Home চৌদ্দের চিঠি চৌদ্দের চিঠি পর্ব ৫০

চৌদ্দের চিঠি পর্ব ৫০

চৌদ্দের চিঠি পর্ব ৫০
আরোবা চৌধুরী আরু

আরিব দাঁড়িয়ে আছে একদম নিশ্চুপ। চোখ শুধু এক জায়গায়, নাফিসার দিকে। এতক্ষণ ধরে যে অস্থিরতা তাকে খেয়ে ফেলছে, নাফিসাকে চোখের সামনে নিরাপদ দেখে বুকটা ধীরে ধীরে ফিরলো। কিন্তু কপালে ওপরের ব্যান্ডেজ আর নাফিসার নিস্তেজ ভাব দেখে তার ভেতরে আবার কেমন যেন মোচড় দিয়ে উঠল।
রুশা একটু দূর থেকে এগিয়ে এল। মুখে দুশ্চিন্তার ছাপ। আফিয়া বেগমের সামনে গিয়ে জিজ্ঞেস করল,
“কি হয়েছে ফুপুমণি? নাফিসার কি অবস্থা? মাথায় ব্যান্ডেজ কেন? হঠাৎ কী হল?”
আফিয়া বেগম মুখ খুললেন না। কেবল নিঃশ্বাস ফেললেন গভীরভাবে। ইমা বেগম ধীর স্বরে বললেন,

“রুশা… ভিতরে গিয়ে কথা বলি। এই জায়গায় বলা ঠিক হবে না।”
ওদিকে রিশা ধরা হাতে নাফিসাকে সামলে নিয়ে হাঁটছে। আফিয়া বেগম পাশে আছে, আরিব আর রুশা পিছন থেকেই হেঁটে ভেতরে ঢুকল, ইমা বেগমও সাথে।
ডাইনিং রুমের বড় সোফায় নাফিসাকে বসানো হলো। শরীরটা ক্লান্ত, চোখ যেন ভারী। আফিয়া বেগম পাশে বসে আছেন—হাতটা এখনও নাফিসার কাঁধে।
ইমা বেগম এক কর্মচারীকে ডাকলেন।

আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন

“পানি আনো।”
সাথে সাথেই একটা গ্লাস এগিয়ে দেওয়া হলো। আফিয়া বেগম নিজের হাতে গ্লাসটা তুলে নিলেন। ধীর ভঙ্গিতে নাফিসাকে পানি খাওয়ালেন।খাওয়াতে খাওয়াতে তার চোখ থেকে, দু’ফোটা পানি গড়িয়ে পড়ল গালে। এই দৃশ্যটা নাফিসা দেখতে পেল। এবং মুহূর্তেই অস্থির হয়ে উঠল।
“মামনি… আমি ঠিক আছি। শুধু একটু পরে গেছি। তুমি এত দুশ্চিন্তা করতেছো কেন? আমি ভালো আছি মামনি…”
কথাগুলো নাফিসা বলছে ঠিকই , কিন্তু তার গলার কম্পন বলে দিচ্ছে, সে নিজেও বুঝতে পারছে না আসলে কী হচ্ছে।
ঠিক তখনই উপর তলা থেকে নিচে নামলো সাবিহা খালেদ নাফিসার দিকে তাকিয়ে নাক শিটকালেন আর রাইমা ডোন্ট কেয়ার ভাব নিয়ে একটা সোফায় বসে ফোন দেখা শুরু করলো। পেছনে বিলকিস আরা, রিদওয়ান , আর এক পাশে দাঁড়িয়ে আছে রাহিল—বড় বড় চোখে তাকিয়ে আছে নাফিসার দিকে । রিদওয়ান ওর পাশে দাঁড়িয়ে হাত ধরে রেখেছে।

