চেকমেট ২ পর্ব ৩৬
সারিকা হোসাইন
“শাহরান কে খুন করার জন্য কেউ কিলার হায়ার করেছে বাবা।গত রাতে সেই কিলার শাহরানকে অ্যাটাক করেছিলো।সংগে গান থাকায় অল্পের জন্য প্রাণে বেঁচে গেছে শাহ।”
বদ্ধ ড্রইং রুমে নিনাদের হিমশীতল গলার চঞ্চল কথাটা কেমন বজ্র হুংকার তুললো চারপাশে।কেবলই এক কাপ চা মুখে তুলেছে অভীরূপ চুমুক দেবার জন্য।কিন্তু নিনাদের কথা খানা তার হাত কাঁপিয়ে তুললো।শক্ত পোক্ত অভিরুপের হাত ঠক ঠক করে কেঁপে চায়ের কাপ মাটিতে পড়লো।টাইলসে পড়েই চূর্ণবিচূ্ণ হলো সিরামিকের ঠুনকো বস্তু খানা।
পাশেই ডায়নিং টেবিলে খাবার গুচ্ছাচ্ছিল নেলি।ছেলের কথা শুনে স্তব্ধ দাঁড়িয়ে নির্বাক ছেলের পানে তাকিয়ে রইলো সে।তার মস্তিষ্ক কাজ করা বন্ধ করলো।বুক কেঁপে উঠলো সেই সঙ্গে ছলছল হলো চোখ জোড়া।মনে হলো তার কান ভুল শুনছে।ওমন কোমল স্বভাবের সুন্দর মানুষটার ও শত্রু আছে বুঝি? এতো অসম্ভব!যেই ছেলে কোনোদিন কারো চোখে চোখ রেখে উচ্চবাচ্য পর্যন্ত করে না তাকে কেউ কেনো মেরে ফেলতে চাইবে?বিয়ের চিন্তায় নিনাদের মাথা কি এতটাই খারাপ হয়ে গেছে?নাকি আজকাল নেশা পানি করা শুরু করেছে?
মনে বিভিন্ন দ্বিধাদ্বন্দ্ব নিয়ে নানান কিছু ভাবতে লাগলো নেলি।কিন্তু কিছুতেই যেনো দুইয়ে দুইয়ে চার মিলল না।
কিছুক্ষন ওভাবেই দাঁড়িয়ে থেকে ছুটে এলো নেলি। নিনাদের বাহু চেপে ধরে ভীত গলায় জিজ্ঞেস করলো —
“তোর মাথা ঠিক আছে?কি বলছিস এসব?বাজে বন্ধুদের সাথে মিশে নেশা ভাং করছিস তাই না?
নিনাদ ভেঙে যাওয়া চায়ের কাপ মাটি থেকে ব্যস্ত ভঙ্গিতে তুলতে তুলতে বললো —
“আমি নেশা করিনি মা। সত্যি বলছি।স্যান্টা ক্রুজ মাউন্টেইন থেকে গত রাতে ওকে আমি পিক করে বাসায় পৌঁছে দিয়েছি।ঘটনার বিস্তর বহু দূর।কিন্তু তোমার ভাগ্নে কাওকে কিচ্ছু জানাতে দিচ্ছে না মা।ইভেন নানু ও কিচ্ছু জানে না। সারফরাজ আংকেল তো আরোও না।”
“মাউন্টেইনে কেনো গিয়েছিলো সে?
অবুঝের মতো জিজ্ঞেস করলো নেলি।
“কিলার তাড়া করিয়ে নিয়ে গেছে ওকে। ভবিষ্যতে দৌড় করিয়ে আরও কোথায় নিয়ে যায় কে জানে?বললাম আংকেলকে জানাতে।কিন্তু তোমার ভাগ্নে জানাবে না কিচ্ছুটি।এসব মামুলি বিষয় সে নাকি একাই হ্যান্ডেল করার ক্ষমতা রাখে।
বলেই ভাঙ্গা কাপ নিয়ে রান্না ঘরে ছুটলো নিনাদ।নেলি শরীরের ভার ছেড়ে দিয়ে অভির পাশে বসে কম্পিত গলায় বলে উঠলো —
“এতদিন বাদে কিসের ঝড় আসতে চলেছে অভী?তুমি না বলেছিলে ভাইজানের সাথে তেমন কারোর শত্রুতা নেই এখন?রুদ্ররাজ চৌধুরীও তো ওসব ছেড়েছে বহু আগে।তবে ছেলেটার প্রাণ নেয়ার জন্য মরিয়া হলো কে?
