খান সাহেব পর্ব ১৬
সুমাইয়া জাহান
মানুষের মন হলো তাশের ঘরের মতো, একবার ভেঙে গেলে আর শতো চেষ্টা করেও জোড়া লাগানো যায়না। সুমুর মনটাও আজ তাশের ঘরের মতো ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে গেছে। সে পালিয়ে যেতে চাইছে সবকিছু ছেড়ে, কিন্তু পারছে না। বাবার মান-সম্মান, মামার মান-সম্মান– এই সবকিছু তার পায়ে শিকল পরিয়ে রেখেছে।
সন্ধ্যায় সুমুকে দেখতে আসবে। সে সামিয়ার মুখে শুনেছে, ছেলে আসছে না। শুধু ছেলের মা-বাবা আসবে। ছেলের নাকি অসিফে জরুরী মিটিং আছে। তাই সে আসতে পারবেনা।
সিকদার বাড়িতে রান্নার ধুম পড়েছে। সন্ধ্যা হতে আর বেশি দেরি নেই। আর কিছুক্ষণের মধ্যে হয়তো ছেলের বাড়ির লোকেরা চলে আসবে। খুশি বেগম তাদের রাতের ডিনার করিয়ে, তবেই ছাড়বেন বলেছেন। কাল রাত থেকে সুমু ঠিকমতো কিছু খায়নি। একেবারে না খেয়ে সুমু নিজেকে আর কষ্ট দিতে চায়না। তাই অল্প হলেও একটু আগে কিছু খেয়েছে সে। সে পণ করেছে আর কষ্ট পাবে না। আর কাঁদবে না। কার জন্য কাঁদবে? যে মানুষটা সুমুর নয় অন্যকারো, তার জন্য কেঁদে আর কি লাভ। সুমু তো মরিচিকার পিছনে ছুঁটছিল এতোদিন। আজ সুমুর চোখের সামনে সবকিছু পরিষ্কার হয়ে গেছে।
বেলকনিতে দাঁড়িয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে গভীর ভাবনায় বিভোর সুমু। হঠাৎ রুমের দরজা খোলার শব্দে ধ্যান ভাঙাল তার। মাইশা এসেছে। হাতে নীল রঙের একটা শাড়ি। বেলকনি ছেড়ে রুমে আসল সুমু। মাইশা সুমুর মুখের দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে বলল,
“চোখ মুখের কি অবস্থা করেছিস সুমু? কি হয়েছে তোর? বিয়েটা কেনো করতে চাইছিস না? শুনলাম কাল সারারাত কেঁদেছিস। এখন আবার একদম চুপ মেরে গেছিস। একফোঁটাও চোখে পানি নেই তোর। আমার তোকে দেখে ভালো লাগছে না সুমু। কি হয়েছে তোর?”
সুমু বিছানায় আরাম করে বসে বলল,
“কি হবে মাইশা আপু? আমি একদম ফিট অ্যান্ড ফাইন। কেঁদে কি হবে বলো? বলির পাঠা যখন জেনে যায় যে, সে যতই কাঁদুক তার বলি হবেই। তাহলে আর কেঁদে কি লাভ?”
মাইশা কপালে কিছু ভাঁজ ফেলে বলল,
“তাহলে তুই বলছিস তোকে বলি দেওয়া হচ্ছে?”
