খান সাহেব পর্ব ৮২
সুমাইয়া জাহান
বদ্ধ একটি গহীন অন্ধকার রুম। দেয়ালের চুন খসে পড়েছে, বাতাসে রক্ত আর ধাতবের গন্ধ। রুমের মাঝখানে দুটো চেয়ারে পিঠমোড়া করে বেঁধে রাখা হয়েছে মাহিন আর রুদ্রকে। দু’জনের মুখে রক্তের দাগ, চুলে ঘাম আর ধুলো জমে আছে। কপালের এক কোণ থেকে টুপটাপ করে পানি পড়ছে। সেই শব্দটা যেন অজানা কোনো মৃত্যুর আগমনী ধ্বনি। একটা পুরনো বাতির ক্ষীণ আলো দুলছে মাথার ওপর। সেই আলোয় রুদ্রের মুখ দেখা যাচ্ছে — ঠোঁট ফেটে গেছে, চোখে রক্তিম দৃষ্টি। সে খুব কষ্ট ফিসফিস করে বলল,
“এটা নিশ্চয়ই শেরাজ খানের কাজ।”
মাহিন কষ্টে শ্বাস নিতে নিতে বলল,
“আমাদের মৃত ঘন্টা বেজে গেছে।”
দরজাটা কেঁপে উঠল। ধীরে ধীরে ভারী কাঠের দরজা খুলে গেল। ভেতরে ঢুকল শেরাজ খান— হাতে গ্লাভস, চোখে ঠান্ডা শীতলতা, মুখে সেই চেনা তৃপ্তির ছাপ। সে তাদের সামনে এসে থামল। দু’জনের দিকে তাকিয়ে নরম স্বরে বলল,
“দেখছো, এই নীরবতাটাই আমার পছন্দ। কেউ চিৎকার করছে না, কেউ মিথ্যা বলছে না—শুধু সত্যির গন্ধ পাচ্ছি আমি।”
রুদ্রর গলা শুকিয়ে গিয়েছে, তবুও চেঁচিয়ে উঠল,
“আপনি যা করছেন, তাতে আপনার নিজেরও শেষ হবে।”
শেরাজ হালকা হাসল। পকেট থেকে একটা ছুরি বের করল। আলোয় ঝলসে উঠল তার ধার।
“শেষ?” সে ফিসফিস করে বলল, “শেষটা তো আমি নিজের মতো করেই লিখব।”
সে একটু থেমে বসে পড়ল ওদের দুজনের সামন। ঠোঁটে কুটিল একটা হাসি টেনে বলল,
“সেদিন আরিয়ান আর রায়য়ানের কথায় আমাদের গাড়ির ব্রেক তোরাই ফেল করিয়েছিলি, তাইনা?”
মাহিন মুখ থেকে রক্তভরা থুতু ফেলে বলল,
“হ্যাঁ, আমরা! তবে সেদিন আরিয়ান স্যার আর রায়য়ান স্যার জানত না ওই গাড়িতে ম্যামও আছে। ওনাদের ইনটেনশন ছিল আপনাকে মেরে ফেলা। কিন্তু আপনি সেদিনও না মরে জিতে গেলেন। জীবনের সব ক্ষেত্রেই আপনি জিতে গিয়েছেন, স্যার।”
শেরাজ হাসল। কিন্তু সেই হাসিতে কোনো মুগ্ধতা নেই। হাসি থামিয়ে বিদ্রূপ করে বলল,
“যেদিন আমার মম-ড্যাড সন্তান নেওয়ার পরিকল্পনা করেছিলেন, সেদিন কোটি কোটি শুক্রাণুর মধ্যে শুধুমাত্র একটিই সবার আগে পৌঁছেছিল তার গন্তব্য ডিম্বাণুতে। আর সেই বিজয়ী শুক্রাণুটি ছিলাম আমি। আমি সেদিন কোটি কোটি প্রতিযোগির মধ্যে জয়ী হয়েছিলাম। আমি আমার জন্মের আগেই প্রমাণ করেছিলাম—আমি হার মানার জন্য নয়, জয় করার জন্যই জন্মেছি।”
সে হাতে থাকা ছুরিটা টেবিলের ওপর আঘাত করল। টং টং শব্দে বাতি আবার কাঁপতে লাগল। পাশে এসে দাঁড়াল স্যান্ডি। শেরাজ উঠে গিয়ে রুদ্রর মুখ বরাবর ছুরিকাঘাত করল। রুদ্র চিৎকার করে উঠল। পরনের ব্লেজারের বোতাম খুলের রাখার ফলে রক্ত ছিঁটে সাদা শার্টে গিয়ে লাগল শেরাজের। এরই মধ্যে স্যান্ডির ফোন বেজে উঠল। সে ফোনের দিকে তাকাল। স্ক্রিনে ইংরেজিতে লেখা নামটা ভেসে উঠল— সারবাজ।
শেরাজ ধীর গলায় বলল,
“রিসিভ করো।”
স্যান্ডি কলটা রিসিভ করল,
“স্যার!”
