চৌদ্দের চিঠি পর্ব ১৪
আরোবা চৌধুরী আরু
সায়মান গাড়িটা ধীরে ধীরে থামাল। ইঞ্জিনের শব্দ স্তিমিত হতে না হতেই সে নিজের সিটবেল্ট খুলতে খুলতে ঠান্ডা স্বরে বলল,
—বাইরে বের হও।
বলেই দরজা খুলে আগে নেমে গেল।
নাফিসা একটু ইতস্তত করে তার ব্যাগটা কাঁধে ঠিক করল, তারপর আস্তে আস্তে দরজা ঠেলে বাইরে বের হলো। গাড়ি থেকে নেমে প্রথমেই চোখ গেল চারপাশে অবাক হয়ে দেখল, তারা একেবারে একটা সুন্দর ডুপ্লেক্স বাড়ির সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। দুইতলার বারান্দায় সাদা রেলিং, ছাদের ধারে ঝুলছে সবুজ লতাপাতা। বাড়ির চারপাশে প্রচুর গাছপালা যেন ছোট্ট এক বাগান ঘিরে রেখেছে পুরো বাড়িটাকে।
, —সায়মান সোজা গেটের দিকে হাঁটতে হাঁটতে বলল।
নাফিসা তার ছোট ছোট পা ফেলে ধীরে ধীরে ওর পিছন পিছন হাঁটতে লাগল। হাঁটার ফাঁকে ফাঁকে চারপাশে তাকাচ্ছে, গাছের পাতায় সূর্যের আলো ছায়ার খেলায় দুলছে, রঙিন ফুলের পাপড়ি হালকা বাতাসে দুলে উঠছে। কিছু কিছু ফুলের নামও সে জানে না—এই প্রথম দেখছে, অথচ মনে হচ্ছে এদের মধ্যে অদ্ভুত এক শান্তি লুকিয়ে আছে।
গেট পার হয়ে সায়মান নাফিসাকে নিয়ে বাড়ির বারান্দায় এসে দাঁড়াল। কাঠের দরজার সামনে থেমে, ধাতব কলিংবেলটা চাপল সে। ঘণ্টার টুংটাং শব্দ মিলিয়ে যেতে না যেতেই ভেতর থেকে পায়ের শব্দ ভেসে এল টুকটাক, টুকটাক কাঠের মেঝেতে কারো হালকা স্যান্ডেলের ধাক্কা।
দরজাটা খুলতেই ভেতর থেকে বেরিয়ে এল ত্রিশের কোঠায় এক নারী মুখভরা প্রাণখোলা হাসি, থ্রি পিস পর ওড়নাটা এক সাইডে নেওয়া, গলায় পাতলা সোনার চেইন, চুলে হালকা হাইলাইটের ঝিলিক। চোখে-মুখে উষ্ণতা, যেন অনেক দিনের চেনা কেউ ফিরে এসেছে।
আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন
—আরে তেহু ! তার ঠোঁটের কোণ উজ্জ্বল হয়ে উঠল, দাঁত কেলিয়ে চমৎকার এক হাসি দিলো।
সায়মান শান্তভাবে সালাম দিল।
—আসসালামু আলাইকুম, রুশনা আপি।
রুশনা সালামের উত্তর দিয়ে এগিয়ে এসে তার গাল দু’হাতে টেনে বলল,
—কেমন আছিস তেহু?
সায়মানের কপালে হালকা ভাঁজ পড়ল। গম্ভীর স্বরে বলল,
—আপি, প্লিজ… এগুলো করবি না। তোকে অনেকবার মানা করেছি।
রুশনা দাঁত বের করে হেসে বলল,
—আরে! তোকে কাছে পাওয়া যায় যে! বলে না”যে চাঁদ বারো মাসে একবার দেখা দেয়, তাকেই সবাই বেশি ভালবাসে।”
ঠিক তখনই ভেতর থেকে ছোট্ট পায়ের টপটপ শব্দ শোনা গেল, তারপর উচ্ছ্বসিত একটা কণ্ঠ—
—বয় মামা!
তিন বছরের একটা বাবু দৌড়ে এসে সোজা সায়মানের দিকে ঝাঁপিয়ে পড়ল। সায়মান নিচু হয়ে হাত বাড়িয়ে কোলে তুলে নিল তাকে। বাবুটি খিলখিলিয়ে হেসে সায়মানের গালে একের পর এক চুমু খেয়ে দিল,, টুক, টুক, টুক করে !
