Home চৌদ্দের চিঠি চৌদ্দের চিঠি পর্ব ৪০+৪১

চৌদ্দের চিঠি পর্ব ৪০+৪১

চৌদ্দের চিঠি পর্ব ৪০+৪১
আরোবা চৌধুরী আরু

নাফিসা জামা কাপড় চেঞ্জ করে কিছুক্ষণ পর ওয়াশরুম থেকে বের হয়ে এলো। জিন্স আর কুরতি পরে ড্রেসিং টেবিলের সামনে গিয়ে দাঁড়ালো। আয়নায় নিজেকে দেখে মনে হলো, যেন নিজেকেই চিনতে পারছে না।
ঠিক তখনই দরজায় শব্দ হলো। পরক্ষণেই সায়মান দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকল। ঘরে ঢুকেই তার দৃষ্টি সরাসরি গিয়ে পড়ল নাফিসার ওপরে। মাথা থেকে পা পর্যন্ত একবার ভালোভাবে পর্যবেক্ষণ করল সে। চোখে এমন এক ভঙ্গি, যেন প্রথমবার সে তার বউকে নতুনভাবে দেখল।

এই ড্রেসে নাফিসাকে অদ্ভুতভাবে আরও পিচ্চি লাগছে। এই জামাকাপড় যেন তাকে আরও বাচ্চা বাচ্চা করে তুলেছে। ব্যাপারটা সায়মানের কাছে কেন যেন ভালো লাগছে না। সে নিজেই বুঝতে পারছে না কেন। অথচ এ ড্রেসগুলো সে নিজেই কিনে এনেছিল কয়েক দিন আগে। ভেবেছিল, বউকে নতুন কিছু ট্রাই করাবে, বড়দের মতো স্টাইলিশ একটা ভ vibe দেবে। কিন্তু ফল হয়েছে উল্টো নাফিসা তার চোখে এখন আরও ছোট, আরও নিরীহ, আরও “পিচ্চি বউ” মনে হচ্ছে।

আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন

সে এগিয়ে গেল নাফিসার সামনে। নাফিসা ড্যাবডেবে বড় বড় চোখ করে তার দিকে তাকিয়ে রইল। সায়মান সামনে এসে দাঁড়াতেই তার চোখে কেমন নরম ভাব ফুটে উঠল। হঠাৎই সায়মান এক হাত বাড়িয়ে নাফিসার কোমর জড়ালো, তারপর হ্যাচকা টান দিয়ে তাকে একেবারে নিজের সাথে মিশিয়ে নিল। আচমকা টানে নাফিসা কেঁপে উঠল। তার মনেই ছিল না এমন হঠাৎ টেনে নেবে সায়মান।
সায়মান গভীরভাবে নাফিসার দিকে তাকিয়ে ঝুঁকে পড়ল তার কপালের দিকে, তারপর ধীরে খুব নরম করে একটা চুমু এঁকে দিল সেখানে। নাফিসা চোখ নামিয়ে নিল, কিছু বলল না। শুধু চুপচাপ তার হালাল পুরুষের ভালোবাসা অনুভব করল বুক ভরে। এই মানুষটার ছোঁয়া তার হৃদয়কে এক অদ্ভুত শান্তি দেয়, যে শান্তির নাম হয়তো ভালোবাসাই।
সায়মান আবার এক হাত তুলে নাফিসার গালে রেখে বলল,