সুমু তাচ্ছিল্য করে হেসে বলল,
“না! আমার মা-বাবা তাদের বড় মেয়ের ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করছে। তুমি শাড়ি পড়াতে এসেছো তো? তাহলে শাড়ি পড়াও।”
মাইশা গিয়ে বসল সুমুর পাশে। সে সুমুর কাঁধের ওপর হাত রেখে বলল,
“তোকে আমি বুঝতে পারছিনা সুমু।”
“আমাকে তো আমি নিজেই নিজেকে আজ পযর্ন্ত বুঝে উঠতে পারলাম না। তুমি কীভাবে বুঝবে? এখন রাখো তো এইসব কথা। আজ আমাকে দেখতে আসছে। আমাকে শাড়ি পরিয়ে অনেক সুন্দর করে সাজিয়ে দাও, যাতে আমার হবু শশুর বাড়ির লোকজন আজই আমাকে তাদের সাথে করে নিয়ে যেতে চাই।
কথাগুলো বলে কেমন করে যেন হাসল সুমু। সেই হাসিতে কোনো প্রাণ ছিল না। মাইশা আর দেরি করল না। সে সুমুকে সুন্দর করে শাড়িটা পরিয়ে দিল। আজ আর সাজাতে বারণ করল না সুমু। বরং নিজেই এটা-ওটা হাতে নিয়ে বলছিল, “আমাকে এটা দিয়ে সাজাও, ওটা দিয়ে সাজাও।” মাইশার স্বাভাবিক লাগল না কিছুই। সে সুমুকে সাজিয়ে দিয়ে বসিয়ে রেখে চলে গেল। মাইশা চলে যেতেই সুমু উঠে দাঁড়াল। ড্রয়ার থেকে ডায়েরিটা বের করে টেবিলে গিয়ে বসল। তারপর পেনটা নিয়ে লিখতে শুরু করল।
“আপনি আমার সেই লুকানো শহর, যেখানে চাইলেই হারিয়ে যাওয়া যায়। আপনাকে ছোঁয়া বারণ, দেখা পাওয়াও ভার; শুধু অনুভবের চাদরে জড়িয়ে রাখা যায়। ভিড়ের মাঝে আপনাকে খুঁজতে হয় না, কারণ আপনি থাকেন আমার একান্ত নির্জনে—চায়ের কাপে ওঠা ধোঁয়ায় কিংবা অসময়ের কোনো এক শ্রাবণে।”
কথাগুলো লিখতে গিয়ে দু’ফোঁটা পানি গড়িয়ে পড়ল সুমুর চোখ থেকে। চটজলদি হাত দিয়ে পানিটা মুছে নিল সে। ডায়েরিটার থেকে অদ্ভুত সুন্দর একটা স্মেল আসছে সুমুর নাকে। স্মেলটা তার বড্ড পরিচিত। ডায়েরিটা নাকের কাছে এনে চোখ বন্ধ করে স্মেলটা অনুভব করল সুমু। তার মনে হলো, তার খান সাহেব তার কাছে দাঁড়িয়ে আছে। চোখ মেলে তাকাল সুমু। ডায়েরিটা পুনরায় জায়গায় রেখে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ল। বিছানা থেকে ফোনটা নিয়ে গ্যালারি অপশনে ঢুকল। শেরাজের হাস্যজ্বল একটা ছবি বের করে অপলক তাকিয়ে রইল। কি সুন্দর হাসছে তার খান সাহেব। ছবিটা দেখে মনটা অদ্ভুতভাবে ভালো হয়ে গেল তার। শেরাজের হাসি মাখা ছবিগুলো সমসময় মন ভালো করার ঔষধ সুমুর।
হঠাৎ দরজার কড়া নাড়তেই ফোনের হোম স্ক্রিনে এসে ফোনটা বন্ধ করে রাখল সুমু। রুমের ভিতরে ঢুকে এলো মাইশা, সামিয়া, নাজমিন, তিশা, রাইশা, ইফতিয়া, রাইফ, লামিয়া।
মাইশা সুমুর কাছে এসে বলল,
“চল সুমু! ওনারা চলে এসেছে। তোকে দেখতে চাইছে। আব্বু তোকে নিয়ে যেতে বলেছে।”
ফোনটা বিছানার ওপর রেখে উঠে দাঁড়াল সুমু। সকলের সাথে এগিয়ে চলল ড্রয়িংরুমের দিকে।
ড্রয়িংরুমে সকলে উপস্থিত। আনোয়ার সাহেব, হাসনা বেগমের স্বামী আফতাব উদ্দিনের সাথে কথা বলছেন। শামীম সাহেব পাশে চুপ করে বসে আছেন। খুশি বেগম তার বান্ধবীর সাথে বসে হেসে হেসে কথা বলছেন। হঠাৎ সুমুকে দেখে উঠে দাঁড়াল হাসনা বেগম। সুমুর কাছে এসে সুমুর থুতনি ছুঁয়ে চুমু খেয়ে “মাশআল্লাহ” বললেন তিনি। সুমুর হাত ধরে টেনে নিয়ে গিয়ে নিজের পাশে বসালেন। হাসনা বেগম সুমুর সাথে নানান কথা বলতে শুরু করলেন। সুমু হ্যাঁ, না করে উত্তর দিচ্ছে। কিন্তু ঠিকমতো কোনো কথায় কানে পৌঁছাচ্ছেনা তার। তার চঞ্চল চোখ দুটো কাউকে খুঁজছে। হঠাৎ সিড়ির দিকে চোখ গেল সুমুর। শেরাজ শার্টের হাতা ফোল্ড করতে করতে নিচে নামছে। তাকে দেখে মনে হচ্ছে কোথায়ও বেরোবে।
আনোয়ার সাহেব শেরাজকে দেখে ডাক দিয়ে বললেন,
“কোথায়ও যাচ্ছো নাকি বাবা?”
