চারুবৃত্ত পর্ব ১৭
জুলি জোনাকি
রাত তখন দশটা , চারু ময়লার ব্যাগ হাতে নিয়ে একটু দূরে ফেলে আসছিল ,এমন সময় বেশ দূরে কেউ দাঁড়ালো । চারু তাঁকালো , বোঝাই যাচ্ছিল, বেশ ক্লান্ত । ক্লান্ত দেহটা নিয়ে দু হাত প্যান্টের পকেটে ঢুকিয়ে চারুর দিক এগিয়ে গিয়ে আচমকা চারুর কাঁধে কপাল ঠেঁকিয়ে দাঁড়ালো , চারু আটকালো না , অনেকখন দুজন চুপ থাকলো । এবার নিরবতা কাটিয়ে চারু মৃদু স্বরে আওরাল ,
” আপনি এই অসময়ে ?”
বৃত্ত ধীরে ক্লান্ত স্বরে জবাব দিলো ,
“আমি বড্ড ক্লান্ত, এভাবে একটু থাকতে দাও ।”
চারু আর প্রশ্ন করলো না, কেবল ওভাবে দাঁড়িয়ে থাকলো ।চারু অনেকখন ওভাবে দাঁড়িয়ে থেকে এখন একটু নড়াচড়া করতেই বৃত্ত বিরক্ত নিয়ে বলল,
“উফফফ , একটু স্থির থাকতে পারো না ? ”
চারুর নড়াচড়া বন্ধ হয়ে গেল । বৃত্ত এবার মাথা তুলে দাঁড়ালো । বেশ কিছুক্ষণ চারুকে দেখলো , তারপর বলল,
” কেমন আছো? ”
চারু একবার তাকাল, চোখ সরিয়ে বলল,
আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন
“ভালো ।”
“আমায় তিনদিন না দেখেও ভালো আছো ? আহ , থাকবে নাই বা কেন , নতুন রেগুলার কাস্টমার পেয়েছ ভালো থাকারি কথা !”
অভিমানে মুখ ঘোড়ালো বৃত্ত । চারু আড় চোখে তাকিয়ে ঠোঁট টিপে হাসলো । বৃত্ত ও আড় চোখে তাকাতেই চারুর হাসিখানা চোখে আটকাল । চোখ ছোট ছোট করে বলল,
“হাসছো যে ?”
“আমি কখন হাসলাম । অনেক রাত হয়েছে বাড়ি যান ।”
বৃত্ত ফাইজলামি করে বলল,
“ভাবছি আজ তোমার কাছে থাকবো ।”
“মা মানে ?”
“মানে আজ তোমার সাথে থাকবো । ”
ঢোক গিললো চারু, ঠোঁট কামরে এদিক সেদিক তাকাচ্ছিল । এমন হাল দেখে বৃত্ত হেসে ফেললো । তারপর একটু ঝুঁকে ফের চুল গুলো এলোমেলো করে দিল, বলল,
“তুমি দেখি সিরিয়াস হয়ে গেছো । ”
চারু কিছু বলল না দেখে বৃত্ত বলল,
“ক্ষুদা পেয়েছে কিছু খেতে দিবে ? সারিদিন ব্যস্ততার কারণে খেতে পারিনি ।”
চারু নিচের দিক তাকিয়ে মনে মনে বলল,
“সারাদিন কি এমন ব্যস্ততা ছিল যে দেখা করতে আসে নি ?”
চারুর মনের কথা যেন বৃত্ত শুনতে পেল , তাই বলল,
“সারাদিন পরীক্ষার খাতা দেখলাম , তাই দেখা করার সময় পাইনি । ”
চারু চমকে তাকালো , বুঝলো কি করে মনের কথা ? চারু বড্ড হাসফাস করতে লাগলো । বৃত্ত ফের বলল,
” চলো যাই ।”
“হুমম ।”
রাতে রাস্তা দিয়ে হাঁটছিল দুজন ,কথা নেই বার্তা নেই, বৃত্ত বারবার চারুর দিক তাকাচ্ছিল, চারু যেন জড়সর হয়ে হাটছিল । বৃত্ত মুখ চেপে হাসলো ।
“ভাইয়া, তিনদিন কোথায় ছিলেন ?”