“এই বউ, পিচ্চি বউ… তুমি এত পিচ্চি কেন? এটা পরে তো আরও পিচ্চি লাগতেছো! এটা কিন্তু ঠিক না। তোমারে এরকম বেশি পিচ্চি পিচ্চি দেখলে আমার মুডে বারোটা বেজে যায়। কবে বড় হবা তুমি আমার পকেট সাইজ সুখ?”
নাফিসা অবাক চোখে তাকিয়ে রইল তার দিকে। লোকটা আসলে কি বলে, কিভাবে কথা বলে, কিছুই বোঝা যায় না! একেক সময় এমন সব অদ্ভুত কথা বলে যে মাথা ঘুরে যায়। তার বয়স তো ১৮ বছর হয়ে গেছে । কিন্তু সায়মানের কাছে কেন এখনও সে “পিচ্চি বউ” টাইটেলে আটকে আছে কে জানে!
আর যা নাফিসাকে সবচেয়ে বেশি বিরক্ত করে, এই লোক যখন রাতের বেলায় “আকাজ-কুকাজ” করে তখন একবারও ভাবে না যে মেয়েটা নেহাতই ছোট! তখন তার মাথায় বয়স–টয়স কিছুই আসে না! কিন্তু বাইরে এসে আবার পিচ্চি ডাকে! এই মানুষটার মাথার ভেতর আসলে কী চলে –——— সেটা আল্লাহই ভালো জানেন।
সায়মান নাফিসাকে ছেড়ে দিল এবার।

“যাও বউ, হিজাব বেধে এসো ! আমি দুই মিনিট টাইম দিচ্ছি ——— ফটাফট রেডি হও।”
নাফিসা ভদ্র বউয়ের মতো কিছু না বলে চুপচাপ ড্রেসিং টেবিলের সামনে দাঁড়িয়ে হিজাবটা বাঁধতে লাগল। আর সায়মান এদিকে হাঁটা দিল তার পড়ার টেবিলের দিকে। নাফিসার বই–খাতা সব তছনছ করে রাখা ছিল ষোলো আনাই অগোছালো। সায়মান এক এক করে বইগুলো গুছিয়ে এক জায়গায় আনতে লাগল। তারপর কাপড় রাখার টালি খুলে এক পাশে বই–খাতাগুলো সুন্দর করে সাজিয়ে রাখল।
হিজাব বাঁধতে বাঁধতে নাফিসা সবকিছু লক্ষ্য করছে । লোকটার প্রতিটা কাজই যেন তাকে অবাক করে। এই মানুষটা কখনো খুব রাগী, আবার কখনো খুব আদুরে, কখনো খুব গম্ভীর, আবার কখনো খুব যত্নশীল। তার ভেতরটা যেমন রহস্যময়, তেমনি আকর্ষণীয়ও।

হিজাব বাধা শেষ হলে সায়মান বলল,
“চলো, আমার পিছন পিছন আসো।”
বলেই টলি হাতে নিয়ে হালকা দ্রুত পায়ে হাঁটা শুরু করল সে। নাফিসাও বাধ্য মেয়ের মতো তার পেছন পেছন চলল। তার বুকের ভিতর কেমন অদ্ভুত ভয় কাজ করছে। বাড়ির কেউই ঠিক জানে না তারা কোথায় যাচ্ছে।তাদের সম্পর্কের বিষয়ে ও কিছু জানে না। আর সায়মানও কিছু বুঝতে দিচ্ছে না তাকে। তার মনে এখন হাজার প্রশ্ন ———— কিন্তু জিজ্ঞেস করার সাহস নেই।
করিডোর পেরিয়ে নিচে নামতেই ডাইনিংয়ে আফিয়া বেগমকে দেখা গেল। মানুষটা তাদের দিকে তাকিয়ে হেসে দিল । নাফিসার গলা শুকিয়ে গেল ভয় পেয়ে গেল । জানে না কি বলবে এখন মামনিকে।
আফিয়া বেগম বললেন,

“কিরে, হলো তাহলে? তোদের বিদায় দিয়ে আমি এবার ঘুমাতে যাই। অনেকক্ষণ ধরে তোদের জন্য অপেক্ষা করতেছি।”
নাফিসা হতবাক। একবার তাকালো আফিয়া বেগমের দিকে, তারপর অবিশ্বাস নিয়ে সায়মানের দিকে। এতক্ষণে সে বুঝল———— এই লোক তার মাকে আগেই সব বলে রেখেছে!
নাফিসা অবাক হয়ে আফিয়া বেগমের দিকে একবার তাকালো তারপর সায়ামানের দিকে। জানলো কি করে মামনি তারা কোথায় যাচ্ছে।
আর নাফিসা কোনরকম নিজেকে সামলে আফিয়া বেগমের দিকে তাকিয়ে হাসি দিয়ে বলল।
মামনি তুমি জানো আমরা কোথায় যাচ্ছি।
ও মা জানবো না কেন। সায়মান যে বলল, তোর গ্রামের বাড়ির কাজ নাকি এখনো শেষ হয়নি। তোর নামে কি জমি জায়গা লেখা আছে সেগুলো ঠিক করবে। এগুলো নিয়ে না থাকুন না ঝামেলাও হত তবু নিজের জিনিস নিজে বুঝে নেয়াই ভালো। আচ্ছা সাবধানে যাস।