—মামা, তমি ইতদিল পর তেন আতলে? আমি তোমাল অনেত মিস তরেছি… আধো আধো তোতলা গলায় কথাগুলো বলল সে, তারপর ঠোঁট ফুলিয়ে রাগী ভঙ্গি করল।
সায়মান সেই ফুলানো ঠোঁট দেখে মুচকি হেসে দুই আঙুল দিয়ে আলতো করে গাল টিপে বাতাস বের করে দিল।
—আসলে মামনি, অনেক বিজি থাকি বলে আমার মিষ্টির কাছে আসা হয় না। এজন্যই তো অনেক সরি।
রুশনা মুচকি হেসে বলল,
—এই পিচ্চির কথাই বলছিলি তুই!
নাফিসা এতক্ষণে যেন একটু চমকে উঠল। ওর দৃষ্টি রুশনার দিকে আটকে গেল অপরিচিত অথচ খুব সহজভাবে সায়মানের সাথে মিশে থাকা নারী, যে বিনা সংকোচে তার গাল টানতে পারে। সে অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল, তারপর ধীরে ধীরে বুকের কাছে নিজের ব্যাগটা চেপে ধরল। সায়মানকে বাবুটার সাথে এতটা নরমভাবে কথা বলতে দেখে তার মনে হলো এ কি সত্যিই সেই গম্ভীর মানুষটা?
সায়মান লক্ষ্য করল, নাফিসা স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে শুধু তাকিয়ে আছে ওদের দিকে। এক মুহূর্তের জন্য তার চোখে অদ্ভুত কিছু ভাসল, কিন্তু সে কিছু বলল না। শুধু গভীর সুরে বলল,
—ভিতরে এসো।
রুশনা এবার নাফিসার দিকে এগিয়ে এল। তার হাসিতে এক ধরণের উষ্ণতা, যা বরফ গলিয়ে দিতে পারে। সে এক হাত দিয়ে নাফিসাকে আলতো করে জড়িয়ে ধরল, বলল—
—এই যে পিচ্চি আপু! তোমার নাম একটু বলো তো? তেহু শুধু পিচ্চি পিচ্চি করেই বলেছে, নামটাই বলেনি।
নাফিসা খানিকটা অবাক হলো, সায়মান তার কথা বলেছে!
নাফিসা চুপ থাকতেই রুশনা আবার মজার ভঙ্গিতে বলল,
—কিগো? নাম বলবা না নাকি?
নাফিসা মাথা নিচু করে আস্তে বলল,
—নাফিসা আলম।
রুশনা খুশি হয়ে গাল টিপে দিল,
—তোমার নাম তো তোমার মতোই সুন্দর! তাইলে আমি তোমাকে নাফু বলেই ডাকবো।
নাফিসা হালকা লজ্জা মাখা চোখে তাকাল, তারপর কিছু না বলে মাথা নাই দিয়ে হ্যাঁ জানালো ।
মিষ্টি এক মুহূর্ত নীরবে সায়মানের কোলে বসে তার দিকে তাকাল, তারপর হঠাৎ কৌতূহলী চোখে নাফিসার দিকে ফিরল। কপাল কুঁচকে, তোতলা গলায় জিজ্ঞেস করল,
—এতা কে?
প্রশ্নটা শুনে নাফিসা একটু অবাক হয়ে গেলেও উত্তর দেওয়ার আগেই রুশনা মিষ্টির পাশে এসে দাঁড়াল। ঠোঁটে এক ঝলক হাসি এনে বলল,
—এটা তোমার খালামণি হয়।
“খালামণি” শব্দটা শুনে মিষ্টির মুখে দুষ্টু হাসি ফুটে উঠল। ওর ছোট্ট জিভে শব্দটা যেন ঠিকমতো বসল না। খুশির সুরে বলল,
—থালামনি!
উচ্চারণের মিষ্টি ভুল শুনে নাফিসার ঠোঁটের কোণে হাসি থামল না। সে না চাইলেও ফিক করে হেসে ফেলল।
ওর হাসি চোখ এড়াল না রুশনার। দুষ্টুমিভরা চোখে নাফিসার গাল আলতো করে টেনে নিয়ে বলল,
—আরে বাবা! নাফু তো দেখি হাসতেও জানে!
