চৌদ্দের চিঠি পর্ব ২৭
আরোবা চৌধুরী আরু
নাফিসা চোখ শক্ত করে বন্ধ করে রেখেছে। বুক দ্রুত উঠানামা করছে———শ্বাস যেন বুকের ভেতরেই আটকে যাচ্ছে। শরীরের প্রতিটি রন্ধ্রে অদ্ভুত এক শিহরণ, ভয় আর অচেনা অনুভূতির মিশ্রণে ভিতরটা কেঁপে উঠছে। সায়মানের ঠোঁটের ছোঁয়া———প্রতিটি চুম্বনে শরীর যেন অসাড় হয়ে যাচ্ছে, আবার ভেতরে অদ্ভুত এক উষ্ণতা ছড়িয়ে পড়ছে। মনে হচ্ছে ভয়, নিরাপত্তা আর ভালোবাসা একসাথে মিশে গিয়ে ওকে গ্রাস করছে।
সায়মান যেন উন্মাদের মতো নিজের কাজে লিপ্ত, এক মুহূর্তও থামছে না। তার প্রতিটি নিঃশ্বাস গরম হয়ে নাফিসার মুখে এসে লাগছে, নাফিসা অসহায়ভাবে চোখ বন্ধ করেই সব অনুভব করছে।
ওদিকে রিয়াদ মেঝেতে পরে আছে। সামনে তাকিয়ে শুধু সায়মানের বিশাল দেহটা দেখতে পাচ্ছে। সায়মানের উচ্চতা আর শক্ত শরীরের আড়ালে নাফিসার ছোট্ট দেহটা পুরোপুরি ঢাকা পড়েছে। তাই রিয়াদ বুঝতেই পারছে না
———ওরা ঠিক কোন অবস্থায় আছে।
এই সুযোগে রিয়াদ নিজের ক্ষতবিক্ষত শরীরটা কষ্ট করে তুলে ধরল। বুক ওঠানামা করছে যন্ত্রণায়, তবু বাঁচার জন্য উঠে দাঁড়াতে চাইলো। ধীরে ধীরে শরীর ঘুরিয়ে, হোঁচট খেতে খেতে পালানোর চেষ্টা করল।
কিন্তু কয়েক কদম যেতেই হঠাৎ ভাঙা কাঁচের ফুলদানির টুকরোর ওপর পা পড়ে গেল। মুহূর্তেই চিৎকার করে উঠল———
———— “আআহহহ!”
রক্ত গড়িয়ে পড়ছে পায়ের আঙুল বেয়ে, রিয়াদ যন্ত্রণায় পা চেপে ধরল।
চিৎকারের শব্দে সায়মান হঠাৎ হুঁশে ফিরল। নাফিসার অধর জোড়া ছেড়ে দিয়ে এক ঝাঁটকাই নিজের থেকে সরিয়ে দিল নাফিসাকে। বুক ওঠানামা করছে বড় বড় শ্বাসে, লাল চোখে পেছন ফিরে তাকাতেই রিয়াদকে দেখতে পেল। মুহূর্তেই মাথায় আবার রক্ত উঠে গেল।
আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন
নাফিসা নিজের নিঃশ্বাস সামলাতে পারছে না। শরীরের ভেতর দম যেন আটকে গিয়েছিল, কিছুক্ষণ আগেও মনে হচ্ছিল অজ্ঞান হয়ে যাবে। অবশেষে সায়মান ঝাঁকুনি দিয়ে তাকে সরিয়ে দিতেই, হঠাৎ মুক্তি পেয়ে গলা দিয়ে হাওয়া বের হলো———গভীর নিঃশ্বাস টেনে, বুক ফুলিয়ে আবার বাঁচার চেষ্টা করছে।
তারপর চোখে পড়ল———সায়মান ঝড়ের বেগে রিয়াদের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। তার চোখে আগুন, দাঁতের দাঁত চেপে ফেলছে।
সায়মান রিয়াদের কাছে গিয়ে এক ঝটকায় ওর শার্টের কলার চেপে ধরল। শক্ত হাতে টেনে তুলতেই রিয়াদের নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসলো। আর কোনো কথা নয়———মাথা নিচু করে দাঁত চেপে ওকে জোরে টানতে শুরু করল। প্রতিটি পদক্ষেপে যেন আগুনে জ্বলতে থাকা সিংহ এগিয়ে চলেছে।
