খান সাহেব পর্ব ৮১
সুমাইয়া জাহান
দুপুরের পর থেকে সিমরান আর শেরানের প্রচণ্ড জ্বর এসেছে। শেরাজ বাড়িতে নেই। সকালে অফিসের কথা বলে বেরিয়েছে। সুমু অনেকবার কল করেও তাকে ফোনে পায়নি। রাহিনদের কল করলে, ‘তারা জানিয়েছে শেরাজ গুরুত্বপূর্ণ একটা মিটিংয়ে আছে।’ কিন্তু সুমু বুঝতে পারছেনা, সকাল থেকেই একটা মানুষ কী এত মিটিং করছে। তার হাতের সমস্ত কাজ যেন থেমে গেছে, মনে এক অজানা ভয় জমে আছে। সে ছোট্ট দুই প্রাণের দিকে বার বার তাকাচ্ছে, চোখের জল জমেছে। ডাক্তার এসে দেখে গেছে, তবুও বাচ্চাদের জ্বর কমছেনা।
“খান সাহেব কোথায় আপনি?” সুমু ফিসফিস করে বলল।
সিমরান আর শেরান জ্বরের তোপে খুব জ্বালাচ্ছে আজ। দুজনেই কেঁদে চলেছে। সুমু একবার সিমরানকে কোলে তুলে রুম জুড়ে হেঁটে বেরাচ্ছে, তো একবার শেরানকে। কোল থেকে নামালেই আর কোলে নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকলেই দুজন কেঁদে বাড়ি মাথায় তুলছে। দুজনকে বার বার কোলে উঠানো নামানো করার জন্য স্টিচের অংশটাতে তীব্র ব্যথা হচ্ছে তার। তবুও সে সন্তানদের কষ্ট দেখে সবটা মুখ বুঝে সহ্য করে নিচ্ছে। এদিকে সিমরান, শেরান আজ মায়ের কোল ছাড়া কারও কোলে থাকছেনা। রুমের মধ্যে বাড়ির প্রত্যেকটা মহিলা সদস্য উপস্থিত। তবে কেউ রাখতে পারছেনা তাদের দুজনকে।
“সুমু তোমার কষ্ট হচ্ছে। এখন একটু বিশ্রাম নাও, আমি আর ইশিতা ওদের রাখছি।” এগিয়ে এসে বলল ইনায়া।
“ওরা তো থাকছেনা তোমাদের কাছে। এদিকে জ্বরটাও কমছেনা। আমি এখন কী করব,?”
ইনায়া ধীরে হাতে হাত ধরে বলল,
“দুশ্চিন্তা করো না। ডাক্তার তো বলল, এমন নাকি হয়। সব ঠিক হয়ে যাবে, সুমু।”
সুমু নিঃশব্দে মাথা নাড়ল। বুকের ভেতর কেমন এক অজানা কাঁপুনি উঠছে। সে সিমরান আর শেরানকে, ইনায়া আর ইশিতার কোলে তুলে দিল। অনন্যা খাতুন তাকে। টেনে নিয়ে বেডের সাইডে বসালেন। ছোট্ট সিমরান কাঁপা কাঁপা ঠোঁট ফাঁকা করে কান্নার আওয়াজ তুলল, তার পাশে শেরানও কাঁদতে শুরু করল। দুই নবজাতক সন্তানের একসাথে কান্নায় ঘরটা যেন কেঁপে উঠল।
সুমু ছুটে গিয়ে সিমরানকে ইনায়ার থেকে কোলে নিল, তারপর অন্য হাতে শেরানকে জড়িয়ে ধরল। কোলের ভেতর দুটো নরম, গরম শরীর। সুমুর বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠল।
“আল্লাহ… ওদের একটু শান্তি দাও।” ফিসফিস করে বলল সে।
বেডে বসে বাচ্চাদের মুখে দুধ দিল। জ্বরের উত্তাপে কাঁপছে দুজনে। সে কাঁপা হাতে ওদের কপাল ছুঁয়ে জ্বর চেক করল। সে যেন নিজের শরীরের ব্যথা ভুলে গেছে। স্টিচের জায়গাটা টান খাচ্ছে ব্যথায়, কিন্তু সে একবারও বসে বিশ্রাম নিচ্ছে না।
