Home খান সাহেব খান সাহেব পর্ব ৩০

খান সাহেব পর্ব ৩০

খান সাহেব পর্ব ৩০
সুমাইয়া জাহান

“পুরো শহর জুড়ে আজ আবারও আতঙ্কের বাতাস বয়ছে। বিখ্যাত বিজনেসম‍্যান জনাব আলবার্ট সিংয়ের একমাত্র ছেলে অরিন্দম সিংয়ের এমন ভয়াবহ নৃশংস অবস্থা দেখে আঁতকে উঠেছে পুরো শহরবাসী। সিআইডির প্রত‍্যেকটা ডিপার্টমেন্ট ইনভেস্টিগেশনের জন‍্য রেডি। শুধু অরিন্দম সিংয়ের জ্ঞান ফেরার অপেক্ষা। আলবার্ট সিং সিআইডি ডিপার্টমেন্টের ওপর বার বার ওপরমহলকে দিয়ে প্রেশার সৃষ্টি করছেন। কিন্তু, সিআইডি ডিপার্টমেন্টের এসিপি বলেছেন, “কোনো রকমের স্টেটমেন্ট ছাড়া তারা ইনভেস্টিগেশন শুরু করতে পারেন না। অরিন্দম সিংয়ের জ্ঞান ফিরলে তারা অরিন্দম সিংয়ের থেকে স্টেটমেন্ট নিয়ে ইনভেস্টিগেশন শুধু করবে।” বিশেষ তথ্যে আরও জানা গেছে, কাল মাঝরাতে অরিন্দম সিংকে কেউ বা কারা হসপিটাল থেকে কিছু দূরে আহত অবস্থায় ফেলে গেছেন। অরিন্দম সিংয়ের দু’টি চোখ আর বা’হাতটি পুরোপুরি নষ্ট করে দিয়েছে সন্ত্রাসীরা। সিআইডি ডিপার্টমেন্টের ধারণা যারা এই কাজটি করেছে তারা খুব চতুরতার সাথে কাজটি করছে। সন্ত্রাসীদের চিহ্নিত করা যাবে এমন কোনো প্রমাণ ফেলে যায়নি তারা।”

বেডের ওপর আধশোয়া হয়ে নিউজ দেখছে শেরাজ। ঘড়িতে এখন সময় দুপুর দু’টো। আজ রাত আটটার দিকে রিসাত সাহেব চলে যাবেন। শেরাজ সুমুকে বলেছে, “ছোট মামা বাড়ি থেকে বেরোনোর একঘণ্টা আগে বাসায় পৌঁছে যাব আমরা।”
কাল সারাদিন সুমুরা পার্কটা ঘুরে দেখেছে। সুমুর এখন খুব ইচ্ছে করছে কাল সকালে তার খান সাহেবের এনে দেওয়া প্রতিটা ড্রেস ট্রায়াল দিয়ে দেখতে। সে কাল সকালে শেরাজকে বলেছিল যে, এখানে আসার সময় টেনে নিয়ে এলেন। কোনো ড্রেস আনিনি সাথে করে। এখন আমি কি পড়ব?

সুমুর কথা শেষ হবার সাথে সাথে শেরাজ স‍্যান্ডিকে কল করে। পাঁচ মিনিটের মধ্যে স‍্যান্ডি একটা লাগেজ নিয়ে রুমের দরজার সামনে এসে হাজির হয়। লাগেজ রেখে স‍্যান্ডি চলে যেতেই সুমু লাগেজ খুলে দেখে, লাগেজের মধ্যে দশটা শাড়ি, দশটা আনারকলি আর কিছু কসমেটিকস। এতো শাড়ি আর ড্রেসের মধ্যে শেরাজের জন‍্য দু’টো টি-শার্ট আর ব্ল‍্যাক জিন্স প‍্যান্ট আছে। সুমু তখনই বুঝতে পারে, এইসব তার খান সাহেব আগে থেকেই ব‍্যবস্থা করে রেখেছে। শাড়ি আর ড্রেসগুলো খুব পছন্দ হয়েছে তার। আলাদা আলাদা কালারের ছিল প্রতিটা বস্ত্র। শুরু ব্ল‍্যাক কালাটা সুমুর কাছে কমন লেগেছে। কারণ তার খান সাহেব অলরেডি তাকে ব্ল‍্যাক কালারের দু’টো শাড়ি আগেই দিয়েছে।
ভাবনা থেকে বেরিয়ে সুমু তাকাল শেরাজের দিকে। এই লোক এখনো একইভাবে বসে আছে। না নিজে রেডি হচ্ছে আর না তাকে রেডি হতে দিচ্ছে। সুমু অধৈর্য‍্য হয়ে বসে আছে তার খান সাহেবের পাশে। সে এতোক্ষনে অনেকবার রেডি হতে গিয়েছিল। শেরাজ সুমুর হাত থেকে জামাকাপড় সোফার ওপর ফেলে তাকে কোলে তুলে বেডের ওপর এনে ফেলেছে। তার গলা থেকে ওড়না নিয়ে ওড়নার একসাইড দিয়ে তার হাত বেঁধে দিয়েছে। আর ওড়নার অপর সাইড শেরাজ নিজের হাতের মুঠোর মধ‍্যে পেঁচিয়ে ধরে রেখেছে। সুমুর নিজেকে গোয়ালে বেঁধে রাখা গরু মনে হচ্ছে। এই ভাবে বেঁধে রাখার কারন বুঝতে পারছেনা সে। সে একধ‍্যানে শেরাজের দিকে তাকিয়ে আছে আর শেরাজ ফোনের দিকে। সুমু হাত ছাড়ানোর জন‍্য নড়াচড়া করতেই শেরাজ ফোনের দিকে চোখ রেখেই বলল,

“এতো ছটফট করছো কেনো? বিয়ের আগের কাঁপাকাঁপি আর ছটফট করা স্বভাবটা তোমার এখনও যায়নি দেখছি।”
“খান সাহেব!”
“হুম, বলো!”
“কাল আপনি আমাকে ড্রেস আর শাড়ি এনে দিলেন।”
“হুম দিলাম, তো?”
“আমার না এগুলো পড়ে একবার ট্রায়াল দিতে ইচ্ছে করছে।”
শেরাজ ভ্রু কুচঁকে তাকাল সুমু দিকে। সুমুর পা থেকে মাথা পর্যন্ত পরখ করে বলল,
“ট্রায়াল দেওয়ার কি আছে? ওগুলো আমার পছন্দ করা। আর আমার পছন্দ করা প্রতিটা জিনিসে আমার পাগলিটাকে জোস লাগবে। তাছাড়া ওগুলো দেখলেই মনে হয়, ওগুলো শুধু আমার সুইটহার্টের জন‍্যই বানানো হয়েছে।”
“ছাড়ুন না। একবার ট্রায়াল দিব।”
“ট্রায়াল দিতে হবেনা। আমি নিউজটা দেখে, তোমাকে নিয়ে এখন একটা কড়া ঘুম দিব।”