নাফিসা হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। ভয় আর অবিশ্বাসে শরীর আবার কেঁপে উঠল। মুহূর্তেই শাড়ির আঁচল বুকের ওপর গুছিয়ে নিল, কাপড় ঠিক করে নিজের শরীর ঢাকলো। তারপর চোখ ভিজে উঠল অশ্রুতে————তবুও কাঁপতে কাঁপতে কয়েক কদম ছুটে গেল সায়মানের পেছনে।
সায়মান একটানা টেনে টেনে রিয়াদকে সিঁড়ির দিকে নিয়ে এল। রিয়াদ গোঙাচ্ছে, হাত-পা ছুড়ে মুক্তি পাওয়ার চেষ্টা করছে, কিন্তু সায়মানের হাতের শক্তির সামনে সব বৃথা।
ধাপ ধাপ শব্দে সিঁড়ি বেয়ে নামছে দুজন। চারপাশে ঘর নিস্তব্ধ, শুধু রিয়াদের কাতর চিৎকার আর সায়মানের ভারী শ্বাসের শব্দ প্রতিধ্বনিত হচ্ছে।
নাফিসা পিছন পিছন দৌড়াচ্ছে, বুক ওঠানামা করছে, নিঃশ্বাস কাঁপছে, তবু থামছে না।
হঠাৎ————
সায়মান রিয়াদকে টেনে নিয়ে নিচে এসে সবার সামনে এক প্রচণ্ড ধাক্কায় মেঝেতে ছুড়ে ফেলল।
“ধাম!” শব্দে পুরো হলঘর মুহূর্তেই স্তব্ধ হয়ে গেল।
অতিথিরা, আত্মীয়স্বজন———— যারা এখনো শকে ডুবে ছিল————সবাই হঠাৎ চোখ বড় করে তাকিয়ে রইল। বাতাস জমে গেল, চারপাশে নিস্তব্ধতা। শুধু রিয়াদের গোঙানি আর সায়মানের তীব্র শ্বাস-প্রশ্বাসের শব্দ শোনা যাচ্ছে।
শিরিনা করিম ছেলের অবস্থা দেখে মুহূর্তের জন্য যেন নিথর হয়ে গেলেন। চোখের সামনে রিয়াদের সারা শরীর রক্তে ভিজে আছে। বুক কেঁপে উঠলো, এক চিৎকার দিয়ে তিনি দৌড়ে গেলেন ছেলের দিকে। হাঁটু গেড়ে বসে, রিয়াদের মাথাটা নিজের কোলের উপর তুলে নিলেন। তার হাত কাঁপছে, কণ্ঠ ভেঙে যাচ্ছে—
————“রিয়াদ… আব্বু’রে, চোখ খোলো… কিছু বলো…”
ক্রমাগত কান্নায় তার কণ্ঠ গলগল করে বেরোচ্ছে। চারপাশ নিস্তব্ধ, শুধু শিরিনার বুকফাটা আর্তনাদ প্রতিধ্বনি হয়ে ছড়িয়ে পড়ছে।
এহসান করিম আর রাহুলও ছুটে গেলেন ওর কাছে। দুজনই হাঁপাচ্ছেন, নিঃশ্বাস ভারী। রাহুল রিয়াদের রক্তাক্ত শরীর দেখে দাঁত চেপে ধরল———— চোখ জ্বলজ্বল করছে ক্রোধে। মুহূর্তে উঠে দাঁড়িয়ে, এক ঝটকায় গিয়ে সায়মানের মুখে ঘুষি বসিয়ে দিল।
“ধাড়াশ!”
সায়মানের মুখ পাশ ঘুরে গেল, ঠোঁট থেকে রক্ত বেরিয়ে এল। কিন্তু রাহুল আরেকটা ঘুষি মারার আগেই, বজ্রের মতো শক্ত হাতে সায়মান ওর হাত চেপে ধরল। শ্বাস ভারী, চোখ লাল, কণ্ঠে বরফের মতো ঠান্ডা হুমকি ছুঁড়ে দিল———
————”Today whatever mistake you made, you made it. Next time, before you dare to raise your hand on me————— think twice.”