আফিয়া বেগমের কথা শুনে নাফিসা আরও অবাক হয়ে সায়মানের দিকে তাকাল। মনে মনে বলল, কি মিথ্যুক লোক রে আল্লাহ! ভাবাও যায় না। এতো বড় মিথ্যে কথা বলে রেখেছে মামনিকে! আল্লাহ মাবুদই জানেন এই মানুষের মাথায় কি চলে, কি প্ল্যান করে রাখে আর কখন কোন অভিনয়টা করে ফেলে ——— কিছুই ধরে রাখা যায় না।
নাফিসা কিছু বলতে পারল না। শুধু বোকার মত হালকা একটা হাসি দিল, মাথা নেড়ে সম্মতি জানাল, যেন বুঝিয়েছে হ্যাঁ, সব ঠিক আছে। তারপর সায়মানের দিক থেকে চোখ সরিয়ে আফিয়া বেগমের দিকে তাকালো সে।
আফিয়া বেগম এগিয়ে এলেন। মায়ের মতো স্নেহে দু’হাতে নাফিসাকে জড়িয়ে ধরে কপালে নরম করে একটা চুমু দিয়ে বললেন,

“সাবধানে যাস কেমন? আর তাড়াতাড়ি ফিরতি আসিস।”
“আচ্ছা মামনি।” ——— নাফিসা মিষ্টি স্বরে বলল।
আফিয়া বেগমকে বিদায় জানিয়ে সায়মান ও নাফিসা দুজনেই গ্যারেজের দিকে রওনা দিল। গ্যারেজে আগে থেকেই রাজীব দাঁড়িয়ে ছিল, সব প্রস্তুত রেখেই। সায়মান টলি এগিয়ে দিতেই রাজীব তা নিয়ে নিল।
রাজীব ভদ্রভঙ্গিতে নাফিসার দিকে তাকিয়ে মিষ্টি হাসি দিয়ে বলল,

“আসসালামু আলাইকুম ভাবি।”
নাফিসাও সৌজন্য ধরে হাসি দিয়ে জবাব দিল,
“ওয়ালাইকুম আসসালাম ভাইয়া।”
রাজীব বলল,
“স্যার, আমি তাহলে আপনাদের ব্যাগগুলো নিয়ে যাচ্ছি। আপনারা আসেন।”
সায়মান মাথা নেড়ে বলল,
“ওকে।”

রাজীব ব্যাগ–পত্র নিয়ে গাড়িতে তুলে রাখল। তারপর ড্রাইভারের সিটে বসল, ইঞ্জিন স্টার্ট দিল, এবং গ্যারেজের বাইরে গাড়িটা নিয়ে চলে গেল। তাদের জন্য পথ পরিষ্কার রেখে।
সায়মান এগিয়ে গিয়ে সামনে দাঁড় করানো বাইকের উপর উঠে বসল। কালো জিন্স, কালো লেদার জ্যাকেট আর হাতে কালো গ্লাভস ——— একদম বাইকার লুক। তার শক্ত শরীরে এই পোশাক আরও ভয়ংকর অথচ আকর্ষণীয় একটা ভাব এনে দিয়েছে। মাথায় হেলমেটটা পরতে পরতে নাফিসার দিকে তাকিয়ে এক চিলতে হাসল। সেই হাসির ভেতর রহস্যও আছে, দখলদারের গর্বও আছে, আর অদ্ভুত এক টান ——— যা নাফিসার বুক কাঁপিয়ে দেয়।
সায়মান ইশারা করল ——— পেছনে বসো।
নাফিসা বাইকের সামনে দাঁড়িয়ে দ্বিধায় পড়ে গেল। গাড়ির মতো হলে একটা কথা ছিল, বাইক! বাইকের পিছন সাইড উঁচু হয় কিভাবে উঠবে বুঝতে পারল না।

