই চশমা খুলে রাখ।“
কাজিনমহলের এমন ফিসফিসানিতে ভীষন অস্বস্তিতে পড়লো কাঞ্চন। চোখ গরম করে তাকালো স্নিগ্ধের দিকে। স্নিগ্ধ কিছু বুঝতে পারে নি এমন একটা মুখ করে বললো,
“হা কর। হাত ব্যথা হয়ে যাচ্ছে আমার।”
“তোমার খাওয়া তুমি খাও না! নাটক করছো কেন?”
স্নিগ্ধ কিছুসময় শান্ত চোখে তার দিকে তাকিয়ে রইলো। ফিঁচেল হাসি ফুটলো ঠোঁটের কোনায়। গাঢ় স্বরে বললো,
“এক মাত্র ওয়াইফ আমার অভুক্ত থাকবে আর আমি খাবো, এক বছর পর আমাকে বলা হবে পাষন্ড তা তো হবে না। আফটার অল পার্ফেক্ট হাসবেন্ড আমি।”
“নটকা পুরুষ!”
“আমি বউ পালানোর কোনো চান্স দিবো না। ট্রাই করে যা।”
বলেই মুখে লোকমা তুলে দিলো স্নিগ্ধ। কাঞ্চন বেশি কথা বললো না। তার ক্ষুধা লেগেছে। তাই নিজের পেটের কথা ভেবে সিমেন্টের বস্তার হাতেই খেলো সে। স্নিগ্ধের ঠোঁটের কোনায় হাসি। স্কোরের খাতায় একপাক্ষিক ভাবে গোল দিয়েই যাচ্ছে লোকটা। ধ্যাত ভালো লাগে না।

খাওয়া-দাওয়া সব শেষ। একটু পর প্রীতি আপু শ্বশুরবাড়ি চলে যাবেন। পটনভীদের ঘরে তার বিয়ে হয় নি। সুতরাং তার একটা ঘটা করে বিদায় অনুষ্ঠান হবে। পটনভীদের ঘরে বিয়ে হলে কোনো ভনীতা হতো না। বিদায় লগ্নে তার কান্না দেখার লাইভ টেলিকাস্ট মিস করতে চায় না কাঞ্চন। রিদ্ধি আপুর ছেলেকে তার কাছেই রেখে এসেছে। ওড়নার পিন খুলে গেছে। এই আনারকলি পড়া একটা ঝামেলা। এখানেও শার্ট বা টিশার্ট পড়া যেত তাহলে ভালো হত। ওড়নাটা ঠিক করে ঠোঁটে লিপস্টিক দিলো। আয়নায় নিজেকে দেখলো। লাল টকটকে আনারকলি তার পরণে। ঠোঁটে কড়া রঙ্গের একটা লিপস্টিক। মুখে উপছে পড়ছে জেল্লা। আজকে পিওর খলনায়িকার মতোই লাগছে তাকে। আজকে খুব গর্ববোধ হচ্ছে। প্রীতি আপুর মহা আকাঙ্খিত বিয়ের আনন্দ সে চটকে দিয়েছে। শুধু কাঞ্চন একা পুড়বে কেন? প্রীতি আপুকে একটু জ্বালাতে ক্ষতি কি!
ওয়াশরুম থেকে বের হতেই হাতে হ্যাচকা টান খেলো কাঞ্চন। কিছু বোঝার আগেই প্রীতি তাকে ধাক্কা মারলো দেওয়ালের দিকে। ধাক্কাটা একটু জোরেই ছিলো, ফলে পিঠে তীব্র ব্যথা পেলো কাঞ্চন। যন্ত্রণা মুখে ফুটতে দিলো না। বরং কড়া স্বরে বললো,
“প্রীতি আপু কি করছো?”
“কি সমস্যা তোদের? আমার সুখ সহ্য হয় না কেন? যখনই আমি একটু সুখী হতে চাই তার মধ্যে শকুনী নজর দিতে হবে?”

প্রীতিকে অপ্রকৃতস্থ লাগলো। রাগে সে থরথর করে কাঁপছে। খুব জোরে কাঞ্চনের বাহু চেপে ধরেছে সে। কাঞ্চন কিছু সময় স্থির চোখে তাকিয়ে রইলো। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
“আমাকে ছাড় প্রীতি আপু। তুমি কি বলছো আমি বুঝছি না!”
“একটা থাপ্পড় মেরে তোর দাঁত ফেলে দিব। ন্যাকা সাজছিস? আমি বুঝি না! ওদের সবাইকে তুই দাওয়াত দিয়েছিস আজকে। ইচ্ছে করে করেছিস আমার ঘর ভাঙ্গতে তাই না? কি শত্রুতা তোর আমার সাথে?”
কাঞ্চন এবার আরোও ধীর গলায় বললো,
“প্রীতি আপু এটাকে কর্মফল বলে। You sow what you reap– আমাকে ফাঁসানোর আগে তোমার ভাবা উচিত ছিলো। পটনভীরা কারোর ধার রাখে না। তোমার ভালোমানুষী নাটকটা অন্তত তোমার স্বামীর জানা উচিত। তোমার কালো মনটাকে তার চেনা উচিত!”
প্রীতি ঠোঁটে অপ্রকৃতস্থ হাসি ফুটলো। ধীর স্বরে বললো,
“তুই সব কিছু জেনে বসে আছিস, তাই তো?”
কাঞ্চনের মস্তিষ্ককোষগুলো একটু নড়েচড়ে উঠলো। প্রীতির কথা তার বোধগম্য হলো না। প্রীতি চিৎকার করে উঠলো,