শেরাজ দুইহাত পকেটে গুজে দাঁড়িয়ে বলল,
“হ্যাঁ আঙ্কেল! আমার পি.এ আসছে আজ। ওকে এয়ারপোর্ট থেকে এনে একটা হোটেল বুক করে দিয়ে আসতে যাচ্ছি।”
রাহিনরা সকলে অবাক। স্যান্ডির বাংলাদেশে আসার কারণটা ওরা বুঝল না। আনোয়ার সাহেব আবারও বললেন,
“আমার বাসা থাকতে হোটেল কেনো? তোমার পি.এ কে এই বাড়িতে নিয়ে আসো।”
শেরাজ সম্মতি জানিয়ে চলে যাচ্ছিল। আনোয়ার সাহেব আবারও তাকে ডেকে বললেন,
“শেরাজ বাবা! বাসায় মেহমান এসেছে। একটু বসে, তারপর যাও।”
শেরাজ সুমুর দিকে তাকাল। সুমু করুণ দৃষ্টিতে তার দিকেই তাকিয়ে আছে। শেরাজ চোখ সরিয়ে নিয়ে সুমুর সামনের সোফায় বসল। রাহিনরা সকলে ঠোঁট টিপে হাসছে। আইয়ুব রাহিনের কানের কাছে গিয়ে বলল,
“মা-বাবা হয়তো এস.কের না। তবে দেখে মনে হচ্ছে, সুমুকে এস.কেই দেখতে এসেছে।
হাসনা বেগম শামীম সাহেবকে বললেন,
“ভাই, আপনার মেয়েকে নতুন করে আর দেখার কিছুই নেই। সুমুকে আমি যতই দেখব, ততোই মুগ্ধ হবো। নিখুঁত সুন্দরী আপনার মেয়ে। শুধু আমি কেনো, দুনিয়ার কোনো মায়েরই তার ছেলের জন্য সুমুকে অপছন্দ হবেনা। আমার আর কিছু দেখার নেই, ভাই। আমি শুধু যতো দূরত্ব সম্ভব বিয়েটা দিয়ে দিতে চাই। মানে আজকে তো মঙ্গলবার। এই শুক্রবারেই যদি বিয়েটা হয়ে যেত, তাহলে আমাদের জন্য ভালো হতো। এখন আপনাদের কি মত আপনারাই বলেন।”
শামীম সাহেব বুঝতে পারছেনা, এরা এতো তাড়াহুড়ো কেনো করছে। তিনি ভদ্রতাসূচক হেসে বলল,
“কিন্তু আপা! এতো তাড়াতাড়ি কীভাবে কি? মানে আমাদেরও তো একটা প্রস্তুতির ব্যাপার আছে। এভাবে এতো তাড়াতাড়ি কীভাবে কিছু করব?”
হাসনা বেগম খুশি বেগমের দিকে তাকালেন। খুশি বেগম বললেন,
“দুলাভাই! আপনি কোনো চিন্তা করবেন না। আপনি শুধু মত দিন। আমরা সবাইতো আছি। আমরা সকলে মিলে সব ব্যবস্থা করে নিব।”
শামীম সাহেব কিছুটা গম্ভীর হয়ে বললেন,
“তাহলে আর কি। আমার মেয়ের জন্য তো সবাই আছে। করো, তোমাদের যেটা ভালো মনে হয়।”
হাসনা বেগম খুব খুশি হলেন। হাসি হাসি মুখ করে তিনি আনোয়ার সাহেবের দিকে তাকিয়ে বললেন,
“ভাইজান আপনি কি বলেন?”
