চৌদ্দের চিঠি পর্ব ১৩
আরোবা চৌধুরী আরু
ক্লাসে হালকা গুমোট গরম। জানালার ধারে পাখাটা কট কট করে ঘুরছে, কিন্তু তাতে খুব একটা ঠাণ্ডা মিলছে না। সামনে টিচার হোয়াইটবোর্ডে চক দিয়ে বড় বড় করে লিখে যাচ্ছেন, গলার স্বরে টানা টানা একঘেয়েমি,,
“তো, এই টপিকটা কিন্তু তোমাদের এক্সামে আসবে…”
সবাই খাতায় কিছু না কিছু লিখছে, কিন্তু পিছনের কর্নারে বসে থাকা রিশা আর জারিনের খাতা একদম ফাঁকা। ওরা একেবারেই অন্য এক দুনিয়ায়।
রিশা হালকা ঝুঁকে ফিসফিস করে বলল,
—শোন, কাল রাতে আমি একদম ঠিক করে ফেলেছি… ব্ল্যাক ডায়মন্ডকে প্রপোজ করব।
জারিন এক মুহূর্ত থমকে তার দিকে তাকাল, তারপর ফিসফিস স্বরে বলল,
—তুই? প্রপোজ? কাজে দিবে না, আকাশ ভাই সোজা গিয়ে আন্টিকে বলে দেবে!
রিশা মুখ বাঁকিয়ে ফিসফিস করল,
—এইজন্যই তো তোকে বলছি। কেমনে করব বুঝে উঠতে পারছি না। হঠাৎ গিয়ে বলি, “হ্যালো ব্ল্যাক ডায়মন্ড, আমি তোমাকে ভালোবাসি । তুমি যদি আমার প্রপোজাল একসেপ্ট না করো, পরে অন্যভাবে আবার ট্রাই করে প্রপোজ করব ি পছন্দ করবে। তবুও আমার আম্মুকে প্লিজ বলো না।” কেমন হবে?
জারিন ঠোঁট কামড়ে হাসি চাপল, মাথা নাড়িয়ে বলল,
—তুই তো সিনেমা বানাবি মনে হয়।
তারপর হালকা দীর্ঘশ্বাস ফেলে গম্ভীর মুখে বলল,
—আমারই তো এখনো কেউ মেলেনি, যার সাথে এমন প্রপোজ-ট্রপোজের কথা বলব।
এই বলতে বলতে জারিন চশমাটা আঙুল দিয়ে ঠিক করল প্রথমে নাকের ডগায় তুলল, আবার নামিয়ে দিল। কিছুক্ষণ পর আবার তুলল, যেন চশমা না, তারও মুড সুইচ।
রিশা খিলখিল করে হেসে বলল,
আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন
—তোকে আগে একখান গ্লাসগোলা দিয়া বিয়া দিতে হবে, তারপর তুই প্রেম করবি।
জারিন বিরক্ত হয়ে কাঁধে হালকা ঠুসি মারল,
—চুপ কর, টিচার টের পেলে আবার সামনে নিয়ে যাবে।
কিন্তু দুজনের ঠোঁটে তখনো চাপা হাসি।
্সিটির বিশাল মাঠটা আজ সোনালি আলোয় ভরে গেছে। হালকা বাতাসে চারপাশের এক্সাইডের গাছের পাতা নড়ছে মৃদু শব্দেশাঁ শাঁ করে। মাঠের কোণে লম্বা ছায়া পড়েছে, দূরে। এক্সাইডের বড় গাছটার নিচে হেলান দিয়ে বসে আছে সাইফান। হাতে ঠান্ডা কফির ক্যান, পাশে তার বন্ধু-বান্ধব তানভীর, মুশফিক আর ইমন বসে মজা করছে। কথোপকথন হালকা, হাসি-ঠাট্টার মাঝে গাছের পাতার ফাঁক দিয়ে সোনালি আলো এসে তাদের মুখে পড়ছে।
হঠাৎই, দূর থেকে একদলা ধুলো উড়িয়ে একটা ছেলে দ্রুত পায়ে এগিয়ে এলো। গায়ে লাল চেক শার্ট, চোখ লাল হয়ে আছে রাগে। কোনো কথা না বলে এসে সোজা সাইফানের কলার চেপে ধরল।
গলা ফেটে রাগে চেঁচিয়ে উঠল,
—বাস্টার্ড! তুই আমার গার্লফ্রেন্ডকে…
সাইফান প্রথমে অবাক হয়ে তার মুখের দিকে তাকাল, তারপর ধীরে ধীরে চোখ নামিয়ে নিজের কলার ধরা হাতের দিকে। ঠোঁটের কোণে এক চিলতে তাচ্ছিল্যের হাসি ফুটে উঠল।
—বলো তো… আবার বলো একবার।
ছেলেটা চোয়াল শক্ত করে বলল,
—তোর জন্য আমার গার্লফ্রেন্ড আমার সাথে ব্রেকআপ করে দিয়েছে! সে এখন বলে, সে নাকি তোকে ভালোবাসে!
