খান সাহেব পর্ব ২
সুমাইয়া জাহান
ভোরের আলো চোখে পড়তেই একরাশ বিরক্তি নিয়ে কম্বলটা চোখ পযর্ন্ত ঢেকে দিয়ে আবারও ঘুমানোর প্লান করল সুমু। হঠাৎ বাহির থেকে তার মায়ের চিৎকারের ডাক ভেসে এলো। মায়ের কন্ঠ শুনেই ঘুম থেকে লাফ দিয়ে উঠল সে। ফোনটা পাশ থেকে নিয়ে সময়টা দেখতেই চোখ কপালে উঠল তার।
“ওএমজি! এতো লেট করে ফেলেছি ঘুম থেকে উঠতে। ইশ! কাল রাতে লাইভ দেখার জন্য ওয়েট করতে গিয়ে আজ এত দেরী করে ফেললাম। এই খান সাহেব এতো রাতে কেনো লাইভে আসে, কে জানে? অবশ্য তার সময় আর আমার সময় আলাদা। তার লেট করে আসাটা স্বাভাবিক।”
সুমু পাশ ফিরে তাকাতেই দেখল সামিয়া এখনো কুম্ভকর্ণের মতো ঘুমাচ্ছে। ছোট বোনকে ডেকে তুলে, সে চলল ফ্রেশ হতে। পনেরো মিনিটের মধ্যে ফ্রেশ হয়ে এসে ছুটল ব্রেকফাস্ট করার জন্য।
টেবিলে ব্রেকফাস্ট সাজানো হয়েছে। সুমু টেবিলে বসে পরোটা দিয়ে ডিম ভাজা খেতে-খেতে হাসি বেগমকে জিঙ্গাসা করল।
“আম্মু! নাজমিন আমাদের সাথে যাবে না? তুমি বড়মা আর বড়বাবাকে বলেছিল, যে ওকে আমাদের সাথে নিয়ে যাব?”
“হ্যাঁ বলেছিলাম, রাজি হয়েছে। আর শোন, নাজমিন তোদের মতো পড়ে-পড়ে ঘুমাচ্ছে না। মেয়েটা কোন সকালে ঘুম থেকে উঠে রেডি হয়ে গেছে। এখন দয়া করে তোরা দুইবোন তাড়াতাড়ি রেডি হয়ে আমাকে উদ্ধার কর।”
“আরে আম্মু! তুমি কোনো টেনশন করো না। সময়মতো আমি রেডি হয়ে যাব। তুমি তোমার ছোট মেয়েকে বলো।”
এমন সময় সামিয়া এসে চেয়ার টেনে বসল। সুমুর কথা শুনে বলল,
“আমি আজ আপুর আগে রেডি হয়ে যাব আম্মু।”
সুমু ছোট বোনের মাথায় একটা গাট্টা দিয়ে বলল,
“হুম, দেখা যাবে।”
বিরক্তিতে চোখ মুখ কুচকে “আহ্ আপু” বলে চিৎকার করল সামিয়া। পাশ ফিরে তাকিয়ে দেখলে তার বোন চুপচাপ খেয়ে যাচ্ছে।
“আপু শোন!”
“হুম বল!”
“শেরাজ খান মানে তোর ক্রাশ খান সাহেব–সে তো রাহিন ভাইয়ার ফ্রেন্ড।”
“হুম তো?”