আমি আর কি বলব। শামীম আর হাসি যখন মত দিয়েছে, তখন আমার আর অমত করার কিছুই থাকেনা। কিন্তু তোমার ছেলেটা আসলে খুব ভালো হতো। তোমার ছেলে বিয়েতে রাজিতো হাসনা?”
“আর বলবেন না ভাইজান। ছেলেটা আমার এতো লক্ষী কি বলব। আমাকে বলল, “মা তুমি গিয়ে দেখে আসো। তোমার পছন্দই আমার পছন্দ।”
হাসনা বেগমের কথাশুনে শেরাজ বাঁকা হাসল। মনে হলো, খুব মজা পেয়েছে সে কথাগুলো শুনে। আনোয়ার সাহেব একটু ভাবুক হয়ে বললেন,
“বুঝলাম, তোমার ছেলে অনেক লক্ষীছেলে, ভালো ছেলে। কিন্তু তারপরও ছেলেমেয়ে দুজন দুজনকে দেখল না, কথা বলল না। ব্যাপারটা কেমন দেখায় না।”
মিনা বেগম বিরক্তিরস্বরে বললেন,
“থামো তো তুমি। এতো দেখা, কথা বলার কি আছে? মা-বাবা পছন্দ করছে ছেলেমেয়ের জন্য উপযুক্ত জীবন সঙ্গী। আমরা তো আর খারাপ জীবন সঙ্গী পছন্দ করব না ছেলেমেয়েদের জন্য। বাকি দেখা সাক্ষাত বিয়ের পরে হবে। আর ছেলে তো সুমুর ছবি দেখে সুমুকে পছন্দ করেছে। আর সুমুকেও ছেলের ছবি সকালে দেখানো হয়েছে। এখন শুধু ভালোয় ভালোয় বিয়েটা হয়ে যাক। কি হাসি আপা! আপনি কি বলেন?”
হাসি বেগম আলতো হেসে বললেন,
“হ্যাঁ ঠিকি তো। তবে বিয়েটা বেশি ধুমধাম না করে, অল্প আয়োজনে হবে।”
হাসনা বেগম বললেন,
“হাসি আপা! আপনারা আপনাদের সুবিধা মতো যা পারেন করেন। কিন্তু আমার বাড়িতে সব হবে। আমার একমাত্র ছেলে। আমি কোনো ত্রুটি রাখতে চাইনা।”
বিয়েতে সকলে মত দিল। কাল বিয়ের শপিং করবে, পরশু গায়ে হলুদ আর মেহেন্দী হবে। তারপর শুক্রবারে বিয়ে। সকলে একসাথে “আলহামদুলিল্লাহ্” বলে মিষ্টি মুখ করল। সুমু মাথা নিচু করে বসে আছে। নিজের জীবনটাকে আজ মূল্যহীন মনে হচ্ছে তার। জীবনটাকে আজ ভাগ্যের ওপর ছেড়ে দিল সে। আড়ে-আড়ে একবার শেরাজের দিকে তাকাল সে। তখনই শেরাজ উঠে দাঁড়াল। তারপর আনোয়ার সাহেবের থেকে অনুমতি নিয়ে, নিজের বন্ধুদের নিয়ে বেরিয়ে পড়ল এয়ারপোর্টের উদ্দেশ্যে।
গাড়ি ড্রাইভ করছে রাহিন। শেরাজ পাশে বসে ফোনে স্ক্রল করছে। দুটো গাড়ি নিয়ে বেরিয়েছে তারা। সারবাজদের গাড়িতে হই-হুল্লর হলেও রাহিনদের গাড়ির সকলে চুপচাপ। কেউ কোনো কথা বলছে না। সকলেই শেরাজের ভাবমূর্তি বোঝার চেষ্টা করছে। কিন্তু শেরাজকে দেখে কিছুই বোঝা যাচ্ছেনা। হঠাৎ রাহিন নিরবতা ভেঙে বলল,
“তোর ব্যাপারটা কিরে এস.কে?”