(“আজ তুমি যেই ভুলই করো না কেন, সেটা তুমি করেছোই। কিন্তু পরেরবার আমার ওপর হাত তোলার সাহস করার আগে—— দু’বার ভেবে নিও।”)
রাহুলের চোখে ক্রোধ দাউদাউ করে জ্বলছে। বুক ওঠানামা করছে, কপালে ঘাম। সায়মানের দৃঢ় দৃষ্টি আর তার দমবন্ধ করা কথাগুলো বাতাসে যেন কাঁপন ধরিয়ে দিল।
এহসান করিম এই দৃশ্য দেখে আর ধরে রাখতে পারলেন না। তিনি রিয়াদের পাশ বসা থেকে দাঁড়িয়ে উঠলেন। তার মুখ লাল হয়ে উঠেছে রাগে, চোখে রক্ত চেপে উঠেছে। বুকের ভেতর থেকে গজরানো কণ্ঠ বেরিয়ে এল——
———“How dare you raise your hand on my son?”
( “আমার ছেলের গায়ে হাত তোলার সাহস তোমার কীভাবে হলো?”)
হলঘরে তীব্র নিস্তব্ধতা। শিরিনার কান্না, রিয়াদের ক্ষীণ গোঙানি, আর সায়মানের বুক থেকে বেরোনো গর্জন———সব মিলিয়ে পরিবেশটা মুহূর্তেই আরও ভারী হয়ে গেল।
চারিদিক নিস্তব্ধ। মুহূর্তের জন্য যেন সময় থমকে গেছে।
সবার চোখ এখন একই দিকে————সায়মান, এহসান করিম আর রাহুলের সেই বিস্ফোরক সংঘর্ষের দিকে।
আফিয়া বেগম মুখে হাত চাপা দিয়ে তাকালেন সায়মানের দিকে। চোখ ভরা বিস্ময় আর আতঙ্কে তার ঠোঁট কেঁপে উঠছে। পাশে দাঁড়িয়ে থাকা ইমা বেগম আর বিলকিস আরা, একে অপরের দিকে তাকিয়ে স্তব্ধ, কিছু বলার ভাষা যেন হারিয়ে ফেলেছে।
হলঘরের অন্য পাশে, রিদওয়ান, আরিব, সাইফান, রুহি, জারিন আর রিশা সবাই একসাথে জড়ো হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। তাদের চোখে বিস্ময়, অবিশ্বাস। কয়েক মুহূর্ত আগে পর্যন্ত পরিবেশে ছিল উৎসবের আবহ, আর এখন যেন যুদ্ধক্ষেত্র।
রুশনা দ্রুত রাহিল আর ছোট্ট মিষ্টিকে নিয়ে সরে গেল পাশের দিকে। শিশুদের এমন দৃশ্যের মধ্যে রাখা যায় না————এটা ও ভালোভাবেই জানে। তার হাত কাঁপছে, কিন্তু দৃঢ়ভাবে বাচ্চাদের বুকের সাথে জড়িয়ে ধরে নিয়ে যাচ্ছে ঘরের দিকে।
ঠিক সেই মুহূর্তে রিদওয়ান অবিশ্বাসে ভরা স্বরে বলে উঠল———
—“এই, দা ভাই এ বেয়াদবটার এই হাল করলো কেন রে?”
তার কণ্ঠে বিস্ময় আর অস্বস্তির মিশেল।
রিশা ঠোঁট কামড়ে হালকা বিদ্রুপ করে বলল————
————“ঠিক আছে, বেয়াদব টার খুব চুলকানি উঠছিল, তাই ভাইয়া মনে হয় ধরে চুলকানির মলম দিয়ে দিয়েছে চুলকানি অল্প থাকতে থাকতে মলম দিয়ে দেওয়া উচিত না হলে এটা একসময় চুলকাতে চুলকাতে ঘাঁতে পরিণিত হয় ।”
কথাটা বলে সে মুখ নামিয়ে ফেলল, কিন্তু চোখের কোণে স্পষ্ট আতঙ্ক।
এই সময় হঠাৎ জারিন চারপাশে তাকিয়ে ভ্রু কুঁচকে উঠে বলল————
—————“ওয়েট… নাফিসা কোথায়?”
মুহূর্তেই সবাই যেন চমকে উঠল।
একসাথে অনেকগুলো কণ্ঠ মিশে গেল———
———— “হ্যাঁ তাই তো… নাফিসা কোথায়?”