সাইফান এবার মুখের হাসিটা আরও চওড়া করল, কণ্ঠে ঠান্ডা ব্যঙ্গ মিশিয়ে বলল,
—শালা, মান না মান মে তেরি মেহমান, তোর ওইরকম প্রেমপাগল, দশটা ছেলের সাথে লাইন মারা মেয়ের দিকে আমি চোখ দিয়েছি, এই ভাবনাটাই তোর মাথার সবচেয়ে বড় অসুখ। আমি তো ওই টাইপের প্লাস্টিক লাভার গার্ল কুকুরেও তাকাবে না, মানুষ তো দূরে থাক।
এই বলে সাইফান এক ঝটকায় তার হাত ঝেড়ে দিয়ে সোজা একটা ঘুষি মারল ছেলেটার মুখে। ঘুষির শব্দের সাথে সাথে পাশে বসা বন্ধুরা চমকে উঠল, আশেপাশের কয়েকজন ছাত্র মাথা ঘুরিয়ে তাকাল।
ছেলেটা হোঁচট খেয়ে পেছনে সরল, ঠোঁট ফেটে রক্ত পড়ছে। হাতের পেছন দিয়ে রক্ত মুছে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকাল সাইফানের দিকে।
—তোকে আমি দেখে নেব!
সাইফান ঠোঁট বাঁকিয়ে ব্যঙ্গ করল,
—দেখে নিবি? তোর গার্লফ্রেন্ডের মতো নাকি? আর বিয়েটা মানুষ টাইপের কারও সাথে করিস, প্লিজ।
তারপর আবার হতাশ ভঙ্গিতে বলল,
—আজকে একটু সুন্দর বলে কত মেয়ের প্রপোজাল আসে, হায় আল্লাহ তুমি এত সুন্দর বানাইলেন ক্যা! শালাদের গার্লফ্রেন্ড শালারা সামলাতে পারে না, আমার দিকে সব চোখ দিয়ে গিলে খায়, আবার সেই হাগুর গার্লফ্রেন্ড সামলাতে না পেরে শালারা সতীনের মতো চলে আসে যুদ্ধ করতে, এদিকে আমি শাকেও না পাতে ও না।
পাশে বসা তানভীর খিলখিল করে হেসে বলল,
—ভাই, সই বলেছিস!
জারিফ রাগে চোখ লাল করে তাকাল। সাইফান তাতে দমে গেল না, বরং ব্যঙ্গ বাড়িয়ে দিল,,
বলিউডের সতীনের ঘরের সতীন আমার! শোন, এবার একটু ভালো, দয়ালু, শান্ত মেয়ে দেখে প্রেম করিস। এমন মেয়ে দেখ, যে তোকে ভালবাসবে, তোর থেকে একটু সুন্দর আর তোর বাপের টাকা দেখে দৌড়াবে না। শালা, দোষ করেছে তোর গার্লফ্রেন্ড, আর তুই মারতে চলে এসেছিস আমাকে?