শেরাজ কোনো কথা বলল না। ফোনে মন দিয়ে পড়ে থাকল সে। রাহিন বিরক্তি হয়ে আবারও বলল,
“সেদিন লামিয়া মেয়েটার সাথে যে তুই কিছু করেছিস, সেটা আমরা সবাই জানি। কিন্তু আজ, সুমুর বিয়ে হয়ে যাচ্ছে। আর তোর মধ্যে কোনো রিয়েকশন নেই। আমরা এইটা বুঝতে পারছি, তুই কিছু করবি, কিন্তু কি করবি সেটাই বুঝতে পারছি না। দয়া করে আমাদেরকে একটু বলবি, তুই ঠিক কি করতে চাইছিস?”
“কিছু না।”
সকলে অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল শেরাজের দিকে। শেরাজ ফোনে স্ক্রল করতে করতে বলল,
“আমার মুখে কি তোদের বাসর রাতের সিন দেখতে পাচ্ছিস, যে এইভাবে তাকিয়ে আছিস। সামনে তাকিয়ে ড্রাইভিংয়ে মন দে রাহিন।”
রাহিন সামনে তাকিয়ে বলল,
“তুই সত্যি কিছু করবি না?”
“কি করব?”
“বিয়েটা আটকাবি না?”
“না!”
“তুইতো সুমুকে ভালোবাসিস। এইভাবে ওকে অন্যের হতে দিবি?”
“বিয়ে হলে সুমু অন্যের হতে যাবে কেনো? আমারই তো থাকবে।”
“মানে?”
“তোকে ওতো বুঝতে হবেনা।”
“সূর্যমামা বাংলাদেশে কেনো আসছে?”
“কাজ আছে তাই।”
“স্যান্ডির বাংলাদেশে কি কাজ?”
“হলেই দেখতে পারবি।”
“তুই এতো হেয়ালি না করে পরিষ্কার করে বলবি, যে তুই ঠিক কি করতে চাইছিস?”
“আপাতত কিছু করতে চাইছি না। যখন করব, তখন দেখতেই পারবি। এখন শুধু শুধু প্রশ্ন করে কানের মাথা খাসনা।”
রাহিন কিছু বলতে গিয়েও বলল না। আইয়ুব বলল,
“বাদ দে। ও যা করতে চাইছ করুক। শুধু শুধু প্রশ্ন করে কোনো লাভ নেই। ও এখন কিছুই বলবে না।”
আইয়ুবের কথা শুনে রাহিন আর কিছু বলল না। সে চুপচাপ ড্রাইভিংয়ে মন দিল।
সুমুকে হাসনা বেগম নিজের সাথে নিয়েই খেতে বসেছেন। তারা খেয়েই বেরিয়ে পড়বেন। সুমুকে এটা ওটা নিজ হাতেই তুলে দিচ্ছেন হাসনা বেগম। কিন্তু সুমু কিছুই ভালো করে খাচ্ছেনা। হাসি বেগম, হাসনা বেগমের আচরণে মুগ্ধ।
হাসনা বেগম বললেন,
“কালতো তোমরা শপিংয়ে যাবে। আমার ছেলেও আসবে সেখানে। তোমার পছন্দ মতো যা যা ভালো লাগে সবকিছু কিনবে সুমু। আর পারলে রিফাতের সাথে কাল আলাদা করে কথা বলে নিও।”
সুমু কোনো কথা বলল না। খুশি বেগম হাত দিয়ে সকলের অগোচরে খোঁচা মারল হাসনা বেগমকে। হাসনা বেগম চোখ দিয়ে আশ্বাস দিলেন খুশি বেগমকে।
গাড়ি এসে থামল এয়ারপোর্টের সামনে। স্যান্ডিকে দেখে সকলে গাড়ি থেকে নেমে ছুটে গেল। শেরাজ দুইহাত পকেটে গুজে ধীর পায়ে এগিয়ে গেল। আইয়ুব স্যান্ডিকে বুকে জড়িয়ে বলল,
“ওয়েলকাম সানমামা।”