“মামি গতকাল ফোন দিয়ে বলল, রিহান ভাইয়ার সব ফ্রেন্ডরা নাকি কাল বিডিতে আসবে–রাহিন ভাইয়ের সাথে এই বিয়েতে। শুনলাম শেরাজ খান ও নাকি আসবে। ইফতিয়া আপু, রাইশা, রাইশার ফ্রেন্ডরা নাকি অনেক এক্সসাইটেড–তার আসার খবর শুনে।”
বোনের মুখ থেকে এমন কথা শুনে গলায় খাবার আটকে গেলে সুমুর। সামিয়া মাত্র কি বলল এখনো বুঝে উঠতে পারেনি তার মস্তিষ্ক। মাত্র কি বলল তার বোন, “শেরাজ খান মানে তার খান সাহেব–সে বিডিতে আসবে। যে মানুষটাকে দেখার জন্য সে প্রতিদিন অপেক্ষা করে। কখন সেই মানুষটা লাইভে আসবে আর তাকে একপলক দেখতে পাবে সুমু। যাকে টিকটক, ইনস্টাগ্রাম, ইউটিউব সব জায়গা থেকে ফলো করে সে। আজ পযর্ন্ত লাইভে একটা প্রশ্ন পযর্ন্ত করতে পারেনি সুমু। তাকে লাইভে দেখলে অদ্ভুত এক ভয় কাজ করে মেয়েটার মাঝে। এমন অদ্ভুত ফিলিংস আর কাউকে দেখলে হয় না সুমুর। যার কোনো ভিডিও, পিক দেখা মিস করেনা সে। সবসময় অপেক্ষা করে আবার কবে লাইভে আসবে, নতুন ভিডিও, পিক পোস্ট করবে। যার পিক ভিডিও দিয়ে ফোন ভর্তি করে ফেলেছে মেয়েটা। রোজ রাতে ঘুমানোর আগে এই প্রার্থনা করে চোখ বন্ধ করে সে– যাতে স্বপ্নে অন্তত মানুষটাকে দেখতে পারে। সেই মানুষটা বিডিতে আসবে। মানে আমি তাকে দেখতে পাব? সত্যি আমি তাকে দেখতে পাব? এমনটা হবে? নিজের মনকে নিজে প্রশ্ন করলো সুমু। তার শেরাজ খানের প্রতি এমন অদ্ভুত ফিলিংসগুলোর কথা কেউ জানেনা। সুমু কাউকে বলে না। সবাই শুধু জানে সেইও আর দশটা মানুষের মতো শেরাজের ফ্যান।”
এমন সময় হাসি বেগম বললেন,
“তোরা দুইবোন কি শান্তিতে খেতেও জানিস না? খাবার সময় এতো কথা কিসের তোদের? চুপচাপ খেয়ে রেডি হতে যা। তোদের মামা সেই সকাল থেকে ফোন করছে তাড়াতাড়ি যাওয়ার জন্য।”
চুপচাপ খেয়ে রেডি হবার জন্য চলে গেল দুইবোন। আজ সুমুর সবথেকে আনন্দের দিন। এমন খুশির খবর সে তার জীবনে পায়নি।
দুপুর একটার মধ্যে সুমুরা পৌঁছে গেল তার মামার বাসায়। বাড়ি ভর্তি মানুষের আনাগোনা। কাল নাকি তার স্বপ্নের মানুষটা আসবে এই শহরে। ভাবতেই অবাক লাগে এখনো সুমুর। হাসি বেগম এসেই কাজে লেগে পড়েছে। বিয়ে বাড়ি অনেক কাজ পড়ে আছে।
আজ রাতে সবাই মিলে ছাদে প্রচুর আড্ডা দেবার প্লান করল। সুমু ভাবল মাইশার কাছে যাবে। কিন্তু আসার পর থেকেই দেখছে মাইশা ফোনে কথা বলেই যাচ্ছে। দুদিন পরেই তো বিয়ে– এখন এতো কি কথা বলে বুঝেই পায়না সুমু। তারপরেও তার কাজিন নাজমিনকে নিয়ে গেল মাইশার রুমে। ওদের দুজনকে দেখে মাইশা ফোন রেখে ওদের দুজনকে বসতে বলল। ঠিক তখনই হুড়মুড়িয়ে রুমে ঢুকল ইফতিয়া, সামিয়া, তিশা, রাইশা, রাইফ। ব্যাস, এইবার জমে যাবে তাদের আড্ডা। সবাই মিলে শুরু করল একে অপরের পিছনে লাগা। মিনা বেগম সবার জন্য শরবত, ফল কেটে নিয়ে আসল। খেতে-খেতে সকলে গল্প করছে। হঠাৎ ইফতিয়া বলল,
“এই মাইশা আপু, সারাদিন তুমি ভাইয়ার সাথে কি এতো কথা বলো? আমাদের দাও, আমরাও একটু কথা বলি।”
রাইশা দুষ্টু হেসে বলল,
“এই চলো আমরা সবাই মিলে নয়ন ভাইয়ার সাথে একটু মজা করি।”
মাইশা ভ্রু কুঁচকে বলল,
“এই না, নয়ন তোদের বড় ভাইয়া হয়। একদম উল্টাপাল্টা কিছু করার চিন্তা করবি না। ছোট ছোটোর মতো থাক। বেশি পাকনামি করবি না।”
সামিয়া আলতো হেসে বলল,
“না বললে তো শুনব না আপু। ছোট হিসাবে আমাদেরও তো একটা দায়িত্ব আছে তাই না? এই রাইশা আপু তুমি বলো তো ঠিক কি করতে চাও?”