অভিরূপ এখনো ঘোরের মধ্যে আছে।তার মস্তিস্ক কাজ করা বন্ধ করেছে বহু আগেই।নেলির কথা তার কর্ণকুহরে যাচ্ছে না।মাথায় কেবল একটা জিনিস ঘুরে বেড়াচ্ছে —
“পূর্ব শত্রুতা নতুন করে আবার জেগে উঠতে চাইছে?এতো বড় হিম্মত কার? সারফরাজ এর অগোচরে এতবড় অন্যায় করার মতো বুকের পাটা ওয়ালা মানুষটা কে?
অভিরূপের নির্বাক উপস্থিতি নেলিকে বিষিয়ে তুললো।সে তেঁতে বলে উঠলো —
“বয়সের সংগে সংগে কি বোধ বুদ্ধি আর জবানও হারিয়ে ফেলেছো? এতো এতো কথা বলছি একটার ও জবাব দিচ্ছ না।নিষ্কর্মা বুড়ো লোক কোথাকার।
অভিরুপ তপ্ত শ্বাস ফেলে নেলির পানে তাকিয়ে ছোট করে বলে উঠলো —
“ভবিষ্যতের ভাবনা ভেবে আমি ভয় পাচ্ছি নেলি। বিশ বছর আগেই সারফরাজ পুরোনো অন্ধকার দুনিয়াকে বিদায় জানিয়ে হাত ঝেড়ে ফেলেছে।ব্যবসায়িক ক্ষেত্রে দু একজন শত্রু আছে তার।কিন্তু শাহরানকে খুন করার মতো শত্রু নয়।এই শত্রু বড্ড পুরোনো।অতীত নতুন করে হানা দিতে চাইছে।বহুত মূল্য চুকাতে হবে এর জন্য।
“মূল্য যাকেই চুকাতে হোক ,এসবে শাহরান নির্দোষ।তুমি ভাইজানের সঙ্গে কথা বলো।শাহরানের নিরাপত্তার ব্যবস্থা করো।ওর কিছু হলে রুপকথা , মামা কেউ বাঁচবে না।তুমি এক্ষুনি ভাইজানের সঙ্গে দেখা করো।
অভীরূপ আর বসলো না।ড্রাইভার কে কল করে বেরিয়ে গেলো সারফরাজের বাড়িতে।পুরো ঘটনা শোনার পর সারফরাজের রিয়েকশক কি হবে ভেবেই শিউরে উঠলো অভী।কিন্তু কোনো ভাবেই চুপ থাকা যাবেনা এমন মুহূর্তে।ঘাতক কে তা খুঁজে বের করতে হবে।শাহরান এখনো যথেষ্ট ছোট। বড়দের নোংরা খেলার মারপ্যাঁচ বুঝবে না সে।তাকে গুটি বানিয়ে ঘাতক সারফরাজকে চেকমেট দিতে চাইছে।কিন্তু পাক্কা খেলোয়াড়কে হারানো কি এতই সহজ?