কিছুটা সাহস করে পেছনে উঠতে গেল কিন্তু বাইকটা উঁচু বলে ঠিকমতো উঠতে পারল না। দুইবার চেষ্টা করল না, পারছে না। সামনে থেকে হালকা পেল ধমক এসে পড়ল তার কানে।
“আমাকে ধরে তারপর উঠে বসো। বোকার মতো দাঁড়িয়ে থেকো না।”
নাফিসা ঠোঁট ফুলিয়ে বিরক্ত চোখে তাকাল সায়মানের দিকে। কিন্তু শেষমেশ উপায় না দেখে সায়মানের বাহু ধরে সামলে বাইকে উঠল সে। ঠিক উঠতেই টের পেল সায়মান তার দুই হাত ধরে নিজের কোমরের সামনে জড়িয়ে দিল শক্ত করে।
নাফিসা থমকে গেল,

“এভাবে কেন ধরলেন?”
সায়মান এক মুহূর্ত ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাল তার দিকে।
“বাইক এর আগে উঠনি বুঝি? না ধরে বসলে পড়ে যাবে। আমি কিন্তু নিয়ে দায়িত্ব নেব না। আমার বউ পড়ে গেলে ব্যথা পাবে এই চিন্তা আমার নাই, আগে নিজের ভুল ভাঙো তুমি এখন শুধু আমার, তাই ধরেই বসবে।”
নাফিসার গাল লাল হয়ে গেল কথাগুলো শুনে। বুকের ভেতর অদ্ভুত তোলপাড়। রাগও হচ্ছে, আবার মায়া-মায়াও লাগছে। পুরুষটা কেমন যেন! কখনো রাগে হুমকি দেয়, আবার কোন সময় এমনভাবে আপন করে টেনে নেয় যে… বোঝা যায় না সে আসলে কী ধরনের মানুষ।
বাইক স্টার্ট হলো ——— রাতের নীরবতা চিরে ইঞ্জিনের গর্জন ছুটে গেল সামনে। বাড়ি পেছনে পড়ে রইল। রাস্তা ধরে এগোতে লাগল সায়মান। চারপাশে নিশ্চুপ রাত, অন্ধকার, দূরে-দূরে শুধু ল্যাম্পপোস্টের হলুদ আলো। বাইকের গতির সাথে বাতাস এসে আঘাত করছিল নাফিসার মুখে, গাল ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু তার বুকের ভেতর কেমন হিংস্র উষ্ণতা ছড়িয়ে পড়ছে হালাল পুরুষের বুকের সাথে, তার শক্ত শরীরের স্পর্শে এমন নিরাপত্তা সে আর কখনো পায়নি।

হঠাৎ—ছ্যাঁাৎ!
বাইক থেমে গেল নির্জন রাস্তার মাঝখানে। চারদিকে কেউ নেই, শুধু দূরে গাছের সারি, আকাশে আধাঘুমানো চাঁদ। নাফিসা অবাক হয়ে তাকাল,
“কি হয়েছে? বাইক কেন থামালেন?”
সায়মান হেলমেট খুলে নিঃশব্দে তাকিয়ে রইল কিছুক্ষণ। তারপর ধীরে ধীরে বলল,
” সামনে বসো।”
নাফিসা থ হয়ে গেল।
“কি?? সামনের দিকে? না না না—এটা ঠিক না… হচ্ছে কি এসব—আমি সামনে বসতে পারবো না…!”
সে কথা শেষ করার আগেই সায়মান নিচু গলায় বলল,

