চৌদ্দের চিঠি পর্ব ৩৪
আরোবা চৌধুরী আরু
সায়মান দরজা বন্ধ করে হাতে থাকা ব্যাগটা টেবিলের ওপর রাখল। তারপর ব্যাগ থেকে একটা প্যান্ট বের করে দ্রুত পড়ে নিল।
চোখ গেল বিছানায় শুয়ে থাকা নাফিসার দিকে, এখনো গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন তার বউটা।
ধীরে ধীরে কাছে এগিয়ে গিয়ে শুয়ে পড়ল ওর পাশেই। নাফিসার পরনে তার নিজের শার্ট, একবার মুখটা ভালো করে পর্যবেক্ষণ করলো। ঘুমিয়ে থাকার দরুন আরও মায়াবী লাগছে তার পিচ্চি পুতুলকে। তারপর শার্টটাতে হাত বাড়িয়ে দু’একটা বোতাম আলগা করে নিয়ে, মুখ গুঁজে দিল বুকের গভীরে। নাক বোলাতে বোলাতে মাঝেমধ্যে হালকা চুমু এঁকে দিতে লাগল।
গভীর ঘুমের মধ্যেও এভাবেই স্পর্শ করাই নাফিসার ঘুমের ব্যাঘাত ঘটলো। পিটপিট করে চোখ খুলে, সায়মানকে এভাবে তার এত কাছে থাকতে দেখে লজ্জায় লাল হয়ে গেল। মুহূর্তের মধ্যে রাতের কথা স্মরণ হতেই লজ্জায় সায়মানকে হাত দিয়ে সরাতে চাইলো।
কিন্তু এই নিলজ্জ স্বামী নামক পুরুষ কি সহজে সরতে চাই? সে নিজের কাজে বাঁধা পেয়ে, জেদি ভঙ্গিতে নাফিসার বুকের উপর মুখ গুঁজে রেখেই বলল মৃদু স্বরে,
“Sweet baby wifey… তুমি যতই সরাতে চাও, আমি ছাড়ছি না। রাতের পরেও মনে হচ্ছে আমি তোমাকে এখনো পুরোটা পাইনি।”
নাফিসা চোখ বড় বড় করে তাকাল। বুক ধকধক করছে, মনে হচ্ছে শরীরের ভেতরটা আবার আগুনের মতো জ্বলে উঠছে। তবুও লাজুক কণ্ঠে মিনমিন করে বলল,
আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন
“উঠেন তো… অনেক বেলা হয়ে গেছে, ভাইয়ারা হয়তো আমাদের জন্য অপেক্ষা করছে?”
সায়মান এক ঝটকায় মুখ তুলে তাকাল ওর দিকে। চোখে-মুখে এক অদ্ভুত উন্মাদনা, ঠোঁটে হালকা এক চওড়া হাসি।
“করতে দাও, বেশি কথা বলো না আমার পিচ্চি বউ।”
কথাটা বলে আবারও নিজের ঠোঁট নামিয়ে আনল। এবার একের পর এক চুম্বনে ভরিয়ে তুলল নাফিসার গলা আর বুকের মাঝামাঝি অংশ।
নাফিসা হাত দিয়ে ওকে ঠেকাতে গেলেও, সায়মান তার হাতদুটো ধরে খাটের ওপর চেপে ধরল। তারপর দাঁত বসিয়ে দিল নরম চামড়ায়।
“আহ্…” ব্যথা মিশ্রিত এক গুমরে ওঠা শব্দ বেরিয়ে এলো নাফিসার ঠোঁট থেকে।