সেই মুহূর্তে সায়মানের দৃষ্টি একবার নীরবে নাফিসার দিকে গেল। কিছু বলল না, শুধু গভীরভাবে তাকাল।
রুশনা এবার মিষ্টির দিকে মুখ ঘুরিয়ে মজা করে বলল,
—আচ্ছা মিষ্টি, বলো তো—খা-লা-ম-ণি।
মিষ্টি একদম ভেবে নিয়ে আবার আনন্দের সুরে বলল,
—থালা মনি!
রুশনা হেসে মাথা নেড়ে বলল,
—যাক, থালামণি হলো তোমার!
সায়মান এবার মিষ্টিকে কোলে নিয়ে সোজা ড্রয়িংরুমের দিকে এগোল। সামনে রাখা বড় নরম সোফার ওপর মিষ্টিকে বসিয়ে দিল, যাতে ওর ছোট্ট পা ঝুলে থাকে আর দুলতে দুলতে খেলতে পারে।
এদিকে রুশনা স্নেহভরে নাফিসার দিকে তাকাল। হাত বাড়িয়ে তার হাত ধরল এবং আলতো করে ভেতরের দিকে নিয়ে এল। চলতে চলতে বলল,
—আমি হলাম সায়মানের কাজিন, সায়মানের বড় মামার মেয়ে। আর একটা কথা জানো? আমি কিন্তু আমার সব কাজিনদের মধ্যে সবচেয়ে বড়।
নাফিসা নীরবে তার কথা শুনছিল। মাঝে মাঝে ছোট্ট করে মাথা নাড়ছিল, কিন্তু কিছু বলছিল না।
সোফার অন্য কোণে নাফিসাকে বসিয়ে রুশনা পাশেই বসল। তারপর ভেতরের দিকে মুখ ফিরিয়ে জোরে ডাক দিল,
—খালা! এদের একটু নাস্তা দিয়ে যাও তো!
কিছুক্ষণের মধ্যে রান্নাঘরের দিক থেকে এক মধ্যবয়সী মহিলা ট্রে হাতে এসে হাজির হলেন। ট্রেতে সাজানো ধোঁয়া ওঠা নাস্তা, সাথে কয়েকটা ছোট্ট বাটি আর গ্লাস। মহিলা এসে টেবিলের ওপর নাস্তা সাজিয়ে রেখে নরম স্বরে বললেন,
—এই নেন মা, গরম গরম।
তখনই সায়মান হাত বাড়িয়ে একটি বাটি তুলে নিল। বাটিটা হালিমে ঠাসা। রুশনা বলল,
—নে, তোর পছন্দের হালিম।
নাফিসা ধীরে ধীরে চোখ তুলে ওদের দিকে তাকাল। সায়মানের দিকে চোখ পড়তেই মনে মনে একরকম বিস্ময় ভর করল তার ভেতরে—
এই গভীর, চুপচাপ মানুষটার আবার এমন চটপটে টাইপের খাবার পছন্দ? হালিম! সত্যিই কি ওর মতো মানুষের রুচি এমন হতে পারে?
এদিকে সায়মান সোফায় বসে মিষ্টিকে তার পায়ের এক পাশে বসিয়ে রেখেছে, যেন ছোট্ট পায়ের জায়গা হয় আরাম করে বসার। তখনই বাইরে থেকে দারোয়ান এসে টেবিলের পাশে একটা বড় বক্স নামিয়ে রেখে চলে গেল। রুশনার কণ্ঠে নরম গর্বের সুর,
—ওই যে, সায়মানই ওটার জন্য এতক্ষণ দেরি করছিল।
বক্স খুলতেই বোঝা গেল, ভিতরে নানা রঙের খেলনা সাজানো। গাড়ি, পুতুল, পাজল,,সবই নতুন, চকচকে। আসলে সায়মানই কিনে এনেছে মিষ্টির জন্য। মিষ্টি তাড়াতাড়ি এক খেলনা হাতে নিয়ে ওর কোলে বসে খেলতে লাগল, যেন চারপাশের সবকিছু ভুলে গেছে।
সায়মান গম্ভীর মুখে নিজের সামনে রাখা বাটিটা হাতে তুলে নিল। নীরবে চামচ দিয়ে হালিম নেড়ে দেখছিল। ওর মুখের গাম্ভীর্য রুশনার নজরে পড়তে দেরি হলো না।
রুশনা হালকা বিরক্তি নিয়ে কপাল কুঁচকালো, তারপর মজা-রাগ মেশানো গলায় বলল,
—ভাই, একটু হাসবি না? তোর জন্য কত কষ্ট করে বানালাম! আমার হাতে তুই একটা খাবার পছন্দ করিস বলেই জানি—ভাবছিলাম অন্তত আজকে প্রশংসা করবি। কিন্তু না! কোনদিনও করিস না! অন্তত একটু হাসতে তো পারিস!