স্যান্ডি হেসে ফেলল। স্যান্ডি শেরাজদের বয়সি। দেখতে শুনতে ভালো। গায়ের রং ফর্সা। লম্বায় শেরাজের থেকে একটু শর্ট। জিম করা বডি। শেরাজ সবগুলো বন্ধুই ফর্সা, লম্বা। সবারই শেরাজের মতো জিম করা বডি। ওমানে সকাল, সন্ধ্যা সবাই একসাথে জিমে কাটায়। হালকা চাপ দাঁড়িও আছে সকলের মুখে। বলতে গেলে শেরাজের সবগুলো ফ্রেন্ডের একই গেটআপ। এমনিতে সবাই বাচ্চাসূলভ। কিন্তু একবার রেগে গেলে সকলেই ব্লাস্ট করে। তবে বাকিদের থেকে ফ্রেন্ডগুলোর মধ্যে শেরাজ একটু ব্যাতিক্রম। সকলের মধ্যে ফেমাসও বেশি। নিজের বিজনেস আর গিফটিং দিয়ে সকলের মাঝে নাম্বার ওয়ান। প্রতিবছর কোনো না কোনো প্লাটফর্ম থেকে অ্যাওয়ার্ড পেয়েই থাকে সে। সৌন্দর্যের দিক দিয়েও সবগুলো ফ্রেন্ডের মধ্যে বেস্ট। গেটআপ অলওয়েজ শাহরুখ খানের মতো। তার অনেক ফ্যান ফলোয়ারদের কাছে দ্বিতীয় শাহরুখ খান নামে পরিচিত সে। কখনো কখনো ফেসের গড়ন সিদ্ধার্থ মালহোত্রার মতো লাগে বলে অনেকের সিদ্ধার্থ বলে ডাকে। কিন্তু বাস্তব জীবনে শেরাজ শাহরুখ খানের ফ্যান। শেরাজ যখন রেখে যায়, তখন যে কেউ তাকে ভয় পেতে বাধ্য। আর যখন হাসে, তখন যে কোনো মেয়ে সেই হাসিতে পাগল হতে বাধ্য। তাছাড়া তার বডি ফিটনেস, অ্যাটিটিউড যেকোনো মেয়েকে আকর্ষিত করতে বাধ্য। আফগানিস্তানে জন্মগ্রহণ করায় “পাঠান আর তালেবান” নামে পরিচিত সে। শেরাজদের জাতীয় ভাষা “পাশতো।” তবে বিজনেসের জন্য তাকে নানান রকমের ভাষায় অভ্যস্ত হতে হয়েছে।
হঠাৎ সারবাজ বলল,
“সান ব্রো! এই পার্সেলের ভিতরে কি আছে? আর এতো পার্সেল কেনো? এতো কি এনেছো তুমি?”
স্যান্ডি শেরাজ দিকে তাকাল। স্যারের পারমিশন ছাড়া স্যান্ডি এই ব্যাপারে কাউকে কিছুই বলতে পারবে না। তাই সে করুণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে তার স্যারের দিকে। শেরাজ স্যান্ডির অস্বস্তি বুঝতে পেরে বলল,
“ওগুলো সব আমার পার্সেল। আমি আনিয়েছি। অনেক প্রয়োজনীয় জিনিস। ওগুলো কাছ থেকে সরে দাঁড়া।”
আইয়ুব ভ্রু কুঁচকে বলল,
“এস.কে তুই জানিস না, নিষিদ্ধ জিনিসে আগ্রহ বেশি জাগে? এখনতো আমার মনটা পার্সেলের ভেতরে কি আছে সেটা দেখা জন্য আকুঁপাকু করছে।
শেহেরাজ গম্ভীরস্বরে বলল,
“সবকিছুর একটা নিদিষ্ট সময় থাকে আইয়ুব। আপাতত পার্সেলগুলো সকলে মিলে গাড়িতে তোল। সাবধানে তুলবি। সঠিক সময় হোক, অবশ্যই জানতে পারবি এর মধ্যে কি আছে।”
সকলে হতাশার নিঃশ্বাস ফেলে নিজেদের কৌতূহল দমিয়ে রেখে পার্সেলগুলো একে একে গাড়িতে তুলতে লাগল।
সিকদার বাড়ির সকলে ঘুমিয়ে পড়েছে। রাহিন, আনোয়ার সাহেবকে কল করে জানিয়েছে “তারা রাতে খেয়ে আসবে আর ফিরতে একটু লেট হবে। সবাই যেন খেয়ে ঘুমিয়ে পড়ে।” আনোয়ার সাহেবরাও তাই খেয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে। সুমু আজও রুমে একাই শুয়েছে। তবে ঘুম নেই তার চোখে। বেলকনিতে দাঁড়িয়ে চাঁদের দিকে তাকিয়ে আছে। হঠাৎ বাহিরে গাড়ির শব্দ শুনে রুম থেকে বের হলো সুমু। নিচে গিয়ে সদর দরজা খুলে দিল। রাহিন আনোয়ার সাহেবকে কল করতে যাচ্ছিল। সদর দরজা খুলতে দেখে আর কল না করে ভেতরে ঢুকে আসলো। সে সুমুকে দেখে বলল,
“তুই এখনো ঘুমাসনি কেনো সুমু?”