আজ এই কয়েকজনই বাসায়। রায়হান আর রুহি চট্টগ্রামে।মইন রাশিদ ও মাহবুব রশিদ শহরের বাইরে। সাইফান তো আজ জাপানে গিয়েছে কোম্পানির কাজে।
আফিয়া বেগম চোখ তুললেন রিদওয়ানের দিকে।
“রাহিলকে নিয়ে ভিতরে যাও।”
রিদওয়ান কোনো কথা না বলে রাহিলকে নিয়ে ঘরের ভিতর চলে গেল।
এবার আফিয়া বেগম আবার মুখ ফেরালেন নাফিসার দিকে।
ধীরে মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন। তারপর দুই হাত দিয়ে নাফিসার গাল ধরে নিজের দিকে আগলে নিয়ে, একটু ঝুঁকে কপালে চুমু রাখলেন।

“আমার সোনা মা… আমার মেয়ে…”
তার কণ্ঠে ভালোবাসা, ভরসা, আর গভীর কষ্ট সব একসাথে মিশে আছে।
একটু পরে তিনি বললেন,
“কিছু কথা জিজ্ঞেস করবো, সোনা। তুমি উত্তর দেবে, ঠিক আছে? ভয় পাবে না… আমি তোমাকে বিশ্বাস করি। আমার মেয়ে আমাকে কিছু লুকাবে না।”
নাফিসা বিভ্রান্ত মুখে তাকিয়ে আছে।
“কি কথা”

এবার তখনকার পরিবেশটা আরও নিঃশব্দ হয়ে গেল। সবাই যেন নিঃশ্বাস আটকে দাঁড়িয়ে আছে। আফিয়া বেগম ধীরে, খুব ধীরে এক দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। তারপর নাফিসার দুই গাল নিজের হাতে ধরে নরম স্বরে বললেন,
“সোনা… তুমি প্রেগন্যান্ট।
এটা কি তুমি জানো?”
এক মুহূর্তে নাফিসার মুখের সমস্ত রঙ মিলিয়ে গেল। কথা বলার ভাষা যেন গলা থেকে উধাও হয়ে গেল সম্পূর্ণ। চোখ বড় হয়ে গেল কথা নেই, শুধু নিঃশ্বাস থমকে গেছে।
তারপর…
তার চোখে হঠাৎই জমে থাকা পানি টুপ… টুপ… করে ঝরে পড়তে লাগল। নাফিসার হাতটা ধীরে, কাঁপতে কাঁপতে নিজের পেটের উপর গিয়ে থামল। মনে হলো যেন প্রথমবার নিজের ভেতরে কিছু আছে—কেউ আছে—এটা সত্যিকারেরভাবে অনুভব করল সে।
সেদিকে তাকিয়ে আছে…
চোখের পানি থামছে না…
পেটের উপরে হাত রেখে বিড়বিড় করে বলছে,

“আমার ভেতরে… আমার হালাল পুরুষটা… আমার DSP সাহেবের অস্তিত্ব…? এটা সত্যি?”
শরীরটা নিস্তব্ধ, দৃষ্টি কাঁপছে, ঠোঁট কেঁপে কেঁপে উঠছে… কিন্তু কোনো শব্দ বের হচ্ছে না। কানে যেন দূরের কোনো আওয়াজও পৌঁছাচ্ছে না, সব যেন থেমে গেছে।
আরিবের কানে “নাফিসা প্রেগন্যান্ট” শব্দটা যেই ঢুকলো, ঠিক সেই মুহূর্তে তার মনে হলো পুরো দুনিয়াটা থেমে গেছে। একটা অদ্ভুত ঠকঠক ধাক্কা বুকের ভেতর লাগলো, তারপর নিস্তব্ধতা। অবাক চোখে সে নাফিসার দিকে তাকিয়ে রইল, যেন নিশ্চিত হতে চাইছে যে সে ঠিকই শুনেছে তো?
মনে হচ্ছে ভুল কিছু শুনেছে… ভুল না হলে এমন কথা কিভাবে সম্ভব? ওর নাফিসা তো এমন মেয়ে না, কিভাবে? কেন? মাথার ভেতর অস্থির ব্যথা শুরু হয়ে গেল, মনে হলো পুরো মাথাটা ফেটে যাচ্ছে। একটা ভয়ঙ্কর সন্দেহ তার বুকের মধ্যে দপদপ করতে লাগলো,