সুমু বুঝল এইভাবে হবেনা। তাই চুপ করে বসে রইল। শেরাজ আবারও ফোনের দিকে নজর দিল। মিনিট পাঁচেক যেতেই সুমু নিংশব্দে বা’হাত দিয়ে ডান হাত খোলার চেষ্টা করল। এতো আস্তে আস্তে হাতটা খুলল, যাতে শেরাজ কিছু বুঝতে না পারে। হাত খোলা হতে সুমু তড়িঘড়ি করে বেড থেকে নেমে দাঁড়িয়ে “খান সাহেব” বলে ডাক দিল। শেরাজ কিছু বুঝে ওঠার আগেই শেরাজকে মুখ ভেঙিয়ে ওয়াশরুমের মধ্যে ঢুকে দরজা লাগিয়ে দিল। শেরাজ দৌড়ে এসে সুমুকে ধরতে পারল না। বেডের কাছে এসে অন‍্যদিকে ফিরে কোমরে দু’হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে রইল শেরাজ। সুমু আবারও ওয়াশরুমে দরজা খুলে উঁকি মারল। ঠোঁট টিপে হেসে আবারও “খান সাহেব” বলে ডাক দিল। শেরাজ পেছন ফিরে তাকাতেই মুখ ভেঙিয়ে আবারও দরজা লাগিয়ে দিল। সুমু একই কাজ আবারও করল। তার খান সাহেবকে জ্বালিয়ে বেশ মজা পাচ্ছে সে। সে আবারও ওয়াশরুমের দরজা খুলে উঁকি মারল। কিন্তু শেরাজকে রুমের মধ্যে কোথাও দেখতে পেল না। রুমটা ভালো করে দেখার জন‍্য ওয়াশরুমের দরজা খুলে কিছুটা বেরিয়ে আসতেই হাতে টান পড়ল তার। শেরাজ সুমুকে ওয়াশরুমের দরজার পাশের দেওয়ালের সাথে জোরে চেপে ধরে রাখল। সুমু চোখ মুখ খিঁচে বন্ধ করে রেখেছে। তার মুখের ওপর পরে থাকা চুলগুলো শেরাজ ফুঁ দিয়ে সরিয়ে দিয়ে বলল,

“ধাপপা সুইটহার্ট! ধরে ফেলেছি তোমাকে। আমার সাথে লুকোচুরি খেলছো তুমি? তুমি জানো না, আমি একবার ধরতে পারলে তোমার কি অবস্থা হতে পারে? তুমি কি চাইছো? হালকা শুকিয়ে আসা ক্ষত গুলো আবারও তাজা করে দেই?”
সুমু গলার স্বর একদম নিচু করে বলল,
“এটা চিটিং, খান সাহেব। আপনি চিটিং করেছেন আমার সাথে।”
“কিন্তু আমি তো তোমার সাথে হাইড এন্ড সিক খেলতে চাইনা, সুইটহার্ট। আমি তোমার সাথে মিক্সং মিক্সং খেলতে চাই।”
কথাগুলো বলে শেরাজ সুমুর ওষ্ঠ নিজের দখলে নিয়ে নিল। মিনিট পাঁচেকের মধ্যে সে ছেড়ে দিল তাকে। সুমু বড় বড় করে শ্বাস নিয়ে বলল,
“আপনি এই ভর দুপুর বেলা কি শুরু করেছেন এইসব?”
“আজ লাঞ্চ শেষে ডেজার্টে কিছু খাইনি আমি। তাই এখন বউয়ের অধর থেকে দুনিয়ার সব থেকে বেস্ট মিষ্টিটা খেলাম।”

“রুমের দরজা খোলা আছে, খান সাহেব। কেউ এসে আমাদের এইভাবে দেখলে কি বলবে বলুন তো? এমনিতেও এই সমাজ, এই দুনিয়ার মানুষ বেশি ভালো না। স্বামী- স্ত্রী হলেও এইভাবে রুমের দরজা খুলে রোমান্স করাটাকে কেউ ভালো চোখে দেখবে না, উল্টো বাজে কথা বলবে। আর এইটা বাংলাদেশ, খান সাহেব।”
“বলতে দাও দুনিয়াকে, যেটা তাদের বলার আছে। আমার তোমার সঙ্গ চাই, দুনিয়ার না।”
“কিন্তু, খান সাহেব…”
শেরাজ সুমুর ঠোঁটের ওপর তর্জনী রেখে সুমুকে চুপ করিয়ে দিয়ে বলল,
“আই ডোন্ট কেয়ার এবাউট দিস ফাকিং সোসাইটি, সুইটহার্ট। বাই দ‍্য ওয়ে, কার এতো বড় কলিজা হয়েছে যে, শেরাজ খানের বউকে নিয়ে বাজে কথা বলবে। একবার বলে দেখুক না। তাকে স্বয়ং শেরাজ খান, নিজ দায়িত্বে জাহান্নাম থেকে ট‍‍্যুর করিয়ে আনবে। সো, যার জাহান্নাম থেকে ঘুরে আসার শখ জাগবে, সেই শেরাজ খানের বউকে নিয়ে বাজে কথা বলার সাহস দেখাবে।”

“আপনি কি গুন্ডা বা ভিলেন নাকি যে, এইসব করবেন?”
“শেরাজ খানের পার্সোনাল প্রাপার্টির দিকে কেউ চোখ তুলে বা আঙুল তুলে কথা বললে, শুধু গুন্ডা বা ভিলেন কেনো, দুনিয়ার সবথেকে নিকৃষ্ট মানুষটিও হতে রাজি আমি।”
কথাগুলো বলার সময় শেরাজের মুখের ভঙ্গিমা কেমন একটা যেন পাল্টে গেল। সুমু ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে রইল শেরাজের দিকে। শেরাজ ছেড়ে দিল সুমুকে। সে একটু দূরে সরে দাঁড়িয়ে বলল,
“ট্রায়াল দিতে চেয়েছিলে না? যাও, ট্রায়াল দিয়ে এসো। তুমি এক একটা করে পরে ট্রায়াল দিবে, আর আমি কমপ্লিমেন্ট দেব।”

