খান সাহেব পর্ব ২৯
সুমাইয়া জাহান
সিকদার বাড়ির ডাইনিং টেবিলে সুমু, শেরাজ আর স্যান্ডি বাদে সকলেই উপস্থিত। সুমু আর শেরাজ বাড়িতে নেই কথাটা শোনার পর আনোয়ার সাহেব প্রচন্ড রেগে যান। একদফা চেঁচামেচি পযর্ন্ত করেছেন তিনি। রাহিন সবটা জানানোর পর, রাহিনের ওপর সব রাগ ঝেড়েছেন আনোয়ার সাহেব। রাহিন বাবার বাধ্য ছেলের মতো মাথা নিচু করে সবাইটা হজম করেছে। আনোয়ার সাহেব এমনিতে খুব নরম-সরম, ঠান্ডা মেজাজের মানুষ। কিন্তু একবার রেখে গেলে তুলকালাম কান্ড বাধিয়ে ছাড়েন তিনি। সুমুরা বাসায় নেই কথাটা জানার পর তার রাগ গিয়ে পড়ে রাহিনের ওপর।
ডাইনিং টেবিলে সকলে চুপচাপ বসে খেয়ে যাচ্ছেন। এখন কারো মুখে শব্দ নেই। মিনা বেগম আর হাসি বেগম সকলকে খাবার সার্ভ করছেন।
হঠাৎ ডাইনিংটেবিলের পিনপিন নিরবতা ভেঙে খুশি বেগম বললেন,
“আমার মনে হয় আমাদের সুমুই শেরাজ বাবাকে বাহিরে নিয়ে যাবার জন্য জোর করেছে। নয়ত শেরাজ তো আর ছোট নয় যে, শরীরের এই অবস্থার মধ্যে বাসা থেকে বের হবে। আর শরীরের কথা বাদ দিলাম। যার একটা হাতের বর্তমানে অবস্থা খুব খারাপ। সে কেনো এমন ব্যথা হাত নিয়ে বাসা থেকে বেরোবে, তাও আবার গাড়ি ড্রাইভ করে এতোদূর যাবে। হয়তো সুমুর ঘুরতে যাবার শখ জেগেছিল, তাই শেরাজের কাছে সে বায়না ধরেছে। আর শেরাজও সুমুর কথা ফেলতে পারেনি বলে, ওকে নিয়ে বেরিয়ে পড়েছে।”
শামীম সাহেব তেঁতে উঠলেন খুশি বেগমের কথায়। তিনি খাওয়া বাদ দিয়ে বললেন,
“তোমার আমার মেয়েকে নিয়ে সমস্যা কি, খুশি? যখনই দেখি আমার মেয়ের দোষ খুঁজতে ব্যস্ত তুমি। তোমার কি মনে হয়, যেই মেয়ে তার স্বামীর সুস্থতার জন্য হসপিটালের মধ্যে পাগলের মতো পাগলামী করেছে, যেই মেয়ে তার স্বামী রেসপন্স না করা অব্দি সামান্য একটু পানি পযর্ন্ত মুখে তুলেনি, যেই মেয়ে তার স্বামীর সুস্থতার জন্য আল্লাহর দরবারে দীর্ঘ এক একটা সিজদায় দিয়েছে, সে মেয়ে তার স্বামীকে এই অসুস্থ অবস্থায় বাসা থেকে বের হবার জন্য বলবে? তাও আবার, তাকে গাড়ি ড্রাইভ করে ঘুরতে নিয়ে যেতে বলবে?”
খুশি বেগম একটু কড়া গলায় বললেন,
“ঠিক আছে, ঠিক আছে! মেনে নিলাম আপনার সব কথা দুলাভাই। তাহলে আপনার মেয়েই বা কেমন? তার স্বামীর এই অবস্থায় তাকে নিয়ে বেরিয়ে গেল, আর সে তার স্বামীকে আটকাতে পারল না?”
আনোয়ার সাহেব চুপচাপ খাচ্ছেন। মিনা বেগম স্বামীর ভার্বমূতি বোঝার জন্য খাবার সার্ভ করার ফাঁকে ফাঁকে স্বামীকে পরখ করছেন।
রাহিন খেতে খেতে বলল,
“আন্টি! আপনি এস.কের সম্পর্কে কতোটুকু জানেন?”
