চোখের আড়ালে ভালোবাসি পর্ব ৪২
আয়াত বিনতে নূর
এদিকে নিশিতাদের গাড়িটা ঢাকার বসুন্ধরা শপিং মলের সামনে এসে ধীরে থামলো। সারা রাস্তা জুড়ে চারজনের হাসি–ঠাট্টা, গল্প আর নানান গুজবে সময়টা কখন যে কেটে গেছে, কেউ টেরই পায়নি।
এই অল্প সময়েই তনয়ার মনটা অনেকটা হালকা হয়ে গেছে।
অতীতকে ভুলে যাওয়া সহজ নয়—কিন্তু অসম্ভবও না। তনয়াও নিজের মতো করে চেষ্টা করছে।
সে জানে, সুন্দর একটা জীবন এখনো তার জন্য অপেক্ষা করছে। অতীতের কষ্টগুলো বুকে জমে থাকলেও, সে ধীরে ধীরে সামনে এগোতে চাইছে।
আসলে তনয়া খুবই স্ট্রং একটা মেয়ে।
নাহলে এতকিছুর পরেও নিজেকে এত সুন্দরভাবে সামলে রাখা কি আর সবার পক্ষে সম্ভব?
গাড়ি থেকে একে একে নেমে এলো চারজন নিশিতা, রিয়া, অহনা আর তনয়া।
নিশিতা গাড়িতে বসে থাকা রাজুর দিকে তাকিয়ে হালকা হেসে বললো,
“আঙ্কেল, আপনি না হয় কোনো দোকানে গিয়ে বসুন, অথবা শপিং মলের ভেতর কোথাও আরাম করে বসে থাকুন। আমরা শপিং শেষ করে আপনাকে কল দেবো। আর যা বিল হবে, পরে আপনাকে দিয়ে দেবো।”
রাজু কোনো কথা না বলে শুধু মাথা নাড়ালো।
তারপর গাড়িটা পার্ক করার জন্য নিয়ে চলে গেলো।
আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন
চারজন আর কোনো কথা বাড়ালো না। একসাথে শপিং মলের ভেতরে ঢুকে পড়লো। মলের ভেতরে প্রচণ্ড ভিড়, চারদিকে মানুষের কোলাহল। তবুও নিশিতাদের কাছে সবকিছু কেমন যেন শান্ত লাগছে। আলো ঝলমলে দোকান, রঙিন সাজসজ্জা সব মিলিয়ে একটা অন্যরকম আবহ।
নিশিতা এক মুহূর্তও দেরি না করে বললো,
“চল, আগে ড্রেস দেখি।”
আর কোনো দ্বিধা না করে চারজন একসাথেই ড্রেস সেকশনের দিকে এগিয়ে গেল। আজকের শপিং শুধু কাপড় কেনা নয় আজকের শপিং যেন চারজনের মন হালকা করার একটা অজুহাত।
সবাই যার যার মতো আলাদা হয়ে গেল।
নিজের পছন্দের জিনিস খুঁজতে শপিংয়ে মেতে উঠলো প্রত্যেকে। তনয়া একটু সাইডে গিয়ে লং টপসগুলো দেখছিল। একটার পর একটা টপস হাতে নিয়ে আয়নার সামনে ধরে দেখছে কোনোটায় চোখ আটকে যাচ্ছে, আবার কোনোটায় মন ভরছে না।
আর অন্যদিকে নিশিতা, রিয়া আর অহনা আগেই ঠিক করে নিয়েছে আজ তারা শাড়িতেই পার্টিতে যাবে। তাই তিনজন একসাথে পার্টির জন্য গর্জিয়াস শাড়ি দেখতে শুরু করলো। একটার পর একটা শাড়ি দেখছে নিশিতা, কিন্তু অদ্ভুতভাবে কোনোটাই তার মন ছুঁয়ে যাচ্ছে না।
ঠিক তখনই হঠাৎ করে একটা খয়েরী রঙের শাড়ির দিকে চোখ আটকে গেল নিশিতার।
এক মুহূর্ত দেরি না করে প্রায় দৌড়েই গিয়ে শাড়িটা হাতে তুলে নিল।
রিয়া আর অহনা তখন অন্য শাড়ি দেখায় এতটাই ব্যস্ত ছিল যে, নিশিতার এই আচরণ তাদের চোখেই পড়েনি। নিশিতা শাড়িটা নিয়ে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে গায়ে ধরলো। নিজের প্রতিবিম্বের দিকে তাকিয়ে নিজেই বলে উঠলো,
“নাহ নিশি… তোকে খুব একটা খারাপ লাগছে না।
এটাই নেওয়া যাক।”
এরপর হঠাৎ করেই প্রায় চিৎকার করে ডেকে উঠলো
“রিয়া… অহনা …”
নিশিতার এমন চিৎকার শুনে দু’জনই সবকিছু ফেলে রেখে দৌড়ে এলো। রিয়া আর অহনা দু’জনই একটু চিন্তিত হয়ে বলল,
“কি হয়েছে নিশি? এভাবে চিল্লাচ্ছিস কেন?”
নিশিতা একটু বিব্রত হয়ে হেসে বলল,
“না… মানে…
দেখতো এই শাড়িটা আমার উপর কেমন লাগছে?”