চারপাশে খোঁজাখুঁজি শুরু হয়ে গেল। চোখের দৃষ্টি বারবার সিঁড়ি, কোণা আর দরজার দিকে ঘুরছে। নিঃশ্বাসের শব্দ আরও ভারী, যেন বাতাসে অস্থিরতা ছড়িয়ে পড়ছে।
সাইফান এ সময় দাঁত চেপে, কণ্ঠ উঁচু করে বলল————
———“বিষয়টা কি? তোরা ছটুকে খুঁজছিস কেন? ওর সাথে রিয়াদের কি সম্পর্ক? আসল কারণটা বল।”
তার কণ্ঠে ছিল এক ধরনের তীক্ষ্ণ সন্দেহ।
আরিব ততক্ষণে আরও বেশি উত্তেজিত হয়ে গেছে। বুক ওঠানামা করছে দ্রুততর ছন্দে। সে বলে উঠল————
————“হ্যাঁ, নাফিসার সাথে রিয়াদের কানেকশন কোথা থেকে আসছে? এই রহস্য কি?”
রুহি এবার ওদের তিনজনের দিকে আঙুল তুলে দাঁত চেপে বলল————
————“এই! তোরা কি লুকাচ্ছিস? বল তো! তোরা আগেই সব জানিস, তাই না? কি হয়েছে, সব বল!”
বাতাসে যেন ফিসফিস আওয়াজ জমে উঠল, একটা টান টান উত্তেজনা সবার ভেতর ছড়িয়ে পড়ছে।
হঠাৎই সিঁড়ির কাছে দাঁড়ানো একটা পরিচিত ছায়া চোখে পড়ল।
———“ওই তো… নাফিসা।”
সবাই একসাথে তাকাল।
সিঁড়ির ধাপে দাঁড়িয়ে আছে নাফিসা ——— চুল এলোমেলো, শাড়ি অগোছালো, মুখ ফ্যাকাশে। তার বুক ওঠানামা করছে দ্রুত, চোখে লজ্জা, ভয় আর অসহায়তার মিশ্রণ।
দৃশ্যটা দেখে সবাই মুহূর্তের জন্য নিস্তব্ধ হয়ে গেল।
তারপর হঠাৎ ভাঙা স্রোতের মতো সবাই দৌড়ে গেল ওর দিকে।
আরিব সামনে এগিয়ে এসে একবারে গলা শুকিয়ে ঢোক গিলল। মনে মনে শুধু প্রার্থনা করছে———— “না… যা ভাবছি তা যেন না হয়, তা যেন না হয়…”
নাফিসার দিকে এক এক জন এক এক ভাবে প্রশ্ন ছুঁড়ে
দিচ্ছে————
————“তোর এই অবস্থা কেন?”
————“কি হয়েছে?”
————“দা ভাই রেগে গেছো কেন?”
————“তুই এতক্ষণ কোথায় ছিলি?”
শব্দের ঝড় যেন নাফিসার চারপাশে ঘিরে ধরল।
ঠিক তখনই ভিড় ঠেলে এগিয়ে এলেন মাহবুব রাশিদ ও মঈন রাশিদ।
মঈন রাশিদ এগিয়ে গিয়ে দৃঢ় হাতে সায়মানের কাঁধে হাত রাখলেন। বুকের ভেতরে থেকে ভারী নিঃশ্বাস বেরিয়ে আসছে তার।
মাহবুব রাশিদ স্থির দৃষ্টিতে তাকালেন সায়মানের চোখের দিকে। চারপাশের কোলাহল যেন মুহূর্তেই থেমে গেল। কণ্ঠে শান্ত স্বর, কিন্তু ভেতরে স্পষ্ট ঝড়————
————“ওকে মারার কারণ কি?”
একটা প্রশ্ন, কিন্তু তার ভারী ওজন যেন চারপাশের বাতাসকেও জমাট বেঁধে দিল।
এহসান করিম দাঁত চেপে, চোখে রক্ত উঠে গর্জে উঠলেন। তার কণ্ঠ যেন বজ্রপাতের মতো কেঁপে উঠল চারপাশে————
————“মাহবুব! তোর ছেলে আমার ছেলেকে মেরে আধমরা করে ফেলেছে, রক্তাক্ত করেছে, আর তুই শান্তভাবে দাঁড়িয়ে তোর ছেলেকে প্রশ্ন করছিস কেন মারল? এটাই কি ন্যায়?”