খুশি বেগম কপাল কুঁচকালেন। রাহিন খুশি বেগমের দিকে তাকিয়ে বলল,
“সবসময় সুমুর দোষ খোঁজা বন্ধ করুন। এস.কে বাচ্চা ছেলে নয়। আর সুমু এস.কে’কে কোথাও নিয়ে যায়নি, বরং এস.কে সুমুকে নিয়ে গেছে।”
খুশি বেগম কিছুটা উচ্চস্বরে বললেন,
“ঠিক আছে বুঝলাম যে, তোর বন্ধু সুমুকে নিয়ে গেছে। কিন্তু, একটা ব্যাপার ভেবে দেখেছিস? যে, ছেলেটার এখন কি অবস্থা? প্রথমত, ছেলেটা এখানে এসে তার বাড়ির কাউকে কিছু না জানিয়ে বিয়ে করে নিল। তারপর, ওর যে এতো বড় একটা এক্সিডেন্ট হলো, এখন পযর্ন্ত ওর বাড়ির কাউকে জানাসনি তোরা। এখন আবারও শরীরের এতো খারাপ অবস্থায় গাড়ি নিয়ে বাসা থেকে বেরিয়ে গেছে। এরপর যদি উল্টাপাল্টা কিছু হয়, তখন তো শেরাজের বাড়ির লোকের কাছে তোকে আর ভাইজানকেই সব কৈয়ফিয়ত দিতে হবে।”
আইয়ুব খাবারের টেবিল ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে বলল,
“ব্যাস, আন্টি! অনেক বলেছেন। এস.কে’কে নিয়ে চিন্তা শুধু আপনার একার না, আমাদের ও আছে। আর রইল কৈয়ফিয়ত দেওয়ার ব্যাপারটা। ওইটা নিয়ে আপনাকে ভাবতে হবে না। এস.কে’কে নিয়ে আর ওর ফ্যামিলিকে নিয়ে ভাবার জন্য আমরা সবাই আছি।”
কথাগুলো বলে আইয়ুব চলে যেতে নিল। আনোয়ার সাহেব গম্ভীর গলায় আইয়ুবকে ডাক দিলেন। আনোয়ার সাহেবের ডাক শুনে আইয়ুব দাঁড়িয়ে পড়ল। আনোয়ার সাহেব খাবারের দিকে চোখ রেখেই বললেন,
“খুশির কথায় কিছু মনে করো না, বাবা। ও ওইরকমই। তুমি ওর ওপর রাগ করে না খেয়ে চলে যেওনা। আসলে আমরা সকলেই শেরাজ বাবার জন্যই খুব চিন্তিত। খুশিও চিন্তিত। তাই ওইভাবে কথাগুলো বলে ফেলেছে। তুমি খেয়ে নাও, বাবা। তুমি না খেয়ে চলে গেলে আমি খুব কষ্ট পাব।”
আইয়ুব এসে আবারও বসল চেয়ারে। সে চুপচাপ খাওয়াতে মন দিলেন। খুশি বেগম মুখ বাকিয়ে করে তার খাবারের প্লেটের দিকে নজর দিলেন।
আজ আবহাওয়া প্রচন্ড ঠান্ডা। বাহিরে হালকা ঝিরিঝিরি বৃষ্টি পড়ছে। ভোরের দিকে ব্যান্ডেজের ওপর রক্ত উঠে এসেছিল শেরাজের। সুমু রক্ত পরিষ্কার করে নতুন করে ব্যান্ডেজ করে দিয়েছে। শরীরে প্রচন্ড ব্যথা আর জ্বর নিয়ে তার খান সাহেবের জন্য কড়া ব্ল্যাক কফি পযর্ন্ত বানিয়ে এনে দিয়েছে সে। যাতে তার খান সাহেবের মাথা ব্যথা কমে। শেরাজ বারণ করলেও শোনেনি সে। শেরাজ মাঝে মাঝে তার প্রতি সুমুর ভালোবাসা দেখে অবাক হয়।