নাতাশা এগিয়ে এসে বলল,
“ম্যাম, আপনি একটু শুয়ে পড়ুন। আমরা ওদের দেখছি।”
সুমু মাথা নেড়ে না করল,
“না, ওরা এখন শুধু আমার কাছেই চুপ করে। একটুখানি নামালেই কেঁদে ওঠে। দেখো, আমার বুকের মধ্যে রাখলে একটু শান্ত হয়ে থাকে।”
ইনায়া দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
“বাচ্চারা অসুস্থ থাকলে কিছু ভালো লাগেনা।”
সুমু, শেরান আর সিমরানকে ঘুম পাড়ানোর চেষ্টা করল। দুজনেই দুধ খেতে খেতে ঘুমে ঢলে পড়ল। সে ইনায়াদের ওদের কাছে বসতে বলল। ইনায়া আর নাতাশা দুজনের পাশে বসল।
সুমু ফোনটা হাতে তুলে নিয়ে বেলকনিতে গিয়ে আবার কল করল শেরাজকে। এবারও ফোন বন্ধ। সে রাহিনকে কল করল। কল রিসিভ হতেই সুমু উদ্বিগ্ন কন্ঠ বলল,
“রাহিন ভাইয়া সত্যি করে একটু বলুন তো, খান সাহেব কোথায়?”
ওপাশ থেকে রাহিন বলল,
“সুমু, ও এখনো মিটিংয়ে।”
ফোনটা নামিয়ে সুমু এক মুহূর্ত স্থির হয়ে তাকিয়ে রইল বাচ্চাদের দিকে। নিজেকে সামলে সে বলল,
“অফিস, মিটিং, এসব সম্পর্কে আমার আইডিয়া আছে, ভাইয়া। ভুলে যেওনা আমিও এই ওমানে বসে আমার ইন্ডিয়ার বিজনেস সামলাই। এমন কী মিটিং করছে উনি, যে সকালে শুরু হয়েছে কিন্তু এখনো শেষ হয়নি?”
রাহিন এক মুহূর্ত চুপ করে রইল। একটু সময় নিয়ে বলল,
“আমি জানি, সুমু… কিন্তু আজকের মিটিংটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আর আজ অফিসেও অনেক কাজ। আমি নিজেও সকাল থেকে কিছু খায়নি। আমি চেষ্টা করছি। এস.কে মিটিং শেষ করে বের হলে আমি ওকে জানিয়ে দিব।”
সুমু চোখ বন্ধ করল, ঠোঁট কেঁপে উঠল।
“ঠিক আছে, ভাইয়া। তোমাকে আর কষ্ট করে সাজিয়ে মিথ্যা বলতে হবেনা। আমি কিন্তু শেরাজ খানেই ওয়াইফ। কিছু বোঝার জ্ঞান না থাকলে তো আর তার মতো মানুষের বউ হতে পারতাম না। দয়া করে তুমি আর আমাকে মিথ্যা বলে সান্ত্বনা দিতে এসো না। তুমি শুধু ওনাকে বলে দিও, বাচ্চাদের অবস্থা ভালো না। আমি একা কিছুই সামলাতে পারছি না। বাকিটা আমি উনি বাড়িতে ফেরার পর ওনার সাথে বুঝে নিব।”
কলটা কেটে গিয়ে নিস্তব্ধ হয়ে গেল চারদিক। দূরের আকাশে সূর্য ডুবে যাচ্ছে, নরম সোনালি আলো গায়ে এসে পড়েছে তার। তবু সেই আলোয় উষ্ণতা নেই—মনে কেবল এক শূন্যতা।
ঘরে ফিরে সুমু দেখল, সিমরান আবার কেঁদে উঠেছে। ইনায়া তাকে সামলানোর চেষ্টা করছে। সে দ্রুত ছুটে গিয়ে সিমরানকে বুকের মাঝে টেনে নিল।
“কাঁদেনা মাম্মা।”
সে দীর্ঘশ্বাস ফেলে ইনায়ার দিকে তাকিয়ে বলল,
“ইনায়া! থার্মোমিটারটা দাও!”