তার বুক ওঠানামা করছে দ্রুত ছন্দে। শিরার ভেতর রক্ত যেন ফুটছে। চারপাশে উপস্থিত সবাই এহসানের রাগে থমকে গেল।
মাহবুব রাশিদ স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন এহসানের চোখে। চারপাশের উত্তেজিত কোলাহল যেন মুহূর্তেই থেমে গেল। তার ঠোঁটে শান্ত অথচ দৃঢ় শব্দ ভেসে এল—
————“আমি আমার ছেলেকে খুব ভালো করে চিনি, এহসান। সে কোনো কারণ ছাড়া কাউকে আঘাত করে না, এমনকি কারও খারাপ লাগবে এমন কথা বলাটাও তার স্বভাবে নেই। নিশ্চয়ই রিয়াদ এমন কিছু করেছে… যার শাস্তি হিসেবে আমার ছেলে তাকে এই অবস্থায় এনেছে।”
কথাগুলো যেন ধারালো অস্ত্রের মতো নীরবতা ভেদ করে বেরিয়ে এলো।
সায়মান নিঃশব্দে বাবার দিকে তাকাল। চোখে এক অদ্ভুত ঝড়, কিন্তু ঠোঁটে কোনো শব্দ নেই।
এহসান করিম এবার পুরোপুরি তেতে উঠলেন, হাত কাঁপছে ক্রোধে। তিনি চিৎকার করে উঠলেন———
————“ কি এমন অন্যায় করলো তাই বলে আমার ছেলেকে মেরে আধমরা করে দেবে? এটাই নাকি তোর ন্যায়বিচার?”
মাহবুবের দৃষ্টি এহসানের চোখে গেঁথে রইল। শান্ত কণ্ঠে জবাব দিলেন———
————“সেটা তোর ছেলেকে জিজ্ঞেস কর, এহসান। আমি আমার ছেলেকে ভালোভাবে চিনি।”
তারপর সায়মানের দিকে ঘুরে দাঁড়ালেন। গলায় দৃঢ়তার সাথে বললেন———
————— “ঠিক কি হয়েছে খুলে বল। তুমি একজন আইনের লোক, তোমার কাজ ছিল শান্ত মাথায় সমাধান করা, এভাবে মারামারি নয়।”
হলঘরের বাতাস যেন জমাট বেঁধে গেল। সবার নিঃশ্বাস ভারী হয়ে আসছে। সবাই সায়মানের দিকে তাকালো আসল কাহিনী জানার জন্য।
সায়মানের চোখ রিয়াদের দিকে গেল। আগুনের মতো লাল চোখে সে চিৎকার করে উঠল, গলায় কাঁপা কাঁপা শব্দ ছুটে এল———
—————”That bastard dared to touch my little doll! That fcking son of a btch put his filthy hands on her. I swear, I will kill him right here, right now!”
( “ওই হারামজাদা আমার পিচ্চি পুতুলকে ছুঁয়ে দুঃসাহস করেছে! ওই অভিশপ্ত নোংরা শয়তান ওর গায়ে হাত দিয়েছে। ওকে আমি আজ , এখানেই মেরে ফেলবো এখনই !”)
শব্দগুলো বজ্রের মতো প্রতিধ্বনিত হলো চারপাশে। সায়মান হঠাৎ ঝাঁপিয়ে পড়ল রিয়াদের দিকে, চোখে খুনের আগুন। চারপাশে হাহাকার।
মঈন রাশিদ আর সাইফান দৌড়ে গিয়ে দুই দিক থেকে সায়মানকে চেপে ধরল। ওর বিশাল দেহকে নিয়ন্ত্রণ করা যেন অসম্ভব হয়ে উঠল। ওর ভিতর মনে হচ্ছে কিছু ভর করেছে দুইজন মিলে হিমশিম খাচ্ছে সামলাতে। দুজনের হাত কাঁপছে, বুক দপদপ করছে তীব্র চাপে।
মাহবুব রাশিদ ভুরু কুঁচকে সায়মানের দিকে তাকালেন, কণ্ঠ ভারী হয়ে উঠল————
————— “পিচ্চি পুতুল কে?”