সায়মান সেই শব্দ শুনে আরও পাগল হয়ে উঠল। দাঁত বসানো জায়গাটাই সঙ্গে সঙ্গে মুছে দিল ভেজা চুম্বনে। যেন ব্যথা আর লজ্জা দুটোই চুষে নিয়ে শুধু আদরে ভরিয়ে দিতে চাইছে।
নাফিসার চোখ ভরে উঠছে অশ্রুতে, কিন্তু সেটা আর পুরোপুরি দুঃখের নয়। তার বুকের ভেতর মিশে আছে ভালোবাসা, আবেগ আর স্বামীর ছোঁয়ার প্রতি অদ্ভুত এক আত্মসমর্পণ।
সায়মান ফিসফিস করে বলল,
“তুমি আমার… শুধু আমার। আজীবন তুমি আমার পকেট-সাইজ সুখ, আমার ছোট্ট পুতুল।”
নাফিসা আর কিছু বলল না। শুধু চোখ বন্ধ করে মাথা গুঁজে দিল সায়মানের বুকে, আর জড়িয়ে ধরল তাকে।
ঘর আবারও ভরে উঠল দুজনার নিঃশ্বাসে, একে অপরের দমবন্ধ করা আবেগে।
সাইফান নিজের সাথে বকবক করতে করতে তাদের জন্য বরাদ্দ থাকা ঘরে ঢুকল। ভেতরে গিয়ে দেখে রাজিব ফোনে ব্যস্ত।
চুপচাপ দরজার কাছে দাঁড়িয়ে কান পাতল।
রাজিব নরম স্বরে বলছে,
“প্লিজ বেবি, রাগ কোরো না। আমি ছুটি নিয়েই নেবো। এখন তুমি একা একা শপিংটা করে নাও। আমি চাই বিয়ের পর তোমার সাথে সময়টা আরও বেশি কাটাতে। তাই একটু দেরি করে ছুটি নিচ্ছি, বোঝার চেষ্টা করো।
বিয়ের আগে যদি বাসরের নিয়ম থাকত, আমি অনেক আগেই ছুটি নিয়ে নিতাম। কিন্তু নিয়ম তো বিয়ের পরই বাসর করা,তাই ছুটি ও দেরিতে নিচ্ছি যাতে তোমাকে সময় বেশি দিতে পারি বেবি…।”
ওপাশ থেকে কী উত্তর এলো সেটা সাইফানের কানে পুরোপুরি পৌঁছাল না। শুধু দেখল, রাজিব হঠাৎ ফোনটা কানের থেকে সরিয়ে বাংলার প্যাঁচার মতো মুখ করে ফোনের দিকে তাকাচ্ছে। তারপর দাঁত কেলিয়ে হেসে ফোন অফ করে দিয়ে ধপ করে খাটের উপর লম্বা হয়ে শুয়ে পড়ল।
সাইফান চোখ বড় বড় রাজিবের দিকে তাকিয়ে,
“আরে বাবা! রাজিব ভাই তো এমনিতে ভদ্র সাজে, কিন্তু ভেতরে যে এক নম্বর পাজি, তা কে জানত? একেবারে মধু খাওয়ার জন্য অস্থির! শুধু অমৃতার কথা বলল আমাকে, কিন্তু নিজে পুরো মধুর চাকটা খাবার জন্য বসে আছে, সেটা লুকাল কেন?”
একটা শয়তানি দিয়ে,
“আজকে রাজিব ভাইকে ছাড়ব না। মুখ থেকে সব বের করিয়েই ছাড়ব।”
বলেই এগিয়ে গিয়ে রাজিবের পাশে শুয়ে পড়ে রাজিবকে জড়িয়ে ধরল।
রাজিব চোখ বন্ধ করে ছিল, হঠাৎ এমন আচরণে আঁতকে উঠে চোখ মেলে বলল,
“এই সাইফান! কি করছো? ছাড়ো আমাকে!”
