চোখের আড়ালে ভালোবাসি পর্ব ৪৩
আয়াত বিনতে নূর
কিছুক্ষণের মধ্যেই ফারিস নিশিতাকে নিয়ে চৌধুরী ভিলার সামনে গাড়ি থামাল। ফারিসের রাগ যেন আর বাঁধ মানছে না। নিজেকে শান্ত রাখার কোনো চেষ্টাই সে আর করছে না।আর নিশিতা কান্না করতে করতে প্রায় নিঃশেষ। ফুলে ওঠা চোখ, কাঁপতে থাকা ঠোঁট সবই যেন ফারিসের চোখ এড়িয়ে যাচ্ছে।
গাড়ি থেকে নেমে ফারিস পিছনের দরজাটা খুলল।
পরমুহূর্তেই নিশিতার হাতটা হেঁচকা টানে ধরে বাইরে নামিয়ে আনল।নিশিতার মনে হলো কেউ যেন তার হাতটা ছিঁড়ে ফেলছে। ব্যথায় কেঁপে উঠে চিৎকার করে উঠল সে,
“আহ্… লাগছে ফারিস ভাই! প্লিজ… আমাকে ছাড়ুন। আমার তো কোনো দোষ নেই…”
এই কথাগুলো ফারিসের রাগ আরও উসকে দিল।
কিছু না বলে তাকে টানতে টানতেই বাড়ির ভেতরে ঢুকে পড়ল।নিশিতার চোখ দিয়ে দু’ফোঁটা পানি গড়িয়ে পড়ল।হাতটা ব্যথায় অবশ হয়ে আসছে, তবু ফারিসের কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই।ঠিক তখনই দৃশ্যটা চোখে পড়ল আফিয়া চৌধুরী আর আমেনা চৌধুরীর।
আফিয়া চৌধুরী আতঙ্কিত কণ্ঠে বললেন,
“এসব কী ফারিস? নিশিতাকে এভাবে টানছিস কেন? কী হয়েছে? আর ও বাইরে গেলই বা কখন?”
আমেনা চৌধুরী চুপচাপ সব বোঝার চেষ্টা করছেন, কিন্তু কিছুই পরিষ্কার না। ফারিস চোখ লাল করে আফিয়ার দিকে তাকিয়ে গর্জে উঠল,
আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন
“এখন প্রশ্ন করছেন কেন? যখন কাউকে কিছু না বলে বাইরে গেল, তখন তো কিছু বলেননি! এখন আমাকে থামাতে আসবেন না। ফল ভালো হবে না।”
এই বলেই নিশিতাকে টানতে টানতে সিঁড়ি বেয়ে উপরে নিয়ে গেল। আফিয়া চৌধুরী হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন।আমেনার দিকে তাকিয়ে অসহায় গলায় বললেন,
“কি হবে এখন আমেনা? ফারিস তো ভয়ংকর রেগে আছে। যদি নিশিতার কিছু করে ফেলে…”
আমেনা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন,
“চিন্তা করবেন না ভাবি… নিশ্চয়ই নিশিতা কোনো ভুল করেছে। নাহলে ফারিস এভাবে রেগে যেত না।”
কিন্তু আফিয়ার বুকের ভেতর অজানা আশঙ্কা আরও ঘনীভূত হতে লাগল।রুমে ঢুকেই ফারিস নিশিতাকে সামনে দাঁড় করাল।
এক সেকেন্ডও সময় নিল না,
চড়!
ফারিসের পাঁচ আঙুলের ছাপ ফুটে উঠল নিশিতার গালে।নিশিতা ভারসাম্য হারিয়ে বেডের ওপর হুমড়ি খেয়ে পড়ল। পরমুহূর্তেই হু হু করে কেঁদে উঠল সে।ফারিস আগুনঝরা দৃষ্টিতে তাকিয়ে চিৎকার করল,
“তোর সাহস কী করে হয় আবার ওই বাস্টার্ডটার সাথে কথা বলার? কতবার বলেছি—ওর সাথে তোকে আমি দেখতে পারি না!”
নিশিতা কাঁপতে কাঁপতে উঠে দাঁড়িয়ে বলল,
“আমি নাভিদের সাথে কথা বলতে চাইনি… ওর সাথে দেখা করতেও চাইনি…”
এই কথাতেই ফারিসের রাগ চূড়ান্ত সীমা ছাড়াল।
আরেকটা চড় বসাল সে।নিশিতা পড়ে যেতে গেলে ফারিস তার হাত ধরে টেনে নিজের কাছে আনল।
চোখের আগুন তখন আরও ভয়ংকর।
দাঁত চেপে ফিসফিস করে বলল,
“নেক্সট টাইম যদি তোকে ওই লোকটার সাথে দেখি, কিংবা ওর নাম যদি তোর মুখে শুনি—সেদিনই তোর শেষ দিন, নিশি।”
একটু থেমে ঠাণ্ডা অথচ ভয়ংকর কণ্ঠে ,
“আর আজ থেকে তোর বাইরে যাওয়া বন্ধ। এই বাড়ির চার দেয়ালই তোর দুনিয়া। এটাই তোর জন্য ‘সেইফ’ জায়গা।”
এই কথা বলে নিশিতার হাত ছেড়ে রুম থেকে বেরিয়ে গেল ফারিস। নিশিতা ভেঙে পড়ে কান্নায়,
“কেন ফারিস ভাই… সব কিছুর দোষ সবসময় আমারই হয় কেন? আমি তো কিছুই চাইনি…”
একই সময়ে রাজীবের গাড়ি থামল চৌধুরী ভিলার সামনে।শপিংয়ের আগের হাসি-আনন্দ সব উধাও।
সবার মুখ ফ্যাকাসে।রাজীব ভারী গলায় বলল,
“তোরা ভেতরে যা। আমি ব্যাগগুলো নিয়ে আসছি।”
কেউ কিছু বলল না।
নীরবতায় ডুবে সবাই বাড়ির ভেতরে ঢুকে পড়ল।
ভিলার বাতাস তখন থমথমে ঝড়টা শুধু শুরু হয়েছে।কিন্তু এই পুরো ঘটনার মাঝখানেই তনয়ার মাথার ভেতর যেন ঝড় বইছে। একটার পর একটা প্রশ্ন তার মনে আছড়ে পড়ছে। হঠাৎ করে ফারিসের এমন অস্বাভাবিক রেগে যাওয়া এর কারণই বা কী? নাভিদ নামের ছেলেটাই বা কে?
আর নিশিতা আর নাভিদকে একসাথে দেখে ফারিস কেন এতটা নিয়ন্ত্রণ হারাল?
যত ভাবছে, ততই প্রশ্ন বাড়ছে। কোনো প্রশ্নেরই পরিষ্কার উত্তর সে খুঁজে পাচ্ছে না। মনে হচ্ছে, কোথাও একটা বড় কিছু লুকিয়ে আছে যেটা তারা কেউই পুরোটা জানে না। এইসব অস্থির চিন্তার মাঝেই তারা তিনজন বাড়ির ভেতরে প্রবেশ করলো। তাদের দেখামাত্রই আফিয়া চৌধুরী আর আমেনা চৌধুরী দ্রুত এগিয়ে এলেন। মুখে ছিল স্পষ্ট উদ্বেগ আর রাগের মিশেল।
আফিয়া চৌধুরী আর নিজের রাগ ধরে রাখতে পারলেন না। প্রায় চিৎকারের সুরেই রিয়াকে উদ্দেশ্য করে বললেন,
“বাড়ির মানুষগুলোর যে তোদের জন্য চিন্তা হয়, সেটা কি একেবারেই ভুলে গেছিস তোরা? কাউকে কিছু না বলে এভাবে চলে যাওয়ার মানে কী?
