খান সাহেব পর্ব ৮১ (২)
সুমাইয়া জাহান
রাত তখন গভীর। বাইরে বৃষ্টি থেমেছে, কিন্তু বাতাসে এখনো ভেজা মাটির গন্ধ। রায়য়ান হাতে একটি ব্যাগ নিয়ে ধীরে ধীরে বাড়ির গেট খুলে ভেতরে ঢুকল। ড্রাইভওয়ের আলোয় তার মুখে দেখা গেল অদ্ভুত ক্লান্তি, চোখ দুটো লাল, কিন্তু ঠোঁটে একরকম তৃপ্তির ছাপ। সে নিঃশব্দে ড্রয়িংরুম পার হয়ে গেল। সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠতে উঠতে একবার পেছনে তাকাল, যেন কেউ অনুসরণ করছে কি না দেখল। তারপর সোজা গিয়ে থামল আলিশার রুমের দরজার সামনে। দরজাটা আধখোলা ছিল। হালকা আলো ছিটকে বেরিয়ে আসছে ভিতর থেকে।
আলিশা, রায়য়ানের একটা ছবি নিয়ে অন্যদিকে মুখ ঘুরিয়ে শুয়ে নিঃশব্দে চোখের পানি ফেলছে। সে ধীরে ছবিটার ওপর ঠোঁট ছুঁয়ে দিল। হাতের আঙুলগুলো ছবিটার ওপর ঘষে গেয়ে উঠল,
“আঁখি ভরে দেখি তারে,
পরাণ দিয়ে ছুঁই!
যতই মোরে দূরে সরায়
তত কাছে রই!
হায়রে একি তার ছলনা,
কেনো মোরে দেয় বেদনা!
বোবা মনের ভালোবাসা,
সে তো বোঝেনা!”
রায়য়ান ধীরে দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকল। দরজা খোলার শব্দ পেয়ে উঠে বসল সে। বুকের ওড়নাটা ঠিক করে বেড থেকে নেমে দাঁড়াল।
“তুমি তো ঠিকমতো এখানে আসো না, তো আজ হঠাৎ এই অসময় এলে যে?”
রায়য়ান এগিয়ে এসে সোফার ওপর আরাম করে বসল। পা দুটো তুলে দিল সেন্টার টেবিলের ওপর। পকেট থেকে ছোট্ট একটা বিয়ারের বোতল বের করে চুমুক দিয়ে গলাটা ভিজিয়ে নিয়ে বলল,
“আমি এতিম রে। আর তাই আমি মরে গেলে আমার জন্য কাঁদার আর আমাকে মনে রাখার জন্য একমাত্র তুই আছিস। তাই আজ শেষ সময় তোর কাছে এলাম। মনে রাখবি তো আমায়?”
আলিশার বুকের ভেতরটা ধক করে উঠল। গাল বেয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ল। সে ধীর পায়ে হেঁটে এসে রায়য়ানের সামনে মেঝের ওপর বসল। ব্যথার দৃষ্টিতে রায়য়ানের দিকে অপলক তাকিয়ে থেকে বলল,
“তুমি মরে যাবে মানে? কীসব বলছ তুমি?”
রায়য়ান হালকা হেসে মাথাটা পিছনে ঠেকাল। চোখদুটো আধবোজা, ঠোঁটের কোণে তৃপ্তি আর রহস্যের হাসি মিশেল।
“মরণ মানে তো সব শেষ না, আলিশা। কখনো কখনো মানুষ বেঁচে থেকেও মরে যায়। যেমন এখন আমি।”
আলিশা কান্না চেপে রাখার চেষ্টা করল, কিন্তু পারল না। চোখ থেকে টপটপ করে অশ্রু গড়িয়ে পড়ছে।
“তুমি এমন কথা বলছ কেন, আর.সি? তুমি কিছু করেছ নাকি?”
রায়য়ান চুপ করে তাকাল তার মুখের দিকে। হালকা হেসে বলল,
“করেছি বললে হয়তো তুই ভয় পাবি। না বললে তুই প্রশ্ন করবি। তাই ভাবলাম… এসব বাদ দেই।”
আলিশা কেঁপে উঠল।
“আর.সি, আমি ভয় পাচ্ছি। তোমার চোখদুটো এমন লাল কেন? ওই ব্যাগে কী আছে?”