এই কথা শুনে রিয়া আর অহনা যেন আকাশ থেকে পড়লো। রিয়া চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে রইলো নিশিতার দিকে। ওই দৃষ্টিতে নিশিতা ছোট্ট একটা ঢোক গিললো। পরমুহূর্তেই রিয়া রেগে গিয়ে নিশিতার মাথায় আলতো করে একটা গাট্টা দিয়ে বলল,
“গাধী! তোর মাথায় কি একটু বুদ্ধি হবে না নাকি?
আমরা ভাবলাম না জানি কি হয়েছে, তাই সব ফেলে দৌড়ে আসলাম। আর তুই এখানে শাড়ি চুজ করানোর ডাকছিস!”
নিশিতা কী বলবে বুঝে উঠতে পারলো না।
মনে হলো, সত্যিই হয়তো ওদের একটু বেশি চিন্তায় ফেলে দিয়েছে। একটু আমতা আমতা করে বলল,
“সরি জানরা… আর করবো না। যা, তোরা যা নেওয়ার নিয়ে নে। বাড়িও ফিরতে হবে, তিনটা বাজতে চললো…”
রিয়া আর অহনা হেসে বলল,
“চল, আমাদের তো হয়ে গেছে। আমি আর অহনা এই পারপেল রঙের শাড়িটা নিয়েছি। দু’জন একসাথে ম্যাচিং করে পরবো।আর তনয়া আপু মনে হয় এখনো টপস সেকশনে আছে।
চল, ডেকে নিয়ে আসি।”
হঠাৎ অহনা একটু চিন্তিত হয়ে বলল
“সব ঠিক আছে, কিন্তু তোদের মনে হয় না গাড়িগুলো একটু বেশিই দাম নিচ্ছে? মানে ৩১ হাজার টাকা তো কম না…”
রিয়া কিছু বলার আগেই নিশিতা হালকা হাসি দিয়ে বলল,
“নাহ মেডাম, ঠিক আছে। আপনাকে এত চিন্তা করতে হবে না।”
অহনা আর কিছু বলল না। কারণ সে জানে—এই অঙ্কটা নিশিতাদের কাছে খুবই সামান্য।
রিয়া বলল,
“আচ্ছা চল এবার। তনয়া আপুকেও নিয়ে আগে বিল মিটাই, তারপর ম্যাচিং জুতাও কিনতে হবে।”
নিশিতা মাথা নাড়ালো সম্মতির ভঙ্গিতে। এরপর তিনজন মিলে তনয়াকে খুঁজতে বেরিয়ে পড়লো।
এদিকে ঘটনার স্রোতে ফারিসও শপিং করার উদ্দেশ্যে বসুন্ধরা শপিং মলে এসে পৌঁছালো।
পার্কিং লটে গাড়িটা সুন্দরভাবে পার্ক করে সে রাজীবের জন্য অপেক্ষা করতে লাগলো।
কিছুক্ষণ আগেই রাজীবকে কল দিয়েছিল ফারিস।
রাজীব জানায় আর মাত্র পাঁচ মিনিট লাগবে।
তাই ফারিস গাড়ি পার্ক করেই বাইরে দাঁড়িয়ে রইলো। মনের অস্থিরতা এখনো কাটেনি তার।
চারপাশে মানুষজনের আনাগোনা, গাড়ির শব্দ সব মিলিয়ে এক ধরনের ব্যস্ততা। কিন্তু ফারিসের মাথার ভেতর যেন অন্য কিছুই চলছে।
কিছুক্ষণ পর দূরে রাজীবের গাড়িটা এসে থামলো।
গাড়িটা পার্কিং স্পটে রেখে রাজীব গাড়ি থেকে নেমে সরাসরি ফারিসের দিকে এগিয়ে এলো।
ফারিস তাকে দেখেই স্বাভাবিক কণ্ঠে বলল,
“এতো লেট করলি কেন?”
রাজীব একটু থমকে গেল। মনে মনে ভাবলো,
এতোটাও তো দেরি করিনি! … কিন্তু সেটা মুখে না এনে শান্ত গলায় বলল,
“আসলে রাস্তায় ট্রাফিক জ্যাম ছিল ভাইয়া,
তাই একটু লেট হলো আরকি।”
এক মুহূর্ত থেমে আবার বলতে শুরু করলো,
“চলো, শপিং মলের ভেতরে যাই।”
ফারিস কোনো কথা না বলে শুধু মাথা নাড়ালো।
তারপর দু’জন পাশাপাশি হেঁটে বসুন্ধরা শপিং মলের ভেতরে ঢুকে পড়লো। ভেতরে ঢুকতেই আলোর ঝলকানি, মানুষের কোলাহল, দোকানের সাজ, সব মিলিয়ে এক আলাদা জগত।
আর ঠিক এই শপিং মলের ভেতরেই
এক অদেখা মুহূর্ত অপেক্ষা করছিল
ফারিসের জন্য…?