“তাহলে কি কেউ… ওর ফুলটাকে … বাজেভাবে স্পর্শ করেছে?”
ভাবতেই তার শরীর কাপতে লাগলো।
আফিয়া বেগমের কথাগুলো তার কানে যেতেই সে আরও থমকে গেল। সে তাকিয়ে দেখলো নাফিসা মাথা নিচু করে বসে আছে, আর সবাই হতভম্ব। রুশনা পাশে দাঁড়িয়ে আরিবের এই ভাঙা অবস্থা দেখে আর দাঁড়াতে পারলাম না। আরিবের চোখ-মুখ একেবারে বেহাল—চোখ লাল, ঠোঁট শুকিয়ে গেছে, মুখে অবিশ্বাসের ছাপ। রুশনা দ্রুত তার দিকে এগিয়ে গিয়ে ওর হাত চেপে ধরলাম।
আস্তে, খুব আস্তে বললাম,

“আমি তোকে বুঝতে পারতেছি রে… তোর মতো আমারও শখ লাগছে কথাটা শুনে। কিন্তু প্লিজ, এখন কোনো রিয়াকশন দেখাস না। আগে শোনি, আসল ব্যাপারটা কি। আমাদের নাফু এমন না… নিশ্চয়ই কিছু একটা আছে। কি হয়েছে ঠিক মতো শুনি আগে…”
রুশনার কথা শুনে আরিব হাত দুটো মুঠো করে দাঁড়িয়ে থাকল চোখ ভেজা, দৃষ্টি ফাঁকা। রুশা আরিবের এই অবস্থা দেখে নিজেরও অসহায় লাগলো, তার মুখও ম্লান হয়ে গেল।
এই সময় রাইমা ফোন দেখছিলো, কিন্তু “প্রেগন্যান্ট” শব্দটা কানে ঢুকতেই সে চমকে গেল। ফোনটা পাশে রেখে পুরো মনোযোগ এইদিকে দিল। আর সাবিহা খালেদের ভুরু জোড়া কুঁচকে আছে—মুখ দেখেই বোঝা যায়, সে ইতিমধ্যে নিয়ে মাথার মধ্যে নিজের মতো করে গল্প তৈরি করে ফেলেছে।
আফিয়া বেগম তখনও নাফিসার দিকে তাকিয়ে আছেন অবিশ্বাসে।
বিলকিস আরা বেগম চমকে উঠে আফিয়া বেগমের দিকে চোখের ইশারা করলেন,

“কি হয়েছে?”
কিন্তু আফিয়া বেগম তৎক্ষণাৎ শাশুড়িকে চোখের ইশারা করে চুপ থাকতে বললেন।
নাফিসার চোখ দিয়ে টুপটাপ কান্না ঝরতে দেখে আফিয়া বেগম ওকে আগলে নিল নিজের বুকে।বারবাার নাফিসার মাথায় হাত বুলিয়ে বলতে লাগল,
“আমার সোনা মেয়ে… টেনশন করো না মা। কিছু নিয়ে ভয় পেও না। নিজেকে একদম দোষ দেবে না। আমি তোমাকে চিনি—খুব ভালো করেই চিনি। এবার আমাকে বলো তো, কে তোমাকে বাজেভাবে স্পর্শ করেছে? কি হয়েছে? বলো মা… কেউ কি তোমাকে বাজেভাবে, খারাপভাবে ধরেছে?”
আফিয়া বেগমের গলা কেঁপে উঠছে, মুখে আতঙ্ক, নাফিসা একবার তার মুখের দিকে তাকাল, তারপর সঙ্গে সঙ্গে মাথাটা নিচু করে ফেলল। মনে হচ্ছে প্রচণ্ড অপরাধবোধে ভেঙে পড়েছে। কিন্তু ঠিক কীভাবে উত্তর দেবে—তা যেন বুঝতে পারছে না।