একটু থেমে ঠান্ডা স্বরে, কিন্তু চোখে তীক্ষ্ণ বিদ্রুপ নিয়ে,
আমার কাছে না এসে তোর গার্লফ্রেন্ডের পশ্চাৎদেশে দুই-চারটা লাথি মারলেই সব মিটে যেত, বুঝলি?
এবার মুশফিক আর ইমন দুজনই হেসে উঠল। মাঠের চারপাশে যারা খেলা দেখছিল, তারাও এখন কৌতূহল নিয়ে তাকিয়ে আছে।
জারিফ পাশে থাকা ডাস্টবিনটায় এক লাথি দিয়ে চলে গেল।
সাইফান ওর যাওয়ার দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে, আবার বলল, আরে কি করি এত সুন্দর কেন আমি, আজকাল তো আমার সৌন্দর্যের গন্ধ শুকে মানুষ ঘরে এসে চার চোখ দিয়ে ইজ্জত লুটে নেই।
স্কুল ছুটি হয়ে গেছে। গেটের ভেতরটা গমগম করছে, বাচ্চাদের হইচই, অভিভাবকদের ডাকাডাকি, রিকশাওয়ালাদের আওয়াজ—সব মিলিয়ে এক ব্যস্ত বিকেল। গরমের ভ্যাপসা ভাব এখনও বাতাসে লেগে আছে, কপালের পাশে চুলে হালকা ঘাম জমেছে।
নাফিসা দাঁড়িয়ে আছে গেটের কাছে, কাঁধে স্কুলব্যাগ। তার চোখে সেই শান্ত, নির্লিপ্ত দৃষ্টি,,
সায়মানের কথামতো আজ সে রিশার সাথে যায়নি। রিশা ড্রাইভারের সাথে বাসার পথে রওনা দিয়েছে অনেক আগেই। পাশেই দাঁড়িয়ে আছে মেহেরাব আর মেহেরিন, তাদের কালো গাড়ি গেটের বাইরে পার্ক করা, চালক ড্রাইভিং সিটে হেলান দিয়ে মোবাইল স্ক্রল করছে।
মেহেরিন জিজ্ঞেস করল,
—তোকে নিতে কে আসবে?
নাফিসা হালকা হাসল, চোখ নামিয়ে বলল,
তোকে বলেছিলাম না আমি আমার ভাইয়ার বন্ধুর বাসায় থাকি। উনি নিতে আসবে আমাকে।
নাফিসা ওদের সাথে তার বিয়ের ব্যাপার ও আগে কোথায় থাকি সবকিছু বলিনি। সে তার অতীতের দিকে আর ফিরে যেতে চাই না, এখানে আসার পর থেকে অনেক ভালোবাসার মানুষ পেয়েছে। তার ঠিকানা জেনে যদি তার নতুন গড়ে তোলা বন্ধুরা তার থেকে দূরে চলে যায় সেটা ভেবে আরো ওদের সাথে নিজের সব বিষয় শেয়ার করিনি নাফিসা।
মেহেরাব পাশের দোকান থেকে তিনটা আইসক্রিম নিয়ে ফিরে এল। ঠান্ডা ধোঁয়া উঠছে আইসক্রিমের ওপর থেকে, বাতাসে ভ্যানিলা আর চকোলেটের গন্ধ মিশে যাচ্ছে।
—এই নে, একটা এগিয়ে দিল নাফিসার দিকে।
—না… লাগবে না, নাফিসা মাথা নেড়ে বলল।
—আরেহ, গরমে না খেলে মরে যাবি, বলে জোর করে হাতে ধরিয়ে দিল।
নাফিসা অনিচ্ছাসত্ত্বেও আইসক্রিমটা নিল, ঠোঁটে হালকা হাসি ফুটে উঠল। পাশে দাঁড়িয়ে মেহেরিন আইসক্রিম খেতে খেতে নাফিসার সাথে গল্প করছে, হোমওয়ার্কের ঝামেলা, ছোটখাটো গসিপ। তাদের কথা বলার মাঝে মাঝে মেহেরাব চুপচাপ দাঁড়িয়ে, চোখ একদৃষ্টিতে নাফিসার দিকে, ।
মেহেরিন সেটা খেয়াল করল, হঠাৎ চোখ কুঁচকে বলল,
—এই যে! হ্যাবলাকান্তের মতো দাঁড়িয়ে হা করে তাকিয়ে আছিস কেন?