এদিকে নিশিতারা ড্রেসের বিল মিটিয়ে
এরপর জুতা কেনার উদ্দেশ্যে অন্য সেকশনে চলে গেল। ঠিক একই সময়ে ফারিস শপিং মলে ঢুকেই সোজা শাড়ির সেকশনে গিয়ে দাঁড়ালো।
রাজীবকে হালকা স্বরে বলল,
“বাড়ির সবার জন্য যা যা দরকার, তুই দেখে নিয়ে নে।”
রাজীব আর কিছু না বলে মাথা নাড়ালো।
তারপর একাই একেকটা শাড়ি, ড্রেস, উপহার দেখতে শুরু করলো। আর ফারিস? সে একটা চেয়ার টেনে আরামে বসে পড়লো। পকেট থেকে ফোন বের করে অন্যমনস্কভাবে স্ক্রল করতে লাগলো।
রাজীবের অবস্থা তখন একেবারে করুণ।
এক হাতে শাড়ি, আরেক হাতে ব্যাগ, কাকে কী মানাবে, কে কী পছন্দ করবে, সব ভেবে মাথা ঝিমঝিম করছে। শেষমেশ আর না পেরে ফোন বের করে সোজা আফিয়া চৌধুরীর নাম্বারে কল দিল।
ওপাশে তখন আফিয়া চৌধুরী বিশ্রামে ছিলেন।
হঠাৎ ফোন বেজে উঠতেই ফোনের দিকে তাকালেন। রাজীবের নাম দেখে মুচকি হাসি খেললো ঠোঁটে। ফোনটা রিসিভ করলেন।
আফিয়া চৌধুরী কিছু বলার আগেই
রাজীব এক নিঃশ্বাসে বলে উঠলো,
“আম্মু, তোমার বড় ছেলে আমাকে শপিংয়ে এনে
নিজে আরামে বসে ফোন স্ক্রল করছে।
আমি বুঝতেই পারছি না কী নেবো আর কী নেবো না!”
ছেলের কথা শুনে আফিয়া চৌধুরী হালকা হেসে বললেন,
“তোর যা পছন্দ, তুই তাই নিয়ে আয় বাবা।
তোরা যা কিনবি, তাতেই হবে। আর তোর পছন্দের উপর আমার ভরসা আছে।”
এইটুকু বলেই কল কেটে দিলেন। রাজীব ফোনটা নামিয়ে একটু হালকা নিঃশ্বাস ছাড়লো।
মনে মনে ভাবলো,
আমার পছন্দ এতোটাও খারাপ না… সবার জন্য মোটামুটি ভালো কিছু তো নিতে পারবো।
এই ভেবে আবার মনোযোগ দিয়ে শাড়ি বাছাই করতে শুরু করলো।
এদিকে ফারিস অনেকক্ষণ ফোন স্ক্রল করে বিরক্ত হয়ে ফোনটা আবার পকেটে ঢুকিয়ে রাখলো।
ঠিক তখনই, হঠাৎ তার চোখ আটকে গেল
সামনে রাখা একটা কালো, গর্জিয়াস শাড়ির দিকে।
শাড়িটার দিকে তাকিয়েই মনে হলো যেন চোখের সামনে কালো শাড়ি পরা নিশিতা দাঁড়িয়ে আছে।
ফারিসের চোখ দুটো মুহূর্তে জ্বলজ্বল করে উঠলো।
বুকের ভেতর কোথাও যেন হালকা একটা কাঁপুনি বয়ে গেল। আর এক মুহূর্তও দেরি না করে
সে উঠে দাঁড়ালো। শাড়িটা হাতে তুলে নিয়ে
দৃঢ় কণ্ঠে বলল,
“এইটা প্যাক করে দিন।”
এদিকে রাজীব খুব যত্ন করে বাড়ির সবার জন্য বেছে বেছে ভালো জিনিসগুলোই নিয়েছে।
সব প্যাকিং করার জন্য দিয়ে এখন বিল কাউন্টারের সামনে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছে।
এরপর ফারিসের কাছে এসে স্বাভাবিক গলায় বলল,
“ভাইয়া, সবার জন্য সব কিছু নেওয়া হয়ে গেছে।
আর একটু ওয়েট করো, প্যাকিং করেই দিয়ে যাবে।”
ফারিস তার স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গিতে চোখ না তুলে ছোট করে শুধু বলল,
“হুম।”
ওদিকে নিশিতাদের অবস্থা একেবারে আলাদা।
চারজন মিলে এমন শপিং করেছে যেন সত্যিই আজ পুরো শপিং মলটাই তুলে এনেছে।প্রত্যেকের হাতেই কম করে দশ–বারোটা করে ব্যাগ।
হাতে আর নতুন করে কিছু ধরার জায়গা নেই।
শপিং শেষ করে নিশিতা ক্রেডিট কার্ডটা বাড়িয়ে দিয়ে পেমেন্ট মিটিয়ে লেডিস সেকশন থেকে বের হয়ে এল।
এক জায়গায় দাঁড়িয়ে হালকা হাঁফ ছেড়ে বলল,
“ফাইনালি শপিং ডান। এবার বাড়ি চল, না হলে দেরি হয়ে যাবে।”