ওর মাথার ভেতর তখন শুধু একটাই প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে,
সায়মান কই?
তার ডিএসপি সাহেব কই?
তার সন্তানের বাবা তো তার হালাল পুরুষ… কিন্তু পরিবার জানে না। জানবে কীভাবে! সেই তো বলতে দিইনি, এখন নিজের উপর প্রচন্ড রাগ লাগছে ওর। ওর চোখের সামনে ভেসে উঠছে—আজ কয় তার dsp সাহেব কই? সে জানলে কী বলত? মনে হলো ফোন করবে, আজ কটা মাস তো তার সাথে কোন যোগাযোগই নেই। এখন কি করে একা একা সব সামাল দিবে। ওর ভাবনার মাঝেই
ঠিক তখনই আফিয়া বেগম আবারও জিজ্ঞেস করল,

“বল মা, কে তোকে বাজেভাবে ছুঁয়েছে? ভয় পাস না, আমি আছি।”
নাফিসা মাথা নেড়ে আস্তে আস্তে বলল,
“কেউ না… কেউ বাজেভাবে স্পর্শ করেনি আমাকে…”
পাশেই দাঁড়িয়ে থাকা সাবিহা খালেদ এবার মুখ বাঁকিয়ে জ্বলে উঠল,
“দেখো! কোথায় গিয়ে নষ্টামি করে এসে এখন নাটক করছে! আমি তো আগেই বলেছিলাম—এইসব মেয়েদের চিনি আমি খুব ভালো করে। এখন দেখো মিললো না কি আমার কথাই? এসব থার্ড ক্লাস মেয়েদের বাড়িতে জায়গা দিতে মানা করেছিলাম যে! আর তোমরা না শুনে আদর-যত্নে মাথায় তুলেছো। এখন বোঝো!”
তার কণ্ঠে বিষ, কথা বলার ভঙ্গি যেন নাফিসাকে ছিঁড়ে ফেলছে।
বিলকিস আরা বেগম সঙ্গে সঙ্গে রেগে উঠে বলল,

“সাবিহা, আর একটা বাজে কথা বলবে না। তোমার স্বভাব ঠিক করো এখনো করার —কেউ যদি ভদ্রভাবে কথা বলতে না পারো, তবে চুপ করে থাকো। নাফিসার ওপর কোনো বাজে কথা প্রয়োগ করা চলবে না।”
তারপর শান্ত গলায় নাফিসার দিকে তাকিয়ে বলল,
“দিদিভাই… তুমি কি ভয় পাচ্ছো? কেউ তোমাকে ভয় দেখিয়েছে কি চুপ করে থাকার জন্য? সবটা খুলে বলো আমাকে।”
বিলকিস আরা বেগম তার মাথায় খুব আস্তে করে হাত বুলিয়ে দিল।
নাফিসা আবারও মাথা নাড়ল,

“না … কেউ ভয় দেখায়নি…”
তখন বিলকিস আবার জিজ্ঞেস করল,
“তাহলে বলো … তুমি কি কাউকে পছন্দ করো? যার বাচ্চা… সে কে?”
এই প্রশ্নটা শুনে নাফিসার বুকটা যেন ধক করে উঠল।
সায়মানের এখনো তো পরিবার জানে না!সে কীভাবে মুখ তুলবে?কাকে বলবে?কি বলবে?চোখের জলে ঝাপসা হয়ে গেল চারপাশ।
হঠাৎ করে তার ঠোঁট কাঁপতে কাঁপতে শব্দ বের হলো,
“এই সন্তান… ডিএসপি সাহেবের। আমার হালা………।”
মুহূর্তের মধ্যে পুরো ঘর নিস্তব্ধ।কেউ কথা বলতে পারছে না। কেউ শ্বাসও নিচ্ছে না যেন। আরিব, রুশা, আফিয়া বেগম—সবাই যেন আকাশ থেকে পড়ল। আর ঠিক ওই মুহূর্তেই, আফিয়া বেগমের মুখের রঙ বদলে গেল এক ঝটকায়।
পরের সেকেন্ডেই ঠাস!
নাফিসার কথা সম্পূর্ণ না হওয়ার আগেই, গালে ঝড়ের মতো এক থাপ্পড়।
তারপর আরেকটা।
আরেকটা।
ঠাস ঠাস ঠাস—
থামার নাম নেই। নিজের সমস্ত রাগ উগরে দিচ্ছে।

