চোখের আড়ালে ভালোবাসি পর্ব ৩৬
আয়াত বিনতে নূর
এদিকে কলেজের পুরোনো ক্লাসরুমটায় ঢুকে জানালার পাশের বেঞ্চটায় এসে বসলো অহনা আর রিয়া। ক্লাস শুরু হতে এখনও কিছু সময় বাকি। চারপাশে ছেলেমেয়েদের হাসি-ঠাট্টা, ব্যাগের চেইনের শব্দ, চেয়ার টানাটানির আওয়াজ—সব মিলিয়ে চেনা একটা কোলাহল। কিন্তু এই কোলাহলের মাঝেও রিয়ার মুখটা অস্বাভাবিক রকম গম্ভীর। অহনা সেটা অনেকক্ষণ ধরেই লক্ষ্য করছে। রিয়ার চোখে নেই সেই চঞ্চলতা, ঠোঁটের কোণে নেই চিরচেনা হাসিটা। মুখ ভার করে জানালার বাইরে তাকিয়ে বসে আছে। অহনা ধীরে ধীরে রিয়ার পাশে একটু সরে এসে বসলো। কণ্ঠটা নরম করে বলল,
-“কি হয়েছে রে? সেই কখন থেকে দেখছি মুখ কালো করে বসে আছিস।
একটু থেমে আবার বলল,
-আর নিশি কোথায়? আজও কলেজে আসেনি নাকি?
রিয়া গভীর একটা নিঃশ্বাস ফেললো। মনে হলো বুকের ভেতর জমে থাকা ভারী কষ্টটা নিঃশ্বাসের সাথে বের করে দিতে চাইছে।
তারপর ধীরে ধীরে বলল,
আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন
-“জানিস অহনা… নিশির এই কটা দিনে অনেক পরিবর্তন হয়ে গেছে।”
অহনা ভ্রু কুঁচকে তাকালো। রিয়া কথাটা চালিয়ে গেল,
-“ও আগের মতো আর আমার সাথে কথা বলে না। হাসিখুশি থাকে না।সবসময় মনে হয়, ও যেন কিছু একটা লুকোচ্ছে… কিছু একটা চাপা কষ্ট বয়ে বেড়াচ্ছে।”
একটু থেমে গলা ভারী করে আবার বলল,
-আর সবথেকে বড় কথা জানিস কী? ওই যে… ২১ তারিখ আমাদের ওয়াল ফাংশন ছিলো না?
অহনা মাথা নেড়ে বলল,
-“হ্যাঁ, মনে আছে।”
রিয়া চোখ নামিয়ে বলল,
-“সেইদিন ভাইয়া নিশিকে কোথায় যেন নিয়ে চলে গেলো… আর নিশি সেদিন রাতে আর বাড়ি ফেরেনি।”
এই কথাটা শুনে অহনার চোখ দুটো একদম বড় হয়ে গেলো। মনে হলো যেন আকাশ থেকে পড়ে গেলো সে,
-কিহ্?!
অহনা প্রায় ফিসফিস করে বলল,
– ‘তুই তো আমাকে এসব কিছুই বলিস নি রিয়া! আমি তো কিছুই জানি না। কবে থেকে এসব হচ্ছে?”