ইনায়া ছুটে এসে দুজনের জ্বর মেপে চিন্তিত কন্ঠে বলল,
“শেরানের জ্বরটা কমেছে। তবে সিমরানের জ্বর আবার বেড়ে গেছে।”
সুমুর গলা কেঁপে উঠল,
“আমি এখনই ডাক্তারকে ফোন দিচ্ছি।”
সে ফোন হাতে তুলে ডাক্তারের নাম্বারে ডায়াল করল,
“ডক্টর, আমি মিসেস খান বলছি। শেরানের জ্বর একটু কমেছে। তবে সিমরানের জ্বর এখনো কমেনি, উল্টো বেড়ে গেছে…”
ডাক্তারের শান্ত গলায় বলল,
“চিন্তা করবেন না, ম্যাডাম। ওদের শরীর খুব ছোট, প্রতিক্রিয়া স্বাভাবিক। ঠান্ডা কাপড় ভিজিয়ে কপালে রাখবেন, বুক খুব গরম লাগলে একটু ভেজা তোয়ালে দিয়ে মুছে দিন। যদি রাতের মধ্যে কমে না, তাহলে আমাকে কল করবেন, আমি চলে আসব।”
সুমু কেঁপে ওঠা কণ্ঠে বলল,
“ঠিক আছে, ডাক্তার। ধন্যবাদ।”
কল কেটে সে চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল। অনন্যা বেগম কাছে এসে বলেন,
“সব ঠিক হয়ে যাবে, ইনশাআল্লাহ।”
সুমু চোখ নামিয়ে বলল,
“কখন ঠিক হব, আম্মু? যখনই ওদের কাঁদতে দেখি, মনে হচ্ছে আমার নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে যাবে। আমি আর সহ্য করতে পারছিনা ওদের কষ্ট।”
সুমু চলে গেল বেডের কাছে। বাইরে তখন রাত নেমে এসেছে। দু’টো ছোট্ট দেহ বুকের কাছে জড়িয়ে ধরে সে নরম গলায় বলল,
“আল্লাহ, আমার সন্তানদের রক্ষা করো। ওদের জ্বর কমিয়ে দাও। আমি আর কিছু চাই না, শুধু ওদের সুস্থ করে দাও।”
রাত অনেকটা গড়িয়েছে। ঘড়ির কাঁটা তখন রাত একটা ছুঁই ছুঁই। পুরো বাড়িটা নিস্তব্ধ। সিমরান আর শেরান ঘুমিয়ে আছে। সুমু বসে দোয়া পড়ছে আর মাঝে মাঝে বাচ্চাদের কপালে ঠান্ডা তোয়ালে চেপে ধরছে। তার চোখ লাল হয়ে উঠেছে, শরীর ক্লান্ত, কিন্তু বুকের ভেতর এক অজানা শক্তি যেন তাকে জেগে থাকতে বাধ্য করছে।
অনন্যা খাতুন আর আফিয়া খাতুনকে জোর করে রুমে পাঠিয়েছে সে। কিন্তু ইনায়া, নাতাশা আর ইশিতা রুমে যায়নি। তারা বলেছে, “ভাইয়া না আসা পর্যন্ত তারা এখানেই থাকবে”।
ওদিকে, সারবাজ আর আরবাজও সন্ধ্যায় বাড়িতে ফিরে এসেছে। সুমু তাদের শেরাজের ব্যাপারে কিছু জিজ্ঞেস না করলেও, ইনায়া সারবাজকে জিজ্ঞেস করতেই সে জানিয়েছে, আজকের মিটিং অফিসের বাহিরে ছিল। শেরাজ একাই আজ মিটিংয়ে গিয়েছিল। আর সেখান থেকেই সে সন্ধ্যায় আরও কিছু ক্লাইয়েন্টের সাথে বিজনেসের কিছু ডিল করবে। ওর ফিরতে অনেক রাত হবে। ও ফোন অন করার সময় পায়নি, এসব স্যান্ডি তাকে টেক্সট করে জানিয়েছে।”