সুমু খুশি মনে নাচতে নাচতে চারটা ড্রেস একসাথে নিয়ে ওয়াশরুমে ঢুকল। শেহরাজ পা ঝুলিয়ে বেডের ওপর বসে সুমুর জন্য অপেক্ষা করতে লাগল। পাঁচ মিনিটের মধ্যে সুমু একটা হোয়াইট কালারের ড্রেস পড়ে বাহিরে বেরিয়ে এলো। সে গিয়ে দাঁড়াল শেরাজের সামনে। জামার দু’সাইড ধরে ঘুরে ঘুরে তার খান সাহেবকে দেখাল। শেরাজ সুমুর পা থেকে মাথা পযর্ন্ত পরখ করে বলল,
“মাশাআল্লাহ্! আসমান কা পারি জামিন পার নাজার আ রাহা হে।”
সুমু মুখে হাত দিয়ে হাসল। কোনো রকমে হাসি আটকে “নেক্সট” বলে আবারও চলে গেল ওয়াশরুমে। একে একে সুমু চারটা ড্রেস ট্রায়াল দিল, আর শেরাজ বসে বসে তার পাগলির পাগলামি দেখল আর কমপ্লিমেন্ট দিল। এখনো বাকি পাঁচটা। সুমু এসে শুয়ে পড়ল শেরাজের পাশে। শেরাজ সুমুর ওপর ঝুঁকে বলল,
“কি হলো, ম‍্যাডাম? আর ট্রায়াল দিবেন না? এখনও তো বাকি আছে।”
সুমু চোখ বন্ধ করে আবারও বড় করে একবার নিঃশ্বাস ছাড়ল। তারপর চোখ মেলে শেরাজের দিকে তাকিয়ে বলল,
“ড্রেস চেঞ্জ করতে করতে, ড্রেস পড়তে পড়তে, ওয়াশরুমের দরজা খুলতে খুলতে, আপনার সামনে আসতে আসতে, আবার ওয়াশরুমে যেতে যেতে আমি হাঁপিয়ে উঠেছি।”

“তাহলে আমার সামনেই চেঞ্জ করলে পারতে। বার বার ওয়াশরুমে যাওয়ার কি দরকার ছিল? নাকি এখনো তোমার কোনোকিছু দেখা বাকি আছে আমার, যার জন‍্য তুমি আমার সামনে ড্রেস চেঞ্জ করতে পারবে না।”
সুমু দু’হাত বাড়িয়ে শেরাজের গলায় জড়িয়ে ধরে আরও একটু কাছে টেনে আনল তাকে। সে শেরাজের নাক টেনে দিয়ে মুচকি হেসে বলল,
“আপনার সামনে যেমন আমি দুনিয়ার সবথেকে বেশি নির্লজ্জ নারী। তেমনি আপনার সামনেই আমি দুনিয়ার সবথেকে বেশি লজ্জাবতী নারী। এখনো আপনি আমাকে স্পর্শ করলে, আমি সেই প্রথম দিনের মতোই লজ্জায় কুঁকড়ে যাব। আর একবার স্পর্শ করে ফেললে, সেই রাতের মতো নির্লজ্জ হয়ে উঠব।”
শেরাজ ঠোঁট কামড়ে হেসে বলল,

“তাহলে, এখন আবারও একবার নির্লজ্জ হবে নাকি, সুইটহার্ট?”
কথাটা বলে শেরাজ ঝুঁকতে লাগল সুমুর দিকে। শেরাজের উদ্দেশ্য বুঝতে পেরে সুমু শেরাজের বুকে দু’হাত রেখে জোরে ধাক্কা মারল তাকে, তবে এক ইঞ্চিও সরাতে পারল না। নিজের কাছে পরাজয় শিকার করে দু’হাত দিয়ে নিজের মুখ ডেকে রাখল সে। দু’আঙ্গুলের ফাঁকা দিয়ে তাকিয়ে দেখলো শেরাজ বসে তার দিকে তাকিয়ে হাসছে। শেরাজ হাসতে হাসতে নিজের হাত বাড়িয়ে দিল তার দিকে। সুমু মুখ থেকে হাত সরিয়ে তার হাত ধরে উঠে বসল। সে শেরাজের দিকে তাকিয়ে শেরাজের নাক টেনে দিয়ে দৌড় মারল, তবে শেষ রক্ষা হলো না। শেরাজ একহাতে পেছন থেকে সুমুর কোমর জড়িয়ে ধরে মাটি থেকে কিছুটা উঁচু করে ঘোরাল তাকে। হঠাৎ করে কোমরে স্পর্শ পেয়ে খিলখিলিয়ে হেসে উঠল সুমু। ঘুরতে ঘুরতে দু’জনে একসাথে বেডের ওপর পড়ল। শেরাজ মাথায় একহাত ঠেকিয়ে সুমুর দিকে তাকিয়ে আছে। আর সুমু পাগলের মতো হাসছে। শেরাজ তার হাসি দেখে ভ্রু কুঁচকে বলল,
“এইভাবে পাগলের মতো হাসছো কেনো?”
সুমু হাসতে হাসতে কোনোমতে বলল,

“সুড়সুড়ি, খান সাহেব।”
“এখনো তোমার আমার ছোঁয়াতে সুড়সুড়ি লাগে?”
“লাগে তো।”
“এতো সুড়সুড়ি আসে কোথা থেকে?”
“আপনার হাত থেকে।”
সুমুর উত্তর শুনে শেরাজ ঠোঁট কামড়ে হেসে বলল,
“দেখি কোথায় কোথায় এখনও সুড়সুড়ি আছে তোমার। দেখাও আমাকে। আমি এখনই সব ভাঙিয়ে দিচ্ছি।”
সুমু হাসি থামিয়ে বলল,
“সুড়সুড়ি, লজ্জা সব পরে ভাঙাবেন। এখন আমি রেডি হতে যায়।”
উঠে বসল সে। বেড থেকে নেমে ক‍্যাবার্ড খুললো ড্রেস বের করার জন‍্য। বেবি পিংক কালারের একটা আনারকলি বের করল সে। তারপর ড্রেসটা নিয়েই ওয়াশরুমে যাবার জন‍্য পা বাড়াল।