রিয়া ঠোঁট চেপে ধরে বলল,
-“সেদিন রাতে ঝড় হয়েছিলো। ভাইয়া বলেছিলো রাস্তা খারাপ, তাই নিশি নাকি ওদের বাসায় আছে।
আমরা সবাই বিশ্বাস করে নিয়েছিলাম। আর জানিসই তো… ভাইয়ার মুখের উপর আমাদের বাড়িতে কেউ কখনো কথা বলতে পারে না।
তাই কেউ কিছু জিজ্ঞেসও করেনি।”
কিছুক্ষণ চুপ থেকে আবার বলল,
-“সব ঠিকঠাকই চলছিলো… কিন্তু কালকে আমার সব ধারণা একদম পাল্টে গেছে অহনা।”
অহনা মনোযোগ দিয়ে তাকিয়ে আছে।
রিয়া বলতে থাকলো,
-“কালকে তুই চলে যাওয়ার পর আমি আর নিশি গাড়ির জন্য অপেক্ষা করছিলাম। ঠিক তখনই ভাইয়া এসে হাজির।” এক কথায় নিশিকে নিয়ে চলে গেলো।
গলা আরও নিচু করে বলল,
– “এমনকি কালকেও নিশি সারারাত বাড়ি ফেরেনি।
কোনো ঝামেলা না হয়, তাই আমি বাসায় বলেছিলাম— নিশি তোদের বাড়িতে আছে।
এই কথাগুলো শুনে অহনা স্তব্ধ হয়ে গেলো।
মাথার ভেতরে হাজারটা প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে।
মনে পড়ছে সেই ফারিস ভাইয়ার কথা,
যে প্রপোজ করার অপরাধে নিশিকে গুনে গুনে ১৫টা চড় মেরেছিলো। সেই মানুষটা হঠাৎ করে এত বদলে যাবে? অহনা কিছুতেই মিলাতে পারছে না। সে রিয়ার দিকে তাকিয়ে ধীরে ধীরে বলল,
– “একটা কথা আছে… হয়তো তোকে অনেক আগেই বলা উচিত ছিলো। আমি বলিনি।
কিন্তু আজ এসব শোনার পর মনে হচ্ছে— আর চুপ করে থাকা ঠিক হবে না। রিয়া উৎসুক চোখে অহনার দিকে তাকালো,
-“কী কথা?”
অহনা গভীর শ্বাস নিয়ে বলল,
– “নিশি… ফারিস ভাইয়াকে ভালোবাসে, রিয়া।
রিয়ার চোখ ছানাবড়া। রিয়া বিশ্বাস এই করতে পারছেনা। কারণ নিশিতা আর তার ফারিস ভাইয়ের মধ্যে এমন কিছু থাকতে পারে? রিয়া অবাক হয়ে বলে,
-কিহ?! কি বলছিস তুই?!
অহনা বলতেই থাকলো,
– “এটা এক–দুই দিনের ব্যাপার না। পুরো তিন বছর ধরে ও ফারিস ভাইয়াকে ভালোবাসে। শুরুতেই আমাকে বলেছিলো। আমি তখন মজা ভেবেছিলাম। কিন্তু পরে বুঝেছি— ওর ভালোবাসাটা একদম সত্যি ছিলো।”
রিয়া অবিশ্বাসের দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে।
অহনা গলা ভার করে আবার বলল,
– “নিশি নিজেই ফারিস ভাইয়াকে প্রপোজ করেছিলো। কিন্তু উনি রাজি তো হনই নি… উল্টো নিশিকে চড় মেরেছিলেন। তারপর থেকে নিশি চেষ্টা করছিলো ওনাকে ভুলে যেতে। এড়িয়ে চলতো। কথা বলতো না।”
এই কথা শুনে রিয়া কেঁপে উঠলো।
– “মানে… এসব আমি কিছুই জানি না!
নিশি ভাইয়াকে ভালোবাসে— আর আমি জানিই না?”
অহনা চুপ করে রইলো। তার কাছে কোনো উত্তর নেই। রিয়া আবার বলল,
– “তাহলে এজন্যই ও কিছুদিন ধরে ভাইয়াকে এভয়েড করছিলো… আমি কতবার জিজ্ঞেস করেছি, কিছুই বলেনি।
কিছুক্ষণ চুপ থেকে হতভম্ব কণ্ঠে বলল,
-কিন্তু একটা জিনিস আমি কিছুতেই বুঝতে পারছি না অহনা… যদি নিশি এড়িয়ে যাচ্ছিলো, তাহলে হঠাৎ করে এসব হলো কীভাবে?