বাইরে বৃষ্টি পড়ছে টুপটাপ। হঠাৎ বিদ্যুৎ চমকে উঠতেই ঘরটা আলোকিত হলো এক মুহূর্তের জন্য। সেই আলোয় দেখা গেল—সুমুর চোখ বেয়ে নেমে আসা জল। সে নরম কণ্ঠে ফিসফিস করে বলল,
“খান সাহেব, আপনি জানেন না, আপনার বাচ্চারা কত কষ্ট পাচ্ছে আজ। আমি যে একা কিছুতেই ওদের সামলাতে পারছিনা…”
বাচ্চাদের দুজনেরই শরীর গরম হয়ে আছে। সুমু কপাল ছুঁয়ে দেখল, সিমরানের জ্বর সন্ধ্যায় কমলেও এখন আবার একটু বেড়েছে। বুকটা ধক করে উঠল তার। সে আবার ফোনে ডায়াল করল, “খান সাহেব”।
ফোনটা এবারও বন্ধ। সুমুর নিঃশ্বাস ভারী হয়ে উঠল। চোখের কোণের জমে থাকা অশ্রু ঝরে পড়ল বাচ্চাদের গরম গালে।
“মাম্মা কাঁদে না, মাম্মা আছে না তোমাদের কাছে…”
ঠিক সেই সময় দরজার বাইরে গাড়ির শব্দ শোনা গেল। নাতাশা দ্রুত জানালা দিয়ে উঁকি দিল,
“ম্যাম! মনে হয় স্যার এসেছেন।”
সুমু কিছু বলল না। তার বুকের ভেতর ধকধক করছে। কিছুক্ষণের মধ্যে রুমে প্রবেশ করল সাদা শার্টে ভিজে যাওয়া শেরাজ খান, মুখ গম্ভীর, চোখে উদ্বেগের ছায়া। সে কিছু না বলে এগিয়ে এসে বাচ্চাদের কপালে হাত রাখল। গরম শরীর ছুঁয়েই মুখ কঠিন হয়ে গেল তার।
“জ্বর এত বেশি! ডাক্তার কি এসেছিল?”
“এসেছিল… কিন্তু কমছেনা কিছুতেই,” ইনায়া চিন্তিত গলায় বলল।
সুমু যেন চুপ। শেরাজ কাবার্ড থেকে একটা টি-শার্ট আর ট্রাউজার বের করে ওয়াশরুমে চলে গেল। ইশিতা উঠে এসে সুমুর পাশে বসে বলল,
“এখন আমরা যাই, সুমু। ওদের খেয়াল রেখো। আর দরকার পড়লে অবশ্যই আমাদের ডেকো।”
সুমু হালকা মাথা নাড়ল। ইশিতা, ইনায়া আর নাতাশা রুম থেকে বেরিয়ে গেল। দরজা বন্ধ হতেই পুরো ঘরে নেমে এলো এক অদ্ভুত নীরবতা।
সুমু বাচ্চাদের দিকে তাকিয়ে রইল। তার চোখে ক্লান্তি, মুখে একরাশ নীরব অভিমান। শেরাজ ওয়াশরুম থেকে বেরিয়ে এলো, চুল ভেজা, মুখে তীব্র গাম্ভীর্য। সে এগিয়ে এসে বেডের পাশে দাঁড়াল। বাচ্চাদের কপালে হাত রাখল।
“তুমি জ্বর মেপেছ?”
সুমু উত্তর দিল না। সে সিমরানের মাথায় হাত বুলিয়ে যেতে লাগল। শেরাজ আবারও বলল,
“ডক্টর কী বলেছে?”