“সুইটহার্ট!”
দাঁড়িয়ে পড়ল সুমু। পেছন ফিরে শেরাজের দিকে প্রশ্নবোধক দৃষ্টিতে তাকাল। শেরাজ ফোনে স্ক্রল করতে করতে বলল,
“আজ শাড়ি পরবে, সুইটহার্ট?”
সুমু মুচকি হাসল। হাতে ড্রেসটা সোফার ওপর রেখে লাগেজ খুললো সে। শাড়িগুলো লাগেজ থেকে এখনও বের করেনি সে। লাগেজ থেকে দশটা শাড়ি প‍্যাকেটসহ বের করে শেরাজের সামনে নিল। প্রতিটা শাড়ি শেরাজ ভালো করে দেখে একটা পার্পেল কালারের শাড়ি সুমুর হাতে দিল। শাড়িটা সাইডে রেখে সুমু বাকি শাড়িগুলো লাগেজে তুলে রাখল। বেডে শাড়িটা রেখে প‍েটিকোট আর ব্লাউজ নিয়ে ওয়াশরুমে চলে গেল সে। পাঁচ মিনিটের মধ্যে পেটিকোট আর ব্লাউজ পরে গায়ে ওড়না জড়িয়ে ওয়াশরুম থেকে বেরিয়ে এলো। আগের পরিহিত জামাটা সুন্দর করে ভাঁজ করে লাগেজের মধ্যে ঢুকাল। জামাটার ওড়নাটাও গা থেকে খুলে ভাঁজ করে লাগেজের মধ্যে ঢুকাল। লাগেজটা লক করে খুলে রাখা চুলগুলো হাত খোঁপা করে বেড থেকে শাড়িটা নিয়ে ড্রেসিংটেবিলের সামনে এসে দাঁড়াল।
শেরাজ শুয়ে শুয়ে ফোনে স্ক্রল করতে ব‍্যস্ত। সুমু শাড়ির ভাঁজ খুলতেই শেরাজ ফোন রেখে উঠে এসে দাঁড়াল সুমুর পেছনে। সুমু আয়নার ভেতর দিয়েই শেরাজের দিকে প্রশ্নবোধক দৃষ্টিতে তাকাল। শেরাজ কোনো কথা না বলে সুমুর হাত থেকে শাড়িটা নিয়ে নিয়ে বলল,

“বউটা যেহেতু আমার, সেহেতু আজ আমার বউটাকে আমি নিজ হাতে সাজাব।”
কথাটা বলে শেরাজ সুমুকে নিজের দিকে ঘোরাল। শাড়ির ভাঁজ খুলে সুমুকে শাড়ি পরিয়ে দিতে লাগল। শাড়ির কুঁচি ঠিক করে দিয়ে কুঁচি গোঁজার সময় বাধল বিপত্তি। শেরাজের ভাষ‍্যমতে, “শাড়ি যেহেতু সে পরিয়েছে, তাই কুঁচিও সেই গুঁজবে। আর সুমু কিছুতেই তাকে শাড়ি গুঁজতে দিবেনা, কারন তার সুড়সুড়ি লাগে। আর তাই সে শেরাজের হাত ধরে দাঁড়িয়ে আছে। আজ শেরাজ পণ করেছে সে সুমুর জেদের কাছে হারবেনা। অনেক জোড়াজুড়ি করার পর সুমু বাধ‍্য হয়ে শেরাজের হাত ছেড়ে দিল। শেরাজ এমনভাবে হাসল যেন সে ওয়ার্ল্ড কাপ জিতেছে। কুঁচি গোঁজার জন‍্য সুমুর পেটে হাত রাখতেই সুমু খিলখিলিয়ে হেসে উঠল। সুমুর হাসি দেখে শেরাজও হাসল। কুঁচি গুঁজে দিয়ে সুমুকে ড্রেসিংটেবিলের সামনে বসাল। তখনই শেরাজের ফোনটা বেজে উঠল। শেরাজ বেডের কাছে গিয়ে কলটা কেটে ফোনটা সাইলেন্ট করে রাখল। সুমু আয়নার দিকে তাকিয়ে বলল,

“রোজা আপু, তাইনা? রোজা আপু দেখতে কিন্তু খুব সুন্দর।”
শেরাজ কোনো কথা বলল না। সুমুর কাছে এসে সুমুর চুলগুলো খুব সুন্দর করে আঁচড়ে দিল সে। তারপর পকেট থেকে কিছু অর্নামেন্টস বের করল শেরাজ। একটা হার্ট ফটো পেন্ডেন্ট, তিন জোড়া ডায়মন্ড পাথরের ইয়ার রিং, একটা ডায়মন্ড পাথরের নোজ পিন। সুমু পেন্ডেন্টটা হাতে নিয়ে হার্টটা খুললো। পুরো হার্ট ছোট্ট ছোট্ট ডায়মন্ড পাথর দিয়ে ডিজাইন করা। সুমু হার্টটা খুলে দেখতে পেলে, বিচে প্রোপোজ করার দিনের দু’জনের হাস‍্যজ্বল একটা কাপল পিক। সুমুর চোখ জোড়া খুশিতে চিকচিক করে উঠল। শেরাজ সুমুর হাত থেকে পেন্ডেন্টটা নিল। সে সুমুর পেছনে দাঁড়িয়ে তার পিঠের ওপর থেকে চুলগুলো সরিয়ে একসাইডে রাখল। পেন্ডেন্টটা খুব যত্নসহকারে গলায় পরিয়ে দিল। তারপর আলতো করে তার কাঁধে ঠোঁট ছোঁয়াল। শেরাজের ছোঁয়া চোখ বন্ধ করে অনুভব করল সুমু। ড্রেসিংটেবিলের ওপর থেকে ইয়ার রিংগুলো নিল শেরাজ। সুমুর দু’কানে মোট ছয়টা পিয়ার্সিং করা। শেরাজ একে একে সবগুলো রিং তার কানে পরিয়ে দিল। আবারও আলতো করে সুমুর দু’কানে ঠোঁট ছোঁয়াল সে। তারপর সুমুর আগের নোজ পিনটা খুলে ফেললো। নিজের আনা নোজ পিনটা সুমুকে পরিয়ে দিয়ে সুমুর নাকে ওপর ঠোঁট ছোঁয়াল। ড্রেসিংটেবিলের ওপর থেকে কাজল আর লিপস্টিকটা হাতে নিল। কাজলটা সুমুর চোখে পরিয়ে দিয়ে বলল,