“বাড়াবাড়ি করবে না। যা বললাম তাই করো। সামনে বসবে।”
“আমি পারবো না!”
“করতে হবে। নইলে এখানেই রেখে যাচ্ছি।”
“আপনি জোর করছেন কীসের জন্য?”
সায়মান হালকা এগিয়ে এল। চোখদুটো অন্ধকারে আরও গভীর দেখাচ্ছে।
“কারণ… আজ তুমি আমার। আমার কাছে থাকবে। আমার কাছ থেকে দূরে না। ভয় পাওয়ার দরকার নেই। তোমার স্বামী আমি এটাই যথেষ্ট।”
তারপর অপেক্ষা না করে নিজেই নাফিসার হাত ধরে তাকে পেছন থেকে নামিয়ে বাইকের সামনে বসাল। নাফিসার নিঃশ্বাস গুলি এলোমেলো হয়ে গেল। এইভাবে সামনে, সায়মানের বুকের খুব কাছে বসতে হবে? বুক ধকধক করছে ওর। মনে হচ্ছে হৃদস্পন্দনের শব্দ বাইরেও বের হয়ে পড়ছে।
নাফিসা কাঁপা গলায় বলল,

“আমি—আমি ভয় পাচ্ছি…”
সায়মান ঝুঁকে এল। তার কানে খুব কাছে মুখ এনে বলল,
“থাক, ভয় পেলেই তুমি আমার আরো কাছে আসো। সেটা আমার পছন্দ।”
তারপর নিজের হাত দিয়ে নাফিসাকে জড়িয়ে ধরল, এমনভাবে যেন তাকে বাইকের সাথে আটকেই রাখল। নাফিসা দম বন্ধ হয়ে গেল প্রায়। শরীর কাঁপছে। কিন্তু আশ্চর্য—ভয়ের সাথে গলে আছে নিরাপত্তা।
এই পুরুষটা ভয়ংকরও, আবার আশ্রয়ও।

পড়ন্ত বিকেলের বেলা। চারপাশে হালকা হাওয়া বইছে, গাছপালার পাতায় সূর্যের আলো ঢেউ খেলছে। এক বটগাছের নিচে দাঁড়িয়ে আছে রিশা আর জারিন। দুই বান্ধবী অনেকক্ষণ ধরে অপেক্ষা করছে আকাশের জন্য। তাদের পা লেগে গেছে, কিন্তু মানসিকভাবে তারা একঘেয়েমি বা ক্লান্তির বোঝা বহন করছে না ——— স্রেফ মনে অদ্ভুত উত্তেজনা, অস্থিরতা।
জারিন অনেকবার চেষ্টা করেছে আকাশকে রাজি করাতে, একবার রিশার সঙ্গে দেখা করার জন্য। কিন্তু আকাশ কোনমতে দেখা করতে রাজি ছিল না। আগেই সে নিজের অবস্থান স্পষ্ট করে দিয়েছে। যেটা তার কাছে কখনও সম্ভব নয়, সেটা নিয়ে সময় নষ্ট করা তার জন্য বোকামি। কিন্তু রিশা জানে, আকাশ বুঝতে পারছে না যে কেউ তার জন্য কতটা অসহায় হতে পারে। কেউ তার জন্য সবকিছু ছাড়তে প্রস্তুত ———— স্ট্যাটাস, অর্থ, সবকিছু বিপরীতে ভালোবাসা।

রিশা ভেবেছে, যার প্রতি একবার মন যায়, তার প্রতি মায়া জাগে। যদি এই মায়া খাঁটি ভালোবাসায় রূপান্তরিত হয়, এমায়া থেকে বের হওয়া কতটা কঠিন হতে পারে, তা সে ভালোভাবে অনুভব করছে। হয়তো সেই কারণেই রিশাও পারছে না। আকাশও হয়তো রিশাকে ভালোবাসে। হয়তো বলা ভুল হবে, ভালোবাসে, কিন্তু তার মাথা ভরা, হাজার রকমের বেড়াজাল ও বাধা। মধ্যবিত্ত পরিবারের ছেলে-মেয়েরা সাধারণত সহজে অনুভূতি প্রকাশ করতে পারে না। করতে গেলেও বিবেক সবসময় কাজ করে। আকাশ ঠিক এমনই। ভালোবাসার মানুষকে চাইতে চাইলেও দূরে ঠেলে দিতে বাধ্য হচ্ছে।