শহরের কোলাহল থেকে দূরে বিস্তীর্ণ জমির ওপর দাঁড়িয়ে আছে সারফরাজের বিশাল এস্টেটটি। উঁচু পাথরের দেয়াল আর লোহার বিশাল গেট ঘিরে রেখেছে পুরো সম্পত্তি। গেট পেরোলেই দীর্ঘ বৃক্ষশোভিত ড্রাইভওয়ে, যার দুই পাশে নিখুঁতভাবে সাজানো বাহারি রঙের দেশি বিদেশি ফুলের বাগান। মূল ফটক থেকে বেশ খানিক দূরে মূল প্রাসাদ।গাঢ় পাথরের দেয়াল, বিশাল কাঁচের জানালা আর প্রশস্ত বারান্দায় তৈরি এই আধুনিক রাজকীয় প্রাসাদটি।বাড়ির ভেতরে বিলাসবহুল ড্রইংরুম, ব্যক্তিগত অফিস, বৈঠকখানা, লাইব্রেরি এবং পরিবারের জন্য আলাদা উইং রয়েছে। পুরো এস্টেটের পরিবেশ এমন যেনো,এটা শুধু একটি বাড়ি নয়, বরং এক ক্ষমতাবান মানুষের নিজস্ব রাজ্য।
এখানে কেবল একজনের হুকুমই চলে এবং পুরো এস্টেট সে নিজ শাসনে দাবিয়ে রাখে।
বিশাল ড্রাইভওয়ে পেরিয়ে সারফরাজের প্যালেসের সামনে গাড়ি থামালো অভি।দরজার সামনে নিরাপত্তারক্ষী শক্ত অবস্থানে দাঁড়িয়ে রয়েছে।অভিকে এই সাত সকালে দেখে রক্ষী জ্যাকসন বেশ অবাক হলো।
রক্ষীকে বিশেষ পাত্তা না দিয়ে ঘরের ভেতর ঢুকলো অভি।অভিকে দেখে একজন মেইড দৌড়ে গিয়ে রূপকথাকে জানালো —
“স্যারের বন্ধু অভিরুপ এসেছেন।
রুপকথা হাতের কাজ ফেলে দৌড়ে এলো ড্রইং রুমে।অভিকে কেমন বিধ্বস্ত দেখাচ্ছে।রুপকথা নিজের বিষ্ময় সাইডে রেখে কিচ্ছু জিজ্ঞেস করার আগেই অভি বলে উঠলো —
“টেবিলে নাস্তা দাও।তোমাদের এখানে ব্রেকফাস্ট করবো আজ।
বলেই সিঁড়ির দিকে পা ফেললো।অভির ব্যস্ত চলনে বাঁধ সেধে রুপকথা বলে উঠলো —
“সারফরাজ উপরে নেই।প্রাইভেট কাউন্সিল রুমে।
অভি ফোস করে শ্বাস ফেলে পুনরায় বাড়ির বাইরে বেরিয়ে এলো এরপর হাতের বামের পাথুরে সর্পিল পথ ধরে এগিয়ে গেলো দূতলা বিশিষ্ট কাউন্সিল হলের দিকে।
এলার্মের কর্কশ শব্দে গভীর ঘুমের ব্যাঘাত ঘটলো শাহরানের।কোনো মতে বিরক্তি নিয়ে চোখ মুখ কুচকে এলার্ম বন্ধ করে বিছানায় পড়ে রইলো শাহরান।আজ সানডে।ছুটির দিন।ভার্সিটি যাবার তাড়া নেই।আরেকটু ঘুমালে মন্দ হয়না।
ঘুমে জড়ানো চোখ জোড়া বন্ধ করে ঘুমের অতলে ডুবতে চাইলো শাহরান।কিন্তু চোখের পাতা বন্ধ করতেই গত রাতের বীভৎস ঘটনা অক্ষি পটে ভেসে উঠলো।ত্বরিত শোয়া থেকে উঠে বসলো শাহ।বিছানার হেডবোর্ডে হেলান দিয়ে আধ শোয়া হয়ে কিছু ভাবতে চাইলো কিন্তু মাথাটা কেমন ঘুরে উঠলো।আনমনে চুলে হাত বুলাতেই টনটনে ব্যাথায় দাঁত চেপে আর্তনাদ করে উঠল শাহরান।
আকস্মিক মনে পড়লো কিলার পাথর ছুঁড়ে তাকে আঘাত করেছে।ক্রোধে শাহরানের দাঁত পিষে উঠলো।শরীর জুড়ে অদ্ভুত অগ্নি স্ফুলিঙ্গ ফুঁসে উঠলো।বিছানা ছেড়ে নেমে ওয়াশরুমের দিকে পা বাড়াল শাহরান।
ওয়াশ রুমের বিশাল আয়নায় নিজের অবয়ব পরখ করলো সে।কপালের কোণের অনেকটা জুড়ে সাদা ব্যান্ডেজের আধিপত্য।গত রাতে নিনাদ হসপিটালে নিয়ে ক্ষত পরিষ্কার করে ব্যান্ডেজের ব্যবস্থা করেছিলো।
মুহূর্তেই স্বাভাবিক জীবনে কেমন যেনো ব্যাঘাত ঘটলো।হেসে খেলে বড় হওয়া শত্রুহীন শাহরানের পায়ে বেঁধে সবাই অহেতুক শত্রু হতে চায়।কিন্তু কেনো?