“এমনিতেও আমার সুইটহার্টের ঠোঁটে লিপস্টিকের প্রয়োজন পড়েনা। তবুও হালকা পড়ালাম।”
শেরাজ আলতো হাতে সুমুর ঠোঁটে পিংক কালারের লিপস্টিক হালকা করে পরিয়ে দিল। একদম সাধারণ ভাবে সাজাল সুমুকে। মুখে কোনো প্রসাধনীর ছোঁয়া পযর্ন্ত দিল না। সুমুকে দাঁড় করিয়ে নিজের দিকে ঘুরিয়ে বলল,
“মাশাআল্লাহ্! মানুষ দুনিয়াতে চেহারা দ‍্যাখে। আর আমি, একটা চেহারার মধ্যে আমার পুরো দুনিয়া দেখে ফেলেছি।”
কথাগুলো বলে শেরাজ সুমুর কপালে ঠোঁট ছোঁয়াল। তারপর জড়িয়ে নিল প্রেয়সীকে তার দুই বাহুর মধ্যে। দু’মিনিট পরে সে সুমুকে ছেড়ে দিয়ে বলল,
“আমি শাওয়ার নিয়ে আসছি। বাহিরে যা যা আছে প‍্যাক করে নাও।”
সুমু ড্রেসিংটেবিলের সামনে এসে বাকি জিনিসগুলো হাতে নিল। শেরাজ ওয়াশরুমে না গিয়ে আবারও ফিরে এলো তার কাছে। সুমু পেছন ফিরতেই শেরাজের সাথে ধাক্কা খেলো। সে প্রশ্নবোধক দৃষ্টিতে শেরাজের দিকে তাকাল। শেরাজ দু’হাত পকেটে গুজে দাঁড়িয়ে বলল,
“তোমার ঠোঁটে এই কালারটা একদম মানাচ্ছেনা, সুইটহার্ট।”
সুমু ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে বলল,

“ঠিক আছে, মুছে ফেলছি।”
সে সামনের দিকে ঘুরে দাঁড়ানোর আগেই শেরাজ তার কোমর জড়িয়ে ধরে তাকে কাছে টেনে এনে তার ওষ্ঠ নিজের ওষ্ঠের আয়ত্বে নিয়ে নিল। সুমুর হাতে থাকা প্রতিটা জিনিস মেঝের ওপর শব্দ করে পড়ল। সুমুর ওষ্ঠের ওপর নিজের ইচ্ছেমতো রাজত্ব চালিয়ে ছেড়ে দিল সুমুকে। মুহুর্তেই সুমুর গোলাপি অধর জোড়া রক্তবর্ণ ধারন করল। শেরাজ দুষ্টু হেসে বুড়ো আঙুলের সাহায্যে নিজের ঠোঁটে কোণা মুছে বলল,
“নাও, পারফেক্ট সুইটহার্ট। আমার ঠোঁট আর দাঁত দিয়ে তৈরি করা এই রক্তিম কালারটাতে তোমাকে সবথেকে বেশি মানায়।”
সুমু ঠোঁটে হাত রেখে দাঁড়িয়ে আছে। কথাগুলো বলে চলে যাবার দু’পা বাড়াল শেরাজ। আবারও পা পেছনে ফিরিয়ে এনে সুমুকে চোখ মেরে ফিসফিসিয়ে বলল,

“আই এম ইওর লিপস্টিক রিমুভার, সুইটহার্ট।”
সুমু রাগি লুক নিয়ে শেরাজের দিকে তাকাল। শেরাজ ঠোঁট কামড়ে হাসছে। সুমু শাড়ির আঁচল সামনে এনে কোমরে গুজতেই শেরাজ দৌড়ে ওয়াশরুমের মধ্যে ঢুকে গেল। সুমু হাসল শেরাজের কান্ডে। ওভাবেই কোমরে শাড়ি গুঁজে বাকি জিনিসগুলো লাগেজে প‍্যাক করতে লাগল সে। মিনিট দশেকের মধ্যে শেরাজ কোমরে টাওয়েল পেঁচিয়ে ওয়াশরুম থেকে বেরিয়ে এলো। ড্রেসিংটেবিলের সামনে দাঁড়িয়ে হাত দিয়ে চুল ঝাড়তে লাগল সে। ঠোঁটে লেখে আছে তার এসআরকের “ডাংকি” মুভির “ও মাহি” গান। গান গাইছে আর “ও মাহি” বলার সময় সুমুর দিকে হাত বাড়িয়ে “ও মাহি” বলছে। সুমু সেদিকে ভ্রুক্ষেপ না করে ওয়াশরুমে গিয়ে শেরাজের প‍্যান্টটা নিয়ে এলো। ভাঁজ করে প‍্যান্টটা লাগেজে ঢুকাল। লাগেজ থেকে শেরাজের জন‍্য নিউ টি-শার্ট আর প‍্যান্ট বের করল। শেরাজ আবারও সুমুর দিকে তাঁকিয়ে গান ধরলো,

“একখান চুমু……… দিয়ে যা!
ও বউ…..একখান চুমু দিয়ে যা”
সুমু তাকাল না তার দিকে। শেরাজ একটু চেঁচিয়ে বল,
“তোর স্বামী, তোর চুমু শূন্যতায় ভুগে রে!
ঝুম্মা ঝুম্মা দে দে”
শেরাজ নিজের ভুল বুঝতে পেরে জিভে কামড় দিয়ে বলল,
“ওহ সরি! ভুল গেয়েছি।”
“সুমু সুমু দে দে,
সুমু সুমু দে দে, চুম্মা”
সুমু বিরক্ত হলো তবুও তাকাল না তার দিকে। নিজের মতো কাজ করতে থাকল সে। শেরাজ আয়নার মধ্যে সুমুকে একবার পরখ করল। পা থেকে মাথা পযর্ন্ত পরখ করতে গিয়ে শেরাজের চোখ আটকালো সুমুর মেদহীন ফর্সা পেটের দিকে। শাড়ি কোমরে গুঁজে রাখার ফলে সুমুর পেটসহ নাভি দৃশ‍্যমান। সুমু দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে লাগেজের সবকিছু চেক করছে।
শেরাজ আয়নার ভেতর দিয়েই সুমুর দিকে তাকিয়ে থেকে বলল,
“সুইটহার্ট!”

সুমু সোজা হয়ে দাঁড়াল। আয়নার ভেতর দিয়ে শেরাজের দিকে প্রশ্নবোধক দৃষ্টিতে তাকাল। শেরাজ হাতের তর্জনী দিয়ে আয়নার মধ্যে সুমু প্রতিবিম্বের ওপর হাত রাখল। সুমু ড‍্যাবড‍্যাব করে তাকিয়ে রইল আয়নার দিকে। শেরাজ আয়নার মধ্যেই সুমুর কপালে তর্জনী রেখে ধীরে ধীরে নিজের আঙুল ধীরে ধীরে নিচে নামাতে লাগল। সুমু তার কান্ড দেখে চোখ বড় করে ফেললো। শেরাজের হাতে এসে থামল সুমুর শাড়ি সরে বেরিয়ে আসা পেটের ওপর। সে এমন ভাবে হাতটা আস্তে আস্তে সরাল যেন সে সুমুর পেটের ওপর থেকে কাপড়টা নিজে সরাল। আয়নার ওপর নিজের হাত বিচরণ করতে লাগল শেরাজ। শেরাজের কর্মে সুমু শ্বাস আটকে নিজের পেট ভেতরে দিকে টেনে নিল। শেরাজ হাসল সুমুর অবস্থা দেখে। সে একটু ঝুঁকে আয়নার মধ্যে সুমুর নাভির প্রতিবিম্বের ওপর ঠোঁট ছোঁয়াল। সুমু চোখ বন্ধ করে ফেললো। শেরাজ উঠে দাঁড়াল। সে ধীরে এগিয়ে এলো সুমুর কাছে। সুমুর মুখের সামনে হাত দিয়ে তুড়ি বাজাতেই সুমু চোখ মেলে তাকাল। সুমুর কোমর থেকে শাড়ির আঁচলটা ছেড়ে দিল শেরাজ। আঁচলটা ঠিক করে দিয়ে সুমুর কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিসিয়ে বলল,