মেহেরাব যেন ধরা পড়ে গেল। পরক্ষণেই ঠোঁটে শয়তানি টান এনে হঠাৎ মেহেরিনের মুখে আইসক্রিম ছুঁইয়ে দিল। ঠান্ডা স্পর্শে মেহেরিন ঝটকা খেয়ে চিৎকার করে উঠল,
—আআআআ… এই নোংরা! তুই মরবি আজ!
সে এক ঝটকায় আইসক্রিম ফেলে দিয়ে মেহেরাবের দিকে তেড়ে এল।
—তোকে আমি ছাড়ব না!
মেহেরাব হেসে দৌড় দিল। দু’জনের হাসি-চিৎকারে আশেপাশের কয়েকজন অভিভাবকও তাকিয়ে দেখল।
দৌড়াতে দৌড়াতে মেহেরাব এবার নাফিসার পিছনে গিয়ে দাঁড়াল।
—এই, পাশে থাক, ওকে আটকাস! বলে তার দুই বাহু ধরে একবার ডানে, একবার বামে দুলাতে লাগল, যেন নাফিসা মাঝখানে ঢাল হয়ে আছে।
—আরে ছাড়! নাফিসা হাঁপাতে হাঁপাতে বলল, কিন্তু ঠোঁটের কোণে চাপা হাসি।
এদিকে মেহেরিন একপাশ থেকে তেড়ে আসছে, অন্যপাশে মেহেরাব নাফিসাকে ঢাল বানিয়ে লুকোচুরি খেলছে,,
গাড়ির দরজা খুলে নামল সায়মান। কপাল কুঁচকে আছে, চোখে বিরক্তি আর খোঁজার তাড়া। এদিক-ওদিক তাকিয়ে হঠাৎ গেটের পাশে এই ছোটখাটো হুলস্থুল চোখে পড়ল।
প্রথমেই চোখ গিয়ে থামল মেহেরাবের হাতে, যেটা নাফিসার দুই বাহু ধরে আছে।
সায়মানের দৃষ্টি মুহূর্তেই শক্ত হয়ে গেল। চোয়াল টানটান, মুঠো বাঁধা। পা বড় বড় ফেলে এগিয়ে এল।
—কোথায় ছিলে এতক্ষণ ধরে খুঁজছি? গম্ভীর, কানে বিঁধে যাওয়া স্বর।
শব্দটা এত হঠাৎ আর তীক্ষ্ণ ছিল যে মেহেরিন মাঝপথে থেমে গেল। মেহেরাবও হাত ছেড়ে দিল, অবাক দৃষ্টিতে সায়মানের দিকে তাকাল।
মেহেরিন তাড়াতাড়ি বলল,
—হ্যালো ভাইয়া, আমি না নাফিসার ফ্রেন্ড।
মেহেরাবও হেসে বলল,
—হ্যালো ভাইয়া। আপনি যেহেতু নাফিসার ভাইয়া হন, তাহলে আমাদেরও ভাইয়া! আপনার কথা অনেক শুনেছি।
‘ভাইয়া’ শব্দটা সায়মানের কানে কেমন কটাস করে বাজল। ঠোঁট শক্ত হয়ে গেল, চোখের গভীরতা আরও গাঢ় হয়ে উঠল। কিন্তু বাইরে কিছু প্রকাশ না করে ঠান্ডা হাসি দিল, নাফিসার হাত ধরে বলল,
—তোমাদের সাথে আবার পরে দেখা হবে। তোমাদের নতুন বন্ধুকে আমি নিয়ে যাচ্ছি।
নাফিসার হাত টেনে গেটের বাইরে নিয়ে গিয়ে গাড়ির দরজা খুলল।
—বসো। জোরে বলে উঠলো,
নাফিসা চমকে উঠলো, কিছু বলার আগেই সায়মান দৃঢ় দৃষ্টিতে ইঙ্গিত করল। তার আচমকা রাগে নাফিসা হতভম্ব হয়ে শুধু তাকিয়ে রইল।
পিছনে দাঁড়িয়ে মেহেরাব ফিসফিস করে বলল,
—আজব না ব্যাপারটা?