সুমুকে বুকের ওপর নিয়ে শুয়ে আছে শেরাজ। সকালের নাস্তা সুমুকে পরম যত্ন করে খাইয়ে দিয়েছে সে। ভোরে শাওয়ারের পর থেকেই সুমুর প্রচন্ড জ্বর এসেছে। এই অবস্থায় সুমুর প্রয়োজনীয় প্রতিটি মেডিসিন সুমুকে খাওয়ানো গেলেও, পেইন কিলারটা কিছুতেই সুমুকে খাওয়াতে পারেনি সে। প্রচন্ড হুমকি-ধমকি দিয়েও কাজ হয়নি।
সুমুর পরনে এখনও শেরাজের শার্ট। গভীর ঘুমে তলিয়ে আছে সে। শেরাজ সুমুর মাথায় একহাত দিয়ে হাত বুলিয়ে দিচ্ছে, আরেক হাতে সে ফোনে স্ক্রল করছে। হঠাৎ রুমের দরজায় নক পড়তেই ফোন থেকে চোখ সরিয়ে দরজার দিকে তাকাল সে। ফোনটা সাইডে রেখে আলগোছে সুমুকে বুকের ওপর থেকে সরিয়ে বালিশের ওপর শুইয়ে দিল। সুমুর মুখের ওপর কিছু চুল এসে পড়ল। চুলগুলো দেখে শেরাজ মুচকি হাসল। আলতো হাতে সুমুর মুখের ওপর থেকে চুলগুলো সরিয়ে দিয়ে ছোট করে সুমুর কপালে ঠোঁট ছোঁয়াল। শরাজের ঠোঁটের নরম ছোঁয়া পেয়ে কিছুটা নড়েচড়ে উঠল সুমু। শেরাজ নিঃশব্দে সুমুর পাশ থেকে উঠে দাঁড়াল। আচমকাই হাতের ব্যথায় টনটন করে উঠল তার। ব্যথায় চোখ-মুখ খিঁচে কিছুক্ষণ বন্ধ করে রাখল শেরাজ। দরজা খুলতে যাবার আগে সুমুর দিকে আবারও ফিরে তাকাল সে। সুমুর গায়ের টেম্পারেচারটা চেক করে চলে গেল দরজা খুলতে। দরজা খুলতেই স্যান্ডি আলতো হেসে বলল,
“গুড মনিং, স্যার!”
শেরাজ মুখটা গম্ভীর করে স্যান্ডির কথার ছোট্ট করে উত্তর দিয়ে বলল,
“কোনো আপডেট?”
“জি, স্যার!”
“বলো।”
“স্যার! আইয়ুব স্যার কল করেছিলেন আমাকে। তিনি বললেন, আপনাকে নাকি অনেকবার কল করেছিল। আপনাকে পায়নি বলে আমাকে কল করেছিল। আইয়ুব স্যাররা অনেক রেগে আছে, স্যার। আমার ওপর অনেক রাগারাগি করেছে। সকলে অনেক চিন্তা করছে, স্যার। আমরা কোথায় আছি জানতে চেয়েছিল। আপনার পারমিশন নেই বলে আমি কিছুই জানায়নি। আইয়ুব স্যার বলেছে, লোকেশন ট্রাক করে এখানে চলে আসবে। আর একটা নিউজ।”
“বলো!”
“স্যার! কোম্পানির নতুন সব পোডাক্ট রেডি। জেন্স প্রোডাক্টগুলোর পাবলিসিটিতো আপনি আর আইয়ুব স্যাররা করেন। আর লেডিস পোডাক্টগুলোর পাবলিসিটির জন্য তো আমাদের ফ্যাশান শো অর্গানাইজ করতে হবে। আর তার জন্য মডেল হায়ার করতে হবে। আর স্যার, পোডাক্টগুলোর পাবলিসিটি হয়ে গেলে এগুলো মার্কেটে আসবে। সেইজন্য যতো দূরত্ব সম্ভব আমাদের সবাইকে ওমান ফিরতে হবে।”
“তোমার ম্যামের পাসপোর্ট আর ভিসা রেডি?”
“জি, স্যার! আর দশ দিনের মধ্যে ভিসা হাতে পেয়ে যাব আমরা।”
“ওকে! আরিয়ানের কোনো আপডেট?”