“মাত্রই শাওয়ার নিয়ে আসলাম, বউ। তুমি কি আমাকে আরও একবার গোসল করাতে চাও? অবশ্য তুমি যদি চাও, তাহলে আমি আরও একবার ফরজ গোসল করতে পারি। কি, চাইছো নাকি, বউ? ঝেড়ে কাশো, বউ। মন খুলে কথা বলো। আমি একটুও মাইন্ড করব না।”
সুমু বেড থেকে টি-শার্ট আর প‍্যান্ট শেরাজের হাতে ধরিয়ে দিয়ে বলল,
“আপনার অশ্লীল মুখটা বন্ধ করুন। আর তাড়াতাড়ি রেডি হয়ে বাহিরে আসুন। আমি আর আপনি কিছু কাপল পিক তুলব।”
“তাহলে আমি ভিডিও মেক করব, তুমি ক‍্যামেরা ধরবা।”
“ওকে, তাড়াতাড়ি করুন।”
শেরাজ আর কোনো কথা না বলে তাড়াতাড়ি রেডি হয়ে নিল। সে সুমুকে টেনে এনে আয়নার সামনে দাঁড় করিয়ে ক‍্যামেরা অন করে সুমুর হাতে দিল। সুমু একহাতে ফোনের ক‍্যামেরা ধরল। শেরাজ দু’হাত দিয়ে পেছন থেকে সুমুকে জড়িয়ে ধরে সুমুর গলায় মুখ গুঁজে রাখল। চুলের জন‍্য শেরাজের মুখ আর ফোনের জন‍্য সুমু মুখ হাইড হয়ে গেল। দুজনে একসাথে এইভাবে কিছু মিরর কাপাল পিক নিল।
পিক তোলা শেষে সুমু শেরাজের দিকে তাকিয়ে হেসে বলল,

“একটু ঝুঁকুন তো, খান সাহেব।”
শেরাজ ঝুঁকে দাঁড়াল। সুমু শেরাজের কপালে ঠোঁট ছুঁয়ে বলল,
“আমার মন আর মস্তিষ্কের রাজ‍্যে রাজত্ব চালানো আপনি এক সুদর্শন, প্রেমিক পুরুষ, মায়াবী মহারাজা। এই হৃৎপিণ্ডটা আমার বুকের মধ্যে থাকে, কিন্তু তাকে নিয়ন্ত্রণ করেন আপনি। আমার হৃৎপিণ্ডের প্রতিটা হৃৎস্পন্দন আপনার নামে স্পন্দিত হয়, খান সাহেব।”
থামল সুমু। ছলছল নয়নে আবারও শেরাজের দিকে তাকিয়ে বলল,
“এখন আমার নিজেকে পৃথিবীর সবথেকে সুখী আর ভাগ‍্যবতী নারী মনে হয়। কিন্তু, মাঝে মাঝে ভয় হয়। আমি যে অভাগী, খান সাহেব। সুখ বেশিদিন আমার কপালে সয়না। এই এতো সুখ আমার কপালে সয়বে তো, খান সাহেব? কোনো ঝড় এসে সবটা তছনছ করে দেবেনা তো?”
“চুপ! এমন কিছুই হবেনা। আমরা হতে দেবোনা, সুইটহার্ট। এখন চলো।”
শেরাজ স‍্যান্ডিকে কল করল। স‍্যান্ডি এসে তাদের লাগেজ নিয়ে গেল। শেরাজ সুমুকে নিয়ে বেরিয়ে এসে রুমের চাবি ম‍্যানেজারের হাতে দিল। ম‍্যানেজার হাসি মুখে চাবিটা নিল। রিসোর্ট থেকে বেরোনোর আগে শেরাজ মুখে মাক্স পড়ে নিল।
সুমু হেসে বলল,

“আপনি নাকি পিক তুলবেন? ভিডিও মেক করবেন? এই মাক্স পড়ে করবেন?”
শেরাজ কোনো কথা বলল না। সে সুমুকে নিয়ে রিসোর্ট থেকে বেরিয়ে এলো। পার্কের যেই সাইডে জনসংখ্যা কম সেই সাইডে গিয়ে মাস্ক খুললো সে। স‍্যান্ডিকে দিয়ে নিজেদের কিছু কাপাল পিক নিল। পিক তোলা শেষে মাস্ক পরার সময় একটা মেয়ে এসে দাঁড়াল সামনে শরাজের। মেয়েটাকে দেখে শেরাজ তড়িঘড়ি করে মাস্ক পরে নিল। মেয়েটা মুচকি হেসে শেরাজের দিকে আঙুল তাঁক করে বলল,
“এস.কে ওরফে দ‍্যা ওয়ার্ল্ড ফেমাস গার্লস হার্টথ্রব শেরাজ খান, রাইট?”
শেরাজ মেয়েটার দিকে ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে বলল,
“নো, ইউ আর রং সিস্টার।”
শেরাজের কথা মেয়েটা পাত্তা দিল না। মুহুর্তেই সে সকলকে ডাকতে ছুঁটে গেল। সুমু শেরাজের পাশে দাঁড়িয়ে হাসছে। স‍্যান্ডি তার স‍্যারের অবস্থা দেখে মুখ ঢেকে হাসছে। শেরাজ চোখ রাঙিয়ে তাকাল স‍্যান্ডির দিকে। স‍্যান্ডি মুখ থেকে হাত সরিয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে আকাশ দেখতে লাগল। শেরাজ সুমুর হাত ধরে বলল,