নাফিসা!!! তুই কি বললি?! ডিএসপি সাহেবের বাচ্চা?! আমার খেয়ে আমার পরে, আমার ছেলের ঘাড়ের উপর তোর নষ্টামি করা বাচ্চার দায় চাপাচ্ছিস?”
আফিয়া বেগমের কণ্ঠে শক এবং ক্রোধের মিশ্রণ। এবার আরিব দৌড়ে এসে আফিয়া বেগমকে আটকালো।
“ফুপুমনি, থামো!” সে চিৎকার করে বলল, “ ওর কথা কিছু করার আগে একটু শোনো তো।”
আফিয়া বেগম চোখ গরম করে আরিবের দিকে তাকালো ।
“আমার ছেলে তাকে এখানে নিয়ে এসেছে। তার পড়াশোনার দায়িত্ব নিয়েছে। ভালোবাসা দিয়ে রেখেছে। আর সে, এই মেয়েটা, এত বড় মানুষের ওপর দায় চাপাচ্ছে। যে ছেলে নিজের ছোটবোনের মত করে ওকে আগলে রেখেছে, তার নামের উপর এমন দায় চাপাচ্ছে?
ইমা বেগমের রঙ পাল্টে গেছে। চোখ-মুখে ক্রোধ স্পষ্ট। রিশা নাফিসার দিকে তাকিয়ে দাঁড়াল, চোখে বিষাদ আর হতাশার ছাপ।

“ছি! তোকে আমি আমার নিজের মতো দেখেছি। কিন্তু তুই কি বড় ভাইয়ের নামে এত বড় মিথ্যা অপবাদ দিচ্ছিস? একবারও তোদের বয়সের পার্থক্য দেখেছিস না যে মানুষটা তোকে এত আগলে রেখেছে। তার নাম এভাবে বলার সাহস কোথা থেকে পেলি?”
রুশনা একবার গভীর নিশ্বাস নিল, তারপর নাফিসার দিকে তাকিয়ে বলল,
“এই মেয়ে… আমি কি বলব তোমাকে? বলার ভাষা খুঁজে পাচ্ছি না। তুমি কি বুঝছো? তুমি আমার এক ভাইকে পাগল করে দিচ্ছ, আরেক ভাইয়ের নামে মিথ্যা রটাচ্ছ। ছি ছি, তোমার কাছ থেকে এটা আশা করিনি। এভাবে আমাদের বিশ্বাস ভাঙছো।”
রাইমা চুপ করে দাঁড়িয়ে হাসছে, চোখে হাসির আভা। “বাহ! অবাক হলেও ওর অবস্থা দেখে এখন ভালই লাগছে,”
সাবিহা খালেদ ছোট ছোট চোখে নাফিসাকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখল।

“এই মেয়ে… এবার প্রমাণ পেল যে বাড়ির প্লেটে খায় সেই বাড়ির প্লেটে ফুটো করছে। আমি আগেই বলেছিলাম—এ ধরনের মেয়েরা বাড়িতে ঢুকলে বিপদ হয়। কিন্তু সবাই নিজের মতো করে আদর, যত্ন দিয়ে মাথায় তুলে দিয়েছে। এখন দেখ, কী হলো? ছেলে নামের অপবাদ দিয়ে দিল?”
নাফিসা অবাক চোখে চারপাশের মানুষগুলোর দিকে তাকাচ্ছে। আগে যারা ভালোবাসতো, যারা বিশ্বাস করতো—এখনও কি বিশ্বাস আছে তার উপর? এই মানুষগুলো এখন তার কথা না শোনে, তাকে দোষারোপ করছে।
আফিয়া বেগমের দিকে তাকিয়ে সে আরও অবাক হলো। যে মানুষকে সে সবসময় আস্থা করতো—সে এতটা সহজেই তাকে অবিশ্বাস করতে পারল!
সাবিহা খালেদ আবারও কণ্ঠটা কড়া করে বলল,
“এই মেয়েকে এখনই বাড়ি থেকে বের করে দাও?নষ্ট মেয়ে কোথাকার নষ্টামি করে বাচ্চা পেটে নিয়ে এসে। বাড়ির ছেলেদের নামে দোষ দিচ্ছে।”