কথাটা শোনামাত্রই নিস্তব্ধ ভিড়ের মধ্যে থেকে রিশা এক পা এগিয়ে এল। গলায় কাঁপা কাঁপা স্বর, কিন্তু দৃঢ়তাও আছে।
————“বড় আব্বু… পিচ্চি পুতুলটা নাফিসা। রিয়াদ চার বছর ধরে নাফিসার পেছনে লেগে ছিল। সব সময় বিরক্ত করত। কিন্তু এবার তো সীমা ছাড়িয়ে গেছে… নাফিসার সাথে জোর করে… রেপ করার চেষ্টা করছিল। দা ভাই সময়মতো না এলে…”
তার গলা ভারী হয়ে এল, চোখ দিয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ল। তবু দাঁত চেপে শেষ কথাটা ছুঁড়ে দিল————
—————“এটা স্বাভাবিকই তো ভাইয়ার এভাবে রিএক্ট করা। ওই শয়তানটার সাথে এমন না করলে আর কিভাবে শিক্ষা হতো?”
কথাটা ভিড়ের মধ্যে গর্জনের মতো বাজল। অনেকেই বিস্ময়ে স্তব্ধ।
আফিয়া বেগম দাঁড়ানো অবস্থায় কেঁপে উঠলেন। মনে হলো পায়ের নিচে মাটি সরে গেল। দৌড়ে গিয়ে নাফিসাকে বুকে জড়িয়ে ধরলেন। দুই হাতে মুখ ধরে বারবার চুমু দিচ্ছেন, বুক ভেঙে যাচ্ছে কান্নায়।
———“মা… আমার মা… তোকে আমি সামলাতে পারলাম না। তোকে আমি আগলে রাখতে পারলাম না… আমি কি তবে তোর মা হয়ে উঠতে পারিনি? আমাকে ক্ষমা করে দে, মামনি…”
অশ্রু টপটপ করে পড়ছে আফিয়ার চোখ থেকে। নাফিসা হঠাৎ বুক ভেঙে কেঁদে উঠল। কাঁপা কণ্ঠে আঁকড়ে ধরল———
————“মামনি…”
হলঘরের নিস্তব্ধতা এবার কান্নার শব্দে ভরে উঠল।
কিন্তু এহসান করিম আবার দাঁড়িয়ে উঠলেন। চোখ লাল, কণ্ঠ গর্জে উঠল———
————“আমি মানি না! আমার ছেলে এরকম না! আমি আমার ছেলেকে চিনি। নিশ্চয়ই ওই মেয়ের দোষ আছে।”
রাহুল চুপ করে দাঁড়িয়ে আছে ওর বিশ্বাস হচ্ছে না রিয়াদ এমন কিছু করতে পারে।
শিরিনা করিমও এবার ছেলের মাথা কোলেতে নিয়ে কান্না ভেজা স্বরে যোগ দিলেন———
————“হ্যাঁ, ঠিকই বলছ। আমার ছেলে কখনো এ কাজ করতে পারে না। এই মেয়েই সব দোষের গোড়া! আমার ছেলেকে ফাঁসিয়েছে। আমার রিয়াদ… ছেলের বুকের উপর হাত বুলিয়ে দিচ্ছে আর বলছেন !”
তার কণ্ঠ ফেটে যাচ্ছে। চোখ রক্তাক্ত হয়ে উঠছে কান্না আর রাগে।
এই মুহূর্তে সুযোগ পেয়ে সাবিহা খালেদ এগিয়ে এলো। অনেকক্ষণ ধরে সে চুপচাপ ছিল। এবার দাঁড়িয়ে কণ্ঠ উঁচু করে বলল———
———“তোমরা সবাই আগে থেকেই জানো। এসব মেয়েরা… এরা বড়লোকের ছেলেদের উসকানি দেয়। পরে যখন কিছু হয়, তখন নিজেদের নির্দোষ সাজায়। সবই ধান্দা!”
নাফিসা অপমানে মাথা নিচু করে ফেললে চোখ দিয়ে ক্রমগত পানি করাতে শুরু করলো।
কথা শেষ হওয়ার আগেই আফিয়া বেগম, চোখে আগুন নিয়ে গর্জে উঠলেন। এক হাতে নাফিসাকে জড়িয়ে ধরে দাঁত চেপে বললেন———
———— “আর একটা কথা বললে আমি ভুলে যাব তুমি কে, সাবিহা!”
সাবিহার মুখ থমকে গেল।
শিরিনা আবার কেঁদে উঠলেন—
———“আমার ছেলেকে ফাঁসাচ্ছে! ওই মেয়েই দোষী। সব ওর জন্য হয়েছে!”