এই প্রশ্নটার কোনো উত্তর কারও কাছেই নেই।
ঠিক তখনই ক্লাসরুমের দরজা খুলে স্যার ঢুকে পড়লেন। মুহূর্তেই পুরো ক্লাসরুম নিস্তব্ধ হয়ে গেলো।
সবাই নিজের নিজের জায়গায় সোজা হয়ে বসল।
অহনা আর রিয়াও চুপ করে গেলো। কিন্তু তাদের মন আর ক্লাসে নেই। দুজনের মাথার ভেতর শুধু একটাই প্রশ্ন ঘুরছে— নিশি আর ফারিসের মাঝখানে আসলে কী চলছে?
এদিকে ফারিস ধীর গতিতে গাড়িটা এসে থামালো চৌধুরী গ্রুপ অফ ইন্ডাস্ট্রির মূল ভবনের সামনে।
এই গ্রুপের অধীনে অসংখ্য অফিস থাকলেও, এই অফিসটাই ছিলো সবচেয়ে আলাদা। সবচেয়ে আধুনিক। সবচেয়ে আকর্ষণীয়। উঁচু কাঁচের দেয়াল, ঝকঝকে মার্বেলের ফ্লোর, সামনে সাজানো নান্দনিক গার্ডেন— সব মিলিয়ে দূর থেকেই বোঝা যায়, এটা শুধু একটা অফিস না, এটা ক্ষমতা আর অভিজাততার প্রতীক। ফারিস গাড়ির ইঞ্জিন বন্ধ করলো। কিছুক্ষণ চুপ করে বসে থাকলো।
তারপর পাশের সিটে রাখা নিজের স্যুটটা হাতে নিলো। গাড়ির দরজা খুলে বেরিয়ে এলো সে।
চারপাশে ব্যস্ত কর্মচারীদের আনাগোনা, সিকিউরিটির সতর্ক দৃষ্টি— সব কিছুর মাঝেও ফারিসের উপস্থিতি আলাদা করে চোখে পড়ার মতো। সে ধীরে ধীরে স্যুটটা পরে নিলো।
শার্টের কাফ ঠিক করলো। টাইটা সামান্য ঠিক করে নিলো আয়নার দিকে একবার তাকিয়ে। কয়েক কদম এগোনোর পরেই হঠাৎ করে ফারিসের ফোনটা বেজে উঠলো। বিরক্তির ছাপ স্পষ্টভাবে ফুটে উঠলো তার চোখেমুখে।
পকেট থেকে ফোনটা বের করে স্ক্রিনে তাকালো।
– রাজীব।
একটা ছোট নিঃশ্বাস ফেলে কলটা রিসিভ করলো।
ওপাশ থেকে প্রায় তাড়াহুড়ো করা গলায় রাজীব বলল—
– ভাইয়া, কই তুমি? উনি তো এসে বসে আছেন। তুমি তো এখনও আসলে না!
ফারিসের কণ্ঠ ছিলো সম্পূর্ণ শান্ত, কিন্তু সেই শান্ত কণ্ঠেই লুকিয়ে ছিলো আত্মবিশ্বাস আর কর্তৃত্ব,
– শোন রাজীব, এরকম ডিল হয়তো চৌধুরী গ্রুপ অফ ইন্ডাস্ট্রির জন্য বড় হতে পারে… কিন্তু আমার কাছে এরকম ডিল রোজই আসে।
একটু থেমে আবার বলল,
– তাই এতো চিন্তা করার কিছু নেই। আমি চলে এসেছি।
এই কথা বলেই ফারিস আর কিছু শোনার অপেক্ষা করলো না। সরাসরি কল কেটে দিলো। রাজীব ওপাশ থেকে আর কিছু বলার সুযোগই পেলো না।
ফারিস ফোনটা পকেটে রেখে সামনে এগিয়ে গেলো। তার হাঁটার ভঙ্গিতেই বোঝা যায়— সে জানে, এই জায়গাটা তারই। কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই সে মিটিং রুমে প্রবেশ করলো। বিশাল মিটিং টেবিল। চারপাশে চামড়ার চেয়ার। ঘরের ভেতর হালকা সুগন্ধি আর শীতল এসির বাতাস।
ফারিস ঢুকতেই একজন নিজে থেকে উঠে এগিয়ে এলো। হাসিমুখে হাত বাড়িয়ে দিয়ে বলল,
-Hi, I’m Rivan Talukder, Mr. Chowdhury.