শাহরান কোনো মতে ফ্রেশ হয়ে ডাইনিং রুমের দিকে পা বাড়ালো।
টেবিলে থমথমে মুখে বসে আছে সারফরাজ।পাশে অভীরুপ। শাহরান নিজের বরাদ্দকৃত চেয়ারে বসে একটা প্লেট টেনে তাতে কিছু সটেড ভেজিটেবল আর একটা ডিমের ওমলেট নিলো।কাটা চামচে অল্প সবজি মুখে তুলে চিবুতে লাগলো।ভাবখানা এমন যেনো তার পাশে কেউ নেই। রুপকথা ব্যস্ত ভঙ্গিতে অভিরূপের প্লেটে দুটো রুটি আর ভেজিটেবল দিয়ে বলে উঠলো —
“নেলীকেও সঙ্গে নিয়ে এলে পারতেন।
অভিরুপ হাত গুটিয়ে চুপচাপ বসে অল্প সৌজন্য মুলক হাসলো শুধু।সুফিয়ান চৌধুরী নিজের খাবার চিবুতে চিবুতে শাহরানের পানে নজর নিবদ্ধ করলো।কপালে সাদা ব্যান্ডেজের প্রলেপ চকচক করছে।নাতির শারীরিক ব্যাথা তাৎক্ষনিক নিজ বক্ষে অনুভব করলেন বৃদ্ধ সুফিয়ান।তিনি খাওয়া থামিয়ে অস্থির গলায় জিজ্ঞেস করলেন —
“ব্যাথা পেলি কি করে নানু ভাই?
শাহরান কিছুই হয়নি এমন ভঙ্গিতে বলে উঠল —
“ওয়াশরুমে পিছলে পড়ে গেছিলাম গত রাতে।বাথ ট্যাবের কোণায় লেগে কপাল কেটেছে অল্প।চিন্তার কিছুই নেই।দুদিনেই সেরে যাবে।
এতক্ষন ছেলের দিকে না তাকালেও এবার সব কিছু ফেলে ছেলের পাশে এসে দাঁড়ালো রূপকথা।ছেলের মসৃণ ঝলমলে চুল সরিয়ে কপালে হাত বুলিয়ে রুপকথা বলে উঠলো —
“কালই ভ্যালেরিয়াকে দিয়ে তোমার ওয়াশরুম আমি নিজে দাঁড়িয়ে ক্লিন করিয়েছি।কীভাবে পড়লে?
শাহরান কথা বাড়ালো না।শুধু বললো —
“মামুলি একটা বিষয় নিয়ে খাবার টেবিলে এতো কথা বলতে ভালো লাগছে না মা।
এতো সময় ধরে সারফরাজ চুপ থাকলেও এবার গলা বাড়ালো।বললো —
“শাহরান ছোট বাচ্চা নয় রুপকথা।ওকে খেতে দাও।
রুপকথা অবিশ্বাস্য চোখে স্বামীর পানে তাকিয়ে রইলো।শাহরান ছোট বাচ্চা নয় মানে?মায়ের কাছে সন্তান কখনো বড় হয়? সারফরাজ নিজে কি কখনো শাহরানকে বড় নজরে দেখেছে?ছেলের প্রতি তো সে আরোও দুর্বল।তবে আজ চোখ মুখের অভিব্যাক্তি এতো কঠিন কেনো?কি চলছে ভেতরে ভেতরে?
রূপকথা মুখ ভার করে শাহরানকে ছেড়ে নিজের চেয়ারে বসতে বসতে বলে উঠলো—
“গত রাতে অনেক দেরিতে বাড়ি ফিরেছ।কোথায় গেছিলে?
“নিনাদের বিয়ের শপিং করতে।
বলেই অভির পানে নজর নিবদ্ধ করলো শাহ।এরপর প্রশ্নবিদ্ধ চোখে অভিকে জিজ্ঞেস করলো —
“নিনাদ কিছু বলেনি তোমাকে?
অভি মাথা ঝাঁকিয়ে বললো —
“নিনাদ সব বলেছে আমাকে।
অভির জবাবে শাহরান হাতের স্পুন টা শক্ত করে চেপে দাঁত দাঁত পিষলো।ইচ্ছে হলো নিনাদ কে ধরে উদুম কেলানি দিতে। সেই সাথে একটা একটা করে দাঁতের কপাট খুলে ফেলতে।
শাহরানের নিঠুর ভাবনার মাঝেই একজন মেইড দৌড়ে এসে মাথা নিচু করে জানালো —
“রোদশী ম্যাডাম এসেছে।
শাহরান তাৎক্ষনিক বলে উঠলো —
“ভেতরে পাঠাও তাকে।
মেইড সম্মতি জানিয়ে দৌড়ে বেরিয়ে গেলো।সুফিয়ান চৌধুরী টিপ্পনী কেটে বলে উঠলো —
“গত কালই দেখা হয়েছে।বন্ধের দিনটাও সহ্য হচ্ছে না?