ওপাশ থেকে হেঁচকি ধরা গলা ভেসে এলো। সারবাজ যেন ছুটছে কোথাও, শ্বাস-প্রশ্বাস এলোমেলো,
“সান! সারাদিন দুজনেই ফোন বন্ধ করে রেখেছিলে কেন? সকাল থেকে ট্রাই করছি তোমাদের সাথে কনট্যাক্ট করার। এস.কে কোথায়? তুমি এখনই ওই কুত্তার বাচ্চাটাকে বলো এসপিটালে আসতে। সকালে সুমুর স্টিচ খুলে গিয়েছিল। রক্ত বন্ধ হচ্ছিল না কিছুইতে।”
স্যান্ডির চোখ বড় বড় হয়ে গেল, তার হাত থেকে ফোনটা প্রায় পড়ে যাচ্ছিল।
“কী বলছেন, স্যার?”
সারবাজ কাঁপা গলায় বলল,
“আমরা এখনো হসপিটালে আছি। এখন সবটা সামলে নেওয়া গেছে। এস.কে যেন এক্ষুনি এখানে চলে আসে।”
স্যান্ডি চুপ হয়ে গেল। চারপাশের বাতাসটা যেন হঠাৎ থমকে গেল। শেরাজ স্যান্ডির দিকে তাকিয়ে বলল,
“কি হয়েছে, সান?”
স্যান্ডি ধীরে তাকাল তার দিকে। চোখে ভয়, মুখটা শুকনো।
“স্যার, সকালে ম্যামের স্টিচ খুলে গিয়েছিল। রক্ত পরা বন্ধ হচ্ছিল না। ওনাকে হসপিটালে নেওয়া হয়েছে। সারবাজ স্যাররা আমাদের সাথে সকাল থেকে কনট্যাক্ট করার চেষ্টা করেছে, তবে পারেন নি।”
এক মুহূর্তে নিস্তব্ধতা। রুমের বাতি টিমটিম করে নিভে গেল একবার। শেরাজ স্থির দাঁড়িয়ে রইল। চোখের মণি যেন জমে গেল বরফের মতো। তার হাতে থাকা ছুরিটা নিচে পড়ে গেল। ঠোঁট ফাঁকা হলো, কিন্তু কোনো শব্দ বেরোল না। চোখের কোণ বেয়ে একটা ফোঁটা ঘাম নেমে এলো। তার মুখের সব শীতলতা মিলিয়ে গেল। সে ধীরে নিঃশ্বাস টেনে বলল,
“গাড়ি প্রস্তুত করো।”
স্যান্ডি কাঁপা কন্ঠে বলল,
“আপনি… এখনই?”
“হ্যাঁ! তাড়াতাড়ি করো।”
স্যান্ডি দৌড়ে চলে গেল। শেরাজ ফোন বের করে সারবাজকে কল করল। সারবাজ কল রিসিভ করতেই শেরাজ উত্তেজিত কন্ঠে বলল,
“আমার সুমুর কী অবস্থা এখন?”
সারবাজ চিন্তিত কন্ঠে বলল,
“এখন ভালো আছে।”
“সিমরান আর শেরান কোথায়?”
“ওরা এখানেই আছে। ইনায়া, নাতাশা, সামিয়া, নাজমিন, ইশিতা, বড়মামনি— সবাই আছে ওদের কাছে।”
“ওকে, আমি এক্ষুনি আসছি।”
কল কাটল সে। বেরিয়ে গেল রুমটি থেকে। বাহিরে গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে। ব্যস্ত পায়ে গাড়িতে উঠে বসল। স্যান্ডি এসে দাঁড়াল।
“স্যার, এই দুজনকে কী করব?”
“দি এন্ড!”
স্যান্ডি মাথা নাড়ল। শেরাজ গাড়ি স্টার্ট দিল। নিস্তব্ধ রাতে গর্জন তুলে গাড়ি ছুটল হসপিটালের উদ্দেশ্যে।
হসপিটালের সাদা কেবিন রুম। সুমু বেডে শুয়ে আছে, চোখের কোণে ক্লান্তি, শ্বাস ধীর। সে ঘুমিয়ে আছে। কেবিনের বাহিরে সিমরান আর শেরান খিদেতে কান্না শুরু করেছে। ইনায়া আর ইশিতা ওদের দুজনকে নিয়ে কেবিনে ঢুকে এলো। কেবিনের মধ্যে থাকা নার্স তাদের দেখে কপাল কুঁচকে বলল,
“একি, আপনারা ভেতরে এলেন কেন? এখন তো ভিজিটিং আওয়ার্স না।”
ইনায়া শেরানের কান্না থামানোর চেষ্টা করে বলল,
“ওদের দুজনের অনেক খিদে পেয়েছে। ওরা অনেকক্ষণ হলো কিছু খায়নি।”
নার্স একটু কড়া গলায় বলল,
“দেখছেন না, পেশেন্ট ঘুমাচ্ছে। এখন ওনাকে ডাকা যাবেনা। বাচ্চাদের একটু সামলে রাখার চেষ্টা করুন। পেশেন্টের অনেকটা ব্লাড লস হয়েছে। এখন ওনার রেস্টের অনেক প্রয়োজন।”
সিমরান আর শেরানের কান্না আরও জোরে বাড়তে লাগল। ওদের দুজনের কান্না সুমুর কানে গেল। সে ঘুমন্ত অবস্থায় নড়েচড়ে উঠে চোখ মেলে তাকাল। মস্তিষ্ক সজাগ হতেই বাচ্চাদের কান্না শুনে উঠে বসার চেষ্টা করল। পেটে আবারও টান লাগল তার। ব্যথায় মৃদু শব্দ করল। নার্স দৌড়ে এসে তাকে ধরে বলল,
“আপনি কী করছেন, ম্যাম? শুয়ে পড়ুন প্লিজ। আপনার রেস্টের প্রয়োজন।”
সুমু হালকা কড়া গলায় বলল,
“আমার কলিজা দুটো খিদেতে কাঁদছে আর আপনি আমাকে বলছেন রেস্ট নিতে?”
