খান সাহেব পর্ব ১৫
সুমাইয়া জাহান
ভয় এমন একটা শব্দ। যেটা মানুষের ভিতর একবার ঢুকে গেলে যেকোনো সাধারন সুস্থ মানুষ হিতাহিতজ্ঞানশূণ্য হয়ে পাগলের মতো আচারন করে। লামিয়াও সকাল থাকে পাগলের মতো আচরণ করছে। বাড়ির সকলে গেস্ট রুমে উপস্থিত। লামিয়ার মুখে একটাই কথা, “সে বাড়ি যাবে।” তার প্রচুর জ্বর এসেছে। জ্বরের ঘোরে পাগলের মতো একই বিলাপ করছে। ডাক্তার এসে চেকআপ করে মেডিসিন দিয়ে গেছেন আর বলেছেন, “কোনো কিছু থেকে ভয় পেয়ে লামিয়া ট্রমার মধ্যে চলে গেছে। যার ফলে পাগলের মতো বিলাপ করছে।” সিকদার বাড়ির সকলের ধারণা সমুদ্রের পানিতে বেশি ভেজার ফলে এমন জ্বর এসেছে। আর নতুন জায়গায় রুমে একা ঘুমানোর ফলে হয়তো ভয় পেয়েছে। মাইশা আর নয়ন লামিয়ার মাথার কাছে বসে আছে।
লামিয়া কাতর দৃষ্টিতে মাইশার দিকে তাকিয়ে বলল,
“ভাবি,আমি বাড়ি যেতে চাই। প্লিজ, তোমরা আমাকে বাড়ির নিয়ে চলো। আমি আর এখানে থাকতে চাই না।”
মাইশা লামিয়ার হাত ধরে বলল,
“আমরা তোমাকে বাড়ি নিয়ে যাবো লামিয়া। তুমি এখন একটু রেস্ট নাও। আমি তোমার পাশে আছি।”
লামিয়া কিছুটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে চোখ বন্ধ করল। আনোয়ার সাহেব লামিয়ার বাবা রফিক সাহেবকে সবটা বলতে চেয়েছিলেন। কিন্তু নয়ন বারণ করেছে, এখন কিছু না বলতে। শুধু শুধু সকলে টেনশন করবে। আনোয়ার সাহেব জামাইয়ের বারণ শুনে আর জানাননি লামিয়াদের বাড়িতে।
আনোয়ার সাহেব সকালের নাস্তা করে স্কুলের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়লেন। মেয়ের বিয়ের জন্য কিছুদিন ছুটি নিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু এখন আবার তাকে তার কর্মে ফিরে যেতে হবে। কাজের জায়গায় তিনি কোনো আপোস করেন না। বর্তমানে তিনি স্কুলের প্রিন্সিপালের পদে আছেন। রিসাত সাহেবও কিছুদিন পরে ডুবাইতে ফিরে যাবেন। রাহিনরা আরো একমাস থাকবে বলে ঠিক করেছে, তারপর তারাও ফিরে যাবে ওমানে। সুমুরা আর একসপ্তাহ থাকবে, তারপর ফিরে যাবে। এই নিয়ে অবশ্য সুমুর মনটা খারাপ। সে তার খান সাহেবকে রেখে যেতে চায়না। যতোদিন খান সাহেব আছে সেও এখানে থাকতে চায়।
মিনা বেগম আর হাসি বেগম দুপুরের রান্নার ব্যবস্থা করছেন আর টুকটাক কথা বলছেন। হঠাৎ খুশি বেগম রান্নাঘরে এলেন। তিনি মিনা বেগমের সাথে চোখাচোখি করে, হাসি বেগমের উদ্দেশ্যে বললেন,
“আপা! কিছুদিন যাবত তোকে একটা কথা বলব বলে ভাবছিলাম। কিন্তু এতো এতো ঝামেলার মাঝে আর বলা হয়ে উঠেনি।”
হাসি বেগম খুব হাস্যজ্বল স্বভাবের মানুষ। মুখে আলতো হাসি সবসময় থাকে তার। জীবনে অনেক কঠিন পরিস্থিতিকে সামাল দিয়েছে তিনি। পেঁয়াজ কাটতে কাটতে তিনি ছোট বোনের দিকে তাকিয়ে বললেন,
“এখন তো ঝামেলা নেই। এখন বল। আমি শুনছি।”
খুশি বেগম আলতো হেসে বললেন,
“আসলে আপা! বলতে তো চাই, তবে তুই কীভাবে নিবি কথাটা বুঝতে পারছিনা।”
“আরে এতো অস্বস্তিবোধ করছিস কেনো? বলনা, কি বলতে চাস?”