দুই বান্ধবী দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে পায় লেগে গেছে। হঠাৎই তাদের অপেক্ষার অবসান ঘটে ———— আকাশ এসে উপস্থিত হলো। রিস্কা থেকে নিচে নামলো, ভাড়া মিটিয়ে, এগিয়ে আসলো, আকাশের পরনে একটা চেক শার্ট সাথে কারো প্যান্ট আর কাঁধে সব সময় এর মত একটা ব্যাগ ঝুলানো। এই মানুষটার ক্লান্তি কি শেষ হয় না। এত খাটে কেন সারাদিন টিউশনি করার এত কিছু করে।
রিশা তার ব্ল্যাক ডায়মন্ডের দিকে গভীর দৃষ্টি দিল। এই মানুষটাকে সে কতটা ভালোবাসেছে, নিজেও জানে না। মানুষটাকে দেখলে মনে হয় নতুন করে ভালবাসতে আবার,, যতবার দেখেন ততবার নতুন নতুন বিষয় প্রেমে পড়ে কি আজব ঘটনা। যে মানুষটা তাকে চাই না বোঝেনা।
আকাশ দুজনের সামনে এসে দাঁড়ালো।

“আসসালামু আলাইকুম।”
রিশা ও জারিন একসাথে বলল,
“ওয়ালাইকুম আসসালাম।” কিছুছুক্ষণ চুপ থাকলো। তার মনে উলঝানো এক অদ্ভুত দ্বন্দ্ব,, কি বলবে সে নিজে ঠিক বুঝতে পারছিল না। রিশার দিকে তাকাতে সাহস পাচ্ছে না; এই মেয়েটার দিকে চোখ দিলে যেন নিজের নীর্ধারিত সিদ্ধান্তের ওপর অটল থাকা অসম্ভব হয়ে যাবে। হয়তো বন্ধুত্বের সেই বিশ্বাস, যা এই বাড়ি থেকে এত সময় ধরে ভালোবাসা পেয়েছে, তা ভাঙতে চায়ছে না ।
আর রিশার প্রতি তার যে অনুভূতি ভালোবাসা, তা প্রকাশ পেলেই তো সব অস্থিতিশীল হয়ে যাবে। যদি কেউ জানে যে সে এই বাড়ির মেয়েটাকে ভালোবেসে ফেলেছে, তবে কি প্রতিক্রিয়া হবে? নিশ্চয়ই বলে দেবে, “বামন হয়ে চাঁদে হাত দেওয়ার সব স্বপ্ন জেগেছে।” সেই ভয়েই হয়তো সে চুপ থাকল।

কিছুক্ষণ নিঃশব্দ থাকার পর, আকাশের চোখের কোণেও অদ্ভুত একটা ভাব ফুটে উঠল। মনে হলো, যা ভাবছে তা হয়তো বলতে হবে, কিন্তু সেই সঙ্গে ভয়ও আছে—ভয় তার নিজের অনুভূতির প্রতি, ভয় অন্যদের বিশ্বাস হারানোর।
কিছুক্ষণ চুপ থাকার পর আকাশ বলল,
“আর কি বলতে এসেছো? তাড়াতাড়ি বল। জানোই তো, আমার সময়ের মূল্য অনেক। ব্যস্ত মানুষ খেটে খাওয়া, তাই সময়ের মূল্য একটু বেশিই।”
জারিন গভীর নিঃশ্বাস নিয়ে নিজেকে প্রস্তুত করল। এতক্ষণ ধরে গুছিয়ে রাখা কথাগুলো বলার জন্য তিনি যেন একটু সাহসী হল।