নাফিসা চুপচাপ, মাথা নিচু করে, চোখে জল। মনে মনে বলছে DSP সাহেব…
আপনার পিচ্চিটা ভেঙে গেছে আজ।সবাই আমাদের ভালোবাসাকে কলঙ্কের গল্প বানাতে চাইছে।আপনি কোথায়? আসছেন না কেন? আপনার পিছে আর সহ্য করতে পারছে না? ”
আফিয়া বেগম এবার চোখ বুজে নিজের রাগ নিয়ন্ত্রণ করে, নাফিসার কাঁধে হাত রাখলেন, নরম স্বরে বললেন,
“সোনা,তুমি যেটা বলেছে সেটা মিথ্যা। কেউ তোমাকে এগুলো বলতে বলেছে বলো। আমি জানি তুমি ভয় পাচ্ছ, লজ্জা পাচ্ছ। কিন্তু তুমি একা নও। আমরা তোমার পাশে আছি। সবটা খুলে বলো, আমরা শুনবো। ভয় পেও না। ”
নাফিসা কেঁপে ওঠা ঠোঁট দিয়ে শেষমেশ জোরে বলে উঠলো ,
“এই সন্তান… ডিএসপি সাহেবের… সায়মানের আমাদের বিয়ে হয়েছে কোন কলঙ্ক নাই এটা,প্লিজ কেউ অপবাদ দিবেন না ।”

ঘরটা হঠাৎ নিস্তব্ধ। আরিব, রুশনা, ইমা বেগম, রিশা, রাইমা, সাবিহা,বিলকিস আরা, আফিয়া বেগম—সবাই যেন আকাশ থেকে পড়ল।
আফিয়া বেগমের চোখ থেকে রঙ উধাও। তার গলা কেঁপে উঠল, চোখে অদ্ভুত শক। আর ঠিক ওই মুহূর্তে নাফিসার গালে ঠাস! একের পর এক থাপ্পড়।
“ঠাস ঠাস ঠাস—”
এই শব্দ যেন নিঃশ্বাস কেটে দিয়েছে।
আরিব চোখ বড় করে নাফিসার দিকে তাকিয়ে থাকল, মনে হলো যেন পুরো বিশ্ব থেমে গেছে। রুশনা পাশে দাঁড়িয়ে হাত ধরে তাকে সামলাচ্ছে।
আফিয়া বেগম তীব্র চোখে তাকিয়ে গর্জে উঠল,
“আমার তেহুর নামে আর একটা মিথ্যা অপবাদ দিবি না!”
নাফিসার দিকে সেই চোখের দৃষ্টি যেন আগুন ছুঁড়ে দিচ্ছে। শব্দের প্রতিটি অংশ ছিঁড়ে ফেলছে নাফিসার বুকের ভেতরটা।
সাবিহা খালেদ ঠোঁট বাঁকিয়ে নাফিসার দিকে তাকালো। মুখের, ভঙ্গিটা, বহুদিনের জমে থাকা বিদ্বেষ এখন বের করার সুযোগ পেয়েছে।