বাড়িতে কোনো পুরুষ মানুষ ছিল না ছিলাম শুধু আমি আর আমেনা। আমাদেরও কি একটু বলে যাওয়া যেত না?”
রিয়া, তনয়া আর অহনা তিনজনই মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইল। চোখ তুলে তাকানোর সাহস পর্যন্ত নেই। তারা আর কী-ই বা বলবে? দোষ তো আসলে তাদেরই। ঠিক সেই সময় রাজীব এসে পরিস্থিতি সামলানোর চেষ্টা করলো। নরম কিন্তু দৃঢ় গলায় বলল,
“আচ্ছা, অনেক হয়েছে আম্মু। এখন এসব বলার সময় না। আটটায় পার্টি, এখন চারটা বাজতে চলেছে। রাগারাগি বাদ দাও। ওরা শপিং-এ গিয়েছিল।”
একটু থেমে চারদিকে তাকিয়ে আবার প্রশ্ন করলো,
“আচ্ছা, নিশিতা আর ভাইয়া কোথায়?”
এই কথাটার সাথেসাথেই আমেনা চৌধুরীর মুখের ভাব বদলে গেল। হঠাৎ করেই যেন সবকিছু মিলিয়ে ফেললেন তিনি।
ধীরে ধীরে বললেন,
“এই জন্যই তাহলে ফারিস এত রেগে ছিল। নিশিতাকে নিয়ে সেই কখন উপরে গেছে—এখনো কোনো খোঁজ নেই। আচ্ছা করেই দিক মেয়েটাকে। সব বাদরামি বের হয়ে যাবে। দিন দিন এতো অবাধ্য হয়ে উঠছে, কিছু বলারই আর নেই।”
এই কথাগুলো শোনামাত্রই অহনা আর রিয়ার মাথার ওপর যেন আকাশ ভেঙে পড়লো। বুকের ভেতরটা হঠাৎ করে ছ্যাত করে উঠলো।
শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছিল। মনে মনে দু’জনেরই একটাই কথা ঘুরছিল,
“আল্লাহ জানে মেয়েটা কেমন আছে! ভাইয়া আবার ওকে মারেনি তো?”
এই দমবন্ধ করা মুহূর্তেই হঠাৎ ফারিস নিচে নামলো। তার চোখেমুখে এখনো স্পষ্ট রাগের ছাপ।
চোয়াল শক্ত হয়ে আছে, যেন দাঁত চেপে কোনো বড় বিস্ফোরণ আটকে রেখেছে। কাউকে কিছু না বলেই সোজা বের হওয়ার দিকে হাঁটতে শুরু করলো সে। ফারিসকে দেখেই রিয়া, অহনা আর তনয়া গুটিয়ে গেল। তনয়ার মনে হচ্ছিল সবকিছু তার মাথার ওপর দিয়ে ঝড়ের মতো চলে যাচ্ছে।
এতটা ভয় সে হয়তো জীবনে আগে কখনো অনুভব করেনি।
ফারিস বের হতে গেলে রাজীব তাকে আটকানোর চেষ্টা করলো। কিন্তু ফারিস এক প্রকার ধাক্কা দিয়ে তাকে সরিয়ে দিয়ে গটগট করে বেরিয়ে গেল।
বাইরে গিয়ে সে গাড়িতে উঠল। মুহূর্তের মধ্যেই গাড়ির ইঞ্জিন গর্জে উঠল। হাই স্পিডে গাড়ি নিয়ে সে ছুটে বেরিয়ে গেল এক অজানা উদ্দেশ্যের দিকে।
ফারিস নিজেও জানে না সে ঠিক কোথায় যাচ্ছে।
জানে শুধু এই মুহূর্তে তার ভেতরের আগুন থেকে পালাতে হবে… নাহলে কিছু একটা ভয়ংকর ঘটে যেতে পারে।
ছেলের যাওয়া দেখে আফিয়া চৌধুরী ভারী কণ্ঠে বললেন,
“আল্লাহ জানে, এই ছেলেটা নিশিতার সাথে কী করেছে!”
এই কথাটা কানে যেতেই অহনা আর রিয়া আর এক সেকেন্ডও দেরি করলো না। দু’জনেই প্রায় দৌড়াতে দৌড়াতে সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠে গেল।
দুশ্চিন্তায় অহনা আর রিয়ার মাথা যেন ফেটে যাবে। বুকের ভেতরটা ধকধক করছে অস্বাভাবিকভাবে। একটাই ভয়—নিশিতা ঠিক আছে তো? নিশিতার রুমের সামনে গিয়ে রিয়া জোরে দরজায় ধাক্কা দিল। কিন্তু ভেতর থেকে কোনো সাড়া শব্দ এলো না।
“নিশিতা! দরজা খোল!” “নিশু! শোন, দরজা খোল!”
বারবার ডাকল তারা। কিন্তু কোনো উত্তর নেই।
নিশিতা দরজা খুললো না, একটা শব্দও করলো না।
এই নিস্তব্ধতা দু’জনের বুকের ভেতরটা আরও ভারী করে দিল। হতাশ আর ভয় নিয়ে শেষমেশ আবার নিচে নেমে এলো রিয়া আর অহনা। রিয়া সোজা গিয়ে আফিয়া চৌধুরীর সামনে দাঁড়িয়ে বলল,
“আম্মু, নিশিতা দরজা খুলছে না। এখন কী হবে?”
আফিয়া চৌধুরীর চোখে জল চিকচিক করে উঠলো। রাগ আর অসহায়ত্ব একসাথে মিশে গলা ভারী হয়ে এলো,
“এই ছেলেটার রাগ শুধু আমার ছোট মেয়েটার ওপরেই পড়ে। ভুল করেছে, তাই বলে এভাবে শাসন করার কি কোনো মানে আছে?”