তবুও কোনো উত্তর এলো না। সুমুর চোখ নিচের দিকে, ঠোঁট শক্তভাবে চেপে আছে, যেন নিজের কান্নাটাকে আটকে রেখেছে সে।
শেরাজ এক মুহূর্ত চুপ করে তাকিয়ে রইল স্ত্রীর দিকে। এতক্ষণে তার চোখে প্রথমবার দেখা গেল ক্লান্তি আর অনুশোচনা। সে ধীরে একটা চেয়ার টেনে বেডের পাশে বসল। বাচ্চাদের দিকে তাকিয়ে বলল,
“আমি জানি, আজ সারাদিন তোমার খুব কষ্ট হয়েছে। কিন্তু কিছু কাজ ছিল যা এড়িয়ে যেতে পারিনি।”
সুমু কোনো প্রতিক্রিয়া দেখাল না। শুধু হালকা করে সিমরানের গায়ে কম্বলটা টেনে দিল। শেরাজ নিঃশ্বাস ফেলল, কণ্ঠ ভারী হয়ে উঠল তার,
“তুমি রেগে আছো, জানি। কিন্তু অন্তত আমার দিকে একবার তাকাও, সুইটহার্ট।”
সুমু যেন পণ করেছে আজ সে কথা বলবেনা। শেরাজ চুপ করে রইল কিছুক্ষণ। তারপর ধীরে বলল,
“আমি জানি, আমি দোষী। কিন্তু তোমার এই নীরবতা আমার বুকের ভেতর রক্তক্ষরণ করছে, সুইটহার্ট।”
সুমু তবুও কোনো কথা বলল না। বাচ্চাদের কপালে হাত রেখে দোয়া করতে লাগল,
“আল্লাহ, ওদের ভালো করে দাও।”
শেরাজ একদৃষ্টে তাকিয়ে রইল সুমুর দিকে। সেই দেখল এই দৃশ্য, যেখানে এক মা, এক ক্লান্ত নারী, যিনি সারাদিনের সব কষ্ট ভুলে শুধু সন্তানদের জন্য জেগে আছেন। তার বুকের ভেতরটা কেমন যেন মোচড় দিয়ে উঠল। সে আস্তে করে একটা কম্বল নিয়ে সুমুর কাঁধে দিল।
সুমু আজ অবাক হয়ে তাকাল না। রাত এখন আরও গভীর। শেরাজ বাচ্চাদের পাশে বসে রইল। মাঝে মাঝে জ্বর মাপছে, আবার কখনও ঠান্ডা কাপড় বদলে দিচ্ছে।
সুমু এক কোণে বসে, অচেতন চোখে তাকিয়ে আছে দুটো ছোট্ট মুখের দিকে। বাইরে বৃষ্টি আবার শুরু হয়েছে। কিন্তু ঘরের ভেতর দু’জন মানুষ, একজনের মুখে অভিমান, অন্যজনের চোখে অপরাধবোধ। আর তাদের মাঝখানে দু’টো নিঃশ্বাসে গরম ছোট্ট জীবন।
ভোরের আলোটা জানালার ফাঁক দিয়ে ঘরে ঢুকেছে। সাদা পর্দা বাতাসে হালকা দুলছে। সিমরান আর শেরান দুজনেই এখন ঘুমে।
সুমু সারা রাত এক মুহূর্তের জন্যও চোখ বন্ধ করেনি। চোখে হালকা ফোলা ভাব, তবুও বাচ্চাদের দিকে তাকিয়ে মুখে এক অদ্ভুত শান্তি দেখা যাচ্ছে তার। পাশে টেবিলে থার্মোমিটার, ঔষধের বোতল আর আধা খাওয়া গ্লাসে পানি।
শেরাজ চেয়ারেই বসে ছিল সারা রাত। এখনো চোখে ক্লান্তি, তবু দৃষ্টি নিবদ্ধ সুমুর দিকে।
সুমু ধীরে উঠে দাঁড়াল, সিমরানের গায়ে চাদরটা টেনে দিল। তারপর নিজের কাজ শুরু করল—একটাও কথা না বলে।
শেরাজ ধীরে বলল,
“সুমু, একটু পানি দাও।”
সুমু হাতের কাজ থামাল না। টেবিলের গ্লাসটা তুলে তার দিকে বাড়িয়ে দিল, কিন্তু একবারও তাকাল না।
শেরাজ নিঃশ্বাস ফেলল।
“এভাবে কতদিন চুপ থাকবে তুমি?”