সাইফান গম্ভীর গলায় বলল,
“না ভাই, আজকে ছাড়ছি না। তুমি শুধু অমৃতর কথা বললে। কিন্তু মধুর চাক খাওয়ার জন্য যে উতলা হয়ে আছো সেটা বললে না কেন? আজ তোমার কাছ থেকে সব শুনেই ছাড়ব।”
রাজিব তড়িঘড়ি করে নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে উঠে বসল।
“সাইফান, তুই আমার ভাই। আমি সব বলব, কিন্তু এভাবে চেপে ধরিস না। আমার হবু হবু বউ যদি দেখে, তাহলে হবু হবু বউই থেকে যাবে, বউ হয়ে উঠবে না। সাথে শুধু বিয়ে ভেঙেই দেবে না, আর ভেঙার আগে আমাকে মেরে ফেলে যাবে। প্লিজ ছোট ভাই, আমার থেকে দূরে থাক।”
সাইফান দুষ্টু হাসি দিয়ে আবার এগিয়ে আসতে গেলে, রাজিব তাড়াতাড়ি খাটের পাশে রাখা নিজের শার্টটা হাতে তুলে নিয়ে দৌড়ে দরজা খুলে বাইরে বেরিয়ে গেল।
সাইফানও দরজা পর্যন্ত ছুটল, কিন্তু তার আগেই রাজিব উধাও।
বিছানায় ফিরে এসে সাইফান পেট চেপে ধরে হো হো করে হেসে উঠল।
“আহা ভাই, জীবনে একটাই সমাধান, বিয়ে ছাড়া আর উপায় নাই। ভবিষ্যৎ বউ হয়তো আমার জন্যই এখন কান্নার বন্যা বইয়ে দিচ্ছে। তাই আর অপেক্ষা না করে তাড়াতাড়ি বিয়ের ব্যবস্থা করতেই হবে। তারপর ইচ্ছেমতো যখন খুশি অমৃত খাব আহ….শান্তি,… শান্তি!”
বলতে বলতে বালিশে মাথা দিয়ে ঘুমিয়ে গেল সাইফান।
গভীর ঘুমে তখনো মগ্ন সাইফান। হঠাৎ কেউ কানে খোঁচা দিতেই বিরক্তিতে তার চোখ-মুখ কুঁচকে উঠল।
“উফফ… কে রে আবার! ঘুমেরও শান্তি নাই।”
কিন্তু আবারও একই কাজ এবার আরও জোরে।
ঘুমটা একেবারে ভেঙে গেল। রাগে গজগজ করতে লাগল,
“এই কেরে… কে বাল! ঘুমের মধ্যে একটু বউয়ের কাছ থেকে অমৃত খেতে যাচ্ছিলাম। একটুখানি তাও স্বপ্নে মধ্য এসে ব্যাঘাত দিল। শালা, আজ ধরে পশ্চাৎদেশে লাথিই মারব!”
বলে হঠাৎ উঠে বসল।
চোখ মেলে একবার দেখে, আবার দুই হাত দিয়ে চোখ কচলানো তারপর যা দেখল, তাতে সাইফানের চোখ আরও বড় বড় হয়ে গেল।
সামনে দাঁড়িয়ে আছে তিনজন পুলিশ অফিসার। আর তাদের পাশে এক মহিলা, শরীরের পোশাক-আশাকের বেহাল দশা।
তাড়াতাড়ি বুকের উপর হাত দিয়ে ফুঁ দিয়ে উঠল,
“আস্তাগফিরুল্লাহ… আস্তাগফিরুল্লাহ!”
মনে মনে আতঙ্ক,
“হায় আল্লাহ! আমি কি আবার স্বপ্নের ভেতর এই মহিলার সাথে কিছু করে ফেলেছি নাকি? নাহ, নাহ, আমি তো স্বপ্নেই অমৃত খেতে গিয়েছিলাম ঠিকিই, কিন্তু এই মহিলা তো এখানে ছিল না কোথা থেকে টপকালো। আর কি বেহাল অবস্থা।”
এবার পুলিশ অফিসারদের একজন রাগে গর্জে উঠল,
“এই ওঠ! দিনে-রাতে এখানে শুধু নষ্টামি করতেই আসিস? আজ সবগুলোকে জেলে নিয়ে গিয়েই ছাড়ব।”
বলেই সাইফানের হাত ধরে টান দিল।
সাইফান তাড়াতাড়ি হাত ছাড়াতে লাগল,
“আরে কি করেন স্যার! আমি কিছুই করি নাই। এই চাচি আম্মার মতো দেখতে মহিলাটা আমার ঘরে এল কিভাবে, সেটা আগে বলেন তো!”