লজ্জায় মাথা নুইয়ে ফেললো শাহরান ।এমন সময় হেলেদুলে ভেতরে প্রবেশ করলো রোদ।টেবিলে উপস্থিত সকলকে সম্মান জানিয়ে রূপকথার পাশে বসে রোদ বলে উঠলো —
“আপনাদের অনেক মিস করছিলাম।তাই সকাল সকাল চলে এলাম।খুব বিরক্ত করলাম বুঝি?
বলেই চুপিসারে শাহরানের পানে তাকিয়ে চোখ টিপলো।মুহূর্তেই বিষম খেলো শাহরান। রোদ ঝটপট এক গ্লাস পানি শাহরানের দিকে এগিয়ে বলে উঠলো _
“নাও নাও পানি খাও।
সুফিয়ান চৌধুরী আড়চোখে এসব তামাশা দেখে বলে উঠলো —
“আমার নাতির চিন্তায় রাতে ঘুম হয়নি বুঝি?ভোরের আলো না ফুটতেই চলে এসেছ।তারচে বরং একেবারেই থেকে যাও।কষ্ট করে যাতায়াত করে যাওয়া আসার দরকার কি?
লজ্জায় রোদের গাল গোলাপি হয়ে উঠলো।বুড়োটা ইচ্ছে করে তাকে অস্বস্তিতে ফেলছে বুঝেই রূপকথার পিছনে গিয়ে লুকালো রোদ।
রূপকথার হঠাৎ মনে পড়লো চুলায় দুধ বসিয়ে এসেছে সে।শাহরান দুদিন আগে পায়েশ খেতে চেয়েছিল।
সবাইকে টেবিলে খাবার সার্ভ করে মেইডকে ইশারা করে রান্না ঘরের দিকে পা চালালো সে।বুড়ো সুফিয়ান চৌধুরীর হাত থেকে বাঁচতে রোদ রূপকথার পিছু পিছু রান্না ঘরে গেলো।
দুধে বলক এসেছে।রুপকথা গুছিয়ে রাখা সব কিছু ট্রেতে নিয়ে চুলার কাছে এলো।এমন সময় রোদ বললো
“আণ্টি আমি বানাই?
রুপকথা মুচকি হেসে শিখিয়ে দিলো কীভাবে কী দিতে হবে।
রূপকথার ইন্সট্রাকশন ফলো করে একে একে সকল উপকরণ পায়েশে মিশালো রোদ।
হঠাৎ মেইড এসে জানালো —
“হাসপাতাল থেকে ফোন এসেছে।আপনার সঙ্গে কথা বলতে চাইছে ।
রুপকথা তপ্ত শ্বাস ফেলে কিচেন থেকে বের হবার আগে রোদকে বললো —
“চিনির কথা বলতে ভুলে গেছি। দেড় কাপ চিনি দিও।
বলেই দ্রুত পদে বেরিয়ে এলো।
রোদ ট্রেতে থাকা বয়াম থেকে দেড় কাপ পরিমাণ চিনি নিয়ে পায়েসে মেশালো।কিছুক্ষন নাড়াচাড়া করার পর পায়েশ ঘন হয়ে এলো।কেমন মজাদার শাহী ঘ্রাণ আসছে পায়েশ থেকে।
একটা সার্ভিং ডিশে সেই পায়েশ নামিয়ে কিছু ড্রাই ফ্রুটস ছিটিয়ে ডাইনিং টেবিলে এলো রোদ।
রোদের হাতে পায়েশ দেখে সুফিয়ান চৌধুরী প্রশস্ত হেসে বলে উঠলেন —
“পায়েশ!দাও আমাকে আগে দাও।
একটা ছোট বাটিতে পায়েশ ঢেলে সুফিয়ান চৌধুরীর দিকে এগিয়ে রোদ বলে উঠলো —
“পায়েশ আজ আমি রেধেছি।খেয়ে বলবেন কেমন মজা হয়েছে।পুরোটাই খেতে হবে কিন্তু।
হা হা করে হাসলেন সুফিয়ান চৌধুরী।
রোদ শাহরানের পানে একটা বাটি বাড়িয়ে ফিসফিস করে বলে উঠলো —