“আসলে আপা! মাইশার গায়ে হলুদের দিন আমার বান্ধবী হাসনা এসেছিল, জানিস তো? সেদিন হাসনা ওর ছেলের জন্য আমাদের সুমুকে পছন্দ করেছে। আমাকে বলেছে কথাটা। আমি বলেছি, সুমু আমার আপার মেয়ে। আর আপা যা চাইবেন তাই হবে। তারপর হাসনা কথাটা আমায় তোকে জানাতে বলল। তাই তোকে জানালাম। শুনেছি, ছেলে খুব ভালো। এই দুদিন আমি নিজে সব খোঁজ খবর নিয়েছি। আমি আগেই ভেবেছিলাম, আগে আমি ছেলের সম্বন্ধে সব খোঁজ খবর নিব। যদি ভালো ছেলে হয় তাহলেই তোকে জানাব। হাসনার একটাই ছেলে বুঝলি। নিজেদের পারিবারিক ব্যবসা সামলায়। নাম রিফাত। দেখতে মাশআল্লাহ। আমাদের সুমুর সাথে দারুন মানাবে। এখন তোর আর দুলাভাইয়ের ইচ্ছা।”
কথাগুলো একবারে বলে শেষ করলেন খুশি বেগম। হাসি বেগম মুচকি হেসে বললেন,
“কিন্তু সুমু তো এখনো অতোটা বড় হয়নি। মাত্র উনিশ বছর বয়স। ওদের বংশের মেয়েদের একটু বয়স করেই বিয়ে দেওয়া হয়। আর তাছাড়া সুমুর বাবারও তার দুই মেয়েকে নিয়ে কিছু স্বপ্ন আছে। অভাবের সংসার। তার দুইমেয়ে নাকি তার দুঃখ ঘোচাবে। উনি কি রাজি হবেন এখন সুমুর বিয়ে দিতে? মেয়ের বিয়ের প্রস্তাব তো অনেক জায়গা থেকেই আসে। উনি তো বিয়ে দিতে রাজি হননা।”
খুশি বেগম হাসি বেগমের কাঁধে হাত রেখে বললেন,
“এমন ভালো পাত্র আমার ইফতিয়ার জন্য আসলে, আমি ইফতিয়ার বিয়ে দিয়ে দিতাম। এমন ভালো ছেলে কেউ হাত ছাড়া করবে না। ছেলে আর ছেলের মা দুজনেই সুমুকে খুব পছন্দ করেছে। তুই দুলাভাইকে বোঝা আপা।”
হাসি বেগম সম্মতিসূচক মাথা নাড়িয়ে বললেন,
“আমি কথা বলে দেখব, খুশি। তবে, মেয়ের বিয়ে দিতে গেলে অনেক খরচ। উনি যদি রাজি হয়, তাহলে শুধু কথা বলে বিয়ে ঠিক করে রাখব। দুইবছর পরে বিয়ে দিব।”
খুশি বেগম বোনের দিকে তাকিয়ে হেসে বললেন,
“তুই আমাকে এতোটা পর কবে থেকে ভাবিস আপা? সুমুর বিয়ের সব দায়িত্ব আমাদের সবার। তুই শুধু দুলাভাইকে রাজি করা। কি বলেন ভাবি?”
মিনা বেগম খুশি বেগমের দিকে তাকিয়ে হেসে বললেন,
“হ্যাঁ আপা! আপনি একদম ঠিক কথা বলেছেন। সুমু কি শুধু বড় আপা আর দুলাভাইয়ের মেয়ে। আমাদের কেউনা নাকি?”