সুমু জোরপূর্বক হেসে বলল,
“ঘুমিয়েই তো ছিলাম ভাইয়া। হঠাৎ পানির পিপাসা লেগেছিল। রুমে পানি ছিল না। তাই পানি খেতে নিচে নেমেছিলাম ভাইয়া।”
আর কেউ ধরতে না পারলেও শেরাজ খুব ভালো করেই জানে সুমু ঘুমাইনি। তার জন্য অপেক্ষা করছিল সে। রাহিন আবারও বলল,
“তোর কি মন খারাপ সুমু?”
সুমু এবার তাকাল শেরাজের দিকে। শেরাজ ফোনে স্ক্রল করছে। সুমু বুঝে পায়না এই লোকটা সারাদিন ফোনে এতো কি কাজ করে। তখনই সুমুর মনে পড়ল কাল রাতের কথা। তার খান সাহেবের তো ভালোবাসার মানুষ আছে। কথাটা মনে পড়তেই বুকের ভেতর চিনচিন ব্যথা করে উঠল তার। সে মুখে হাসি রেখে বলল,
“আমার মন কেনো খারাপ হতে যাবে ভাইয়া? আমার তো এখন আরো খুশির দিন। শুক্রবারে আমার বিয়ে। আমি খুব এক্সসাইটেড। কাল আবার শপিং করতে যাব। সেখানে আমার হবু হাজবেন্ড আসবে। আমি তো অনেক এক্সসাইটেড তার সাথে দেখা করার জন্য। শুধু ভাবছি, কখন সকাল হবে আর তার সাথে দেখা করব। রিফাতকে ছবিতে দেখেছি আমি। অনেক সুন্দর দেখতে। আমার খুব পছন্দ হয়েছে। সবাই বলেছে আমার সাথে দারুন মানাবে। আমার তো এক্সসাইটমেন্টের জন্য ঘুমই আসছে না ঠিকমতো। কবে যে শুক্রবার আসবে, আর আমি বিয়ে করে শশুরবাড়িতে যাব। উফ! আমি আর পারছিনা অপেক্ষা করে থাকতে।”
শেরাজ ফোনে চোখ রেখেই সব কথাগুলো শুনলো। সুমুর কথা শেষ হতেই হনহনিয়ে নিজের রুমে চলে গেল সে। সুমুও নিজের রুমে চলে গেল। আইয়ুবরা ড্যাবড্যাব করে তাকিয়ে রইল দুজনের যাওয়ার পানে। হঠাৎ কিছু ভাঙার আওয়াজ এলো আইয়ুবদের কানে। একসেকেন্ডও না দাঁড়িয়ে সকলে ছুটল শেরাজের রুমের দিকে। স্যান্ডি ভয়ে কাঁপছে। আইয়ুবরা রুমে এসে দেখল, কাঁচের ফুলদানি ভেঙে পড়ে আছে। শেরাজের হাতের মধ্যে এখনো ফুলদানির ভাঙা টুকরো। সে শক্ত করে হাতের মুঠোয় চেপে ধরে রেখেছে টুকরোটা। হাত দিয়ে চুয়ে চুয়ে রক্ত মেঝেতে পড়ে মেঝে লাল হয়ে গেছে। রাহিনরা দৌড়ে গিয়ে তার হাত থেকে জোর করে কাঁচের টুকরোটা ফেলল। শেরাজ ঝাটকা মেরে হাতটা ছাড়িয়ে নিয়ে দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
“তোর বোনকে বলে দিস, ওর এইসব অসভ্য মার্কা কথার ফল অন্য কাউকে ভুগতে হতে পারে। আমি কোনো নির্দোষের প্রাণ নিতে চাইনা। সময় থাকতে তোর বোনকে সাবধান করে দিস। নেক্সট টাইম আমার সামনে এইসব কথা বললে, ওকে পুঁতে রেখে দেবো। ওর ভালো লাগাকেও দুনিয়া থেকে মুছে ফেলব। এই শেরাজ খান ছাড়া তোর বোনের জীবনে দ্বিতীয় কোনো ভালো লাগে আসবেন না।”
“এস,কে! কথাগুলো সুমু তোকে রাগানোর জন্য বলেছে। তুই কেনো এতো হাইপার হচ্ছিস?”