কোনো উত্তর নেই।
“আমি জানি, তোমার কষ্ট হয়েছে। আই এম সরি, সুইটহার্ট। প্লিজ, কথা বলো।”
তবুও কোনো প্রতিক্রিয়া নেই। সুমু পর্দা সরিয়ে বাহিরের দিকে তাকিয়ে রইল। শেরাজ উঠে দাঁড়াল।
“সুমু, আমি তোমার স্বামী। তুমি যদি আমার সাথে এভাবে নীরব থেকো, তাহলে আমি কি করে বুঝব তুমি কী চাও?”
সুমু এবারও চুপ। শেরাজ তার কাছে এসে দাঁড়াল।
“এনাফ, সুইটহার্ট। এখন তুমি আমার সাথে কথা বলবে। তোমার এই চুপ থাকাটা আর সহ্য হচ্ছে না আমার।”
সুমু ধীরে ঘুরে তাকাল। ঠান্ডা গলায় বলল,
“কাল কোথায় ছিলেন আপনি, খান সাহেব?”
ঘরের ভেতর মুহূর্তে নীরবতা। শেরাজ থমকে গেল। চোখ নামিয়ে বলল,
“আমি বাইরে ছিলাম।”
“বাইরে?” সুমু ঠোঁট বাঁকিয়ে হালকা তাচ্ছিল্যের হাসি দিল, “ওমানে ‘বাইরে’ বলতে অনেক জায়গা বোঝায়, তাই না? অফিস, মিটিং, বা অন্য কোথাও?”
শেরাজ মুখ তুলে তাকাল। গলার স্বর ভারী হয়ে এলো।
“তুমি আমাকে অবিশ্বাস করছ?”
সুমু ধীরে বলল,
“না! শুধু বিশ্বাসটা হারিয়ে গেছে কবে, সেটাই এখন মনে করতে পারছি না।”
সে বাচ্চাদের কাছে চলে গেল, যেন শেরাজর কথা আর শুনতে চায় না। শেরাজের বুকের ভেতর কিছু একটা কেমন যেন চেপে ধরল। সে এগিয়ে এসে সুমুর হাত ধরতে গেল, কিন্তু সুমু হাত সরিয়ে নিল।
“খান সাহেব, এখন হয়তো বাচ্চাদের জ্বর কমছে। তবে এই মুহুর্তে আমার কাছে ওদের যত্ন করাটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।”
শেরাজ আর কিছু বলল না। শুধু তাকিয়ে রইল স্ত্রীর মুখের দিকে, যেখানে ভালোবাসা আছে, কিন্তু তা অভিমানের পর্দায় ঢাকা।
“কাজ ছিল,” মৃদুস্বরে বলল সে।
সুমু একটা হাসি দিল, কিন্তু সে হাসি মিষ্টি নয়, তাচ্ছিল্যময়।
“কী কাজ ছিল আর কোথায় কাজ ছিল, খান সাহেব? সেটাই জানতে চাইছি,” সে বলল, হাত ঘুরিয়ে ছোট্ট বাচ্চাদের দিকে দেখাল যেন সময় নষ্ট করতে চায় না।
শেরাজ কিছু বলতে চাইল, কিন্তু কোনো শব্দ বের হলো না। সে চুপ করে রইল। সুমু আবারও হালকা তাচ্ছিল্য করে হেসে বলল,
খান সাহেব পর্ব ৮০
“আপনি চুপ, কারণ আপনি আমাকে মিথ্যা বলতে পারেন না, তাই না?”
শেরাজের কিছু বলল না, কেবল তাকিয়ে রইল। সুমুর হাসি যেন এক রকম জোর করে বের করা, কিন্তু চোখে এক অদ্ভুত ধারালো ব্যথা লুকানো তার। সে আবার দুই ছোট্ট সন্তানদের দিকে তাকাল, ঠোঁটের কোণে নরম হাসি। শেরাজ চুপচাপ এগিয়ে এসে সুমুর কাঁধে হাত রাখল। সুমু হাত সরিয়ে দিল। তার মন বলছে, ‘বড় কোনো ঝড় আসবে। যে ঝড় সব তছনছ করে দিবে। তার খান সাহেব হয়তো আবারও রক্তে হাত ভিজিয়েছে। আর এবার হয়তো সব শেষ হয়ে যাবে। তার জীবনের সুখের দিনের পাতা হয়তো এবার শেষ হয়ে যাবে।’