অফিসার চোখ রাঙিয়ে বলল,
“সেটা তো আপনিই বলবেন, মহাশয়। মেয়ে নিয়ে হোটেলে নষ্টামি করতে আসেন, এখন আবার সাধুর সাজার অভিনয় করছেন! এই মুহিব, ধরো একে।”
কনস্টেবল এগিয়ে আসতেই সাইফান চেঁচিয়ে উঠল,
“এই চাচি আম্মা! আপনি এই রুমে ঢুকলেন কিভাবে বলেন? ছিঃ! এমন চাচি আম্মার সাথে আমি কিছু করব, এইটা ভাবলেন কিভাবে স্যার!”
মহিলাটা চোখ মুখ কুঁচকিয়ে সায়ফানের দিকে তাকালো।
পুলিশ অফিসার ভ্রু কুঁচকে কনস্টেবলকে ইশারা করল সাইফানকে ধরতে।
সাইফান এবার এক লাফে খাট থেকে নেমে দৌড় দিল।
করিডোর জুড়ে ধপধপ শব্দ তুলে ছুটতে লাগল সে। পিছনে তিন পুলিশ অফিসার, গম্ভীর মুখে ধাওয়া করছে।
সাইফানের মুখে তখনও গজগজ,
“হায় আল্লাহ, আমি না গরিব সিঙ্গেল মানুষ, তাও আবার এমন অপবাদ! ভাইরে ভাই, মধু খাওয়ার স্বপ্ন দেখার অপরাধে এখন জেলখানায় নিয়ে যাবে মনে হয়।”
অবশেষে এসে থামল সায়মানদের রুমের সামনে। বুক ধড়ফড় করছে, নিঃশ্বাস হাঁপাচ্ছে।
পিছন থেকে পুলিশরা চেঁচিয়ে উঠল,
“এই থামো! পালানোর চেষ্টা করো না। আজ হাতে-নাতে ধরেছি।”
পুলিশগুলো ওর কাছে এসে দাঁড়িয়ে হাপাচ্ছে। সাইফান একবার ওদের দিকে তাকালো, তারপর আশেপাশে তাকিয়ে দেখলো এদিক ওদিক থেকে সব বেহাল অবস্থায়, বিভিন্ন মহিলা ও ছেলেদের পুলিশ বের করছে। পোশাকের অবস্থা দেখে ওর বোঝা শেষ যে এটা কেমন হোটেল, আর হোটেলের রেট পড়েছে।
সায়ফান কড়া কণ্ঠে দরজা ধাক্কা দিল,
“ভাই, এ ভাইয়া! অপকর্ম করলে তুমি আর ধরে নিয়ে যাচ্ছে আমার মত সিঙ্গেল গরিবকে? আমি এখনও অমৃত খাইনি, ভাই, আর এরা আমাকে অশ্লীল কাজ করার অপবাদ দিচ্ছে!”
হে আল্লাহ তুমি এর বিচার কর, আস্তাগফিরুল্লাহ… আস্তাগফিরুল্লাহ…
পুলিশ অফিসারটা বিরক্ত হয়ে বলল,
“এই আপনি চুপ করবেন?”