বৃত্ত খাচ্ছিল এমন সময় লতা হাজির হলো । সোজাঝাপ্টা প্রশ্ন ছুড়লো, বৃত্ত জবাব দিল ,
” কাজ ছিল , তাই আসতে পারি নাই ।”
কথাটা বলে বৃত্ত পানি খাচ্ছিল তখন লতা আরেকটা কথা বলে উঠলো ,
” কাজ থাকতেই পারে ভালো কথা , কিন্তু একটা বার বলে যাবেন তো , হুটকরেই উধাও,আপনি কি জানেন এই তিনদিন মেয়ে টা কি পরিমাণ ছটফট করেছে ? না বলতে পেরেছে না সইতে পেড়েছে , কেমন আক্কেল আপনার ? ”
এক নিঃশ্বাসে বলে ফেললো কথা গুলো । বৃত্ত তা শুনে বিষম খেল । কাশতে কাশতে চারুর দিক তাকালো , চারু দৌড়ে এসে বৃত্তের পিঠে হালকা থাপড়াতে লাগলো । কাশি থামিয়ে বৃত্ত চারুর হাত ধরে সামনে দাঁড় করিয়ে বলল,
“মিস করেছো অথচ ফোন করো নি ? ”
চারুর আগে লতা বলল,
“আপনিও তো ফোন করতে পারতেন , করেন নি কেন ?”
“আরে আমার দেওয়ার রাস্তা বন্ধ করে রেখেছে , ব্লক করে ফেলে রেখেছে । ”
দুজনকে থামিয়ে দিয়ে চারু বলল,
“আমি কাউকে মিস করিনি সব মিথ্যা কথা ।”
লতা কপাল কুঁচকে বলল,
” আমি মিথ্যে বলছি ? যখন কাস্টমার আসে তখন তুমি দৌড়ে দেখতে যাও না ভাইয়া এলো কি না ? ”
বৃত্ত বা হাত গালে রেখে চারুর দিক তাকিয়ে হাসছিল । চারু আর কিছু না বলে লতাকে নিয়ে ওদিকটাতে চলে গেল । বৃত্ত মুখ ঢেকে হা হা করে হাসলো ।
চারু লতাকে দূরে নিয়ে গিয়ে বলল,
“এমন বললে কেন ? আমি কি তোমায় একবারও বলেছি যে, আমি তাকে মিস করেছি ?”
লতা বেশ বিগরে গেল, বলল,
” আরে তুমি বলবে কেন ? তোমার চোখ মুখ সব বলে দিচ্ছিল । তুমি নিজেও জানো না যে , তুমি বৃত্ত ভাইয়া কে ঠিক কতো টা চাও ।”
” ল লতা থ থাম , তুমি যেমন ভাবছো তেমন কিছু না । ”
“আচ্ছা, কেমন কিছু তাহলে তুমি বলো ?”
চারু বৃত্তের দিক তাকালো , ছেলেটা কেমন হাসছে । চারু লতাকে কিছু বলার আছে বৃত্ত সেখান থেকে ডাকলো ,
“চারু শুনো ।”
চারু থেমে খেল , অসস্থি নিয়ে এগিয়ে গেল , বৃত্ত হাসি থামাতেই পারছে না তবুও ঠোঁট কামড়ে আটকাল । বলল,
“তোমার ফোন কোথায় ?”
“ক কেন ? ”
“দরকার আছে দাও ।”
হাত টা বাড়িয়ে দিল বৃত্ত । চারু খামচে তার ফোনটা এটে ধরলো । দিল না দেখে বৃত্ত ফের বলল,
“কি হলো দাও ।”
” কি করবেন আ আগে ব বলেন ?”
বৃত্ত চট করে উঠে ছো মেরে ফোনটা চারুর হাত থেকে কেড়ে নিল । চারু তার ফোনটা ফিরিয়ে নিতে গেলেই বৃত্ত হাত ধরে আটকে দিল । তারপর ব্লক টা ছাড়িয়ে চারুর ফোনটা ফিরিয়ে দিল । আর চারুর নাকে হালকা করে টোকা দিয়ে বলল,
” ফোন দিলে সাথে সাথে ধরবে , আর যদি ব্লক করো তাহলে যেখানে জ্বিনের আনাগোনা বেশি যেখানে মাঝ রাতে গিয়ে রেখে আসবো ।”
চারু চুপ করে দাঁড়িয়ে কথা গুলো শুনলো , জবাব দিল না দেখে বৃত্ত ঝুঁকে ফিসফিসিয়ে বলল,
” মনে থাকবে ।”
চারু কেবল মাথা নেড়ে সম্মতি জানাল । বৃত্ত চারুর চুলগুলো কপাল থেকে সরিয়ে দিয়ে বলল,
” আমি এখন আসি , সাবধানে থেকো । ”
সকাল ছয়টা চারু টিউশন পড়তে যাচ্ছিল এমন সময় পেছন পেছন কেউ তাকে ফলো করছিল । পেছন ফিরতেই কাউকে নজরে এলো না ।
এমনটা বাড়ি ফেরার পথেও হলো , কেউ যেন তাকে ফলো করছে , কিন্তু যেই পেছনে তাকালো কাউকে নজরে পড়লো না ।
বিকালে দোকান খুললো চারু । রান্না শুরু করবে তখন আদিলের আগমোন হলো । এসেই বলল,
” মিস চারু আমায় আজ ঝালঝাল কিছু বানিয়ে দিতে পারবেন ?”