হাসি বেগম একটু ভেবে বললেন,
“তবুও ভাবি। আপনাদের ঘাড়ে সব দায়িত্ব চাপিয়ে দিলে হয়না। আর কতো করবেন আপনারা আমাদের জন্য। আপনি, বড় ভাইজান, খুশি আমাদের জন্য অনেক করেছেন। আর কতো? উনি যদি রাজি হন। তাহলে অল্প আয়োজনে পারিবারিকভাবে বিয়েটা দিয়ে দেব।”
খুশি বেগম আর মিনা বেগম একে ওপরের দিকে তাকিয়ে কেমন করে জানি হাসলেন। তাদের উদ্দেশ্যে পূরণ হবে ভেবে তারা মনে মনে খুশিতে ফেটে পড়লেন।
ড্রয়িংরুমে সকলে উপস্থিত। সুমুর শরীর এখন অনেকটা ভালো। আনোয়ার সাহেব আর শামীম সাহেবের মাঝে বসে সে বেগুনি আর আলুর চপ খাচ্ছে। মিনা বেগম সকলের জন্য সন্ধ্যার নাস্তায় বেগুনি, আলুর চপ, চা, কফি সব একা হাতে বানিয়েছেন। শামীম সাহেব গম্ভীর হয়ে বসে আছে। বিকালেই হাসি বেগম সুমুর বিয়ের কথাটা তার কানে তুলেছেন। কিন্তু শামীম সাহেব এখন বিয়ে দিতে কিছুতেই চায়না। এই নিয়ে হাসি বেগম আর তার মধ্যে ঝামেলাও হয়েছে। হাসি বেগম রেগে গিয়ে অনেক কড়া কথা শুনিয়েছেন তাকে। মিনা বেগমও মাইশারা কক্সবাজার যাবার দিন সুমুর বিয়ের কথা আনোয়ার সাহেবকে জানিয়েছেন। আনোয়ার সাহেব মত বা অমত কিছুই দেননি। শুধু বলেছেন, “হাসি আর শামীম যদি সুমুর বিয়ে দিতে চায়, তাহলে আর আমার কিছু বলার নেই। মেয়ে ওদের, সবার আগে ওদের মতামত জরুরি।” এতেই মিনা বেগম ধরে নিয়েছেন সুমুর বিয়েতে তার স্বামী কোনো আপত্তি করবে না। বিকালে আনোয়ার সাহেব বাড়ি ফেরার পর মিনা বেগম আনোয়ার সাহেবকে বলেছেন, “হাসি বেগম সুমুর বিয়ে দিতে রাজি হয়েছে। তুমি শুধু আজ সন্ধ্যায় বাড়ির সবাইকে একসাথে ডেকে বিয়ের ব্যাপারটা জানাও।” বউয়ের জোড়াজুড়িতে আনোয়ার সাহেব বাড়ির সকলকে ডেকে একসাথে ড্রয়িংরুমে উপস্থিত করেছেন। রাহিনের সব ফ্রেন্ডরাও উপস্থিত আছে। শেরাজ সোফায় বসে কফির কাপে একটু একটু চুমুক দিচ্ছে আর সুমুর চপ খাওয়া দেখছে। লামিয়ার শরীরটাও এখন অনেকটা সুস্থ। শুধু ভয়টা এখনো কাটেনি তার। শেরাজকে দেখে নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছে সে। তাছাড়া কাল মাইশারা চলে যাবে।
ড্রয়িংরুম উপস্থিত সকলকে একবার পরক্ষ করে হঠাৎ আনোয়ার সাহেব গম্ভীর গলায় বললেন,
“আজ তোমাদের সকলকে এখানে উপস্থিত করা হয়েছে কিছু বিশেষ কথা বলার জন্য। আমি আশা করব, তোমরা সবাই আমার কথা বোঝার চেষ্টা করবে।”
কথাগুলো বলে একটু থামলেন আনোয়ার সাহেব। তিনি দম নিয়ে আবারও বললেন,
“সুমুর জন্য একটা ভালো ঘরের থেকে বিয়ের প্রস্তাব এসেছে। তাই আমরা বড়রা সকলে চাই, এই ছেলের সাথেই সুমুর বিয়ে দিয়ে দিতে।”
সুমুর মাথায় যেন বাজ পড়ল। হাত থেকে চপটা পড়ে গেল। আনোয়ার সাহেবের বলা কথাটা সুমুর মস্তিষ্ক এখনো বুঝে উঠতে পারেনি। সুমু এতোটাই অবাক হলো, যে কোনো প্রতিক্রিয়া দেখাতেই ভুলে গেল।
আনোয়ার সাহেব সুমুর দিকে তাকিয়ে বললেন,
“সুমু মামনি! তুমি ঠিক আছো তো?”
সুমু জোরপূর্বক হাসল। কিন্তু কোনো কথা বলল না। সে তাকাল তার সামনে বসে থাকা তার খান সাহেবের দিকে, যে এখনো কফিতে ছোট্ট ছোট্ট চুমুক দিচ্ছে। কোনো প্রতিক্রিয়া দেখা গেল না তার মাঝে। রাহিনরাও শেরাজের দিকে তাকিয়ে আছে। কিন্তু শেরাজের মধ্যে কোনো হেলদোল দেখা গেল না। তাকে দেখে মনে হচ্ছে, আনোয়ার সাহেব যে এমন কিছুই বলবে সেটা সে আগে থেকেই জানতো।
হঠাৎ রাহিন আনোয়ার সাহেবের উদ্দেশ্যে বলল,
“কিন্তু বাবা, কিছুদিন আগেই মাইশার বিয়ে হলো। এর মধ্যেই সুমুর বিয়ে দেওয়ার কি খুব দরকার?”