“হুম! তাহলে শোনো সবাই। আপু তো সারাদিন ভাইয়ার সাথে কথা বলে। তাহলে অবশ্যই ওদের দুজনের ভেতর ভালো সম্পর্ক হয়ে গেছে। দুজন দুজনকে ভালো করে চিনে গেছে, বুঝে গেছে। তাই আমরা এখন ভাইকে কল করব আর আপুর ভয়েজ নকল করে কথা বলব।”
মাইশা বাঁধা দিয়ে বলল,
“এই না, না! রাইশা মার খাবি তুই। এমন কিছুই করবিনা।”
নাজমিন বলল,
“কেনো আপু? আমরাও একটু দেখি ভাইয়া আপনাকে কতটা ভালোবাসে। চিনে নিতে পারে কিনা আপনাকে।”
সকলের জোড়াজুড়িতে মাইশা বাধ্য হলো নয়নকে কল করতে। মাইশাও দেখতে চায় কতটা ভালোবাসে মানুষটা তাকে। পারে কিনা তাকে চিনে নিতে। তাই সকলে মিলে সুমুর কাছে ফোন দিল। সুমু নয়নের নাম্বার ডায়াল করল। ওপাশ থেকে দু’বার রিং হতেই কল রিসিভ করল,
“হ্যালো, আসসালামু ওয়ালাইকুম!”
“ওয়ালাইকুম আসসালাম!”
“কেমন আছো জান?”
“আলহামদুলিল্লাহ্ ভালো। কিন্তু মাইশা তোমার ভয়েসটা একটু অন্য রকম লাগছে?”
“কই অন্যরকম লাগছে? এইটুকু সময়ের মধ্যে তুমি আমার ভয়েসটাও ভুলে গেলে?”
“আরে! না, না। সরি সোনা। আমি তোমাকে ভুলিনি। একটু অন্য রকম লাগছিল তাই আর কি।”
ওদের দুজনে কথা শুনে সকলে মুখ টিপে হাসছে। আর মাইশা রাগে ফুঁসছে আর বিড়বিড় করে বলছে,
“এই লোকটার খবর করে ছাড়ব আমি। সারাদিন কথা বলেও উনি আমার ভয়েস চিনে না।”
সুমু কল কেটে হেসে উঠল। সকলে একসাথে মাইশার সাথে মজা নিতে লাগল।
পুরো ছাদ জুড়ে বইছে দক্ষিণা বাতাস। কুয়াশার চাদরে ঢেকে গেছে চারপাশ, অথচ চাঁদের আলো সেই কুয়াশার ভেতরেই এক অন্যরকম রহস্যময় সৌন্দর্য ফুটিয়ে তুলেছে। বাতাস বয়ে আনছে সদ্য ফোটা ফুলের মাদকতা, যা নিঃশব্দ রাতটাকে যেন আরও মায়াময় করে তুলছে। দূরে ঝিঁঝিপোকার ডাক, আর কাছে নিস্তব্ধতার গভীরতা—দুটো মিলে তৈরি করেছে এক অদ্ভুত সুর। লক্ষ কোটি কপোত-কপোতি তারার ভিড়ে আকাশজুড়ে জ্বলজ্বল করছে একাকী এক চাঁদ। সঙ্গীহীন হয়েও সে যেন উদারভাবে নিজের আলো বিলিয়ে দিচ্ছে চারপাশে। প্রকৃতির এই সৌন্দর্যে নিজেকে হারিয়ে না ফেলার উপায় নেই।
চারদিকে নিরবতা, গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন পুরো শহর। শুধু একটি চোখজোড়া আকাশের দিকে নিবদ্ধ—অপেক্ষায় প্রহর গুনছে। সেই চোখদুটো সুমুর। কত আকাঙ্ক্ষা জমে আছে তার ভেতরে, কত অদ্ভুত শিহরণ বুকে ধরা দিচ্ছে। ভাবছে—কখন আসবে সকালের আলো? কখন দেখা দেবে তার প্রিয় মানুষটা? আজকের রাতটা এত সুন্দর কেন? অপেক্ষা করাটাই এত আনন্দময় লাগছে কেন? আকাশের পানে তাকিয়ে সুমু নিঃশ্বাস ফেলে বলে ওঠে মনে মনে— “সত্যিই তো কাল সে আসবে।”
সকালে পাখির কিচিরমিচির আওয়াজে চোখ মেলে তাকাল সুমু। বাড়ি ভর্তি মানুষের আনাগোনা। কম্বলটা নিজের ওপর থেকে সরিয়ে বিছানা থেকে নেমে দাঁড়াল। তারপর চলে গেল ফ্রেশ হতে। আজরাতে সব কাজিনরা মিলে ব্যাচেলর পার্টি করবে বলে ঠিক করেছে। দশ মিনিট পরে ফ্রেশ হয়ে বের হলো সে। অগোছালো বিছানাটা পরিপাটি করে রেখে রুম ছাড়ল ব্রেকফাস্টের উদ্দেশ্যে।
ডাইনিং টেবিলে বসে ব্রেডে কামড় দেওয়ার সময় রাইফ এসে বলল,
“সুমু আপু! মাইশা আপু তোমাকে তাড়াতাড়ি ব্রেকফাস্ট করে রেডি হতে বলেছে। সকলে মিলে শপিং করতে যাবে।”
কথাটা বলেই চলে যাবার জন্য পা বাড়াচ্ছিল রাইফ।
“রাইফ!”