তনয়া ক্লান্ত গলায় হেসে বলল,
“সত্যি, আজকের দিনটা বেশ ভালোই গেল।
এখন শুধু বাড়ি গিয়ে একটু রেস্ট দরকার।
ভীষণ টায়ার্ড লাগছে।”
এই কথাগুলোর মাঝেই নিশিতা অহনা, রিয়া আর তনয়াকে একটু পিছনে রেখে অজান্তেই কয়েক কদম সামনে এগিয়ে গেল।
আর ঠিক তখনই, হঠাৎ সামনে তাকিয়ে সে সেই চেনা মুখটা দেখে ফেললো। নিশিতার বুকের ভেতরটা মুহূর্তে কেঁপে উঠলো।
খুশি? না একদমই না। বরং অদ্ভুত একটা অনুভূতি
ভেতর থেকে ধাক্কা দিয়ে বেরিয়ে আসতে চাইলো—
কিছুটা ভয়, আর কিছুটা জমে থাকা রাগ। সামনে আর কেউ নেই। শুধু নাভিদ দাঁড়িয়ে আছে।
নিশিতাকে দেখেই নাভিদ প্রায় দৌড়েই তার দিকে এগিয়ে এল।
হয়তো সে ভেবেছে আজ নিশিতা একা।
এই সুযোগটা আর হাতছাড়া করা যাবে না।
নিশিতা কিছু বলল না। একদম চুপ করে রইলো।
শুধু একবার চারপাশে তাকালো। রিয়া, অহনা, তনয়া কাউকেই চোখে পড়ছে না।
মনের ভেতরে একটা অজানা আশঙ্কা ধীরে ধীরে বাসা বাঁধছে। হৃদপিণ্ডটা অকারণে দ্রুত স্পন্দন শুরু করলো। নাভিদ ঠিক তার সামনে এসে দাঁড়ালো। আর নিশিতা বুঝে গেল এই মুহূর্তটা কিছু একটা ঘটার আগের নিঃশব্দ সময়।
এর মাঝেই হঠাৎ করে নাভিদ নরম অথচ চাপা উত্তেজনায় ভরা কণ্ঠে বলে উঠলো,
“কি রে নিশি কেমন আছিস?”
কথাটা বলার সময় তার চোখে ছিল বহুদিন জমে থাকা একরাশ অস্থিরতা।
“অনেকদিন পর তোকে দেখলাম। জানিস, তোর ওই ভাইয়ের জন্য আমাকে কলেজ পর্যন্ত চেঞ্জ করতে হয়েছে।”
একটু থেমে যেন নিজের কষ্টটা জাহির করলো সে।
“নাহলে বিশ্বাস কর, তোকে ছেড়ে যাওয়ার কোনো ইচ্ছে আমার কখনোই ছিল না।”
কণ্ঠটা আরও নিচু হয়ে এলো।
“আমি তোকে এখনও ভালোবাসি নিশি…”
এই কথাটা শেষ হতেই নিশিতার ভেতরের সব জমে থাকা রাগ এক মুহূর্তে বিস্ফোরিত হলো।
সে হঠাৎ চিৎকার করে উঠলো,
“সাট আপ! জাস্ট সাট আপ নাভিদ!”
চারপাশের মানুষজন ঘুরে তাকানোর আগেই
নিশিতা ঝাঁঝালো কণ্ঠে বলে উঠলো,
“তোর কি একটুও লজ্জা হয় না?”“ওই দিন ফারিস ভাইয়ের কাছে এতো মার খাওয়ার পর,এতো অপমানিত হওয়ার পরও আমাকে দেখে দৌড়ে এসে বলছিস তুই আমাকে ভালোবাসিস?”
কথাগুলো বলতে বলতে নিশিতার চোখে রাগের আগুন জ্বলছিল। সে তাচ্ছিল্যের হাসি দিয়ে বলল,
“সিরিয়াসলি? তোর কি এতোটুকুও লজ্জা নেই নাভিদ?”
নাভিদের মুখটা মুহূর্তেই ছোট হয়ে গেল। চোখের দৃষ্টি নিচে নামিয়ে আনলো সে। তারপর অদ্ভুত এক হাসি হেসে বলল,
“তোকে ভালোবেসে আমি একদম নির্লজ্জ হয়ে গেছি নিশি।”
কণ্ঠে ছিল জেদের সঙ্গে অসহায়ত্বের মিশ্রণ।
“বিশ্বাস কর, তোর সামনে মাথা ঝোকাতেও আমার কোনো দ্বিধা নেই।”
একটু থেমে আবার বলল,
“কিন্তু আমাকে এভাবে ফিরিয়ে দিস না।”
“আচ্ছা… আমি তো তোর কাছে ভালোবাসা চাইনি।”
কণ্ঠটা এবার প্রায় মিনতির মতো শোনালো।
“শুধু চাই—আমাদের আগের বন্ধুত্বটা অন্তত ঠিক থাকুক।”
এই কথাটা নিশিতার সহ্যের শেষ সীমাটুকুও পার করে দিল। সে রাগে যেন ফেটে পড়লো।
চোখে চোখ রেখে একেবারে সোজাসাপ্টা বলল,
“তুই আমার এমন কেউ না,
যার সাথে আমার বন্ধুত্ব রাখার কোনো দরকার আছে।”
একটু দম নিয়ে আবার বলল,
“আমি তোকে আগেও নিষেধ করেছি আমার সাথে মিশবি না।”“তাহলে বারবার কেন আমার পেছনে ছুটে আসিস?”