রায়য়ান ব্যাগটার দিকে তাকাল। চোখ এক মুহূর্তের জন্য নরম হলো। শান্ত গলায় বলল,
“এই ব্যাগে আমার নিষিদ্ধ পাপ আছে, আলিশা। এমন পাপ, যেটা ধুয়ে ফেলতে হলে সাগরের পানিও কম পড়ে যাবে।”
আলিশা হাউমাউ করে কেঁদে উঠল,
“না আর.সি! তুমি এমন কিছু করতে পারো না। তুমি তো খারাপ না… তুমি খারাপ না।”
রায়য়ান নিঃশব্দে তাকিয়ে রইল তার দিকে, যেন সেই কান্নার শব্দ তার বুকের ভেতরে আজ তোলপাড় করে দিচ্ছে। নিচু গলায় বলল,
“খারাপ হতে হয়, আলিশা। কারণ এই স্বার্থের দুনিয়ায় ভালোদের জায়গা নেই। ভালোবাসার দৃষ্টিতে মানুষ যতই স্বর্গীয় দেখাক, দুনিয়ার প্রতিটি মানুষের পেছনে অন্ধকার লুকিয়ে আছে।”
“তুমি এসব কী বলছ আর.সি, আমি কিছুই বুঝতে পারছিনা।”
“তোকে এতকিছু বুঝতে হবেনা”, সে প্যাকেটটা হাতে তুলে নিয়ে আলিশার দিকে বাড়িয়ে দিল, “এরমধ্যে তোর জন্য একটা গিফট আছে। আজ খুলে দেখবিনা। আমি যেদিন মেসেজ করে খুলে দেখতে বলব, সেদিন খুলে দেখবি।”
আলিশা চোখ মুছে ভ্রু কুঁচকে বলল,
“তারমানে এই এত রাতে এইটা দেবার জন্য আর এইসব গাঁজাখুরি গল্প শুনিয়ে আমাকে কাঁদানোর জন্য এসেছ?”
রায়য়ান একটা আলতো হাসি দিল। সেই হাসিতে যেন প্রাণ নেই।
“এবার একটা গুরুত্বপূর্ণ কাজের জন্য অনেক দূরে চলে যাচ্ছি। কবে ফিরব, আদো কোনদিনও ফিরতে পারব কিনা জানিনা। তুই, তোর আর আন্টির খেয়াল রাখিস।”
আলিশা হঠাৎ রায়য়ানের হাতটা চেপে ধরল, যেন ওকে চলে যেতে দিবে না।
“তুমি যাচ্ছ মানে? কোথায় যাচ্ছ তুমি, আর.সি? বলো না! আমি ভয় পাচ্ছি।”
রায়য়ান ধীরে তার হাতটা সরিয়ে নিল। চোখে এক মুহূর্তের জন্য এক অদ্ভুত কোমলতা ভেসে উঠল, তারপর আবার পাথর হয়ে গেল তার মুখ।
“আমাকে যেতে হবে, আলিশা। আন্টি ঘুমাচ্ছে বলে, চলে যাবার আগে একবার তার সাথে দেখা করে যেতে পারলাম না।”
“তুমি কোথাও যাবেনা, আর.সি। আমি তোমাকে যেতে দিব।”
“আমার সময় হয়ে এসেছে, পাগলী। আমাকে যেতেই হবে।”
“আর.সি, চলোনা আমরা একটা নতুন জীবন শুরু করি। সেই জীবনে আমরা অনেক সুখে থাকব আর.সি, আমি কথা দিচ্ছি তোমাকে।”
“সম্ভব না আলিশা! আমি যে আমার সুহাসিনীকে ভালোবাসি। তাকে কাছে পাইনি, তবু তার প্রতি আমার ভালোবাসার শেষ নেই।”
“সে তোমার জন্য নিষিদ্ধ, তুমি এইটা কেনো বুঝতে পারোনা।”
“শুনেছি, নিষিদ্ধ ফলটাই নাকি সবচেয়ে মিষ্টি লাগে। তাই তো যা পাওয়া সহজ, তা মানুষকে টানে না। কিন্তু যা পাওয়া যায় না, সেটাই মানুষকে পাগল করে তোলে।”