এইবার আমেনা চৌধুরী শান্ত কিন্তু দৃঢ় কণ্ঠে বললেন,
“না ভাবি, নিশিতা আজ যা করেছে ওকে শাসন করে ফারিস কোনো ভুল করেনি। একটু পরেই সব ঠিক হয়ে যাবে। তোরা এখন রুমে গিয়ে রেডি হয়ে নে।”
তারপর রাজীবের দিকে তাকিয়ে বললেন,
“আর রাজীব, তুইও গিয়ে রেডি হয়ে নে। নাহলে আবার বের হতে দেরি হয়ে যাবে। নিশিতা নিজেকে সামলে নিক। দুষ্টুমি করলে শাসন তো পেতেই হবে।”
রাজীব চুপচাপ মাথা নাড়লো। কারো সঙ্গে তর্ক করলো না। যে যার কেনাকাটার জিনিসপত্র নিয়ে নিলো সবাই। ঘরের ভেতর ধীরে ধীরে ব্যস্ততা ফিরে এলো, কিন্তু ভেতরের অস্বস্তিটা কাটলো না।
রাজীব বলল,
“আমি আর ভাইয়া অফিস থেকেই যাবো।
তোমরা আব্বু আর ছোট আব্বুর সাথে যাবে।”
সবাই মাথা নেড়ে সম্মতি দিল।
এরপর একে একে সবাই নিজের নিজের রুমের দিকে চলে গেল। ঠিক তখনই রাজীব পিছন থেকে অহনাকে ডাকলো,
“অহনা।”
অহনা পিছনে ঘুরতেই রাজীব তার হাতে একটা ব্যাগ ধরিয়ে দিয়ে বলল,
“তোমার জন্য। আজকে এটাই পরবে।”
এইটুকু বলেই সে আর দাঁড়ালো না। সোজা উপরে নিজের রুমে চলে গেল রেডি হতে। অহনা কিছুক্ষণ স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো। হাতের ব্যাগটার দিকে তাকিয়ে থাকলো অবাক হয়ে। কি করবে, বুঝে উঠতে পারছিল না। সে আর রিয়া তো আগে থেকেই ঠিক করেছিল দু’জনে ম্যাচিং করে শাড়ি পরবে। এখন আবার হঠাৎ করে আলাদা একটা শাড়ি! মাথার ভেতরে হাজারো ছোট ছোট চিন্তা ঘুরতে লাগলো নিশিতার অবস্থা, ফারিসের রাগ, পার্টির ঝামেলা, আর এখন এই শাড়ি। এসব ভাবতে ভাবতেই ধীর পায়ে সে উপরে রিয়ার রুমের দিকেই এগিয়ে গেল।
এদিকে জামান বাড়িতে, দুই তলা বিশিষ্ট ফেন্সঘেরা বিশাল বাড়িটার ড্রয়িংরুমে আরিশা আর আরিশ জামান পাশাপাশি বসে আছে। ঘরজুড়ে নিস্তব্ধতা। এমন এক নিস্তব্ধতা, যেখানে শব্দ না থাকলেও ভেতরে ভেতরে অনেক কিছু চলতে থাকে।
হঠাৎ সেই নীরবতা ভেঙে আরিশ জামান গভীর কণ্ঠে বললেন,
“বেটা, তোমার জন্যই আমরা এই ডিলটা নিলাম।
নাহলে এই ডিলের থেকেও বেশি টাকার অফার অন্য জায়গা থেকে আসছিল। এই ডিলটা নেওয়ার কারণ কী, আরিশা?”
আরিশা ধীরে হাতে থাকা কফির মগটা টেবিলের উপর রেখে বাবার দিকে তাকালো। চোখে কোনো দ্বিধা নেই, বরং আত্মবিশ্বাসে ঠাসা একরকম জেদি ঝিলিক।
“ড্যাড,”
শান্ত কিন্তু ধারালো গলায় বলল,
“ছোটবেলা থেকে আমি যা চেয়েছি, সবই পেয়েছি।
আর আজ যখন আমার চাওয়াটা পূরণ হচ্ছে না, তখন তো আমাকে আঙুল বাঁকাতেই হবে।”
একটু থেমে, ঠোঁটের কোণে হালকা বাঁকা হাসি খেলিয়ে আবার বলল,
“আর তুমি তো জানো, আমি ফারিসকে কতটা ভালোবাসি।
এত সহজে কি করে ছেড়ে দেওয়া যায় তাকে?
ও আমাকে হতেই হবে যে কোনো মূল্যে।”
কণ্ঠটা এবার আরও দৃঢ় হয়ে উঠলো,
“ঠিক এই কারণেই আমি তোমাকে এই ডিলটার জন্য এতটা চেষ্টা করতে বলেছি। এই ডিলের ২০% শেয়ার আমাদের। আগে আঙ্কেলকে ভালোভাবে বলো। যদি রাজি না হয় তাহলে তো আমাদের প্ল্যান বি রেডিই আছে।”
আরিশ জামান কিছুক্ষণ চুপ করে মেয়ের দিকে
তাকিয়ে রইলেন। তারপর ধীর কণ্ঠে বললেন,
“এতে কিন্তু আমাদেরও লস হতে পারে, মাই গার্ল।”
আরিশা হেসে ফেলল। সেই হাসিতে কোনো ভয় নে বরং নিশ্চিত বিজয়ের অহংকার।
“তার আগেই আমার আর ফারিসের বিয়েটা হয়ে যাবে, ড্যাড।”
তারপর প্রায় আদেশের সুরে বলল,
“তুমি এখনই আঙ্কেলকে কল করো। বলো, কালকে আমরা চৌধুরী বাড়িতে আসছি। আর কালকে যদি ফারিস রাজি না হয় তাহলে তো প্ল্যান বি আছেই।”
আরিশ জামান আর কোনো কথা বাড়ালেন না।
মেয়ের জেদ আর আত্মবিশ্বাস তিনি ভালো করেই চেনেন। তিনি সঙ্গে সঙ্গেই আরাফাত চৌধুরীর নাম্বারে কল দিলেন। ওদিকে আরাফাত চৌধুরী তখন অফিসে বসে কিছু জরুরি কাজ দেখছিলেন।
হঠাৎ ফোন বেজে উঠতেই স্ক্রিনের দিকে তাকালেন।
আরিশ জামানের নাম দেখে ফোনটা রিসিভ করলেন।আরাফাত কিছু বলার আগেই আরিশ জামান হেসে বললেন,
“কেমন আছেন ভাই?”
আরাফাত চৌধুরী স্বাভাবিক কণ্ঠে উত্তর দিলেন,
“জি, আলহামদুলিল্লাহ ভালো। আপনি কেমন আছেন?”
“আলহামদুলিল্লাহ,”
বললেন আরিশ জামান।
“ভাই, আপনার সাথে একটু কথা ছিল। ফ্রি আছেন তো?”
“জি, বলুন,”
আরাফাত চৌধুরীর কণ্ঠে কোনো পরিবর্তন নেই।
আরিশ জামান এবার মূল কথায় এলেন,
“দেখুন, আমার মেয়ে এখনও আপনার ছেলেকে ভালোবাসে। আর আমি চাই ওদের বিয়েটা হোক।
এত বছরের বন্ধুত্ব আমাদের আশা করি এতে কোনো সমস্যা হবে না। আপনি শুধু একটু ফারিসকে বোঝান।”
একটু থেমে আবারও বলতে শুরু করলেন,
“আপনারা চাইলে কালকে আমি আপনাদের বাড়িতে আসতে চাই। দু’জনে মিলে ফারিসকে বোঝাবো।”
আরাফাত চৌধুরী হালকা নিশ্বাস ফেলে বললেন,
“দেখুন, আমিও তো চাই ওদের বিয়েটা হোক।
কিন্তু ফারিসকে তো আপনি চিনেনই।
ও যেটাতে রাজি না সেটাতে আমি কীভাবে জোর করবো?”
আরিশ জামান তাড়াতাড়ি বললেন,
“দেখুন, আমার মেয়েটা ফারিস বলতে পাগল।
ফারিস ছাড়া কিছুই বুঝে না। তাই আমি চাইছি ওদের বিয়েটা হোক। কালকে আমরা সবাই মিলে বসে ফারিসকে বোঝাবো।ফারিস তখন নিশ্চয়ই না করবে না!”