আনোয়ার সাহেব ছেলের দিকে তাকিয়ে বললেন,
“ভালো ছেলে হাতছাড়া করা বোকামির কাজ।”
মিনা বেগম বললেন,
“আর তাছাড়া একদিনতো বিয়ে দিতেই হবে। তাহলে এখন দিতে কি সমস্যা? আমরা সবাই রাজি। সুমুর মা-বাবাও রাজি।”
মাইশা বলল,
“কিন্তু মা, ইফতিয়া সুমুর বড়। ওর এখনো বিয়ে হয়নি। আর সুমু এখনো পড়াশোনা করছে। এতো তাড়াতাড়ি সুমুর বিয়ে দেওয়াটা কি খুব জরুরী?”
মিনা বেগম মেয়ের দিকে তাকিয়ে বললেন,
“ছেলের মা সুমুকে পছন্দ করেছে, ইফতিয়াকে না। ইফতিয়াকে পছন্দ করলে অবশ্যই ইফতিয়ার বিয়ে দিতাম। আর তাছাড়া পড়াশোনা তো সুমু বিয়ের পরেও করতে পারবে।”
খুশি বেগম বললেন,
“ছেলে কিছুদিন পর দেশের বাহিরে যাবে ব্যবসার কাজের জন্য। কবে আসবে তার কোনো ঠিক নেই। ছেলে চলে গেলে হাসনা বাড়িতে একা পড়ে যাবে। হাসনার স্বামীও সারাদিন অফিসে থাকে। তাই হাসনা চাইছে তাড়াতাড়ি বিয়েটা দিয়ে দিতে। আর হাসনা বলেছে, সে বাড়ির বউ চায়না, একটা মেয়ে চাই।”
খুশি বেগমের কথাশুনে আইয়ুব হেসে বলল,
“আন্টি! তাহলে সুমুর বিয়ে দিয়ে কি লাভ? এই ব্যাপারে সুমু তো আর হাসনা আন্টিকে কোনো হেল্প করতে পারবে না। হাসনা আন্টির তো এই ব্যাপারে তার হাজবেন্ডের সাথে কথা বলা উচিত। হাসনা আন্টি বুঝি, এই বয়সে তার হাজবেন্ডকে কথাটা বলতে লজ্জা পাচ্ছে? তাহলে আপনি আমাকে আন্টির হাজবেন্ডের নাম্বার দিন। আমি লজ্জার মাথা খেয়ে আঙ্কেলকে কথাটা বলে দিব।”
ড্রয়িংরুমে উপস্থিত সকলে ঠোঁট টিপে হাসছে। আনোয়ার সাহেব কেশে উঠলেন। খুশি বেগমের কথা বলা বন্ধ হয়ে গেল। শেরাজ এখনো ভাবলেশহীনভাবেই বসে আছে। আশেপাশের কোনো কথাতেই তার গুরুত্ব নেই। হঠাৎ সে সোফা থেকে উঠে দাঁড়িয়ে বলল,
“আঙ্কেল! আমার ইমপটেন্ট কিছু মিটিং আছে। আমি রুমে গেলাম।”
আনোয়ার সাহেব মাথা নাড়িয়ে সম্মতি জানালেন। তার সম্মতি পেয়ে শেরাজ সিড়ি বেয়ে ওপরে চলে গেল। সুমু ছলছল নয়নে তার খান সাহেবের যাওয়ার পানে তাকিয়ে রইল।
সুমুর বিয়ের কথা শুনে ইফতিয়া আর রাইশা খুশিতে আত্মহারা। লামিয়াও আগের চেয়ে অনেকটা সুস্থবোধ করছে এখন। সুমুর বিয়ের খবরটা মেডিসিনের মতো কাজ করেছে লামিয়ার ওপর।
শেরাজ চলে যেতেই খুশি বেগম বললেন,
“ভাইজান আমার বান্ধবী তো কালকেই সুমুকে দেখতে আসতে চায়।”
আনোয়ার সাহেব একটু ভেবে বললেন,
“এতো তাড়াহুড়ো করার কি আছে, বুঝলাম না।”
মিনা বেগম স্বামীর দিকে তাকিয়ে একটু উচ্চস্বরে বললেন,
“তুমি শুনলেনা ছেলে বাহিরে চলে যাবে। তারা ছেলের বাড়ির লোক, তাড়াহুড়োতো তাদের থাকবেই।”
আনোয়ার সাহেব শামীম সাহেবের দিকে তাকিয়ে বললেন,
“শামীম তোমার কি মতামত? সুমু তোমার মেয়ে। সবার আগে তোমার মতামত দরকার। তুমি চাইলে কথা এগোবে, তুমি না চাইলে এখানেই সব বন্ধ।”
সুমু একটু আশার আলো দেখতে পেল। ছলছল নয়নে সে তার বাবার মুখের দিকে তাকাল। সে মনে-প্রাণে চাইল, তার বাবা জানো একটিবার তার মুখের দিকে তাকায়। কিন্তু, সুমুর সব আশার আলোতে জল ঢেলে দিয়ে শামীম সাহেব বললেন,
মেয়ে হয়তো আমার। তবে মেয়ের ওপর আমার থেকেও মেয়ের মামা, খালাদের অধিকার বেশি। এখানে আমার কি মতামত থাকতে পারে?”