পিছন থেকে ডাক শুনে ঘুরে দাঁড়াল সে।
“কিছু বলবে আপু?”
“হুম! কাছে আয়।”
“বলো।”
“রাহিন ভাইয়া কি আসবে না?”
“হুম! ভাইয়া সন্ধ্যা ছয়টার ফ্লাইটে আসবে। আমাদের টাইম চারটা। ওই যে ভাইয়ার সেলিব্রিটি ফ্রেন্ড আছে না?”
“হুম!”
“ওই ভাইয়াটার একটা গুরুত্বপূর্ণ মিটিং আছে। ওইটা শেষ করেই রওনা দেবে।”
“ওহ আচ্ছা। ওকে তুই যা। আমি রেডি হয়ে আসছি।”
কথা শেষ হতেই এক দৌড়ে চলে গেল রাইফ। সুমুও আর বসল না। কোনোমতে ব্রেকফাস্ট করে চলে গেল রেডি হতে। ত্রিশ মিনিটের মাথায় সকলে রেডি হয়ে নিচে নামল। সকলে একসাথে বেড়িয়ে পড়ল শপিংমলের উদ্দেশ্যে।
বিয়ের কেনাকাটা আগেই হয়ে গেছে। এখন শুধু গায়ে হলুদে সবার জন্য শাড়ি আর পাঞ্জাবী কিনল। আর সব শেষে মেহেদী আর ব্যাচেলর পার্টির জন্য চিকেন ফ্রাই, কোক, কেক আরও অনেক রকমের খাবার জিনিস কিনল।
ফিরতে-ফিরতে সকলের সন্ধ্যা হয়ে গেল। দুপুরের খাবার সকলে রেস্টুরেন্টে খেয়েছিল। বাসায় ফিরে সকলে চলে গেল যার যার রুমে ফ্রেশ হওয়ার জন্য। দশ মিনিটের মধ্যে ফ্রেশ হয়ে সকলে চলে আসল ড্রয়িংরুমে। বাড়ির মহিলাদের জন্য হলুদের শাড়ি আর পুরুষদের জন্য পাঞ্জাবী যার যার হাতে দেওয়া হলো। এগারো সেট পাঞ্জাবী মিনা বেগম আলাদা করে সরিয়ে রাখলেন– রাহিন আর তার ফ্রেন্ডদের জন্য। বড়রা সকলে তাদের কাজে চলে গেলো আর ছোটরা চলে গেল ছাদে।
সুমু নিজের শাড়ি নিয়ে রুমে চলে আসল। ঘড়িতে দেখল আটটা একুশ বাজে। সময়টা দেখেই খুশিতে চকচক করে উঠল সুমুর চোখ। আর মাত্র কিছুক্ষণ সময়– তারপর সেই কাঙ্ক্ষিত মানুষটা তার দেশে তার শহরে পা রাখবে। একই শহরে এক বাড়িতে তারা থাকবে। আনোয়ার সাহেব গেছে তাদের রিসিভ করতে। এইতো আর কিছুটা সময়। উফফ্! অপেক্ষার সময় এতো দীর্ঘ হয় কেনো? নিজের মনকেই প্রশ্ন করল সুমু। শাড়িটা আলমারিতে তুলে রেখে মুখে একচিলতে হাসি নিয়ে ছাদে যাবার উদ্দেশ্যে বাহিরে বেরলো সে। এমন সময় তার আন্টি সামনে এসে দাঁড়াল।
“কিরে সুমু, আসার পর থেকে একবারও দেখলাম না তোকে। আমাদেরকে কি ভুলেই গেছিস? আর এতো হাসি কিসের তোর? বিয়েটা কি তোর নাকি? “
খুশি বেগমের মুখ থেকে এমন কথা শুনে হাসিটা নিভে গেলো সুমুর। ঠিক এইসব কথার জন্যই মামাদের বাড়িতে, আন্টিদের বাড়িতে আসতে চায়না সে। এরা সবাই শুধু ওর মায়ের সামনে ওর সাথে ভালোবাসা দেখায়। কিন্তু গোপনে নানান বাজে কথা শুনিয়ে কথা বলে ওর সাথে। এইসব সুমু তার আম্মুকে বলতে পারেনা তিনি কষ্ট পাবেন বলে। সে মুখে কোনোমতে হাসিটুকু টেনে বলল,