“এই মেয়েটা দেখছো? কত বড় ধুরিবাজ। এখন আবার নতুন নাটক সাজাচ্ছে— বিয়ে করেছে নাকি! বাহ! বের করে দাও একে। আরও কত রকম অপবাদ দেবে বলা যায় না।”
তার কথায় ঘরটা আরও ভারী হয়ে গেল। নাফিসা নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে আছে। চারপাশের মানুষগুলো তাকে দেখে যেন ঘৃণা গিলে ফেলছে।ঠিক তখনই আফিয়া বেগম হঠাৎ উঠে দাঁড়ালেন। শব্দ না করে সিঁড়ি বেয়ে ওপর দিকে চলে গেলেন। ঘরের বাতাস যেন হঠাৎ জমে গেল। কেউ শব্দ করলো না। সবাই শুধু তাকিয়ে আছে নাফিসার দিকে— সেই দৃষ্টিতে ঘৃণা, সন্দেহ, আর অবিশ্বাস ছাড়া আর কিছু নেই।
নাফিসা থম মেরে দাঁড়িয়ে। মানুষগুলোকে সে আর চিনতে পারছে না। এরা কি সেই পরিবার, যেখানে সে এতদিন থেকেছে?সবচেয়ে এত ভালোবাসা পেয়েছে। কিন্তু আজ?আজ তারা সবাই তার দিকে তাকাচ্ছে যেন সে কোনো নোংরা অপরাধী।

নাফিসা ধীরে ধীরে হাত রাখল নিজের পেটের উপর। তার ভেতরে যে ছোট্ট প্রাণটা আছে—তার অস্তিত্ব যেন আরও জোরে অনুভব হলো এই মুহূর্তে। চোখ ঝাপসা হয়ে গেল পানিতে।
“তোর বাবা শুধু হারিয়ে যায়… তোর মাকে ফেলে শুধু চলে যায়…
দেখ না, তুই যে আমার পেটে এসেছিস। তোর অস্তিত্বটা আমার ভেতরে…
কিন্তু সে জানার আগেই সবাই আমাকে দোষী বানিয়ে দিল।”
ধীরে ধীরে পানি টুপটুপ করে গড়িয়ে পড়ছে নাফিসার গাল বেয়ে।
ঘরটা তাকে গিলে ফেলতে চাইছে মনে হচ্ছে। হঠাৎ ওপরতলা থেকে পায়ের থাপ! থাপ! শব্দ… আফিয়া বেগম হাত ভরা লাগেজ নিয়ে নেমে এলেন। মুখে কঠোরতা । সোজা নাফিসার সামনে এসে দাঁড়ালেন। তারপর কোনো পূর্বাভাস ছাড়াই। এক ঝটকায় নাফিসার হাত ধরে শক্ত করে টেনে তুললেন।
“বের হয়ে যা এই বাড়ি থেকে! আর কখনও তোর এই মুখ দেখাবি না!”

নাফিসা হোঁচট খেল। মাটি পায়ের তলা সরে যাচ্ছে অনুভব করল।
কিন্তু আফিয়া বেগম টেনে ধরে রীতিমতো টেনে নিয়ে যাচ্ছে ওকে ।
ঘরের সবাই নিঃশব্দে দেখছে কেউ কোনো কথা বলছে না। কারো চোখে দয়া নেই।
সাবিহা আর রাইমা ঠোঁটের কোণে মিষ্টি হাসি লুকাতে পারছে না।
তাদের চোখে তৃপ্তির ঝিলিক, যেন বহুদিনের শত্রুকে শেষ পর্যন্ত হারাতে পেরেছে।
রিশার চোখ দুটো লাল হয়ে আছে। পানি পড়ছে টইটই করে।
তার মন চাইছে নাফিসাকে বিশ্বাস করতে— কিন্তু তার প্রিয় ভাইয়ের নামে অভিযোগ সে সহ্য করতে পারছে না। এই দ্বন্দ্ব তাকে ভেতর থেকে ছিঁড়ে ফেলছে।
আফিয়া বেগম প্রায় টেনে হিঁচড়ে নাফিসাকে বাড়ির দরজার দিকে নিয়ে যাচ্ছেন । ঠিক তখনই পেছন থেকে কড়া গলায় বিলকিস আরা রাশিদ বললেন,