“স্যার! আরিয়ান স্যার, ঠিক আগের মতোই আছেন। বার, ডিসকো, মদ, মেয়ে এইসব নিয়েই পড়ে আছেন তিনি।”
“ওকে, তুমি যাও। আর আইয়ুবের সাথে আমি কথা বলে নেব।”
শেরাজের আদেশ পেয়ে স্যান্ডি চলে গেল। রিসোর্টের বারেন্দায় কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকল শেরাজ। উন্মুক্ত শরীর, দু’হাত প্যান্টের পকেটে, ঠোঁটে লেগে আছে বাঁকা হাসি। দুরের আকাশের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে রুমের মধ্যে চলে এলো সে। বেড থেকে ফোনটা হাতে নিয়ে বেলকনিতে চলে গেছে। কন্ট্রাক লিস্ট থেকে আইয়ুবের নাম্বার বের করে কল করল। রিং হওয়ার সাথে সাথে কল পিক করল, আইয়ুব। আইয়ুব কল পিক করার সাথে সাথে ফোনটাকে কানের থেকে একটু দূরে সরিয়ে রাখল শেরাজ। ফোনের ওপাশ থেকে আইয়ুব চেঁচিয়ে চলেছে। প্রায় মিনিট পাঁচেক হলো গেল আইয়ুব চেঁচিয়ে চলেছে। শেরাজ ধৈর্য্য হারা হয়ে ফোনটা কানে নিয়ে বলল,
“কাম ডাউন আইয়ুব। বাকিটা বাড়ি আসার পর শোনাস। আপাতত আমার কথা শোন। তুই এতো হাইপার হলে নাজমিন তোর এই রুপ দেখে ভয় পেয়ে যাবে। তারপর নাজমিন পটার আগেই ছেঁকা খাবি তুই। সো, রিল্যাক্স।”
অপরপাশ থেকে আইয়ুব কি বলল শোনা গেল না। শেরাজ একটু উচ্চস্বরে হেসে বলল,
“কাল রাতে তোর ভাবিজি আবারও পাক্কা গিন্নিদের মতো করে আমার সাথে ঝগড়া করছিল। আমাকে শাসন করছিল। আর তোর ভাবিজি যখন কোমরে দু’হাত বেঁধে পাক্কা গিন্নিদের মতো করে আমার সাথে ঝগড়া করে, আমাকে শাসন করে। তখন আমার বড্ড বাসর-বাসর ফিল আসে। মিক্সিং-মিক্সিং গেম প্লে করতে ইচ্ছা করে। ভেবেছিলাম এতো তাড়াতাড়ি বাসরটা করব না। কিন্তু, তোর ভাবিজি সেই কথাটা রাখতে দিল না।”
কিছুক্ষণ চুপ করে আইয়ুবের কথা শুনে হাসলে শেরাজ। তারপর হঠাৎ করে মুখটা গম্ভীর করে বলল,
“রাহিনের ছোট মামা কাল সন্ধ্যায় সিকদার বাড়ি ছাড়বেন। আজ আমরা ফিরতে পারব না। সুমুর ভীষণ জ্বর এসেছে। বাড়িতে বলে দিস কাল রিসাত মামা বাড়ি থেকে যাবার আগেই আমরা বাড়িতে পৌঁছে যাব।”
কথাগুলো বলার মাঝে ফোনের ওপর পাশ থেকে নাজমিনের কন্ঠস্বর শুনতে পেয়ে ভ্রু কুঁচকালো শেরাজ। তবে ঠোঁটে লেগে আছে মুচকি হাসি। সে আইয়ুবকে খোঁচা মেরে বলল,
“বাহ! এতোদূর চলে গেছিস? আমার অনুপস্থিতিতে সব সেটিং করে ফেলেছিস তুই? হুমম! চালিয়ে যাও।”
কথাগুলো বলে আইয়ুবকে আর কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে কল কেটে দিল শেরাজ। সে ফোনটা পকেটে রেখে বেলকনিতে দাঁড়িয়ে রইল। মিনিট খানেক বাদে একজোড়া হাত এসে পিছন থেকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরল তাকে। হাত জোড়ার মালিক শেরাজের পিঠে মাথা ঠেকিয়ে দাঁড়িয়ে রইল। শেরাজ মুচকি হেসে হাত জোড়ার ওপর হাত রাখল। নিজের উন্মুক্ত বুকের ওপর থেকে একটি হাত সরিয়ে হাতটির ওপর ঠোঁট ছুঁইয়ে হাতটির মালিকে টেনে সামনে আনলো। সুমু ঘন ঘন কয়েকবার চোখের পল্লব ঝাপটে মুচকি হেসে তাকাল শেরাজের দিকে। সুমুর মুখের ওপর কিছু অবাধ্য চুল এসে পড়েছে। শেরাজ আলতো হেসে চুলগুলো সুমুর মুখের ওপর থেকে সরিয়ে কানের পাশে গুঁজে দিয়ে বলল,
“ঘুম ভেঙেছে মাহারাণী? শরীর কেমন লাগছে এখন?”