রুশনা একটু হালকা গলায় কথার মোড় ঘুরিয়ে বলল,
—যাই হোক, বাড়ির সবাই কেমন আছে?
সায়মান চুপচাপ এক চামচ হালিম তুলে মুখে দিল, তারপর ধীরে বলে উঠল,
—আলহামদুলিল্লাহ, ভালো আছে সবাই।
রুশনা দীর্ঘশ্বাস ফেলল, ভঙ্গিটা যেন হতাশার।
—কাজের চক্করে কোথাও আর যাওয়া হয় না, তোর দুলাভাইয়েরও টাইম পাই না, আমিও পাই না। যেটুকু পাই, মিষ্টির সাথেই থাকতে হয়,,বাচ্চাটাকে সময় না দিলে চলে? ওর জন্যই তো সব কষ্ট সার্থক লাগে। ও বাড়িতে অনেকদিন যাওয়া হয় না, তোদের বাড়িতেও অনেকদিন যাওয়া হয়নি। আবার আব্বুদের বাসাতেও বহুদিন যাওয়া হয় না।
বলতে বলতেই হঠাৎ তার চোখে-মুখে উচ্ছ্বাস ফুটে উঠল। হালকা ঝুঁকে সায়মানের দিকে তাকিয়ে বলল,
—শোন, তুই যখন এসেছিস, চল না সবাই মিলে খুলনা ঘুরে আসি! আব্বু তো তোর কথা অনেক বলে,,আসলে অনেকদিন নয়, বলা যায় বহু বছর হয়ে গেছে তুই ওখানে যাসনি। চল না, এবার যাওয়া যাক!
সায়মান রুশনার উচ্ছ্বাসের দিকে একবার তাকাল, তারপর গম্ভীর স্বরে বলল,
—সময় নেই আমার।
রুশনা বিরক্তির ভঙ্গিতে হাত নেড়ে বলল,
—তোর সময় থাকে কবে? আমরা সবাই ব্যস্ত থাকি, তাও সময় করে নিতে হয় কাছের মানুষদের সাথে কাটানোর জন্য। সর, তোর দাঁড়ায় কিছু হবে না। তোর থেকে সাইফানের সাথে যোগাযোগ করলে কাজ হবে কোথায় থাকে রে, অনেকদিন আসেনি!
সায়মান মুখের ভাব না বদলিয়ে ঠাণ্ডা গলায় উত্তর দিল,
—জানি না।
রুশনা হালকা বিরক্তিতে চোখ পাকিয়ে বলল,
—হুঁ, তোর কাছে জিজ্ঞেস করাটাই আমার ভুল। আমি নিজেই ফোন দেব ওকে। ওই বেয়াদবটাকে খুঁজে পাওয়া যায় না! হাতের কাছে পেলে একেবারে পিটিয়ে সোজা করে দেব। আর যাই হোক, দুষ্টু হলেও অন্তত কথা শুনে একটু।
রুশনা খানিকক্ষণ চুপ করে সায়মানের দিকে তাকিয়ে রইল, তারপর মাথা নাড়িয়ে বলল,
আর তুই দিন দিন কেমন জানি একা সেরে হয়ে যাচ্ছিস। যেন নিজের চারপাশে এক দেওয়াল তুলে ফেলেছিস।
এক মুহূর্ত থেমে আবার দৃঢ় সুরে বলল,
যাইহোক, এবার কিন্তু একটা কিছু প্ল্যান করবই, আর তোকে সাথে করে টেনে নিয়েই যাব। না করার কোনো সুযোগ পাবি না।
সায়মানের মুখে কোনো প্রতিক্রিয়া ফুটল না। সে নিজের মতো করে খাচ্ছে, মাঝেমধ্যে পাশের মিষ্টির দিকে তাকিয়ে দুই-একটা কথা বলছে, আবার খাবারে মন দিচ্ছে।
রুশনার চোখ এবার ঘুরে গেল নাফিসার দিকে। দেখল, মেয়েটা চুপচাপ বসে আছে, তাদের কথাবার্তা মন দিয়ে শুনছে, কিন্তু একদমই খাচ্ছে না। মুখটা এমন হা করে আছে যেন গল্পের একদম গভীরে ডুবে গেছে।
—এই নাফু! ডাক দিল রুশনা, ঠোঁটে হালকা মজা মেশানো হাসি। —খাচ্ছো না কেন? চুপচাপ বসে আছো কেন?