ফারিস স্বাভাবিক ভঙ্গিতে হাত মেলালো। চোখে একফোঁটা অবাকভাবও নেই।
শান্ত গলায় উত্তর দিলো,
– I know. After all, আপনি নাম করা বিজনেসম্যানদের তালিকায় আছেন।
রিভান মুচকি হাসলো। তার হাসিটা অহংকারে ভরা নয়, বরং আত্মবিশ্বাসী। সে হালকা কৌতুকের সুরে বলল,
– আপনি যেখানে আছেন, সেখানে পৌঁছাতে এখনো অনেক কষ্ট করতে হবে, Mr. Chowdhury.
লোকটার কথা বলার ধরন শুনেই বোঝা যায়— সে ভদ্র, মার্জিত, কিন্তু নিজের জায়গা সম্পর্কে সচেতন। রিভানের দিকে তাকালেই বোঝা যায়, লোকটা সত্যিই সুদর্শন। তার বয়স আনুমানিক ২৭।
প্রায় ৬ ফুট লম্বা শরীর। গায়ের রং ধবধবে সাদা না হলেও পরিপাটি ফর্সা। ফর্মাল স্যুটে তাকে সত্যিই চমৎকার লাগছে। চোখ দুটো হালকা কালো রঙের, শান্ত কিন্তু গভীর। জিম করা শরীরের পেশিগুলো স্যুটের নিচেও স্পষ্ট বোঝা যায়। ফারিসের মতো অতটা ভয়ংকরভাবে আকর্ষণীয় না হলেও,
লোকটার মধ্যে আছে একধরনের স্থির সৌন্দর্য।
দেখেই বোঝা যায়— রিভান তালুকদার এমন একজন মানুষ, যে চুপচাপ নিজের কাজ করে যায়,
আর প্রয়োজন হলে ঠিকই নিজের জায়গা বুঝিয়ে দিতে জানে।
মিটিং রুমের বাতাসটা ধীরে ধীরে ভারী হয়ে উঠতে শুরু করলো। দু’জন শক্তিশালী পুরুষের মুখোমুখি বসা মানেই— এই ডিল শুধু কাগজে সীমাবদ্ধ থাকবে না। মিটিং রুমের চারপাশে নিস্তব্ধতা বিরাজ করছে। দূর থেকে ভেতরের হালকা বাতাস, হালকা এসির শব্দ, চামড়ার চেয়ার ঘষে ওঠার অল্প আওয়াজ—সব মিলিয়ে যেন একটা অদ্ভুত চাপ তৈরি করছে। বড়, চকচকে টেবিলের দুই পাশে বসে আছেন ফারিস এবং রিভান।
দু’জনের চোখে নিজস্ব আত্মবিশ্বাস, এবং চারপাশের স্থিরতা যেন আরো ভিন্ন মাত্রা পাচ্ছে।
ফারিস ধীরে ধীরে নিস্তব্ধতা ভেঙে বলল,
– তাহলে কি শুরু করা যাক মিটিংটা?
কণ্ঠটা শান্ত, কিন্তু মধ্যে মধ্যে নিজের কর্তৃত্ব প্রদর্শন করছে।
-আশা করি আমার লেট করে আসার কারণে কোনো অসুবিধা হয়নি আপনার?