নার্স মৃদু কণ্ঠে বলল,
“ম্যাম, আপনি বাচ্চাদের ব্রেস্টমিল্ক করাতে পারবেন এখন? আপনার তো…”
“পারব! ইনায়া, ইশিতা ওদের আমার কাছে নিয়ে এসো।”
ইনায়া আর ইশিতা ছোট্ট সিমরান আর শেরানকে সুমুর কাছে নিয়ে গেল। সুমু ধীরে হাত বাড়িয়ে ছোট্ট সিমরানকে কোলে নিল। কান্নার ফলে মুখ লাল হয়ে গেছে তার। সুমু মৃদু হাসি দিয়ে বলল,
“খুব খিদে পেয়েছে আমার মাম্মাটার। এইতো মাম্মা এখনই সব কষ্ট দূর করে দিচ্ছি।”
ইশিতা শেরানকে শান্ত করার চেষ্টা করছে। নার্স পাশ বলল,
“ঠিক আছে ম্যাম, এখন ব্রেস্টমিল্ক শুরু করুন। আমি এখানেই আছি, কোনো সমস্যা হলে সঙ্গে সঙ্গে জানাবেন।”
সুমু ধীরে তার বাচ্চাদের ব্রেস্টমিল্ক করালো। দুজনেই খেতে খেতে ঘুমিয়ে পড়ল। সুমু যত্ন করে দুজনকে তার পাশে শুইয়ে দিল। সিমরান আর শেরান এখন শান্ত। তাদের নিঃশ্বাস ধীরে নিয়মিত হয়ে চলছে। সুমু তাদের ছোট্ট শরীরগুলোকে আলতো করে আঁকড়ে ধরল। ক্লান্ত চোখে সে তাদের দিকে তাকিয়ে রইল, যেন পৃথিবীর সব শান্তি এই ছোট্ট দুই প্রাণের দিকে তাকিয়ে পাচ্ছে সে।
ইনায়া নরম কণ্ঠে বলল,
“দেখছ ইশিতা, এখনই মা’কে চিনে ফেলেছে। আমরা দুজন কত চেষ্টা করলাম থামানোর, কিছুতেই থামল না দুজনে।”
ইশিতা হালকা হাসি দিয়ে বলল,
“ঠিক বলেছ! মায়েদের মায়া অনেক শক্তিশালী হয়।”
সুমু ধীরে চোখ বন্ধ করে নিল। ছোট্ট সিমরান আর শেরান তার সাথে মিশে শুয়ে আছে। ঘুমের মধ্যে হালকা হাত নড়াচড়া করছে দুজনে। ইনায়া সুমুর পাশে এসে দাঁড়িয়ে বলল,
“সুমু, ওরা তো এখন ঘুমাচ্ছে, তুমিও এখন রেস্ট নাও। আমরা বাহিরেই আছি, কোনো দরকার পড়লে আমাদের জানিয়েও।
সুমু জোরপূর্বক আলতো হাসল। ইনায়া আর ইশিতা বেরিয়ে গেল। সুমু কেবিনের দরজার দিকে তাকাল, যেন কেউ আসবে। সে দীর্ঘশ্বাস ফেলল। গাল বেয়ে দু’ফোটা অশ্রু গড়িয়ে পড়ল। শক্ত হাতে চোখের পানি মুছে চোখ বন্ধ করল।
হসপিটালের করিডরে তীব্র স্যানিটাইজারের গন্ধ।
পায়ের শব্দ যেন প্রতিটি ইঞ্চিতে প্রতিধ্বনি তুলছে। শেরাজ তাড়াহুড়ো করে হসপিটালে ঢুকল। তার শার্টে রক্তের শুকনো দাগ, চোখ দুটো অদ্ভুত বিচলিত। বাইরে সুমুদের সুরক্ষার জন্য আনা পাহারার লোকজন একে একে স্যালুট করল তাকে, কিন্তু সে কিছুই শুনল না। সব শব্দ যেন তার কানে মিলিয়ে গেছে। কোনোদিকে না তাকিয়ে সোজা কেবিনের সামনে এলো। শেরাজকে দেখে সকলে উঠে দাঁড়িয়ে পড়ল। সাহবাজ খান ছেলের দিকে তাকিয়ে মুখ ঘুরিয়ে নিলেন। শেরাজ কেবিনে ঢুকতে নিলে, অনন্যা খাতুন এসে তার সামনে দাঁড়াল।
“মম!”
“চুপ! ডোন্ট কল মি, মম। তোমার মতো সন্তানের মম নই আমি। এখানে কেন এসেছ? বেরিয়ে যাও তুমি।”
“কিন্তু মম ভেতরে সুমু…”
“তাতে তোমার কী? একদম আমার মেয়ে আর নাতি-নাতনির কাছে যাবেনা তুমি। ওদের কাছে যাওয়ার কোনো অধিকার নেই তোমার। সারাদিন যেখানে ছিলে, সেখানে যাও।”
“সুমু আমার স্ত্রী, মম। আর সিমরান, শেরান আমার সন্তান। ওদের কাছে যাওয়া থেকে তুমি কেন, দুনিয়ার কেউ আমাকে আটকাতে পারবেনা।”
“পারবে!”