আরাফাত চৌধুরী কিছুক্ষণ ভেবে বললেন,
“আচ্ছা, তাহলে কালকে আসুন। কালকে দেখা হচ্ছে আমাদের।”
কল কেটে দিয়ে আরিশ জামান মেয়ের দিকে তাকালেন। ঠোঁটে হালকা হাসি।
“কালকে তাহলে খেলা শুরু হচ্ছে, কী বলো মাই গার্ল?”
আরিশা রাজ্য জয়ের হাসি হাসলো। চোখে স্পষ্ট উন্মাদ আত্মবিশ্বাস।
“ওহু… ড্যাড।আজ সন্ধ্যা থেকেই শুরু হবে।”
আরিশ জামান হেসে উঠলেন। এদিকে চৌধুরী বাড়িতে সবাই যার যার মতো রেডি হচ্ছে। রিয়া আর অহনা রিয়ার রুমে একসাথে প্রস্তুত হচ্ছে।
রাজীব বারবার তাড়াতাড়ি রেডি হওয়ার কথা বলে গেছে। তাই দু’জনই চুপচাপ, নীরবে রেডি হচ্ছে মনের ভেতরে জমে থাকা অজানা অস্বস্তি নিয়ে।
রাজীব নিজে রেডি হয়ে অফিসে চলে গেছে।
কাজ পড়ে আছে অনেক।কিন্তু কেউই জানে না
এই প্রস্তুতির আড়ালেই ধীরে ধীরে এগিয়ে আসছে এমন এক ঝড়, যা কাল সকালেই চৌধুরী পরিবারকে নাড়িয়ে দেবে।
চৌধুরি বাড়ি.
একদিকে রিয়া আজ পরেছে গাঢ় পারপেল রঙের শাড়ি। শাড়িটা গায়ে জড়াতেই ওর চেহারায় একটা আলাদা উজ্জ্বলতা এসেছে। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে একবার দেখে নিয়ে ঠোঁটে লিপস্টিক লাগাচ্ছে সে। অহনার ইচ্ছে ছিল রিয়ার সাথে মেচিং করে শাড়ি পরবে। দুই বোন পাশাপাশি দাঁড়ালে যেন একরকম লাগে এই ভাবনাটা তার মনেও ছিল। কিন্তু রাজীবের আবদারটা আর ফেলতে পারেনি সে। তাই শেষমেশ রাজীবের দেওয়া সাদা রঙের শাড়িটাই পরে নিয়েছে।
সাদা শাড়িতে অহনাকে আরও শান্ত, আরও নরম লাগছে। কিন্তু এই সাদা রঙের আড়ালে তার ভেতরে জমে আছে অজানা এক অস্বস্তি।
রিয়া আয়নার সামনে ঠোঁটের কোণ ঠিক করতে করতে হঠাৎ বলল,
“আচ্ছা, নিশি কি আমাদের সাথে যাবে না?”
একটু থেমে নিঃশ্বাস ছাড়লো,
“ভাইয়ার ভয়ে তো ওকে ডাকতেও যেতে পারলাম না। আর আল্লাহ জানে ভাইয়া ওর সাথে কী না কী করছে!”
অহনা হিজাব বাঁধতে বাঁধতে উত্তর দিল। কণ্ঠে চাপা ভয়,
“আমারও সেম চিন্তা হচ্ছে রে। কিন্তু কী করবো বল? তোর ভাই যাওয়ার আগে বলে গেছে নিশিকে যেন কেউ না ডাকে।”
হিজাবের পিন লাগাতে গিয়ে হাত একটু কেঁপে উঠলো তার। তারপর ধীর কণ্ঠে আবার বলল,
“আর আজকে যে রূপ দেখলাম ভাইয়ার…
ভয়ে তো ডাকতেও যেতে পারছি না।”
রুমের ভেতর কয়েক সেকেন্ডের জন্য নীরবতা নেমে এলো। এই নীরবতার ভেতরেই জমে থাকলো ভয় আর দুশ্চিন্তা। এদিকে তনয়া একা তার রুমে।
বাইরে সবাই পার্টির প্রস্তুতিতে ব্যস্ত, কিন্তু তনয়ার মনটা অকারণেই ভার হয়ে আছে। দুপুরে মনটা বেশ ফুরফুরে ছিল। কিন্তু এখন যেন সেই ভালো লাগার জায়গাটা কালো মেঘে ঢেকে গেছে।
নিজেও ঠিক বুঝতে পারছে না কেন এমন লাগছে।
কোথাও যেতে ইচ্ছে করছে না তার। চুপচাপ গিয়ে বিছানার ধারে বসে পড়েছে। দুই হাতের আঙুল একটার সাথে আরেকটা জড়িয়ে ধরে বসে আছে অনেকক্ষণ। মনের ভেতরে বারবার ঘুরে ফিরে আসছে দু’টো নাম, নিশিতা আর ফারিস। ফারিসের হঠাৎ এমন রেগে যাওয়া…নিশিতাকে নিয়ে তার আচরণ… সব মিলিয়ে তনয়ার মনে একের পর এক প্রশ্ন জন্ম নিচ্ছে। কিন্তু কোনো প্রশ্নেরই উত্তর সে পাচ্ছে না। এই ভাবনাগুলোই তনয়ার মনকে আরও ভারী করে তুলছে। ঘড়ির কাটায় তখন ৫টা ৩০ মিনিট। আরাফাত চৌধুরী আর
আলতাফ চৌধুরী বাড়ি ফিরেছেন। বাড়িতে আজ যা যা হয়েছে সবকিছুই তাদের অজানা। তারা বিশেষ কিছু না ভেবে যে যার মতো নিজের রুমে চলে গেলেন।
ফ্রেশ হয়ে খাবার খেলেন। তারপর একটু রেস্ট নিলেন। কিছুক্ষণ পর তারাও পার্টির জন্য রেডি হবেন এই ছিল ভাবনা। ঠিক তখনই ঘড়িতে ছয়টা বাজে। ফারিস কখন বের হয়েছে এখনও বাড়ি ফেরার কোনো খোঁজ নেই। এই বিষয়টা নিয়ে কেউ খুব একটা চিন্তাও করছে না। কারণ ফারিসের এই আচরণে সবাই অভ্যস্ত।হঠাৎ বের হয়ে যাওয়া, নিজের মতো করে চলা এটাই তার স্বভাব।
তাই বাড়ির ভেতর আবারও সাজগোজের ব্যস্ততা বাড়ে। সবাই যার যার মতো পার্টিতে যাওয়ার প্রস্তুতিতে ডুবে যায়।
ফারিস হাই স্পিডে গাড়ি চালাতে চালাতে শহর ছাড়িয়ে এক নির্জন রাস্তায় এসে হঠাৎ ব্রেক চাপল।
চাকার ঘর্ষণে শব্দ তুলে গাড়িটা থেমে গেল। গাড়ি থেকে নেমে রাস্তার ধারে দাঁড়াল । চারপাশে নিস্তব্ধতা। কোনো মানুষের শব্দ নেই, নেই কোনো আলো শুধু তার বুকের ভেতরের অস্থিরতা। রাগটা আগের মতো তীব্র না হলেও পুরোপুরি কমেনি।
বারবার তার মাথার ভেতর ভেসে উঠছে নাভিদের মুখ, আর নিশিতার সেই মুহূর্তগুলো।
ভাবতেই ফারিসের চোয়াল শক্ত হয়ে আসে।
রাগ আবার দানা বাঁধতে চায়। কিন্তু হঠাৎ করেই মনে পড়ে যায় রাগের মাথায় নিশিতার সাথে করা নিজের আচরণগুলো। একটা ধাক্কার মতো অনুভূতি বুকের ভেতর নামলো। হাত তুলেছিল সে।
নিজের নিশিতার গায়ে হাত তুলেছিল।