আনোয়ার সাহেব শামীম সাহেবের কথাশুনে বললেন,
“তুমি যেমনটা ভাবছো, তেমনটা নয় শামীম। সুমুর ওপর সবথেকে বেশি তোমারই অধিকার।”
শামীম সাহেব তাচ্ছিল্যে করে হেসে বললেন,
“কি করতে পেরেছি আমি আমার মেয়েদের জন্য? কিছুনা। তাই আজ আমার কোনো মতামত নেই। আপনারা যেটা ভালো বুঝেন, সেটাই করেন।”
কথাগুলো বলে উঠে চলে গেলেন শামীম সাহেব।
আনোয়ার সাহেব হতাশার নিঃশ্বাস ফেললেন। হাসি বেগম স্বামীর চলে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে বললেন,
“ভাইজান আপনি ওনার কথায় কিছু মনে করবেন না। আমি আপনাকে বলছি, আমরা দুজনেই এই প্রস্তাবে রাজি। আপনি কাল ছেলের বাড়ির লোককে আসতে বলুন।”
আনোয়ার সাহেব সম্মতি জানিয়ে রুমে চলে গেলেন। রাহিনরাও চলে গেল। ইফতিয়া আর রাইশা রুমে এসে ড্যান্স করছে। লামিয়া নিজের মত বদলেছে। সে কাল যাবে না। সে একেবারে সুমুর বিয়ের পর এই বাড়ি থেকে যাবে।
রাতে সকলে খেয়ে শুয়ে পড়েছে। সুমু আর শামীম সাহেব খায়নি। সামিয়া আর নাজমিন সুমুকে খাওয়ানো চেষ্টা করছে। কিন্তু সুমু অনবরত চোখের পানি ফেলেই চলেছে। সুমু কাঁদছে। তবে সেই কান্নার কোনো শব্দ নেই। নীরবে কান্না হয়তো সবথেকে কষ্টের হয়। সুমু শব্দ করে কাঁদতে পারেনা। সে জোরে কাঁদলে তার মাথা ব্যথা হয়। তার কান্নার আওয়াজ এখন পযর্ন্ত তার খুব কাছের মানুষ ছাড়া কেউ শোনেনি।
হঠাৎ শামীম সাহেব মেয়ের রুমে এলেন। সুমু তার বাবাকে আসতে দেখে দৌড়ে গিয়ে শামীম সাহেবের পা জড়িয়ে ধরে চিৎকার করে কেঁদে উঠল। এতোক্ষণ ধরে আটকে রাখা বুকের ভেতরের কষ্টকে আর ধরে রাখতে পারল না সে। শামীম সাহেবের পা জড়িয়ে ধরে সে বলল,
“আব্বু! আমাকে বিয়ে দিয়ে দিওনা। আমি এই বিয়ে করতে পারব না। তুমি আমাকে বাঁচাও আব্বু। নয়তো আমি মরে যাব।”
শামীম সাহেব পা ছাড়িয়ে নিয়ে মেয়ের কাছে বসলেন। মেয়ের মাথায় হাত রেখে বললেন,
“আমার কিছু করার নেই মা। তোর জীবনের সবথেকে বড় অভিশাপ হলো, তুই আমার মেয়ে। দ্বিতীয় অভিশাপ হলো, তুই একটা অতি সাধারন ঘরে জন্মেছিস। তোর বাবাকে তুই ক্ষমা করে দিস মা। তোর এই অপদার্থ বাবা তোর জন্য কোনোদিনও কিছু করতে পারেনি। আজও পারল না। তোর মামা, খালার কাছে তোর বাবা বিক্রি হয়ে গেছে মা। জীবনে তারা এতো করেছে আমাদের জন্য। তাই আজ তোর বাবার তোর জীবন সম্পর্কে কিছু বলার অধিকার নেই। আমাকে ক্ষমা করে দিস মা।”
সুমু তার বাবার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল কিছুক্ষণ। চোখ দিয়ে পানির সাগর বয়ে যাচ্ছে তার। জীবনে কোনোদিনও এতো কেঁদেছে কিনা সুমুর জানা নেই। বাবাকে আর কিছু বলতে ইচ্ছা করল না সুমুর। এই মানুষটাকে খুব ভালো করে সুমু চেনে। সে জানে, তার বাবার তার জন্য বুক ফেটে যাচ্ছে। সুমু খুব ভালো করেই জানে, তার বাবার কিছু করার নেই। তার আম্মু হয়তো এমন কিছু বলেছে, যার জন্য তার বাবা মেয়ের কষ্ট দেখেও কিছু বলতে পারছে না।