সাইফান চোখ ছোট ছোট করে তাকিয়ে,
“আপনি আমার বিরুদ্ধে মামলা করছেন, আমাকে ধরে নিয়ে যাবেন। আর আমি কি চুপ থাকব? এই ঘরে অপকর্ম চলছে। আমার ভাই তার ছোট-বিবাহিত স্ত্রীর কাছ থেকে দুষ্টু দুষ্টু আচর নিয়েছে, আমি নিজের চোখে আমার ভাইয়ের বডি পর্যবেক্ষণ করে দেখেছি।”
পুলিশ অফিসার ভুরু কুঁচকে তাকালো। একটা কনস্টেবলক ডাক দিল, মুহিব,
“এখনই কষ্টেপ নিয়ে আসার ব্যবস্থা করো। নিয়ে এসে আগে এই লোকটার মুখে কষ্টেপ মারো।”
সাইফান এবার হাত জোরে ধরে, গলায় কষ্ট মেশানো স্বরে অনুনয় করল,
“না প্লিজ, এমন করবেন না। কষ্টেপ লাগানোর ফলে, যদি আমার রসালো ঠোঁটের ওপর আঘাত লাগে, আর আমার ভবিষ্যতে বউ যদি আমাকে চুমু খেতে না চায়, তাহলে আমি অমৃত সাধ কেমনে পাবো আয় হায়।”
মাথায় হাত দিয়ে, আর এই বালের রাজিব ভাইটা কই গেল?
বলেই, সায়ফান আবার দরজা ধাক্কা দিলো,
“ভাই, এ ভাই দরজাটা খোল, না হলে এরা আমাকে জেলে তো নিয়েই যাবে। তার ওপর আমার বউয়ের সম্পদের দিকে চোখ দিয়েছে। আমার অমৃত খাওয়া থেকে বঞ্চিত করার গভীর ষড়যন্ত্র নেমেছে সব।”
সায়মান তার পিচ্চি বউয়ের ছোট্ট শরীরকে অস্থির করে তুলতে ব্যস্ত ছিল। গভীর মুহূর্তের সময় হঠাৎ বাইরে দরজায় লাগাতার শব্দ হলো। সায়মান বিরক্ত হয়ে, নাফিসার উপর থেকে সরে এসে একবার চোখ বুলিয়ে দেখল—মেয়েটার চোখ-মুখ কুঁচকে বন্ধ,জোরে জোরে নিশ্বাস নিচ্ছে ।
নিজেকে ঠিক করে নেওয়ার পর, সায়মান নাফিসাকে ধীরে ধীরে কোলে তুলে নিল। ওয়াশরুমের দিকে হাটতে লাগল।
ওয়াশরুমে পৌঁছে নাফিসাকে দাঁড় করিয়ে দিয়ে, দুই হাতে তার গাল আগলে নিল। তারপর ছোট্ট, কোমল এক চুমু দিল, ঠোঁটের হালকা ছোঁয়া নাফিসার অধরে পড়ল।
নাফিসা জড়োসড়ো হয়ে দাঁড়িয়ে আছে, দিনের আলোয় পুরো বাথরুম স্পষ্টভাবে দৃশ্যমান। সায়মানের শার্ট এখনও তার শরীরে, হাটুর উপরে উঠে আছে। লজ্জায় নাফিসার গাল ক্রমাগত লাল হয়ে উঠছে।
সায়মান তার দিকে তাকিয়ে, ঠোঁটের কোণে হালকা একটি হাসি ফেলে। নাফিসার কানের কাছে গিয়ে ফিসফিস করে বলল,
“এইভাবে নিজেকে লজ্জায় গুটিয়ে নেওয়ার দরকার নেই। তোমার কোন কিছু দেখা আমার বাদ নেই। কাল রাতে তুমি আমার কাছে গোসল করেছ, তাই অভ্যাস করে নাও। এখন থেকে এক চুলও ছাড় দিব না।”
লজ্জায় নাফিসা দুই হাত দিয়ে নিজের মুখ ঢেকে নিল।
সায়মান মুচকি হাসি দিয়ে নাফিসার দিকে এগোতে গেলেই,