এই ভাবনাটাই যেন তার হৃদয়টাকে কেউ খামচে ধরলো। নিশিতার চোখ দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়েছিল। এই দৃশ্যটা মনে হতেই বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠলো। নিজের ওপর নিজের ভীষণ রাগ হলো ফারিসের। রাগটা আর কোথায় রাখবে বুঝতে না পেরে হঠাৎ করে নিজের হাতটা গাড়ির বডির ওপর সজোরে আছড়ে মারলো। আঙুলগুলো ছুলে গেল। চামড়া কেটে হালকা রক্ত বের হলো। কিন্তু চোখে-মুখে ব্যথার কোনো ছাপ নেই। কারণ এর চেয়েও বড় ঝড় তখন তার ভেতরে চলছিল। ঠিক তখনই তার চোখ পড়লো ড্রাইভিং সিটের পাশের সিটে। নিশিতার জন্য কেনা শাড়ির ব্যাগটা অবহেলায় পড়ে আছে।
এক মুহূর্ত তাকিয়ে রইলো ফারিস। তারপর গলা ভারী হয়ে মনে মনে বলল,
“আমি আসছি, জান… চিন্তা করিস না।
আমি আসছি।”
এই কথাটুকু বলেই তাড়াহুড়ো করে গাড়িতে উঠে বসল সে। স্টিয়ারিং ঘুরিয়ে জোরে এক টান দিলো।
টায়ারের ঘর্ষণে বিকট শব্দ উঠলো। এরপর শোঁ শোঁ করে গাড়িটা ছুটে চললো, চৌধুরী বাড়ির দিকে।
কিছুক্ষণের মধ্যেই ফারিস গাড়ি থামালো বাড়ির সামনে। গাড়ি থেকে নামার সময় হাতে করে শপিং ব্যাগটা তুলে নিলো। বাড়ির ভেতরে পা রাখতেই চারপাশে এক অদ্ভুত নীরবতা। ড্রয়িং রুম ফাঁকা।
কেউ নেই। সবাই যে যার রুমে পার্টির জন্য রেডি হচ্ছে এটা বুঝতে সময় লাগলো না তার। আর এক সেকেন্ডও দেরি না করে ফারিস সোজা উপরে উঠে গেল নিশিতার রুমের দিকে। দরজায় নক করলো।
একবার। দু’বার। কোনো সাড়া নেই।
ফারিস বুঝে গেল, নিশিতা নিজে থেকে দরজা খুলবে না। নিজের রুমে গিয়ে এক্সট্রা চাবিটা নিয়ে এলো। হাত কাঁপছিল একটু। চাবি ঘুরিয়ে দরজা খুললো। দরজা খুলতেই যে দৃশ্যটা চোখে পড়লো,
ফারিসের বুকের ভেতরটা ছিন্নভিন্ন হয়ে গেল।
নিশিতা বেডে পা দুটো জড়ো করে বসে আছে।
হাউমাউ করে কাঁদছে। কাঁদতে কাঁদতে বলছে,
“সব ওই নাভিদের জন্য হয়েছে… না আজকে ওর সাথে আমার দেখা হতো না, তাহলে এসব হতো না…”
কান্নার ফাঁকে ফাঁকে তার ভাঙা কণ্ঠ,
“সবসময় খারাপ জিনিসগুলো আমার সাথেই কেন হয়?”
এই কথাগুলো বলেই আবারও কান্নায় ভেঙে পড়লো সে। ফারিসের চোখ আটকে গেল নিশিতার মুখে। চড় মারার জায়গায় দুই পাশ ফুলে আছে।
ঠোঁটের কোণ দিয়ে হালকা রক্ত জমে আছে।
ব্যথায়, রাগে, অপমানে নিশিতা শিশুর মতো কাঁদছে। এই দৃশ্য আর সহ্য করতে পারলো না ফারিস। প্রায় দৌড়েই এগিয়ে গিয়ে নিশিতাকে জড়িয়ে ধরলো সে। নিজের কোলে তুলে বসালো।
নিশিতা তাকে দেখে এক মুহূর্ত থমকে গেল।
চোখে বিস্ময়। তারপর বাচ্চাদের মতো হাত-পা ছড়িয়ে আবারও কান্না শুরু করলো। ফারিস শক্ত করে জড়িয়ে ধরে কপালে আলতো একটা চুমু দিলো। কণ্ঠ কেঁপে উঠলো,
“সরি জান আমাকে মাফ করে দে।রাগের মাথায় আমি কী না করেছি। ”
গলা ভারী হয়ে এলো,
“সব আমার ভুল। এতটা রাগ করা উচিত হয়নি।
তোর খুব লেগেছে, তাই না?”
কিন্তু নিশিতার দিক থেকে কোনো উত্তর এলো না।
বরং কান্নার বেগ আরও বেড়ে গেল। হঠাৎ করেই সে ফারিসকে ধাক্কা দিয়ে দূরে সরিয়ে দিল।
কাঁপা কিন্তু তীক্ষ্ণ কণ্ঠে বলল,
“ছাড়ুন আমাকে। ছুঁবেন না আপনি আমাকে।”
চোখে জমে থাকা আগুন আর পানি একসাথে,
“আপনার মতো মানুষ শুধু মারতে পারে ভালোবেসে বোঝাতে পারে না।”
ফারিস স্তব্ধ হয়ে গেল। নিশিতা আবার বলল,
“আপনি যান এখান থেকে। চিন্তা নেই, আপনার কথাই থাকবে আমি বাড়ি থেকে বের হবো না।”
একটু থেমে নিঃশ্বাস নিয়ে বলল,
“কিন্তু এখন দয়া করে আমাকে একা থাকতে দিন।
আমার এখন একটু একা থাকা দরকার।”
এই কথাগুলো নিশিতার মুখ থেকে বের হতেই
ফারিসের ভেতরটা দুমড়ে-মুচড়ে গেল। সে বুঝতে পারছে নিশিতা অভিমান করছে। কিন্তু এই কথাগুলো যে তার হৃদয়ে কতটা গভীর ক্ষত তৈরি করছে, সে কি জানে—এই বোকা, অবুঝ মেয়েটা?
ফারিস দাঁড়িয়ে রইলো। নীরবে।ভাঙা হৃদয় নিয়ে।
ফারিস নিশিতাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে নিচু স্বরে বলল,
“এগুলো বলিস না জান… বিশ্বাস কর, তোর মুখ থেকে এসব কথা শুনলে আমার কষ্ট হয়। আমি সহ্য করতে পারি না।”
নিশিতার চোখে চোখ রেখে ফারিস ধীর অথচ গভীর কণ্ঠে বলে উঠল,
“I want you in a way that goes beyond logic.
I want you so deeply that my presence is felt in every thought of yours. I want to be the one you can’t ignore, the one you keep coming back to—no matter what.
I want to live in your mind, in your emotions, in your silence. Every part of you should know me, feel me, choose me.
I don’t want half of you I want all of you, completely. Physically, mentally, emotionally every layer of you. I want to be the one you belong with, the one you can never replace. And this… this desire, this obsession this is what Faris Wahid Chowdhury wants.”