এরই মধ্যে হাসি বেগম এলেন মেয়ের রুমে। মেয়ের এমন অবস্থা দেখে অবাক হলেন তিনি। সুমু ছুটে গেল তার মায়ের কাছে। পা জড়িয়ে ধরে বলল,
“আম্মু! দুনিয়ার সব মায়েরা সন্তানের কষ্ট বোঝে। তুমি কি বুঝোনা আম্মু? তোমার মেয়ের বুকের ভেতরটা জ্বলে যাচ্ছে আম্মু। তুমি আমাকে বাঁচাও। এই বিয়েটা আমি করব না আম্মু। আমি তোমাদের ছেড়ে যেতে চাইনা আম্মু। আমার অনেক স্বপ্ন আম্মু। একদিন নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে আব্বুর পাশে দাঁড়াব। তুমি এই বিয়েটা ভেঙে দাও আম্মু।”
হাসি বেগম মেয়ের দিকে তাকিয়ে বললেন,
“পাগল মেয়ে! সব মেয়েদেরই একদিন মা-বাবা ঘর ছেড়ে শশুর বাড়ি যেতে হয়। কাঁদিস না তুই। দেখতো কেঁদে কেঁদে চোখ মুখের কি অবস্থা বানিয়েছিস। কাল ছেলের বাড়ির লোক আসবে। তোকে এইভাবে দেখলে তারা কি ভাববে বলতো। কাঁদিস না মা। খেয়ে, ঘুমিয়ে পড়।”
সুমু দুরে সরে গেল তার মায়ের কাছ থেকে। সে বুঝে গেছে, কেউ তার কষ্ট বুঝবে না। সে চিৎকার করে বলল,
“চলে যাও এই রুম থেকে তোমরা দুজনে।”
হাসি বেগম কিছুটা অসন্তোষ হলেন, তবে কিছু বললেন না। সময় দিলেন মেয়েকে। শামীম সাহেবকে নিয়ে বেরিয়ে চলে গেলেন রুম থেকে।
সুমুর এই কান্না মিনা বেগমকে খুব তৃপ্তি দিচ্ছে আজ। খুশি বেগম আর মিনা বেগম এতোক্ষণ রুমের বাহিরে দাঁড়িয়ে সবটা দেখেছেন। রুমে গিয়ে দুজনে অট্টহাসিতে ফেটে পড়েছেন।
ঘড়িতে সময় রাত একটা। সুমু বেলকনিতে দেওয়ালের সাথে পিঠ ঠেকিয়ে বসে আছে। চোখের জল আজ বাধ মানছে না যেন। শরীরের কোনো শীতের কাপড় নেই সুমুর। বাহির থেকে আসা হিমশীতল হাওয়া বয়ে যাচ্ছে বেলকনির ভেতরে। সেদিকে সুমুর কোনো খেয়াল নেই। রুমে আজ একাই আছে সে। সামিয়া আর নাজমিনকেও বের করে দিয়েছে রুম থেকে। হঠাৎ সুমুর কিছু একটা মনে হল। সে উঠে দাড়ালো চট করে। রুমের দরজা খুলে বেরিয়ে পড়ল রুম থেকে। এসে দাড়াল কাঙ্ক্ষিত রুমটির সামনে। দরজায় হাত রাখতেই দেখল রুমের দরজা খোলা। আজ আর দরজায় নক করল না সুমু। দরজা ঠেলে ঢুকে পড়ল রুমের ভেতরে। সে জানে, তার খান সাহেব এখনো ঘুমাইনি। রুমে ঢুকে পুরো রুম অন্ধকার দেখল সুমু। হঠাৎ বেলকনিতে চোখ পড়ল তার। সে এগিয়ে গেল বেলকনির দিকে। শেরাজ বেলকনির চেয়ারে মাথা হেলিয়ে দিয়ে চোখ বন্ধ করে বসে আছে। হয়তো সুমুর জন্যই অপেক্ষা করছিল। চোখ বন্ধ অবস্থায় শেরাজ বলল,
“হঠাৎ এতরাতে এই রুমে?”