রিভান নিজের চেয়ারে সামান্য বসতে বসতে হেসে উত্তর দিলো,
– ও হ্যাঁ… এটা তো আমার ভাগ্য যে আপনার সাথে দেখা করার সুযোগ পেলাম।
-এবার শুরু করুন মিটিংটা।
ফারিস চুপচাপ চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়াল।
প্রজেক্টের প্রেজেন্টেশন অন করা হলো। প্রথম স্লাইড থেকে শেষ পর্যন্ত একে একে সব প্রজেক্ট দেখানো হলো। ডাটা, চার্ট, ফাইন্যান্সিয়াল ভিউ—সবকিছু নিখুঁতভাবে সাজানো। সবশেষে ফারিস আবারও নিজের কোটচেয়ারে ফিরে বসল।
চোখ রিভানের দিকে সরিয়ে বলল,
-সো… আপনার কি মনে হয়, এই ডিলটা চৌধুরী গ্রুপ অফ ইন্ডাস্ট্রি পেতে পারবে?
রিভান একটুখানি উঠে দাঁড়িয়ে শান্ত ভঙ্গিতে
বলল,
-অবশ্যই।
-কিন্তু এই ডিলের জন্য এখানে আরও একটি কোম্পানির সাথে মিলে কাজ করতে হবে।
-ডিলের ২০% তারা করবে, বাকি ৮০% আপনার।
-আপনি পুরো পেমেন্ট পাবেন, তবে তাদের সাথে মিলে কাজটি করতে হবে।
ফারিস কোনোভাবেই মাথা ঘামালো না।
নির্দিষ্ট ভঙ্গিতে বলল,
-সো… এখন তো আপনার সাথে আমাদের সম্পর্ক তৈরি হয়ে গেল।
-কেমন লাগছে?
রিভান হাসিমুখে হ্যান্ডশেকের জন্য হাত বাড়ালো,
-আপনার মতো মানুষের সাথে কাজ করতে পেরে নিজেকে সত্যিই ভাগ্যবান মনে হচ্ছে।
ফারিসও ধীরে ধীরে হাত বাড়িয়ে মুচকি হাসল।
-ঠিক আছে, চল শুরুর দিকে এগিয়েই যাই।
রাজীব, পাশের চেয়ার থেকে, সবটা পর্যবেক্ষণ করছিল। দম ফেলতে ভুলে গেছে—দু’জন শক্তিশালী পুরুষের মধ্যে এই একচেটিয়া মুহূর্তের টানটান শক্তি অনুভব করতে পারছিলো।
রিভান আবারও ধীরে বলল,
-এতো বড়ো ডিল সাইন হলো।
-কাল অবশ্যই পার্টি হবে।
-পার্টিটা আমি আয়োজন করবো।
-আপনার পুরো ফ্যামিলি ইনভাইটেড।
-অবশ্যই সবাইকে নিয়ে আসবেন।
ফারিস মাথা হালকা নেড়ে সম্মতি জানাল।
-ঠিক আছে, দেখা যাক কালকে সবাই কেমন সময় কাটায়।
মিটিং শেষে রিভান ধীরে ধীরে বিদায় নিল।
ঘড়ির কাঁটা ৫:৩০-এ পৌঁছালো। ফারিস ধীরে ধীরে নিজের কোট ঠিক করল এবং অফিসের বাইরে বেরিয়ে গেল, মনের মধ্যে এক অদ্ভুত আনন্দ আর সন্তুষ্টির মিশ্র অনুভূতি নিয়ে। মিটিং শেষ, ডিল সাইন সম্পন্ন। এখন শুধু বাকি আছে—পরবর্তী দিনের পার্টি এবং ফ্যামিলির মধ্যে নতুন সম্ভাবনার উদ্ভাবন।
ফারিস তার কেবিনে প্রবেশ করতেই রাজীবকে ডেকেছে।
-রাজীব, এখানে চুপচাপ আসো।
রাজীব এগিয়ে এলো। ফারিস ধীরে ধীরে বলল,
-আমি আমার অফিসে যাচ্ছি।
-ওই দিকটা এখন শুধুই নিহান সামলাচ্ছে।
-এবার আমিও সামলাবো।
-তুই দেখে নিস, এই দিকটা ঠিকঠাক চলছে কি না।
-আর কালকে আমাদের সাথে যে কাজ করবে, ওই কোম্পানির সাথে দেখা হয়ে যাবে।
-আমি এখন আমার অফিসে যাচ্ছি।
রাজীব একটু চিন্তিত হয়ে প্রশ্ন করল,
-ভাইয়া, তুমি না থাকলে তো কি করে সব সামলাবে?