“আমি তোর নামে মিথ্যে লিখেছিলাম কারণ”
“কাঞ্চন!”
ভারী স্বর কানে আসতেই নড়েচড়ে উঠলো প্রীতি এবং কাঞ্চন। প্রীতির চোখ মুখের ভাব বদলালো। সে চুপ করে গেলো। কাঞ্চন পেছনে তাকাতেই দেখলো স্নিগ্ধ দাঁড়িয়ে আছে। কালো পাঞ্জাবীর পকেটে তার হাত গোঁজা। ভারী স্বরে বললো,
“তোকে মা খুঁজছে।”
কাঞ্চন নিজেকে ছাড়ালো প্রীতি থেকে। এই মহিলা পাগলায়ে গেছে। অনেকটা অতি শোকে পাথর। তাই বেশি ঘাটানো উচিত নয়। তাই সে সেখান থেকে চলে এলো। স্নিগ্ধ তখনও দাঁড়িয়ে আছে। তার পকেটে হাত গুজা। তীক্ষ্ণ চোখে চাইলো সে প্রীতির দিকে। তারপর গম্ভীর স্বর দেওয়ালে বাড়ি খেলো,
“প্রীতি, আমি তোমাকে আগেও ওয়ার্ন করেছি। এক কথা চৌদ্দ বার বলার মতো ধৈর্য্য আমার নেই। শেষবার ওয়ার্ন করছি, আমার ধৈর্যচ্যুতি ঘটিও না। আমার ওয়াইফের ক্ষেত্রেই ধৈর্যচ্যুতির ইয়েল্ড পয়েন্টটা হিমালয় পর্যন্ত বরাদ্দ। অন্যদের ক্ষেত্রে কিন্তু সেটা নয়। মাথায় ছেপে নাও।”
প্রীতি গায়ের লোম দাঁড়িয়ে গেলো। ভয়ে গলা শুকিয়ে এলো। তবুও ক্ষীণ স্বরে বললো,

“ভয় পাচ্ছো স্নিগ্ধ ভাই?”
“ভয় সরফরাজ পটনভী পায় না প্রীতি!”
“কাঞ্চন যখন জেনে যাবে বিয়ের দিন যা হয়েছে সব পূর্বপরিকল্পিত এবং তোমার পরিকল্পিত, তখনও একই কথা বলবে?”
স্নিগ্ধের ধাঁরালো চোয়াল শক্ত হয়ে গেলো। চোখে দৃষ্টি ছুরির থেকেও শানিত হয়ে উঠলো। এই স্নিগ্ধকে প্রচন্ড ভয়ংকর দেখালো। প্রীতির হৃদয় শুকিয়ে গেলো। স্নিগ্ধ গম্ভীর স্বরে বললো,
“তুমি যদি নিজের ভালো চাও, শুধরে যাও। তোমার বাবার কৃতকর্ম তোমার শ্বশুরবাড়ির নীরিহ লোকেরা জানলে ক্ষতি তোমার। ভালো মেয়ের মত এখন নিচে যাও। কান্নাকাটি করে শ্বশুরবাড়িতে যাও।”
এর মধ্যেই প্রৌঢ় ভারী স্বর কানে এলো,
“সরফরাজ, প্রীতিকে বকছো কেন তুমি?”
স্নিগ্ধ প্রীতির থেকে সরে গেলো। প্রীতির দমবন্ধ হয়ে এসেছিলো। সে হাঁপাতে লাগলো। তারপর এক দৌড়ে নিচে চলে গেলো। একটু হলেই তার হৃদপিন্ড খাঁচা ছাড়া হতো। স্নিগ্ধ ঘুরে দেখলো জুলফিকা পটনভী লাঠিতে ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। তার দৃষ্টি সূঁচালো। তাকে অসন্তুষ্ট দেখালো। গমগমে স্বরে বললেন,
“তোমার সাথে কথা আছে।”

জুলফিকার পটনভী চৌকস মানুষ। তিনি যে স্নিগ্ধ এবং প্রীতির সব কথা শুনেছেন তাতে সন্দেহ নেই। স্নিগ্ধ কোনো কথা বললো না। সে বৃদ্ধর পেছনে পেছন তার ঘরে গেলো।
জুলফিকার পটনভী নিজের আরাম কেদারায় বসলেন। হুক্কা খাওয়ার একটা স্বভাব ছিলো তার। অনেক আগে ছেড়ে দিয়েছিলেন। আজকে খেতে ইচ্ছে করছে। নলটা পরিষ্কার করিয়েছেন। ঠোঁটের ফাঁকে নিয়ে গুড়গুড় করে টানলেন। স্নিগ্ধ দাঁড়িয়ে আছে বুকে হাত বেঁধে। ছেলেটার মধ্যে কোনো অনুতাপের চিহ্ন নেই। জুলফকার সাহেব গম্ভীর স্বরে বললেন,

ভুলভাল অন্তরাল পর্ব ২১

“আমার বয়স হয়েছে সরফরাজ। এখন এসব আমার বয়স নিতে পারে না। তোমাকে আমি আমার উপযুক্ত উত্তরাধিকার ভাবি। কিন্তু তোমার কাজে আমি একটু হতাশ হয়েছি।”
স্নিগ্ধ গম্ভীর গলায় বললো,
“ক্ষমা করবেন নানাজান। এখন পর্যন্ত যা হয়েছে, আপনার ইচ্ছাতেই হয়েছে। আগামীতেও সেটাই হবে।”………

ভুলভাল অন্তরাল পর্ব ২৩

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here