সুমু অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল। খান সাহেব কীভাবে তার উপস্থিত টের পেল, বুঝতে পারল না সে। শেরাজ পুনরায় বলল,
“কি হলো? চুপ করে আছো যে?”
সুমু জিভ দিয়ে ঠোঁট ভিজিয়ে বলল,
“কাল আমাকে দেখতে আসছে, খান সাহেব।”
শেরাজ সেভাবেই বসে থেকে বলল,
“তাহলে তো তোমার এখন ঘুমানো উচিত। এমনিও পেত্নীর মতো দেখতে তুমি। না ঘুমিয়ে চোখের নিচে ডার্ক সার্কেল পড়ে গেলে, তখন তো ছেলের বাড়ির লোক পছন্দ করবে না তোমাকে।”
সুমু অবাক হয়ে তাকিয়ে বলল,
“আপনি কিছু বলবেন না খান সাহেব?”
“কি বলবো?”
“আপনার কিছুই বলার নেই?”
“আজব কথা! আমার কি বলার থাকতে পারে?”
“আজ আপনি আমার দিকে তাকাচ্ছেন না কেনো? আমার দিকে তাকিয়ে কথা বলুন।”
“তুমি কি কিছু বলতে চাও সুমু? যদি কিছু বলতে চাও, তাহলে তাড়াতাড়ি বলে এই রুম থেকে যাও।”
“আমার বিয়ে হয়ে গেলে। আপনি আমাকে মিস করবেন না, খান সাহেব?”
“হুম করব। তবে তোমাকে না, তোমার হাতের চা, কফি খুব মিস করব। কিন্তু মিস করে কি লাভ? তোমার বিয়ে হোক, বা না হোক। একদিন তো আমি আমার গন্তব্যে ফিরে যেতামই।”
“তাহলে আমাকেও নিয়ে চলুন আপনার সাথে। আপনার বাড়ির কাজের লোক বানিয়ে রাখবেন আমাকে। আমি আপনাকে রোজ চা, কফি বানিয়ে খাওয়াব।”
“কিন্তু সুমু! ওমানে আমার চা, কফিতো আমার বউ বানায়।”
মাথায় বাজ পড়ল সুমুর। বউ? তার খান সাহেবের বউ আছে? না বিশ্বাস করেনা সুমু। সে নিজেকে সামলে বলল,
“আপনার বউ বানায় মানে?”
“হুম! আমার বউ।”
“আপনার বউ আছে? মানে আপনি ম্যারিড?”
“হুম!”
“তাহলে সেটা আপনি সোশ্যাল মিডিয়াতে কাউকে বলেনি কেনো? সোশ্যাল মিডিয়াতে আপনি বলেন, যে আপনি আরও পরে বিয়ে করবেন?”
“হুম! আমি আনম্যারিড। তবে আমি এইটা মানিনা। তাকে আমি অনেক ভালোবাসি। আমাদের বিয়ে ঠিক হয়ে আছে। ওমানে ফিরে গিয়ে বিয়ে করে নিব। আর আমি আমার নিজের জিনিসকে সকলের সামনে উপস্থাপন করি না সুমু। ভালোবাসা গোপনেই সুন্দর। বেশি মানুষের সামনে ভালোবাসা প্রকাশ্য করলে, ভালোবাসা নষ্ট হয়ে যায়। আর তার কথা সোশ্যাল মিডিয়াতে বললে, সবাই থাকে দেখতে চাইবে। এইটা আমি চাইনা। তাকে শুধু আমি দেখব আর কেউ না।”
সুমু আর সহ্য করতে পারল না। তার মনে হলো, সব শেষ। যার জন্য এতোকিছু, আজ সুমু জানতে পারল সেই মানুষটার বিয়ে ঠিক। এখন কি করবে সে? মরে যাবে? না সে মরবে না। তবে সে এই বিয়েটাও করবে না। আজ তার সব শেষ। বুকের ভেতরটা ভেঙেচুড়ে শেষ হয়ে যাচ্ছে তার। চারপাশ কেমন ফাঁকা ফাঁকা লাগছে। এতো কষ্ট কেনো হচ্ছে তারর। তার যে চিৎকার করে বলতে হচ্ছে করছে, “আমি আপনাক ভালোবাসি খান সাহেব। অনেক ভালোবাসি।”
নিজেকে আর ধরে রাখতে পারল না সুমু। ছুটে দৌড়ে গেল শেরাজের পায়ের কাছে। সে কান্না করতে করতে বলল,
“আমি আপনাকে ভালোবাসি, খান সাহেব। অনেক ভালোবাসি। প্লিজ, এমনটা করবেন না। আমি মরে যাব।”
“পাগলামি করো না, সুমু। রুমে যাও।”
“আপনি কারো না, কারো তো হবেনই খান সাহেব? সেই কেউটা না হয় আমি হলাম।”
“সেই কেউটা অন্য কেউ, সুমু।”
“আমি আপনাকে ভালোবাসি, খান সাহেব।”
“আমি অন্য একজনকে ভালোবাসি, সুমু।”
“আমি আপনাকে ভালোবাসি, খান সাহেব।”
“আর আমি অন্য একজনকে ভালোবাসি, সুমু।”
“আমি বিশ্বাস করিনা।”
“সেটা একান্তই তোমার ব্যাপার। কিন্তু তাতে সত্যিটা মিথ্যা হয়ে যাবে না।”
“সে কি অনেক সুন্দরী?”