সুমু কোনো কথা না বলে জড়িয়ে ধরল শেরাজকে। সে শেরাজের বুকে মুখ গুঁজে বলল,
“এতোক্ষণ শরীর একটুও ভালো লাগছিল না, তবে এখন শরীর পুরোপুরি ভালো লাগছে।”
শেরাজ সুমুকে নিয়ে বেলকনিতে থাকা চেয়ারের ওপর বসল। সুমুকে কোলের ওপর বসিয়ে জড়িয়ে রাখল নিজের সাথে। সুমু বড় করে দু’বার নিঃশ্বাস ছেড়ে বলল,
“আপনার হাত ব্যথা করছেনা?”
শেরাজ মুচকি হেসে বলল,
“এতোক্ষণ করছিল। তবে, এখন আর করছেনা।”
সুমু মাথা তুলে শেরাজের দিকে তাকিয়ে বলল,
“আমার কথা আমাকেই ফেরত দিলেন?”
শেরাজ সুমুর কথার উত্তর দিল না। সে একহাত দিয়ে সুমুর ফর্সা গলায় কালরাতে নিজের তৈরি করা দাগগুলো ওপর ছুঁয়ে দিল। শেরাজের হাতের শীতল স্পর্শে সুমু চোখ জোড়া বুজে ফেলল। সুমুকে লজ্জায় ফেলার জন্য শেরাজ বলল,
“আমার ভালোবেসে করা স্কেচগুলো তোমার শরীরে বড্ড মানিয়েছে, সুইটহার্ট। এই স্কেচগুলো তোমার সৌন্দর্য আরও বেশি বাড়িয়ে দিয়েছে। দেখো সুইটহার্ট, এখন আমাকে এই দাগগুলো খুব টানছে। স্কেচগুলোর ওপর আবারও নতুন করে স্কেচ করে দিতে বলছে।”
সুমু চোখ মেলে তাকাল। নিজের লজ্জা কাটানোর জন্য সে প্রসঙ্গ পাল্টে বলল,
“আজকে আবহাওয়াটা খুব সুন্দর, তাই না খান সাহেব?”
শেরাজ বুঝতে পারল সুমু প্রসঙ্গ পাল্টাটে চাইছে। সে আবারও দুষ্টু হেসে বলল,
“আবহাওয়ার কথা বলে তুমি কি বোঝাতে চাইছো, সুইটহার্ট?”
সুমু কপাল কুঁচকে শেরাজের দিকে তাকিয়ে বলল,
“আমি আবার কি বোঝাতে চাইলাম?”
শেরাজ ঠোঁট কামড়ে হেসে বলল,
“আমার ভালো পারফরম্যান্সের জন্য নির্দিষ্ট কোনো ওয়েদারের প্রয়োজন পড়ে না, সুইটহার্ট। আমি সব মৌসুমেই বেস্ট পারফরম্যান্স করি। বিশ্বাস না হলে রুমে চলো, আরও একবার প্রমাণ করে দেখাচ্ছি। বাই দ্য ওয়ে, কাল রাতের পারফরম্যান্স কেমন ছিল, সুইটহার্ট?
সুমু অবাক হয়ে হা করে তাকিয়ে রইল। এই লোকটা নরমাল কথার মধ্যেও এতো রোমান্স খুঁজে পায় কই থেকে বুঝে পায়না সে। শেরাজের বুকের ওপর মাথা রেখে কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে আবারও বলল,
“কাল রিসাত মামা চলে যাবেন। আমরা কি বাসায় ফিরব না?”