তার কণ্ঠ এবার আরও শক্ত হয়ে উঠলো,
“দেখ, লাস্ট বারের মতো বলছি আর কখনো আমার সামনে আসবি না।”
এক মুহূর্ত থেমে, চাপা কষ্টে বলল,
“তোর জন্য আমার জীবনে অনেক কিছু ঘটে গেছে নাভিদ।” “আর কোনো ঝামেলা আমি চাই না।”
এই সময়েই রিয়া, অহনা আর তনয়া দ্রুত এগিয়ে এলো। এসে তারা যা দেখলো, তা তারা একদমই আশা করেনি। অহনা অবাক হয়ে ফিসফিস করে বলল,
“ওটা নাভিদ না?” “ও এখানে কী করছে?”
রিয়া অস্বস্তিতে একটা শুকনো ঢোক গিলে বলল,
“আমরা তো কাউকে কিছু বলেই আসিনি।”
“তারপরও এই উটকো ঝামেলাটা আবার কোথা থেকে এলো?”
কণ্ঠে ভয় স্পষ্ট হয়ে উঠলো,
“আর বাই এনি চান্স যদি ভাইয়া এখানে থাকে…”
“তাহলে আজকে আমরা পুরো শেষ।”
তনয়া ওদের কথার কিছুই ঠিকমতো বুঝতে পারছিল না। সে চুপ করে রইলো কিছুক্ষণ। তারপর বিভ্রান্ত গলায় বলল,
“কি হয়েছে?” “খুলে বল তো। আমি কিছুই বুঝতে পারছি না।”
নাভিদের দিকে তাকিয়ে আবার প্রশ্ন করলো,
“এই ছেলেটাই বা কে?” “আর ফারিস কেন রাগ করবে?”
রিয়া আর অহনা একে অপরের দিকে তাকালো।
কোনো উত্তর তাদের মাথায় এলো না।
কি বলবে, কীভাবে বলবে, কিছুই বুঝে উঠতে পারলো না তারা।অহনা চাপা গলায় আবার বলল,
“নিশিতাকে দেখে বোঝা যাচ্ছে ও খুব রেগে আছে।”
“এখন কী হবে?”
তারপর সিদ্ধান্তের সুরে বলল,
“চল, তাড়াতাড়ি গিয়ে দেখি আসলে কী হচ্ছে।”
আর ঠিক এই মুহূর্তেই পরিস্থিতি আরও ভয়ংকর দিকে মোড় নিতে চলেছে।এর মাঝেই হঠাৎ করেই যেন বজ্রপাতের মতোরাজীব এসে সামনে হাজির হলো। রাজীবকে চোখের সামনে দেখামাত্র
রিয়া আর অহনা ঠিক যেন ভূত দেখেছে, দুজনেই একসাথে চমকে উঠলো।
মুহূর্তের মধ্যেই তাদের মুখের হাসি উধাও হৃদপিণ্ডটা জানো এক লাফে গলায় উঠে এলো।
কি করবে, কী বলবে এক মুহূর্তের জন্য কিছুই বুঝে উঠতে পারলো না।
রাজীব এক নজরে রিয়া, অহনা আর তনয়াকে একসাথে দেখে প্রচন্ড রকম অবাক হয়ে গেলো।
অহনাকে দেখে তার চোখে একফোঁটা খুশির ঝিলিক জ্বললেও সেই খুশি মুহূর্তেই চাপা পড়ে গেল বিস্ময় আর রাগের নিচে।
কণ্ঠটা শক্ত করে রাজীব বলল,
“তোরা এখানে কি করছিস রিয়া?”
রিয়ার বুক কেঁপে উঠলো। সে মাথা নিচু করে ফেললো। কি-ই বা বলবে? এতোবার নিষেধ করার পরও যে শপিং করতে এসেছে, এই কথার কোনো যুক্তি তার কাছে নেই।
রাজীব এবার কণ্ঠটা আরও ভারী করে বলল,
“ভাইয়া তোদের শপিংয়ে আসতে নিষেধ করেছিল না?”
একটু থেমে চোখে চোখ রেখে প্রশ্ন ছুঁড়ে দিল,
“তাহলে কেন এসেছিস? হ্যাঁ?”
তার কণ্ঠে রাগের সাথে দায়িত্ববোধও স্পষ্ট।
“ভাইয়া তো এখন আমার সাথেই আছে।” “আমি এখন তাকে কি উত্তর দেবো বল?”
এই প্রশ্নটা যেন তিনজনের ওপর একসাথে আছড়ে পড়লো। তনয়া, অহনা আর রিয়া, তিনজনেই মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইলো। কারও মুখ দিয়ে কোনো শব্দ বের হচ্ছিল না।
কিছুক্ষণ পর সাহস সঞ্চয় করে তনয়া ধীরে বলল,
“আমি জানতাম না ভাইয়া নিষেধ করেছে।”
কণ্ঠে ছিল সরলতা আর অনিচ্ছাকৃত অপরাধবোধ।
“জানলে আমি আসতাম না।”
রাজীব তৎক্ষণাৎ বলল,
“তুই না জানলেও রিয়া আর নিশি তো জানতো।”
তার চোখ এবার খুঁজতে লাগলো।
“নিশি কোথায়?”