বলতে বলতেই ভুলে গেল যে ওর হাতে খাবার তুলে দেওয়া হয়নি। তাই নিজেই তাড়াতাড়ি টেবিল থেকে একটা হালিমভরা বাটি তুলে নাফিসার সামনে এগিয়ে দিল।
নাফিসা নীরবে বাটিটা হাতে নিল। তারপর ধীরে ধীরে চামচ দিয়ে হালিম তুলে মুখে দিতে লাগল,,প্রথমে দ্বিধা নিয়ে, তারপর খুব আস্তে আস্তে, যেন প্রতিটা কণাই ভেবে-চিনে খাচ্ছে।
রুশনা এবার নিজের জন্যও একটা হালিমের বাটি তুলে নিল, হাসিমুখে খেতে খেতে দু’চোখে কেমন একটা তৃপ্তি নিয়ে চারপাশে তাকাল।
নাস্তা শেষ হলে রুশনা হাতের আঙুল দিয়ে ঠোঁট মুছে হাসিমুখে নাফিসার দিকে তাকাল।
—চলো, তোমাকে একটু বাড়ি ঘুরে দেখাই।
নাফিসা চুপচাপ মাথা তুলল। তার চোখ স্বাভাবিকভাবেই সায়মানের দিকে চলে গেল। সায়মান তখন মিষ্টির হাতে খেলনা তুলে দিয়ে ব্যস্ত, কিন্তু যেন বুঝেও না বোঝার ভান করছে।
রুশনা সেটা খেয়াল করতেই দুষ্টু ভঙ্গিতে হেসে বলল,
—ওর দিকে তাকানোর দরকার নেই, নাফু। চলো আমার সাথে।
মুচকি হাসতে হাসতে পাশের টেবিল থেকে এক গ্লাস লাচ্ছা তুলে নিল রুশনা।
—এই নে, হাঁটতে হাঁটতে খাস, গরমে শরীর ঠাণ্ডা হবে।
নাফিসা কিছু বলল না। শুধু হালকা ইতস্তত নিয়ে গ্লাসটা হাতে নিল এবং ধীরে ধীরে রুশনার সাথে বেরিয়ে এল।
বারান্দা পেরিয়ে করিডর দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে রুশনা কথা শুরু করল—
—জানো নাফু, তেহু তোমাকে নিয়ে আজকে এখানে এসেছে একটা বিশেষ কারণে।
নাফিসা হকচকিয়ে তাকাল।
—কারণে?
রুশনার কণ্ঠ হঠাৎ কোমল হয়ে গেল।
—হ্যাঁ… ও আমাকে বলেছে, তুমি মাঝে মাঝে রাতে খুব অদ্ভুতভাবে ঘুম ভেঙে যাও, প্যানিক হয়ে যাও… আর স্বপ্নে যেন একই ঘটনা বারবার ফিরে আসে।
নাফিসার হাতের আঙুলগুলো গ্লাসের গায়ে কেঁপে উঠল। সে কিছু বলতে চাইল, কিন্তু শব্দ বের হলো না।
রুশনা আলতো করে ওর হাত ধরল।
—তুমি কিছু বলতে না চাইলে বলবে না, কিন্তু আমি বুঝতে পারছি… ছোটবেলায় কেউ তোমার প্রতি খারাপ ব্যবহার করেছিল, তাই না?