অনন্যা খাতুন পেছনে তাকালেন। সাহাবাজ খান রক্তচক্ষু নিয়ে এগিয়ে এসে তাকালেন ছেলের দিকে। তিনি কড়া গলায় বললেন,
“আমরা পারব তোমাকে আটকাতে। এই মুহূর্তে আমরা আমাদের মেয়ের কেবিনে কোনো আউটসাইডারকে এলাউ করব না।”
শেরাজ হতবাক হয়ে তাকাল তার বাবার দিকে। ভ্রু কুঁচকে বলল,
“আমি আউটসাইডার, ড্যাড?”
“অবশ্যই! এই মূহুর্তে তোমাকে আউটসাইডার মনে হচ্ছে আমাদের। দয়া করে এখান থেকে চলে যাও। আমরা কেউ তোমাকে দেখতে চাইনা।”
“ড্যাড আমি তোমাদের সন্তান।”
“সেটাই আমাদের জীবনের সবথেকে বড় ভুল যে, তুমি আমাদের সন্তান।”
আরবাজ, আইয়ুব আর রাহিন এগিয়ে এসে সাহাবাজ সাহেবকে পেছনে সরিয়ে নিয়ে গিয়ে সামলানোর চেষ্টা করলেন। ইনায়া আর ইশিতা এসে অনন্যা খাতুনকে সামলালেন। শেরাজ স্থির দাঁড়িয়ে রইল। তার বুকের ভেতর শব্দহীন একটা বিস্ফোরণ ঘটল যেন। এক মুহূর্তে সে শুধু তাকিয়ে রইল— বাবা-মায়ের দিকে নয়, কেবিনের কাচের দরজার ওপারে ঘুমন্ত সুমুর দিকে। সাদা বেডের ওপর সুমুর মুখটা অদ্ভুত শান্ত, অথচ সেই শান্ত মুখই যেন তাকে টুকরো টুকরো করে দিচ্ছে।
হঠাৎ সে ধীরে বলল,
“তোমরা আমার কাছ থেকে সব ছিনিয়ে নিতে পারো। কিন্তু আমার শ্বাস, আমার রক্ত, আমার আত্মা—সবেতেই সুমু আছে। ওকে কেউ আমার থেকে আলাদা করতে পারবে না।”
সাহাবাজ সাহেব গর্জে উঠে এগিয়ে আসতে নিলেই আইয়ুবরা তাকে আটকালো। সারবাজ এগিয়ে এসে শেরাজকে টেনে সাইডে নিয়ে গিয়ে বলল,
“চুপ কর, এস.কে! তুই তোর রাগ, তোর রক্তের উন্মাদনা দিয়ে সবকিছু জ্বালিয়ে দিবি একদিন। তুই জানিস, সুমু আজ হাসপাতালে কেন? তোর জন্য! তোর কাজ, তোর প্রতিশোধ, তোর রক্তপিপাসাই ওর জীবনটাকে আজ প্রায় নিয়ে নিয়েছিল।”
শেরাজ হতভম্ব হয়ে গেল,
“কীসব বলছিস তুই? তুইও শেষমেশ এসব…”
সারবাজ ঠাণ্ডা গলায় বলল,
“তুই ফোন বন্ধ করে রেখে, কারাগার তৈরি করছিলি কারো মৃত্যুর চিত্রনাট্য হিসাবে। আর এদিকে তোর স্ত্রী রক্তে ভেসে যাচ্ছিল এখানে। বড়বাবা আর বড়মামনি তো ঠিকই বলেছে, তোর কোনো অধিকার নেই ওর কাছে যাওয়ার।”
শেরাজের নিজের ঠোঁট কামড়ে রক্ত বের করল।
একটা শব্দও বেরোল না তার মুখ দিয়ে। সে সারবাজকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে কেবিনে ঢুকে গেল। সারবাজও তার সাথে ঢুকল। কেবিনের ঢুকতেই ভেতরের দৃশ্য থামিয়ে দিল শেরাজের নিঃশ্বাস। সাদা বেডটার ওপর সুমু ঘুমিয়ে আছে। চোখের নিচে হালকা কালচে দাগ, মুখে ক্লান্তি, ঠোঁটজোড়া শুকনো। তার পাশে ছোট্ট সিমরান আর শেরান শান্তিতে ঘুমোচ্ছে। সিমরানের একটা হাত মায়ের গায়ে, অন্যটা শেরানের ওপর রাখা। শেরাজ এক মুহূর্তের জন্য থেমে গেল। তার বুকের ভেতরটা হঠাৎ যেন চেপে ধরল কেউ। চোখে সেই ঠাণ্ডা শীতলতা আর নেই— বরং এক অদ্ভুত ভয়, অপরাধবোধ, আর অসহায় ভালোবাসা মিশে গেছে তাতে। সে ধীরে এগিয়ে গিয়ে বিছানার পাশে দাঁড়াল। সুমুর শ্বাসের ওঠানামা দেখে নিঃশব্দে হাঁফ ছেড়ে খুব নিচু গলায় বলল,
“তুমি জানো না, তোমাকে হারানোর ভয় কেমন হয়, সুইটহার্ট।”