এই একটা প্রশ্ন শুনেই রিয়ার মাথার ওপর যেন আকাশ ভেঙে পড়লো। তার বুক ধড়াস করে উঠলো।নাভিদের সাথে নিশিতাকে যদি ফারিস দেখে ফেলে, কি হবে, সেটা ভাবতেই তার শরীর শিউরে উঠলো।
অহনার ভেতরেও তখন ঝড়। সে মনে মনে অসহায়ের মতো দোয়া করলো,
“আল্লাহ… আজকে আমার নিশুকে বাঁচিয়ে নিও।”
“ওই ছেলেটার জন্যই তো সবসময় আমার নিশু ফেসে যায়।”
রিয়া তাড়াহুড়ো করে প্রায় কেঁদে ফেলার মতো গলায় বলল,
“ভাইয়া কোথায়?” “ভাইয়া যেন এদিকে না আসে ভাইয়া তুমি প্লিজ একটু দেখো।”
রাজীব অবাক হয়ে তাকালো।
“কেন?”
তার কণ্ঠে এবার তিরস্কার।
“এসব করার আগে তোদের মনে ছিল না?”
একটু থেমে কঠিনভাবে বলল,
“এখন ভাইয়া আসুক, তারপর তোদের সবাইকে দেখবে।”
রিয়ার চোখে পানি চলে এলো। সে প্রায় মিনতির সুরে বলল,
“না ভাইয়া… প্লিজ।” “এইবারের মতো আমাদের ক্ষমা করে দাও।”
কণ্ঠ কাঁপতে কাঁপতে সে বলল,
“নিশিতা আমাদের সাথেই এসেছে।” “আর ওখানে নাভিদের সাথে রাগারাগি হচ্ছে।”
একটু থেমে ভয় নিয়ে,
“ভাইয়া দেখলে আবার বড় সমস্যা হবে।” “তুমি কিছু একটা করো, ভাইয়াকে আটকাও প্লিজ।”
এই কথাগুলো শুনেই রাজীবের চোখের রাগটা ধীরে ধীরে মিলিয়ে গেল। সে পিছনে ঘুরে তাকালো।
দূরে নিশিতাকে নাভিদের সাথে তর্ক করতে দেখে
হঠাৎ করেই সেই দিনের ভয়ংকর স্মৃতিগুলো
তার চোখের সামনে ভেসে উঠলো। এক মুহূর্তে রাজীব বুঝে গেল এই পরিস্থিতি আর বাড়লে
সবকিছু আবার হাতের বাইরে চলে যাবে।
গম্ভীর অথচ দ্রুত সিদ্ধান্ত নিয়ে বলল,
“আমি ভাইয়াকে আটকাচ্ছি।” “তোরা তাড়াতাড়ি গিয়ে নিশিকে নিয়ে আয়।”
কণ্ঠটা এবার কড়া,
“আমি আর কোনো সিনক্রিয়েট চাই না।”
রিয়া আর অহনা দ্রুত মাথা নাড়ালো। এক মুহূর্তও দেরি না করে তারা সামনে এগিয়ে গেল।
এদিকে তনয়া পুরো ব্যাপারটাই ঠিকমতো বুঝতে পারলো না। তার কাছে সবকিছু যেন হঠাৎ করেই খুব জটিল হয়ে গেছে। সে চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলো।
চোখ বড় বড় করে যা ঘটছে, শুধু তাই দেখছিলো।
আর ঠিক তখনই দূর ফারিসের উপস্থিতির আশঙ্কা
পরিস্থিতিকে আরও ভয়ংকর করে তুলতে চলেছে।
এতক্ষণ ধরে যা কিছু ঘটছিল সবটাই ফারিস দূর থেকে দাঁড়িয়ে দেখছিল। সে নিজেকে সামলানোর আপ্রাণ চেষ্টা করছিল। বারবার মনে মনে বলছিল—
কন্ট্রোল, ফারিস… কন্ট্রোল। কিন্তু রাগের তাপে তার চোখ দুটো যেন আগুন হয়ে জ্বলছিল। চোখের শিরা-উপশিরাগুলো ফুলে উঠেছে, মুখের গড়ন শক্ত হয়ে পাথরের মতো হয়ে গেছে।
হাতের পেশিগুলো এমনভাবে টানটান হয়ে উঠেছে
যেন আর এক সেকেন্ড পরেই কাপড় ছিঁড়ে বেরিয়ে আসবে। দু’হাত শক্ত করে মুঠিবদ্ধ। নখগুলো তালুতে গেঁথে যাচ্ছে তবুও সে কিছু টের পাচ্ছে না।
তার চোখ দুটো এক মুহূর্তের জন্যও সরেনি।
একদম স্থির নিশিতার দিকেই তাকিয়ে আছে।
নাভিদের উপস্থিতি, নিশিতার রাগে কাঁপা মুখ,
ওদের মধ্যেকার দূরত্ব সবকিছু একসাথে ফারিসের ভেতর আগুন ধরিয়ে দিয়েছে। আর পারলো না।
এইবার আর নিজেকে কন্ট্রোল করা সম্ভব হলো না।
হঠাৎ করেই ফারিস তেড়ে গেলো নাভিদের দিকে যেন বহুদিনের জমে থাকা রাগ এই এক মুহূর্তেই বিস্ফোরিত হতে চায়।