“ভাইয়া,” জারিন বলল,
“আমি বলছিলাম, একবার আপনারা বিষয়টা দেখলে হয় না।
আকাশ শান্ত ভঙ্গিতে বলল,
” আমাদের বিষয় ঠিক বুঝতে পারিনি। জানি না কথাটার মানে কী। আরেকবার বললে ভালো হবে সব স্পষ্ট হয়ে যাবে।”
এতক্ষণ ধরে গুছিয়ে রাখা কথাগুলো এখন এলোমেলো হয়ে গেল জারিনের । তবু সে বান্ধবীর দিকে চেয়ে বলল,
“বলছিলাম, ভাইয়া, আপনারা দুজনের সম্পর্কে, আপনার আর রিশার বিষয়ে। আপনাদের সম্পর্কটা ঠিকভাবে আবার দেখলে বোঝালে হয় না।”
আকাশ ভান করে অবাক হওয়ার চেষ্টা করল। রিশার দিকে একবার তাকাল, তারপর ধীরে ধীরে বলল,
“আমাদের মধ্যে তেমন কোনো সম্পর্ক নেই। তোমার কিছুটা ভুল হচ্ছে। আমি ওদের কোম্পানির সাধারণ কর্মচারীর ছেলে, ওর ভাইয়ের বন্ধু, আর ওর শিক্ষক ব্যতীত আর কিছু নয়। আশা করি, বিষয়টা স্পষ্ট হয়ে গেছে।”
জারিন বলল,

“ভাইয়া, আপনি এভাবে বলবেন না। আপনি বেশ ভালোই জানেন আমি কি বলতে চাইছি। এতটা অবুঝ হবেন না। একবার রিশার সঙ্গে কথা বলুন।”
আকাশ রিশার দিকে তাকাল।
“তোমার বান্ধবী তোমাকে এটুকু বলেনি যে আমার সঙ্গে তার একবার কথা হয়েছে। নতুন করে আবার কি বলব, আমি বুঝতে পারছি না,” সে বলল।
জারিন রিশার দিকে চোখ ঘুরিয়ে দেখল। মেয়েটির চোখ পানিতে ভরা, চোখের পলককেও ধরে রাখতে পারছে না। প্রাণপ্রিয় বান্ধবীর মুখ দেখে জারিন খুব অসহায় বোধ করল। সে আবার আকাশের দিকে তাকিয়ে অনুরোধের সুরে বলল,

“ভাইয়া, আমাকে ছোটবোন ভাবেন তো। এই বোনের একটা আবদার রাখুন। আর একবার রিশার সঙ্গে কথা বলুন। প্লিজ, একবার ভেবে দেখুন। প্লিজ।”
আকাশ একটি দীর্ঘশ্বাস ফেলল। তার চোখে ক্লান্তি, আর কণ্ঠে ধীরতা। কিন্তু সে জানে, একবার রিশার সঙ্গে কথা বললে কিছু ভাঙতে পারে। তারপর বলল,
“আচ্ছা।”

রিশা কিছুটা অবাক, কিছুটা আশ্বস্ত। জারিন হাসির মধ্যে লুকিয়ে রাখল নিজের উত্তেজনা।
রিশা এবং জারিন একে অপরের দিকে চেয়ে হালকা নিঃশ্বাস নিল। এখন সেই মুহূর্তটি এসেছে, যেটা তারা দীর্ঘক্ষণ ধরে অপেক্ষা করছিল। রিশার চোখে অজানা এক উত্তেজনা, আকাশের চোখে ধীরতায় ভরা চিন্তা।
জারিন মনে মনে ভাবল, “যদি আজ একবার আকাশ সত্যি রিশার সঙ্গে কথা বলে, তাহলে হয়তো সব অস্পষ্টতা দূর হয়ে যাবে। হয়তো এবার সব কিছু পরিষ্কার হবে।”

চৌদ্দের চিঠি পর্ব ৩৯

আকাশ ধীরে ধীরে তার ব্যাগের স্ট্র্যাপ ঠিক করল, আবার জারিনের দিকে চেয়ে বলল,
“ভালো, এবার কথা বলব ওদিকে আসতে বল তোমার বান্ধবীকে।”
রিশা কাঁপতে শুরু করল না, মনে রয়েছে যে, আকাশ সবকিছু ধীরে এবং বুঝে শুনে বলবে। সে জানে, এই কথোপকথনের মাধ্যমে সব কিছু স্পষ্ট হবে না । তবু হাল ছাড়বেনা। আকাশের কথা শুনে রিসা জারিনের হাতটা শক্ত করে চেপে ধরল একবার আর জারিনও পাশে আছে, শান্তভাবে এবং সমর্থন দিল প্রাণপ্রিয় বান্ধবীকে ।

চৌদ্দের চিঠি পর্ব ৪২+৪৩