নার্স কিছু বলতে যাচ্ছিল, কিন্তু সারবাজ মাথা নেড়ে থামিয়ে দিল। সে নার্সকে বেরিয়ে আসতে বলে নিজেও বেরিয়ে গেল। রুমে শুধু মনিটরের হালকা বিপ্ বিপ্ শব্দ। শেরাজ আগে তার সন্তানদের আদর করল, একে একে সিমরান আর শেরানের কপালে গাঢ় করে চুমু এঁকে দিল। সে বেডের পাশে রাখা চেয়ারটাতে বসল। ঝুঁকে সুমুর হাত ধরল। শেরাজের ঠাণ্ডা আঙুলের ভেতর সুমুর গরম হাতের স্পর্শ লাগতেই হালকা কাঁপুনি দিয়ে উঠল সুমুর শরীর। চোখ মেলে তাকাতেই দুজনের চোখ মিলল। মুহূর্তেই নীরবতা নেমে এলো কেবিন। সুমু হাত ছাড়িয়ে মুখটা ঘুরিয়ে নিল। শেরাজ নিঃশব্দে তাকিয়ে রইল তার দিকে। সে এখন শুধু চাইছে, এই নীরবতার মধ্যে সুমু তার চোখের মধ্যে থাকা অনুতাপটা পড়ুক।
“আমি জানি, তুমি কথা বলবে না। তবু আমি বলতে চাই, সুইটহার্ট। আমি তোমাকে কখনো কষ্ট দিতে চাইনি।”
কোনো উত্তর নেই। সুমুর চোখের কোণ বেয়ে অশ্রুবিন্দু গড়িয়ে পড়ল বালিশে। শেরাজ আবারও বলল,
“তোমার নিরবতা আমাকে যতটা কষ্ট দেয়, তার বিন্দুমাত্র পরিমাণ কষ্ট আমাকে তোমার তিক্ত কথা দিতে পারেনা।”
সে ধীরে উঠে জানালার কাছে গেল। বাইরে কখন রাত নেমে এসেছে। চারপাশে একফোঁটা আলো নেই, ঠিক যেমন নিভে গেছে তাদের দুজনের ভেতরের বিশ্বাসের আলো। শেরাজ পেছন ফিরে তাকাল। সুমু এখনো চুপচাপ। শেরাজের গলা ভারী হয়ে এলো। সে মৃদু স্বরে বলল,
“তুমি জানো, তোমার এই চুপ থাকা আমার কাছে মৃত্যুর থেকেও ভয়ংকর।”
সুমু মুখ ঘোরাল না। তার ঠোঁট নড়ল সামান্য, কিন্তু কোনো শব্দ বেরোলো না। শেরাজ এগিয়ে এসে আবার বসে পড়ল তার পাশে। নরম কণ্ঠে বলল,
“তুমি আমার দিকে একবার তাকাও।”
সুমু তাকাল না। শেরাজ মাথা নিচু করে দীর্ঘশ্বাস ফেলল। সে সুমুর হাতটা আলতো করে আবার নিজের হাতের তালুতে রাখাল। সুমু হাতটা ছাড়িয়ে নিল। শেরাজ সুমুর মুখের দিকে স্থির হয়ে তাকিয়ে থেকে নরম গলায় বলল,
“তুমি কথা বলবে না, সুইটহার্ট?”
তবুও কোনো সাড়া নেই। শেরাজের কণ্ঠ এবার আরও নিচু, কিন্তু দৃঢ় হয়ে উঠল,
“আমি বলেছি তুমি আমার সাথে কথা বলবে। তোমার নীরবতা আমার সহ্যের বাইরে যাচ্ছে।”
সুমু কিছু বলল না, কেবল চুপ করে তার বাচ্চাদের দিকে তাকিয়ে রইল। তখন হঠাৎ তার চোখে পড়ল, শেরাজের সাদা শার্টের বুকের কাছে গাঢ় বাদামি রঙের শুকনো রক্ত। তার চোখ বড় হয়ে গেল, নিঃশ্বাস থেমে গেল এক মুহূর্তের জন্য।
“এটা কী? আপনি রক্তে ভেজা কেন?”
সে হঠাৎ উঠে বসল। কাঁপা হাতে শেরাজের বুকের দিকে হাত বাড়িয়ে দিল। তাড়াতাড়ি করে তার কাঁধ, গলা, হাত— সবখানে চেক করতে লাগল।
“আপনার কোথাও লেগেছে? বলুন, আপনি আহত হয়েছেন?”
শেরাজ তার হাত চেপে ধরে বলল,
“না, সুইটহার্ট। তুমি শান্ত হও। আমার কোথাও লাগেনি।”
সুমু থেমে গেল, কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে রইল তার দিকে। তার ঠোঁটের কোণে এক অদ্ভুত হাসি ফুটে উঠল। হাসিটা নিঃশব্দ, কিন্তু ভয়ংকর। সে কাঁপা কাঁপা গলায় বলল,
“আবারও রক্তে হাত ডুবিয়েছেন আপনি, তাই না?”
শেরাজ হতবাক হয়ে গেল। সুমুর হাসিটা ততক্ষণে বেড়ে উঠেছে, যেন এক রকম মানসিক ভাঙন। সে তীব্র কণ্ঠে বলে উঠল,
“আপনি আমাকে আর আমার সন্তানদের বাঁচতে দেবেন না, তাই না খান সাহেব? আপনার এই রক্তের গল্পে আমরা সবাই শেষ হয়ে যাবো একদিন, তাইনা?”