“তাড়াতাড়ি চলো। এখান থেকে বেরোতে হবে। কাল একবার এই ঝামেলায় পড়েছি। আজ আর পড়তে চাইনা।”
সুমুকে নিয়ে দু’পা এগোতেই সকলে এসে ঘিরে ধরল শেরাজকে। স‍্যান্ডি এগিয়ে আসতেই সুমু আটকালো স‍্যান্ডিকে। সকলের জোড়াজুরিতে শেরাজ বাধ্য হয়ে মাস্ক খুললো। সকলে একসাথে বলে উঠল, “স‍্যার ওয়ান ফটোগ্রাফ, প্লিজ।”
শেরাজ ব‍্যস্ততা দেখিয়ে চলে আসতে চাইল। সুমু তার হাত ধরল। শেরাজ সুমুর দিকে তাকাতেই সুমু চোখ দিয়ে ইশরা করল তাকে। শেরাজ রাজি হলো সকলের সাথে সেলফি নিতে। হঠাৎ একটা মেয়ে এসে সুমুকে বলল,

“এই আপু! একটু সরুন তো।”
সুমু সরে যেতে নিলে শেরাজ সুমুর হাত ধরে ফেললো। মেয়েটা ভ্রু কুঁচকে শেরাজ আর সুমুর হাতের দিকে তাকাল।
শেরাজ সুমুর দিকে তাকিয়ে বলল,
“সি ইজ মাই ওয়াইফ।”
কথাটা বলে শেরাজ সামনে তাকালো। সকলে অবাক হয়ে সুমুর দিকে তাকিয়ে আছে।
শেরাজ আবারও বলল,
“পিক তুলতে হলে আমার ওয়াইফকে সাথে নিয়েই আমার সাথে পিক তুলতে হবে। আর হ‍্যাঁ, সকলে আমার থেকে দু’পা ডিস্ট্যান্স মেইনটেইন করে পিক তুলবেন।”
কথাগুলো বলে শেরাজ সুমুর দিকে তাকিয়ে বলল,
“এই যে ম‍্যাডাম! আমার ইউজ করা মাস্ক আপনার ইউজ করতে কি কোনো প্রবলেম হবে?”
সুমু ভ্রু কুঁচকে শেরাজের দিকে তাকিয়ে চাপাস্বরে বলল,
“সারাদিন আমার ঠোঁটের মধ্যে নিজের ঠোঁট ডুবিয়ে বসে থাকেন, আর এখন জিঙ্গাসা করছেন, আপনার ইউজ করা মাস্ক ইউজ করতে আমার প্রবলেম হবে কিনা?”
শেরাজ আলতো হেসে নিজ হাতে সুমুকে মাস্কটা পরিয়ে দিল। শেরাজের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েগুলো কেমন করে যেন দেখল সুমুকে। সকলে একে একে এসে দু’পা ডিস্ট্যান্স রেখে পিক তুললো। পিক তোলা শেষ হতেই শেরাজ আর এক সেকেন্ডও দাঁড়াল না।সে সুমুর হাত ধরে পার্ক থেকে বেরিয়ে এলো। সুমু আর শেরাজ ব‍্যাক সিটে বসল। স‍্যান্ডি গাড়িতে উঠে গাড়ি স্টার্ট করল। মুহুর্তেই গাড়ি চলতে লাগল নিজ গতিতে।

ওমান, বুরাইমি
আরিয়ান আর রোজা আজ এসেছে এস.কে ম‍্যানশনে। রোজা বরাবরের মতো ওয়েস্টার্ন ড্রেস পরে এসেছে। অনন্যা খাতুন জমিয়ে রান্না করছেন ওদের জন‍্য। রোজা কিচেনে এসে অনন‍্যা খাতুনকে জড়িয়ে ধরল। অনন‍্যা খাতুন আলতো হেসে রোজাকে বুকে টেনে নিল। রোজা মুচকি হেসে বলল,
“ওহ ফুপিমনি, তোমার ছেলে কবে আসবে বলো তো? বিডি’তে গিয়ে আমাদের ভুলে গেছে নাকি? আমি আজ কতোবার ফোন করলাম। একবারও কল পিক করল না।”
অনন্যা খাতুন রান্না করতে করতে বললেন,
“চলে আসবে মামনি। তুই আর কিছুদিন ওয়েট কর। এইবার শেরাজ ফিরলেই আমি তোদের দুজনের বিয়ের ব‍‍্যবস্থা করব। ছেলেটা বড্ড অবাধ‍্য হয়ে গেছে। এইবার ওকে তোর সাথে বিয়ে দিয়ে ঘরে বাঁধার ব‍্যবস্থা করব।”
রোজা খুশিতে আবারও জড়িয়ে ধরল অনন‍্যা খাতুনকে। সে অনন‍্যা খাতুনের গালে ঠোঁট ছুঁয়ে বলল,
“আই লাভ ইউ, ফুপিমনি। আই লাভ ইউ সো মাচ।”
“আরে ছাড় মামনি। রান্না করছি তো।”
রোজা ছেড়ে দিল অনন‍্যা খাতুনকে। অনন‍্যা খাতুন একটু অভিমানী স্বরে বললেন,
“আরিয়ানটা কই রে?”
“ব্রো তো ড্রয়িংরুমে রিয়াজের সাথে বসে গল্প করছে আর দাবা খেলছে।”
অনন‍‍্যা খাতুন ফ্রিজ থেকে মিষ্টি আর ফল বের করলেন। ফলগুলো ভালো করে ধুয়ে কেটে প্লেটে সাজিয়ে তিনি ইশিতার হাতে দিয়ে বললেন,

“ড্রয়িংরুমে আরিয়ান বসে আছে। তুমি রোজাকে নিয়ে ড্রয়িংরুমে যাও। আর এই ফল, মিষ্টিগুলো নিয়ে যাও।”
ইশিতা রোজাকে নিয়ে চলে গেল ড্রয়িংরুমে। আরিয়ান রিয়াজের সাথে দাবা খেলছে। ইশিতাকে দেখে সোজা হয়ে বসল আরিয়ান। ইশিতা মিষ্টি আর ফলের ট্রেটা সেন্টার টেবিলের ওপর রাখল। আরিয়ান বাজে নজরে ইশিতার দিকে তাকিয়ে রইল। ইশিতা চলে যেতে নিলে, আরিয়ান পেছন থেকে ডাক দিল। আরিয়ানের ডাক শুনে ইশিতা দাঁড়িয়ে পড়ল। আরিয়ান কাটাচামচে একটা মিষ্টি গেঁথে বলল,
“আরে ইশিতা, চলে যাচ্ছো কেনো? আমাদের সাথে একটু বসো। গল্প করি তোমার সাথে। তোমার আর আরবাজের বিয়ের গল্প আমাকে বলো। আমিও একটু শুনি। তুমি ভাবো ইশিতা, আরবাজ! আমার, সারবাজ আর শেরাজের থেকে ছোট হয়েও আগে আগে বিয়ে করে ফেললো। আর আমরা এখনো বিয়ে তো দূরে থাক একটা গার্লফ্রেন্ড পযর্ন্ত কপালে জোটাতে পারলাম না।”