নিশিতা হা করে তাকিয়ে রইল ফারিসের দিকে।
এই লোকটার কিছু কথা শুনলেই যেন তার সব রাগ মিলিয়ে যায়। একটু আগে যে ফারিসকে সে দেখেছিল, এখনকার ফারিস যেন তার চেয়েও আলাদা আরও গভীর, আরও তীব্র। ফারিস তাকে আবার বুকে চেপে ধরে বলল,
“দূরে যাস না জান… আমি সহ্য করতে পারব না।”
নিশিতা নির্বাক। কী বলবে, কিছুই বুঝে উঠতে পারল না। ঠিক তখনই ফারিসের চোখ পড়ল পাশে রাখা শপিং ব্যাগটার দিকে যেটা সে কিছুক্ষণ আগেই রেখে দিয়েছিল। নিশিতাকে ছেড়ে হালকা মুচকি হেসে ব্যাগটা তার হাতে তুলে দিল।
নিশিতা অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল,
“এর ভেতরে কী?”
ফারিস শুধু বলল,
“খুলে দেখ।”
ব্যাগ খুলতেই নিশিতার চোখ বড় হয়ে গেল। ভেতরে রাখা একটা ভীষণ সুন্দর কালো রঙের শাড়ি। তার চোখ জ্বলজ্বল করে উঠল। ফারিসের দিকে তাকিয়ে সে ধীরে বলল,
“এটা… কার জন্য?”
ফারিস শান্ত গলায় উত্তর দিল,
“তোর জন্য। তাড়াতাড়ি রেডি হয়ে নে। নাহলে দেরি হয়ে যাবে। ব্যাগের ভেতরে কালো রঙের ম্যাচিং হিজাব আছে ওটাও পরবি। আর শাড়িটা ঠিক করে পরিস, জানো… শরীরের একটা অংশও যেন দেখা না যায়।”
নিশিতা শুধু মাথা নাড়ল। হঠাৎ করেই ফারিসের ফোনটা বেজে উঠল। বিরক্ত হয়ে স্ক্রিনের দিকে তাকাতেই দেখল রাজীব। ফোন রিসিভ করতেই রাজীব ব্যস্ত কণ্ঠে বলে উঠল,
“ভাইয়া, তাড়াতাড়ি অফিসে চলে এসো। একটা ঝামেলা হয়ে গেছে—তুমি ছাড়া সলভ হবে না। প্লিজ দ্রুত আসো। আমরা অফিস থেকেই পার্টিতে চলে যাব।”
ফারিস বিরক্ত স্বরে বলল,
“ওকে, আসছি।”
কল কেটে সে নিশিতার দিকে তাকাল। নিশিতা চিন্তিত গলায় জিজ্ঞেস করল,
“কি হয়েছে ফারিস ভাই? এখন কোথায় যাবেন? আর একটু পরেই তো পার্টি সবাই বের হবে।”
ফারিস বলল,
“অফিসে যেতে হবে। ঝামেলা হয়ে গেছে। তুই সবার সাথে চলে যা। আমি আর রাজীব অফিস থেকেই যাবো। এখন বেশি ভাবিস না তাড়াতাড়ি রেডি হ।”
এই বলে সে নিশিতার কপালে গাঢ় একটা চুমু এঁকে দিল। তারপর আর একবার পেছনে না তাকিয়ে, নিজের রুমে রেডি হতে চলে গেল।নিশিতা মনে মনে বলল,
“এভাবে যাওয়া যাবে না… আগে শাওয়ার নিয়ে তারপর রেডি হবো।”
যে ভাবা সেই কাজ ঝটপট টাওয়ার নিয়ে সে ওয়াশরুমের দিকে দৌড়ে গেল। ওয়াশরুমে ঢুকে সোজা শাওয়ারের নিচে দাঁড়িয়ে পড়ল। পানির ঝাপটায় সারাদিনের ক্লান্তি এক এক করে ধুয়ে যেতে লাগল।
ফারিস তার রুমে গিয়ে সাওয়ার নিয়েই বের হলো। ভেজা চুলগুলোতে ফারিসকে আরও আকর্ষণীয় মনে হচ্ছে নিজে নিজেই জানে। চুল মুছে, ধীরে ধীরে শপিং ব্যাগের দিকে এগোলো যা আগে রাজীব তার রুমে রেখে দিয়েছে। ফারিস নিশিতার সাথে মেলানো কালো রঙের হালকা ফ্যাশনেবল শার্ট, স্যুট আর প্যান্ট এক এক করে পড়লো।
সব কিছু পরে আয়নার সামনে দাঁড়াল, চুল ব্রাশ করে নিলো। সামনের পারফিউম স্প্রে করলো হালকাভাবে।
তারপর নিজেই রুম থেকে বের হয়ে গাড়ি নিয়ে অফিসের উদ্দেশ্যে রওনা দিল। ফারিসের রাগটা এখন আর নেই, তাই সবকিছু শান্ত মনে হচ্ছে।
ওদিকে নিশিতা শাওয়ার শেষে বের হলেই চমকে উঠল মনে হলো ভূত দেখেছে। সামনে দাঁড়িয়ে রিয়া আর অহনা, হাসি-খুশি মুখে তাকিয়ে আছে।
নিশিতা অবাক হয়ে বলল,
“কি রে! তোরা এখানে? আমি তো এখনও রেডি হইনি। তোদের বাহ বাহ!”