“তেমন কিছুনা আন্টি। আসার পর থেকেই মাইশা আপুর কাছে ছিলাম তো– তোমাদের কাছে যাওয়ার সময় পায়নি।”
খুশি বেগম বললেন,
“শোন! আজ আমাদের রাহিন আর ওর ফ্রেন্ডরা আসবে। তোকে জানো ওদের সামনে বেশি ঘুরঘুর করতে না দেখি। আর হ্যাঁ, বিয়ে বাড়িতে কত কাজ থাকে জানিস না? শুধু ঘুরে ঘুরে খেলে হবে। বাহিরে সবাই কত কাজ করছে। ওইখানে যা আর আদা, রসুনগুলোর খোসা ছাড়া। এই দায়িত্বটা আমি তোকে দিলাম শেষ করে তারপর ওইখান থেকে উঠবি। আয় আমার সাথে।”
ছলছল নয়নে ওর আন্টির যাওয়ার পানে তাকিয়ে আছে সুমু। ওরা আমার সাথে এমন কেনো করে। কি দোষ করেছি আমি। ছোট থেকেই দেখে আসছি এইসব। যতবার মামার বাড়িতে, আন্টির বাড়িতে এসেছে– ওর আন্টি, আন্টির মেয়েরা এমন ব্যবহার করেছে ওর সাথে। সে শুধু তার মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে এদের বাড়িতে আসে। নানির ভালোবাসা, ছোট মামার ভালোবাসাও পায়নি সে। শুধু বড় মামা, বড় মামি, মামাতো ভাইদের, মামাতো বোনদের ভালোবাসা একটু পেয়েছে। এখন তো মামির ভালোবাসাও ওপরে-ওপরে। মামি ও মন থেকে ভালোবাসেনি। সুযোগ পেলেই আন্টির মতো ওর নামে বদনাম করেছে। কাজ করার কথাটা ভালো করে বললেই পারত। এভাবে কথা শুনানোর কি মানে। অবশ্য এদের থেকে ভালো কিছুই আশা করেনা সুমু। কারো ভালোবাসা চাইনা তার। সে এদের থেকে দূরে থাকতেই চায়।
প্রায় একঘণ্টা ধরে মেয়েটা বসে বসে সব কাজ করছে। এর মধ্যে নাজমিন, সামিয়া, রাইফ, রাইশা ওকে ডেকে গেছে ছাদে যাবার জন্য। কিন্তু যায়নি সে– যায়নি বললে ভুল হবে। বরং যেতে দেওয়া হয়নি তাকে। একের পর এক কাজ ওর সামনে দিয়ে যাচ্ছে ওর আন্টি আর মামি। আর মেয়েটা মুখ বুঝে সব কাজ করে যাচ্ছে। হাতের অবস্থা ভালো না। ফুলে লাল হয়ে গেছে। অনেক ব্যথা করছে। তবুও মুখ ফুটে কিছু বলছে না। সব কষ্ট সহ্য করে কাজ করে যাচ্ছে। বিয়ে বাড়িতে কোনো ঝামেলা চায়না সে।
খান সাহেব পর্ব ১
হঠাৎ গেট দিয়ে গাড়ি ঢোকার আওয়াজ হলো। তারমানে কি ওরা চলে এসেছে। এতোক্ষণের কষ্ট হঠাৎ কোথায় যেনো হারিয়ে গেল সুমুর। ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটে উঠল তার। দ্রুত সবকাজ শেষ করতে চাইল সে। কারণ সে জানে, কাজ শেষ না করা পযর্ন্ত তাকে এখান থেকে উঠতে দেওয়া হবে না। কিন্তু ব্যাকুল হৃদয় যে অন্য কিছু চাইছে। চোখ দুটো তৃষ্ণার্ত হয়ে আছে কাউকে জিবনের প্রথমবার সামনে থেকে সরাসরি দেখার আশায়।