শেরাজের বুকটা কাঁপল। তার কণ্ঠ কর্কশ হয়ে উঠল,
“এনাফ, সুমু! তুমি জানো না তুমি কী বলছ।”
সুমু হেসে ফেলল— সে এক পাগল, হতভাগ্য হাসি।
“হ্যাঁ, সত্যি আমি জানি না। আমি জানি না, আপনি কাকে মেরেছেন আজ। আপনার চোখে আমি সেই পুরনো আগুন দেখছি, খান সাহেব। সেই আগুন যেটা ভালোবাসার নয়, ধ্বংসের।”
“আমি যা করেছি, তা তোমার আর আমার সন্তানদের জন্য…”
“ওখানেই থামুন। নিজের পাপের দায়ভার আমার সন্তানদের ওপর দিবেন না। সবাই তো এমনই বলে জানেন। ভালোবাসার নামে হত্যার কারণ দেয়।”
“বেশ! তুমি আমাকে ঘৃণা করতে পারো, কিন্তু আমি তোমার ছাড়া বাঁচব না। আমি আবার রক্তে হাত ডুবিয়েছি, হ্যাঁ। কিন্তু এবার সেই রক্ত আমার নিজের শান্তির জন্য।”
“বেশ তো! তাহলে আপনি থাকুন আপনার এই শান্তি নিয়ে। আমাকে মুক্তি দিন। আমি আমার সন্তানদের নিয়ে অনেক দূরে চলে যাব। ওদের একটা সুস্থ জীবন দিব। এখানে থাকলে আপনি আমাদের বাঁচাতে দিবেন না। আমি চাইনা আমার সন্তানরা জানুক যে, তাদের বাবা একজন খুনি,” সে শেরাজের শার্টের কলার টেনে ধরে বলল, “এই মিস্টার শেরাজ খান, কথা দিয়েছিলেন তো আপনি আমাকে। কথা দিয়েছিলেন যে, সব ছেড়ে দিবেন। আপনি সেদিন আমাকে মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, তাইনা? কী চেয়েছিলাম আমি আপনার কাছে? বলুন না, কী চেয়েছিলাম? ব্যস! একটা ছোট সুন্দর সংসার। দিতে পারলেন না, হ্যাঁ? পারলেন না দিতে?”
“সুমু কাম ডাউন। শান্ত হও। তুমি কিন্তু অসুস্থ। স্টেচ পরেছে নতুন, এমন করলে ক্ষতি হবে তোমার।”
সুমুর বুক ওঠানামা করছে রাগে। সে একটু নরম হয়ে করুণ গলায় বলল,
“আমি কোনো প্রাসাদ চায়নি, কোনো রাজত্ব চায়নি, শুধু একটা শান্তিপূর্ণ জীবন চেয়েছিলাম। একটা ছোট সংসার যেখানে আমাদের সন্তানরা ভয় ছাড়া বড় হবে। আপনি সেটা দিতে পারেন নি। আপনি শুধু রক্ত, ভয়, আর ধ্বংস এনেছেন আমার জীবনে।”
তার চোখ দিয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ল,
“আপনি প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, খান সাহেব। আপনি বলেছিলেন— আর রক্ত নয়, আর লড়াই নয়। আপনি বলেছিলেন আমার হাত ধরে নতুন করে সব শুরু করবেন। তাহলে কেন? কেন আবার এই রক্ত, এই আগুন?”
শেরাজ ধীরে তার হাতটা নামিয়ে নিল কলার থেকে। তার চোখে অসহায়তা, ঠোঁটে কম্পন। নিচু গলায় বলল,
“তুমি যা দেখছো, তার পেছনে কারণ আছে, সুইটহার্ট। আমি এমনটা চাইনি। আমি শপথ করছিলাম ঠিকই, তবে আমি তোমাদের নিরাপদ রাখার জন্য এসব করেছি।”
সুমু হেসে উঠল এক ভাঙা, তিক্ত হাসি।
“নিরাপদ? আপনি জানেন, আপনি যাদেরকে ভালোবাসেন, তারা সবাই একদিন ভেসে যাবে আপনার গড়া এই রক্তের সাগরে। আমি চাই না আমার সন্তানরাও সেই অভিশাপ পাক।”
“তুমি আমার থেকে দূরে যেতে পারবে না, সুমু। তুমি আমার শ্বাসের মতো, আমার জীবন তুমি। তোমায় ছাড়া আমি বাঁচব না।”
“তাহলে আজই মুক্তি দিন আমাকে, খান সাহেব। আপনি যদি সত্যিই আমাকে ভালোবাসেন, তবে যেতে দিন। আমার সন্তানেরা যেন তাদের বাবার নাম শুনে ভয় না পায়। আমি আপনাকে আর সহ্য…”
শেরাজ নিজের ঠোঁট চেপে ধরল সুমুর শুকনো ঠোঁট জোড়ায়। দুজনের ঠোঁট মিলিত হতেই মুহূর্তটা স্থির হয়ে গেল। সময় যেন থেমে রইল কেবিনের মধ্যে। সুমু এক মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেল, তার শরীর কেঁপে উঠল হালকা। সে চেষ্টা করল মুখ সরাতে, কিন্তু শেরাজের হাত তার মুখের পাশে এসে ঠেকল। সেই হাত দৃঢ়, জেদি, আর কম্পিত, যেন কিছুইতে ছাড়বেনা তার প্রেয়সীকে। সে ঠোঁট ছাড়তেই সুমুর নিঃশ্বাস ভারী হয়ে এলো। কাঁপা কণ্ঠে সে বলল,
“আপনি… আপনি এটা কেন…”
কথাটা শেষ হবার আগেই শেরাজ আবারও ঝুঁকে পড়ল, এবার আরও গভীর, আরও মরিয়া হয়ে চুমু খেলো। তার ঠোঁটে সেই অদ্ভুত অস্থিরতা, যেন প্রতিটি চুমু এক নিঃশব্দ আর্তি,
“যেও না, থেকে যাও!”