“সুন্দর বললে, তাকে ছোট করা হবে। সে আরো বড় কিছু ডির্জাব করে।”
“সত্যি? এতোটা সুন্দরী সে?”
“অন্যের কথা জানিনা। আমার কাছে সে দুনিয়া আর জান্নাতের মধ্যে সব নারী থেকেও সবচেয়ে বেশি সুন্দর নারী।”
“অনেক ভাগ্যবতী সে?”
“আমি ভাগ্যবান।”
“কতোটা ভালোবাসেন তাকে?”
“এমন প্রশ্ন কোনোদিনও মাথাতেই আসেনি। তার প্রতি আমার ভালোবাসা বলে বোঝানো অসম্ভব।”
“আজ আপনি একটা কথাও আমার দিকে তাকিয়ে বলেন নি।”
“ইচ্ছে করেনি তাকাতে।”
সুমুর আর কথা বলতে ইচ্ছে করল না। ভেতরটা জ্বলে যাচ্ছে তার। মৃত্যুর যন্ত্রণাও হয়তো এই যন্ত্রণার কাছে কিছুই না। চলে যাবার জন্য পা বাড়াচ্ছিল সে। আবারও ঘুরে দাঁড়িয়ে বলল,
“আমার ডায়েরিটা?”
“টেবিলের ওপর আছে।”
সুমু টেবিলের ওপর থেকে ডায়েরিটা হাতে নিয়ে আবারও ফিরে এসে বলল,
“আমার ডায়েরির প্রতিটা পাতায় এমন গভীরভাবে তুলে ধরব আপনাকে। আমার লেখা প্রতিটা শব্দ যে পড়বে, সেও পাগলের মতো ছটফট করে বলবে, কে এই মহাপুরুষ যার জন্য তোমার এতো বিদ্রোহ?”
কথাটা বলে একছুট্টে বেরিয়ে গেল সে। আজ সুমু কাঁদবে। অনেক কাঁদবে।
শেরাজ উঠে দাঁড়াল। সুমুর যাওয়ার পানে তাকিয়ে বিড়বিড়িয়ে বলল,
“তোমার চোখের দিকে তাকিয়ে মিথ্যা বলার ক্ষমতা আমার নেই। মাত্র কয়েক ঘন্টায় চোখ মুখের কি অবস্থা করেছো তুমি। তোমার এমন অবস্থা দেখার মতো ক্ষমতা বা সাহস আমার মধ্যে নেই সুমু। তোমার চোখের দিকে তাকালে হয়তো তোমাকে এইভাবে আঘাত দিয়ে কথা বলতে পারতাম না আমি। আর তোমাকে নিজের করে নিতে হলে, তোমাকে এইটুকু আঘাত আমার দিতেই হবে।”
খান সাহেব পর্ব ১৪
কথাগুলো বলে শেরাজ তীক্ষ্ম দৃষ্টিতে শূণ্যের দিকে তাকিয়ে রইল। ধীরে ধীরে তার ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল বাঁকা এক হাসি।
সুমু রুমে এসে দরজা লক করে দিয়েছে। বিছনায় উঁপুর হয়ে শুয়ে কাঁদছে সে। আজ সে সত্যি কাঁদবে। তবে জীবনের শেষ কান্না কাঁদবে। এমনিতেও কান্না ছাড়া তার জীবনে আছেই বা কি? একটা সময় কাঁদতে কাঁদতে কান্ত হয়ে চোখ বন্ধ করল সে।