“হুম ফিরব। তবে, আজ না। আমরা কাল ফিরব। তুমি এখন অসুস্থ। আর একটু সুস্থ হও। আমরা কাল ফিরব।”
সুমু আর কিছু বলল না। শেরাজ কিছুক্ষণ চুপ থেকে আবারও বলল,
“এইটা তো আর যে সে রোগ বা ব্যথা নয়, সুইটহার্ট। আমার তৈরি করা রোগে, রোগী তুমি। সুস্থ হতে টাইম তো লাগবেই।”
সুমু শেরাজের মুখ বন্ধ করার জন্য তার উন্মুক্ত বুকে কামড় বসাল। সুমুর কান্ডে চোখ বন্ধ করে শরীর দুলিয়ে হাসল শেরাজ। কোনোমতে হাসি থামিয়ে সে বলল,
“তোমার এই লজ্জামাখা মুখটা দেখার জন্যই তোমার খান সাহেবের এতো আয়োজন পাগলি। একবার মুখটা তুলে তাকাও। আমার করা এতো আয়োজন কতোটুকু সাকসেস হলো, আমিও একটু দেখি।”
সুমু আর মুখ তুলে তাকাল না। ওভাবেই শেরাজের বুকের মধ্যে মুখ লুকিয়ে বিড়াল ছানার মতো বসে রইল।
মাটি খুঁড়ে খুব শৌখিন ভাবে আধুনিক স্টাইলে তৈরি করা হয়েছে এক পাতালপুরির বদ্ধ লাক্সারিয়াস হাউজ। পাতালপুরির এই বাড়ির প্রতিটা রুম চোখ ধাধানো সুন্দর। শুধু একটি রুম থেকে ভেসে আসছে ভেপসা গন্ধ। রুমটি পুরো কবরের মতো গহীন অন্ধকারে ডুবে। সেই অন্ধকার থেকে ভেসে আসছে একটি ছেলের আর্তনাদে শব্দ। হাত-পা মুখ বেঁধে ফেলে রাখা হয়েছে ছেলেটিকে। শরীরে প্রচুর মারের দাগ। মুখ বাঁধার বিশেষ দরকার না পরলেও, পাতালপুরির মালিকের ঘুমের যাতে ডিস্টার্ব না হয় তাই ছেলেটির মুখ বেঁধে রাখা হয়েছে।
পাতালপুরির একটি লাক্সারিয়াস বেড রুমে মাতাল অবস্থায় বেঘোরে ঘুমাচ্ছে একটি পুরুষ । পাশে পড়ে আছে চারটা ওয়াইনের খালি বোতল। পুরুষটি আড়মোড়া ভেঙে বেড ছেড়ে উঠল। ওয়াশরুমে গিয়ে চোখে মুখে পানি দিয়ে এসে হাতে একটি ওয়াইনের বোতল নিয়ে রুম ত্যাগ করল। অন্ধকার রুমটির ভেতরে এসে চেয়ারের সাথে বেঁধে রাখা ছেলেটির মাথার ওপর থাকা বাল্বটা জ্বালিয়ে দিল। মুহুর্তেই বাল্বটি তার হলুদ আলো ছড়িয়ে স্পর্টলাইটের মতো জ্বলে উঠল ছেলেটির মাথার ওপর। তবে পুরো রুম আলোকিত করতে পারল না। ওয়াইনের বোতলে চুমুক দিতে দিতে পুরুষটি এসে দাঁড়াল বেঁধে রাখা ছেলেটির সামনে। তার সাথে সাথে এসে দাঁড়াল আরও দু’জন দানবের মতো লোক। দুজনের মুখ ঢাকা। একজন চেয়ার এনে দিল। মাতাল পুরুষটি চেয়ারে বসে বলল,
“ওর মুখটা খুলে দাও।”
নিজের বসের হুকুম পেয়ে একজন ছুঁটে গিয়ে বেঁধে রাখা ছেলেটির মুখ খুলে দিল। ছেলেটির নাক-মুখ দিয়ে রক্ত গড়িয়ে পড়ছে। ঘোলা ঘোলা দৃষ্টিতে চোখ মেলে তাকাল ছেলেটি। তবে অন্ধকারের জন্য সামনে বসে থাকা পুরুষটিকে দেখতে পেল না। ছেলেটি মুখ থেকে থু মেরে লালা ফেলে বলল,
“কে আপনি? আর আমাকে এভাবে বেঁধে রেখেছেন কেনো?”
অন্ধকারে বসে থাকা পুরুষটি শরীর কাঁপিয়ে উচ্চস্বরে হেসে উঠল। রুমের প্রতিটা কোণায় সেই হাসির প্রতিধ্বনি শোনা গেল। আহত ছেলেটি মুহুর্তেই রেগে গেল। সে গর্জন করে বলল,
“কাপুরুষের মতো অন্ধকারে বসে হাসছিস কেনো? সাহস থাকলে সামনে আয়।”
পুরুষটি হাসি থামাল। সে গম্ভীরস্বরে বলল,
“আমি গেম খেলতে অনেক ভালোবাসি। তোকে এখানে ধরে এনেছি গেম খেলার জন্য। তবে, আজ আমার গেমের গুটি হবার পেছনে তোর কিছু ভুল আছে। তুই যদি ভুলগুলো না করতিস, তাহলে আমি তোকে কখনোই আমার গেমের গুটি বানাতাম না।”
“কি ভুল করেছি আমি? আর কে তুই?”