সুমু ধাক্কা দিয়ে সরাতে চাইল, কিন্তু শেরাজ এক হাতে তার মুখ, অন্য হাতে তার পিঠে চাপা দিল, যেন ভাঙা ভালোবাসাটাকে জোড়া লাগানোর চেষ্টা করছে। সে ফিসফিস করে বলল,
“একটাও কথা নয়, সুমু… একটাও না…”
আবারও চুমু খেলো, এবার আরও গভীর, আরও যন্ত্রণাদায়ক। সুমুর চোখে জল চলে এলো, কিন্তু সে কিছু বলতে পারল না। প্রতিবার মুখ খুলতে গেলেই শেরাজের ঠোঁট এসে তার কথাগুলো থামিয়ে দিচ্ছে, চুপ করিয়ে দিচ্ছে, নীরব করে দিচ্ছে, বেঁচে থাকার আকাঙ্ক্ষাটাকেও থামিয়ে দিচ্ছে। সুমুর হাত একবার তার বুক ঠেলল। সে কাঁপা গলায় বলল,
“আপনি… প্লিজ…”
শেরাজ আবারও তার মুখের ওপর ঝুঁকে পড়ল। ফিসফিস করে বলল,
“আমি শুনব না, আজ কিছুই শুনব না। আমি ভয় পাচ্ছি, তুমি এখন কিছু বললে আমি হয়তো শেষ হয়ে যাব, সুমু।”
সে আবারও গাঢ় চুমু খাওয়াতে ব্যস্ত হলো। সুমু এবার চোখ বন্ধ করে ফেলল। চোখের কোণ বেয়ে নেমে এলো অশ্রু। চোখের পানি গিয়ে লাগল শেরাজের ঠোঁটে। সেই লবণাক্ত স্পর্শে যেন মুহূর্তেই ভেঙে গেল শেরাজের সমস্ত উন্মাদনা। সে থেমে গেল। মুখ তুলে তাকাল সুমুর দিকে। সুমু স্থির, নিঃশ্বাস ভারী। সে চোখ মেলল ধীরে, ঠোঁট কাঁপছে, কিন্তু কণ্ঠে কোনো শব্দ নেই। শেরাজ তার মুখের দিকে তাকিয়ে হঠাৎ নিজের হাত সরিয়ে নিল, পেছনে সরে গেল এক পা। কাঁপা কণ্ঠে বলল,
“আমি আবারও তোমায় কষ্ট দিলাম। আবারও সেই একই ভুল করলাম, তাই না, সুমু?”
সুমু কিছু বলল না। চুপচাপ মুখ ঘুরিয়ে নিল, চোখ থেকে আবারও অশ্রু গড়িয়ে পড়ল। শেরাজ মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইল কিছুক্ষণ।
“আমি দোষী, কিন্তু তোমায় হারানোর শক্তি আমার নেই।”
সুমু আস্তে বলল,
“হারানোর ভয়ই তো আপনাকে এমন করেছে, খান সাহেব। আপনি ভালোবাসতে জানেন না, আপনি শুধু দখল করতে জানেন।”
শেরাজ নিঃশ্বাস নিল গভীরভাবে। খুব নিচু গলায় বলল,
“কীভাবে চুমু থেরাপি দিয়ে বউয়ের মুখ বন্ধ করতে হয়, সেইটা আমার খুব ভালো করে জানা আছে। আর একবার আমার থেকে দূরে চলে যাবার কথা বললে, আমি ভুলে যাব যে তুমি অসুস্থ, আমি ভুলে যাব যে, তোমার পেটে নতুন করে স্টিচ পড়ছে। আমাকে রাগিও, সুইটহার্ট। ডক্টরের সাথে কথা বলে তোমাকে এক্ষুনি বাড়িতে নিয়ে যাব। তোমার যা ট্রিটমেন্ট হবার, বাড়িতেই হবে। তুমি এখানে থাকলে আমার প্রিন্স আর প্রিন্সেসের কষ্ট হবে। আর ওদের সাথে আমার বড় প্রিন্সেসেরও কষ্ট হবে।”
“কি ভেবেছেন আপনি আমাকে?”
“আমার বাচ্চাদের মাম্মা!”