রাজীব পিছনে তাকিয়ে ফারিসকে আসতে দেখে
একদম ঘাবড়ে গেলো। তার বুকের ভেতরটা ধক করে উঠলো।
এই মুহূর্তে পরিস্থিতি কোন দিকে যাবে সে নিজেও বুঝে উঠতে পারলো না। রাজীব তাড়াতাড়ি কিছু বলতে গিয়ে ফারিসের সামনে এগোতেই ফারিস এক হাত তুলে তাকে থামিয়ে দিলো।
চোখে চোখ রেখে ঠাণ্ডা কিন্তু ভয়ংকর কণ্ঠে বলল,
“একটা কথাও শুনতে চাই না আমি।”
এই কণ্ঠে এমন একটা হুমকি ছিল যা শুনেই বোঝা যায় আর একটাও কথা বললে পরিস্থিতি আরও খারাপ হবে। হঠাৎ করে ফারিসকে সামনে দেখে
অহনা আর রিয়া ভয়েই গুটিশুটি মেরে দাঁড়িয়ে রইলো। ওদের মুখে রক্ত চলাচল বন্ধ হয়ে গেছে।
হাত-পা ঠান্ডা হয়ে আসছে।
রিয়া ফিসফিস করে বলল,
“যেটার ভয় পাচ্ছিলাম সেটাই হলো, অহনা।”
কণ্ঠ কাঁপছে।
“এখন নিশুর কি হবে?” “ওকে কে বাঁচাবে?”
একটু থেমে নিঃশ্বাস আটকে বলল,
“আজকে নিশু শেষ।”
এই কথাটা শুনেই অহনার বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠলো। সে দাঁত চেপে ধরে ফিসফিস করে বলল,
“চুপ কর তুই, রিয়া।” “এমনিতেই আমি চিন্তায় শেষ হয়ে যাচ্ছি।” “তুই আবার এসব বলছিস কেন?”
রিয়ার মুখ বন্ধ হয়ে গেলো। সে আর কিছু বলল না।
শুধু চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে রইলো নিশিতার দিকে, ফারিসের দিকে, আর আসন্ন বিপদের দিকে।
এই মুহূর্তে পুরো শপিং মলের কোলাহলের মাঝেও
এই জায়গাটুকু যেন নিঃশব্দ হয়ে গেছে। কারণ
এখন যা ঘটবে তা আর কেউ থামাতে পারবে না।
ফারিস আর এক সেকেন্ডও দেরি করলো না।
সে ঝাঁপিয়ে পড়লো নাভিদের দিকে।
গিয়ে এক ঝটকায় নাভিদের শার্টের কলার মুঠোয় চেপে ধরলো। চোখে চোখ রেখে দাঁত কামড়ে গর্জে উঠলো,
“বাস্টার্ড! তোকে আমি কতবার বলেছি নিশির থেকে দূরে থাকবি!” “ওর ধারে-কাছেও যাবি না।”
কণ্ঠে বিষ। “তুই নিজেই তোর মৃত্যু ডেকে এনেছিস।”
একটু ঝুঁকে ফিসফিস করে বলল,
“এইবার তুই মরবি।” “অনেক সুযোগ দিয়েছি তোকে… কিন্তু তুই সুযোগের যোগ্যই না।”
হঠাৎ করে ফারিসকে সামনে দেখে নিশিতার হাত থেকে সব শপিং ব্যাগ একসাথে ফ্লোরে ছড়িয়ে পড়লো। নিশিতা হা করে তাকিয়ে রইলো।মুখ খুলে কোনো শব্দ বের হলো না। ভাষা হারিয়ে ফেলেছে সে। এভাবে এই জায়গায়এই মুহূর্তে ফারিসকে দেখবে, নিশিতা কখনো কল্পনাও করেনি। সে বাকরুদ্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো। কথা বলাই যেন ভুলে গেছে। আর নাভিদ এই অতর্কিত আক্রমণে নিজেকে সামলাতে পারলো না।
ফারিস এখানে থাকবে এই ভাবনাটাও নাভিদের মাথায় কখনো আসেনি। ফারিস এক ঝটকায় নাভিদকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিলো।
ঠাণ্ডা কিন্তু হিংস্র কণ্ঠে বলল,
“ফাকিং বাস্টার্ড… তোকে আমি পরে দেখবো।”
এই বলেই সে ঘুরে নিশিতার হাত শক্ত করে ধরে ফেললো। নিশিতা ব্যথায় হালকা গুঙিয়ে উঠলো,
“আহ্… ছাড়ুন ফারিস ভাই।”
কণ্ঠ কাঁপছে।
“লাগছে আমার।”
হাত ছাড়ানোর জন্য মোচড়ামুচড়ি করতে লাগলো।ফারিস লাল হয়ে ওঠা চোখে নিশিতার দিকে তাকিয়ে দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