—ঠিক বলেছিস, মেহেরিন মাথা নেড়ে বলল।
মেহেরাব কাঁধ ঝাঁকিয়ে হেসে বলল,
—যাক, অন্তত একটা বিষয়ে আমাদের ভাবনা মিলে গেছে।
মেহেরিন মুখ ঘুরিয়ে বলল,
—দূর, তুই মর! বলে চুলে টান মেরে গাড়ির দিকে দৌড় দিল।
মেহেরাব হেসে তার পেছনে ছুটল।
গাড়ির ভেতরে অদ্ভুত এক নিস্তব্ধতা। সায়মান স্টিয়ারিং হুইলে দুই হাত রেখে বসে আছে, মাথা সামান্য নিচু। আঙুলগুলো শক্ত করে চেপে আছে চামড়ার গ্রিপে, যেন সেই শক্ত চেপে ধরা দিয়েই রাগকে গিলে ফেলতে চাইছে। সে নিজেও বুঝতে পারছে না, এত রাগ কেন? কিসের জন্য?
এক মুহূর্তের জন্য স্টিয়ারিং ছেড়ে দিল। হাতটা সেন্টার কনসোলের পাশের হোল্ডারে গিয়ে থামল, সেখানে রাখা ঠান্ডা পানির বোতলটা তুলে নিল। হঠাৎ গাড়ির দরজা ঠেলে বাইরে বেরিয়ে গেল।
গরম বাতাস মুখে এসে লাগল,,দুপুরের রোদ শহরের পিচঢালা রাস্তায় সোনালি আগুনের মতো ঝলসে উঠছে। চারপাশে গাড়ির হর্ন, দূরে কোথাও এক চায়ের দোকানে ভেসে আসা হাসির শব্দ, হালকা ধুলো মিশ্রিত গন্ধে গরমের ভ্যাপসা ভাব।
সায়মান বোতলের ঢাকনা ঘুরিয়ে খুলল, ঠান্ডা পানির এক ফোঁটা তার হাত বেয়ে নেমে গেল,,তারপর এক ঢোঁক না খেয়ে সোজা মাথায় ঢেলে দিল। ঠান্ডা পানি গরম মাথায় আছড়ে পড়তেই যেন রাগের আগুন কিছুটা নিভে এলো। কিছুক্ষণ চোখ বন্ধ করে দাঁড়িয়ে থাকল, ফোঁটাগুলো কপাল বেয়ে গাল, গলা, শার্টের কলারে গড়িয়ে পড়ল।
এক হাত দিয়ে ভিজে চুল পেছনে সরিয়ে মাথা ঝাঁকাল, ছোট ছোট পানির ফোঁটা চারপাশে ছিটকে গেল। পকেট থেকে একটা সাদা রুমাল বের করল,,ধীরে ধীরে চুল, মুখ, গলা মুছল। শ্বাস কিছুটা হালকা, চোখের তীব্রতা কিছুটা নরম। তবু, ভেতরে কোথাও একটা খচখচে অস্থিরতা রয়ে গেছে।
গাড়ির ভেতরে বসে সব দেখছে নাফিসা। সে একদম অবাক হয়ে গিয়েছে,,এই লোক হঠাৎ গাড়ি থেকে নেমে মাথায় পানি ঢালছে কেন? ভ্যাবাচেকা খাওয়া দৃষ্টিতে কাঁচের ভেতর থেকে তাকিয়ে আছে, মনে মনে ভাবছে, আমি কি কিছু ভুল করে ফেলেছি? নাকি আমার জন্যই এত রেগে গেছে?