রিয়া শান্ত গলায় বলল,
“তো কি করতাম? যাওয়ার আগে রাজীব ভাইয়া বলে গেছিলো, জানো তোকে বিরক্ত না করি। আর আমাদেরও রেডি হওয়ার কথা ছিল। তাই তোকে ডাকেনি।”
নিশিতা একটু মাথা নিল, বলল,
“ঠিক আছে ঠিক আছে। কিন্তু তোদের দুইজনকে জোস লাগছে রে… আর আমি এখনো রেডি নই।”
গালগুলো এতটা ফুলে না থাকলেও হালকা লাল আভা আছে অহনাদের চোখ এড়িয়ে যায়নি।
অহনা কাছে এসে বলল,
“ফারিস ভাইয়া তোকে মেরেছে নিশু? সত্যি করে বলো।”
নিশিতা প্রথমে কিছুই বলল না। কিছুক্ষণ পরে নিজেকে সামলে হালকা হাসি দিয়ে বলল,
“আরে না, তেমন কিছুই হয়নি। চিন্তা করিস না তোরা।”
কথা ঘুরিয়ে বলল,
“আয়, আমাকে রেডি করে দে তোরা, নাহলে আবারও লেট হয়ে যাবে।”
অহনা বলল,
“কোন শাড়ি পড়বি? আমি পড়িয়ে দিচ্ছি।”
নিশিতা চুল শুকাতে শুকাতে বলল,
“ওই যে দেখ, কালো রঙের শাড়িটা… ওটাই পড়িয়ে দে।”
অহনা শাড়িটা হাতে নিয়ে এক ঝলক দেখে বলল,
“ওয়াও নিশি, এটা তো খুব সুন্দর! আয়, তোকে পড়িয়ে দিই।”
রিয়া সোফা থেকে বলল,
“আমি কেনো হেল্প করতে পারবো না? তাড়াতাড়ি রেডি হই নিশি।”
অহনা হেসে বলল,
“তোকে হেল্প লাগবে না শাঁকচুন্নি। তবে নাহলে দেরি হয়ে যাবে।”
এরপর অহনা নিশিতাকে সুন্দরভাবে শাড়ি পরিয়ে দিল। কিছুক্ষণের মধ্যেই নিশিতা আরও ঝকঝকে হয়ে উঠল। অহনা একটু দূরে দাঁড়িয়ে বলল,
“বাহ… আমার নিশু আজকে তো খুব মিষ্টি লাগছে।”
নিশিতা হালকা হাসি দিল। রিয়া বলল,
“নিশি, আজকে তোকে কেউ তুলে নিয়ে যাবে, দেখিস… তোকে খুব সুন্দর লাগছে।”
নিশিতার ফর্সা ত্বকের উপর কালো রঙের শাড়ি যেন আরও উজ্জ্বল করে তুলেছে। নিশিতা বলল,
“দাদা, একটু থামো… আমি হিজাব বেঁধে নেই।”
অয়নাগুলোর সামনে গিয়ে হিজাব বেঁধে নিল, কাজল, লিপস্টিক আর আইলাইনার লাগাল।
প্রথমে ফেস পাউডার, তারপর একে একে সব মেকআপ ফাইনাল। রিয়া হঠাৎ বলল,
“শপিং থেকে কিনেছিলি, ওইগুলো লাগাবি না? সব আমার রুমে ব্যাগে আছে।”
নিশিতা লিপস্টিক শেষ করে বলল,
“এগুলো পরে হবে, আজকে শুধু এটা যথেষ্ট।”
মেকআপ শেষ, হিজাব ঠিকভাবে বাঁধার পর নিশিতা আরও সুন্দর হয়ে উঠল। অহনা বলল,
“মাশাল্লাহ… কারুর নজর না লাগুক জান।”
নিশিতা হেসে উঠল। ঠিক তখন তনয়া রেডি হয়ে এসে বলল,
“কি রে! তোদের হলো? এখনই ৬:৫০ বাজে, তালুকদার বাড়িতে যেতেও টাইম লাগবে।”
নিশিতা হাসি দিয়ে বলল,
“আপু, তোকে আজকে খুব সুন্দর লাগছে।”
তনয়া নীল রঙের গাউন পরেছে, হালকা মেকআপ আর জুয়েলারিতে আরও ঝলমল করছে। নিশিতা ড্রয়ার খুলে কালো রঙের স্টোনের চুড়ি বের করল।
বলল,
“এবার চলো আপু।”
সবাই মিলে নিচে গেল নিচে সবাই তাদের জন্য অপেক্ষা করছিলো।নিশিতারা নিচে নামতেই আরাফাত চৌধুরী বললেন,
“এলো আম্মু রা, নাহলে দেরি হয়ে যাবে।”
আমেনা চৌধুরী হাসি দিয়ে ,
“হ্যাঁ, চল সবাই, এতক্ষণ ধরে আমরা তোদের জন্য অপেক্ষা করছি।”
আফিয়া চৌধুরী তিন মেয়ের দিকে তাকিয়ে বললেন,
“মাশাল্লাহ… আমার মেয়ে গুলোকে কতো সুন্দর লাগছে! কারও নজর যেন না লাগে।”
নিশিতা, রিয়া, অহনা একসাথে হেসে বলল,
“থ্যাংকইউ ।”
আলতাফ চৌধুরী বললেন,
“আচ্ছা আচ্ছা, এখন চল সবাই।”
সবাই একসাথে বাড়ি থেকে বের হলেন। গাড়িতে ওঠার পর দুই গ্রুপে ভাগ হয়ে যাত্রা শুরু হলো
একটি গাড়িতে আরাফাত চৌধুরী, আফিয়া চৌধুরী, আমেনা চৌধুরী আর আলতাফ চৌধুরী বসলেন।
আরেকটি গাড়িতে রিয়া, নিশিতা, অহনা আর তনয়া। দু’টি গাড়ি সারি ধরে ধীরে ধীরে চলতে লাগল। এদিকে তালুকদার বাড়িতে সকাল থেকেই সাজসজ্জা চলছে। শেষ বিকালে সব কিছু সম্পূর্ণ হলে সবাই রেডি হলো। বাড়ি যেন একেবারে জাদুর মত—চারিদিক আলোর ঝিলিক, জায়গায় জায়গায় ফুলের সাজ।
প্রতিটি কোণা, প্রতিটি দেয়াল সব মিলিয়ে পরিবেশ হয়ে উঠেছে প্রচণ্ড মনোমুগ্ধকর। এক এক করে গেস্টরা আসা শুরু করল। কিয়াস আর রিভান অতিথিদের রিসিভ করছে, এবং মুহূর্তের মধ্যেই জমজমাট পরিবেশ তৈরি হলো। সবার মুখে একটাই কথা “দারুন হয়েছে!” মমতা তালুকদার এসে অতিথিদের সঙ্গে আলাপ শুরু করলেন। ঘড়ির কাটায় তখন ঠিক ৮টা ৫ মিনিট। চৌধুরী বাড়ির গাড়ি তালুকদার বাড়ির সামনে থামল। গাড়ি থেকে আরাফাত চৌধুরীসহ সবাই বের হলেন। তাদের চোখ ঝিলিক দিয়ে উঠল সত্যিই অসাধারণভাবে সাজানো হয়েছে পুরো বাড়ি।অল্প একটু পিছনেই নিশিতাদের গাড়ি থামল।
নিশিতা, অহনা, রিয়া এবং তনয়া গাড়ি থেকে নেমে চারদিকে তাকিয়ে দেখল, আলো, ফুল, সাজ সবকিছু যেন স্বপ্নের মতো। তাদের গাইড করলেন আরাফাত চৌধুরী,
“ভিতরে চলো সবাই।”
হঠাৎ আফিয়া চৌধুরী বললেন,
“ভিতরে যাবো ঠিক আছে, কিন্তু তোমার দুই ছেলে যে এখনও আসেনি তা কি খেয়াল করেছো?”
আরাফাত চৌধুরী হাসি দিয়ে বললেন,
“ওরা অফিসে ছিল, অনেক আগে রওনা দিয়েছে। পাঁচ মিনিটে এসে পৌঁছাবে। চিন্তা করো না, ভিতরে চল নাহলে দেরি হয়ে যাবে।”
আফিয়া চৌধুরী আর কিছু বললেন না। সবাই চুপচাপ ভিতরে ঢুকে পড়ল। কিন্তু নিশিতা শাড়ি সামলাতে গিয়ে হঠাৎ পিছলে পড়ল। শাড়ির কুচি ঠিক করতে করতে তার শরীরের ভার সামলাতে হাহাকার করল। তবে রিয়া আর অহনা সঙ্গে সঙ্গে এগিয়ে এসে নিশিতাকে সাহায্য করল।
“থাম, নিশি, আমরা সাহায্য করছি,”
অহনা হেসে বলল।
“বাহ, তুমি আজকে সত্যিই অনেক সুন্দর লাগছো!”