তুমি এখনো সেটা ভুলতে পারোনি… এমনকি স্বপ্নেও সেটা ফিরে আসে।
নাফিসার বুকের ভেতরটা হঠাৎ ভারী হয়ে গেল। ঠোঁট কাঁপতে লাগল।
—আমি… আমি কখনো কাউকে বলিনি…
রুশনা ধীরে মাথা নেড়ে বলল,
—তুমি ঠিক করেছো না বলাটা, কারণ সবার কাছে বলা যায় না। কিন্তু তুমি জানো তো, এই ধরণের ট্রমা শুধু সময় দিয়ে সারে না।
রুশনা নাফিসার দিকে ভেবেচিন্তে তাকিয়ে বলল,
—আমি একজন… সাইকোলজিস্ট” বা “চাইল্ড থেরাপিস্ট”। ছোটদের মানসিক সমস্যা, আতঙ্ক, বা ট্রমা নিয়ে সাহায্য করি ? আমি একজন এই ডক্টর। তুমি আমার সাথে সব ঘটনা খুলে বলতে পারো, নাফিসা। আমি তোমার ভালো চাই, আমি তোমার বড় বোন মনে করে সব বলতে পারো
নাফিসার হাত অজান্তেই কেঁপে উঠল। রুশনা ধীরে ধীরে তাকে ঘরটার এক শান্ত কোণে নিয়ে গিয়ে বসাল। তারপর নিজে তার পাশেই বসে গেল।
রুশনা হাত বাড়িয়ে নাফিসার হাতে এক গ্লাস পানি ধরিয়ে দিল।
—চলো, একটু পানি খাও।
নাফিসা ধীরে ধীরে কাঁপতে থাকা হাত দিয়ে গ্লাসটা ধরে, সাবধানে এক দুই চুমুক পানি নিল। রুশনা তখন তার হাত থেকে গ্লাসটা তুলে টেবিলের ওপর রাখল।
—এত প্যানিক করো না, রুশনার কণ্ঠে মমতা ভরপুর। আস্তে আস্তে বলো, আমার সাথে শেয়ার করো। এখন সব শেয়ার করতে না চাইলে পরে করতে পারো। আমি তোমার জন্যই বলছি, তোমার জন্য এখানে তোমাকে নিয়ে আসা হয়েছে।
সে একটু থেমে নিজে থেকে নাফিসার গালে আলতো হাত বুলিয়ে বলল,
—সায়মান চাইলে তোমাকে হাসপাতালে নিয়ে যেতে পারত, কিন্তু আমার কাছে নিয়ে এসেছে যাতে তুমি বড় বোনের কাছে সব খুলে বলতে পারো।
নাফিসা কিছুক্ষণ নীরব থাকল। তারপর নিজের হাত দিয়ে রুশনার হাত শক্ত করে আঁকড়িয়ে ধরে। চোখের পানি জমে আসছিল।
হলকা কন্ঠে, আস্তে আস্তে সে বলতে শুরু করল,
সন্ধ্যার আলো ছাদে মৃদু ছড়িয়ে পড়ে। ছোট্ট নাফিসা, ছয়–সাত বছর বয়সী, ছাদে বসে খেলছে। চারপাশে লাল, হলুদ ও নীল রঙের খেলনা scattered, আর মৃদু বাতাসে ধূসর ধুলোর সাথে সূর্যের শেষ আলো মিলিয়ে একটা কোমল সোনালি ছাপ ফেলছে।
হঠাৎ ছাদের ঢালু অংশ দিয়ে একজন লোক আস্তে আস্তে কাছে এল। নাফিসা প্রথমে একটু অবাক হয়ে তাকাল, তারপর হালকা মিষ্টি হাসি দিল—
—শাহিন মামা!
লোকটি হাতে একটা চকোলেট এগিয়ে দিল। নাফিসার চোখ চকচক করে উঠল। সে হাতে বাড়ালেই চকোলেটটা সরানো হলো। শাহিন কৌতুক করে বলল,
—চকোলেট নিবি?
নাফিসা মুচকি হেসে বলল,
—হ্যাঁ…
—আচ্ছা, তবে আমার কোলে এসো।
নাফিসা উত্তেজনায় হাত বাড়িয়ে কোলে ওঠার চেষ্টা করল। শাহিন তাকে ধীরে ধরে কোলে তুলল, আর চকোলেটটা হাতে তুলে দিল। নাফিসা প্রথমে খুশি হয়ে খেলতে লাগল, সবকিছু মনে হয়নি।
তবে সময় গড়িয়ে একসময় নাফিসা হঠাৎ একটা অস্বস্তি বোধ করল। সে বুঝতে পারল, নিজের শরীরের ওপর কিছুটা ভয় বা অস্বস্তি আছে। সে সরাসরি নিচে নামল, মাথা নীচু করে বলল,
—মামা, আমি আর কোলে থাকতে চাই না…বলতে বলতে বমি করে দেয়। বাচ্চাটা সহ্য করতে পারে না।
শাহীন নাক মুখ কুঁচকিয়ে নাফিসাকে কোল থেকে নামিয়ে দিয়ে বলল, কি করলি তুই?