পুরুষটি আবারও উচ্চস্বরে হাসল। হাসি থামিয়ে হাত থেকে ওয়াইনের গ্লাসটা মেঝের ওপর ছুঁড়ে মারল। তারপর গর্জন করে বলল,
“ইউ ব্লাডি বিচ! একদম বেয়াদবি করবি না।”
থামল পুরুষটি। গলার স্বর আবারও নিচু করে বলল,
“তুই কি ভুল করেছিস তা তুই নিজে জানিস না, তাহলে আমি কীভাবে জানবো যে, তুই কি ভুল করেছিস? কিন্তু দেখ, তবুও আমি জানি যে, তুই কি ভুল করেছিস। কিন্তু আমার আফসোস, ভুলটা তুই করে তুই নিজেই নাকি জানিস না। আচ্ছা থাক। তুই যেহুতু জানিস না। তোকে আর না জানাই। আর আমার একটা রুলস আছে বুঝলি। আমার এই পাতালপুরিতে কেউ একবার আসলে, হয় তাকে আফসোস নিয়ে মরতে হয়, না হয় তাকে আফসোস নিয়ে সারাজীবন বাঁচতে হয়। আমার হাতে বেশি সময় নেই। তো, আমরা আমাদের গেম শুরু করি?”
কথাগুলো একভাবে বলে পাশে থাকা একজনকে ইশারা করল পুরুষটি। পাশে থাকা একজন দানবের মতো লোক একটি কাচের জার নিয়ে এলো। তার মধ্যে রয়েছে দু’টো চিরকুট। দানবের মতো লোকটি কাচের জারটা নিয়ে আহত ছেলেটির সামনে থাকা টেবিলের ওপর রাখল। ছেলেটির হাত খুলে দিয়ে গলায় ছুরি ধরে রাখল। ছেলেটি ভয়ে একবার ঢোক গিললো। অন্ধকারে থাকা পুরুষটি ছেলেটির চোখে-মুখে ভয় দেখে উচ্চস্বরে হেসে বলল,
“আজ তোর এই জায়গাটাই আমি আমার খুব প্রিয় একজন মানুষকে দেখতে চাই। কিন্তু কি জানিস? আমার সেই প্রিয় মানুষটি তোর জায়গায় থাকলে হয়তো তার চোখে-মুখে এক ফোঁটাও ভয়ের চিহ্ন থাকত না। কিন্তু তোর চোখে-মুখে ভয়ের চিহ্ন আছে। আই লাইক ইট।”
পুরুষটি একটু থামল। আবারও উচ্চস্বরে হেসে বলল,
“এখন এই কাচের জারে থাকা চিরকুট তোর ভাগ্য নির্ধারণ করবে। আর এইটাই হলো গেম। তুই এই জার থেকে একটা চিরকুট তুলবি। তাতে যা লেখা থাকবে, সেটাই তোর ভাগ্য। নে এখন একটা চিরকুট তোল।”
আহত ছেলেটি চুপ করে বসে রইল। তা দেখে অন্ধকারে থাকা পুরুষটি রেগে গেল। সে মুখ ফুটে কিছু বলার আগেই আহত ছেলেটির গলায় ছুরি ধরে রাখা দানবের মতো লোকটা আরও জোরে ছেলেটির গলায় ছুরি চেপে ধরল। গলার চামড়া কেটে ছুরিটা কিছুটা ভেতরে ঢুকে গেল। আহত ছেলেটি ভয়ে তড়িঘড়ি করে একটা চিরকুট তুললো। গলা থেকে ছুরিটা সরিয়ে ছেলেটির হাত থেকে চিরকুটটা নিয়ে নিল দানবের মতো লোকটি। চিরকুটটা খুলে সে উচ্চস্বরে পড়ল,
“টেক টু লিম্ব্স ফ্রম মাই বডি অ্যাজ ইউ উইশ।” (আমার দেহ থেকে ইচ্ছেমতো দুইটি অঙ্গ নিয়ে নাও।)
পুরুষটি আফসোসের স্বরে বলল,
“ইশ! কি ভাগ্য। বেঁচে গেলি তুই? তোর শরীর থেকে আমার পছন্দ মতো মাত্র দু’টো অঙ্গ কেটে রেখে তোকে ছেড়ে দিতে হবে। কিন্তু কি করব বল? আমি যে আমার রুলসের বাহিরে যাইনা। তোর কপাল ভালো। রুলস অনুযায়ী যা এসেছে আমি তোর সাথে তাই করব। কিন্তু তুই কি জানিস অন্য চিরকুটটায় কি ছিল? দাঁড়া তোকে পড়ে শোনাচ্ছি।”