শব্দগুলো পরিবেশ আরও ভারী করে তুলল।
সায়মান এতক্ষণ দাঁত চেপে সবার কথা শুনছিল। হঠাৎ নিজের রাগ আর থামাতে পারল না। বজ্রের মতো গর্জন দিয়ে বিশাল কাঁচের ডাইনিং টেবিলটা দুহাত দিয়ে ধাক্কা মেরে ফেলে দিল।
“ধাম!” শব্দে টেবিল চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে কাঁচের টুকরো ছড়িয়ে গেল চারপাশে। আতঙ্কে সবাই একসাথে চিৎকার করে উঠল।
শব্দের অভিঘাতে অতিথিরা কান চেপে ধরল। সাবিহা খালেদ টেবিলের কাছেই দাঁড়িয়ে ছিল। কাঁচের বড় বড় টুকরো তার পায়ের কাছে এসে পড়তেই সে ভয়ে লাফিয়ে উঠল।
চারপাশ মুহূর্তেই নিস্তব্ধ। নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে এল সবার।
সায়মান বজ্রকণ্ঠে গর্জে উঠল———
———— “One more f*cking word… and I swear, you’ll see the worst side of me!”( “আর একটা বাজে কথা বললেই… আমি শপথ করে বলছি, তুমি আমার সবচেয়ে ভয়ঙ্কর রূপটা দেখবে!”)
তার কণ্ঠে এমন ঠান্ডা হুমকি ছিল যে পুরো হলঘরের বাতাস জমে গেল। কেউ সাহস পেল না আর কিছু বলার।
তারপর সে তীক্ষ্ণ চোখে তাকাল নাফিসার দিকে। গলা চিরে বেরিয়ে এলো ধমক—
———“Go upstairs. Now!”
( “উপরে যাও। এখনই!”)
শব্দটা বজ্রপাতের মতো আঘাত করল নাফিসার বুকে। সে চমকে উঠল। চোখ ভিজে উঠল, কাঁপতে কাঁপতে আফিয়াকে ছেড়ে দৌড়ে গেল সিঁড়ির দিকে।
রুহি, রিশা, জারিন, আফিয়া বেগম, ইমা বেগম আর বিলকিস আরা ছুটে গেল তার পিছনে। সিঁড়ি বেয়ে ওঠার শব্দে পরিবেশটা আরও ভয়ংকর নিস্তব্ধ হয়ে উঠল।
হলঘরে রয়ে গেল শুধু ভাঙা কাঁচের গর্জন, রক্তের গন্ধ, আর দমবন্ধ করা উত্তেজনা।
তাহমিদ ইকবাল এতক্ষণ চুপচাপ দাঁড়িয়ে ছিলেন, চোখে দৃঢ়তা, মুখে শীতলতা। সবাই অবিশ্বাস আর উত্তেজনায় চুপচাপ। অবশেষে তিনি ধীরে ধীরে এগিয়ে এসে সায়মানের কাঁধে শক্ত হাতে হাত রাখলেন।
“Calm down, my boy.”( “শান্ত হও, আমার ছেলে।”)
তিনি বললেন, কণ্ঠে স্থিরতা, কিন্তু চোখে সম্পূর্ণ সাহস ও বোঝাপড়া।
তারপর তিনি চারপাশের দিকে তাকালেন। সবাই তাকিয়ে আছে, নিঃশ্বাস থমকে গেছে। সে শান্ত কণ্ঠে বললেন——
আমি মনে করি, এই বিষয়টি পরিবারের মধ্যে সমাধান করা উচিত। বাকি সব কাজ আইন অনুসারে যথাযথ প্রতিষ্ঠানগুলোর মাধ্যমে হবে।”
অতিথিরা একে অপরের দিকে চাওয়াচাই করতে লাগল। চোখে অদ্ভুত অস্থিরতা, কিছুটা লজ্জা, কিছুটা অবাক ভাব। মুহূর্তেই পরিবেশ শান্ত হলেও ভারী হয়ে গেছে।
মাহবুব রাশিদ ধীরে ধীরে ধ্যান দিয়ে সবার দিকে তাকালেন। তাঁর কণ্ঠে মৃদু, শান্ত স্বর, কিন্তু প্রত্যেক কথায় শোভা পাচ্ছিল শক্তি———
“মাফ করবেন, আমরা কেউই বুঝিনি এমন পরিস্থিতি তৈরি হবে। আজকে কোনো এনগেজমেন্ট সম্ভব নয়। আপনাদের কাছে আমরা আবারও অসংখ্য দুঃখিত। আশা করি সবাই আমাদের ভুল বুঝবেন না।”