“হ্যা, আপনি বসুন ।”
আদিল যেতে গিয়েও ফিরে এসে বলল,
“আচ্ছা আমরা কি একে অপরকে তুমি বলে সম্বোধন করতে পারি ? ”
” আপনি বলতেই পারেন কিন্তু আমি পারবো না ।”
“কেন ?”
” এমনি ।”
“ঠিক আছে । তুমি যেমন বলবে ।”
চারু কিছুটা সময় পরে খাবার দিতে গেল । মুখে হাসি চেনে কিছু একটা বলছিল আদিল কে তখন বৃত্ত এলো , বেশ সেজেগুজে এসেছে আজ । হাসতে হাসতে আসছিল চারুকে আদিলের সাথে দেখে বিরক্ত চোয়াল শক্ত করে এসে বসলো । চারু কথা শেষ করে ঘুরতেই বৃত্ত কে চোখে পড়লো । সেদিকে গিয়ে বলল,
“আপনি কখন এলেন ?”
বৃত্ত অন্য দিক মুখ ঘুরিয়ে বসে ছিল, চারুর কথা শুনেও ফিরে তাকালো না । শুধু অভিমানি স্বরে বলল,
” এতো হেসে হেসে কথা বললে আমায় দেখবে কি করে যে কখন আসলাম ।”
চারু কিছু না বুঝে বলল,
” মানে ?”
বৃত্ত এবার রাগ নিয়ে তাকিয়ে শুধালো,
“কই আমার সাথে তো এমন হেসে একটা কথাও বলো নি , ওর সাথে তোমার হেসে হেসে কি কথা থাকতে পারে? ”
চারু এবার বুঝতে পাড়লো, তাই বলল,
“এমন কিছু না , খাবার নিয়ে কথা বলছিলাম ।”
” খাবার নিয়ে হেসে হেসে কথা বলতে হয় ?”
” এতে সমস্যা কোথায় ?”
বৃত্ত হাসলো , বলল,
“আসলেই তো সমস্যা হওয়ার কথা না , ঠিক আছে যাও কথা বলো আমি আসছি । ”
এই বলে বৃত্ত রাগ নিয়ে চলে গেল । চারু ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে থাকলো । কি হলো বুঝলো না ।
আজ লতা চারুর সাথে আসে নি । একটু পড়ে লতা দৌড়ে এসে হাপাতে হাপাতে বলল,
” চারু জানো সামনে একটা এক্সিডেন্ট হয়েছে, একটা ছেলের ,কি রক্ত টাই না পড়ছে । ”
চারু স্বাভাবিক ভাবে বলল,
“ওহ ।তুমি দেখ নি ।”
“না গো , রক্ত দেখতে পারি না , তাই দূর থেকেই অনুমান করে বুঝতে পেরেছি । ”
চারু আর কিছু বললো না । লতা পানি খেয়ে এদিক ওদিক তাকালো, বৃত্ত কে না দেখে বলল,
” বৃত্ত ভাইয়া আজকে আসে নি ?”
চারুবৃত্ত পর্ব ১৬
চারু গোটা রসুনের খোসা ছাড়াচ্ছিল লতার কথা শুনে হাতটা থেমে গেল , ভারি ভারি নিশ্বাস ফেলতে লাগলো, লতার দিক তাকিয়ে কিছু একটা মনে করে আচমকা দৌড়ে কোথাও চলে গেল । লতা পেছন থেকে অনেকবার ডাকলো তবে চারু শুনলো না দাঁড়ালোও না ……