তখনই দরজায় আবার লাগাতার শব্দ হলো। হঠাৎ মন স্থির করতে না পেরে সায়মান নাফিসাকে বাথরুমের ভিতরে রেখে ঘরে ফিরে গেল। প্যাকেট থেকে জামাকাপড় বের করে হাতে নিয়ে আবারও ওয়াশরুমের দিকে চলে গেল।
“দূরে চেঞ্জ করে নাও। সময় পেলে আমি চেঞ্জ করে দিতাম। এখন কষ্ট করে নিজে করো, আর যতক্ষণ না আমি রুমে আসি, ততক্ষণ বাইরে বের হবে না রুম থেকে।”
বলেই সায়মান চলে গেল।
নাফিসার লজ্জায় মনে হলো মাটির সাথে মিশে যাবে। এই নিলজ্জ, ডিএসপি সাহেবের রূপ তো সে আগে কখনো দেখেনি। ভাবতে ভাবতে তাড়াহুড়ো করে নিজের জামা চেঞ্জ করতে লাগল।
সায়মান ঘরে এসে একটা শাট পড়ে দরজা খুলল।
সাইফান সায়মানকে দেখে, কান্না-মাখা ভঙ্গিতে কেঁদে উঠল,
“আমার ভাইয়া, ভাইয়া… দেখো, পুলিশ বাহিনী কিভাবে আমার পিছনে লেগেছে।” বলে সায়মানকে জড়িয়ে ধরল।
সায়মান কপাল গুটিয়ে সাইফানের দিকে তাকালো। তারপর সামনের দিকে নজর দিল।
সামনের পুলিশ অফিসাররা সায়মানকে দেখার সঙ্গে সঙ্গেই সম্মানসূচক স্যালুট দিল।
“স্যার, আপনি এখানে…” অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল সাইফানের সঙ্গে বকবক করা অফিসাটা ।
সাইফান এবার ভাইকে ছেড়ে চোখ গোল গোল করে তাকাল, অফিসারের দিকে।
“আয় হায়, আমার তো মনেই ছিল না, আমার ভাইও পুলিশ অফিসার। ইস মিস হয়ে গেল, আগে বললে এত টানাটানি হতো না!”
সায়মান চড়ক চোখে সাইফানের দিকে তাকাল।
সাইফান দাঁত কেলিয়ে চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল, সায়মানের দিকে তাকিয়ে।
“স্যার, আপনি এখানে…” অফিসার আবার বলল।
সায়মান এবার গম্ভীর কন্ঠে বলল,
“হ্যাঁ, কাল রাতে আপনাদের থানায় যে আসামিরা পাঠানো হয়েছিল, তাদের সম্পর্কে নিশ্চয়ই জানেন।”
“জি, স্যার,” অফিসার বলল, “কিন্তু আমি ওই সময় ডিউটিতে ছিলাম না। আর এইরকম হোটেলে… আমতা আমতা করে বলল।”
অফিসারটা অনেক আগে থেকেই সায়মানকে চেনে,সায়মানের আন্ডারে কাজ করেছে এর আগে। তাই সায়মানের সম্পর্কে ভালোভাবেই জানে।
“হোয়াট ডু ইউ মিন, এইরকম হোটেল মানে?”
সাইফান এবার সায়মানের দিকে তাকাল,
“ভাই, তোমাকে আর কি বলবো? তুমি বিয়ে করলে আসামি ধরতে গিয়ে… আবার —শেষমেশ বাসর করলে আবাসিক হোটেলে, এইরকম রেট পরা হোটেলে আয়, হায় !”
সায়মান চোখ-মুখ কুঁচিয়ে বলল,
“রাজীব কোথায়?”