“জাস্ট শাট আপ।” “আর একটা কথাও বলবি না।”
এক মুহূর্ত থেমে ভয়ংকর স্বরে,
“নাহলে এখানেই তোকে মেরে পুঁতে ফেলবো।”
নিশিতা পুরোপুরি চুপসে গেলো। ভয়ে শরীর শক্ত হয়ে এলো।নিশিতার হাত ধরে টানতে টানতে
ফারিস হাঁটতে হাঁটতে রাজীবের দিকে তাকিয়ে বলল,
“ওদের নিয়ে গাড়ি করে আয়।” শপিং ব্যাগগুলো রাজুর সাথে বাড়িতে পাঠিয়ে দে।”
রাজীব আর কোনো কথা বললো না। এই মুহূর্তে ফারিসকে থামানোর সাহস তার নেই।
সে চুপচাপ রাজুকে ডেকেসব শপিং ব্যাগ বাড়িতে পাঠানোর ব্যবস্থা করলো। তারপর রিয়াদের নিয়ে
গাড়িতে উঠে বসলো।আর ফারিসনিশিতার হাত ধরে টানতে টানতেগাড়ির কাছে নিয়ে গিয়ে
ব্যাক সিটে প্রায় ছুড়ে মারলো।নিশিতা সিটে গিয়ে আছড়ে পড়লো।ফারিস নিজে গিয়েফ্রন্ট সিটে বসল।চোখে তখনও আগুন।ইঞ্জিন স্টার্ট দিলো সে।
একই সাথেরাজীবও তার গাড়ি স্টার্ট করলো।
ফারিসের গাড়িটা আগে আগে ছুটে চললো।
রাস্তায় যেন আর কোনো বাধা নেই গাড়ির গতির সাথে সাথে ফারিসের রাগও ভয়ংকর গতিতে বেড়ে চলেছে। ব্যাক সিটে নিশিতা ঠিকভাবে বসতেই পারলো না।
ধাক্কার ব্যথা এখনো শরীরের ভেতর কাঁপছে।
কষ্টে শরীরটা সামলে নিয়ে ভাঙা গলায় বলল,
“বিশ্বাস করুন ফারিস ভাই… আমি কিছু করিনি।”
একটু থেমে কাঁপা কণ্ঠে আবার,
“নাভিদই হঠাৎ করে আমার সামনে এসে পড়েছিলো।প্লিজ… আমাকে ছেড়ে দিন ফারিস ভা…”
কথাটা শেষ হওয়ার আগেই ফারিস হঠাৎ করে চিৎকার করে উঠলো। তার কণ্ঠে এমন এক আগুন,
যা নিশিতার বুকের ভেতর বরফ ঢেলে দিলো।
“দেখ নিশি”
স্টিয়ারিং শক্ত করে চেপে ধরে গর্জে উঠলো সে,
“তুই যদি আর একবার ওই বাস্টার্ডের নাম নিস…”
“আর আমাকে ভাই বলে ডাকিস ”
এক সেকেন্ডের জন্য থেমে আরও ভয়ংকর স্বরে বলল,
“তাহলে তোকে এখনই এই চলন্ত গাড়ি থেকে ছুড়ে ফেলবো।”
নিশিতার নিঃশ্বাস আটকে গেলো। ফারিস কথা থামালো না।
“আর তার আগে ”
ঠোঁটের কোণে হিংস্র হাসি,
“তোর শরীরের প্রত্যেকটা কোনাকে বোঝাবো—”
“আমি তোর ভাই না…”
চোয়াল শক্ত করে বলল,
“আমি তোর হাসবেন্ড।”
এই কথার পর নিশিতার আর কোনো শব্দ বের হলো না। ভয়ে সে যেন জমে গেলো। গলার ভেতর দলা পাকিয়ে আসছে কান্না। শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে।
ঠোঁট দুটো অনবরত কাঁপছে। কান্না চেপে রাখতে চাইছে। কিন্তু পারছে না।মনে হচ্ছে,সব কষ্ট, ভয়, অপমান একসাথে বেরিয়ে আসতে চাইছে।
নিজেকে আর ধরে রাখতে পারছে না সে।
চোখ দুটো আপনাআপনি বন্ধ হয়ে আসছে অন্ধকার ঘিরে ধরছে চারপাশ। আর সামনে ফারিস। তার চোখে সেই একই হিংস্রতা। সেই আগুন যা এখনো নিভে যায়নি।
সে নিজেকে বারবার সামলানোর চেষ্টা করছে
যেন নিশিতার গায়ে হাত না ওঠে। যেন সে আরও কষ্ট না পায়। কিন্তু তার গায়ের রক্ত এখনো ফুটছে।
চোখের আড়ালে ভালোবাসি পর্ব ৪১
রাগ, অধিকারবোধ, ভয় হারানোর আতঙ্ক
সব একসাথে মাথার ভেতর বিস্ফোরণ ঘটাচ্ছে।
মনে হচ্ছে এই মুহূর্তে সামনে কাউকে পেলে
সে কাঁচা চিবিয়ে খেতো। গাড়ি ছুটছে। রাত আরও গাঢ় হচ্ছে। আর এই যাত্রা এখন শুধু শুরু।