“আফিয়া! যেখানে আছো সেখানেই দাঁড়িয়ে যাও।”
আফিয়া থমকে গেলেন।
বিলকিস আরা ধীরে ধীরে এগিয়ে এসে বললেন,
“ভুলে যেও না— তোমার থেকেও বড় কেউ এই বাড়িতে আছে। আমি তোমার শাশুড়ি। আমি এখনো বেঁচে আছি। পুরো ব্যাপারটা আমাকে বুঝতে দাও।”
আফিয়া বেগম দাঁত চাপা মুখে ফিরে তাকালেন। চোখে রাগের আগুন।
“আমি কিছু বুঝতে চাই না!
আমার তেহুর নামে কোনো অপবাদ আমি শুনবো না! মাফ করবেন না আপনার সাথে বেয়াদবি করার জন্য !”
শাশুড়ির কোনো কথা শোনার চেষ্টা করল না। দৃঢ় ভঙ্গিতে নাফিসাকে আবার টেনে ধরলেন। নাফিসা পা সামলাতে পারছে না।

হোঁচট খেতে খেতে একেবারে বাড়ির বাইরে এসে পৌঁছল। বাইরের ঠাণ্ডা বাতাস মুখে লাগতেই শরীরটা কেঁপে উঠলো। দরজার সামনে দাঁড়িয়েই । আফিয়া বেগম দুই হাত দিয়ে নাফিসাকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিলেন।
ধাপ!
নাফিসা টলে পড়ে গেলো মাটিতে। পাশের টোলিটা উলটে গেলো।
আফিয়া বেগম দরজার সামনে দাঁড়িয়ে ফুঁসে উঠলেন,
“এই বাড়ির সীমানায় যাতে আর না দেখা মিলে তোর! বের হয়ে যা!!”
তারপর দরজাটা জোরে ধাম করে বন্ধ হয়ে গেল।
নাফিসা মাটিতে বসে রইলো।দরজার দিকে তাকিয়ে… চোখে কেবল অবিশ্বাস আর অসহায়তা।

“DSP সাহেব… আজ আপনার অভাবটা আমাকে সত্যি সত্যিই কুরে কুরে খাচ্ছে, ছিন্নভিন্ন করে দিচ্ছে। কোথায় আপনি? আমার জন্য না হোক, আপনার সন্তানটির জন্য অন্তত একটু তাড়াতাড়ি আসতেন! আমি এখন কোথায় যাব, কার কাছে যাব? আমাদের ভালোবাসার চিহ্নটাকে আমি একা কীভাবে আগলে রাখব?
আপনার সন্তানের নাম নিয়ে সবাই নোংরা অপবাদ দিচ্ছে, তিরস্কার করছে… অথচ আমি একা—একদম অসহায় হয়ে সব সহ্য করছি। আপনি থাকলে কেউ এতটুকু বলার সাহস পেত না। দয়া করে ফিরে আসুন DSP সাহেব… আপনার অভাব আমার বুকটা ফাঁকা করে দিচ্ছে।”
কেউ নেই পাশে। ধীরে ধীরে কান্নাটা বুক থেকে উঠে এসে গলার কাছে আটকে গেল, একটা দুটো শব্দও বের হলো না, শুধু নিঃশব্দ কান্না।

চৌদ্দের চিঠি পর্ব ৪৯

অনেকক্ষণ সে ওভাবেই বসে রইলো। ধীরে ধীরে হাত বাড়িয়ে ব্যাগটা তুলে নিলো। ভারী লাগলো টেনে নিয়ে যেতে ভারী শুধু ব্যাগ নয়, জীবনটাই। নাফিসা ধীরে ধীরে দাঁড়ালো। চোখের পানি মুছলো।আরেকবার পিছন ফিরে তাকালো। এই বাড়িতে সে ঢুকেছিল ডিএসপি সাহেবের হাত ধরে…আসার পর সবাই অনেক ভালোবাসা পেয়েছে কিন্তু আজ বের হচ্ছে অপমান আর অভিশাপ নিয়ে। লম্বা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললো। তারপর ধীরে ধীরে বাড়ির সীমানা পেরিয়ে হাঁটতে শুরু করল।

চৌদ্দের চিঠি পর্ব ৫১