মঈন রাশিদ আর সাইফান অতিথিদের সাথে কথা বলল। একে একে অতিথিরা চলে যেতে লাগল, পরিবেশ এখন কিছুটা শান্ত, তবে নিঃশ্বাসে এখনও উত্তেজনার ছাপ।
হল ঘরে রয়ে গেল কেবল এহসান করিমের পরিবার এবং তাহমিদ ইকবাল, রাজিব ও রাশিদের ঘরের সদস্যরা।
তাহমিদ ইকবাল রাজিবের দিকে তাকিয়ে বললেন, “রাজিব, দূরত্বে এম্বুলেন্স ডাকো। বাকি কাজ আইন অনুযায়ী হবে।”
এহসান করিম রেগে গর্জে উঠলেন, চোখ লাল হয়ে, মুখে উত্তেজনা———
“কি হচ্ছে? বিনা কারণে আমার ছেলেকে মারার পর, রেপের দোষ দিয়ে এখন জেলে নিয়ে যাওয়া? আমি সবকিছু নিজে দেখব, কাউকে ছাড়ব না। মাহবুব, যা করলি, ভালো করলি না বন্ধু বলে ছাড়ব না। এই অপমানের সুদে আসলে আমি পূরণ করব।”
মাহবুব রাশিদ মৃদু মুচকি হাসি মুখে———
“এহসান, তুই ভালো করে জানিস, আমি কখনো অন্যায়ের সাথে আপোষ করি না। এত বছরের রাজনীতি ক্যারিয়ারে নিজের দলকে টিকিয়ে রেখেছি। ন্যায়ের দিকে আমার বিশ্বাস সব সময় অটল———রাজনীতি মানে জঘন্য কিছু করা নয়। সেটা নিজেকে সবসময় অন্যায় এর দিক থেকে দূরে থাকার চেষ্টা করেছি। তুই আমাকে ধমকাচ্ছিস, মনে রাখিস, কাকে ধমকাচ্ছিস সেটা মাথায় রেখে কথা বলবি।”
এহসান ততক্ষণে আরও তেতে উঠলো, কণ্ঠ ঝাঁঝালো————
“আমার ছেলের সাথে তোদের বাড়ির মেয়ের বিয়ে আমি ভেঙে দিলাম এখন এই মুহূর্তে।”
মাহবুব রাশিদ হেসে বললেন, শব্দ করে————
“তুই ভাঙবি কি? অনেক আগেই সব শেষ করে দিয়েছি। তুই বললেও কি, না বললেও কি। গেট আউট———— এই বাড়িতে সীমানায় চলো কাউকে না দেখি তোদের ।”
রাজিব ফোন দিয়ে এম্বুলেন্সকে ডাকলো। তার টিম এসে রিয়াদকে নিয়ে হসপিটালে যাওয়ার ব্যবস্থা করল। করিম পরিবারের বাকি সদস্যরাও রিয়াদের দিকে এগোতে লাগল। যাওয়ার আগে এহসান করিম আবার দৃঢ়ভাবে শাসালেন————
“দেখে নেব কাউকে ছাড়বে না।”
সায়মান এখনো চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে । তাহমিদ ইকবাল ধীরে এগিয়ে এসে তার কাঁধে হাত রাখলো।
“তোমার উপর আমি চিরকাল প্রাউড ছিলাম, মাই বয়,।”
তারপর আবার করলেন————
চৌদ্দের চিঠি পর্ব ২৬
“যাইহোক, ভেবেচিন্ত কাজ করো, মাথা ঠান্ডা রাখো। কয়দিন ছুটি নাও। আমরা এখন আমি আসি।”
মাহবুব রাশেদ এবং মঈন রাশিদের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে তাহমিদ ইকবাল ও রাজিব ধীরে ধীরে চলে গেলেন।
হলঘরের বাতাস এখন শান্ত। কেবল নিঃশ্বাসে চাপ, ভাঙা কাঁচের শব্দের স্মৃতি এবং একটা দীর্ঘ মুহূর্তের উত্তেজনা এখনো ধীরে ধীরে কমছে। চারপাশে অবশিষ্ট সবাই একত্র হয়ে দাঁড়িয়েছে, চোখে অস্থিরতা, হৃদয়ে চিন্তা———কিন্তু একরকম শান্তি এসেছে, অন্তত তৎক্ষণাৎ।