“তুমি আমার গল্পের শেষে অপূর্ণতা হয়ে থেকে যাবে, এই দহন আমি সইব কেমন করে বলো তো? তোমার মতো কেউ ছিল না, কেউ থাকবেও না, যে আমার না হয়েও, আমার কল্পনাতে একান্তই আমার হয়ে থাকবে।”
“পরজনমে তুই আবারও আমার প্রেমে পড়িস। আমি সেই জনমে তোকে ভালোবেসে পূর্ণতা কাকে বলে দেখিয়ে দিব।”
“পরজনম বলতে কিছু হয়না, পারলে এই জনমেই রেখে দিও।”
রায়য়ান তাচ্ছিল্য করে হাসল। ভালোবাসা সত্যি বড্ড পোড়ায়। সে উঠে দাঁড়াল। পেছনে আলিশাকে ফেলে চলে গেল রুম থেকে। আলিশা তাকিয়ে রইল। ধীরে উঠে দাঁড়াল। ব্যস্ত পায়ে হেঁটে বেলকনিতে এসে দাঁড়াল। চোখের পানি মুছে নিচে তাকাল। রায়য়ানের গাড়িটা চোখের বাহিরে না চলে যাওয়া অব্দি তাকিয়ে রইল। বুকের ভেতর হুঁ হুঁ করে উঠল। বাহিরে আবারও বৃষ্টি শুরু হয়েছে। আলিশা হাত বাড়িয়ে বৃষ্টির পানি ছুঁয়ে তার ফেলে রাখা গানটি আবারও গেয়ে উঠল,
“নাগার আমার নিঠুর বড়,
মনও বোঝেনা!
আমার ভাঙা খাঁচা পড়ে আছে,
সে তো আসেনা!
পোড়া মনে ভালোবাসা,
বাসা বাধে না!”
বেলকনির ভেজা মেঝের ওপর বসে পড়ল সে। বুকের ভেতরটায় যেন কেউ বিষমাখা ছুরি গেঁথে দিয়েছে। বাহির থেকে বৃষ্টির ঝাপটা এসে ভিজিয়ে দিচ্ছে তাকে।
রায়য়ান রাতের অন্ধকার পেরিয়ে নিজের পাতালপুরীতে ফিরল। ধুলো-মাটি আর খাঁচার লোহার গন্ধ ভেসে আছে চারপাশে। বাতাসে ফুসফুসে জ্বাল দেয়ার মত মদ ও সিগারেটের গন্ধ ভেসে আছে। মেঝের এক কোণে আরিয়ান নেশায় মাতাল হয়ে পড়ে আছে। তার চুল এলোমেলো, চোখ আধখোলা, শরীর জড় হয়ে গেছে মেঝের সঙ্গে। হালকা খিচুনি আওয়াজ করছে সে, মাঝে মাঝে অজান্তেই ফিসফিস করে কিছু বলছে। রায়য়ান ধীর পায়ে এগোতে লাগল, আরিয়ানকে ডিঙিয়ে কক্ষের ভেতর ঢুকল। আরিয়ানের দিকে তাকিয়ে এক মুহূর্তের জন্য মনে হলো, এই মানুষটা কতটা দুর্বল। সে ঝুঁকে গিয়ে আরিয়ানকে শক্ত করে ধরে টেনে তুলল।
“আরিয়ান, উঠে দাঁড়া!”
আরিয়ান অস্থির হয়ে হাত নেড়ে চেষ্টা করল দাঁড়াতে, কিন্তু ভারসাম্য হারিয়ে মেঝেতে ঝুঁকে পড়ল। রায়য়ান আবারও শক্ত করে ধরে তাকে টানতে লাগল। আরিয়ান চোখ মেলে পুরোপুরি তাকাল। রায়য়ান তাকে কাঁধে চাপিয়ে এক পাশে বসিয়ে দিল,
“তুই ঠিক আছিস তো, ব্রো?” রায়য়ান জিজ্ঞাসা করল।
আরিয়ান কিছু না বলে হালকা মাথা নাড়ল। রায়য়ান তার মুখে পানি ছিঁটাল। আরিয়ান আবারও চোখ মেলে তাকিয়ে হালকা হেসে বলল,
“আমাকে লং ড্রাইভে নিয়ে চল, রায়য়ান।
রায়য়ান বিরক্ত স্বরে বলল,
“তুই পাগল নাকি? এই অবস্থায় কোথা যাবি?”