সুমু ক্লান্ত চোখে তার দিকে তাকিয়ে বলল,
“আপনি কি জানেন, আপনি যতটা আমাকে ভালোবাসেন বলে দাবি করেন, ততটাই আমি ভয়ে কাঁপি? আপনি আমার চারপাশের দেয়াল হয়ে গেছেন, যার বাইরে আমি নিঃশ্বাস নিতে পারি না।”
শেরাজ ধীরে এগিয়ে এসে তার বিছানার পাশে বসে পড়ল।
“তোমার ভয়টা আমি জানি, সুমু। কিন্তু বিশ্বাস করো, আমি শুধু তোমায় নিরাপদ রাখতে চেয়েছি।”
সুমু মৃদু হেসে বলল,
“আবারও নিরাপদের কথা বলছেন? বন্দি করে কেউ কাউকে নিরাপদ রাখতে পারে না, খান সাহেব। ভালোবাসা মানে তো মুক্তি দেওয়া, বিশ্বাস করা।”
শেরাজ মাথা তুলে তাকাল তার দিকে।
“তুমি যদি চলে যাও, আমি বাঁচব কীভাবে? আমার সমস্ত লড়াই, আমার অস্তিত্বের মানে তোমার ভেতরেই তো বাঁধা, সুমু।”
সুমু মুখ ফিরিয়ে জানালার দিকে তাকাল।
“বাঁচতে হয় নিজের জন্যও, খান সাহেব। শুধু ভালোবাসার জন্য নয়।”
শেরাজ কিছু বলল না। সে উঠে দাঁড়াল। দরজার কাছে গিয়ে থেমে, একবার পেছন ফিরে তাকাল সুমুর দিকে।
“ডক্টরের সাথে কথা বলে আসি।”
কেবিনের দরজা বন্ধ হয়ে গেল। সুমু চোখ বন্ধ করে পিঠ হেলিয়ে দিল বালিশে। পাশেই ঘুমন্ত দু’সন্তানের নিঃশ্বাসের শব্দ শোনা যাচ্ছে। এক মুহুর্তের জন্য যেন সন্তানদের নিঃশ্বাসের শব্দ শুনে শান্তি অনুভব করল সে।
“ভালোবাসি সুহাসিনী”, সুমুর একটা ছবি চোখের সামনে নিয়ে মৃদু গলায় কথাটা বলল রায়য়ান। ছবিটার ওপর আঙুল ছোঁয়াল সে।
আরিয়ান এসে গা ঘেঁষে তার পাশে বসল। দুজনেরই অবস্থা প্রাণহীনদের মতো। লোকজন দেখলে বলবে না, এদের মধ্যে একজন মাফিয়া, তো একজন গ্যাং-স্টার। হাতে সবসময় সিগারেট আর মদের বোতল যেন ডেইলি রুটিন হয়ে দাঁড়িয়েছে দুজনের। একজন ছবি নিয়ে দেবদাসের মতো বসে আছে, তো একজন মদের বোতল হাতে নিয়ে পাগলের প্রলাপ বকছে।
“আচ্ছা রায়য়ান, আমরা কী সুমুকে অনেক কম ভালোবেসেছিলাম? ওকে কী আরও ভালোবাসা উচিত? তাহলে কী ও আমাকে ভালোবাসবে?”
“জানিনা রে! তবে আমার ভালোবাসার ভাণ্ডার শূণ্য। সেখানে আর একটুও ভালোবাসা অবশিষ্ট নেই। সব ভালোবাসা অনেক আগেই সুহাসিনীকে দিয়ে দিয়েছি।”
“তাহলে ওর ছবিটা রেখে দে। ও যে আমাদের দুজনের একজনকে কোনদিনও ভালোবাসবে, এই স্বপ্নটা আমাদের কোনদিনও সত্যি হবেনা। এইটা স্বপ্নই থেকে যাবে।”
রায়য়ান হাসল। সে সুমুর ছবিটা বুক পকেটে রেখে বলল,
“তোর কথা শুনে আমার ওই যে ওই গানটার কথা মনে পড়ছে।”
আরিয়ান ঘোলা চোখে তাকিয়ে বলল,
“কোনটা?”
রায়য়ান, আরিয়ানের হাত থেকে ওয়াইনের বোতলটা কেড়ে নিয়ে একচুমুক বসাল। ঠোঁট থেকে বোতলটা নামিয়ে দেওয়ালে ছুঁড়ে মারল। বোতলটা ভেঙে পুরো রুমটা জুড়ে কাচ ছড়িয়ে পড়ল। সেখান থেকে একটা কাচ রায়য়ান হাতে তুলে নিয়ে চেপে ধরে গেয়ে উঠল,
“সব স্বপ্ন সত্যি হয় কার,
তবু দেখতে দেখতে কাটছি,
আর হাঁটছি যেদিক আমার দুচোখ যায়!”
হাতে কাচের টুকরোটাতে হাত কেটে রক্ত ঝরছে, কিন্তু সে যেন কিছুই টের পাচ্ছে না। তার ঠোঁট গানের শেষ লাইনে থেমে আছে,
“যেদিক আমার দুচোখ যায়…”
আরিয়ান হেসে গানের মাঝখান থেকে গেয়ে ওঠে,
“জানি স্বপ্ন সত্যি হয়না,
তবু মন মানতে চায়না,
কেনো এমন রাত্রি নামছে জানালায়!”
খান সাহেব পর্ব ৮১ (২)
আরিয়ান গান থামিয়ে হঠাৎ রায়য়ানের হাতটা ধরে ফেলল,
“পাগল, ছাড় এটা! কী করছিস তুই?”
রায়য়ান ফিসফিস করে বলল,
“ব্যথা লাগে না রে, আরিয়ান। আমার বুকের মধ্যে যেই ব্যথা, তার কাছে এসব তুচ্ছ।”