-আরও একটু থেকে গেলে কি হলো না?
ফারিস ধীরে উঠে দাঁড়িয়ে রাজীবের দিকে তাকাল।
কণ্ঠে ছিলো দৃঢ়তা, চোখে আত্মবিশ্বাস।
-পারবি তুই।
-ফ্যামিলি বিজনেস যেমন আমার দায়িত্ব, তেমনি আমার নিজস্ব বিজনেসও সামলানো আমার দায়িত্ব।
এই বলে ফারিস কেবিনের দরজা ধাক্কা দিয়ে বেরিয়ে গেলো। তার পেছনে রাজীব খানিকটা অবাক হলেও, একদিকে গর্বও অনুভব করলো।
ফারিসের মধ্যে এমন এক শক্তি আছে, যা দেখলে মনে হয়—কোনো কিছুই তাকে থামাতে পারবে না।
এদিকে চৌধুরী বাড়ি ফিরে এসেছে। আফিয়া চৌধুরীর মা আগের তুলনায় অনেকটাই সুস্থ, তাই আজ তারা সবাই মিলিত হলো। আফিয়া চৌধুরী যদিও চেয়েছিলেন আর কয়েক দিন থাকবেন,
কিন্তু আরাফাত চৌধুরী জোরাজোরি করে আছেন।
কোনো ভাবেই শান্তিতে বসে থাকতে পারছিলেন না।
কারণ এত বড় ডিল সাইন হবে—যদি কোনো সমস্যা হয়! যদিও তার মন ভরসা করছে ফারিসের উপর। -ফারিস সব ঠিকঠাক সামলে নেবে। তবুও চিন্তার রেখা মুছে যায় না। সিলেটের সব কাজ মিটিয়ে আলতাফ চৌধুরীও আজ এসে পৌঁছালেন।বাড়িতে ফিরে আফিয়া চৌধুরী আর আমেনা চৌধুরী রান্নার কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে। আর আরাফাত চৌধুরী ও আলতাফ চৌধুরী বারবার জানালার দিকে তাকাচ্ছে। কারণ তারা সবাই অপেক্ষা করছে—ফারিস কখন আসবে। তাদের কানে আগেই খবর পৌঁছেছে—ডিল ফাইনাল হয়ে গেছে। এভাবেই বাড়িতে শৃঙ্খলা বজায় রাখার চেষ্টা চলছিল। ঠিক তখনই রাজীব হঠাৎ করে এসে উপস্থিত হলো।সে চুপচাপ আরাফাত চৌধুরীর পাশে বসে বলল,
-ভাইয়া, সব ঠিকঠাক সামলে নিয়েছে আব্বু।
-কালকে মি. রিভান পার্টি থ্রো করছে।
-আমরা সবাই ইনভাইটেড।
আরাফাত চৌধুরী এক চুমুক চা নিলেন, তারপর ধীরে ধীরে মাথা হেলালেন।
-হুম, শুনেছি।
-ফারিস যে যোগ্য, সেটা সবসময় প্রমাণ করেছে।
-আর আমি বাবা হিসেবে গর্বিত তার জন্য।
তার চোখে ভরপুর ভালোবাসা আর গর্ব।
-নিজের ব্যবসাকে যতটা প্রাধান্য দিচ্ছে, এই কোম্পানিতেও ততটাই মনোযোগ দিচ্ছে।
-আমি মনে করি, ভবিষ্যতে ও এই কোম্পানির পুরো মালিক হবে।
-ওর উপর ভরসা আছে। এই বয়সে যেখানে পৌঁছেছে, আমি সেই বয়সে এসেও পৌঁছাতে পারিনি।
প্রত্যেক কথাতেই তার বুক গর্বে ভরে উঠছে।