আরিয়ান মাথা নেড়ে হাসল,
“জীবনটা থেমে আছে, রায়য়ান। আজ একটু গতি চাই।”
রায়য়ান তার কলার চেপে ধরল, কন্ঠ ভারী হয়ে গেল তার।
“তুই নিজের সর্বনাশ করছিস, আর আমি সেটা দেখতে পারব না। ওঠ, পানি খা।”
আরিয়ান মৃদু হেসে সোজা হয়ে বসল।
“আমাকে থামাতে পারবি না, রায়য়ান। আমি জানি কোথায় যেতে হবে।”
রায়য়ান চোখ কুঁচকে তার মুখের দিকে তাকাল,
“কোথায়?”
আরিয়ান চুপ করে তার দিকে তাকিয়ে থাকল কিছুক্ষণ। ধীরে বলল,
“যেখানে সুমু আছে…”
রায়য়ান তাকে টেনে দাঁড়াল করালো। হাতে দুটো ওয়াইনের বোতল নিয়ে আরিয়ানকে নিয়ে বেরিয়ে এলো। আরিয়ানকে সিটে বসিয়ে নিজে গিয়ে ড্রাইভিং সিটে বসে গাড়ি স্টার্ট করল। নিস্তব্ধ রাতে গাড়িটা গর্জন তুলে ছুটে চলল।
গাড়ি এসে থামল মাঠের কিনারে। চারপাশে শুধু অন্ধকার আর ভেজা ঘাস। রায়য়ান প্রথমে গাড়ি থেকে নামল, তারপর আরিয়ান। দুজনেই একসাথে মাঠের মাঝখানে এগোল। ভেজা ঘাসের স্পর্শে এক চিলতে কুঁচকে তারা হেসে উঠল। রায়য়ান মাঠের ভেজা ঘাসের ওপর শুয়ে পড়ল। আরিয়ানও অনুশীলনের মতো একইভাবে শুয়ে পড়ল। দুজনের ঠোঁটে হাসি, হাতে ওয়াইন এবং বোকা বোকা উন্মত্ততার ছায়া। আরিয়ান ওয়াইনের বোতলে চুমুক বসিয়ে বলল,
“দিয়ে এসেছি?”
রায়য়ান মাথা নাড়ল। দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
“হ্যাঁ! জিনিসটা দিয়ে একেবারে শেষ বিদায় নিয়ে এসেছি।”
“আসতে দিল তোকে?”
“আমাকে আটকে রাখার ক্ষমতা একমাত্র সুহাসিনীর ছাড়া আর কারও নেই।”
আরিয়ান ব্যথাতুর হেসে বলল,
“সে ভালোবাসতে জানত, অথচ আমায় ভালোবাসেনি। সে আমার সব হয়ে উঠেছিল,
তবু আমি তার কিছুই হয়ে উঠতে পারলাম না।”
রায়য়ানও হেসে উঠল এবার। সে উঠে বসে পুরো ওয়াইনের বোতল এক চুমুকে শেষ করল। ভেজা ঘাসের দিকে তাকিয়ে হাপাতে হাপাতে বলল,
“তার ভালো চাইতে গিয়ে, আমার আর ভালো থাকা হলো না।”
শেরাজ আজও ভোর হতেই বেরিয়ে গেল। সুমু আজ আর কোনো প্রশ্ন করল না তাকে। সে চুপচাপ জানালার পাশে দাঁড়িয়ে ছিল, হাতে কফির মগ, চোখের নিচে হালকা কালো দাগ—রাতে না ঘুমানোর ছাপ। বাইরে আকাশটা ঘন মেঘে ঢেকে আছে, যেন তার মনের মতোই ভারী।
শেরাজ যখন দরজার কাছে দাঁড়িয়ে জুতা পরছিল, সুমু তখনও চুপ ছিল। সে সিমরান আর শেরানের দিকে তাকিয়ে ফিসফিস করে বলেছিল,
“মাম্মা তোমাদের সাথে আছে, মাম্মা কাউকে আর কিছু জিজ্ঞেস করবেনা।”
শেরাজ একবার তাকিয়েছিল, যেন কিছু বলতে চায়। কিন্তু সুমুর নীরব চোখ দেখে সে থেমে গিয়েছিল। কারণ সেই মুহুর্তেও সুমুর নীরব চোখে ছিল অভিমান, ক্লান্তি, আর এক অদ্ভুত দূরত্ব।