“জানি না,” সাইফান জবাব দিল।
সায়মান অফিসারের দিকে তাকিয়ে গম্ভীর কণ্ঠে বলল,
“কালকে অনেক রাত হয়ে যাওয়ায় আমরা ঢাকায় ফিরিনি, এখানে রাত কাটিয়েছি। আর এই জায়গাটা এমন আমরা কেউ জানতাম না। রাজিব সিলেক্ট করেছিল জায়গাটা।”
অফিসার মাথা নাড়িয়ে বলল,
“ও, আচ্ছা স্যার। সরি, ভুল হয়ে গেছে। আসলে আপনারা এখানে আছেন, এটা আমরা ঠিক জানতাম না।”
সে সাইফানের দিকে তাকিয়ে , “আর স্যার, এটাকে হয় আপনার একবার বলবেন ।”
সাইফান চোখ ছোট ছোট করে অফিসারের দিকে তাকাল,
“এটা কেম মানে ? আমরা দুইজন আপন ভাই।”
অফিসার সায়মানের দিকে তাকাল,
“স্যার, আসলে ওনার রুমে আমরা একটা মহিলাকে পেয়েছি।”
সায়মান চোখ ছোট করে সাইফানের দিকে তাকাল।
সাইফান সায়মানকে এভাবে তাকাতে দেখে মাথায় হাত দিয়ে বসে পড়ল।
“হায় হায় ভাই, তুমি আমাকে সন্দেহ করছো। ওই রাজিব ভাই আমাকে ফাঁসিয়ে দিয়ে চলে গেছে। আমি তো ঘুমিয়েছিলাম। ওই চাচী মার্কা মহিলা কখন আমার ঘরে ঢুকলো, আমি জানি না।”
সায়মান সাইফানের দিকে একবার তাকাল। একটা হতাশার নিঃশ্বাস ফেলল। একে আর কোন কালে শোধরানো যাবে না, দিনকে দিন বাঁদর হচ্ছে।
তারপর অফিসারের দিকে তাকিয়ে বলল,
“আপনাদের হয়তো কোন ভুল হয়েছে। ভালো করে সিসিটিভি ক্যামেরা চেক করুন। হয়তো মহিলাটি পালাতে গিয়ে ঘরের দরজা ফাঁকা পেয়ে ভিতরে ঢুকে পড়েছে।”
অফিসার মাথা নাড়িয়ে হ্যাঁ জানাল।
সাইফান এক লাফ দিয়ে উঠে দাঁড়াল, সায়মানকে জড়িয়ে ধরল।
“এই না হলে, ভাই… আমি জানতাম, তুমি ভুল বুঝবে না।”
সায়মান এবার ধমকে উঠল,
“বাঁদরের মতো লাফালে এক আচার দিব এবার তোকে।”
রাজিব দেওয়ালের পাশ ঘেষে উঁকি দিয়ে লুকিয়ে সব দেখছিল। ও তখন নিচে গিয়ে স্মোক করছিল। আশেপাশটা ঘুরে দেখছিল। হোটেলে আসতে গিয়ে চারপাশের এমন অবস্থা দেখে চমকে গিয়েছিল। নিজেও জানতো না এই হোটেলটা এমন। যদি সায়মান তাকে সামনে পাই, তাহলে তো কাঁচা চিবিয়ে খাবে। তাই লুকিয়ে থাকার চেষ্টা করছিল ।
চৌদ্দের চিঠি পর্ব ৩৩
হঠাৎ সাইফানের চোখ লুকিয়ে থাকা রাজিবের দিকে পড়ল।
জোরে চিৎকার করে বলল,
“এইতো! রাজীব ভাই আমাকে ফাঁসিয়ে, এখন লুকিয়ে আছে নিজে।”
রাজিব বারবার ইশারা করছে কিছু না বলতে, কিন্তু সাইফান কি শুনার পাএ।
সায়মান এবার সাইফানের দেখানোর দিকে তাকাল। রাজিব দাঁড়িয়ে আছে। সায়মানের চোখে চোখ পড়তেই রাজিব ভয়ে ঢক গিলল।