রিয়াও বলে ।নিশিতা লজ্জা পেয়ে হালকা হাসি দিল,
“ঠিক আছে, ঠিক আছে… এবার চল ভিতরে।”
তাদের ধীরে ধীরে ভিতরে প্রবেশের সঙ্গে সঙ্গে ভিতরে মানুষের কৌলাহল আর আলো, ফুলের সৌন্দর্য আরও দৃশ্যমান হয়ে উঠল।
আরাফাত চৌধুরীদের আসতে দেখেই রিহান, কিয়াস আর মাহতাব তালুকদার এগিয়ে এলেন।
হাতে ফুলের তোড়া, মুখে আন্তরিক হাসি সবাইকে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানালেন তারা। রিভান সবার দিকে একবার তাকাল। চোখে পড়ল না ফারিস আর রাজীবকে। সৌজন্যমূলক ভদ্রতায় প্রশ্ন করল,
“আচ্ছা, মি. চৌধুরী কোথায়?”
আলতাফ চৌধুরী স্বাভাবিক গলায় বললেন,
“এই তো আসছে ওরা। পাঁচ মিনিটের মধ্যেই পৌঁছে যাবে।”
রিভান আর কিয়াস একসাথে সবাইকে ভিতরে নিয়ে গেল। কথা, হাসি, অভ্যর্থনার ভিড়ে কেউ খেয়ালই করল না নিশিতা একটু পিছনেই রয়ে গেছে। ভিতরে ঢুকে সবাই যার যার মতো ঘুরে ঘুরে দেখতে লাগল সাজানো বাড়িটা।
আলো, ফুল, সাজসজ্জা সবকিছু যেন চোখ জুড়িয়ে দেয়। কিন্তু এই উচ্ছ্বাসের ভিড়েও তনয়ার মন কোথাও আটকে আছে।সে সোজা মকটেল কাউন্টারে গিয়ে একটা জুস নিল, তারপর পাশের একটা চেয়ারে গিয়ে চুপচাপ বসে পড়ল।
এই ঝলমলে আয়োজন তার ভালো লাগছে না।
আসবে না ভেবেছিল কিন্তু সবার কথা ভেবে না করতে পারেনি। মন এমনিতেই ভারী, তার উপর এতো লোকের ভিড়… সব মিলিয়ে তার কাছে ব্যাপারটা ভীষণ অসহ্য লাগছে। দূর থেকেই কিয়াস তনয়ার নিঃশব্দ উপস্থিতি টের পেল। মুচকি হেসে ধীরে ধীরে এগিয়ে এসে বলল,
“এক্সকিউজ মি, মিস!”
হঠাৎ পুরুষালী কণ্ঠে তনয়া একটু চমকে উঠল।
পিছনে ফিরে তাকিয়ে কিয়াসকে দেখে ভদ্রতার খাতিরে বলল,
“জি, বলুন।”
কিয়াস মিষ্টি হেসে বলল,
“আমি কি আপনার পাশের চেয়ারটাতে বসতে পারি?”
তনয়া মনে মনে ভাবল,
চেয়ারে বসার জন্য আবার অনুমতি লাগে নাকি!
তবু হালকা হাসি দিয়ে বলল,
“হ্যাঁ, অবশ্যই।”
কিয়াস বসে পড়ল। একটু থেমে তনয়ার দিকে তাকিয়ে বলল,
“আপনার কোনো সমস্যা হচ্ছে কি? আপনি আমাদের গেস্ট আমি চাইবো না আপনি অস্বস্তিতে থাকুন। আপনাকে দেখে মনে হচ্ছে আপনি কিছু নিয়ে ডিস্টার্ব।”
তনয়া একটু অবাক হলো। এই লোকটা যার সাথে আগে কখনো কথা হয়নি এক দেখাতেই এতো কিছু বুঝে ফেলল কীভাবে? হালকা হেসে বলল,
“আপনি তো বেশ কিছুই বুঝে ফেলেন!
ইন্টারেস্টিং।”
কিয়াস হাসল,
“সব কিছু না… কিন্তু আপনার মনটা ভালো নেই, এটা বুঝতে পারছি।”
তনয়া হাসল। তারপর বলল,
“না, তেমন কিছু না।
But your arrangement is very beautiful.”
কিয়াস ভদ্রভাবে বলল,
“ধন্যবাদ।কোনো সমস্যা হলে বলবেন দ্বিধা করবেন না।”
“ওকে,”
তনয়া হেসে বলল।
কিয়াস যেন কিছু বলতে চেয়েও পারছে না। ইতস্তত ভাবটা তনয়া বুঝে গিয়ে বলল,
“আপনি কি কিছু বলতে চাইছেন?”
কিয়াস একটু জড়তা নিয়ে বলল,
“জি মানে আমরা কি বন্ধু হতে পারি, মিস তনয়া চৌধুরী?”
তনয়া এক মুহূর্ত অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল।
তারপর হেসে বলল,
“হ্যাঁ, অবশ্যই। কেনো নয়!”
কিয়াসের মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল।
“তাহলে আজ থেকে আমরা ফ্রেন্ডস ওকে?”
“ওকে,”
তনয়া হেসে সম্মতি দিল। তারপর দু’জন মিলে হালকা গল্পে মেতে উঠল কখনো পার্টি নিয়ে, কখনো সাধারণ কথা। তনয়ার মনটাও ধীরে ধীরে একটু হালকা হতে লাগল।অন্যদিকে, আফিয়া চৌধুরী আর আমেনা চৌধুরী মমতা তালুকদারসহ পরিচিত মানুষদের সঙ্গে ব্যস্ত আলাপে। আরাফাত চৌধুরী আর আলতাফ চৌধুরী কথা বলছেন মাহতাব তালুকদার আর অন্য ব্যবসায়ীদের সাথে।
কিন্তু রিয়া আর অহনা চুপচাপ এক কোণায় দাঁড়িয়ে রইল।
অহনা ফিসফিস করে বলল,
“পার্টি বুঝি এমনই হয় রে, রিয়া?”
রিয়া হেসে বলল,
“হ্যাঁ, কেন?”
অহনা ঢং করে বলল,
“এই প্রথম তো এলাম পার্টিতে!”
রিয়া হেসে ফেলল,
“আজকে তো এসেছিস। আজকে দেখেই নে।”
হঠাৎ অহনার মুখ গম্ভীর হয়ে গেল বলল,
“আচ্ছা… নিশি কোথায় রে? ওকে দেখছি না কেন?”
রিয়ার বুকটা ধক করে উঠল। সত্যিই তো এই ভিড়ের মাঝে নিশিতার কথা কেউ খেয়ালই করেনি।
চিন্তিত কণ্ঠে রিয়া বলল,
চোখের আড়ালে ভালোবাসি পর্ব ৪২
“সত্যি তো কোথায় ও?এতো লোকের মাঝে এখন খুঁজবো কীভাবে? এই মেয়েটাকে নিয়ে আর পারা গেলো না রে অহনা!ওকে কে বলেছে আমাদের থেকে আলাদা হতে?”
অহনা বিরক্ত হয়ে বলল,
“এত কথা না বলে আগে খুঁজ।
আমি ওই দিকটা দেখছি, তুই এইদিকে যা।”
রিয়া মাথা নাড়িয়ে দ্রুত ভিড়ের মধ্যে নিশিতাকে খুঁজতে বেরিয়ে পড়ল অজানা একটা আশঙ্কা বুকের ভেতর নিয়ে।কারন ফারিস জানলে আবার সমস্যা হবে তাদের কিছু হবেনা কিন্তু নিশিতার উপরে ভালোই প্রভাব পরবে…