“এর চাইতেও মিষ্টি জিনিস রেডি আছে তোমার জন্য।তাড়াতাড়ি তোমার রুমে চলো।
ঠোঁট কামড়ে হেসে ফু দিয়ে ঠান্ডা করে এক চামচ পায়েশ মুখে তুললো শাহরান।যতটা উৎফুল্ল নিয়ে পায়েশ মুখে দিয়েছিল ,পায়েশ মুখে দেবার সংগে সঙ্গে সমস্ত উৎফুল্ল আনন্দ কোথায় যেনো গায়েব হলো।
সারফরাজ রোদকে বলে উঠলো —
“আমাকে আর অভিকে ও দাও।আমরাও খেয়ে দেখি রুদ্রের মেয়ের হাতের রান্নার টেস্ট কতটা সুস্বাদু।
বাবার মুখে এই ভয়ানক কথা শুনে পায়েসের বাটি নিজের দিকে টেনে শাহরান চিৎকার করে উঠলো —
“না কেউ খাবে না।আমি একাই সব খাবো।এই পায়েসের প্রতি যার নজর পড়বে তাকে আমাকে মোকাবেলা করতে হবে আগে।
বলেই বেকায়দায় হেসে সুফিয়ান চৌধুরীর বাটি সহ টেনে নিলো।
সবেই মুখে এক চামচ পায়েশ তুলেছেন সুফিয়ান চৌধুরী।সেই পায়েশ লবনের তিক্ত স্বাদে গলা দিয়ে নামাতে গিয়ে তিন বার বমির উদ্রেক পাচ্ছে তার।কিন্তু নাতির ভয়ে পায়েশ মুখে গুঁজে শক্ত হয়ে বসে আছেন তিনি।
শাহরান চোখে চোখে তার নানুকে বোঝালো —
“যদি একটাও টু শব্দ করেছো তবে গলা টিপে মেরে পাথর চাপা দেবো।
বৃদ্ধ সুফিয়ান চৌধুরীর মনে হলো এই মেয়ে সাত সকালে তাকে টর্চার করতে চলে এসেছে।একটু আগে রোদের প্রতি যেই ভালোবাসায় গদগদ হয়েছিলেন তিনি এখন তা ক্রোধে রূপ নিলো।
বহু কষ্টে সেই পায়েশ গলাধঃকরণ করে ঢকঢক করে সুফিয়ান চৌধুরী পানি খেয়ে বলে উঠলেন —
“এতো মজার পায়েশ জীবনেও খাইনি।খা নানু ভাই তুই ই খা।বাঁচবি ই আর কতদিন।
সারফরাজ ছেলের উদ্দেশ্যে বলে উঠলো —
“এতগুলো পায়েশ একা খেতে পারবে তুমি?এসব কেমন বাচ্চাদের মতো জেদ?
সুফিয়ান চৌধুরী কাতর চোখে মেয়ের জামাইয়ের দিকে তাকিয়ে মাথা নাড়লেন।চতুর সরফরাজ সব বুঝে বাকা হাসলো।ছেলেকে বললো —
“আমিও টেবিলে বসে দেখতে চাই কিভাবে তুমি এতগুলো পায়েশ খাও। যতক্ষণ তোমার পায়েশ খাওয়া শেষ না হচ্ছে আজ আমি কোথাও যাচ্ছি না।
বলেই শক্ত আসনে বসে রইলো সরফরাজ।
চেকমেট ২ পর্ব ৩৫
জামাইয়ের প্রতি মনে মনে বেশ খুশি হলেন সুফিয়ান চৌধুরী।ইচ্ছে হলো সারফরাজকে বুকে জড়িয়ে চুমু খেতে।কিন্তু নাতির ভয়ে পারলেন না।
শাহরান কেঁদে দেবার ভঙ্গিতে আরেক চামচ পায়েশ মুখে তুলে চুপচাপ বসে রইলো ।গলা দিয়ে নামেনা সেই পায়েশ।প্রেমিকার মন ভাঙলেও চূড়ান্ত পাপ দিবেন বিধাতা।এবার তবে কি উপায়?এই পায়েশ পুরোটা শেষ করলে তো বিয়ের আগেই বিধবা হবে রোদশী অরোরা।