শেরাজ গর্জে উঠে বলল,
“বলবে না। এমনি, সিরিয়াসলি, মজা করে, রাগানোর জন্য, যেজন্য বলুক, বলবে না ও। আমি ছাড়া অন্য কোনো ছেলের নাম ওর মুখে শুনতে চাইনা আমি।”
রাহিনরা সকলে মিলে শান্ত করল শেরাজকে। তারা জোর করে শেরাজের হাতে ব্যান্ডেজ করে দিল। শেরাজ স্যান্ডির দিকে তাকিয়ে বলল,
“কাল তুমিও আমাদের সাথে শপিংমলে যাচ্ছো। ফোনে কিছুই করতে হবেনা। যা করার কাল সামনাসামনি করব।”
স্যান্ডি সম্মতি জানিয়ে বলল,
“স্যার! ওই পিচ্চি মেয়েটাই কি আমার ম্যাডাম?”
“হুম!”
“স্যার! ম্যাডাম কিন্তু দেখতে অনেক সুন্দর। একদম ছোট্ট একটা ডলের মতো।”
শেরাজ অগ্নিদৃষ্টি নিয়ে তাকাল স্যান্ডির দিকে। স্যান্ডি ভয়ে আমতা আমতা করে বলল,
“স….সরি স্যার। ম্যাডামতো আমার ছোট বোনের মতো। আমি একদম তাকাইনি ম্যাডামের দিকে স্যার।”
শেরাজ রাহিনকে বলল,
“ওকে রুমে নিয়ে যা। আর আমাকে রেস্ট নিতে দে।”
সকলে বেরিয়ে গেল রুম থেকে। শেরাজ ফ্রেশ হয়ে এসে। শুয়ে পড়ল। ফোনের গ্যালারিতে ঢুকে সুমুর আর ওর ছবিটা বের করল। মাইশার বিয়ের দিন সারবাজকে দিয়ে তুলেছিল ছবিটা। সে কিছুক্ষণ ছবিটার দিকে তাকিয়ে থেকে বলল,
খান সাহেব পর্ব ১৫
“মেইড ফর ইচ আদার। তোমাকে শুধু আমার সাথেই মানাবে সুইটহার্ট।”
এবার কক্সবাজারে যাবার সময় তার দেওয়া কালো শাড়ি পড়া একটা ছবি বের করল। ছবিটা জুম করে ঠোঁটে ছুঁয়ে বলল,
“কাল রাতে তোমাকে দেওয়া আঘাতটা আজ তুমি আমাকে ফিরিয়ে দিলে সুইটহার্ট। আই লাইক ইট। কিন্তু বেশি বাড়াবাড়ি করলে নিজের বিপদ নিজেই ডেকে আনবে তুমি।”
কথাগুলো বলে ফোনটা সাইডে রেখে চোখ বন্ধ করলো শেরাজ। স্কিনের ওপর এখনো ভেসে আছে তার প্রেয়সীর মুখ। এমনটা সে রোজ রাতেই করে। হয়তো ফোনের মাধ্যমেই নিজের প্রেয়সীকে পাশে নিয়ে ঘুমায় সে। রোজ সকালে ঘুম থেকে উঠে প্রেয়সীর মুখটা দিয়েই দিন শুরু এবং রাতে প্রেয়সীর মুখটা দেখেই দিন শেষ করে সে।