চোখে আনন্দ, মুখে সন্তুষ্টি—পুরো রুমে যেন একটি অদৃশ্য গর্বের আবহ তৈরি হলো। এরপর তারা আরাফাত চৌধুরীর অভিজ্ঞতা, ব্যবসার দিকনির্দেশনা, ফারিসের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা—সব নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা শুরু করল।
দেখতে দেখতে ৭:৩০ বেজে গেছে।
ফারিস ধীরে ধীরে তার মার্সিডিজ গাড়ি চৌধুরী ভিলার সামনে থামাল। সারাদিনের ব্যস্ততা আর ক্লান্তিটা এখনো শরীরের মধ্যে লেগে আছে, কিন্তু মনের মধ্যে একটা তৃপ্তি ও শান্তি ভরেছে।
গাড়ির দরজা খুলে নেমে সে ধীরে ধীরে বাড়ির ভিতরে প্রবেশ করলো। প্রবেশ করার সঙ্গে সঙ্গে আরাফাত চৌধুরী এগিয়ে এসে ফারিসকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরলেন,
-Congratulations, my boy! You did it।
ফারিস কেবল মুচকি হাসল এবং ধীর কণ্ঠে বলল,
-Thank you।
ফারিস জানে, এর থেকে বেশি কিছু বলার দরকার নেই। আরাফাত চৌধুরীর চোখে গর্ব, মুখে সন্তুষ্টি—সবই তার জন্য যথেষ্ট। আরাফাত চৌধুরী একটু হেসে বললেন,
-তোমার জন্য এই ডিল হয়তো নরমাল, কিন্তু আমাদের জন্য এটা অনেক বড়। আমি জানতাম তুমি পারবে।
ঠিক তখন আলতাফ চৌধুরী এগিয়ে এসে ফারিসের হাত ধরে বললেন,
-Congratulations।
ফারিস আবারও মুচকি হাসল। কিন্তু এই আনন্দের মাঝেও তার চোখ যেন খুঁজছে কাউকে। বাড়ির চারপাশে সবাই আছে, কিন্তু যাকে সে খুঁজছে,
তাকে দেখতে পাচ্ছে না। ফারিস ধীরে ধীরে বলল,
-ওকে তোমরা কথা বলো, আমি একটু রেস্ট নিচ্ছি। আজ অনেক ক্লান্ত।
এই বলে ফারিস ধীরে ধীরে উপরে চলে গেলো।
উপরে ওঠার পর সে একবার নিশিতার রুমের দিকে তাকালো। চোখে হালকা মুচকি হাসি।
আজ নিশিতা সারাদিন রুমের মধ্যে থেকে বের হয়নি। সকালে পড়াশোশান্তনা শুরু করেছিল, কিন্তু পড়তে পড়তে দু’বারই বিরতিতে উঠে গেছে।
প্রথমে টেবিল থেকে উঠে গিয়ে সাওয়ার নিতে চলে গিয়েছে। সাওয়ার শেষে ড্রেস পরে চুল শুকিয়ে আবারও পড়াশোনায় মন দিয়েছিল। বিকালের দিকে সে ছাদে গিয়ে ফুলের গাছগুলোকে পানি দিয়েছিল, তারপর নিচে এসে ঘুমিয়ে পড়েছিল।
চোখের আড়ালে ভালোবাসি পর্ব ৩৫
এখনো নিশিতার গভীর ঘুম ভাঙেনি।
ফারিস তার রুমের দরজা বন্ধ করে বসলো। চোখগুলো ভেতরের নিঃশব্দ ঘরটায়। মনে মনে ভেবেছিল—আজ সারাদিনের ব্যস্ততার পরও, সে শুধু নিশিতাকে খুঁজে পেতে চাচ্ছে। একটা হালকা হাসি মুখে এসে গেল, যেন ঘুমন্ত নিশিতার অদ্ভুত শান্তি তাকে করছে।