ছোট নাফিসা চোখ তুলে তাকিয়ে, নিজের ক্লান্ত শরীর নিয়ে ওখানে বসে পরলো।
। তখনও মাঝে মাঝে পুরনো ভীতির স্মৃতি মনে পড়ে। হঠাৎ তার দম বন্ধ লাগল, হৃৎস্পন্দন বেড়ে গেল। সে কেঁপে কেঁপে দাঁড়িয়ে রেগুলার প্যানিক অ্যাটাক শুরু হয়ে গেল।
সেই মুহূর্তে রুশনা নাফিসাকে শান্ত করার চেষ্টা করল। নাফিসা তখনও থামছিল না, কাঁদছিল, শুধু চোখ বন্ধ করে ধরেই রাখল।
দৌড়িয়ে সায়মান এসে বসল নাফিসার পাশে। সে নাফিসাকে ধীরে ধীরে নিজের বুকের কাছে জড়িয়ে নিল। চারপাশে ঘরের নরম আলো, আর জানালার বাইরে হালকা বাতাস নাফিসার কান্নাকে কিছুটা কমিয়ে আনল।চোখ বন্ধ করে অনবরত ফুপিয়ে যাচ্ছে। আর বারবার বলছে শাহিন মামা প্লিজ আমাকে ছুইয়ো না।
সায়মান নাফিসার মাথায় হাত রাখল, দুই গাল আগলে নিয়ে বলল—
—এই পিচ্চি পুতুল, এই পিচ্চি কিছুই হয়নি তো। দেখো, এখানে কেউ নেই। তুমি বিশ্বাস করো না আমাকে?
কিছুক্ষণ শান্ত হয়ে গেল সব। চারিদিকে নিস্তব্ধ
নাফিসা পিটপিট করে চোখ খুলল। ধীরে ধীরে সায়মানের দিকে তাকাল। চোখের পলকে যে শান্তি ফিরল, তা চারপাশের আলোকে আরও উজ্জ্বল করে তুলল।
সায়মান মিষ্টিকে ফোনে কার্টুন দিয়ে বসিয়ে রেখে ।এখানে এসে আড়ালে দাঁড়িয়ে, রুশনা ও নাফিসার এই মুহূর্তের কথা চুপচাপ শুনছিল, সায়মান নিজের রাগ নিয়ন্ত্রণ করছিল, কিন্তু চোখে ধীরে ধীরে মন্থর ব্যথার ছাপ দেখা যাচ্ছিল এতক্ষণ ধরে হাত মুঠো করে দাঁড়িয়ে ছিল। নাফিসার প্যানিক অ্যাটাক হতে দেখে ওর দিকে ছুটে আসে তখন।
চৌদ্দের চিঠি পর্ব ১৩
শিশুদের নিরাপত্তা: গুড টাচ ও ব্যাড টাচ সম্পর্কে সচেতনতা
প্রিয় পাঠকগন,
আমাদের সমাজে শিশুদের ওপর যৌন হয়রানি ও নির্যাতনের ঘটনা উদ্বেগজনক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। শুধু মেয়ে নয়, ছেলে শিশুরাও এই ধরনের ঘটনার শিকার হচ্ছে। তাই আমাদের দায়িত্ব, সন্তানদের ছোটবেলা থেকেই গুড টাচ ও ব্যাড টাচ সম্পর্কে সচেতন করা।
জাতীয় পরিসংখ্যান: ইউনিসেফের এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে যে, বাংলাদেশে ১ থেকে ১৪ বছর বয়সী প্রায় ৯০% শিশু প্রতি মাসে কোনো না কোনো ধরনের সহিংসতা বা মানসিক নির্যাতনের শিকার হয়।২০১৬ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে ASK এর প্রতিবেদনে অন্তত ৬,৫১৪টি শিশু নির্যাতনের ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে, যার মধ্যে ৭০৫টি ঘটনা ৬ বছরের কম বয়সী শিশুদের।যদি আপনার সন্তান কোনো অস্বস্তিকর পরিস্থিতির শিকার হয়, তাহলে ১০৯৮ নম্বরে কল করে সহায়তা নিতে পারেন।)