গাড়ির শব্দ মিলিয়ে যেতেই সুমু ধীরে দরজাটা বন্ধ করে নিঃশব্দে ঘরের ভেতর ফিরে এলো। সিমরান আর শেরান তখনো ঘুমাচ্ছে। দুজনের মুখে শান্তির ছাপ। ওদের দিকে তাকিয়ে সুমুর ঠোঁটে একটু নরম হাসি ফুটল, কিন্তু চোখের কোণে অশ্রুর রেখা। সে ধীরে ওদের মাথায় হাত রেখে হালকা কণ্ঠে দোয়া করল,
“আল্লাহ, আমার সন্তানদের তুমি সবসময় ভালো রেখো।”
বাইরে আবার বৃষ্টি শুরু হলো। বেডের ওপর অযত্নে পড়ে থাকা ফোনটার জ্বেলে উঠল। সুমু ফোনটা হাতে তুলল। শেরাজের মেসেজ,
“সুইটহার্ট, বিকেলের আগে ফিরতে পারব না। কিছু ক্লায়েন্ট মিট করতে হবে। বাচ্চাদের খেয়াল রেখো। আই লাভ ইউ।”
সুমু স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে রইল কিছুক্ষণ। সে ধীরে ফোনটা রেখে দিল। ঠোঁটের কোণে হালকা এক ব্যঙ্গভরা হাসি খেলল।
“আই লাভ ইউ…” এই তিনটি শব্দ এখন যেন শুধু তার কাছে হাওয়ায় ভেসে থাকা শূন্য প্রতিধ্বনি। সে পর্দা সরিয়ে জানালার বাইরে তাকাল। বৃষ্টির জল কাচ বেয়ে নামছে, নিচে গাছের পাতায় টুপটাপ শব্দ হচ্ছে। সেই শব্দের মধ্যেও যেন এক অদ্ভুত নিস্তব্ধতা। মনটা কেমন হাহাকার করে উঠল তার। মনে হলো, সব কিছু ধীরে ধীরে ফাঁকা হয়ে যাচ্ছে। বাড়ি আছে, মানুষ আছে, সন্তান আছে—তবু কোথাও যেন এক বিশাল শূন্যতা তার। সে ফিরে এসে বাচ্চাদের গায়ে কম্বলটা ঠিক করে দিল। টেবিলে বসে নিজের ডায়েরিটা খুলল। অনেক দিন পর কলম হাতে নিল। পাতার ওপর প্রথম লাইন লিখল,
“বিশ্বাস একবার ভেঙে গেলে, সম্পর্কটা থাকলেও তার মধ্যের ভালোবাসাটা যেন হারিয়ে যায়।”
কলম থেমে গেল। চোখে জল জমে উঠল। বুকের ওপর হাত রেখে ফিসফিস করে বলল,
“খান সাহেব, আপনি বুঝবেন না, একজন নারী তখন ঠিক কতটা কষ্ট পায়, যখন তার ভালোবাসার মানুষটা তার থেকে কিছু লুকিয়ে যায়।”
খান সাহেব পর্ব ৮১
সুমু কেঁদে উঠল। বৃষ্টির শব্দে ঢেকে গেল তার মৃদু কান্না আওয়াজ। সে জানেনা, তার আড়ালে কী হচ্ছে। তবে খুব খারাপ কিছু হতে যাচ্ছে, এইটা সে খুব ভালো করে বুঝতে পারছে। কান্নার ফলে সুমুর স্টিচের অংশে ব্যথা করে উঠল। সে তীব্র যন্ত্রণায় চোখমুখ কুঁচকে ফেলল। মাথা নিচু করে নিজের পেটের দিকে তাকাল। স্টিচের অংশে হাত রাখতেই তার হাত ভিজে উঠল। চোখের সামনে হাতটা এনে দেখল তাজা রক্ত। আঁতকে উঠল সে। স্টিচের অংশ চেপে ধরে বেডের কাছে গেল। ফোনটা তুলে নিয়ে শেরাজকে কল করল, কিন্তু ফোনটা বন্ধ পেল। সুমু আর দেরি না করে ইশিতার নাম্বার ডায়াল করল।