রোজা পায়ের ওপর পা তুলে বসে ফোনে স্ক্রল করছে। আশেপাশে কি হচ্ছে না হচ্ছে সেদিকে তার কোনো পাত্তা নেই। ইশিতা অস্বস্তিবোধ করল। সে গলার স্বর একদম নিচু করে বলল,
“আসলে ভাইয়া, কিচেনে আমার অনেক কাজ আছে। আপনারা বসে গল্প করুন। আমি পরে আসব।”
কথাগুলো বলে ইশিতা ছুটে চলে গেল কিচেনের দিকে। আরিয়ানের বাঁকা হেসে মিষ্টিতে ওয়ান বাইট বসাল। রিয়াজ হাত ধরে টানতেই সে আবারও দাবা খেলায় মন দিল।

গাড়ি এসে থামল সিকদার বাড়ির সামনে। সুমুরা গাড়ি থেকে নেমে দাঁড়াল। স‍্যান্ডি গিয়ে গাড়ির ডিকি খুলে লাগেজ বের করল। শেরাজ স‍্যান্ডির হাত থেকে লাগেজ নিয়ে বলল,
“তুমি গাড়িটা গ‍্যারেজে রেখে আসো, সান।”
“কিন্তু, স‍্যার আপনার হাতে…”
“তোমাকে যেটা বলেছি সেটা করো। আমি বা’হাতে লাগেজ নিব। আর এখন আমার হাত অনেকটা ভালো। তুমি যাও।”
স‍্যান্ডি চলে গেলো গাড়ি গ‍্যারেজে রাখতে। শেহ
রাজ সুমুকে নিয়ে বাসার ভেতরে ঢুকল। বাড়ির সকলে ড্রয়িংরুমে উপস্থিত। সুমুদের ঢুকতে দেখে মাইশা, সামিয়া আর নাজমিন এগিয়ে এলো।
মাইশা! সুমুকে পা থেকে মাথা পযর্ন্ত দেখে বলল,
“বাহ সুমু! তোর শাড়ি আর গলার পেন্ডেন্টটাতো খুব সুন্দর। আর মাশাআল্লাহ! তোকে অসম্ভব সুন্দর লাগছে।”
সুমু মুচকি হাসল মাইশার কথায়। আনোয়ার সাহেব মাইশাকে গম্ভীর গলায় বললেন,
“ওরা মাত্রই এসেছে, মাইশা। ওদের আগে রুমে গিয়ে ফ্রেশ হতে দাও।”
মাইশা সরে দাঁড়াল। শেরাজ আর সুমু ওপরে চলে গেল।

সন্ধ্যা সাড়ে সাতটার দিকে ড্রয়িংরুমে সকলে উপস্থিত হলো। সুমু! রাইফ আর তিশাকে অনেকগুলো চকলেট দিল। মাইশা রাগিস্বরে বলল,
“বাহ সুমু! তুই ওদের চকলেট দিলি, আর আমাদেরটা কই? নাকি আমরা বড় হয়ে গেছি বলে চকলেট পাব না?”
“তোমাদের জন‍্যও আছে, আপু।”
সুমু একে একে সবাইকে চকলেট দিল। আইয়ুবরাও চকলেট নিল। সুমু চকলেট নিয়ে রাইশার সামনে গেল। রাইশা অন‍্যদিকে মুখ ঘুরিয়ে চকলেট নিল। সুমু আলতো হাসল। আবারও চকলেট নিয়ে সে ইফতিয়ার সামনে গেল। ইফতিয়া চকলেট না নিয়ে মুখ ঘুরিয়ে অন‍্যদিকে তাকিয়ে রইল।
সুমু ভ্রু কুঁচকে বলল,
“কি হলো, ধর।”
ইফতিয়া রাগিস্বরে বলল,
“নো নিড।”
“ওকে, তাহলে আমি খাই।”
কথাটা বলে সুমু ইফতিয়ার সামনে চকলেটের প‍্যাকেটটা ছিঁড়ে চকলেটে কামড় দিয়ে বলল,
“উম, চকলেটটা খুব টেস্টি তো। অবশ‍্য আমার খান সাহেবের কিনে দেওয়া চকলেট, মিষ্টিতো হবেই।”
ইফতিয়া তেলে বেগুনে জ্বলে উঠল। সুমু দাঁত কেলিয়ে হেসে সরে এলো। রিসাত সাহেব এখন চলে যাবে। শেরাজরা সকলে তাকে ছাড়তে এয়ারপোর্ট যাবে। হাসি বেগম আর খুশি বেগম ভাইয়ের জন‍্য কাঁদছেন। রিসাত সাহেব সকলকে বিদায় জানিয়ে শেরাজদের সাথে বেরিয়ে পড়ল এয়ারপোর্টের উদ্দেশ্যে।

শেরাজদের বাসায় ফিরতে ফিরতে রাত বারোটা বাজল। আনোয়ার সাহেব ড্রয়িংরুমে বসে আছেন। শেরাজরা বাড়ির ভেতরে ঢুকতেই আনোয়ার সাহেব ডাক দিলেন। তার ডাকে দাঁড়িয়ে পড়ল শেরাজ। সে পেছন ফিরে তাকিয়ে বলল,
“জি, আঙ্কেল!”
“পৌঁছে দিয়ে এসেছো রিসাতকে?”
“জি, আঙ্কেল!”
আনোয়ার সাহেব “আচ্ছা” বলে মাথা নাড়লেন। হঠাৎ তিনি কিছু একটা ভেবে আবারও বললেন,

খান সাহেব পর্ব ২৯

“কাল সন্ধ্যায় তোমার আর সুমু মামনির সাথে আমার কিছু কথা আছে। দুজনে কাল সন্ধ্যায় ড্রয়িংরুমে উপস্থিত থাকবে।”
“ওকে, আঙ্কেল!”
“ঠিক আছে! তাহলে এখন রুমে যাও। সুমু মামনি না ঘুমিয়ে অপেক্ষা করছে তোমার জন‍্য। আর রাহিন তোমরাও রুমে যাও।”
সকলে একসাথে যার যার রুমে চলে গেল। আনোয়ার সাহেব কিছুক্ষণ বসে থেকে তারপর তিনিও রুমে চলে গেলেন।

খান সাহেব পর্ব ৩১