কিছুক্ষণ পর সায়মান গাড়িতে ফিরে এল। আসন সামলে বসতেই তার ভেতরের রাগের ঢেউ কিছুটা স্তিমিত হয়ে এসেছে। ইঞ্জিনের শব্দে গাড়ি আবার ধীরে ধীরে এগোতে শুরু করল।
নাফিসা দুই হাত হাঁটুর ওপর রেখে ছোট্ট কণ্ঠে বলল,
—আপনি এত রেগে আছেন কেন… আমি কি কিছু ভুল করেছি?
সায়মান প্রথমে তাকাল না, ঠোঁটের কোণে এক অস্পষ্ট বাঁক এনে বিড়বিড় করল,
—ইডিয়েট।
তারপর কণ্ঠ কিছুটা শক্ত করে বলল,
—যার-তার সাথে মিশবে না তুমি। গট ইট?
নাফিসা ভয়ে ভয়ে মাথা নাড়ল।
সায়মানের চোখ এক মুহূর্ত তার মুখে স্থির হয়ে রইল,, সংক্ষিপ্ত স্বরে বলল,
—সিটবেল্ট বাঁধো।
নাফিসা সিট বেল্ট বেঁধে, একটু ইতস্তত করে জিজ্ঞেস করল,
—আমরা কোথায় যাচ্ছি?
—এত কথা বলো কেন, পিচ্চি? সায়মান বিরক্ত স্বরে বলল। চুপচাপ বসে থাকো, কোথায় নিয়ে যাচ্ছিতা তোমার ভাবার বিষয় না। আর আমার মুখের ওপর বেশি কথা বলবে না।
নাফিসা নিচু চোখে মাথা নাড়ল, চুপ করে বসল।
সায়মান তার সেই মাথা নাড়ানো দেখে ভ্রু কুঁচকাল,
—সব সময় এমন মাথা নাড়ো, মুখ দিয়ে কথা নাই?
নাফিসা সরলভাবে মিনমিন করে উত্তর দিল,
—আপনি তো বললেন, আপনার মুখের ওপর কথা বলা পছন্দ না…
সায়মান তার দিকে তাকিয়ে ঠোঁটে হালকা চাপা হাসি দেখা গেল , কিন্তু সঙ্গে সঙ্গেই চোখের দৃষ্টি কঠিন করে নিল যেন কাউকে টের না দিতে চায়। ছোট্ট স্বরে বলল,
—ইডিয়েট।
চৌদ্দের চিঠি পর্ব ১২ (২)
তারপর মনোযোগ আবার রাস্তায় ফেরাল। গাড়ির চাকা শহরের রাস্তায় গড়িয়ে চলল, ব্যস্ত নগরের বিকেল।
নাফিসা গাড়ির জানালা দিয়ে বাইরের এই কোলাহল দেখতে লাগল। । মনে মনে সে সায়মানকে বকছে—সবসময় পিচ্চি, পিচ্চি বলে ডাকে! নামটা তার ভালো লাগে না বললে ভুল হবে তার নিজের কাছে ভালো লাগে শুনতে । আবার হঠাৎ ধমক দিয়ে এমনভাবে তাকায় যে ভেতরে ধপ করে ওঠে… এই লোকটা কি বুঝে না এসব?