কথাগুলো বলে হাত দিয়ে ইশারা করল সে। দানবের মতো লোকটি অন্য চিরকুটটা জার থেকে তুলে নিল। চিরকুটটা খুলে সে পড়ে বলল,
“টেক মাই লাইফ।”
আহত ছেলেটি চোখ বন্ধ করে রাখল, যেন এ যাত্রায় জীবনটা ফিরে পেল সে। তবে সে জানেনা এই অপরিচিত লোকটা তার শরীরের কোন দুটি অংশ কেটে রেখে দিবে। ছেলেটির ভাবনার মধ্যেই আবারও একটি জার রাখা হলো ছেলেটির সামনে। চোখ মেলে তাকাল ছেলেটি। দানবের মতো লোকটি আবারও ইশারা করল চিরকুট তুলে নেওয়ার জন্য। ছেলেটি কাঁপাকাঁপা হাতে আবারও একটি চিরকুট তুলে নিল। দানবের মতো লোকটি চিরকুটটা ছেলেটির হাত থেকে নিয়ে খুলে বলল,
“আইজ্ অ্যান্ড হ্যান্ড।”
কথাটা শোনার সাথে সাথে আহত যুবকটি পাগলের মতো কাকুতি-মিনতি করতে লাগল। কিন্তু ছেলেটির করুণ আর্তনাদ রুমে থাকা বাকি তিনজনের কান পযর্ন্ত পৌঁছালেও তাদের মন গলাতে সক্ষম হলো না। ওয়াইন হাতে পুরুষটি বলল,
“আজকের এই ঘটনা আমরা চারজন বাদে আর কেউ জানতে পারলে, তোর একটা বোন আছে না? রাত-বিরাতে বারে মদ খেয়ে পার্টি করে? ও হবে আমার নেক্সট গেম খেলার গুটি। তোকে তো জীবন দিলাম। ওর বেলায় নাও দিতে পারি। আমার এই দুইটা ছেলেকে দেখছিস? ওদের পেটে খুব খিদে রে। তোর একটা ভুলের কারণে তোর বোনটা ওদের এক রাতের ডিনার হয়ে যেতে পারে।”
হঠাৎ একজন লোক গিয়ে গরম চিকন সরু মাথার দু’টি রড নিয়ে এলো। আর অন্যজন হাতে করাত আর একটি ওয়াইনের বোতল নিয়ে এলো। ওয়াইনের বোতলটি তার বসের হাতে দিয়ে সে এগিয়ে গেল আহত ছেলেটির কাছে। মুহুর্তের মধ্যেই গরম রড দু’টি ছেলেটার দু’চোখের মধ্যে ঢুকিয়ে দিল। গগন ফাটিয়ে চিৎকার করে উঠল ছেলেটি, তবে এই চিৎকার রুমটির বাহিরে তার চিৎকার গেল না। ছেলেটির করুণ আর্তনাদ আর ওয়াইন হাতে বসে থাকা পুরুষটির ভয়ংকর হাসির শব্দে রুমটা আরও ভয়ংকর হয়ে উঠল। হাতে করাত নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা লোকটি দেরি না করে ছেলেটির জ্ঞান থাকতে থাকতেই তার বা’হাতটা খুব যত্নসহকারে আস্তে ধীরে কেটে ফেলল। এতে শেষ একবার চিৎকার করল ছেলেটি। তারপর জ্ঞান হারাল। ওয়াইনের বোতলে চুমুক দিতে দিতে পুরুষটি চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে বলল,
খান সাহেব পর্ব ২৮ (২)
“রাত হলে ওকে হসপিটালের দরজার সামনে ফেলে রেখে আসবে। আপাতত, নরমাল ট্রিটমেন্ট দিয়ে রক্ত পড়া বন্ধ করার ব্যবস্থা করো।”
কথাগুলো বলে রুম ত্যাগ করল পুরুষটি। নিজের রুমে এসে আবার শুয়ে পড়ল সে। গেম প্লে করে অনেক টায়ার্ড সে। উদ্দেশ্যে এখন দারুন একটা ঘুম দেওয়া।
